জিনিয়া অথবা প্রেম

রিমি মুৎসুদ্দি

 

“চিজ কর্ন স্যান্ডুইচ আর একটা এক্সপ্রেসো” মোবাইল থেকে মুখ না তুলেই বিতান অর্ডারটা দিল। ইন্সটাগ্রামে সুদেষ্ণার ছবিগুলোয় লাইক দেওয়ার ফাঁকে অস্থিরভাবে মেসেঞ্জার নোটিফিকেশনের দিকে লক্ষ রাখছে। গতকাল ফেসবুকে একটা বিতর্কিত লেখার জবাব এসেই চলেছে। বিতান খুব ঠান্ডা মাথার ছেলে। প্রতিটা নোটিফিকেশন সঙ্গে সঙ্গে পড়লেও জবাব দিচ্ছে বেশ কিছুক্ষণ সময় ধরে। যেকোনওরকম উত্তেজনাই এখন ওর ভাবমূর্তি নষ্ট করে দিতে পারে।

কাঁচের দরজা ঠেলে কফিশপের ভেতরে ঢোকার আগে সুদেষ্ণা কিচ্ছুক্ষণ বাইরে দাঁড়াল। বিতান মেসেজ করেছে ও এসে গেছে।

বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে ও অনেকবার ফোন করেছিল বিতানকে। প্রথমদুবার রিং বেজে গেল। তৃতীয়বার বিতান কেটে দেয় ফোনটা। শুধু একটা মেসেজ আসে, ‘এসো।’

আজ বছর পাঁচেকের সম্পর্ক ওদের মধ্যে এরকমই। প্রথম প্রথম সুদেষ্ণার খুব অভিমান হত। বিতান না হয় একজন জনপ্রিয় কবি। বহু ভক্ত ওর চারিদিকে। কিন্তু সুদেষ্ণাকে তো ও নিজেই বলেছিল, “ভালোবাসি তোকে। জীবনটা যদি আরও দশবছর পিছিয়ে যেতে পারতাম, তাহলে যাকে খুঁজে পেতে চাইতাম সে তুই তুই তুই।”

ভালবাসার কথা বিতান আগেও বলেছিল। সুদেষ্ণার ভাল লাগলেও কোথাও একটা দ্বিধা ছিল। বিতানের চারধারে এত মেয়ে আর ওর মতো একজন সাধারণ একটা মেয়ের প্রেমে কি বিতানের মতো জনপ্রিয় কবি পড়তে পারে? প্রশ্ন ছিল। দ্বিধাও ছিল। তাই একটা সচেতন দূরত্ব বজায় রাখত সুদেষ্ণা। কিন্তু সেদিনের কথায় কী যে ছিল তা সুদেষ্ণা আজও বুঝতে পারে না। সেই সুদূর হায়দ্রাবাদ থেকে ছুটে ছুটে আসে ও বিতানের জন্যই। অফিসের হাজারো সমস্যা সত্ত্বেও কলকাতায় ওর আসা চাইই।

বিতানের এরকম ফোন না ধরা বা ফোন কেটে দেওয়ার কৈফিয়ৎ বিতান নিজেই দেয়। ওর নিজের ভাষায়, ‘তোর ফোনের রিংটোনটা শুনতে শুনতে মনে হয় বহু দূর থেকে একটা পাখি এ গাছ থেকে সে গাছ ঘুরে খুঁজে মরছে তার বাসা। আমি তাকে দেখতেই থাকি। সে যেন আমার বাড়ির বারান্দা দিয়ে এইমাত্র উড়ে গেল। আবার খুঁজে না পেয়ে এখানেই ফিরে আসবে। বসবে এসে কার্নিশে। আমি অপেক্ষা করতে থাকি। ফোন কেটে যায়।’

এইসব কবিতার ভাষা সুদেষ্ণা বোঝে না। প্রোগ্রামিং-এর সফটওয়্যার বোঝা এর থেকে অনেক বেশি সহজ। এইসব কথার গভীরে ও ঢুকতেও চায় না। দূরে থাকলে উপেক্ষা অথবা দুর্বোধ্যতা যতটা পীড়া দেয় কাছে আসার উত্তাপে সেইসব অনুভূতিগুলো ক্রমশ গলে যেতে থাকে।

 

এইবার খুব কষ্ট করে সুদেষ্ণা এসেছে কলকাতায়। সদ্য অসুখ থেকে উঠেছে ও। প্রাইভেট সেক্টরে চাকরির কোনও নিরাপত্তা নেই। ছুটিও কম। শরীর খারাপের জন্য পাওনা ছুটির থেকেও বেশি ছুটি নেওয়া হয়ে গেছে।

উল্টোদিকের ফুটপাথে বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমাহলের সামনে একজন ফুলবিক্রেতা বসত। গতবার একগোছা জিনিয়া নিয়ে এসেছিল ও বিতানের জন্য। ফুল আসলে ওর খুব প্রিয়। তাই বিতানের সঙ্গে অনেকদিন বাদে আবার দেখা হলেই ও ফুল উপহার দেয়। কিন্তু আশ্চর্য, আজ ফুলের দোকানটাই নেই ওখানে। সিনেমাহলটাও ভাঙাচোরা হচ্ছে। সম্ভবত মাল্টিপ্লেক্স বা কোনও শপিং মল হবে।

–ম্যাডাম, কিছু খুঁজছেন? স্যার ভেতরে অপেক্ষা করছেন।

সুদেষ্ণা সামন্য চমকে যায় কফিশপের ছেলেটাকে দেখে। কী যেন নাম?

–অর্ণব। নামটা মনে নেই নিশ্চয়ই। ভাল আছেন? অনেকদিন পর আবার এলেন। স্যার তো প্রায়ই আসেন।

বিতানের কলেজ সামনেই। প্রায় প্রতিদিনই লাঞ্চ আওয়ারে বিতান এখানে আসে। সেই যে আমেরিকায় গিয়ে লাঞ্চে কফি খাওয়া অভ্যাস করেছিল, এখনও এই সময় ওর একটু কফি চাই। তাই একাই রোজ ও এখানে আসে। সুদেষ্ণা জানে। সুদেষ্ণা কলকাতায় এলে ওরা এই সময়ে এখানে দেখা করে। কফি খেয়ে বিতান আবার কলেজে চলে যায়। সুদেষ্ণার বাড়িও কফিশপের কাছেই। সেইসূত্রেই ছেলেটার মুখ চেনা।

–হ্যাঁ ভালো আছি। আচ্ছা এখানে যে ফুলের দোকানটা ছিল সেটা কি উঠে গেছে?
–না ওঠেনি। ঐ আরেকটু এগিয়ে একটা ক্রসিং পেরিয়ে বসেছে। আপনার কিছু লাগবে? আমি এনে দেব? ওইদিকেই যাচ্ছি আমি। ফোন রিচার্জ করতে।

একটু কিছুক্ষণ ভাবে সুদেষ্ণা। নাহ, থাক। কিছু লাগবে না।

গতবারের জিনিয়াগুলো বেশ ফ্রেশ ছিল। ভাবতে ভাবতে সুদেষ্ণা কাচের দরজা ঠেলে কফিশপের ভেতরে ঢোকে। বিতানকে বলবে এবার একগোছা জিনিয়া নাহয় নিদেনপক্ষে রজনীগন্ধাই কিনে দেয় যেন ওকে।

 

কফিশপে ওরা দুজন মুখোমুখি। সুদেষ্ণার জন্য আরেকটা স্যান্ডুইচ অর্ডার করে বিতান। ও নিজে স্যান্ডুইচে কামড় দিতে না দিতেই অর্পিতার ফোন এল। বিতান আবার ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফোনে কথা বলেই চলেছে। অর্পিতার বর কোনও একটা খুব জনপ্রিয় পত্রিকার সম্পাদক। বিতানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এইসব ও বিতানের কাছেই শুনেছে। অর্পিতা পেশায় ডাক্তার হলেও লেখকখ্যাতিই ওর স্বপ্ন। বিতান বলে, “লেখাটা যে ওর মধ্যে নেই তা ওই মেয়েটাকে কে বোঝাবে? সূর্য পশ্চিমদিকে ওঠা আর অর্পিতার লেখক হওয়া কিন্তু এক।” অবাক হয়েছিল সুদেষ্ণা। তাহলে ওর উপন্যাস যে বিখ্যাত এক পত্রিকায় বেরোচ্ছে? “আরে, মেয়েটা আমার প্রকৃত বন্ধু। অনেক উপকার করে আমার। আর ম্যাডাম, তুমি তো কলকাতায় থাকো না। অর্পিতাই আমার সেক্রেটারির কাজ করে। এইসব উপন্যাস আসলে তোমার প্রেমিকেরই।”

অবাক হয়ে যায় সুদেষ্ণা এইসব শুনে। “মানে?” “আমি প্লট দিই ও বলে যাই। সে বেচারি রেকর্ড করে নিয়ে যায়। পরে লিখে জমা দেয়। আর ওর বর যেখানে আছে ছাপায় তো কোনও সমস্যা হয় না ওর।” “সে কী? কিন্তু এ তো রীতিমতো অন্যায়।” “ধুর! এরকম বাংলা সাহিত্যে যুগে যুগে হয়ে আসছে ডার্লিং।”

সুদেষ্ণার বিষণ্ণ ও অবাক মুখের দিকে তাকালেই বিতান আঁচ করে ওর মনে কথা। তাই ব্যাখ্যা দেয়, “আরে তুমি তো আর লেখক নও। তোমার অসুবিধা কোথায়?” সত্যিই তো সুদেষ্ণা লেখক নয়। সফটওয়্যার প্রোগ্রামিং-এর কাজটুকু ছাড়া আর কিছুই জানে না ও। তবুও যেন কেমন কাঁটা খচখচ করতে থাকে ওর মনের ভেতর। বিতান এরপর ওর সাহিত্য জগতের নানা কেচ্ছা শোনাতে থাকে। সুদেষ্ণার খুব ক্লান্ত লাগত তখন। এসব না জানলে ও যে বেশি ভাল থাকত সেই বোধটা কেন যে বিতানের হয় না, ভেবে আরও কষ্ট পেত ও।

 

–তুই যদি মেয়ে না হতিস তাহলে তো আমার বাড়িতেই তোকে থাকতে বলতাম। আমাদের সমাজটা তো জানিস। আর আমার চারিদিকে শত্রু। তোকে তো সবই বলি। কিছুই অজানা নেই তোর।

ফোনটা রেখে সুদেষ্ণার দিকে তাকিয়ে বিতান বলে, অর্পিতা ওর বরের সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। একটা থাকার জায়গার সন্ধানে আছে। আর বোলো না, যত ঝামেলায় লোকে আমাকেই স্মরণ করে।

সুদেষ্ণার ইচ্ছে করছে বিতানকে দেখতে। ছমাস বাদে আবার দেখা। কিন্তু একভাবে তো তাকিয়ে থাকা যায় না। তাই অগত্যা সুদেষ্ণাও মোবাইল-ডেটা অন করে ফেসবুক দেখতে থাকে।

কথা শেষ হলে বিতান সুদেষ্ণার দিকে তাকায়। “খুব রোগা হয়ে গেছ। তবে সুন্দর একইরকম আছ।”

একটা দুষ্টু হাসি সুদেষ্ণার দিকে ছুড়ে দিয়ে বিতান আবার মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে পরে। সুদেষ্ণা অপেক্ষা করে। বেশ কয়েকটা সেলফিও তোলে। আরও একটা চিজ কর্ন স্যান্ডুইচ আর কফি দিয়ে গেল ছেলেটা।

মিষ্টি একটা হাসি উপহার দিয়ে সুদেষ্ণা অর্ণবকে বলে,

–তুমি গেলে না মোবাইল রিচার্জ করাতে?
–না, একটু পড়ে যাব। আপনার ফুল লাগলে এখনও বলতে পারেন। আমি ওইদিকেই তো যাব।

সুদেষ্ণা মাথা নেড়ে বিতানের দিকে তাকায়। বিতান এখনও ফোনেই ব্যস্ত।

–থাক। তোমার স্যার এনে দেবে।

মোবাইল থেকে মুখ না তুলেই বিতান বলে, কী গো? কী এনে দেব?

সুদেষ্ণাকে উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই বিতান বলে যায়, আরে এদিকে একটা ঝামেলায় পড়ে গেছি। গতকাল কাগজে আমার একটা পোস্ট এডিটোরিয়াল কলাম বেড়িয়েছে। আজ ফেসবুকে, টুইটারে সেই লেখা নিয়ে ঝড় উঠেছে। কেউ বলছে সরকারকে সমর্থন করেছি নিজের আখের গোছাবার জন্য। আচ্ছা বলো, কী আখের গোছাব? লিখতে না পারলে কোন সরকারই বা আমার কী করবে? যখন মনে হয়েছে বিরোধিতাও করেছি। আমি কি কোনও স্বার্থেই মিথ্যা বলতে পারি বলে তোমার মনে হয়?

বিতান কথা বলা শুরু করলে অর্ণব আর দাঁড়ায় না সেখানে।

–তুমি ঠিকই বলেছ। আমার মনে হয় একজন লেখকের সবথেকে বড় বন্ধু পাঠক। পাঠক না পড়লে কার জন্য লেখা? আবার তুমি এক্ষুণি বোলো না, নিজের জন্য লিখি।
–কথাটা তো ঠিক সোনা। নিজের জন্যই লিখি। লিখতে ভালো লাগে তাই লিখি। অবশ্য সেই লেখা অন্যেরা পড়লে তা ভালো লাগুক আর মন্দ, একটা অন্যরকম অনুভূতি হয়।
–বলো ভালো লাগে। আমি বুঝি বিতান। তোমার ভালো লাগে। তাই সারাক্ষণ সোশ্যাল মিডিয়ায় তোমার মনোযোগ। কে কী বলছে, সমালোচনা করছে না প্রশংসা?
–সে তো তুমিও ছবি আপলোড করো নিজের। কতগুলো লাইক পাও বলো তো? আমার ১০০০ হলে তোমারও তো ২০০ থেকে ৩০০ লাইক হয়।
–আমি লাইকের জন্য ছবি পোস্ট করি না। তুমি ব্যস্ত। তোমাকেই দিতে চাই আমার সব ছবি। ফেসবুকেই তোমাকে পাই যে। তাই ওখানেই ছবিগুলো পোস্ট করি। যাতে তুমি দেখতে পাও।

কথাগুলো বলতে বলতে সুদেষ্ণার চোখে জল এসে গিয়েছিল। গলাটাও সামান্য ধরে এসেছিল। বিতান খেয়াল করল না। মেসেজের বিপ শব্দে ও আবার ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ছায়াজগতে।

বহুদিন অদর্শনের পর সাক্ষাৎ তবুও কথা জমে না ওদের মধ্যে। ফেসবুকের লাইক কমেন্ট এসবই কথার বিষয় হয় দুজনের মধ্যে। কফির কাপে সুগার কিউবের না গলা টুকরো হয়ে পড়ে থাকে দুজনের নিজস্ব কথোপকথন।

–এই দেখো আমার গতবারের পুরস্কার নিয়েও কী সব লিখেছে। এরা শান্তিতে বাঁচতে দেবে না আমায়?
–তুমি কিছুক্ষণ বাদ দাও না এসব। আমাকে একগোছা জিনিয়া এনে দেবে বিতান? তোমার মনে আছে প্রথম যেদিন দেখা হয়েছিল গড়িয়া স্টেশনে?
–দাঁড়াও। এসব মনে করাকরির সময় এখন নেই। এই উত্তরটা পড়ো তো। কীরকম লিখলাম? ঠিক লিখেছি না? আরে তুমি যতক্ষণ না বলছ আমি ঠিক ভরসা পাই না সোনা।

বিতান হাতটা রাখে সুদেষ্ণার হাতের ওপর। এই একটুখানি ছোঁয়ায় সুদেষ্ণার চোখ ভিজে যায় আবার। মোবাইল স্ক্রিন ঝাপসা হয়ে আসে। তবু ও চোখের জল মুছতে পারছে না। বিতানের এই ভার্চুয়াল জগতে সুদেষ্ণাও ঢুকে পড়তে বাধ্য হয়। বিতান ওর উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে আছে। একটা কথাও যে বলা হল না ওর। হাতে ধরা মেডিক্যাল রিপোর্টটাও তো দেওয়া হল না?

বিতান বলেই চলে। রাজনীতির কথা। ওর কবিতা জগতের কথা। কলেজ পলিটিক্সের কথা। ওর অসহায়তা, বাড়ির সমস্যা। দাদা বউদি আলাদা হয়ে গেছে, মাকে দেখে না। মার সম্পূর্ণ দায়িত্ব বিতানের ওপর।

কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে চকিত ফোনেও চোখ বুলিয়ে নেয় বিতান। আরেক কাপ এক্সপ্রেসো অর্ডার দেয়। অর্ণব নয় অন্য আরেকটা ছেলে আসে কফির কাপ নিয়ে। বিতানের আরেকটা ফোন এসেছে। কথা বলতে পারছে না। হ্যালো হ্যালো করেই চলেছে। সম্ভবত নেটওয়ার্কের কোনও সমস্যা হচ্ছে। বিতান হাতের ইশারায় সুদেষ্ণাকে কিছু বলে ফোনটা ধরতে কফিশপের বাইরে বেরোয়। সুদেষ্ণা মনস্থির করে ফেলেছে। এইবার বিতান এলে ওর হাতে এই মেডিক্যাল রিপোর্টটা ধরিয়ে দেবে। ও রিপোর্টের ফাইলটা খোলে টেবিলে। মনোযোগ দিয়ে আরেকবার খুঁটিয়ে পুরোটা পড়তে শুরু করে। পড়তে পড়তেই ফোনটা বেজে উঠল।

–হ্যাঁ সোনা। আমাকে একটু কলেজে যেতে হচ্ছে। ছাত্র ইউনিয়নে কি সব গণ্ডগোল হয়েছে। প্রিন্সিপ্যালকে ঘেরাও করেছে। এক্ষুণি না ঢুকলে আবার ঢোকাও যাবে না। পরীক্ষা পাশের হুজ্জুতিতে এইসব ঘেরাও টেরাও। আর বোলো না।

একটু কিছুক্ষণ থামে বিতান। আবার বলে, হ্যালো, সোনা শুনতে পাচ্ছো? তুমি কি রাগ করলে সোনা? আমি কী করব বলো তো? আচ্ছা আমি প্রিন্সিপ্যাল স্যারকে ফোন করে বলে দিচ্ছি। যা খুশি হোক। আমি পারব না এখন যেতে কলেজে। আসছি ভেতরে।

এতক্ষণ সুদেষ্ণা কোনও উত্তর না দিয়েই শুধু শুনছিল ওপাশের কথা। এইবার বলে,

–না। তুমি কলেজে যাও। আমি এইখানেই অপেক্ষা করছি। তুমি ফিরে এসো। কথা হবে।
–কিন্তু এই ঘেরাও, ইউনিয়নের গণ্ডগোল কখন মিটবে কে জানে? তাছাড়া থানা পুলিশও হতে পারে। তুমি তো এখানে থাকো না। তাই জানো না। ছাত্র ইউনিয়ন মানেই এখানে চূড়ান্ত স্বেচ্ছাচারিতা।
–সে তো সবজায়গায়। এই যে তুমি কবি না রাজনীতিবিদ বুঝি না। আমি সত্যিই বুঝতে পারি না বিতান।
–সোনা এসব কথা বলার এখন সময় নয়। রাজনীতি আমাদের জীবনের সবকিছুর সাথেই প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে আছে। তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ‘Poetry is a political act’।
–আচ্ছা তুমি কলেজে যাও। আমি বাড়ি চলে যাচ্ছি।

বিতানকে থামিয়ে দেয় সুদেষ্ণা।

–আমি বেরিয়ে তোমায় ফোন করছি। তোমার বাড়ি যাব। না পারলে কাল দেখা করব। জানাব তোমায় পরিস্থিতি।

সুদেষ্ণা মেডিক্যাল রিপোর্টের পাতাটা খোলে। কয়েকটা শব্দের দিকে মুখ গুঁজে তাকিয়ে রয়েছে ও।

–এই নিন ম্যাডাম।

কথাটা শুনে ও মুখ তোলে রিপোর্টের পাতা থেকে। অর্ণব দাঁড়িয়ে আছে টেবিলের সামনে। হাতে একগোছা জিনিয়া।

উজ্জ্বল একরাশ হাসি ছড়িয়ে অর্ণব সুদেষ্ণার টেবিলের কাছে আসে। জিনিয়ার তোড়াটা রিপোর্টের খুলে রাখা পাতার ওপর রেখে বলে, এই ফুলগুলোই সবচেয়ে বেশি ফ্রেশ ছিল। আপনি চাননি। তাও ঐদিক দিয়ে ফেরার সময় মনে হল নিয়ে যাই আপনার জন্য।

সুদেষ্ণা ব্যাগ খুলে টাকা দিতে গেলে অর্ণব বলে, প্লিজ ম্যাডাম। এটা থাক। আমার চেনা ছেলেটা। আমি ওর অনেক উপকার করেছি। টাকা নেয়নি। চাইতে এমনিই দিল।

ছেলেটা চলে গেছে। সুদেষ্ণা জিনিয়াটা রিপোর্টের পাতা থেকে তুলে হাতে নেয়। একহাতে জিনিয়া আর ওর চোখ রিপোর্টের কয়েকটা শব্দের দিকে— Carcinoma Stage 2…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1912 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...