লিগ্যাসি কোড ১৯০৫১৯৬১

অরিজিৎ আদিত্য

 

অন্ধকার মঞ্চ। অফিসঘরের কোলাহল। শোনা যাবে— ‘এই বলাই এফিডেবিটটা টাইপ হয়েছে কি না একটু খবরটা নে তো’, ‘কিরে মন্তাই, চা আনতে কি রোজকান্দি বাগানে চলে গেলি নাকি রে ব্যাটা’ ইত্যাদি।

মঞ্চ আস্তে আস্তে আলো হবে। গুটি গুটি পায়ে অর্জুন ঢুকবে। পরনে হাঁটু অবধি ধুতি, হাফ শার্ট। দু’হাতে একটা সবুজ ফাইল বুকে চেপে সতর্কভাবে ঢুকবে অর্জুন।

 

অর্জুন: বেজায় মানুষ। এ তো মেলা ভিড় দেখি। সত্যি আদালত বইল্যা কথা। আহা এমন স্থানে আসাও তো একটা পুণ্যের কথা।

(এদিক ওদিক পায়চারি করবে অর্জুন। কারও সঙ্গে ধাক্কা লাগার অভিনয়)

অর্জুন: বাবা! মানুষ-টানুস দেখে না নাকি? এমন তাড়া! (একটু থেমে) কিন্তু লোকটা গেল কই? বলল তো, বারে গিয়ে খাড়াও। তা-ও তো মেলা সময় হইয়া গেল। বার তো এটাই, নাকি? একজন কালো কোট পরা স্যার তো তাই বলল। কিন্তু লোকটা যে কইয়া গেল, এই বার লাইবেরিতে গিয়াই খাড়াও। আমি আসছি।

(পকেট থেকে মোবাইল বের করে)

অর্জুন: উরিব্বাস! এ তো দেড়টা বাজে দেখি। দেখো তো লোকটার কাণ্ড। খাড়াও বলে যে গেল গেলই।

(গলা উঁচিয়ে ভিড়ের মধ্যে লোকটাকে খোঁজে অর্জুন)

অর্জুন: এই খাইছে। একটা পুলিশ আসে যে। বাপরে, আমারে দেখলে না খপ করে ধইর‍্যা নিয়া চালান দিয়া দেয়। পেটলা পুলিশ তো কইছেই— অর্জুন তোর নামে বিদেশি নোটিস ঝুলছে— জামিন ল, জামিন ল। পরে দেখিস আমিই এসে কপ করে তোরে ধরে নিয়ে যাব। তো সেই যাত্রায় চকচইক্যা একটা আসত সিলভার কাপ দিয়া পেটলারে বুঝ মানাইছি। কিন্তু শহরের পুলিশ ধরলে তো সাড়ে বারোটা।

(অর্জুন নিজেকে ভিড়ের মধ্যে আড়াল করে। ভাবে বোঝা যাবে পুলিশটা তাকে পেরিয়ে গেল।)

অর্জুন: যাক বাবা, টের পায় নাই। উফ, যা ডরনটাই না ডরাইছি। কিন্তু ওই হালা আসে না কেন? আর কতখন খাড়াব? চলে যাব? তবে লোকটা কিন্তু চালাক চতুর। আমার মুখ দেইখ্যাই ঠিক বুইঝ্যা নিছে ডি ভোটার কেস। এই আদালতের কারেই বা চিনি কন তো? হারান খুড়া কইল, কোর্টেই যখন যাবি তো যা অবিনাশ উকিলের কাছে যা। মানুষ তো না, দেব্‌তা। আমার নামে যখন নোটিস এল তো এই একদিনে জামিন বের হয়ে গেল। কে বের করে দিল? ওই অবিনাশ উকিল। তুই বাপ গাড্ডায় পড়ছিস, ওই অবিনাশ উকিলই একমাত্র তোকে উদ্ধার করতে পারে।

এখন দেখেন তো এই অবিনাশ উকিলরে খুঁজতে গিয়া আমার কী হয়রানি। আরে স্যার কে জানত এই কোর্টে তিন তিনখান অবিনাশ উকিল রয়েছে। ভাগ্যিস লোকটাকে পেয়ে গেলাম। আমাকে বেকুফের মতো ঘুরতে দেখে নিজেই এগিয়ে আইলেন— তা ভাই, কাউকে খোঁজা হচ্ছে নাকি? ভাই, অবিনাশ উকিলকে খুঁজছ, কিন্তু কোন অবিনাশ বলো দেখি? এই বারে তো তিন তিনজন অবিনাশ রয়েছেন—অবিনাশ ঘোষ, অবিনাশ দাস আর অবিনাশ ভট্টাচার্য। তা তোমার কাকে চাই?

লোকটার দয়ার শরীর, আমার মুখ দেইখ্যা ঠিক বুঝল— কী কেস? ডি ভোটার? কোন হাওর থেকে আসছ, বলো তো? নোটিস এসেছে?

আমি তো অবাক! মানুষ না দেব্‌তা? এই কোর্টে দেখি দেব্‌তারা গিজগিজ করতাছেন, মনের কথা ঠিক ধইর‍্যা ফেলেন! বললাম, স্যার ঠিক ধরছেন। ডি ভোটারের নোটিস আসছে আগেই। এর মধ্যে আরেক গ্যাড়া। এনআরসিতে নাম তুলতে গেছি কাটিগড়া বাজারে। তো কম্পিউটার দোকানের ছ্যামড়াটা কীসব খটাখট মাইর‍্যা কয়, আপনার তো লিগ্যাসি ডাটাই মিলছে না। কেস গড়বড়। আগে লিগ্যাসি ডাটা খুঁজে বার করুন। আমার তো স্যার মাথার দুই ফুট উপর দিয়া গেল কথাখান। লিগ্যাসি ডাটা? এটা আবার কোথায় খুঁজব? তো আমি বললাম শিলচরে গেলে পাওয়া যাবে লিগ্যাসি ডাটা? ব্যাটা বলে, গিয়ে উকিল ধরুন। এখন স্যার আপনিই কন, আমি হাওরের মানুষ, শিলচরের উকিলরে আমি কই পাই? তো ওই হারান খুড়াই কইল অবিনাশ উকিলের কথা। কিন্তু পোড়া কপাল। কে জানে স্যার শিলচর কোর্টে তিন তিনখান অবিনাশ উকিল বইস্যা রইছেন। তা স্যার, আপনিই একজন অবিনাশ উকিলকে ঠিক করে দিন না। লোকটা আমার কাঁধে হাত দিয়া আড়ালে নিয়া আসে। বলে— শোনো ভাই, তোমার বিপদটা আমি বুঝছি। ওইসব অবিনাশ উকিল-ফুকিল ছাড়ো। আমার হাতে ভালো উকিল আছে। তোমার লিগ্যাসি ডাটা ঠিক খুঁজে দেবে, ডি নোটিসরেও শেষ পাইয়ে দেবে। তুমি ওই বার লাইব্রেরিতে গিয়ে খাড়াও, আমি আমার স্যাররে ফাইলগুলো দিয়ে আসি। আর হ্যাঁ, পকেটে কিছু টাকা ফাকা আছে তো? বিপদের সময় টাকাই সবচেয়ে বড় বন্ধুরে ভাই। তোমার এই ফাইলে কী? টাকা?

(অর্জুন ফাইলটা আরও জোরে আঁকড়ে ধরে)

অর্জুন: আমি বলি, স্যার কী যে কন! টাকা বুঝি কেউ ফাইলে রাখে! এই ফাইলে আমার সব কাগজ আছে। বাপ ঠাকুর্দার কাগজ। রিফিউজি ক্যাম্পের কাগজ। জমির দলিল। বার্থ সাট্টিফিকেট। স্কুলের সাট্টিফিকেট। (গলা নামিয়ে) টাকা স্যার ধুতির তলে যে আন্ডারপ্যান্ট আছে ওইটার পকেটে।

হবে হবে। তুমি খাড়াও। আমি আমার স্যারকে ফাইলটা দিয়ে এই যাব আর এই আসব।

(অর্জুন মোবাইল বের করে দেখে)

অর্জুন: আর আসছে— দাঁইড়ে আছি—

এমন সময় পিঠে ঠোকা— অ মা চাইয়া দেখি লোকটা! কয়, শোনো ভাই, আমার স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে। তোমার কাজ হয়ে যাবে। তবে স্যার এখন এজলাসে, সন্ধেবেলা যেতে হবে…।

সন্ধেবেলা? সন্ধেবেলা গেলে যে আর বাস পাব না! রাতে থাকব কই?

এক রাত স্টেশনে থাকলে কি জাত যাবে? এক কাজ করো, তুমি ওই ক্ষুদিরামের স্ট্যাচুর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো। ওইখানে প্রত্যেকদিন কোনও না কোনও নাটক হয়, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখো, আমি কাজফাজ শেষ করে সেখানে আসছি—

তা স্যার ক্ষুদিরামের ইস্ট্যাচুটা কোথায় স্যার? কোন দিক দিয়ে যাব?

স্যার আমার হাতে ধইর‍্যা কোর্ট থেকে বাইর কইর‍্যা আনলেন— শুনতে পারছ মাইকের আওয়াজ? ওই আওয়াজ শুনে শুনে যাও— ক্ষুদিরাম স্ট্যাচু ঠিক পেয়ে যাবে।

(দূর থেকে মাইকের আওয়াজ আস্তে আস্তে স্পষ্ট হবে)

নেতা: আর কতদিন, আপনারা কেউ বলতে পারবেন আর কতদিন বাঙালিকে নিয়ে ছেলেখেলা চলবে? বাঙালি হিন্দুকে নিয়ে? হ্যাঁ বলবেন কেউ? নগাঁওয়ে কী হয়েছে, না, পিস্তল দেখিয়ে কয়েকটা ছেলে রিলিফের জন্য চাঁদা চাইতে গেছে ব্যবসায়ীর কাছে। এ নিয়েই ঝামেলা, ব্যবসায়ী দিয়েছে ওদের পিটিয়ে। কে ঠিক, কে বেঠিক, সেটা আইন দেখবে। কিন্তু বন্ধুগণ, বাস্তবে কী হল? কী হল বাস্তবে? না ওই পিস্তলওলারা অসমিয়া আর যারা মেরেছে ওই ব্যবসায়ী সে বাঙালি। হিন্দু বাঙালি। ফলে সব বাঙালি হিন্দু ভিলেন হয়ে গেল। স্লোগান উঠছে, স্লোগান— কী স্লোগান— না হিন্দু বাংলাদেশির দাদাগিরি চলবে না, অসমে বাংলাদেশিদের প্রভুত্ব চলবে না। বন্ধুগণ আপনারাই বলুন, এর মধ্যে বাংলাদেশি এল কোত্থেকে? সব বাঙালিই কি আসামে বাংলাদেশি? ওই যে আপনি আমি ইনি তিনি আমরা সবাই বাংলাদেশি? এইভাবে, ঠিক এইভাবে, বছরের পর বছর, দশকের পর দশক ধরে বাঙালিকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হচ্ছে। শিলাপথারে কী হল মনে নেই বন্ধুগণ? কে এক সুবোধ বিশ্বাস, তার সঙ্গে আসামের বাঙালির কী লেনাদেনা— অথচ শিলাপথারের ঘটনার পর আপার আসামে বাঙালিকে, হিন্দু বাঙালিকে পদে পদে হেনস্থা করা হয়েছে। এখনও হচ্ছে। বন্ধুগণ, বাঙালির এই অগ্নিপরীক্ষা আজকের নয়। সেই গান্ধিই বলুন, আর নেহরু— বাঙালিকে সবসময় অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছে। তেনারা দেশের প্রাইম মিনিস্টার হবেন, হন না কে বাধা দিয়েছে— কিন্তু কীভাবে হবেন? না দেশকে ভাগ করে— দেশটা স্রেফ দু তিন টুকরো করে কেটে ভাগ করে দিল। আর এতগুলান যে মানুষ, তাদের কী হল? কলমের এক খোঁচায় তারা নিজের জন্মভিটেয় বিদেশি হয়ে গেল। পার্টিশনের আগে কেউ একবার কথা বলেছিল বাঙালির সঙ্গে? যে, তোমরা কী চাও? দেশভাগ না স্বাধীনতা? যে স্বাধীনতা তোমার দেশটাকেই ছিনিয়ে নেবে, চাও সেই স্বাধীনতা? জিজ্ঞেস করেছিল কেউ বাঙালিকে? বন্ধুগণ গর্জে উঠুন, আপনার পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে, গর্জে উঠুন— বাঙালিকে রাষ্ট্রহীন করে রাখার চক্রান্ত স্বাধীনতার আগেও হয়েছে, স্বাধীনতার পরেও হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। এই যে ডি ভোটার, এই যে এনআরসি, লিগ্যাসি ডাটা, ফ্যামিলি ট্রি, ওআই-এনএআই— এসব কী? এসব কেন? বন্ধুগণ, এসবের একটাই কারণ, বাঙালিকে সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন করে রাখা— গর্জে উঠুন— পথে নামুন— আমাদের সঙ্গে আসুন। আমরা, একমাত্র আমরাই আছি আপনার সঙ্গে।

(আস্তে আস্তে নেতার কথার ভলিউম কমবে। হাতে ফাইল তুলে সামনে অর্জুন)

অর্জুন: এই তো, এই তো, ইনিই পারবেন— আহা, কী ভাষণটাই না দিলেন— ইনিই পারবেন আমার লিগ্যাসি ডাটা খুঁজে বের কইর‍্যা দিতে। বুকটা জুড়ায়ে গেল— আহা— চোখে জল এসে যায়, আবার রক্ত টগবগাইয়া ফোটে। ইনিই পারবেন। কিন্তু এত বড় মানুষ, কথা কই কীভাবে? সামনে যাই বা কেমনে?— এই মেলা ভিড়ে পাই বা কারে?

(অর্জুন এদিক ওদিক খুঁজবে)

অর্জুন: ওই পোলাডা নিশ্চয় রিপোটার। হাতে ডান্ডা নিয়ে ক্যামেরার সামনে বকবকাচ্ছে। দেখি, এরে ধরে কিছু হয় কিনা—

স্যার, এই যে স্যার একটু শুনবেন? হ স্যার এট্টু শুনবেন? ওই নেতা মশায়ের সঙ্গে একটু দেখা করিয়ে দেবেন? বড় বিপদে পড়ছি…

বিপদ শুনে পোলাডা মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। আমার পুরো শরীরে চোখ বুলিয়ে দেখল। যেন জরিপ করল, বলল, বিপদ? কী হয়েছে আমাকে বলো তো আগে, শুনি।

বুকে বড় বল পেলাম কথাটা শুনে। বললাম, স্যার… আমি হাওর থেকে আসছি, বড় বিপদ, আমি লিগ্যাসি ডাটা খুঁজছি— আমার নাকি লিগ্যাসি ডাটা নাই— এখন লিগ্যাসি ডাটা কোথায় পাই, সেটাই তো ছাই জানি না। কাটিগড়ার সবাই কইল, শহরে যাও, না হলে পুলিশ ধরে নিয়ে হয় জেলে ঢুকিয়ে দেবে না হলে লাথ মেরে বাংলাদেশ পাঠিয়ে দেবে।

আমার কথা শুনে ব্যাটা তো হা। ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে যে চ্যাংড়া পোলাডা সঙ্গে ছিল, মাথার টুপিটা উলটো কইর‍্যা পরা, ওর দিকে একবার চেয়ে বলল, তুমি বাংলাদেশি? হিন্দু? হিন্দু বাংলাদেশি?

স্যার এসব কী কন মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝি না। বাংলাদেশি হব কেন আমি? অ্যাঁ? আমার ভোটার কার্ড আছে, আমার বাপ ঠাকুর্দার ভোটার লিস্টে নাম আছে।

পোলা দুইটা ততক্ষণে আমার কাছে এগিয়ে এসেছে। চারপাশে মেলা মানুষ, তবু কেন যেন মনে হয়, আমারে ওরা ঘিরে ধরছে। আমার কেমন যেন ডর লাগে। রিপোটার ছেলেটা কয়, তোমার লিগ্যাসি ডাটা আমি খুঁজে দেব— শুধু ক্যামেরার সামনে একবার বলো, বাংলাদেশ থেকে তুমি বর্ডার টপকে আসামে ঢুকেছ, বলো তুমি বাংলাদেশের হিন্দু, মুসলমানের অত্যাচারে পালিয়ে এসেছ, বলো— জাস্ট একবার— এই অসীম, ক্যামেরা স্টার্ট দে— প্রথমে আমি…

বইল্যা ছেলেটা এক হাতে আমাকে ধইর‍্যা ফেলে, আরেক হাতে ওই ডাণ্ডা মুখের সামনে নিয়ে কয়— ঠিক এই মুহূর্তের ব্রেকিং নিউজ— প্রথমে শিলাপথার তারপর নগাঁও কাণ্ডের পর সারা অসম যখন হিন্দু বাঙালির দপদপানির বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে, পথে নেমেছে, তখন এই শিলচরে দেখুন কীভাবে বাঙালি হিন্দুকে তাতানোর চেষ্টা হচ্ছে। নেতার উস্কানিমূলক ভাষণ আপনারা লাইভ দেখলেন। এবার আমরা আসাম লাইভ চ্যানেলে আপনাদের সরাসরি দেখাচ্ছি কীভাবে বর্ডার টপকে বাংলাদেশি হিন্দু এসে জমায়েত হচ্ছে, এক্সক্লুসিভলি আসাম লাইভ— ক্যামেরাম্যান অসীমকে আমি অনুরোধ করছি এই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর লাইভ ছবি আপনাদের দেখাতে…

কয় কী পোলাটা? এ তো আমারে এক্ষুনি জেলে ঢুকাইয়া ছাড়ব। আমি রিপোটার পোলার হাত ছাড়াইয়া দে দৌড়। আমাকে আউয়া পাইছে? বাংলাদেশি বলে চালিয়ে দিতে চাইছে? উল্টাটুপি ছ্যামড়াটা তার ক্যামেরা নিয়ে ঘুরতে না ঘুরতেই আমি বেবাক ভিড়ের মধ্যে ঢুকে দে দৌড়—

আমি কোনওমতে ভিড় ঠেলেঠুলে ছিটকে বেরিয়ে আসি। মাইকে তখনও নেতামশাই বলছেন… বাঙালি হিন্দুর রাস্তা বাঙালি হিন্দুকেই ঠিক করতে হবে… আপনারা আমাদের সঙ্গে আসুন…

আর আসা… আমি ততক্ষণে পলাইতে পারলে বাঁচি। হায়রে কপালডাই মন্দ… নেতামশাই কী সুন্দর ভাষণ দেন, রক্ত খলবলাইয়া ওঠে।– ঠিক বের করে দিতে পারতেন উনি আমার লিগ্যাসি ডাটা… কার মুখ দেখে যে বেরিয়েছিলাম, মধ্যিখানে ওই হতচ্ছাড়া রিপোটারের খপ্পরে পইড়্যা গেল সব কেরাসিন হইয়া। এবারে কোর্টের মুহুরিবাবুই আমাকে কোথায় খুঁজে পাবে, আর আমিই বা তারে কই খুঁজি… মহা মুশকিলে পড়ে গেল তো…

(পকেট থেকে মোবাইল বের করে)

অর্জুন: সাড়ে তিনটা। মুহুরিবাবুর বেরোতে বেরোতে পাঁচটা, এই দেড়ঘণ্টা বরাক নদীর ধারেই ঘাপটি মেরে বসে থাকি… পাঁচটার সময়ে না হয় আবার আসব ক্ষুদিরামের সামনে…

কী গ্যাড়া বলেন তো স্যার, লিগ্যাসি ডাটা খুঁজতে এসে এই শহরে আমারে এভাবে লুকিয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকতে হচ্ছে। আমি বুঝি মানুষ না? এই দেশটা বুঝি আমার না? কথা নেই বার্তা নেই পুলিশ এসে কয়, এই তুই অর্জুন নমঃশূদ্র না? সন অব অনন্ত নমঃশূদ্র, হরিটিকর পার্ট টু… এই ধর তোর নামে বিদেশি নোটিস এসেছে, তুই বাংলাদেশি, তোকে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে গিয়ে প্রমাণ দিতে হবে।

শুনে তো আমি থ। কয় কী! আমি না কি বিদেশি? বাংলাদেশি? পোড়া কপাল পুলিশটারে বোঝাবে কে, আমার এই গাঁয়েই জন্ম। এই হরিটিকরে। আর আমার বাপ, গত হয়েছেন, তারও জন্ম এই রিফিউজি ক্যাম্পে— কাগজ আছে, সাট্টিফিকেট আছে— বাংলাদেশি কইলেই হল… পুলিশটা এক দাবড়ানি দিল… ওসব কথা আমাকে শুনিও না চাঁদু, যা বলার কোর্টে গিয়ে জজসাহেবকে বলো, আমার ডিউটি তোমাকে নোটিস দেওয়া, এই দিলাম, বাকি তুমি তোমার বুঝে নাও। দেখি এখানে সাইনটা কর।

পুলিশরে আমার বড় ডর। সেই ছোটবেলা থাইক্যা। দুপুরে না ঘুমোলে মা কইত, চোখ বন্ধ কর, চোখ বন্ধ কর না হলে পুলিশ আইস্যা ধইর‍্যা নিয়া যাইব। এমনই কপাল সেই পুলিশের পাল্লায়ই কি না পড়লাম সারা জীবনের জন্য। দুদিন পর পর পুলিশ আসে, বলে, মাছ দে, সবজি দে, শাক দে, টাকা দে। শুধু দে দে আর দে। দিতে দিতে আমার জান কয়লা হয়ে গেল। আর কত আর কত?

হাওরের যে শোনে সেই বলে অর্জুন বড় গাড্ডায় পড়েছিস। কোন দিন দেখিস তোরে ধইর‍্যা নিয়া লাথি মেরে বাংলাদেশে ছুইড়্যা ফেলে দেবে। রাতে ঘুম আসে না। আমার শুধু ডর ডর করে। এই না পুলিশ এসে ধরে। কাজকর্ম সব লাটে উঠেছে। আমরা হাওরের মানুষ। শহরের মানুষ আপনারা, হাওর বোঝেন তো? হাওর মানে ছমাস জল আর ছমাস ডাঙা। বৃষ্টির সময় পুরো হাওর জলে ডুইব্যা যায়, এবাড়ি ওবাড়ি যেতে হলেও নৌকা, বাচ্চারা স্কুলেও যায় নৌকায়। আর আমরা মাছ ধরি, সেই মাছ বাজারে নিয়া বিক্রি করি আর ওই টাকায় চুলা জ্বলে। বৃষ্টি শেষ, জলও নেমে যায়— সুখা মরশুমে আমরা চাষ করি— ধান ফলাই, সবজি ফলাই। জল আর জমির সাথেই আমাদের জীবন। নৌকা আর লাঙলই আমাদের সব। পুলিশের ভয়ে আমি নৌকা বের করি না। লাঙলে মরচে ধরে। আমার পরিবার বাসনা, বাসনা ক্যাচক্যাচ করে, কয়, দুবেলা পোলাপানগুলারে খেতে দিই কীভাবে তুমিই বলো। ব্যাটামানুষ, পুলিশের ডরে ঘরে বসে থাকলে চুলা জ্বলবে? কথায় কথায় অশান্তি, কথায় কথায় অশান্তি। ঘরে অশান্তি বাইরে ভয়। আমি যাই কই? মা বুঝে আমার ব্যথা, কয়, বাপ, ডরাস ক্যান, এই দ্যাশ তো তোরও, তাইলে ডরাস ক্যান, আমাদের তো কাগজ আছে। আমি মা-রে জড়াইয়া ধরি, কই, মা, মা গো, আমার যে বড় ডর লাগে। মা কয়, বাছা আমার ডরাইসা, আমি আরও মা-র কোলে মুখে লুকাই, মা গো আমার যে বড় ডর লাগে। শেষমেশ মা-ই বুদ্ধি দিল, কইল, বাপ তুই একবার বিহাড়ার কর্তাবাবুর কাছে যা, তোর বাপঠাকুর্দার আমল থিক্যা কর্তাবাবুরাই তো আমাদের ভরসা।

তো গেলাম কর্তাবাবার বাড়ি। বয়স হচ্ছে মানুষটার। বিশাল বাড়ি। জমিদার বাড়ি তো। কর্তাবাবা মান্যিগন্যি মানুষ। উনি তো বিদেশে থাকতেন, লম্বা চাকরি করতেন, তারপর সব ছাড়ানছুড়ান দিয়া এই বিহাড়ায় চইল্যা আইছেন। গ্রামের মানুষদের বিপদে আপদে কর্তাবাবাই ভরসা। কর্তাবাবা এক দেখাতেই চিনলেন— তুই অনন্তর ব্যাটা না? কী যেন নাম তোর, হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে, অর্জুন! তা তোর নামেও নাকি বিদেশি নোটিস এসেছে।

আমি তো এককেরে থ। এই খবরও কর্তাবাবা পাইয়া গেছেন। কর্তাবাবা বড় বিপদে পড়েছি। একে তো বছর কয়েক ধরে পুলিশ মারছে এই ডি নোটিস নিয়ে। এখন শুরু হয়েছে আরেক গ্যাড়া, কী না কী এনআরসির খাতায় নাম তোলাতে হবে। আমার নাকি লিগ্যাসি ডাটা নাই। আমি কই গিয়া লিগ্যাসি ডাটা খুঁজব? আমি কি জানি লিগ্যাসি ডাটা কী? কর্তাবাবা আপনিই কন আমার লিগ্যাসি কী?

এটা ভালো বলেছিস তো! আমার লিগ্যাসি কী! সত্যিই তো তোর লিগ্যাসি কী? আচ্ছা অর্জুন তোর পরিচয় কী, তুই বলতে পারিস?

পরিচয় মানে আমি তো অর্জুন নমঃশূদ্র পিতা স্বর্গত অনন্ত নমঃশূদ্র সাং গ্রাম হরিটিকর দ্বিতীয় খণ্ড কাটিগড়া, কাছাড়, আসাম।

বাব্বা তুই তো গড়গড়িয়ে তোর পরিচয় বলে দিলি! কিন্তু তুই আসলে কে? তুই আসলে কী?

কী আবার— আমি হিন্দু! কর্তাবাবা তাকালেন আমার দিকে। চোখের দৃষ্টিটা কেমন যেন আমার ভেতর ফুঁড়ে দিয়া গেল। হিন্দু? শুধু হিন্দু?

হ আমি তো বাঙালিই। সে তো আপনি আমি সবাই।

হ্যাঁ তুই আমি আমরা সবাই বাঙালি। জানিস বাঙালির লিগ্যাসি কী? তোর লিগ্যাসি কী, তুই জানিস? তোর লিগ্যাসি মহাপ্রভু চৈতন্য, রবীন্দ্রনাথ, স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজি সুভাষ বোস, ক্ষুদিরাম, চিত্তরঞ্জন দাশ, বিপিন পাল, কাজী নজরুল— এঁরা সব তোর লিগ্যাসি। লিগ্যাসি কথার বাংলা মানে জানিস? উত্তরাধিকার। অনেক বড় অনেক বিশাল এর অর্থ। জানিস? জানিস তুই কার উত্তরাধিকার বয়ে নিয়ে চলেছিস? যারা তোর লিগ্যাসি ডাটা জানতে চায় তারা জানে তুই কার লিগ্যাসি বয়ে নিয়ে যাচ্ছিস? তুই তো লিগ্যাসি বইছিস কমলা ভট্টাচার্য, বীরেন্দ্র সূত্রধর, কানাইলাল নিয়োগী, সুনীল সরকার, বাচ্চু চক্রবর্তী, জগন যিশু, হ্যাঁ কালীপদ সেনেরও। পারবে এই উত্তরাধিকার কেউ কেড়ে নিতে?

ধুর যা খামোখা এলাম। এই বুড়োর বকবকানি শুইন্যা আমার পাগল পাগল লাগছে। বিলেত থেকে কেন চাকরি ছাইড়্যা এসেছে, এখন বুঝছি। চাকরি উনি ছাড়েননি, নিঘঘাত সাহেবরা তাড়ায়ে দিয়েছে। মাথার ঘোর ব্যামো। কিছু তো বলতে হয়, তাই বললাম কর্তাবাবা রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, দেশবন্ধুর নাম জানি, স্কুলের বইয়ে পড়েছি। কিন্তু উনারা কে? এই যে কীসব নাম বললেন কমলা-বীরেন্দ্র আরও কী কার কার যেন? ওদের নাম তো স্কুলের বইয়ে নেই।

কর্তাবাবা বলেন, তুই তোর বাপের মতোই বড় সরল রে অর্জুন। কোনও খবরও রাখিস না, মাছ মারিস ধান ফলাস, ব্যস শেষ— কিন্তু তোকে নিয়ে যে কত রাজনীতি হচ্ছে, সেই কোন যুগ থেকে, এর কোনও খবরও তুই রাখিস না।

না, নেই কোনও ইতিহাস বইয়ে নেই কমলা বীরেন্দ্রর মতো এগারো শহিদের কথা। এঁদের ইতিহাস এই দেশ লিখবে না। কোনও স্কুলের পাঠ্যবইয়ে থাকবে না। কারণ কী জানিস— এঁদের ইতিহাস লেখার সৎসাহস নেই সরকারের। তুই জানতে চাইলি না ওই কমলা হিতেশ বিশ্বাসরা কারা? কারা জানিস? এই যে তুই আমার সঙ্গে বাংলায় কথা বলছিস, তোর ছেলেপুলেকে বাংলা স্কুলে পাঠাচ্ছিস, এটা পারছিস শুধু ওই কমলা বীরেন্দ্রদের জন্যই। শিলচর গেছিস কখনও, স্টেশনটাকে দেখেছিস, এই স্টেশনে পুলিশ গুলি করে কমলাদের এগারোজনকে মেরে ফেলেছিল। হ্যাঁ, এই দেশের সরকারের পুলিশ। ওঁরা প্রাণ দিয়েছিল বলে তুই আজও বাঙালি বলে নিজের পরিচয় দিতে পারছিস।

কন দেখি, আইলাম আমার লিগ্যাসি খুঁজতে, বুড়ায় কই থিক্যা কই শিলচর রেল ইস্টিশান আর পুলিশের গুলি, এই সব আছাইড়া প্যাচাল পাড়ে। কর্তাবাবারে যেন কথায় পাইছে, কন, না না তোর দোষ নয়, তোর দোষ নয়। দোষ আসলে আমাদের, আমরা যারা নিজেদের শিক্ষিত ভাবি, আমরা যারা বাঙালির জন্য রাজনীতি করি, আমরাই তো তোদের জানাতে পারিনি কমলা কে, বীরেন্দ্র কে, চণ্ডীচরণ কে। আরে জানাব কী, আমরা তো শহিদ বলেই স্বীকৃতি দিইনি ওঁদের।

অন্যের কথা ছেড়ে দে, আমি, এই আমি কী করেছি, একেক সময়ে ভাবি। বড় গ্লানি হয়, নিজের কাছে নিজেকে বড় ছোট লাগে। জানিস, সিক্সটিওয়ানের ওই উনিশে মে আমিও শিলচর রেলস্টেশানে ছিলাম। সে কী উন্মাদনা! তোরা, আজকের ছেলেপুলেরা ভাবতেও পারবি না, ভাষার জন্য, মায়ের মুখের ভাষার জন্য মানুষ এতটা উন্মাদ হয়ে উঠতে পারে।

(ব্যাকগ্রাউন্ডে ‘জান দেব তবু জবান দেব না’, ‘ইনক্লাব জিন্দাবাদ’)

 

এরপর আগামী সংখ্যায়

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1925 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...