একটি নিরপেক্ষ বিচার

তানিয়া লস্কর

 

মইনু মিঞা খুব চিন্তায়।

একটি ভালো পাঞ্জাবি কিনতে হবে। কোত্থেকে কিনবেন ঠিক ঠাওর করতে পারছেন না। আসলে জীবনে কোনওদিন পাঞ্জাবি কেনেননি তিনি। এই প্রথম। দামটাও জানেন না। পকেটে শো-দেড়শো টাকা আছে। ওইটুকুনি সম্বল। উকিল সায়েব বলে দিয়েছেন লুঙ্গি পরে আসা চলবে না। কারণ বিদেশি নোটিসের কেইসে লুঙ্গি পরা মানুষ দেখলেই কেইস উলটো হয়ে যেতে পারে। তাই পাঞ্জাবি পরে আসতে হবে। আর পারলে পেন্ট পরে আসুন।

মইনু মিঞা ওসব জীবনেও পরেননি। বিয়ের সময় একবার ভাড়া করা পাঞ্জাবি পরেছিলেন বইকি। তাই ঠিক করলেন পাঞ্জাবি কিনে নেবেন একটা।

তাই গ্রীষ্মের এক তপ্ত দুপুরে ভয়ে ধীর কদমে এসে মৌলানা স্টোর্সের বাইরে দাঁড়ালেন।

–কী লাগে চাচা? লুঙ্গি নি? ভিতরে আইয়েন।

মইনু মিঞা ভিতরে ঢুকে টুলটা টেনে নিয়ে বললেন,

–না বাবা। আইজকে পাঞ্জাবি একটা কিনতে আইলাম।
–কিরকম পাঞ্জাবি চাচা। পাঠানি। না জুব্বা। নাকি শান্তিনিকেতনি?

মইনু মিঞা প্রথম ধাক্কায় থ হয়ে গেলেন। এ ব্যাটা বলে কী? পাঞ্জাবিরও এত রকমফের।

উনার অবস্থা দেখে দোকনি ছোকরা মনে হয় কিছু একটা আন্দাজ করেছে। সে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল,

–চাচা লুঙ্গির খুটে কত?
–দেড়শো টাকার আসে।
–চাচা, এক কাজ করেন। নদীর ঘাটে বুঁচকা নিয়া যে দোকানি বসে ওর কাছে যান। আমারগুলা আপনার হইব না।

মইনু মিঞা ইস্কুলের কেলাস না পাশ করলেও মানুষ জীবনে অনেক দেখেছেন। তিনি যা বুঝার বুঝে গেছেন। আস্তে-আস্তে উঠে দোকান থেকে বেরিয়ে ঘাটের দিকে রওয়ানা দিলেন।

ঘাটের দোকানি মাচায় বসে বিড়ি ফুঁকছিল। মইনু মিয়াঁকে দেখে বিড়ি নিভিয়ে কানের পাশে গুঁজে রেখে হাঁক দিল।

–আয়েন চাচা, বসেন।

এরপর সামনে রাখা লুঙ্গির বান্ডিল টানতে টানতে জিজ্ঞেস করল— চাচা লুঙ্গি না গেঞ্জি?

মইনু মিঞা এবার সত্যিই অস্বস্তি বোধ করলেন। বললেন,

–না। আইজকে লুঙ্গি না পাঞ্জাবি কিনতে আইসি।
–ছেলের বিয়া-টিয়া লাগাইসেন নাকি চাচা?
–না না।
–তবলিগ জম্মাতে যাবেন??
–হ। ওইরকমই।
–আইচ্ছা তো এইটা লন।

একটা লাম্বা জোব্বা দেখিয়ে দোকানদার বললে।

–না না এইটা না।

মইনু মিঞা আবার চিন্তাত পড়লেন।

উকিল সাহেবে বলেছেন পাঞ্জাবি পরে যেতে লাগবে। কিন্তু কী ধরনের পাঞ্জাবি সেটা তো বলেননি। তবুও তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

–আইচ্ছা এইটার দাম কত?
–এইটা তো পাঁচশো পড়বে, চাচা।

পাঁচশো শুনে মইনু মিঞার বুক ধড়াস করে উঠল।

তিনি ওইটা রেখে সামনে ঝুলিয়ে রাখা একটি সাদা পাঞ্জাবি দেখিয়ে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলেন।

–এইটা কত??
–দাম তো ৩০০। আপনার জন্য ২৫০ রাইখা দিমু।

মইনু মিঞা আবার লজ্জা পেলেন। চোখ অন্যদিকে ফিরিয়ে অনুনয়ের সুরে বললেন,

–অত টাকা লইয়া আমি আসি নাই বাবা।

দোকানি সোজা জিজ্ঞেস করলে,

–কত আনছেন চাচা??
–এইত্তো একশো-দেড়শোর মাঝে দেখান।

দোকানদার এবার একটু চিন্তায় পড়ল। বলল,

–আপনে তো মশকিলো ফালাইলেন চাচা। দেড়শো টেকায় আজকাল পাঞ্জাবি পাওয়া যায় না।
–কী করুম। আমার বাপ-দাদা কেউয়ে কোনওদিন পাঞ্জাবি পরে নাই। আমরা গরিব মানুষ। লুঙ্গি আর গামছা  পিন্দ্যা জীবন যায়। আইজ বড় বিপদ। তাই পাঞ্জাবি কিনতে আইলাম।

দোকানদারে একটু ভাবল। এরপর একটা পুরানা গাঁট খুলে হলদে রংয়ের পাঞ্জাবি একটি বের করে দিয়ে বললে,

–এইডা কিনেন চাচা। এমনে দাম ২০০… আপনার জন্য ১৫০ রাইখা দিমু। পায়জামা শাদা।

চুপচাপ ১৫০টি টাকা ধরিয়ে দিয়ে পাঞ্জাবি নিয়ে মইনু মিঞা বাসে চড়লেন। কিন্তু মনে এখনও শান্তি নেই। এতরকমের পাঞ্জাবি। এইটা উকিল সাহেবের পছন্দ হবে কিনা।

…মইনু মিঞা পাঞ্জাবি নিয়ে বাড়ি ঢুকতেই আরেক কাণ্ড শুরু হল। রাজিয়া বিবি গলা ছেড়ে কান্না জুড়ে দিলেন। উকিলসাহেব নাকি বলেছেন সাদা পাঞ্জাবির কথা। হলুদ পাঞ্জাবি কোনও কাজের না। অতটা পয়সা গচ্চা গেল। হাড়মেহনতের কামাই। মেজছেলে ইস্কুল না গিয়ে গৌরাঙ্গ গোঁসাইর জমিতে হাল চালিয়ে এ টাকাটি এনে দিয়েছে। নইলে মইনু মিঞার ঠেলা চালানোর পয়সায় কিছুই কুলোয় না। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়।…

 

(২)

মইনু মিঞা পাঞ্জাবি নিয়ে বাড়ি ঢুকতেই আরেক কাণ্ড শুরু হল। রাজিয়া বিবি গলা ছেড়ে কান্না জুড়ে দিলেন। উকিলসাহেব নাকি বলেছেন সাদা পাঞ্জাবির কথা। হলুদ পাঞ্জাবি কোনও কাজের না। অতটা পয়সা গচ্চা গেল। হাড়মেহনতের কামাই। মেজছেলে ইস্কুল না গিয়ে গৌরাঙ্গ গোঁসাইর জমিতে হাল চালিয়ে এ টাকাটি এনে দিয়েছে। নইলে মইনু মিঞার ঠেলা চালানোর পয়সায় কিছুই কুলোয় না। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। রাজিয়া বিবির বিলাপ শুনে গাঁওবুড়া জলালউদ্দিন বাড়িতে খবর নিতে এলেন। সব শুনে তিনিই সমাধান দিলেন। তিনি বললেন,

–বাদ্দেরে মইনু। আমরা সব ভাই না। আর বিপদে ভাই তো ভাইর কামে আয়। কালকে যাওয়ার আগে গুসল কইরা আমার বাড়িত আসিস। আমার পাঞ্জাবি পিন্দ্যা যাবি। একথা শুনে রাজিয়া বিবির মন একটু শান্ত হল। আর ভয় নেই, সাদা পাঞ্জাবি পরে কোর্টে দাঁড়ালে হাকিম সাহেব নিশ্চয় রহম করবেন।

 

(৩)

আজ মইনু মিঞার সাক্ষী নেওয়া হল। জলালউদ্দিনের দেওয়া সাদা পাঞ্জাবি পরেই এসেছিলেন। সব ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু মেজিস্ট্রেট যখন মার নাম জিজ্ঞেস করলেন মইনু মিঞা ভুল করে উনার বড় বোনের নাম বলে দিলেন। রহিমন বিবির জায়গায় রিজমা বিবি। মেজিস্ট্রেট যতবার জিজ্ঞেস করেন আপনার মার নাম কী? উনি ততবার বলেন রিজমা বিবি। শেষমেশ উকিল ঘোষবাবুকেই ধরিয়ে দিতে হল। তিনিই বললেন,

–রিজমা বিবি আপনার মা না বোন ভালো করে বলেন!

তখনই হঠাত মইনু মিঞার সব মনে পড়ল। তিনি এবার বললেন রহিমন বিবি। মেজিস্ট্রেট কটমট করে তাকিয়ে বললেন,

–এসব জায়গায় ভুল করলে হয়। আপনি তো ঘোষবাবুর সব মেহনত নষ্ট করে দেবেন।

মইনু মিঞা চুপচাপ বেরিয়ে এলেন আদালত থেকে। কী যে হয়েছিল আজ তার। নিজের মায়ের নাম কেউ ভুলে! আসলে জালালউদ্দিনের পাঞ্জাবিতে লেগে থাকা আতরের গন্ধে তার কেমন গা ছমছম করছিল। মনে হচ্ছিল তিনি যেন মরে গেছেন। বলে না, কুকুরের পেটে ঘি সয় না। অনেকটা সেরকমই। নতুন পাঞ্জাবিটা তার সবকিছু গুলিয়ে দিচ্ছিল যেন। তবু যা হোক। কেইসটা ভালোই হয়েছে। জজ মইনু মিঞার তরফেই জাজমেন্টটা দিবেন মনে হচ্ছে। এবার রাজিয়া বিবির টেনশন একটু কমবে। আর কেউ উনার ছেলেমেয়েদের বাংলাদেশি বলবে না।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...