এই অবিশ্বাসী সময়ে আশা জাগানোর দুটি বই…

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

There is no possibility that any perceptible change will happen within our own lifetime…. Our only true life is in the future…. But how far away that future may be, there is no knowing. It might be a thousand years. At present nothing is possible except to extend the area of sanity little by little.

George Orwell, 1984

সম্প্রতি কিছু পুরনো, ক্লাসিকের কাছে ফিরে যেতে মন চাইছিল, আর তাইই বই থেকে শুরু করে, দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমেও কেবলি পিছুটান অনুভব করছি। এটা ঠিক নস্টালজিয়া না, ফিরে পড়া সেইসব ক্লাসিক, যার ভেতর দিয়ে লেখক বা স্রষ্টার সঙ্গে তার পারিপার্শ্বিকের ক্ষমতাবলয়ের যুদ্ধটা হয়ে গিয়েছে। এই যুদ্ধ অনিবার, এরই ইতিহাস মানব সমাজ। যতক্ষণ না চারিদিক থেকে চাপ আসে, যতক্ষণ না লেখক অনুভব করেন কলম বা তুলি তুলে নেওয়াও একরকমের অবস্থান নেওয়া, লড়াইয়ে সামিল হওয়া, ততক্ষণ তাঁর সৃষ্টিতে সেই যাচিত আগুন থাকে না বোধ হয়, পাঠক যা থেকে নিজের দীপ জ্বালিয়ে নিতে পারেন।

আমাদের এখনকার লেখাকথাগানসিনেমা, এখনকার শিল্প, সাহিত্য কোথাও যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে মনে হয়,  নিজের বাস্তবতা থেকে। না, আলগা স্টেজ গরম করার প্রতিবাদের কথা বলছি না হয়ত। চারদিক থেকে যাবতীয় অন্যায় অবিচারকে তিল তিল আহরণ করে, নিজের ভেতরে তার প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়ে ওঠার জন্য অপেক্ষা করে, ঝুঁকি নিয়ে কিছু একটা লিখে বা তৈরি করে ফেলার যে কাজ, তা যে কত কঠিন আর অমিল আজকের দিনে।

কোনও আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠছেন শিল্পী সাহিত্যিক, এমন কোনও ঘটনাকে গল্পকথা মনে হতে শুরু করেছে, আজকাল জনমানসে তাই বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে রসিকতা, ইয়ার্কিও সেই দিকেই নির্দেশ করে। পাঠক আর বিশ্বাস করেন না যে লেখক কোনও সততা বা সিনসিয়ারিটি থেকে রচনা করছেন। আগুনও আহরণ করতে পারেন না। এই সময়ের এটাই অভিশাপ। এতটাই অবিশ্বাসী সময় আমাদের।

তাই, পুরনো পাতা উলটাই। তাই ফিরে ফিরে পড়ি স্রোতের বিপরীতে হাঁটা লেখককে। দেশমাতৃকা হিসেবে দেশকে না দেখতে চেয়ে দেশকে দেশ বা তার মানুষ হিসেবে দেখতে চাওয়ার সাহস সম্পন্ন নিখিলেশ চরিত্র, রবি ঠাকুরের ঘরে বাইরে-তে। আবার পড়ি। ভাবি। যেন ছত্রে ছত্রে মিলে যাওয়া, প্রায় ভবিষ্যদ্বাণীর মত পড়ে হতবাক হই অরওয়েলের নাইনটিন এইট্টি ফোর। অথবা রেজিস্টেন্সে নিজে অংশ নেওয়া লেখক আলবেয়ার কামু-র দ্য প্লেগ থেকে পড়ে নিই কীভাবে প্লেগবিচ্ছিন্ন শহর হয়ে ওঠে ডিপ্রেশনে ডুবে যাওয়া বিরহ আক্রান্ত প্রেমিক প্রেমিকার শহর, অবিশ্বাসের শহর, একে অপরকে সন্দেহ করার, সহানুভূতিশূন্য হবার শহর।

একইভাবে, ইদানীং খুব দেখছি কালোদের জ্যাজ ব্লুজ ও সুইং, আরও নানা সঙ্গীত রীতির ওপরে ডকুমেন্টারি। আমেরিকার কালোমানুষের সিভিল রাইটস মুভমেন্টের ভেতরে গভীরভাবে সম্পৃক্ত জ্যাজ গায়িকা নিনা সিমোনের জীবন, তা নিয়ে এক ডকুমেন্টারি, প্রায় এক উপন্যাসের মত। প্রতিপদে অনুভব করে চলেছিলাম তাঁর লড়াই, তাঁর ভালো না থাকা, তাঁর ব্যক্তিগত পরাজয়, পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টির উত্তুঙ্গ মুহূর্তগুলি। এক কালোমানুষ, এক নারী, এক সৃষ্টিশীল মানুষের যাবতীয় যুদ্ধ।

 

Books were not many in existence, as you can imagine. The Thought Police hunts them down and destroys them almost as fast as we can produce them. It makes very little difference. The book is indestructible. If the last copy were gone, we could reproduce it almost word for word.

George Orwell, 1984

এইসব সময়েই একেবারে আমাদের সময়ে প্রকাশিত দুটি বই কিছুটা আশা জাগায়।

১১৯ পাতার একটি উপন্যাস। হিন্দোল ভট্টাচার্যের “নাশকতার বারান্দা”। লেখার শুরুতেই লেখক বলছেন, ইতিহাস কখনও কখনও নিজেও বিস্মৃতিতে ভোগে। আবার বলছেন, “প্রতিটি এলাকা ইতিহাসের ভিতর সময়ের গূঢ় অভিসন্ধি খেলা করে।”

আমার মতে এই বই আদ্যন্ত রাজনীতির বই। একইসঙ্গে এটি ফ্যান্টাসি। হয়ত বাস্তব থেকে পলায়ন না, ফ্যান্টাসি আসলে বাস্তবকে ঠেকিয়ে রাখার প্রতিরোধ করার, বাস্তবের সঙ্গে লড়াইয়ের হাতিয়ারও কখনওবা।

পাঠকের মুখোমুখি হচ্ছে সেই কলকাতা যেখানে নকশাল আন্দোলন ঘটে থেমে গিয়েছে, যেখানে বাম আন্দোলন ঘটে গিয়েছিল এবং দীর্ঘকাল বাম জমানার পর সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের ঘটনার মধ্যে দিয়ে পালাবদল হচ্ছে, উঠে আসছে পরিবর্তনের সরকার। চরিত্রেরা শহুরে এবং আজকের দিনের, কিন্তু তাদের চোখ থাকছে সর্বদাই ইতিহাসের দিকে। বিষণ্ণ, ক্রুদ্ধ, বিভ্রান্ত ছেলেদের কথা আসছে। রাজা নামে কেন্দ্রীয় চরিত্রের চোখে দেখা হচ্ছে এক পরিত্যক্ত কারখানা। আমাদের পাঠকচিত্তে তখন উঠবে স্মৃতির, অনুষঙ্গের ঢেউ। আমরা সিঙ্গুরের কথা ভাববই। পরে বোঝা যাচ্ছে সেটা জেশপ। পরিত্যক্ত কারখানার বর্ণনা মায়াময়, ধোঁয়াটে কিন্তু স্পষ্ট। একরকমের স্বপ্ন বুনে ফেলেন এখানে লেখক। এই পর্যন্ত বাস্তবের মাটিতে পা, কিন্তু তারই ভেতর অনেক পরতে উঠে আসছে স্বপ্ন, কল্পনার উপাদান। হেরে যাওয়া মানুষদের আখ্যানও বটে তা।

তারপর ম্যাজিকের আবির্ভাব। জেশপের পরিত্যক্ত কারখানায় প্রাচীন, রাজা রামমোহন রায়ের পোশাকের এক ব্যক্তি আছেন। জানা যাচ্ছে নিজের গোপন দল বানাচ্ছেন। মনে হচ্ছে তিনি উন্মাদ। তারপর উদ্ঘাটিত হচ্ছে এই সত্য, যে, আসলে তিনি সময়যানে থাকেন। একটি আশ্চর্য ঘর আর তার চারটি বারান্দা। যা দিয়ে চারটি ভিন্ন সময়ে চলে যাওয়া যায়। রাজা সুরেন্দ্রমোহন দাশ নামের এক চরিত্রের আমদানি করছেন লেখক।

“অতীত ভবিষ্যৎ বলে আসলে কিছু নেই রে। সব আসলে একসঙ্গে থাকে”, এই ছিল তাঁর কথা।

রাজা নামের চরিত্রটি এঁর কাছে ধরা দেয়। সে বিজ্ঞানের রূপকথায় গিয়ে, বাস্তবের কু-রূপকথাগুলিকে অতিক্রম করতে চায়। সুরেন্দ্রমোহনের প্রোজেক্ট “নেই হয়ে যাওয়ার, সময়ের থেকে হারিয়ে যাওয়ার, জগতের থেকে লুকিয়ে যাওয়ার প্রোজেক্ট।” “কেননা, তুই যত লুকিয়ে থাকবি, তত রক্ষা করতে পারবি তোর সংস্কৃতি, তোর শিকড়, তোর ভাবনাকে।”

এই প্রোজেক্টে ঢোকার পর রাজাকে দেখে মানুষ ভাববে সে ভার্চুয়াল রিয়ালিটিতে ঢুকে গেছে। সে কোনও গেমের মধ্যে ঢুকে গেছে। একইসঙ্গে এই উপন্যাস এবার খেলা করবে এইসব কম্পুটার গেমের মধ্যে, একরকমের সায়েন্স ফিকশনের মধ্যে।

কেননা, লেখকের মতে, আসলে সায়েন্স ফিকশন হল মৃত্যুর প্রতিষেধক। লড়াইয়ের হাতিয়ার।

হিন্দোলের উপন্যাসে আজকের মানুষের চোখে অন্য সময় থেকে আসা লোক হয়ে যায় মাওবাদী। আর যে পৃথিবীর ভালো করতে চায় তাকে কেউ বিশ্বাস করে না। সুরেন্দ্রর লড়াই কিন্তু একটা সময়ের একটা রাষ্ট্রের সঙ্গে না। আধুনিকতার সঙ্গে। শিকড়কে বাঁচিয়ে তুলে তিনি বাংলাকে বাঁচানোর প্রকল্প নিয়েছেন। ইনফরমেশনকে নেই করে দিতে চাইছেন। মানুষকে টেনে নিচ্ছেন ওই যন্ত্রে, অন্য বারান্দায় নিয়ে অন্যভাবে তাদের ট্রেনিং দিয়ে ফেরাতে চাইছেন।

এই পুরো খেলাটা জানতে, বইটা পড়তে হবে। রহস্য গল্পের মত খানিক চলছে হিন্দোলের এ উপন্যাস আবার আসছে সমকালীন রাজনীতি নিয়ে তার টিপ্পনী। সমকালকে দেখার আয়না হিসেবে সে ব্যবহার করেছে এক প্রতিসরিত সময়ের আয়নাকে। যা অন্য অনেকের কাছে গেম, মোমো বা ব্লু ওয়েলের মত।

চিন্তার নতুনত্বের জন্যই যে এ গল্প পাঠককে আটকাকে রাখে, কেবল তা নয়। পাঠক ধরা পড়ে, কারণ আমাদের সমসময়কে আমরা নিজেদের ছোট ছোট দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখার বাইরে অন্য একটা ফুটোস্কোপ দিয়েও দেখি। সেই দেখাটা মূল্যবান হয়ে ওঠে। অমোঘও খানিকটা।

ভেতরে ভেতরে ছোট ছোট কারুকাজ আছে। ছোট ছোট যে খুঁটিয়ে দেখাগুলি। সেগুলি অনন্য। তবে অনেকটা জুড়ে আছে সামান্যীকরণ, দর্শন।

স্পয়লার দেবার কোনও বাসনা নেই, তাই শেষ বললাম না। রহস্যের বাতাবরণে ইতিহাসকে নিয়ে খেলা করার ভেতর দিয়ে হিন্দোলের এ উপন্যাস শেষমেশ আমাদের কোথায় নিয়ে ফেলবে তা জানতে পাঠক নিজেই আসুন এ খেলায়।

অভিযোগ যদি কিছু থাকে তা এইই, যে, বড় বেশি আত্মসচেতন এ লেখা। বারে বারে রেফারেন্স টানতে টানতে যায় আশেপাশের অন্যান্য সাহিত্যের। যথা ফ্যাতাড়ুর রূপকল্পটি বার বার আসে। এই সচেতনতার ভাগটা তিনি পাঠকের জন্য ছাড়তে পারতেন। যোগাযোগ স্থাপনের কাজ তো পাঠকই করে নিতেন। আর যে অংশে সামান্যীকরণ, দর্শন বলা, তা মহৎ। কিন্তু থ্রিলারধর্মী উপন্যাসের সঙ্গে একটু বেমানান। কিছু অংশে আমার মতে তা দীর্ঘ। ধারালো, আরও আক্রামক হতেই পারতেন লেখক এইসব অংশকে ছুরির মত তীক্ষ্ণ আর সংক্ষেপিত রেখে।

এই উপন্যাসকে তাই বলে কেউ কল্পবিজ্ঞানের উপন্যাস বলতে পারবেন না। আবারও বলছি, এর একমাত্র বিবরণ হতে পারে, এটি একটি রাজনৈতিক উপন্যাস। যেখানে বাজার ভরে উঠছে মিথ পুরাণ অলৌকিক এবং এক রাশ কল্পবিজ্ঞান কাহিনিতে, যার ভেতরে দর্শন নেই বলেই তারা পাঠকচিত্তে চিরদিনের আসন নিতে পারছে না, সেখানে হিন্দোল উল্টোমেরুতে আছেন। এবং আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক এই ফ্যান্টাসিটি লিখতে হলে এক ধরণের সাহস, বা, বলা ভালো, সাবভার্শানের দুঃসাহস দরকার। সেই ঝুঁকি নিয়েছেন হিন্দোল।

 

“জীবের সঙ্গে জীব মিলে মিশে যে ডাঙায় জীবনের যৌথতা চালায় সেই চলাচলের ক্ষেত্রই ‘অঞ্চল’। আলাদা এক খণ্ড ভিটেমাটি বলে সে ডাঙাকে যদি চাক্ষুষ চেনা না যায়, তাহলেও। যে কোনও অঞ্চলেরই ন্যূনতম একটা আত্মশক্তি চিহ্নিত সার্বভৌমতার দরকার থাকে।

যেমন ধরুন নারীবাদ যে সম্ভব হচ্ছে তার কারণ, মেয়েরা এই অর্থে একটা অঞ্চল। তাঁরা যে আলাদা কোনও ভূখণ্ডে থাকেন না, পুরুষদের সঙ্গে এক বাড়িতে এক পাড়ায় এক দেশেই থাকেন, সেটা নারী অঞ্চলের সংহতির অন্তরায় নয়। নারী অঞ্চলের স্বাতন্ত্র্য চাওয়া মানে ছেলেদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনও ভূমিতে থাকতে চাওয়ার অলীক কল্পনা নয়। মেয়েদের স্বাভাবিক স্বপ্নের পুরনো দাবিরই পরিস্ফুট রূপ। যে পরিস্ফুটনের ধরনটা অধুনান্তিক পর্বের আঞ্চলিকতার লক্ষণে চিহ্নিত।” (প্রবাল দাশগুপ্তের “অধুনান্তিক এলাকা” প্রবন্ধ থেকে)

সমকালীন রাজনীতি নিয়ে রীতিমত অবসেশনের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল হিন্দোলের উপন্যাস। পরের বইটি সমকালীন আর এক চর্চিত কিন্তু বিক্ষুব্ধ বিষয়কে নিয়ে এসেছে। তা হল নারীর বাস্তবতা। এই সময় একইসঙ্গে নারী শরীরের ওপর নানা স্তরে আক্রমণের সময়। আবার একই সঙ্গে প্রান্তিক কণ্ঠ হিসেবে নারীর আত্মসচেতন দাবি আদায়ের সময়। প্রান্ত থেকে কেন্দ্রের দিকে ধীরে ধীরে প্রবেশের সময়।

সেই সব দাবি আদায়ের সনদের মধ্যে একটি হল এই বইটি। কারিগর প্রকাশনার ঝকঝকে কাজ, হাতে নিতে আনন্দ এমন এক বই। “মেয়েদের চোরাগোপ্তা স্ল্যাং: শরীর এবং অন্যান্য আলাপ”। লেখক তৃপ্তি সান্ত্রা।

তৃপ্তি সান্ত্রা তাঁর গল্প কবিতা উপন্যাস ও মুক্তগদ্য সব দিক দিয়েই আমাদের চোখে পড়েছিলেন বহুদিন থেকেই। এই সময়ে তাঁর মত “অথেনটিক” এবং মাটির কাছাকাছি থাকা লেখক হাতেগোণা। বাজারের কথা মাথায় না রেখে রীতিমত সক্রিয় সমাজকর্মীর আদলে লিখে চলেন তৃপ্তি।

এত কথা বলার কারণ এটাই, যে অনেক সময়ে লেখনবস্তু বা পাঠবস্তুর বাইরে গিয়েও, আমাদের দেখা পেতে হয় এমন কিছু ঘটনার, যা বইটিকে অন্যভাবে মহিমান্বিত করে। এই বইটি লেখার পর, তৃপ্তি সান্ত্রাকে ব্যক্তিগত স্তরে লিখিত আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। মালদা জেলার বাসিন্দা তিনি এবং মালদার এক অগ্রগণ্য লেখক ও মান্য ব্যক্তি খবরের কাগজে তাঁকে নিয়ে একধরনের “ল্যাম্পুন কবিতা” লেখেন, যার বিষয়বস্তু, এই বইটি কতটা অশ্লীল ও কদর্য তার বৃত্তান্ত তুলে ধরা।

যেহেতু বইটি স্ল্যাং বিষয়ক, সুতরাং নিষিদ্ধ, অন্তত মেয়েদের জন্য। শরীর সংক্রান্ত যে কোনও বিষয়ে মেয়েদের মুখ খোলাটাই আজও ট্যাবু বিষয়, নিষিদ্ধ বিষয়। এবং তা নিয়ে মুখ খুললেই আক্রান্ত হতে হবে। এটাই দস্তুর। আবারও তা প্রমাণ হল এই ঘটনাতে। যেখানে, নারীবাস্তবতায় স্ল্যাং যে নতুন কিছু নয়, মেয়েরা নিজেদের মধ্যে যে শরীর সম্পর্কিত নানা কথা ব্যবহার করেই থাকেন, এবং চোরাগোপ্তাভাবে তা তৈরি করে মূলধারার পুরুষ পরিচালিত স্ল্যাং-দুনিয়ার বিরুদ্ধে একধরনের সাবভার্শান, তারই প্রমাণ এই তীব্র তীক্ষ্ণ প্রতিক্রিয়া।

আমরা প্রায়ই বলে থাকি যে, যে কোনও মেয়েই যখন কাগজের বুকে প্রথম কলমটি ছোঁয়াচ্ছেন তখনই তা একটি “অ্যাক্ট অফ প্রোটেস্ট” বা প্রতিবাদী ক্রিয়া। তা এক রাজনৈতিক ক্রিয়া। এই রাজনীতির বাইরে স্ল্যাং ত নয়ই, প্রচন্ড বেশিভাবেই শরীর-রাজনীতির ক্ষেত্র এটি। তাই একা অরক্ষিত এক মহিলা লেখক সেই ব্যূহে প্রবেশ করলে তাঁকে তো আক্রান্ত হতে হবেই।

চোরাগোপ্তা, পুস্তকশীর্ষে ব্যবহৃত এই শব্দবন্ধটি এখানে লক্ষ করে দেখতে বলব পাঠককে। কী অনায়াসে কতটা বড় একটা এলাকাকে বুঝিয়ে দিলেন তৃপ্তি এই নামকরণে। প্রথম ব্লার্বে লেখা হল, মেয়েরা কি স্ল্যাং বলেন? গালি দিয়ে মন খালি করে তারা কি মেতে উঠতে পারেন জীবন রঙ্গে?

তারপর বলা হল, সমাজের নানা স্তরে প্রবহমান নারীসত্তার মুখের ভাষা, অন্তরের স্বর, প্রকাশের স্বচ্ছল গতি আর শব্দনির্বাচনের অনিবার্যতা নিয়ে লেখিকার স্ল্যাংভাষা আর শরীরী শব্দজগতের পরিক্রমা বহুদিন ধরেই।

এগুলি প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত নিবন্ধের সমষ্টি, এটুকু বললে এই বই সম্পর্কে কিছুই বলা হয় না।

বইটি, আমার মতে, যেন এক জার্নি, এক ভ্রমণ। নানা ঘাট আঘাটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে এক আত্মজৈবনিক সফর যা আসলে সব মেয়ের। সহকর্মী সহযাত্রিণী, গৃহসহায়িকা শিখা চায়না উমা… কত যে আশ্চর্য মানুষ জমা দিয়েছেন তাঁদের অভিজ্ঞতা এই বইতে। চিরকুট থেকে সেমিনার, বাসযাত্রা থেকে বাজারের মেঠো হেটো পথ। সর্বত্র কুড়িয়েছেন শব্দ আর শব্দসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা তৃপ্তি। তাই তাঁর প্রতিটি নিবন্ধের নামকরণও আশ্চর্য, সঙ্কেত ভাষা, অনার্যজনোচিত, নতুন পৃথিবী পুরনো পাঠক্রম, নতুন পৃথিবী নতুন পাঠক্রম, আমার যোনিগ্রাম, ভি ডে, মেয়েরা হল দেশলাই বাক্স, নীচের তলা, হেটোকথা, মেঠোগান এইসব এক একটি নিবন্ধশীর্ষ এই বইয়ের। একটি মেয়ের মুখে “আপনার মুখ তো নয় পোঁদ” বা “হেগে বড়া ভাজছি”, এইধরনের ব্যবহার ও তার বিশদ ব্যাখ্যা আমাদের মত ডেটলে ধোয়া ফিনাইলে চোবানো পাঠক অন্তরে প্রাথমিক অস্বস্তি তৈরি করে। তারপর বেড়া ভেঙে যায়। অসংখ্য ভাষা এবং তার মান্য ভাষ্য তৈরি হয়। করে তোলেন সংগ্রহকারী। যে চোখটি দিয়ে তিনি এই কাজটি করেছেন, যে চোখে তিনি মেয়েদের দেখেছেন তা অনন্য, মানবিক, এবং শেষত, সহানুভূতি, সমানুভূতি ও প্রেমের চোখ। তাই এই বই আসলে মানুষের কথার বই।

অসম্ভব রিলেট করতে পারি, একাত্মতা অনুভব করি যখন ইভ এন্সলারের ভ্যাজাইনা মোনোলগ নিয়ে তৃপ্তির প্রথম পাঠ অভিজ্ঞতার কথা জানি। মনে পড়ে যায় আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা এই নাটকটি দেখার, শিকাগো শহরে। কনটেন্টের তীব্রতায় উঠে চলে গিয়েছিলেন চোখের সামনে এক বয়স্ক সুভদ্র শ্বেতাঙ্গ দম্পতি। এখনও আমেরিকাতেও কতটা ট্যাবু বিষয় এটি। সেই অভিনয় প্রথম দেখার আঠারো বছর পরে নিজের আঠারো পেরোনো মেয়েকে নিয়ে দেখি। প্রায় কেঁদে ফেলি আমি ও আমার মেয়ে । ততদিনে ঘটে গিয়েছে নির্ভয়া কাণ্ড। আরও কত যে ধর্ষণ।

তৃপ্তিদির ভাষ্যে “নীচের তলা” সংক্রান্ত উল্লেখে মনে পড়ে যায় আমার কন্যা জন্মের পরবর্তী হাসপাতাল বাসের অভিজ্ঞতা, যখন আয়াদের নিজেদের হাসাহাসি কথোপকথন টুকে রেখেছিলাম মনে মনে। যারা বলেছিল, দোতলায় নতুন ভাড়াটে এল, জামাইবাবুর একতলায় ঢোকা বন্ধ কিছুদিন।

এইসব “নিষিদ্ধ” কথোপকথনের জাল বুনে বুনে তৃপ্তি উপহার দিয়েছেন তাঁর বহু বহুদিনের কাজ, প্রোজেক্ট। এসেছে নানা কথা, নানা ফরম্যাট। কখনও ওয়ার্কশপের অভিজ্ঞতা তো কখনও এক সারি সাক্ষাৎকার। বাজারে হাটে রাস্তা ঘাটে শুনতে পাওয়া নানা ইঙ্গিত আকার বাচন প্রবচন … এ এক দীর্ঘ সংগ্রহ প্রক্রিয়া।

নীট ফল যে সংগ্রহশালা, তা অনন্য। এবং আবারও বলছি, বিস্ফোরক। বাংলায় এরকম কাজ হয়নি আর।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1925 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...