এনআরসি ও অনুপ্রবেশ সমস্যা

সুজন ভট্টাচার্য

 

(গত সপ্তাহের পর)

১৯০১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা একবার দেখা যাক।

সাল

জনসংখ্যা

(কোটি)

বৃদ্ধি

(কোটি)

বৃদ্ধির হার হার পরিবর্তন

১৯০১

১.৬৯

১৯১১

১.৮০ ০.১১ ৬.২৫

১৯২১

১.৭৪ (-) ০.০৬ (-) ২.৯১ (-) ৯.১৬

১৯৩১

১.৮৯ ০.১৫ ৮.১৪ ১১.০৫

১৯৪১

২.৩২ ০.৪৩ ২২.৯৩ ১৪.৭৯

১৯৫১

২.৬৩ ০.৩১ ১৩.২২

(-) ৯.৭১

১৯৬১ ৩.৪৯ ০.৮৬ ৩২.৮০

১৯.৫৮

১৯৭১ ৪.৪৩ ০.৯৪ ২৬.৮৭

(-) ৫.৯৩

১৯৮১ ৫.৪৬ ১.০৩ ২৩.১৭

(-) ৩.৭০

১৯৯১ ৬.৮১ ১.৩৫ ২৪.৭৩

১.৫৬

২০০১ ৮.০২ ১.২১ ১৭.৭৭

(-) ৬.৯৬

২০১১ ৯.১৩ ১.১১ ১৩.৮৪

(-) ৩.৯৩

 

সমগ্র ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের সঙ্গে একবার তুলনা করেও নেওয়া যাক তাহলে—

সাল

ভারত পশ্চিমবঙ্গ পার্থক্য পরিবর্তন

১৯১১

৫.৭৫ ৬.২৫ ০.৫০

১৯২১

(-) ০.৩১ (-) ২.৯১ (-) ২.৬০ (-) ৩.১০

১৯৩১

১১.০০ ৮.১৪ (-) ২.৮৬ (-) ০.২৬

১৯৪১

১৪.২২ ২২.৯৩ ৮.৭১ ১১.৪৭

১৯৫১

১৩.৩১ ১৩.২২ (-) ০.০৯ (-) ১১.৫৬
১৯৬১ ২১.৬৪ ৩২.৮০ ১১.১৬

১১.২৫

১৯৭১ ২৪.৮০ ২৬.৮৭ ৩.০৭

(-) ৮.০৯

১৯৮১ ২৪.৬৬ ২৩.১৭ (-) ০.৫১

(-) ৩.৫৮

১৯৯১ ২৩.৮৭ ২৪.৭৩ ০.৮৬

১.৩৬

২০০১ ২১.৫৪ ১৭.৭৭ (-) ৪.৭৮

(-) ৫.৬৪

২০১১ ১৭.৬৪ ১৩.৮৪ (-) ৩.৮০

(-) ০.৯৮

 

তার মানে ১৯৪১, ১৯৬১, ১৯৭১ আর ১৯৯১ সাল ছাড়া অন্যান্য সমস্ত বছরেই ভারতের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম। এর ব্যাখ্যা কী? ১৯৬১, ৭১ আর ৯১-এর সেনসাস বছরে না হয় তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ থেকে হু হু করে অনুপ্রবেশ হয়েছে। তাহলে ১৯৪১ সালে জনসংখ্যা ২২%-এর বেশি বেড়ে গেল কেন? এর উত্তর কী? তখন তো আর দেশভাগ হয়নি। কাজেই অনুপ্রবেশের প্রশ্নও ছিল না। তাহলে? আবার ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ‘কোটি কোটি’ উদ্বাস্তুর আগমনের পরেও জনসংখ্যা মাত্র ৩১ লক্ষ বাড়ল কেন? উত্তর খোঁজার আগে আরও কিছু পরিসংখ্যান দেখে নেওয়া যাক।

১৯৪১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ও মুসলিম জনসংখ্যার চিত্রটা একবার দেখে নেওয়া যাক (কোটিতে):

সাল

মোট হিন্দু শতাংশ মুসলিম শতাংশ

১৯৪১

২.১০ ১.৪১ ৬৭.১৪ ০.৫৫ ২৬.১৯

১৯৫১

২.৬৩ ২.০৭ ৭৮.৭১ ০.৫১ ১৯.৩৯

১৯৬১

৩.৪৯ ২.৭৫ ৭৮.৮০ ০.৭৯ ২২.৬৪

১৯৭১

৪.৪৩ ৩.৪৬ ৭৮.১০ ০.৯১

২০.৫৪

১৯৮১ ৫.৪৬ ৪.২০ ৭৬.৯২ ১.১৭

২১.৪৩

১৯৯১ ৬.৮১ ৫.০৯ ৭৪.৭৪ ১.৬১

২৩.৬৪

২০০১ ৮.০২ ৫.৮১ ৭২.৪৫ ২.০২

২৫.১৯

২০১১ ৯.১৩ ৬.৪৩ ৭০.৪৩ ২.৪৬

২৬.৯৪

 

এইবারে নিশ্চয়ই অনেকেরই আর হাসি আটকানো যাচ্ছে না। দেখাই তো যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের শতাংশ ১৯৮১ থেকে বাড়তে বাড়তে ২০১১-তে প্রাক-স্বাধীনতার হারকেও ছাপিয়ে গেছে। তাহলে মুসলিম-অনুপ্রবেশের কিংবা হিন্দুদের ছাপিয়ে যাওয়ার আশঙ্কার যে ভিত্তি আছে, সেটা নিশ্চয়ই পরিষ্কার হয়ে গেল! আপাতত সেই আশঙ্কার আনন্দ বজায় থাকুক। আরও কিছু পরিসংখ্যান আসবে তার পরে।

ভারতবর্ষের মতই পশ্চিমবঙ্গেও যে মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত বেড়েছে, সেটা আমরা দেখেছি। আসুন আবার কতগুলো তথ্য নিয়ে একটু অঙ্ক কষা যাক। প্রথমেই দেখা যাক, পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ও মুসলমানদের সংখ্যার পার্থক্যের ওঠানামা:

সেনসাস

হিন্দু

(কোটি)

মুসলিম

(কোটি)

পার্থক্য

(কোটি)

১৯৪১

১.৪১ ০.৫৫ ০.৮৬

১৯৫১

২.০৭ ০.৫১ ১.৫৬

১৯৬১

২.৭৫ ০.৭৯ ১.৯৬

১৯৭১

৩.৪৬ ০.৯১

২.৫৫

১৯৮১ ৪.২০ ১.১৭

৩.০৩

১৯৯১ ৫.০৯ ১.৬১

৩.৪৮

২০০১ ৫.৮১ ২.০২

৩.৭৯

২০১১ ৬.৪৩ ২.৪৬

৩.৯৭

 

তাহলে গোটা ভারতের মতই পশ্চিমবঙ্গেও মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত বৃদ্ধি পেলেও মুসলিমদের তুলনায় হিন্দু জনসংখ্যার ফারাক ক্রমবর্ধমান। ১৯৪১ সালকে ভিত্তি করলে ২০১১-য় সেই ফারাক ৪৬১.৬৩%। আবার ১৯৪১-র ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গে ২০১১-র হিন্দু জনসংখ্যা হয়েছে ৪৫৬.০৩% আর মুসলিম জনসংখ্যা ৪৪৭.২৭%। আসুন তাহলে সেনসাস-সালের ভিত্তিতে সেই বিস্তারটা একবার দেখে নেওয়া যাক:

সেনসাস

হিন্দু বর্ধিত

(শতাংশ)

মুসলিম বর্ধিত

(শতাংশ)

পার্থক্য বর্ধিত

(শতাংশ)

১৯৪১

(১০০.০০) (১০০.০০) (১০০.০০)

১৯৫১

১৪৬.৮১ ৯২.৭৩ ১৮১.৪০

১৯৬১

১৯৫.০৪ ১৪৩.৬৪ ২২৭.৯১

১৯৭১

২৪৫.৩৯ ১৬৫.৪৫

২৯৬.৫১

১৯৮১ ২৯৭.৮৭ ২১২.৭৩

৩৫২.৩২

১৯৯১ ৩৬০.৯৯ ২৯২.৭৩

৪০৪.৬৫

২০০১ ৪১২.০৬ ৩৬৭.২৭

৪৪০.৭০

২০১১ ৪৫৬.০৩ ৪৪৭.২৭

৪৬১.৬৩

 

তাহলে কী দাঁড়াল? মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত যতই বাড়ুক না কেন, মোট বৃদ্ধিতে তারা হিন্দুদের পিছনেই রয়েছে। এবং প্রতিটি সেনসাসেই সেই ফারাক বৃদ্ধি ৫০%-এর থেকে বেশি। হ্যাঁ, কেউ বলতেই পারেন, ফারাকটা ২০১১-য় এসে হয়েছে মাত্র ৮.৭৬%। কে বলতে পারে, পরবর্তী দশ বছরে সেটা টপকে যায়নি? এবং বৃদ্ধি হারের যা প্রবণতা, তাতে তো ইতিমধ্যেই টপকে যাবার কথা। ২০২১ সালের সেনসাস অবধি বসে থাকব নাকি? ঠিক, ঠিক। তাহলে আরেকটু এগোনো যাক।

হিন্দু-মুসলিম উভয় অংশের বৃদ্ধি হার নিয়ে আলোচনায় আসা যাক:

সেনসাস

হিন্দু

(কোটি)

বৃদ্ধি হার মুসলিম

(কোটি)

বৃদ্ধি হার

১৯৪১

১.৪১ ০.৫৫

১৯৫১

২.০৭ ৪৬.৮১ ০.৫১ (-) ৭.২৭

১৯৬১

২.৭৫ ৩২.৮৫ ০.৭৯ ৫৪.৯০

১৯৭১

৩.৪৬ ২৫.৮২ ০.৯১

১৫.১৮

১৯৮১ ৪.২০ ২১.৩৯ ১.১৭

২৮.৫৭

১৯৯১ ৫.০৯ ২১.১৯ ১.৬১

৩৭.৬০

২০০১ ৫.৮১ ১৪.১৫ ২.০২

২৫.৪৭

২০১১ ৬.৪৩ ১০.৬৭ ২.৪৬

২১.৭৮

 

এই সারণি থেকে দেখা যাচ্ছে, ১৯৫১ সালের পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ক্রমাগত কমেছে। ১৯৪১-কে ভিত্তি ধরলে পরবর্তী ৭০ বছরে হিন্দু জনসংখ্যার বৃদ্ধি গড় হার হল ২.৪৭। আবার ১৯৫১ সালে মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধি হার ঋণাত্মক হলেও ১৯৬১ সালে ব্যাপক বৃদ্ধি হয়। আবার ১৯৭১-এর সেনসাসে সেই হার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হয়ে যায়। আবার ১৯৮১ ও ১৯৯১ সালে সেই হার বাড়তে শুরু করে। ২০০১ থেকে সেই হার আবার কমতে শুরু করে। একইভাবে ৭০ বছরে মুসলিম গড় বৃদ্ধি হার হল ২.৫১। নিঃসন্দেহে হিন্দুদের তুলনায় মুসলিমদের গড় বৃদ্ধি হার ০.০৪ বেশি। তাহলে কি পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমরা সংখ্যায় হিন্দুদের টপকে যেতে পারবে না? দেখাই যাক।

এই সারণি থেকে এটাও বোঝা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু-মুসলিম জনসংখ্যার ভিত্তি নির্ধারণ করা খুব সমস্যার। ১৯৫১ সালে হিন্দু বৃদ্ধি হার বিপুল। নিঃসন্দেহে দেশ ভাগের কারণে। একই কারণে মুসলিম সংখ্যা হ্রাস। আবার ১৯৬১তেই মুসলিম বৃদ্ধি হার আচমকা বেড়ে যাবার কারণ কী? অনেকেই বলবেন, তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান থেকে ব্যাপক সংখ্যায় মুসলিম আবার পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ করেছিল। যেহেতু ১৯৬৫-র ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আগে পর্যন্ত সীমান্তে ভিসা-পাসপোর্টের প্রয়োগ ছিল না, সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু কেন মুসলিমরা পাকিস্তান ছেড়ে স্বাধীনতার ১৫ বছরের মধ্যেই আবার হিন্দু-অধ্যুষিত অঞ্চলে ফিরে আসবেন? একটা বাজার-চলতি জবাব আছে, পশ্চিমবঙ্গকেও মুসলিমপ্রধান বানিয়ে দেওয়া। থ্রিলার-গল্পের একটা সুবিধা আছে। মূল স্টোরি লাইন ঠিকঠাক থাকলেই হল। আনুষঙ্গিক বিষয়ের খোঁজ সেখানে কেউ করতে যায় না। কিন্তু জনসংখ্যার সমস্যা আর যাই হোক থ্রিলারের মানসিকতা দিয়ে বোঝা যায় না। তাহলে একই ঘটনা পাঞ্জাবে ঘটল না কেন?

আসলে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের মাঝখানেই আরেকটা সাংঘাতিক ঘটনা আমরা প্রায় ভুলেই যাই। সেটা হল অসমে বঙ্গাল খেদা আন্দোলন। অসমে বঙ্গাল খেদা আন্দোলনের সূত্রপাত স্বাধীনতার আগে থেকেই। ১৯৪৮ সালের মে মাসেই অসমের অনেক জায়গাতেই বাঙালিদের উপর আক্রমণ হয়, তাদের দোকান ও সম্পত্তি লুঠ হয়। সেই সময়ে মূল টার্গেট ছিল শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত বাঙালি হিন্দুরাই। প্রাণ বাঁচাতে এদের অনেকেই পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন। কাজেই ১৯৫১ সালে হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে মূল ভূমিকা পূর্ববঙ্গের হলেও অসমেরও একটা ভূমিকা যে ছিল, সেটা স্পষ্ট। কিন্তু ১৯৫৫ সালে ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের প্রস্তাব আসা মাত্রই অসমে বাঙালি মুসলমানরাও টার্গেট হয়ে ওঠেন। গোয়ালপাড়া জেলায় রাতারাতি যাবতীয় বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলো হয়ে যায় অসমিয়া-মাধ্যম। ১৯৬১ সালে মুসলিম বৃদ্ধি হার আচমকাই লাফ দেবার পিছনে অসম থেকে পালিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেবার মধ্যেও লুকিয়ে আছে। সেই ঘটনাগুলোকে চেপে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির আনুপাতিক পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করা যাবে না।

কিন্তু এটাও ঘটনা, ১৯৯১ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরলে (অর্থাৎ যে সময় থেকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের একটা আপাত-সাম্য দেখা যাচ্ছে), পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হিন্দুদের মতই নিম্নগামী।

সেনসাস

হিন্দু বৃদ্ধি হার

পরিবর্তন

মুসলিম বৃদ্ধি হার পরিবর্তন

১৯৯১

২১.১৯

৩৭.৬০

২০০১

১৪.১৫

(-) ৩৩.২২ ২৫.৪৭

(-) ৩২.২৬

২০১১ ১০.৬৭ (-) ২৪.৫৯ ২১.৭৮

(-) ১৪.৪৯

 

 

(আবার পরের সপ্তাহে)

হেডার ছবি: https://scroll.in/article/936017/debates-around-nrc-show-the-common-thread-of-trauma-that-binds-the-people-of-assam

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1912 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...