উদ্বাস্তু শিল্পের সৌন্দর্য

রোমেল রহমান

 

ডুবন্ত নৌকার থেকে ভেসে উঠল একদল মানুষের ভূমিহারা হবার গল্প। তারপর জানা গেল ঝাঁকে ঝাঁকে নৌকো জলের বুকে ভেসে আসছে ফলে ক্যামেরার চোখগুলো সেই ফুটেজ ধরতে নেমে গেল সমুদ্রে-নদীতে, তারপর পুকুরের জলে ডুবে মরা শিশুটির মুখ মনে পড়ে যখন সৈকতে এক শিশুর অভিযোগহীন মরামুখ দেখে পৃথিবীর মনে পড়ে যায় এইসব গল্পের অতীত শতকগুচ্ছে পুতুলের এমন করুণ মৃত্যু পৃথিবীর ইতিহাসে উজ্জ্বল; ফলে শিশু হত্যার অহঙ্কারের গর্ব আছে সভ্যতার কিংবা ধারালো অস্ত্র থেকে বোমা শিল্পের উৎকর্ষ প্রসঙ্গে কোনও প্রশ্ন কেউ যদি নাই করে, কিংবা করে কোনও লাভ নেই জেনে তবুও লাফিয়ে ওঠে প্রতিবাদী মিছিলের বিবিধ খুচরোখাচরা উদ্বেগ! ‘মানুষ আসলে মানুষকে মেরেই বেঁচে থাকে’ এরকম একটা বাক্যের পর টের পাওয়া যায় নিগূঢ় সত্যটা এই যে, এ কথা ফেলে দেবার উপায় নেই! ফলে বিকল যুদ্ধবিমান আর মর্টারের খোসা কিংবা বিচিত্র যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে বানানো যুদ্ধবিরোধী ভাস্কর্য থেকেও আমরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে যাবার শক্তি পেলাম না। কিংবা যুদ্ধ-হত্যা এমন এক নারকীয় শিল্পকর্মের প্রদর্শনী যার দর্শক সমগ্র দুনিয়া যা দেখার মধ্যে আছে এক হাহাকারের আনন্দ। সমবেত দুঃখের জারি গাইবার আছে এক সুখ, তার জন্য প্রয়োজন নরমেধযজ্ঞ! ফলে সাহায্য সংস্থার মাহুতেরা এলে তাদের চোখমুখ দেখলে আমাদের মনে হয়, দুঃখের তিমিরে জেগে ওঠা আশ্বাসের চাঁদ। আমরা মেনে নেই এই ভালো মানুষের দল ত্রাতার ভূমিকায় এসেছে, কিন্তু আমাদের মধ্যে কোনও এক দুষ্ট আত্মা হয়তো চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে, ‘…এই শালা মাহুত ব্যাটা হত্যাযজ্ঞর পুরোহিতের মামাতো ভাই!’ ফলে যুদ্ধবাণিজ্যের শেয়ারহোল্ডার প্রসঙ্গে একটি সূক্ষ্ম সন্দেহ জাগ্রত হবার মুহূর্তেই প্রশ্নকারীকে উন্মাদ, প্রতিষ্ঠানবিরোধী বা মানবতার বিরুদ্ধচারীদের একটা জংধরা লেবেল সেঁটে দিয়ে আমরা ফিরে যাই ত্রাণের প্যাকেটে খাদ্যের পুষ্টিমানের চমৎকারিত্ব প্রসঙ্গে! ফলে ভূমি হারানোর ভূমি ফেরানো কিংবা কেন সে হারাবে ভূমি সেটা আবডালে ফুঁপিয়ে কাঁদুক পালাবার পথে ধর্ষিত হওয়া মেয়েটার মতন। তবু মানববন্ধনের প্ল্যাকার্ডে ঝুলে থাকা দুঃখগুলো ভালো লাগে। ব্যানারে, ফেস্টুনে আঁকা চিত্রবাস্তবতায় এই শতকের গল্পরা হামাগুড়ি দেয় এবং একদিন ফেস্টুন হাতে দাঁড়ানো ছেলেটা হারিয়ে যায় ভিড়ের ভেতরে এবং তার স্মৃতিডায়েরির একটি পাতা হয়ে থাকে হয়তোবা, ‘একদিন আমিও দাঁড়িয়েছিলাম রাস্তায় ভূমিহারা হয়ে যাওয়া এক জাতিগোষ্ঠীর দুঃখে দুখী হয়ে’ এইসব কথা মনে করতে করতে তাকেও আকর্ষণীয় চাকুরির আশায় জাতিসঙ্ঘ কিংবা তৎ আত্মীয় প্রতিষ্ঠানে করুণ আবেদন করতে দেখা যাবে। ফলে ক্যাম্পের বালিকাটি যুবতী হবার আগেই ততদিনে চুরমার হয়ে গেছে। তবে সে বেঁচে আছে হয়তো একদিন গল্পে শোনা মাতৃভূমিতে ফিরে যাবে সেই আশায়। সেখানে একটা ফুলের বাগান করে বাগানের চারপাশে বেড়া দিয়ে কয়েকটা বুনো শুয়োর পুষবে সে।  তারপর সমস্ত বাগানে ফুল ফুটলে, শুয়োরগুলো স্বাস্থ্যবান হলে বাগানের বেড়া খুলে দেবে শুয়োরদের জন্য; তারপর একদিন উন্মাদিনীর মতো সে শুয়োরদের দ্বারা নষ্ট বাগানকে আরও তছনছ করতে অস্ত্র হাতে নামবে, বেদম পিটিয়ে শুয়োরের দঙ্গল আধমরা করে শোধের সুখ নেবে লুফে। ফলে আমরা দেখি প্রদর্শনী গ্যালারিতে সাজানো নিহতের জামা, বালিকার ফ্রক, শিশুটির খেলনা, কারও চুলের কাঁটা, একটা স্কার্ফ, অথবা বয়সীর ছড়িতে মাখানো শুকনো রক্তের কালো, একটা সুটকেস, পানির বোতল, একপাটি জুতো, কারও থেমে যাওয়া হাতঘড়ি, কোনও এক সংসারের তালা কিংবা কারও বোতলে করে আনা স্বদেশের মাটি! যেন এক সমুদ্র মার্সিয়া জেগে ওঠে বুকের মধ্যে। ফুঁপিয়ে ওঠে হৃদপিণ্ডের খোঁড়ল। এক কোনায় একটা আধপোড়া ফটোগ্রাফে যেই যুবকের ছবি তা দেখে নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায়, কোন এক আগুন যুবতীর বুকের খাঁজ থেকে খসে পড়েছে এই ফোটোগ্রাফ! ফলে একটা খেলনা ঘোড়া দেখে মনে হল, শিশুটি পালাতে পারেনি কিন্তু ঘোড়াটা পৌঁছে গেল গ্যালারির শান্ত পরিবেশে। কিন্তু এইসব জিনিস একজন মানুষকে মানুষ থেকে কী করে আলাদা করে? স্বাধীন মানুষ এবং উদ্বাস্তু মানুষের মধ্যে তফাৎ চিহ্নিত করে কি? হয়তো কোনও এক কিশোর এইসব ব্যাপারস্যাপার ওয়েব দুনিয়ায় দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করে, ‘উদ্বাস্তু মানুষ কেন হয়? কিংবা কেন মানুষকে উদ্বাস্তু করে দেয়া হয়? এটা কি উদ্বাস্তু বিষয়ক একটি গেইম? উদ্বাস্তুরা দেখতে কেমন?’ ফলে নন্দনতাত্ত্বিকেরা হয়তো একদিন একটা উদ্বাস্তু মেলার আয়োজন করে, যেখানে দেখা যায় কাঁচের বাক্সের ভেতর বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন রঙের, বিভিন্ন সাইজের, বিভিন্ন চেহারার বিচিত্র উদ্বাস্তুকে বসিয়ে রাখা। উদ্বাস্তু দেখতে দেখতে হয়তো সেই মেলাতে আসা এক বাচ্চা জিজ্ঞাস করে বসে, ‘এরা তো মানুষের মতো দেখতে, কিন্তু এরা কি মানুষ?’ ফলে মানুষ প্রসঙ্গে আমাদের আবার ভাবতে হয় যে, ‘মানুষ আসলে মানুষকে খেয়েই বাঁচে! মানুষ আসলে দর্শক কেননা সার্কাসের খাঁচায় এখন মানুষ বন্দি এবং আজ মানুষেরই করুণ প্রদর্শনী হচ্ছে দিকে দিকে।’ ফলে এই চক্রের ভেতর বসে আমরা বাইরে থাকার ভান করি। ‘আমি বেঁচে গেছি’ টাইপ এক অনুভূতি আমাদের আমোদ দেয়। অন্তত দর্শকের আনন্দের মতো নির্মম সুখ আর নেই। তাই পৃথিবীতে চলমান উদ্বাস্তু শিল্পের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আমাদের ‘আমি’ বেঁচে যাওয়ার সুখ নিরাপত্তা দেয়। এবং কিছু পরিমাণ মানববন্ধন বা দানবাক্সে ছুঁড়ে দেয়া সাহায্য আমাদের জীবনস্মৃতিতে ‘মানুষের জন্য মানুষ’ নামক একটি অধ্যায় রচনায় সহায়তা করে। আদতে এই ঢালের আবডালে একদিন আমার উত্তরপ্রজন্ম উদ্বাস্তু হবার সম্ভাবনা প্রশ্রয় পায়, ফলে আশা করা যাক এই নিয়ত বর্ধমান উদ্বাস্তুর দুনিয়ায় একদিন উদ্বাস্তু মানুষেরা স্বাধীন মানুষ নামক প্রাণীদের উদ্বাস্তু হয়ে ওঠায় হাততালি দিয়ে স্বাগত জানাবে! সেদিন হয়তো সার্কাসের খাঁচায় স্বাধীন মানুষ দেখতে স্কুলের বালক-বালিকারা আসবে, এবং পণ্ডিতেরা ভেবে পাবে না; ‘কেন মানুষের স্বাধীনতা প্রয়োজন?’

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...