মৃত পাখিদের গান — ৯ম পর্ব

অবিন সেন

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

চোদ্দ

“সেই যে সেই অন্ধকার মাঠের পরে মাঠ
সেই যে সেই ভোরবেলার ক্ষেতের পরে ক্ষেত
ক্ষেত পেরিয়ে ঝোপের পাশে হাঁটা পায়ের নদী
নদীর পাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রেত…”

সমস্ত হাওয়া কেমন এলোমেলো আর ভ্রান্ত হয়ে গিয়েছে। শ্বাস টানলে মনে হয় এক অশান্ত হাহাকার বাতাসের রূপ ধরে, বুকের ভিতরে প্রবেশ করে। একটা দম বন্ধকরা অনুভূতি, সারা দিন তাকে ছুটিয়ে মারে। এর থেকে ছুটি কবে? “কবে?” সে চিৎকার করে বিছানায় উঠে বসে। সারা গা তার ঘামে ভিজে উঠে নিভৃত পাখির মৃত কান্নার মতো তাকে বিছানায় বসিয়ে রাখে। ডরোথি পাশে শুয়ে থেকে এই সব কিছুই টের পায় না। কেন পায় না? পেলে কি ভালো হত? ভেবে ভেবে ডরোথির আধো নগ্ন শরীরের দিকে তাকায় সে। আধো অন্ধকারে ডরোথির শরীর শ্যাওলা ধরা স্যাঁতস্যাঁতে দেওয়ালের মতো মনে হয়। ঘামের গন্ধের ভিতর কামের গন্ধ মিশে গিয়ে ব্যর্থ মূর্ছনার মতো ঘরের বাতাসে ভারি হয়ে থাকে। আহা কী ভার! আহা কী বিষাদ, সাপের বিষের মতো ক্রমশ তাকে নিঝুম থেকে নিঝুমতর এক বিকারের কাছে এসে দাঁড় করায়। কিন্তু সে কি দাঁড়িয়ে থাকতে পারে? মাঝে মাঝে খুব অবসন্ন লাগে বলে সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না! বসে থাকে? না! তাও সে পারে না, এক মাতৃ জঠরের মতো গভীর অন্ধকার তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়! তবে কি সে শুয়ে খানিক বিশ্রাম নিয়ে নেবে? কিন্তু শুয়ে থাকলে মনে হয় চারদিকে শুধু পাপ আর পাপ, অনন্ত পাপের ভিতর তার মাথা তলিয়ে যেতে থাকে, গলায় পাথর বেঁধে কেউ যেন সেই অনন্ত পাঁকের ভিতর টানতে থাকে তাকে আর সে আপ্রাণ বুজকুড়ি কাটতে কাটতে ভেসে ওঠার চেষ্টা করে। সে চিৎকার করে বিছানায় উঠে বসে। সারা গা তার ঘামে ভিজে উঠে বর্ষার ভিজে দেওয়ালের মতো মনের হয়। মনে হয় চারপাশে বাতাসের যেন বড় অভাব, বুকের ভিতরটা বায়ুশূন্যতায় হাহাকার করে ওঠে। সে পাশ ফিরে তাকায়, পাশে যেন ডরোথির মৃত শরীর, মৃত শরীরের বুকটা উঠছে নামছে। ডরোথির প্রতি মাঝে মাঝে এক মায়া জেগে ওঠে তার। কিন্তু সেটা সাময়িক রোদের দিনে হঠাৎ মেঘের ছায় নেমে আসার মতো। তখন তার প্রতি এক রক্তের কল্লোল জেগে ওঠে, এক অর্গাজম, আহা এই অর্গাজম নিয়েই বেঁচে থাকা তার।

সন্ধ্যায় সে মার ওখানে গিয়েছিল। সেই অন্ধকার শ্যাওলার ছোপ ধরা গলিপথ বেয়ে একটা অনন্ত রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে সেই বাড়িটা এখন বস্তুত ক্লান্ত দাড়িয়ে আছে। এই পথটুকু সে আনমনা হয়ে পেরিয়ে যায়। পেরিয়ে যায় ছেলেবেলার ভাঙাচোরা এক একটা ছবি। সেই সব ছবির ভিতর ছবিলালকে তার মনে পড়ে। ছবিলাল আর তার বউ বনানী ছিল তাদের একতলার ভাড়াটে। সে এক ভ্যাগাবন্ড ছবিলাল। কী করত কী না করত কেউ তা জানে না। তার বাবার সঙ্গে একদিন শিয়ালদা স্টেশনে ছবিলালের কিভাবে যেন আলাপ হয়ে গিয়েছিল। নতুন যুবতী বউ নিয়ে বেচারি কোথায় যাবে বুঝে উঠতে পারছিল না। সুধাময় তাকে দু-চার দিনের জন্যে একতলার গোটা-দুই ফাঁকা ঘরে থাকতে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন ‘ছবি, একটা ভালো বাসা টাসা দেখে বউমাকে নিয়ে উঠে যেও, আমাদের ঘরগুলো তো আর ভাড়া দেবার নয়, ছেলে মেয়ে বড় হচ্ছে, বাড়িটা এবার মেরামত করে নতুন করে বানাব।’ ছবিলাল ঘাড় কাত করে শুনেছিল। দরজার কাছে বনানী দাঁড়িয়ে ছিল। এলো চুল ডান বুকে ঢলে পড়ে জানুর কাছে এসে নেমেছে। বাম বুক কাপড়ের শাসন মানেনি। ছেলেবেলায় গ্রামে মামার বাড়িতে সোনালী পাকা ধানের ক্ষেত সে দেখেছিল। উপরের পড়ার ঘরের জানালা থেকে বনানীকে দেখতে দেখতে তার সেই পাকা ধান ক্ষেতের কথা মনে পড়েছিল। ছবিলাল পাকাপাকিভাবে থেকে গেল। সে কি বনানীর জন্য? সুধাময়ের সেই বনানীর দিকে তাকিয়ে থাকবার ভঙ্গিমা যেন তাকে তেমনটাই খবর দিয়েছিল।

তার চোখের সামনে কেমন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। সেই কাঠের বন্ধ দরজাটায় গিয়ে এবার সে কড়া নাড়বে। বনানী এসে দরজা খুলে দেবে। তার পরে বনানীর ঠোটে মৃত প্রজাপতির মতো একটা হাসি লেগে থাকবে যতক্ষণ সে বাড়িতে থাকবে।

আর সে দেখবে একটা সুদূর বিস্তৃত ধানক্ষেত। মাঠে মাঠে এমন হাওয়া সে কখনও অনুভব করেনি। সে দেখবে এমন একটা মেঘ, নিরক্ষর গাছপালার সীমানায় কালি গুলে দিয়ে যাবে। সন্ধ্যাবেলা বাতাসে কি বাঘের গন্ধ? যেমন একদিন আধো বিকেলে স্কুল থেকে সে তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছে, অহেতুক বৃষ্টি মাথায় করে। সদর দরজা ভেজানো ছিল। উঠোনে এদিকে সেদিকে শ্যাওলার গন্ধ। তার যেন সেই ওপরের পড়ার ঘরের থেকে দেখা আলুলায়িত ধানক্ষেত মনে পড়েছিল। সে চুপি চুপি পায়ে ছবিলালের দরজাটা খুলে ফেলে নিঃশব্দে। সিলিঙের ভেন্টিলেটর দিয়ে তেরছাভাবে একটা আলো এসে পড়েছে বনানীর বিছানায়। একটি নগ্ন শরীরের উপর আর একটা নগ্ন শরীর উঠছে নামছে। সুধাময়ের টকটকে ফর্সা পিঠটা দেখে চিনতে ভুল হয়নি তার। বনানীর মুখটা সে দেখতে পায়নি। শুধু দেখেছে দীর্ঘ এলো চুল বিছানার কানাচ বেয়ে ঝুলে আছে। ধানক্ষেতের দিক থেকে সে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। মনে মনে টের পেয়েছিল বাতাসে বাঘের গন্ধ।

খট খট করে সে দরজায় কড়া নাড়ে। আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকায় একবার। আজ কি মেঘ করে আছে? বৃষ্টি আসবে? আলো পড়ে আসা বিকেলে সে যেন ঠিক ঠাওর করতে পারে না।

আর একবার সে কড়া নাড়ে। অধৈর্য হয় সে।

এবার দরজা খুলে দাঁড়ায় বনানী। এখন আর সেই ধানক্ষেত নেই। সে ভাবে। আলপথের শুষ্ক ঘাস মাড়িয়ে সে ঘরে ঢুকে পড়ে যেন। কেমন এক শীর্ণ ছায়ার মতো হয়ে গিয়েছে বনানী। শোক তাপের ভিতরে কি বনানী শুকিয়ে আসছে? সে তো বারণ করেছিল। বলেছিল “ইউ ফাকিং বিচ, তোমার আবার প্রেম পিরিতি?” বনানী রাগী বাঘিনীর মতো তার সামনে দাঁড়িয়েছিল। তারপরে এক টান দিয়ে বুক পিঠ থেকে কাপড় সরিয়ে দিয়ে উন্মুক্ত হয়ে বসনের শাসন মুক্ত হয়ে গিয়েছিল। তার বুকে পিঠে অজস্র আঁচড় কামড়ের দাগ। সই সব নির্মমতার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছিল “দ্যাখো দ্যাখো তোমার বাবার ভালোবাসার নমুনা।”

সে তখন সেই সব কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। সে দেখতে পাচ্ছে দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত দিয়ে কি আলপথ চলে গেছে! সে তো সেখানে বাঘের গন্ধ পায়নি তখন। সেই ধানক্ষেতের বুকে মাথা রেখে সে ঘুমোতে চেয়েছে। সে ঘুমিয়েই নিয়েছিল একদিন।

অন্ধ মার হাত ধরে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে। মা সেই কবে থেকে চলৎশক্তিহীন। কেন যে এমনটা হয়ে গেল! সে কি জানে না? একদিন সে স্কুল যাবার নাম করে স্কুলে যায়নি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আবার চুপি চুপি ফিরে এসে পড়ার ঘরে বসে ছিল চুপটি করে। দরজা জানলা বন্ধ। অল্প ওয়াটের আলো জ্বলিয়ে সে নগ্ন হয়ে নাচছিল। আহা কী নাচ! নাচতে নাচতে সে ভাবছে আহা, ধানক্ষেতের কী খেলা, ধানক্ষেতের উপর একটা শাদা মেঘ ঘাই মারছে। মারছে আর মারছে। ধানক্ষেত এলিয়ে পড়ে আছে সরু খাটের কানাচ বেয়ে। সে সেই সব কল্পনায় দ্যাখে আর নিজের মুখে একটা পলিথিন চাপিয়ে দম বন্ধ হয়ে আসার কষ্টটা দারুণ উপভোগ করে। তার পৌরুষ খাড়া হয়ে উঠে কী যেন এক অসহ্য উল্লাস জানান দেয়। তার পরে অনেকক্ষণ সে মড়ার মতো পড়ে থেকেছিল।

সে ভেবেছিল সুধাময় দুপুরে খেয়েদেয়ে দোকানে চলে গিয়েছে। সে নিচে নামবে বলে আলতো করে জানালাটা খুলেছে। দেখেছিল বনানীর জানালার কাছে দাঁড়িয়ে জানালাটা একটু ফাঁক করে মা ভিতরের দৃশ্য দেখছে। সে বুঝতে পেরেছিল সুধাময় আর দোকানে ফিরে যায়নি। সে আবার বাঘের গন্ধ টের পেয়েছিল।

সুধাময়কে কিছু বলবার সাহস তার মায়ের ছিল না। বনানীকে উঠতে বসতে গালমন্দ করতেন মা। কিন্তু বনানীর কিছু কি করার ছিল? ছবিলাল কয়েকদিন থেকে বেপাত্তা। বনানী তার ঘরে এসে কাঁদত। সে ভাবত ধানক্ষেত। ধানক্ষেতের বুকে সে শুয়ে থাকত। মাথার উপরে আকাশ।

ছবিলাল আর ফিরল না। বেশ কয়েকদিন পরে সুধাময় মর্গে গিয়ে ছবিলালের বডি সনাক্ত করে আসে। সেদিনই সন্ধ্যার পরে তার মা ছাদ থেকে পড়ে যায়। সেই থেকে মা অন্ধ। সেই থেকে মা মূক। সেই থেকে মা চলৎশক্তিহীন।

সেই থেকে তার আর বোন তিতলির জীবনটা পাল্টে গেল। একটা চেনা নদী যেন মরে হেজে প্রেত হয়ে গেল ক্রমশ।

সে যখন মার হাত হাতে নিয়ে বসে থাকে মা নিশ্চয়ই তাকে অনুভব করে। সে বসে বসে মাকে তার ব্যবসার উন্নতির গল্প শোনায়। মা কি শুনতে পায়? বনানী শুনতে পায়। কী এক মায়ায় জড়িয়ে সে বনানীর কাছে বসে থাকে। প্রতিবার সে বলে আসে ‘তুমি আলপথ হয়ে গিয়েছ বনানী।’ বনানীকে কোনও দিনই দিদি, বৌদি, ইত্যাদি সম্পর্কের টানে ডেকে উঠতে পারেনি। সে শুধু বনানীর নাম ধরে ডেকেছে!

হঠাৎ কি ডরোথির ঘুম ভেঙে যায়? সে পাশ ফেরে। সে তখন ডরোথির নগ্ন বুক নিয়ে খেলা করে। এখন মাঝরাত। একটু পরে হ্যামিলটন আসবে। নগ্ন হয়েই সে বাথরুমে যায়। ফিরে এসে জামাকাপড় পরে সে নিচে নেমে যায়। হ্যামিলটনের জন্য সে অপেক্ষা করবে।

হা হা করে তার হাসি পায়। আহা, রোজ রাতে। রোজ রাতে হ্যামিলটন তার কাছে আসে।

 

এরপর আগামী সংখ্যায়

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...