প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য, ঋত্বিক চক্রবর্তী এবং ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’

প্রিয়ক মিত্র

 

আড্ডায় পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য ও অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তী। তাঁদের দীর্ঘদিনের একসঙ্গে কাজ, টেলিফিল্ম থেকে বড়পর্দা হয়ে মোবাইল ক্যামেরায় বানানো সিনেমা, এসব নিয়ে দীর্ঘ কথোপকথন। সঙ্গে অবশ্যই রয়েছে 'রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত'-র প্রসঙ্গও। এই সাক্ষাৎকার গতবছর শীতের। তখনও 'রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত'-র মেকিং চলছে। ২০ সেপ্টেম্বর মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল এই ছবিটির। কিন্তু কোনও অজ্ঞাত কারণে 'রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত' কলকাতায় কোনও হল পায়নি। মুক্তির তারিখ ২০ থেকে পিছিয়ে হয়েছে ২৭ সেপ্টেম্বর। প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য এবং ঋত্বিক চক্রবর্তীর সিনেমাভাবনার সঙ্গে পরিচিত হতে এই সাক্ষাৎকারটি পড়তে পারেন। তারপর বিচার করুন, এই ভাবনা বাংলা সিনেমার জন্য জরুরি কি না!

 

প্রদীপ্তদাকে প্রথম যে প্রশ্নটা করব, এই সময়ে দাঁড়িয়ে ‘শ্রীকান্ত’ কেন? এবং এইসময়ের ‘শ্রীকান্ত’ কেন?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: শ্রীকান্ত যখন প্রথম পড়েছিলাম, মাধ্যমিকের সময়, সেইসময় শ্রীকান্ত নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে হয়েছিল। আমার একটা নোটবই আছে, যেখানে বিভিন্ন সিনেমা করার ইচ্ছের কথা লেখা আছে, সেখানে দু’-চার লাইন লেখা ছিল শ্রীকান্ত নিয়ে। শরৎচন্দ্রের ক্লাসিক যদি বলো, আমার একটা মেয়ে দেবদাসও করার ইচ্ছে ছিল। তারপর প্রযোজক যখন বিভিন্ন কনসেপ্ট চাইছিলেন, তখন আমার এইটার কথা মনে হল।

আমি দেখলাম শ্রীকান্ত পুরনো ফর্ম্যাটে করার কোনও প্রয়োজন এখন নেই। প্রথমত, পিরিয়ড পিসে বাজেটের সমস্যা। দ্বিতীয়ত, প্রথমবারের পর আমি শ্রীকান্ত আর পড়িওনি। এখন পড়লে কেমন লাগবে জানি না। আমার যা মনে আছে, তার ভিত্তিতে এখনকার মত করে সাজিয়েছি গল্পটা। ফলত শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ পুরোপুরি উঠে আসছে না আমার কাজে।

এই প্রশ্নটা ঋত্বিক চক্রবর্তীকে, অভিনয় করার সময় কি শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ মাথায় রেখেই কাজ করেছেন?

ঋত্বিক চক্রবর্তী: না, তা করিনি। চিত্রনাট্যের ‘শ্রীকান্ত’ খুব একটা শরৎচন্দ্রের চরিত্র হয়ে নেই। মিল আছে কিছু, অমিলও প্রচুর। ‘শ্রীকান্ত’-কে পরিচালক যেভাবে দেখেছে, সেইভাবেই দেখেছি। যখনই সাহিত্য নিয়ে কেউ ছবি করেছেন, আমি তাতে অংশ নিয়েছি, তখন চিত্রনাট্যতেই মন দিয়েছি; কারণ সাহিত্যটা নিয়ে সে নিজের মত করে কাজ করছে। ‘শ্রীকান্ত’ আমারও ছোটবেলায় পড়া। এ সেই ‘শ্রীকান্ত’ নয়। কাজেই শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ খুব একটা মাথায় রেখে কাজটা করতে যাইনি।

‘শ্রীকান্ত’-র অভয়া, কমললতা পর্যায়গুলো বাদ দিয়ে রাজলক্ষ্মীর পর্যায়টাই বাছা কেন?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ আমাকে সবথেকে বেশি স্ট্রাইক করত। ওই পর্বটা বেশ কয়েকবার পড়েছিলাম। রাজলক্ষ্মী আর শ্রীকান্তর ভেতরকার বিভিন্ন ইক্যুয়েশন, ছোটবেলায় ওদের পরিচয়, বহুদিন পর আবার দেখা হওয়া, শ্রীকান্তর রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে বেরিয়ে আসা সবটাই আকর্ষণ করত। দ্বিতীয় পর্বে, অভয়ার অংশে বা চতুর্থ পর্বে, কমললতার অংশে আবার রাজলক্ষ্মী আসে, এবং যদ্দুর মনে পড়ে রাজলক্ষ্মীকে দিয়েই উপন্যাস শেষ হয়। রাজলক্ষ্মী খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া, অন্নদাদিদি আছে এই পর্বে।

অন্নদাদিদিকে শরৎচন্দ্র খানিক স্নেহশীলা, পতিব্রতা হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। আবার সাহসীও করেছেন তাকে। চরিত্রটার এই দিকগুলো কীভাবে আসবে? আর চরিত্রের ক্রাইসিসের জায়গাটা?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: (প্রথমেই একদফা হাসি) ক্রাইসিস তো আছেই, অবশ্যই আছে। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে যেভাবে আছে, সেভাবে নেই। তুমি যা যা বললে, স্নেহময়ী, পতিব্রতা— এগুলো নেই।

ঋত্বিক চক্রবর্তী: থাকলেও অনুবাদে আছে, মানে সিনেমার ভাষায় অনুবাদে।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: হ্যাঁ, একেবারেই।

আপনি এর আগে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, অপরাধজগৎ, অনুপ্রবেশ নানা কিছু উঠে আসছে এই সিনেমাতে।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: হ্যাঁ, তখনও আমি লিখছিলাম চিত্রনাট্য। অনুপ্রবেশ বলতে, রাজলক্ষ্মীরা চলে আসে বাংলাদেশ থেকে। রাজলক্ষ্মীকে বিক্রি করে দেওয়া হয়, সে একটা প্রস কোয়ার্টারে গিয়ে ওঠে। তারপর ফাইনালি সে একজনের রক্ষিতা হয়ে ওঠে। অপরাধ বলতে খবরে যেভাবে দেখি আমরা, বা অন্যান্য সিনেমায়— এই ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’ ইত্যাদিতে যেভাবে দেখো অপরাধ, সেভাবে দেখবে না। খুনজখম সবই আছে, তবে গল্পের প্রয়োজনমাফিক।

আপনারা দু’জনেই অনেকদিন একসঙ্গে কাজ করছেন। ‘কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল’, ‘পিঙ্কি আই লাভ ইউ’, ‘বিশ্বাস নাও করতে পারেন’-এর মত একের পর এক টেলিফিল্ম তৈরি হয়েছে আপনাদের যুগলবন্দিতে। ওইসময়ের কথা, আপনাদের টেলিফিল্মগুলোর বিষয়ে একটু বলুন।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: সে সময় ধরো, কনসেপ্ট ভাবতাম। আমি আর ঋত্বিক তখন একসঙ্গেই থাকতাম। আমি ভাবলাম ধরো কিছু, ওর সঙ্গে শেয়ার করতাম। তারপর স্ক্রিপ্ট থেকে এডিটিং অবধি গোটা প্রক্রিয়াটায় ও আমার সঙ্গে থাকত। এডিটিংটাও ঘরেই হত।

ঋত্বিক চক্রবর্তী: ফলে, শুরুর দিন থেকে থাকতাম। গোটা প্রসেসটাতেই ইনভলভড থাকতাম। লেখা হচ্ছে যখন থেকে, তখন থেকেই থাকতাম।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: ওর ইনপুটও থাকত।

ঋত্বিক চক্রবর্তী: অভিনেতা হিসেবে কোনও প্রোজেক্টেই আমরা এভাবে থাকি না। এটা যেহেতু ঘরেই হচ্ছে, ফলে শুরুর দিন থেকে আমি জানি, কোন সিনটা কতদূর লেখা হচ্ছে, কোথায় কোন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে লিখতে গিয়ে। যেহেতু আমি সঙ্গে রয়েছি গোটাটা জুড়ে, অনেক আগে থেকে একটা কানেকশন তৈরি হত কাজটার সঙ্গে।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: বা ধরো, কোথাও আটকে গেলাম। তখন ও ধরিয়ে দিল কোনও একটা সূত্র। কো-অর্ডিনেশনটা এরকমই ছিল, একটা টিম হিসেবে কাজ করা।

গল্পের সঙ্গে অভিনেতা হিসেবে জুড়ে থাকতেন, তাই তো? (ঋত্বিক চক্রবর্তীর উদ্দেশে)

ঋত্বিক চক্রবর্তী: গল্প যেখান থেকে তৈরি হচ্ছে সেখান থেকে রয়েছি। জানি, কী ঘটবে গল্পে! গল্পের মাঝে কোথাও হয়তো ভাবনা বদলাল, এগুলো জানি। এই সুযোগটা তো অভিনেতা হিসেবে চট করে পাওয়া যায় না। কিন্তু যেহেতু একটা টিমের মত কাজ করেছি আমরা, শুধু পরিচালক-অভিনেতা হিসেবে নয়, সেই সুবাদে এই পরিসরটা পেয়েছি।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: কিছু মজার ঘটনা আছে, যেমন ‘কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল’-র চিত্রনাট্য লিখতে গিয়ে একদিন দুম করে কারেন্ট চলে গেল। ক্লাইম্যাক্সের জায়গা, মূল চরিত্র তখন দেখতে শুরু করেছে নানারকম অস্বাভাবিক বিষয়। কারেন্ট চলে গেল দুম করে। আর আমার আর ঋত্বিকের রুম ছিল পাশাপাশি।

ঋত্বিক চক্রবর্তী: মাঝখানে একটা আলো জ্বালিয়ে লিখত ও। (হাসতে হাসতে)

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: হ্যাঁ, আর হঠাৎ কারেন্টটা চলে গেল। লিখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

গল্পগুলো বা চরিত্রগুলো কি বাস্তব থেকে উঠে আসা? বাস্তব থেকে খানিক বিচ্যুতি তো আমরা দেখি গল্পের মধ্যে।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: ‘বিশ্বাস নাও করতে পারেন’-এ একটা চরিত্র ছিল। ঋত্বিকের চরিত্র শ্যামল বা সেলিম, তার পাশের ঘরে থাকত।

ঋত্বিক চক্রবর্তী: নিত্য গাঙ্গুলি করেছিল।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: হ্যাঁ, ওই চরিত্রটার ধরনের একটা লোক অরিজিনালি ছিল। আমাদের এক বন্ধু ভোলা, ও আমাদের ছবিতে আর্ট ডিরেকশনও দিয়েছে, ও সন্ধান দিয়েছিল। ঋত্বিক তাকে দেখেওছে। নামটা কী বেশ ছিল?

ঋত্বিক চক্রবর্তী: যতন বসাক।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: হ্যাঁ, তাঁর গল্পটা শুনে তাকে স্ক্রিপ্টে ইনক্লুড করি আমি। তারপর তো গল্পটা অন্য জায়গায় চলে গেল। ‘কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল’-তে দেখবে প্রথমে চরিত্রের নাম নিয়ে একটা সংশয় রয়েছে, সেটা ‘বিশ্বাস নাও করতে পারেন’-এও আছে। তারপর দেখবে একটা বাড়ি খোঁজার কেস আছে। আমার আর ঋত্বিকের বাড়ি খোঁজার একটা দীর্ঘ ফেজ ছিল।

ঋত্বিক চক্রবর্তী: আমাদের নিজেদের কিছু অভিজ্ঞতাও আছে ওতে।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: অভিজ্ঞতা থেকে তুলে একই ডায়লগ বসিয়ে দিয়েছি ইনফ্যাক্ট বহু ক্ষেত্রে। গল্পটা তারপর অন্য জায়গায় গেল।

‘বাকিটা ব্যক্তিগত’-র কাজটাও কি একইভাবে হয়েছিল? ওটা বড়পর্দার কাজ বলে অন্যরকম কিছু ঘটেছিল কি?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: একইরকম প্রায়। ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’-র একটা চিত্রনাট্য করা হল। তারপর একটা আলোচনা হয়েছে আমাদের, কীভাবে ধরো ঋত্বিককে ক্যামেরায় ধরা হবে, সেই আলোচনাটা আমাদের করা ছিল। সব সিদ্ধান্ত আমি নিইনি, ওও নিয়েছে।

ঋত্বিক চক্রবর্তী: কিন্তু আলোচনাটা পুরোটাই হয়ে ছিল। মানে আমরা জানি কী ঘটতে চলেছে বিষয়টা, কী চাইছি আমরা। ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’-তেও তাই হয়েছে।

‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ বা ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ কি অনেক বড় অংশের দর্শকের কথা মাথায় রেখে বানানো?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: না, খুব একটা নয়। তবে মশলা ছবি আমি পছন্দ করি খুবই, এখন খুব একটা দেখাটেখা হয় না, কিন্তু খুবই পছন্দ করি। ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’-তে রয়েছে মশলা। গানটান রয়েছে। (ঋত্বিক ও প্রদীপ্ত দু’জনেই হেসে ওঠেন)।

ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে অসুবিধে হওয়া নিয়ে কিছু মনে হয় এখন?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: এখন যেভাবে দেখি, বিষয়টাকে বলতে পারো ট্রেকিং-এর মত। নানা বাধাবিপত্তি থাকবে, অসুবিধে থাকবে। তাই নিয়েই কাজ করতে হবে। আগে খুব রিজিড একটা ব্যাপার ছিল। এখন খানিক স্ট্র্যাটেজিকালি যা চাইছি তা করে নিতে হয়।

ঋত্বিকদার উদ্দেশে যে প্রশ্নটা থাকবে, আপনি আর প্রদীপ্তদা একসঙ্গে এতদিন ধরে কাজ করছেন, অভিনেতা হিসেবে ওঁর সঙ্গে কাজ করার সুবিধে বা অসুবিধেগুলো কী?

ঋত্বিক চক্রবর্তী: এটা সত্যি কথা, আমরা অনেকদিন ধরে কাজ করে চলেছি। আমি শুধু অভিনেতা হিসেবে প্রদীপ্তর প্রোজেক্টে কখনও থাকি না। ফলে, অন্য ছবির থেকে এই অভিজ্ঞতাটা আলাদা হয়। ওই যে বললাম, স্ক্রিপ্ট লেখা থেকে থাকি, সিদ্ধান্তগুলোতেও জড়িয়ে থাকি মোটামুটি। ফলে অনেক বেশি জানা আমার কাছে বিষয়টা। এবং প্রদীপ্তর নিজস্ব একটা প্রক্রিয়া আছে কাজ করার। আমি যখন কাজ শুরু করেছি, তখন ওই প্রক্রিয়াতেই কাজ করেছি। আমারও একটা অভিনয়প্রক্রিয়া তৈরি হয়েছে। আমাদের নিজস্ব সাঙ্কেতিক ভাষা পর্যন্ত আছে। মানে ধরা যাক শুভদীপকে, মানে ক্যামেরাম্যানকে যখন বলা হচ্ছে কোনও শট নেওয়ার বিষয়ে, তখন ক্যামেরার প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে অন্য কোনও শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘যাদবপুর শট হবে’ (হেসে ওঠেন দু’জনই)। ফলত একটা ডিজাইন তৈরি হচ্ছে। এটা একটা জার্নির অংশ। ফলে সুবিধে অসুবিধে নিয়ে ভাবিই না। আমার একটা অভ্যেস হয়ে গেছে এই প্রক্রিয়াটায় কাজ করে।

প্রদীপ্তদা, পরিচালক হিসেবে অভিনেতা ঋত্বিকের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কীরকম?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: আমাদের শুরু অনেকদিন আগে।

ঋত্বিক চক্রবর্তী: সেই ইনস্টিটিউট থেকে।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: হ্যাঁ, রূপকলা কেন্দ্র-র কন্টিনিউটি দিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম আমরা, ২০০২-এর শেষ বা ‘০৩-এর শুরুতে। আমাদের ওই টিমে কাজ করার বিষয়টা ভেতরে ছিল। বোঝাপড়াটা খুব ভাল ছিল। ঋত্বিকের সঙ্গে কাজ করাতেই আমার সুবিধে সবথেকে বেশি। মানে ধরো ঋত্বিক এখন খুবই জনপ্রিয় এব‌ং নামকরা। কিন্তু আমাদের কাজের জায়গাটা একই রয়ে গেছে, যখন শুরু করেছিলাম তখন যেমন ছিল। জনপ্রিয়তাটা কোনও সমস্যা তৈরি করেনি।

ঋত্বিক চক্রবর্তী: অনেকে জিজ্ঞেস করেন, আমাদের সম্পর্কটা এখনও আছে কি না। (হাসি)

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: এখন ওকে আর আলাদা করে চরিত্র আমায় বোঝাতেও হয় না। চরিত্রলিপিটা তৈরি করে ওর সঙ্গে টুকটাক কথা বলে নিই। এটুকুই। আর কিছু প্রয়োজন হয় না।

ঋত্বিক চক্রবর্তী: যে চরিত্রলিপিটা ও তৈরি করে, চিরকালই সেটা করে স্ক্রিপ্টের আগে। সেটা যে স্ক্রিপ্টেও খুব একটা রিফ্লেক্টেড হয় তা নয়। অভিনেতা হিসেবে চরিত্রলিপিটাতে খুব সুবিধে হয়। একটা অন্য ভাইব পাওয়া যায়।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: ঋত্বিকের একটা নিজস্ব ইন্টারপ্রিটেশনও আছে চরিত্রগুলো নিয়ে।

ঋত্বিক চক্রবর্তী: আমরা দু’জন অডিও ভিস্যুয়ালের কাজ প্রায় একসঙ্গেই শুরু করেছি। তার আগে আমি টুকটাক কাজ করেছি। কিন্তু আমাদের শুরু প্রায় একসঙ্গেই। অনেকরকমের অভিজ্ঞতা আমাদের জমেছে। যেমন মনে আছে, ‘বিশ্বাস নাও করতে পারেন’-এর একটা ফোন ভার্সন ছিল। একটা ক্যামেরা ফোন হঠাৎ পেয়ে গিয়েছিলাম।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: ওইটা দেখিয়ে আমরা তারা-তে টেলিফিল্মের বরাত পেলাম। সেদিন ঋত্বিকের একটা অডিশন ছিল। কীসের বেশ অডিশনটা?

ঋত্বিক চক্রবর্তী: একটা সিরিয়ালের। ‘রাতভোর বৃষ্টি’। সেটা ক্যান্সেল হয়ে গেল।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: হ্যাঁ, এবার আমাদের এক বন্ধু সোমনাথ ক্যামেরা আনল একটা। ফোন ক্যামেরা। ভিজিএ। সেটা হাতে পেয়ে তো যা খুশি করতে ইচ্ছে করছে তখন। ওই জিনিস প্রথম দেখলাম।

ঋত্বিক চক্রবর্তী: আমরা সেদিনই শুট করলাম। এগারোটা বারোটা থেকে শুরু হল। সারা সন্ধে শুট করলাম।

এই টেলিফিল্মগুলো বা সিনেমার যে চরিত্রগুলো, তাদের পরিচয়, জীবন সবকিছু নিয়েই একধরনের সঙ্কট তৈরি হয়। যেমন ‘বিশ্বাস নাও করতে পারেন’ বা ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’-র চরিত্রগুলো। অভিনেতা হিসেবে এই সঙ্কটগুলো প্রভাবিত করে?

ঋত্বিক চক্রবর্তী: সত্যি বলতে কী, খুব একটা প্রভাবিত করে না। খুব একটা ঢুকি না আমি গোটাটার মধ্যে। প্রভাবিত হলে ভয়ঙ্কর বিষয় হতে পারে। আর এ ধরনের জটিল চরিত্রকে যখন অ্যাপ্রোচ করি, তখন একটা ডিসট্যান্স তৈরি করতে হয়। অনেকরকম চরিত্র যেহেতু করতে হয়, তাই অভিনেতা হিসেবে এটা খুব ইমপর্ট্যান্ট প্র্যাকটিস‌। সব অভিনেতাই এটা নিজের মধ্যে করে বোধহয়। যত ঢুকব, বেরোতেও ততটা সময় লাগবে। চরিত্রের ক্রাইসিসের সঙ্গী হওয়ার থেকে ক্রাইসিসটা বোঝা অনেক দরকার। সঙ্গী হলে সামলাতে পারব না।

‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ কীভাবে গৃহীত হতে পারে দর্শকদের মধ্যে? যদি একটু বলেন?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: গৃহীত হবে কীভাবে জানি না। সেটা নিয়ে আশা বা দুরাশা খুব একটা কিছু নেই। সবাই দেখলে আমার খুব ভাল লাগবে। তারপর হয়তো গালাগালি বা ভাললাগা দুটোই জুটবে। যেহেতু “শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’-র অনুপ্রেরণায়” লিখে রেখেছি, সেহেতু একটা আশা তৈরি হবে।

ঋত্বিক চক্রবর্তী: সেটা পুরোটা ফুলফিলড্ হবে না।

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: কিছুতেই হবে না ফুলফিলড্। (হাসি) ফলে প্রশংসা, নিন্দে দুটোই জুটবে। তবে সকলেই দেখুক, এটাই চাই।

ঋত্বিক চক্রবর্তী: হ্যাঁ, দু’রকমেরই প্রতিক্রিয়া আসবে।

আপনি মোবাইলে টুকটাক কাজ করে চলেছেন…

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: মোবাইল ক্যামেরাকে অনেক সহজে ব্যবহার করা যায়। হাতে চলে আসছে ব্যাপারটা, ফ্লেক্সিবল। আলো নিয়ে খেলা যায়। বেশ লাগে। একটা ডকুমেন্টারি আমি বানাচ্ছি, যেটা খানিক ফোনে, খানিক ক্যামেরায়।

আপনাদের কোনও যৌথ প্ল্যান আছে এরপরে?

প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য: (মুচকি হেসে) এখনই কিছু ভাঙছি না। তবে হ্যাঁ, নতুন কাজ, নতুন ধরনের কাজ আমাদের দু’জনেরই করার ইচ্ছে আছে।

ঋত্বিক চক্রবর্তী: একসঙ্গেই করব নতুন কাজ। নিশ্চয় করব।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1925 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...