নারী ও নাগরিকপঞ্জি

শতাব্দী দাশ

 

গুয়াহাটি থেকে বেশি দূরে নয় গোরোইমারি৷ কামরূপ জেলার এক গ্রাম৷ মিশ্র বসতি৷ বোদো আর অহমিয়াদের পাশাপাশি থাকে মিঞা মুসলমানরাও৷ সে গ্রামে এখন হাহাকার পড়ে গেছে। একই গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত ভালুকবাড়ি আর হাতিশালার অবস্থাও তথৈবচ।

এনআরসির গোড়ার কথা তো সবারই জানা। অসমের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি নিয়ে এই কাগজেই লেখা বেরোচ্ছে নিয়মিত। তাই তা নিয়ে বিশদে লিখে প্রবন্ধ দীর্ঘায়িত করব না৷ মোদ্দা কথা, এনআরসি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালে এবং বর্তমানে তারই পুনর্নবীকরণ হচ্ছে অসমে বসবাসকারী ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ (যারা ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের পর বাংলদেশ থেকে এসেছেন) উচ্ছেদ করার উদ্দেশ্যে বা অজুহাতে৷ ২০১৭ সালের জুন এবং ২০১৮ সালের জুলাইতে খসড়া এনআরসি প্রকাশিত হয়৷ শেষে ২০১৯ সালের ৩১শে অগাস্টে প্রকাশিত এনআরসির অন্তিম তালিকা থেকে বাদ পড়েন ১৯ লক্ষেরও বেশি মানুষ৷

সেই ‘ফাইনাল লিস্ট’-এর লিঙ্গভিত্তিক বা জাতিভিত্তিক কোনও পরিসংখ্যান অসম সরকার প্রকাশ করেনি। কিন্তু ২০১৭ সালে যখন এনআরসি-র প্রাথমিক খসড়া বেরোল, তখন দেখা গেছিল, প্রায় একচল্লিশ লক্ষ মানুষ বাদ পড়েছিলেন৷ তার মধ্যে ছিলেন ঊনত্রিশ লক্ষ বিবাহিত মহিলা৷ বিবাহিত, অবিবাহিত মিলে মহিলাদের সংখ্যা আরও অনেক বেশি৷ তাঁরা নির্দিষ্ট নথির দ্বারা পিতৃ-পরিবারের সঙ্গে নিজেদের বংশগত যোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এক্ষেত্রে আর একবার মনে করে নেওয়া যেতে পারে, দুধরনের নথি লাগছে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে। লিগ্যাসি ডেটা আর লিঙ্ক ডেটা। একটির মাধ্যমে আপনি ১৯৭১ সালের আগে এদেশে নিজের পূর্বপুরুষের অস্তিত্ব প্রমাণ করবেন। অন্যটির মাধ্যমে সেই পূর্বপুরুষের সঙ্গে নিজের বংশগত যোগ প্রমাণ করবেন। দ্বিতীয় ধরনের প্রমাণের ক্ষেত্রে বারবার আটকে যাচ্ছিলেন মহিলারা৷ লিস্ট-এ-র অন্তত ১২টি নথির মধ্যে তাঁদের অনেকের একটিও ছিল না৷ তাঁদের মধ্যে কারও কারও বাপ-ঠাকুর্দার নাম ১৯৫২ সালের নাগরিকপঞ্জিতেই ছিল। কিংবা ১৯৭১ সালের মার্চ ২৪ তারিখের আগের ইলেকটোরাল পোলেও তাঁদের পূর্বজদের নাম পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু তাঁরা পাচ্ছেন না সেই বাপ-ঠাকুর্দাদের আপন পূর্বজ হিসেবে দাবি করার মতো নথি। কারও কাছে আছে শুধু তড়িঘড়ি বের করা স্থানীয় পঞ্চায়েতের জেনারেল সেক্রেটারির দেওয়া শংসাপত্র, যাতে বিডিওর সইও আছে, যা জানাচ্ছে তিনি তাঁর বাবারই সন্তান। কিন্তু গ্রাম পঞ্চায়েতের জেনারেল সেক্রেটারির এই শংসাপত্র শুধুমাত্র সহায়ক নথি (লিস্ট-বি/List B নথি) এবং তা বিবাহিত মহিলাদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র স্বীকৃত হবে লিস্ট-এ (List A) নথির উপস্থিতিতেই।

কেন নেই তাঁদের লিস্ট-এ নথি? নারীর স্থান নাগরিকপঞ্জিতে সঙ্কুচিত কেন? এই আলোচনার মূল বিষয়বস্তু সেটিই। নাগরিকপঞ্জি ও লিঙ্গ-বর্ণগত অসাম্য কোথাও ইন্টারসেক্ট করছে কি? করলে কোথায় ও কেন?

 

***

আবার ফিরি গোরোইমারিতে। কারণ অসমের যেসব অঞ্চলের মহিলাদের অবস্থা এনআরসি-উত্তর সময়ে সবচেয়ে সঙ্কটাপন্ন, তার মধ্যে আছে এই গোরোইমারি গ্রাম, এবং গোরোইমারি গ্রামপঞ্চায়েত এলাকাভুক্ত হাতিশালা ও ভালুকবাড়ি গ্রাম।

প্রথমত, এই অঞ্চলের মহিলাদের জন্ম হয়েছে বাড়িতে। সেই জন্ম নথিভুক্ত করার কেউ প্রয়োজন দ্যাখেনি৷ সমাজকর্মী আক্রম হুসেন, যিনি নিরলসভাবে গোরোইমারি অঞ্চলের স্থানীয় মানুষকে নাগরিকপঞ্জিতে নাম তুলতে সাহায্য করেছেন, তিনি জানাচ্ছেন, ‘১৯৭১ কেন? এখানে আজও জন্ম হয় বাড়ির ভিতরে, আঁতুড়ে৷ জন্ম নথিভুক্ত করা হয় না অধিকাংশ ক্ষেত্রে৷ মেয়েদের তো আরওই হয় না।’

দ্বিতীয়ত, তিনি আরও জানাচ্ছেন, মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার হার কম৷ বোর্ডের পরীক্ষার অ্যাডমিট বা শংসাপত্র আজও অনেকের নেই। বৃদ্ধাদের তো নেই বটেই। তরুণীদেরও নেই।

তৃতীয়ত, অনেক মহিলার বিয়ে হয়েছে আঠারোর আগে। তাঁরা বিয়ের আগে কখনও ভোট দেননি। বিয়ের পর ভোটার কার্ড হয়েছে৷ তাতে সামাজিক সংস্কার মেনে আর বাবার নাম থাকেনি, বদলে ‘স্বামী’-র নাম নথিভুক্ত হয়েছে। কিন্তু এনআরসিতে স্বামী ও স্ত্রীর নাগরিকত্ব আলাদা ভাবে প্রমাণ করতে হচ্ছে, তাদের নিজের নিজের পূর্ব-প্রজন্ম হাতড়ে৷

স্থানীয় স্কুল শিক্ষক বলেন, ১২-১৩ বছর বয়সে মেয়েদের আকছার বিয়ে হয় আইনের তোয়াক্কা না করে৷ আঠারোয় অনেকে সন্তানের মা৷ হতাশ আক্রম সমবেত মহিলাদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমাদের বাবামারা পাপ করেছিল আঠারোর আগে বিয়ে দিয়ে, এ ভুল আর কোরো না নিজেদের মেয়েদের ক্ষেত্রে।’ কিন্তু বর্তমান সমস্যার সমাধান তাতে হয় না৷ কী হবে এই মহিলাদের?

পঞ্চমত, বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা মহিলারা পড়েছেন আর এক বিপদে। তাঁরা হয়ত লিস্টে আছেন, কিন্তু স্বামীর কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছে না বলে বাদ পড়েছে তাঁদের সন্তানরা৷

ষষ্ঠ কারণ হল, সম্পত্তিতে এই মহিলাদের চির-অনধিকার। এই গাঁয়েরই পাহালি মোল্লা যেমন বলেন, এখানে মেয়েরা বাবার সম্পত্তি পায় না সাধারণত। নিজ উদ্যোগে কেউ সম্পত্তি চায়ও না৷ শ্বশুরবাড়ির চাপে যদি বা বাপের সম্পত্তিতে অধিকার দাবি করতে আসে, তাহলেও সে দ্যাখে, সেই জমিজমায় চাষ করেই ভাইদের পেট চলে৷ তাই বাবার মৃত্যুর পরেও অধিকাংশ মেয়েই বলে, ‘দাদা বা ভাই জমিটা রাখুক, আমাকে বরং কিছু টাকা দিয়ে দেওয়া হোক।’ লিস্ট-এ-তে জমির দলিলের কথাও আছে। বলা বাহুল্য, বেশিরভাগ মেয়েরই তা-ও নেই৷

সপ্তমত, কিছু ভ্রান্তি ও বিভ্রান্তি। এনআরসি যখন শুরু হয়, তখন স্বয়ং সার্কল অফিসাররাও তা নিয়ে ধন্দে ছিলেন৷ অনেকেই প্রচার করেন, বিবাহিত মেয়েদের পঞ্চায়েত প্রধানের (গাঁও বুড়া-র) সার্টিফিকেট হলেই চলবে, বিশেষত যদি একই গ্রামে বিয়ে হয়ে থাকে৷ কার্যক্ষত্রে কিন্তু তা ঘটেনি৷ গাঁওবুড়ার সার্টিফিকেটের এক্ষেত্রে কোনও মূল্যই নেই৷ পঞ্চায়েতের জেনারেল সেক্রেটারির সার্টিফিকেটের কিছু মূল্য আছে। কিন্তু তা-ও লিস্ট বি ডকুমেন্ট বা সহায়ক নথি, মূল নথি নয়৷

এই বিভ্রান্তিতে পড়ে কেউ কেউ স্কুল সার্টিফিকেট বা প্যান কার্ড থাকা সত্ত্বেও জমা দেননি৷ এমনকী বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে NSK (এনআরসি সেবা কেন্দ্র)-ও৷ এনএসকের দেওয়ালে সাঁটা কাগজে দেখা গেছে চোদ্দটি নথির লিস্ট। তাতে গাঁওবুড়ার বদলে গ্রাম পঞ্চায়েতের জেনারেল সেক্রেটারির সার্টিফিকেটের কথা বলা আছে বটে বিবাহিত মহিলাদের নথি হিসেবে। কিন্তু কোথাও বলা নেই যে সেটি কেবলমাত্র সহায়ক নথি, আদৌ লিস্ট-এ নথি নয় বা আবশ্যিক নথি নয়।

মনুওয়ারা বেগম যেমন ভুল প্রচার শুনেই স্কুল সার্টিফিকেট থাকা সত্ত্বেও জমা দেননি। শুধু গাঁওবুড়ার সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন৷ কিন্তু পুনর্বার যাচাই বা রিভেরিফিকেশনের সময় ব্যাপারটা ঠাহর করে তিনি স্কুল সার্টিফিকেট দ্যান। তাঁর নাম ওঠে এনআরসিতে। আবার সেই একই গাঁয়ের আরিজন নেসা বুঝতে পারেন না তাঁর গল্পটিও মুনওয়ারার মতো হওয়া সত্ত্বেও কেন তাঁর নাম উঠল না? তিনিও প্রথমে দিয়েছিলেন গাঁওবুড়ার সার্টিফিকেট। রিভেরিফিকেশনে স্কুল সার্টিফিকেটও দিলেন। অথচ নাম নেই। ক্লারিকাল এরর? তারই বা খেসারত দেবে কে? ফরেন ট্রাইবুনাল বা কোর্টকাছারিতে যাওয়ার মতো সংস্থান নেই এই মহিলাদের একজনেরও। রাজ্য সরকার নাকি নাগরিকপঞ্জিতে নাম না-ওঠা মানুষদের আইনি সাহায্য দেবে। কিন্তু আরিজন নেসা সন্দেহের সুরে বলেন, ‘আমি মুসলমান, আমাকে দেবে?’ হিন্দুত্ববাদী দল শুধু হিন্দুদেরই সাহায্য করবে বলে তাঁদের বিশ্বাস।

All Assam Minority Students Union (AAMSU) নাকি মুসলিমদের হয়ে দরবার করবে। কিন্তু কাউকেই ভরসা করতে পারছেন না ঘরপোড়া মহিলারা৷ কয়েক মাস আগে ভিটেমাটি বেচা টাকায় এঁদের যখন আপার অসমে যেতে হয়েছিল রিভেরিফিকেশনের জন্য, তখন সাহায্যের জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি৷

তবে, মনুওয়ারা আর আরিজনের ভাগ্য এইমুহূর্তে আলাদা হলেও, প্রতিবেশিনীদের ঈর্ষার কারণ দুজনেই। কোনওভাবে আরিজনেরও নাম উঠবে শেষ পর্যন্ত, অনেক প্রতিবেশিনী নিশ্চিত। কারণ তাঁরা স্কুল পাশ করেছেন, যে সুযোগ পাননি অনেকেই।

এদিকে কংগ্রেসের নেতা তথা মেঘালয়ের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মুকুল সাংমা বলেছেন, তিনি অসংখ্য নারীদের ভয়ার্ত কল পাচ্ছেন। যে মহিলারা বিবাহসূত্রে অসমে থাকেন, অথচ জন্মেছিলেন মেঘালয়ে, তাঁরা এনআরসিতে নাম না ওঠায় ফোন করছেন তাঁকে। তিনি মেঘালয়ের বর্তমান রাজ্য সরকারকে অনুরোধ করেছেন মেঘালয়ের মহিলাদের সত্ত্বর সবরকম সাহায্য করতে। সুতরাং আমরা এবার নারীর নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়ার নবম কারণটিতে এসে পৌঁছলাম৷

বিহার, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে জন্ম হলেও অনেক মহিলাই বিবাহসূত্রে অসমের বাসিন্দা হয়েছেন৷ তাঁদের নাম-বংশপরিচয় যাচাই হতে গেছিল স্ব স্ব রাজ্যে। কিন্তু সময়মতো সকলের নথি এসে পৌঁছয়নি অসমে৷ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অসম সরকারের অভিযোগ, জন্মসূত্রে পশ্চিমবঙ্গবাসী কিন্তু পরে অসমে বসবাসকারী (বিবাহসূত্রে বা অন্যান্য কারণে) মহিলা (ও পুরুষদেরও) নথি পাঠানোর ব্যাপারে নাকি পশ্চিমবঙ্গ গড়িমসি করেছে।

ওদিকে জলপাইগুড়িবাসীরা বলছেন, ১৯৬৮ সালের ভয়াবহ বন্যা এবং ১৯৭৪ সালে কুচবিহার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসের কুখ্যাত আগুনের ফলে হয়ত নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকতে পারে অনেক মানুষের নথি। গুয়াহাটির এক প্রখ্যাত বাঙালি পরিবার, সরস্বতী-পরিবারে, বিয়ে হয়েছিল রুনাদেবীর৷ ৬৮ বছর বয়সে তিনি জানতে পারছেন, পরিবারের বাকি সবার নাম নথিভুক্ত হলেও, তাঁর নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ হয়নি৷ কারণ তিনি এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি থেকে।

‘পশ্চিমবঙ্গ সরকার কি তবে মায়ের নথি খুঁজে পেল না?’ ভাবছেন রুনাদেবীর পুত্র। আর তখনই মায়ের মুখে শোনা সেই আগুন আর বন্যার কথা মনে পড়ছে তাঁর।

একইভাবে গুয়াহাটির কালাপাহাড় অঞ্চলের মাধবী বসু বাদ পড়েছেন, যিনি আদতে কুচবিহারের মেয়ে, বিয়ে হয়ে গুয়াহাটি এসেছিলেন৷ বয়স এখন ৬৫। তাঁরও মুখে সেই আটষট্টির বন্যার গল্প৷ বাহাত্তরে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে আগুন লাগার ঘটনাও তাঁকে ভীত করছে৷

আবার অনেকে মনে করছেন প্রায়-নিরক্ষর মহিলাদের নানা জায়গার স্বাক্ষর না মেলায়, বা নানা জায়গায় স্বাক্ষর নানারকম হওয়ায়, কিছু নাম বাদ পড়েছে। মনে রাখতে হবে, এই মহিলারা অপটু হাতে সই করেন অনেকটা ছবি আঁকার মতো করে। নিজের নামটিও তাঁরা দেখে দেখে নকল করেন মাত্র।

অনেকেরই নথিতে ভুল ছিল। নামের বানান ভুল, বা ধরা যাক বাবার নামের বানান ভুল। সেটিও তাঁরা ঠিক করেননি সময়মতো৷ তার ফলেও বাদ পড়েছেন।

আরও জানা যায়, কারও কারও নাম বাদ গেছে প্রাথমিক পর্যায়ে  নথিভুক্ত হওয়ার পরও, বেনামি ‘অবজেকশন’-এর ভিত্তিতে৷ কারা করছে এই অবজেকশন? জানা যায় না। কিন্তু জানা যায়, প্রায় আড়াই লাখ মানুষকে ‘অবজেকশনের’ শিকার হয়ে রিভেরিফিকেশনের জন্য দৌড়তে হয়েছিল, যদিও ২০১৭ সালের নাগরিকপঞ্জিতে তাঁদের নাম ছিল৷ কিন্তু সবাই পারেননি নামটি আবার তুলতে৷

এনআরসির ফলে বাদ পড়েছে অগণিত শিশুও। প্রাথমিকভাবে এনআরসিতে চোদ্দ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ ছাড়ের কথা বলা হয়েছিল, বিশেষত যাদের বাবামা এনআরসিতে জায়গা পেয়ে গেছেন, তাদের ক্ষেত্রে নিয়ম শিথিল করা হবে বলা হয়েছিল৷ কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, তেমনটা বাস্তবায়িত হয়নি৷ শিশুদের নামের পাশেও দেদার ‘রিজেক্ট’ ছাপ পড়েছে। আমাদের দেশ ‘জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের’ নীতিও আর মানছে না৷ বাদ পড়েছে বক্সার নয় বছর কুলসুমা খাতুন। তার বাবা ও বোন আছে লিস্টে, মা যদিও নেই৷

কয়েক ব্লক দূরত্বে নীলা ঘোষের বাড়িতে আরেক দুঃস্বপ্ন। মায়ের নাম আছে। অথচ পাঁচ সন্তানের কারও নাম নেই৷ টিকাকরণের শংসাপত্র বাতিল হওয়ার পর তাঁরা জন্মশংসাপত্রও জোগাড় করেছিলেন শিশুদের৷ তাঁদের কথামতো, রিভেরিফিকেশনের আশায় দিন গুনছিলেন। কিন্তু রিভেরিফিকেশনই নাকি হয়নি।

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে ফাইল হওয়া একটি পিটিশন থেকে আমরা জানতে পারছি, অন্তত দুহাজার ট্রান্সজেন্ডার মানুষ বাদ পড়েছেন। অসমের প্রথম ট্রান্সজেন্ডার বিচারপতি স্বাতী বিধান বড়ুয়া নিজেই একজন পিটিশনার এক্ষেত্রে৷ তিনি জানাচ্ছেন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের কারণেই ট্রান্সজেন্ডাররা নাগরিক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ পাননি। তাঁর বক্তব্য থেকে আরও জানা গেছে, ‘অবজেকশন ফর্ম’-এ লিঙ্গনির্বাচনের ক্ষেত্রে ‘আদারস’ নামক অপশনটিই তাঁরা পাননি৷

 

***

অসমের শোন্তিপুর জেলায় এনআরসি বেরোনোর দিনেই বিয়াল্লিশের সায়েরা বেগম কুয়োতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। কারণ? তিনি নাকি একথা লোকমুখে শুনেছিলেন যে এনারসিতে তাঁর নাম নেই৷ যদিও পরবর্তীতে জানা গেছিল, তাঁর নাম আসলে ছিল এনআরসিতে৷ ছিল পরিবারের সকলের নামও৷ তাঁর দর্জি বর জানাচ্ছেন, বেগমের নাম ২০১৭ আর ২০১৮ সালে প্রকাশিত লিস্টেও ছিল। বরং ছিল না তাঁর ও তাঁর ছেলের নাম। তাহলে কেন এত ভয় পেলেন সায়রা? তবে কি স্বজন হারানোর ভয়েই এই আত্মহত্যা?

সম্প্রতি আত্মহত্যা করেছেন সাবিত্রী রায় নামে এক হিন্দু মহিলাও। আর হালিমা খাতুনের কথা আমরা ‘ক্যারাভ্যানে’ পড়েছি। মেয়ের নির্বাচন কমিশনের কার্ড দেখাচ্ছিলেন হালিমা, মিডিয়াকে। সতেরোর সেই মেয়ে কার্ড থাকা সত্ত্বেও নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়ে, তারপর আত্মহত্যা করে।

শেফালি হাজং উপজাতিকন্যা। রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী তাকে ও তার মাকে দেখা গেছে গোয়ালপাড়ায় নির্মীয়মান ডিটেনশন ক্যাম্পে রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করতে৷ অথচ তাঁদের নিজেদের নামও ছিল না লিস্টে৷

‘আপনাদেরও কী এখানেই থাকতে হবে না?’
‘হয়ত।’
‘তাহলে বানাচ্ছেন কেন?’
‘পেট চালাতে হবে তো। মজুরি ভালো।’

এই ছিল হাজং মেয়ের নির্বিকার উত্তর৷

পঞ্চান্ন বছরের দুর্গা কোচ মাণ্ডাই প্রমাণ করতে পারেননি তাঁর পূর্বজরা এসেছিলেন ১৯৭১-এর আগে, অথচ সকলেই জানে তিনি কোচ-রাজবংশী উপজাতির মানুষ, যাঁরা বহু যুগ ধরে সে অঞ্চলের বাসিন্দা।

NCAT (National Campaign against Torture) সম্প্রতি যে সার্ভেটি প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে খসড়া নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়া অসমের জনসাধারণের মধ্যে ৮৯% শতাংশ চরম মানসিক নিগ্রহের শিকার হয়েছেন ২০১৯ সালের ৩১শে আগস্টের আগেই৷ নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়ার ভয় তাঁদের তাড়া করে বেড়িয়েছে৷ বক্সা, গোয়ালপাড়া ও কামরূপের যে মানুষেরা খসড়া নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ গেছিলেন, তাদের উপর সার্ভেটি করা হয় জুলাই-এর ১৬ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে৷ এই রিপোর্ট-এর সার প্রকাশিত হয় ‘দ্য হিন্দু‘-তে। রিপোর্টের নাম— ‘Assam’s NRC: Four Million Tales of Mental Torture, Trauma and Humiliation’.

রিপোর্টে বলা হচ্ছে, মানুষ শুধু নাগরিকত্ব হারানোর ভয় পাচ্ছেন না। ভয় পাচ্ছেন অজানা জায়গায় নির্বাসনের। ভয় পাচ্ছেন স্বজন হারানোর। ভয় পাচ্ছেন একথা ভেবেও যে, ফরেনার্স ট্রাইবুনাল বা গুয়াহাটি হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে নাগরিকত্ব প্রমাণের শেষ লড়াইটা লড়ার সামর্থ্য তাঁদের আদৌ নেই৷

এই ৮৯% বাদে বাকি ১০-১১%? তাঁরাও সুখে নেই৷ তাঁরা মডারেট বা মাইল্ড অ্যাংজাইটিতে ভুগছেন৷ NCAT-এর কোঅর্ডিনেটর সুভাষ চাকমা বলেছিলেন, ৪১,১০,১৬৯ জনের মধ্যে ৩৬,৯৯,১৫২ জনেরই দেখা গেছে চরম উৎকণ্ঠা। ৪,১১,০১৭ জনের উৎকণ্ঠা সাধারণ স্তরের৷

অর্থাৎ তীব্রতা কম হলেও, উদ্বেগের প্রকৃতি বা তার কারণ একই। ঘুম কমেছে, খিদে কমেছে, কর্মদক্ষতা ও চিন্তনপ্রক্রিয়ায় ছাপ ফেলছে এনআরসি। অসহায়তা, একাকিত্ব ও লজ্জা গ্রাস করছে তাঁদের। অথচ দশ টাকার বদলে ‘কম্পিউটার দুকান’-এ নাম খোঁজা চলছে নির্বিকারভাবে৷ অ্যাক্সেপ্ট। রিজেক্ট। অ্যাক্সেপ্ট৷ রিজেক্ট৷ মুহূর্তে ভাগ্য বদলে যাচ্ছে। কেউ পায়ের তলায় মাটি ফিরে পাচ্ছে। কারও পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে।

 

***

আপাতভাবে অসম নাগরিকপঞ্জি এক রাষ্ট্রীয় স্বেচ্ছাচারিতার গল্প, যার ফলে ত্রস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত নারী-পুরুষ-তৃতীয় লিঙ্গ, হিন্দু-মুসলমান-জৈন-বৌদ্ধ-আদিবাসী নির্বিশেষে সবাই। কিন্তু এই একমাত্রিক গল্পতে আছে আরও নানা পরত ও মোচড়৷ বর্ণবাদ ও পিতৃতন্ত্র যে সামাজিক অসাম্য চাপিয়ে দিয়েছে মহিলা-শিশু-আদিবাসী-ট্রান্সজেন্ডারের কাঁধে, তা তাঁদের ভোগান্তিকে প্রবলতর করেছে। সমাজ তো সমসত্ত্ব নয়। তাই প্রান্তিকেরাই যে এনআরসিতে বেশি বঞ্চিত হবেন, তা প্রত্যাশিতই ছিল।

গল্পটা ঘুরে ফিরে সেই ‘এজেন্সি’-রই। ব্যক্তি তাঁর সামনে যথেষ্ট সুস্থ চয়েজ পাচ্ছেন কিনা, আর সেই চয়েজকে কাজে লাগিয়ে নিজের ভালো থাকা নিশ্চিত করতে পারছেন কিনা, তার উপর ভিত্তি করেই তাঁর ‘এজেন্সি’র বিস্তার। সমাজবাস্তবতায় দেখা যায়, পুরুষের যতটা জ্ঞানের অধিকার, শিক্ষার অধিকার, তথ্যের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, জন্ম নথিভুক্তকরণের অধিকার আছে, নারী বা ট্রান্সজেন্ডারের তা নেই৷ আবার উচ্চবর্ণের উক্ত অধিকারগুলি যতটা আছে, নিম্নবর্গের বা উপজাতির মানুষের তা নেই। আর নারী বা ট্রান্সজেন্ডার যদিও নিম্নবর্গের হন? সেই সঙ্গে গরীবও হন? তাহলে অবস্থা করুণতর হওয়াটাই স্বাভাবিক।

সীমিত এজেন্সির ফলেই লিঙ্গগত-জাতিগতভাবে, বা অর্থনৈতিকভাবে, প্রান্তিক মানুষ ভুক্তভোগী হয়েছেন বেশি৷

‘নারীর কোনও দেশ নেই’— এই কথাটি ভার্জিনিয়া উলফ বলেছিলেন বটে আলঙ্কারিকভাবে। অসম এনআরসি দেখাল, নারী বা তৃতীয় লিঙ্গের সত্যিকারের পৃথিবীতেও কোনও দেশ নেই। অবাঞ্ছিতভাবে উলফের কথার এক বাস্তব, ভূরাজনৈতিক রূপ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ করে দিল অসম এনআরসি।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1912 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. ঠিকই, লেখাটি ছাপিয়ে সর্বত্র প্রচার করা উচিত, তার আগে কিছু নির্বোধ বাঙালি আর গুজরাটিতে অনুবাদ করে দুই বুরবক গুজিরাটির কাছে পাঠানো উচিত।

আপনার মতামত...