মন নাই কুসুম

রুমা মোদক

 

আমার মাঝে অতঃপর কেমন একটা অপেক্ষা তৈরি হয়। পার্লারের জাপটে ধরা শীতল বাতাসে আমার সর্বদা যে ঘুম ঘুম পেতে থাকে, এখন হঠাৎ তা ছুটে ছুটে যায়। চাকমা মেয়ে দুটোর নির্বিকার চেহারায় হঠাৎ ছায়া ফেলা বিরক্তির ছায়া মাড়িয়ে ম্যাসাজ থেকে হাত দুটো টেনে নেই, মাথার পাশে থাকা মোবাইলটা কি ক্লিক করে উঠল? সে কি মেসেজ দিল! অনেকক্ষণ যোগাযোগ নেই। তার যোগাযোগহীনতায় উপেক্ষার আশঙ্কা নাকি নিজেকে নিজের জগতের বাইরে হঠাৎ মূল্যবান আবিষ্কার করার অপেক্ষা আমাকে অস্থির করে আমি বুঝি না। বুঝি তার সঙ্গে আমার সংযুক্ত থাকতে হয়, অর্থহীন কারণে, অর্থময় অকারণে। নইলে আমার অস্থির অস্থির লাগে!

তার মেসেজগুলো ভুল বাংলিশে লেখা। উচ্চারণ অনুযায়ী বাংলা করলে যা দাঁড়ায়, আমে তমাকে মেস করসি। আমি বুঝে নিই। আমি তোমাকে মিস করছি। এলফাবেটের আই দিয়ে যে ই-কার হয় আর ই দিয়ে এ-কার এগুলো সে বোঝে না। আমিও বুঝিয়ে দিই না। কী জানি আবার যদি হীনম্মন্যতায় পেয়ে বসে! দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতায় তার ব্যক্তিত্ব ঠিকঠাক চিনে উঠতে পারিনি এখনও। তখনই বা কী সংযুক্তি ছিল! কিন্তু তখন এসব ব্যক্তিত্ব টেক্তিত্বের ধার মোটেই গজায়নি এটা নিশ্চিত ছিলাম। থাকলে তখন এসব করত না।

থাকুক, তার আর আমার শিক্ষা আর সামাজিক মর্যাদায় যে অমাবস্যা-পূর্ণিমার পার্থক্য এত বছর পরে নতুন করে মনে করিয়ে দিয়ে লাভ কী! আমি তো অস্বীকার করতে পারি না বুকের মাঝে এক অসহ্য কাঁপন, এক অদ্ভুত ভালোলাগা, এক অচেনা অপেক্ষা আমাকে হঠাৎ নিজের কাছেই নিজেকে অচেনা করে দিয়েছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে তা সে বয়সের চেয়েও বেশি, যে বয়সে হওয়ার কথা ছিল। তখন যা অসম্ভব ভেবেছি এখন তা একেবারেই সম্ভব অসম্ভবের বেড়া ডিঙিয়ে সীমানাহীন হয়ে পড়েছে। গন্তব্যহীন। অনেকটা কম্পাসবিহীন জাহাজের ভেসে চলার মতো। ঠিকানাহীন ভেসে চলা শুধু। অপরিমেয় আনন্দের সন্ধান পেয়েছি যে ভেসে চলায়……।

আমি ছেলেকে স্কুল থেকে তুলতে তুলতে আনমনা হয়ে যাই। মোবাইলটা মুহূর্তের জন্য হাত থেকে ব্যাগে রাখি না। গাড়িতে উঠেই তাড়াতাড়ি ফেসবুকে লগ ইন করে ম্যাসেঞ্জার চেক করি। প্রায়শই সে লিখে রাখে, তমি কতায়?  আমি অভ্রতে টাইপ করি এইতো ছেলেকে স্কুল থেকে নিতে এসেছি, তুমি কোথায়? ও উত্তর করে, দকানে। বাসার বাইরে নিশ্চিত হয়ে আমি ফোন করি। ওর বউটা খুব দজ্জাল। ঘরে ফিরলেই মোবাইল চেক করে সব ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা অগ্রাহ্য করে, আসলে স্বামী-স্ত্রীর এসব পারস্পরিক শ্রদ্ধা নিয়ে ওদের কোনও মাথাব্যাথা নেই। একে অপরকে নাক গলানোই স্বাভাবিক। ও যখন গল্পগুলো বলে, ওয়াশরুমে ঢুকলে ওর বউ ওর পকেট থেকে টাকা সরায়, আমি সেসব গল্পে কোনও অস্বাভাবিকতার গন্ধ পাই না। এটাই এদের কাছে স্বাভাবিক। অথচ এ আমার কল্পনারও অতীত বাবর আমার মোবাইল ধরেছে কিংবা আমি বাবরের পকেট চেক করছি। ওর বউ কেউ ওকে ফোন দিলে কান লাগিয়ে বসে থাকে। একদিন অসময়ে ফোন দিয়ে কি বিপদেই না পড়েছিলাম! ফোন টেনে নিয়ে মাতারির মতো চিৎকার করে বলতে থাকে, কেডায় কেডায়? সরি সরি রং নাম্বার বলে তড়িঘড়ি রেখে দিয়ে সম্মান বাঁচাতে বাধ্য হয়েছিলাম। পরে ও সরি সরি বলে কুল পাচ্ছিল না। অবশ্য এত সরি বলার দরকার ছিল না। ওর ক্লাসের কাছে এর চেয়ে বেশি তো প্রত্যাশাই করি না।

তবু প্রতিদিন সুযোগ করে ফোন দেই। হ্যাঁ দিতি, কেমন আছ? প্রতিদিন ফোন দিলে প্রথম এ প্রশ্নটি সে করবেই। ভালো আছি। বলা মাত্রই বলবে, ভালো তো থাকবাই, আমাকে ছাড়া তো ভালোই থাকবা। আমি হাসি। মনে মনে এক গভীর তৃপ্তি গ্রাস করে। সে যখন বলে, এখনকার মতো যদি সাহস তখন থাকত আমি কী আর তোমাকে অন্যের ঘর করতে দিই? কী জানি কোথায় একটা কাঁপন লাগে। গাড়ির জানালা গলে যেতে থাকা গাড়ির সারিগুলোর দিকে তাকিয়ে নিজের সুখে থাকায় আরও সুখ ঝরে পড়ে। আমি নিজেকে এক নিজস্ব আয়নার সামনে দাঁড় করাই। সত্যি কি আমি ছেলেটিকে বিয়ে করার সাহস করতাম? আমার আর তার অবস্থানে অমাবস্যা পূর্ণিমার দূরত্ব নিয়ে!! উত্তরটা অজানা নয়। খুব জানা। নিশ্চয়ই নয়।

তার সঙ্গে হঠাৎ আমার ফেসবুকে যোগাযোগ। ছবি দেখে আমিই তাকে রিকোয়েস্ট পাঠাই। কিছুদিন ঝুলে থাকি, বুঝতে পারি ফেসবুকে খুব অ্যাক্টিভ নয় সে, হয়তো কেউ খুলে দিয়েছে একটা অ্যাকাউন্ট। মোড়ের ফ্ল্যাক্সিলোডের দোকানদার কিংবা কোনও বন্ধু। এ পর্যন্ত। কিন্তু মাঝে মাঝে দেখি ছবি আপলোড করে। ওষুধের দোকানে, সিগারেট হাতে, পুকুর পাড়ে সানগ্লাস চোখে। মেসেঞ্জারে মেসেজ পাঠাই, চিনতে পারছ? দেখি সে সিন করে, রিপ্লাই দেয় না। অপমানিত হই। সেদিন রাতে সে রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করে অপমানের হাত থেকে বাঁচায়।

নিজেকে একটু যাচাই করতে সাধ হয়, মেসেঞ্জারে আবার জিজ্ঞেস করলাম, চিনে অ্যাক্সেপ্ট করেছ নাকি না চিনে? এবারও সিন করে রিপ্লাই নাই। আবার অপমানিত হই। সাহস কত, আমি কথা বলি রিপ্লাই দেয় না। গালি দিতেও ছাড়ি না আনকালচারড! কেন যে বন্ধু লিস্টে ঢোকালাম! আমার ক্লাসের বন্ধুদের সঙ্গে ফাইভ স্টার-ইটালিয়ানের মতো বেমানান।

ভাবি কি আনফ্রেন্ড করে দেব নাকি ব্লক? পরাজিত হবার আগ মুহূর্তেও মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে চায়। আতিপাতি অস্ত্র খোঁজে। নিজেকে বিজয়ী দেখাতেই মানুষের পরম ও চরম তৃপ্তি। আমিও তাই করি। বিজয়ী হতে চাই, প্রতিযোগী অসম জেনেও বিজয়ই চাই। লিখি, ভুলে গেছ নাকি!

শেষ অস্ত্রটা কাজে লাগে। সে ভুলভাল বাংলিশে যা লেখে তার মানে দাঁড়ায় তোমাকে কেমনে ভুলি, তুমি আমার প্রথম এবং শেষ প্রেম। প্রথম না হয় বুঝলাম, কিন্তু শেষ? আমি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ফোন নাম্বার চাই। নিজেরটাও দিই। আমার অপেক্ষার সীমা অতিক্রম না করে সেই ফোন দেয়। এ কথা, সে কথা। নানা বাঁক উপত্যকা ঘোরে আমাদের গল্প। সেই ফেলে আসা মফঃস্বল, সেই পুকুর, কো-এডুকেশন স্কুল, খেলার মাঠ, টাউন হল…। আমাদের গল্প সময় আর স্মৃতি পরিভ্রমণ করে। আমার অজস্র অলস সময় জীবন্ত হয়। অকাজের আয়েসী দিন প্রাণ পায়।

তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে, একদিন সে বলে। আরও একদিন বলে, কয়েকদিন। আমি একদিন আমার শহরে তাকে আমন্ত্রণ জানাই। আমাদের যোগাযোগ শুরু হয়। আমি স্বীকার করি, কেএফসিতে বসে তার খোলা বোতামের ফাঁকে চওড়া বুকে আমার নজর আটকে যায়। বলিষ্ঠ বাহু শার্ট অতিক্রম করে আমার চোখে ধাক্কা দেয়। কেমন একটা শিরশিরে অনুভূতি গ্রাস করে, তার বুকটায় মাথা রাখতে ইচ্ছে করে। বলিষ্ঠ বাহুর পিষ্টন কাঙ্ক্ষা করে সারা দেহ। কবছরে বেশ সুপুরুষ হয়েছে সে। নিজেই বলে, ফুটবল তো আর খেলি না। রোজ জিমে যাই। আমি আড়চোখে বারবার তার সুঠাম দেহ দেখি, যেমন কিশোরীর সদ্য গজানো স্তন দেখে কিশোরেরা।

হ্যাঁ দেহ। শরীর শরীর, তোমার মন নাই কুসুম। আমার সঙ্গে তার লক্ষ যোজন মানসিক দূরত্ব। খুব রুচি শালীনতা প্রেমের মোড়কে ঢাকা অন্য আমাকে দেখে আমি চমকে উঠি। আমার এই পার্টি-ভাবি জীবন, ড্রাইভার-বাবুর্চি জীবন, যে কোনও আসরে মধ্যমণি হয়ে থাকা জীবনে বেমানান একটা লোক কেবল বলিষ্ঠ পৌরুষত্ব দিয়ে আমাকে লোভাতুর করে তুলছে! আশ্চর্য এ আমাকে আমি চিনতাম?

এমন নয় দাম্পত্যে অসুখী আমি। ফ্ল্যাট আর একাধিক গাড়ির বিলাসী জীবন আমার, বিবাহবার্ষিকীতে হবিগঞ্জের প্যালেস, পাঁচতারা সোনারগাঁ করা জীবন আমার। বাবর বরাবর আশার অতীত কেয়ারিং আমার প্রতি। লক্ষ টাকা মাসে নিজের ভ্যানিটি ব্যাগে রেখে খরচ করি আমি। বিছানায় আমাকে সুখী করতে অক্লান্ত। আমি ছাড়া কোনও আকর্ষণীয় নারী নেই তার চোখে। তলপেট ঘিরে স্থূলতার চর্বি জমে গেলে আমি শাড়ি পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খুঁতখুঁত করি। বাবর হেসে জড়িয়ে ধরে, এখনও যা আছ লক্ষজনে একজন। বয়সে এটুকু না জমলে ভালো লাগে? সবকিছুর সময় আছে না! আমি বুঝি ওর কথায় কোনও ভণিতা নেই। ওর জীবনে ফেসবুক, হোয়াটস আ্যাপ নেই। অফিসে কোনও মেয়ের দিকে ত্যাড়া চোখে তাকানোর বদনাম নেই। নিজের কর্মজগতের বাইরে ওর আমি আর ছেলে ছাড়া কোনও জগত নেই। স্বাভাবিক হিসাবে যে শূন্যতা কিংবা ফাঁক গলে কেউ প্রবেশ করতে পারে তেমন কোনও ফাঁকই নেই। তবু কেন এই অচেনা আর বিপজ্জনক সুখকে সঙ্গে নেওয়া আমার? উত্তর নেই কোনও উত্তর নেই। মানুষ কেন যে কখন কোনও অসুখ সাধ করে নেয় সুখের নামে কেউ কী জানে!

এক বিপজ্জনক ফাঁদ আমি টের পাই। এড়াতে পারি না। তার কথা ভাবতে আমার ভালো লাগে। তার ফোন কিংবা মেসেজের অপেক্ষায় থাকি। পাশাপাশি গাড়িতে বসে হাতটা শিরশির করে একটু স্পর্শের জন্য। সেই কোনকালে ছেলেটা আমার সঙ্গে একই স্কুলে পড়ত আর পড়া না পেরে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকত। ডিস্ট্রিক্ট ফুড কন্ট্রোলারের মেয়ে আমি তখন সেই ক্ষুদ্র নিরীহ জেলা শহরটির শোপিস। গলির মোড়ে সদ্য গোঁফ গজানো ছেলেদের আড্ডা। বাড়ি ঘেঁষে পুকুর পাড়ে হেড়ে গলায় গান, আমার বুকের মধ্যিখানে……। রাস্তার উল্টোপিঠে যে বিশাল ফুটবল মাঠ সেখানে বলে পা লাগিয়ে প্রতিদিন হালি খানেক গোল দিত সে। জাঁদরেল স্ট্রাইকার। শুনতাম সে বয়সেই মাসে হাজার টাকা রোজগার করত ফুটবল টিমের কাছ থেকে।

আমি জানালার শিক ধরে দেখতাম ম্যারাডোনার মতো তার পায়ের দাপট। আর বুঝতাম তার আড়চোখ দেখছে আমাকে। এই চারচোখের সম্মিলন বিন্দুর সামনে শ্রেণি বিভাজনের হিমালয় পর্বত। ডিঙানো অসম্ভব। আমি ডিঙানোর কথা কল্পনায়ও আনি না। অথচ ক্লাসে পড়া না পারার লাজশরম ভুলে সে একদিন হাত পা ছিলে হেডস্যারের কোয়ার্টার থেকে একগাদা কামরাঙা আমার সামনে রেখে বলে, আমি তোমাকে চাই দিতি। আমি কামরাঙাগুলো হাতে নিয়ে হেসেই সারা। বামুনের কত শখ চাঁদ ছুঁতে চায়!

তারপর থেকে ওকে দেখলেই আমার প্রথম বেঞ্চের বন্ধুরা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে, তোমাকে চাই, তোমাকে চাই বলে। তখন সবে সুমন গেয়েছে, এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই….। পুরো ক্লাস প্যারোডি করল, এক হালি কামরাঙায় আমি তোমাকে চাই……। ওর নাম পরে গেল তোমাকে চাই। সবাই হাসে বটে, আমিও তাল মিলাই কিন্তু লক্ষ করি কোথায় তার জন্য চিনচিন টান। কখন কোন বন্ধুকে বলেছিলাম, হেডস্যারের বাসার গাছের কামরাঙা দেখে জিভে জল আসে, কোন কোণায় উৎ পেতে শুনেছে সে বুঝিনি। সেদিনই বুঝতে পারি তার আলাদা মনোযোগ। রাস্তায় দাঁড়ালে তড়িঘড়ি রিকশা ডেকে দেয়। বুঝতে পারি তার নজরদারি। গলির মোড়ে শিস দেয়া যুবকদের ঘুষিতে রক্তাক্ত করে দেয়, বুঝতে পারি ওর ঈর্ষা।

ছায়ার মতো পেছন পেছন টের পেতাম তার অস্তিত্ব প্রাইভেট স্যারের বাড়ি, গানের স্কুল, বন্ধুর জন্মদিন কোথায় নয়! অজস্র ভুল বানানে চিঠি লিখে রেখে যেত জানালায় গুঁজে। এ নিয়ে কত ঠাট্টা উপহাস। আমি ভালোবাসি বান্ধী… শব্দটি যে বান্ধবী, বুঝতে সময় লেগেছে বেশ। সবাই মজা নিলেও আমার একটু মন কেমন করে। দুবেণী করা মফঃস্বলে আমি তখন চুলে বয়কাট করা আলাদা প্রজাপতি। কত ভোমরা। বেখাপ্পা, যুৎসই…। তবু সে খচ করে বিঁধে থাকে সবার মাঝে।

আবার হারিয়েও যায়। পেনশনের পর বাবা ঢাকা স্থায়ী ফ্ল্যাটে উঠে এলে সব কোথায় হারিয়ে যায়। আমার নতুন জগত জন্ম নেয়, ক্যারিয়ার, নতুন বন্ধু, নতুন লক্ষ্য। কোথায় কর্পূরের মতো উবে যায় মফঃস্বল, খেলার মাঠ, কামরাঙা গাছ! আমার জীবনে ঢুকে পড়ে টিএসসি, কলাভবন, হলগেট, লুকিয়ে ডেটিং।

ওকে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। এই সোশ্যাল মিডিয়া না এলে হয়তো আর মনেই পড়ত না। আর যখন খোঁজ পেলাম তার আহ্বানে কেমন নিষিদ্ধ আনন্দ আমাকে সুখের রঙে কেমন সাতরঙা রংধনু ছড়িয়ে দেয়। বাবরের সঙ্গে সঙ্গে সিরিয়াল দেখে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়তে পড়তে, বিছানায় মিশে যেতে যেতে, প্লেটে ইলিশ সর্ষে তুলে দিতে দিতে আমার মনে জেগে থাকে সে বলেছিল আটটায় ফোন দেবে। বাবর কখন ওষুধ কিনতে যাবে!

আহা আমার জন্য কেউ অসুখে আছে, আমার জন্য কারও অনুশোচনা আমাকে কী যে সুখ আর অপেক্ষায় ভাসিয়ে নেয়!

খুব ধরে ও, চলো একদিন কোথাও ঘুরতে যাই দুজন। কোথায়? সম্ভব অসম্ভবের প্রশ্ন মাথায় না নিয়ে জিজ্ঞেস করি, কোথায়? সে বলে তুমি যেখানে বলবে। আমি ভাবতে থাকি, কই যাব? শ্রীমঙ্গলের ডিপ ফরেস্ট? নাকি মেঘে ঢাকা মেঘালয়? অমিত লাবণ্যর শিলং? বাবরের হাত না ধরে যে আমি ঢাকার সীমানা পার হই না, সে আমি ওর সঙ্গে কোথায় কোথায় না যাব প্ল্যান করে করে রোমাঞ্চিত হই। হঠাৎ বাস্তবতার সম্বিতে আপন মনে হাসি। আচ্ছা সত্যি যদি কোথাও যাই ওর সঙ্গে, ও কি বুনো বন্যতায় আমাকে গ্রাস করে নেবে? কী বলব বাবরকে! মায়ের ওখানে একদিন থেকে আসি! বাবর কাজ থেকে ফিরেই ভিডিও কল দেবে, কী বলব! মোবাইলটা নষ্ট হয়ে গেছে! কোনওদিন বাবরকে মিথ্যে বলার প্রয়োজন হয়নি। এতগুলো মিথ্যা তার জন্য বলতে পারব? আচ্ছা বলতেই বা চাইছি কেন! আমি কি সত্যি তার সঙ্গে কোথাও যাব?

 

(২)

বেশ কদিন তার সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে না। ফেসবুকে ছবি আপলোড নেই। মেসেঞ্জারে মেসেজ নেই। আমি আগ বাড়িয়ে ফোন করি না। ওর বউ সন্দেহবাতিকগ্রস্ত। কতক্ষণ পরপর মোবাইল চেক করে। আমি ঠাট্টা করি, সুন্দর বর তো! সামলে রাখে, বেশি ভালোবাসে। তবু সাহস করে কয়েকবার ফোন দেই। রিসিভ করে না। আমি বুঝে পাই না কী হতে পারে! বউয়ের কাছে কেউ বলে দিয়েছে কিছু? কিন্তু কী বলার আছে! আমি অস্থির অপেক্ষা মুক্ত হয়ে আবার ফিরতে থাকি পুরানো অভ্যাসের জীবনে। নিজেকে বোকা লাগে। এই ক্লাসের একটা পুরুষের কাছে হেরে যেতে ইগোতে লাগে। ফেসবুকে ব্লক করে দিই। কেমন লজ্জা লাগতে থাকে। ছি ছি কী বেখাপ্পা নেশায় পড়ে গিয়েছিলাম। কাটানো দুয়েকটা দিন আর একটা অস্থির অপেক্ষার সময় আমাকে গ্লানিতে ডুবিয়ে দেয়।

অপেক্ষার পালা ফুরিয়ে তখন আমি প্রায় ফিরে গেছি পুরানো জীবনে। তখন একদিন হঠাৎ তার ফোন। আমি ধরব কি ধরব না ভাবতে ভাবতে নিরুত্তাপ গলায় বলি, হ্যালো। যেন এতদিন ফোন দাওনি তো আমার বয়েই গেছে। তার গলা কাঁপা কাঁপা। কেমন আছ দিতি! ভালো। আমার নিরুত্তাপ গলায় মোটেই চুল পরিমাণ আবেগ প্রশ্রয় দিই না। পালটা কেমন আছ জিজ্ঞেস না করে একটু অবজ্ঞা দেখানোর চেষ্টাও করি। সে ধারেকাছেও যায় না। হঠাৎ তার গলায় কাঁপা অচেনা আবেগ আবিষ্কার করি আমি। আমি ভালো নেই দিতি। শান্তার ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়েছে। ঢাকায় অপারেশন হয়েছে। ক্যামোথেরাপি লাগবে। ওর গলা কান্নায় ধরে আসে। হড়বড় করে কথাগুলো বলে ফোনটা রেখে দেয় সে। আমি সেই রেখে দেয়া ফোনের রেশে অভূতপূর্ব মায়ার স্পর্শ পাই। অচেনা মেয়েটির প্রতি ঈর্ষা হয় আমার। শান্তা তার নাম।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1907 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...