ভারতীয় গণতন্ত্রে এখন বলীয়ানের জয়

সায়েলাশ্রী শঙ্কর

 

তর্জমা: সত্যব্রত ঘোষ

গণতন্ত্র নিয়ে আমরা ভারতে যেভাবে এতকাল ভেবে এসেছি, তা এখন বদলেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে উদারমনস্কতাকে মিশিয়ে আমাদের যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, তার কোনও বাস্তব ভিত্তি আজ আর নেই। ২০১৭ সালের Pew Global Attitudes Survey-এর রিপোর্ট বলছে পঞ্চান্ন শতাংশ ভারতীয় মনে করেন দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এমন এক জবরদস্ত নেতার প্রয়োজন যিনি সংসদ বা আদালতের তোয়াক্কা না করে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। তিপ্পান্ন শতাংশ ভারতীয় মনে করেন সামরিক শাসন কার্যকর করলে দেশের উন্নতি হবে। সার্ভেটিতে অংশগ্রহণকারী বেশিরভাগ উত্তরদাতাই চান বিশেষজ্ঞ (technocrat)-রাই দেশ শাসন করুক।

থমকালেন তো? ভাবুন তো, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল গণতান্ত্রিক এই দেশটিতে অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি এমন জোরালো সমর্থন কী করে তৈরি হতে পারে? এবার প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র সম্পর্কে যতটুকু অভিজ্ঞতা আপনার হয়েছে, তার ভিত্তিতে নিজেকেই জিজ্ঞাসা করুন, কেন ভারতীয়রা চাইছেন দেশের মূল সমস্যাগুলি নিয়ে তাঁদেরও মতামত নেওয়া হোক, যার ভিত্তিতে পরবর্তীকালে নতুন আইন হবে। অথচ নিরীক্ষাটির রিপোর্ট অনুযায়ী ছিয়াত্তর শতাংশ ভারতীয়ই এখনও প্রতিনিধিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আস্থা রেখেছেন। এবার এই পরস্পরবিরোধী তথ্যের সঙ্গে ব্রিটেন এবং আমেরিকার সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল তুলনা করে দেখুন। ঐ দুই দেশেই প্রতিনিধিমূলক গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের যতটা সমর্থন আছে, ততটা কিন্তু স্বৈরাচারী শাসনের প্রতি নেই। সেক্ষেত্রে, গণতন্ত্রের প্রতি সাধারণ ভারতীয়দের মানসিকতা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে, কারণ রিপোর্টটিতে দেখা যাচ্ছে পঞ্চাশ শতাংশের বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের পাশাপাশি স্বৈরাচারী শাসনকেও শ্রেয় মনে করছেন।

কী ঘটছে ভারতে? How Democracies Die বইটিতে স্টিভেন লেভিটস্কি এবং ড্যানিয়েল জিব্ল্যাট বলছেন নির্বাচনে স্বৈরাচারী কোনও নেতা জিতলে যেভাবে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিরোধীদের দমন করা হয়, তাতে গণতন্ত্র একটু একটু করে মরতে থাকে। সিদ্ধান্তটির সঙ্গে ডেভিড রুঞ্চিম্যান-এর চিন্তার বেশ মিল পাওয়া যায়। How Democracy Ends বইটিতে তিনি বলছেন, রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপকরা নিজেদের শাসনক্ষমতার জোরে উদার গণতন্ত্রকে তাচ্ছিল্য করলে সামরিক ক্যু-এর প্রয়োজন ফুরোবে। তেমনই এক ঝাড়াই-বাছাই পর্ব ভারতে ইতিমধ্যে ঘটেছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাভোগীরা নিজেদের হাতে সর্বময় কতৃত্ব নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছেন। রাজ্যগুলির থেকে কেড়ে নিয়েছেন স্বশাসনের ভার। এবং দেশের সুরক্ষাযন্ত্রগুলিকে ব্যবহার করেছেন তাঁদেরই বিরুদ্ধে যারা রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজের সচেতন সদস্য হিসেবে শাসকদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

কিন্তু ভারতে গণতন্ত্র কি একটু একটু করে মরছে? নাকি অন্য কোনও খেলা চলছে? Pew Survey-তে যে আপাত-বিরোধী মতামতগুলি উঠে আসছে তাতে একটা কথা স্পষ্ট। ভারতীয়রা মোদ্দা এই প্রশ্নটি তুলছেন যে গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ হিসেবে কেন সর্বজনীন মানবাধিকার মান্য হবে? শুধু ভারতেই নয়, বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষরাও সার্বজনীন মানবাধিকারকে তাঁদের স্থানীয় তথা জাতীয় সুরক্ষা ও সমৃদ্ধির পরিপন্থী মনে করছেন (যেমন পরিযায়ী মানুষ ও শরণার্থীদের আশ্রয়দান) এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা ও সমৃদ্ধিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

২০১৯-এর আগস্ট মাসে কাশ্মির নিয়ে মোদি সরকার যে অভূতপূর্ব পদক্ষেপটি নিয়েছে তা থেকে বোঝা যায় অধিকাংশ ভারতীয় উদারমনস্ক মূল্যবোধ এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আর একই পথের শরিক বলে মনে করছেন না। ৩৭০ ধারা অপসারণের মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মির রাজ্যটিকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করবার আগে মোদি সরকার বিরোধী দলগুলিকে কিছু না জানিয়ে সংসদে বিনা আলোচনায় দুদিনের মধ্যে নতুন বিল পাশ করিয়ে নেয়। তার চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ হল, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত কাশ্মিরি নেতাদের গৃহবন্দি করে ৩৫,০০০ সৈন্য পাঠিয়ে সমগ্র এলাকায় ইন্টারনেট এবং মোবাইল পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হল। তা জানতে পেরে সারা দেশ উচ্ছসিত। অথচ কাশ্মির উপত্যকাবাসী নীরব। মানবাধিকার হরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ ভারতবাসী সেই প্রশ্নে নির্বিকার। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ২০১৯-এর মার্চ মাসে Pew Survey-র রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে যে কাশ্মিরের প্রসঙ্গ উঠলেই পঞ্চান্ন শতাংশ ভারতীয় সেটিকে একটি জটিল জাতীয় সমস্যা বলে চিহ্নিত করেছেন। এদের মধ্যে আটান্ন শতাংশের ধারণা কাশ্মিরে সেনা মোতায়েন করেই ভারত সরকার সমস্যাটির সমাধান করতে পারবে। অর্থাৎ, এই রিপোর্টটির ভিত্তিতে বলা যায় যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষ মনে করছেন দেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করবার জন্য ভারতের উত্তর দিকে একটি জমাট সীমান্ত বানাতে হবে। এবং কাশ্মিরে এই সাময়িক নাগরিক স্বাধীনতা হরণকে তার মূল্য হিসেবে ধরলে তুলনায় তা কিছুই নয়।

উদারমনস্কতার মূল্যবোধ এবং অধিকারগুলি থেকে গণতন্ত্রকে আলাদা করবার ধারণাটি যথেষ্ট পুরনো। রাজনৈতিক দর্শনের এক প্রবক্তা যোসিয়া ওবের তাঁর Demopolis: Democracy Before Liberalism in Theory and Practice বইটিতে বলছেন রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণাটি নির্মাণ করবার অনেক আগে থেকেই মৌলিক গণতন্ত্রের অস্তিত্ব ছিল। এমনকি নীতিশাস্ত্রকারেরা যখন অধিকারকে স্বাভাবিক এবং মানবিক এক শর্ত হিসেবে পরিভাষিত করেন, স্বশাসনের জন্য বিচারব্যবস্থার বিতরণ আবশ্যিক— এমন নৈতিকতার ধারণার জন্ম দেন এবং ধর্মীয় বহুত্ববাদকে নিরপেক্ষ সাংবিধানিক আইন হিসেবে দেখতে শুরু করেন, তার আগেও গণতন্ত্র ছিল। ওবের বলছেন সমকালীন উদারবাদের তত্ত্ব এবং প্রজাতান্ত্রিক ধারণাগুলিকে সরিয়ে রেখেও একটি সুনিশ্চিত এবং সমৃদ্ধ সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করা সম্ভব। সুঠাম গ্রিক পরিভাষা অনুযায়ী ‘গণতন্ত্র হল ভিন্ন ধর্মীয় নাগরিকদের একটি অঙ্গ (body) দ্বারা স্বশাসনের জন্য স্থাপিত এক সমষ্টিগত ব্যবস্থা যা সেই সাংবিধানিক আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত যার প্রণয়ন করেছেন সেই নাগরিকরা নিজেই।’ অর্থাৎ, গণতন্ত্রের স্বাদ আপনি তখনই পাবেন যখন মানুষেরা উদারতার নৈতিক দাবি নিয়ে আপনার বক্তব্যে আপত্তি জানাচ্ছেন (যেমন, ধর্মের বিষয়ে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা নিয়ে আপনি কী ভাবেন)। মৌলিক গণতন্ত্রে এমনটাই হয়। নির্দিষ্ট একটি মূল্যবোধের প্রতি দায়বদ্ধ না থেকে একটি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজা।

মৌলিক গণতন্ত্রে যে প্রশ্নগুলি বারবার উঠে আসে তা হল: স্বৈরাচারী নয় এমন সরকার কী উপায়ে সৃষ্টি করা যায়? সেই প্রয়াস কেন জরুরি? কর্তৃত্বের রাশ রাজা বা অভিজাত শ্রেণির কুক্ষিগত না রেখে কেন তা সাধারণ মানুষের হাতে দেওয়া হবে? একটি জটিল সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ কেমনভাবে দক্ষতার সঙ্গে কর্তৃত্ব সামলাবে? মৌলিক গণতন্ত্রে ক্ষমতা এবং স্বার্থের সম্পর্কগুলিকে সংগঠিত করা হয় যাতে সাধারণ নাগরিকবৃন্দ স্বৈরাচারীর প্রতি সমর্থন না জানিয়েও নিজেদের সম্মান বজায় রেখে সুরক্ষা এবং সমৃদ্ধিতে মন দিতে পারেন। নাগরিক সম্মান বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে আপনি আপনার সহ-নাগরিকদেরও নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন এবং তাঁদেরকে নাগরিক হিসেবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের যোগ্য বলে মান্যতা দেবেন। ওবের-এর মতে এগুলি গণতন্ত্রের শর্তবিশেষ, মূল্যবোধ নয়। তিনি একথাও বলতে ভোলেননি যে শর্তগুলির মধ্যে উপস্থিত উপাদানগুলিকে উদারপন্থীরা অধিকার হিসেবেই রক্ষা করে এসেছেন।

ওবের যে কাঠামোটি দিয়েছেন তাতে মৌলিক গণতন্ত্রে স্বৈরাচার, অন্তর্নিহিত মানবাধিকার বা বিতরণযোগ্য বিচারব্যবস্থার বিষয়ে নাগরিকেরা আলাদা করে আগ্রহ প্রকাশ করেন না। উদারপন্থা অবশ্য এগুলিকে প্রাথমিক দায়বদ্ধতা বলে মেনে এসেছেন। ধর্মনিরপেক্ষতার ভাবনা নস্যাৎ করেও মৌলিক গণতন্ত্রে কথা প্রচার করা যেতে পারে। বিচারব্যবস্থার বিতরণকে অগ্রাহ্য করেও মানুষ নিজেকে নাগরিক বলতে পারেন। কিন্তু তাঁরা স্বৈরাচারকে কিছুতেই সমর্থন করবেন না— যতই ক্ষমতাশালী নেতা হোক বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোর থাকুক। অস্বৈরাচারী বলতে কোনও বিশেষ ব্যক্তি বা দলকে বোঝানো হয় যে বা যারা একচেটিয়া রাজনৈতিক কর্তৃত্ব চালাতে পারবে না। এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগের জন্য সেই শাসনব্যবস্থায় ক্রমোচ্চ শ্রেণিবিভাগ (hierarchy) থাকবে না।

ভারতে Pew Survey-তে অংশগ্রহণকারীরা উপরিউক্ত প্রশ্নগুলিকে এভাবেও ব্যাখা করতে পারতেন: ভারতীয় নাগরিকবৃন্দ কেমনভাবে দক্ষতার সঙ্গে কর্তৃত্ব সামলে নিজেদের নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারেন? একজন ক্ষমতাবান নেতা, প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র, প্রতিনিধিমূলক গণতন্ত্র, এমনকি বিশেষজ্ঞ দ্বারা রাষ্ট্রশাসনে যারা বিশ্বাসী তাঁদের উত্তরগুলিতে সেক্ষেত্রে বৈপরীত্য পাওয়া যেত না। ক্ষমতাবান নেতার প্রতি আস্থা থাকা মানেই যে তা স্বৈরাচারকে সমর্থন, তা নয়। সেই ক্ষমতাবান নেতাকে মানুষই সরিয়ে দেবেন যখন সে স্বৈরাচারীতে পরিণত হবে। আমরা ভারতে তা কয়েক দশক আগে ঘটতে দেখেছি। যখন ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধি জনমতের দ্বারা অপসারিত হলেন দুই বছর জরুরি অবস্থা জারি রাখবার পর। সামরিক শাসনে সমর্থন করাটাও সেক্ষেত্রে সমীচীন যেখানে অধিকাংশ মানুষ মেনে নিচ্ছেন যে রাষ্ট্রচালিত সংস্থাদের মধ্যে আদালতগুলির পর সামরিক বাহিনীর প্রতিও সর্বোচ্চ আস্থা কার্যকরীরূপে রাখা সম্ভব। আজিম প্রেমজি-লোকনীতি ২০১৮ সার্ভেটিতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সাতাত্তর শতাংশ মানুষ সামরিক বাহিনীর প্রতি সর্বোচ্চ আস্থা দেখিয়েছিলেন। যার পরে চুয়ান্ন শতাংশ মানুষ সুপ্রিম কোর্টের প্রতি এবং আটচল্লিশ শতাংশ মানুষ হাইকোর্টের প্রতি।

কিন্তু কাশ্মিরের ক্ষেত্রে মোদি সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে ভারতের অন্যান্য নাগরিকরা কি মৌলিক গণতন্ত্রের নজর দিয়ে দেখছেন? তর্কে কেউ বলতেই পারেন, মোদি সরকার এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয়দের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন কারণ অধিকাংশ ভারতীয়ই চেয়েছিলেন একটি মজবুত এবং সুরক্ষিত দেশ যার সীমারেখা নিশ্ছিদ্র এবং সন্দেহের উর্ধে। কিন্তু মোদি সরকারের এই কাজটিতে সমর্থন করাটা কি মৌলিক গণতন্ত্রের পরীক্ষায় ব্যর্থ হয় না যখন অস্বৈরাচারী নেতৃত্ব এবং নাগরিক সম্মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে? এর উত্তরটা এমনটাও হতে পারত: অধিকাংশ মানুষই যথাযথ মূল্যে অস্বৈরাচারী নেতৃত্ব চান। সেক্ষেত্রে ইন্টারনেট এবং অন্যান্য সংযোগব্যবস্থা বন্ধ করে কাশ্মিরিদের যে নাগরিক স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তা কি যথাযথ মূল্য? কাশ্মিরিদের জনপ্রতিনিধিদের যে বন্দি করা হয়েছে এবং প্রতিবাদ সভা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তা কি কাশ্মিরিদের নাগরিক সম্মানের পরিপন্থী নয়? কাশ্মিরিরা কি আর্থিক সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তার স্বার্থে এই সাময়িক বন্দিত্ব মেনে নেবেন? উত্তর দেওয়ার জন্য প্রশ্নগুলি শক্ত কিনা তা নির্ভর করবে আপনার আদর্শগত প্রবণতার উপর। এই বন্দিদশা দ্রুত তুলে নিয়ে কাশ্মিরিদের আশা-আকাঙ্খার মর্যাদা দেওয়ার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আপনি কতদূর আস্থা রাখতে পারেন, তার উপরও।

মৌলিক গণতন্ত্রে একে অপরের প্রতি নাগরিক সম্মান বজায় রাখবার কাজটি দুরুহ। শুধু কাশ্মিরে নয়, ভারতের অন্য অংশেও। এর তিনটি কারণ: জ্ঞানভিত্তিক (cognitive), প্রাযুক্তিক (technological) এবং রাজনৈতিক (political)।

নোবেল জয়ী আচরণভিত্তিক অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল কাহনেম্যান Thinking Fast and Slow বইটিতে বলছেন আমরা দুভাবে সমস্যার সমাধান করি। প্রথম সিস্টেমটি হল ভাবনা— যা আবেগনির্ভর, অনুভূতিপ্রধান, দ্রুত এবং তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশ্বাসী। যেমন বাঘ— বিপদ— দৌড়াও। অথবা ২+২=৬। মানুষের মধ্যে এমন অনুভূতিসর্বস্ব প্রবণতাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাজ করে। দ্বিতীয় সিস্টেমটি হল শ্লথ, চিন্তাপ্রধান, বিশ্লেষণে বিশ্বাসী এবং যুক্তিনির্ভর। এতে সমস্যা সমাধানে শুধু সামনে যে উপাদানগুলি আছে, তার বিশেষ গুরুত্ব নেই। এই দুটি ব্যবস্থা কেমন কাটাকুটি খেলে তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্যারি স্টোকার, কলিন হে এবং ম্যাথ্যু বার বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন। একটি বিশেষ দল (focus group)-কে গণতান্ত্রিক রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করতে বলা হয়। দ্রুত ভাবতে বললে অংশগ্রহণকারীরা রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারা ধোঁকা খাওয়ার কথা বলছেন। কিন্তু ধীরেসুস্থে ভাববার জন্য তাঁদের প্রশ্ন করা হয়, গণতন্ত্র কেমনভাবে নাগরিককে (বা নাগরিকদের সমষ্টিকে) এইধরনের বিশ্বাসঘাতকতা প্রতিহত করতে সাহায্যে আসতে পারে। নাগরিক সম্মান বজায় রাখবার জন্য দ্বিতীয় পদ্ধতিটি গ্রহণ করা প্রয়োজন, বিশেষ করে আমরা যখন এমন কিছু মতবাদ, মতবাদের ভিত্তি এবং তা বেছে নেওয়ার কথা শুনব যা আমাদের ভাবনার থেকে আলাদা। যে প্রমাণ এবং যুক্তি আমাদের সামনে পেশ করা হচ্ছে, তা প্রতিহত করবার জন্য আমাদের নিজস্ব যুক্তিনির্ভর মনকে ব্যবহার করা প্রয়োজন, যার সাহায্যে আমরা অন্য পক্ষের অবস্থান বুঝতে পারি। কিন্তু সেক্ষেত্রে সমস্যা আছে।

এই সূত্রে দ্বিতীয় কারণটিতে আসা যাক। অর্থাৎ প্রাযুক্তিক। কেন অন্যদের নাগরিক সম্মান প্রদর্শন আমাদের এত কঠিন মনে হয়? ছয়ের দশকে ক্যানাডিয়ান দার্শনিক মার্শাল ম্যাকলুহান বলেছিলেন মাধ্যমই ‘বস্তুনিরপেক্ষতা’ নির্ধারণ করে। লেখ্য শব্দ পঠন। তার ফলাফল সাক্ষর ব্যক্তিটি শান্ত, ঠান্ডা মাথার এক যুক্তিবোধসম্পন্ন। তিনি তাঁর চারপাশটিকে নিজের মতো করে সাজিয়ে সযত্নে বিশ্লেষণ করবেন। লেখ্য শব্দের যে মাধ্যমটির দ্বারা তিনি তথ্য আহরণ করেছেন, সেই মাধ্যমটি নিয়ে ভাববেন। কিন্তু এর উল্টো ছবি আমরা দেখব যখন কেউ বৈদ্যুতিন (electronic) মাধ্যম দ্বারা তথ্য আহরণ করছেন। টেলিভিশন এবং ইন্টারনেট মূলত শ্রবণনির্ভর এবং বৈদ্যুতিন মাধ্যমে যে মানুষকে দেখা যায় তাঁর আবেগ আছে, কথা শোনাতে পারেন এবং মনে হয় মানুষটিকে যেন ছুঁয়ে আছি। শ্রুতি এবং দৃশ্যনির্ভর হওয়ার ফলে ইন্টারনেট সঞ্চালিত মাধ্যমগুলি আমাদের আবেগকে অনেকটা ছুঁতে পারে বটে, তবে আমাদের যুক্তিবোধকে ততটা নয়। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য টুইটার একটি উপযুক্ত উদাহরণ, কারণ এই মাধ্যমে আমরা যা প্রকাশ করি তা আমাদের আবেগের পরিসর থেকেই উৎসারিত, অর্থাৎ উপরিউক্ত প্রথম সিস্টেমটির সাহায্যে। জ্যামি বার্টেন তাঁর People Vs Tech: How the Internet Is Killing Democracy (And How We Save It)-এ বলছেন যে ইন্টারনেট ছোট ছোট গোষ্ঠী সৃষ্টি করে গণতন্ত্রকে ক্রমশ মেরে ফেলছে এবং অন্যদের সঙ্গে আমাদের সংযোগকে বন্ধু-শত্রু-র বাইনারিতে পরিণত করেছে। ব্যবহারকারীরা সামাজিক নিয়ম ও নীতিগুলিকে অগ্রাহ্য করতে পারেন কারণ তাঁরা যে ব্যক্তিদের সঙ্গে ‘চ্যাটিং’ করছেন বহু ক্ষেত্রেই তাঁদের চেনেন না বা সাক্ষাৎ পরিচয় নেই। এর ফলে উপরিউক্ত প্রথম সিস্টেমটির কার্যক্ষমতা দ্রুততর হয়। আমরা আগে সিদ্ধান্তে পোঁছাই এবং তারপরে পিছনে ফিরে প্রমাণ খুঁজি।

প্রযুক্তির এই প্রভাবের সূত্রেই আমরা তৃতীয় কারণটিতে পৌঁছে যেতে পারি যা নাগরিক সম্মান অর্জনে আমাদের বাধা দিচ্ছে। সেই কারণটি হল সারা পৃথিবী জুড়ে লোকানুপ্রিয়তা (populism) ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ইয়ান ওয়ের্নার মুলার লোকানুপ্রিয়তার পরিভাষা নির্ণয় করে বলছেন এটি একগুচ্ছ খেয়ালখুশি দ্বারা চালিত। “লোকানুপ্রিয়তা একটি বিশেষ ধরনের নৈতিক কল্পনার নির্মাণ। এর দ্বারা রাজনৈতিক জগতটিকে এমন কিছু একতাবদ্ধ মানুষের সমষ্টি বলে মনে হয় (কিন্তু ওয়ের্নার-এর মতে সেই মনে হওয়ার কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই) যারা অভিজাতদের বিরুদ্ধে লড়ছে এই ধারণা নিয়ে যে হয় তাঁরা দুর্নীতিগ্রস্ত নয়তো কোনও না কোনওভাবে নীতিগত দিক থেকে ইতর।” লোকানুপ্রিয়তার সমর্থক বহুত্ববাদকে মানতে পারে না (অন্যের মতবাদগুলিকে সে অশ্রদ্ধা করবেই) এবং একটি নীতিকে সঠিক ধরে নিয়ে তার ভিত্তিতে সে জনহিতের লক্ষ্যে জোর দেবে (অন্যান্য নীতিগুলিকে চ্যালেঞ্জ করে)। প্রতিনিধিমূলক গণতন্ত্রে তার আস্থা নেই কারণ সে নিজেকেই ‘জনগণ’ হিসেবে দেখছে। ইয়াসচা মউঙ্ক তাঁর The People vs Democracy: Why Our Freedom Is in Danger and How to Save It-এ বলছেন প্রযুক্তিতন্ত্র (technocracy)-র পাশাপাশি কুলীনতন্ত্র (oligarchy)-র প্রতি উত্তরোত্তর নির্ভরতার জন্য সাধারণ ভোটারদের উপর প্রভাব কমতে থাকায় নেতারা লোকানুপ্রিয়তার পথে হেঁটেছেন। লোকানুপ্রিয়তায় বিশ্বাসীরা মানুষের আবেগে প্রভাব বিস্তার করে প্রথম সিস্টেম-এ সমর্থন আদায় করেন। সর্বক্ষণ যদি আমাদের আবেগে সুড়সুড়ি দিয়ে সক্রিয় রাখা হয় তাহলে আমরা কীভাবে অন্যদের নাগরিক সম্মানকে গুরুত্ব দেব?

সোশ্যাল মিডিয়া এবং লোকানুপ্রিয় কথায় মোহিত হয়ে আমাদের সময় কাটাবার পরিণাম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মেরুকরণকে সংগঠিত হতে দেখা যাচ্ছে। মেরুকৃত সেই শক্তিগুলিই আমাদের ভিন্ন দৃষ্টিকোণগুলিকে পরিচালিত করে জানিয়ে দিচ্ছে ভারতবর্ষ বললে ঠিক কোন ছবিটা আমাদের চোখের সামনে ভাসবে। সেই ভারতে সবাই থাকবে (inclusive) না বিশেষ কিছু শ্রেণি বাদ যাবে (exclusive)? সংখ্যালঘুদের কি নাগরিক হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে, না ইতিহাসের বোঝাস্বরূপ তাঁদের দাবিয়ে রাখা হবে? ভারতীয় হিসেবে আমরা কি রাষ্ট্র বিষয়ে আলাদা ধারণা পোষণ করতে পারি, না হিন্দুরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবেই নিজেদের মেনে নিতে হবে? সম্প্রতি অসমে যে নাগরিকত্ব প্রমাণের প্রক্রিয়া আমরা দেখলাম, তা এক অশুভ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করছেন যে অবৈধ অভিবাসীদের তিনি দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবেন। কিন্তু বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান থেকে যে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং শিখ শরণার্থীরা এসেছেন বা আসবেন, তাঁদের ক্ষেত্রে সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি হবে এটাই যে তাঁরা তাঁদের ‘স্বাভাবিক গৃহে’ ফিরে এলেন।

ভ্যারাইটিস অফ ডেমোক্রেসি-র একটি নিরীক্ষায় ২০০৪ থেকে ২০১৭-র সময়সীমায় ভারতের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কতটা কার্যায়িত হল, তার পরিমাণগত দিকটি তুলে ধরা হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে সচেতন রাজনীতির উপায় হিসেবে গণতন্ত্রকে সবার কাছে পৌঁছে দিয়ে সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানোর সূচকে ক্রমিক অবনতি ঘটেছে। লেভিটস্কি এবং জিব্ল্যাট তাঁদের বইতে বলছেন সমকালীন গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিপদ নিয়মের ক্ষয়। উদারপন্থীরা যে লোকানুপ্রিয় কথাবার্তাকে অসংলগ্ন ভাষণ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন তা ভুল। এভাবে তাচ্ছিল্য করে তাঁরা সেই লোকানুপ্রিয়তার সমর্থনকারীদের নাগরিক হিসেবে সম্মান দিচ্ছেন না কারণ মানুষগুলি বিশেষ কিছু ধারণা পোষণ করেন। মুলার-এর কথা অনুযায়ী, আমরা যদি নাগরিক সম্মানে আস্থা রাখি তাহলে যুক্তিবোধের ব্যবহারকে মৌলিক গণতন্ত্র পালনের একটি কর্তব্য হিসেবে ভাবতে হবে। আমরা কোনওভাবেই সেইসব মানুষদের আবেগ-নির্ভর ভাবনার প্রকাশকে পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিতে পারি না। সেক্ষেত্রে আমরা লোকানুপ্রিয় নেতাদের মতো বহুত্ববাদ-বিরোধী হয়ে বহুত্ববাদকেই দুর্বল করে দিচ্ছি। থুক্কিডাইটিস সেই কবে বলেছিলেন, কাজ করবার জন্য আলোচনা বাধা নয়, বরং কাজ করবার পূর্বশর্ত হিসেবে আলোচনা আবশ্যিক।

তাহলে, আমরা কোন দিকে যাচ্ছি? পলকা হিমবাহের উপর দাঁড়িয়ে এখন আমরা ভেসে চলেছি এমন এক সঙ্কটের দিকে যেখানে কথা বলতে সাহসের প্রয়োজন এবং নীরব থাকলে অথবা নিজের বক্তব্য কাটাই-ছাঁটাই করে বললে যে ভারত (বা ভারতগুলি)-কে আমরা আপন করে দেখছি, তার তন্তুগুলি ছিঁড়ে-ফেটে যাবে। ভারতীয় হিসেবে আমরা যদি অস্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা, সুরক্ষা এবং বস্তুগত কল্যাণ— মৌলিক গণতন্ত্রের এই তিন নীতিকে আঁকড়ে নাগরিক সম্মানকে গ্রাহ্য করি, তবেই ভারতবর্ষ সম্পর্কিত আমাদের ভিন্নমতের ধারণাগুলি বেঁচে থাকবে ও স্বৈরাচারীর শাসনকে ঠেকাবে।

 

লেখক দিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ-এর সিনিয়র ফেলো।
মূল লেখার লিঙ্ক: https://openthemagazine.com/columns/column/the-shifting-attitudes-of-indian-democracy/

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...