উপমহাদেশের গণতন্ত্র কোন পথে — তৃতীয় বর্ষ, ষষ্ঠ যাত্রা

স্টেশন মাস্টার

 




…অতএব, গণতন্ত্রের নিরিখে, আমরা যে পশ্চাদ্ধাবন করিতেছি ইহা আন্তর্জাতিকভাবেই স্বীকৃত সত্য বর্তমানে। হ্যাঁ, সুধী পাঠক, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি জরুরি, আপনারা জানেন। হাউডি ডেমোক্র্যাসি!

চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের স্টেশনমাস্টারের কেবিনে তাই এইবার ইহাই সিদ্ধান্ত হইল, গত ১৫ই সেপ্টেম্বর পার হওয়া বিশ্ব গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে আমরা গণতন্ত্রের প্রকৃত অবস্থা বা গতিটিকে বুঝিতে চেষ্টা করিব। ইহাই হইবে আমাদের অক্টোবরের রিজার্ভড বগির বিষয়।…

 

শাশ্বত মার্কসবাদ বলিয়া থাকে, নিরঙ্কুশ গণতন্ত্র একটি স্বর্ণনির্মিত প্রস্তরপাত্র বিশেষ। ইহার অস্তিত্ব কোনওকালে ছিল না। নাই। এবং থাকিবেও না। কারণ সমাজটি শ্রেণিবিভক্ত, এবং মূল শ্রেণিগুলি পরস্পর যুযুধান। যাহাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব— মার্কসীয় পরিভাষায়— বৈর দ্বন্দ্ব। বলপ্রয়োগ ছাড়া যে দ্বন্দ্বের কোনও মীমাংসা সম্ভব নহে। অতএব, কোনও নির্দিষ্ট সময়ে ক্ষমতাদণ্ডটি যে শ্রেণির কুক্ষিগত থাকে, সে তাহার বিরুদ্ধ শ্রেণিকে সেই দণ্ডের সহায়তায়, এককথায় বলপ্রয়োগপূর্বক, দমাইয়া রাখিয়াই সেই ক্ষমতার আস্বাদ লইতে সক্ষম হয়। বিপরীত প্রক্রিয়াটিও চলিতে থাকে নর্মসহচরের ন্যায়। অর্থাৎ, অবদমিত শ্রেণির পাশাটি উল্টাইয়া ক্ষমতাদণ্ডটি নিজ হস্তগত করিবার প্রয়াসও চলিতে থাকে একই সঙ্গে। এবং সেটিরও পদ্ধতি, স্বাভাবিকভাবেই, বলপ্রয়োগ। এই চক্রের মধ্যে নিরঙ্কুশ গণতন্ত্র বস্তুটির কোথাও থাকার কথা নহে, এবং তাহা থাকেও না। গণতন্ত্র ভোগ করে ক্ষমতা যে শ্রেণির হস্তে তাহারাই কেবল, বিরোধী শ্রেণির উপর প্রযুক্ত হয় একনায়কত্ব।

এই প্রসঙ্গেই ভজুখুড়োর কথা মনে পড়িয়া যায়। এক মার্কসবাদী দাদার নিকট শোনা তাঁহার কথা, যাঁহার জীবনের একমাত্র গর্ব ছিল যে তিনি তিনটি সরকারের ভাত খাইয়াছেন। ব্রিটিশ, তৎপরবর্তী কংগ্রেস এবং বাম। ঘটনার সময় বাম সরকারের উদয়ের কাল। দাদাটি ভোট প্রচারে বাহির হইয়াছেন, হইহই সাড়া পাইতেছেন স্বাভাবিকভাবেই, হঠাতই বেসুর গাহিলেন ভজুখুড়ো। তাহার দাবি সবই নাকি এক। রং আলাদা ঢং আলাদা কিন্তু শাঁস একই। দাদাটি শেষ পর্যন্ত শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করিলেন— কিন্তু এটা তো মানবে খুড়ো, এই সরকার আমাদের কথা বলার অধিকার দিয়েছে, আমরা এখন কথা বলতে পারছি! হাসি সহকারে জবাব আসিয়াছিল— ওরে সে ব্রিটিশরাও দিত কথা বলতে, ওদের পক্ষে কথা বললে…!

কিন্তু বর্তমানে যেহেতু ভজুখুড়ো এবং শাশ্বত মার্কসবাদ দুইই প্রান্তিক, অতএব আপাতত মনোযোগ উহাদের হইতে সরাইয়া লওয়াই যুগধর্ম পালন হইবে। এবং তাহা করিলে ইহা অস্বীকার করা যায় না যে, খর্বিত বা খণ্ডিত যে বিশেষণই ব্যবহৃত হউক না কেন, গণতন্ত্রের পথে আমাদের এই সাত দশক পরিক্রমায় অর্জন কিছু কম নহে। একথা সত্য যে, এই গণতন্ত্রটির জন্মলগ্ন হইতে ইহার উপর নানাপ্রকার আঘাত আসিয়াছে, যাহার অধিকাংশই আভ্যন্তরীণ। এই সমাজের উচ্চশ্রেণির সুবিধাভোগী মানুষজন, তাঁহারা যে কৌম, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মুখোশ পড়িয়া থাকুন না কেন, এই গণতান্ত্রিক গঠনকাঠামোকে দুমড়াইয়া মুচড়াইয়া আপনাদিগের নিরঙ্কুশ আধিপত্য কায়েম করিতে চাহিয়াছেন। তাহাতে তাঁহারা অনেকাংশে সফল, কিন্তু পুরোপুরি সফল নন। যেকোনও জনবিরোধী পরিকল্পনা কার্যকর করিতে হইলে তাহাদিগকে আইনসভায় ও জনপরিসরে যে পরিমাণ বিরোধিতার সম্মুখীন হইতে হয়, তাহা আশা জাগায় নিঃসন্দেহে। ভারতীয় গণতন্ত্রের আত্মা অর্থাৎ ভারতবর্ষের কর্মী-শ্রমিক সাধারণ মানুষ এখনও স্বৈরতন্ত্রকে সমর্থন করেন না। বস্তুত, স্বার্থগোষ্ঠী যে অধিকার প্রতিষ্ঠায় এখনও পুরোপুরি সফল হইতে পারেন নাই, এই কৃতিত্বের দায়ভার ভারতীয় গণতন্ত্রকেই দিতে হইবে, কারণ গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত শক্তি আমাদের সাংবিধানিক রক্ষাকবচটি এখনও অটুট। আমাদের এই অসম দেশকে সাম্য, ন্যায় ও স্বাধীনতার আলোকিত প্রান্তরে লইয়া যাইতে হইলে যে কয়টি বিষয়কে আমাদের প্রাধান্য দিতে হইবে, তাহাদের মধ্যে সংবিধানের চরিত্র অক্ষত ও অক্ষুণ্ণ রাখা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। বস্তুত এই অর্জনগুলি আরও স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয় মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলি বা কমিউনিস্ট নামাঙ্কিত চিনের দিকে তাকাইলে।

কিন্তু সমস্যা হইল, ইহা সব লইয়া কিঞ্চিৎ শ্লাঘাবোধ করিতে করিতেই আমাদের দৃষ্টিসীমায় আসিয়া উপস্থিত হয় একটি রিপোর্ট। নাম গ্লোবাল স্টেট অফ ডেমোক্র্যাসি ইনডেক্স। নির্মাতা ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্র্যাসি অ্যান্ড ইলেকটোরাল অ্যাসিসটেন্স— ৩২টি দেশের একটি সংগঠন, ভারত যাহার একটি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। রিপোর্ট বলিতেছে আমরা একটি ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’, ১৫৮টি দেশের মধ্যে আমাদের স্থান ৪১তম। রিপোর্ট আরও বলিতেছে, উহা নির্মিত হইয়াছে যে পাঁচটি বিষয়কে মাপকাঠি করিয়া, তাহার মধ্যে তিনটিতে ২০১৫-র পর হইতে ভারতের পতন লক্ষণীয়। বিষয় তিনটি— নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ, নাগরিক স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের সততা! প্রসঙ্গত ইহারও উল্লেখ থাকুক, এই সূচকে ভারতের সর্বোচ্চ অবস্থান ছিল ২৭, এবং তাহা ২০১৪ সনে।

অতএব, গণতন্ত্রের নিরিখে, আমরা যে পশ্চাদ্ধাবন করিতেছি ইহা আন্তর্জাতিকভাবেই স্বীকৃত সত্য বর্তমানে। হ্যাঁ, সুধী পাঠক, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি জরুরি, আপনারা জানেন। হাউডি, ডেমোক্র্যাসি!

চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের স্টেশনমাস্টারের কেবিনে তাই এইবার ইহাই সিদ্ধান্ত হইল, গত ১৫ই সেপ্টেম্বর পার হওয়া বিশ্ব গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে আমরা গণতন্ত্রের প্রকৃত অবস্থা বা গতিটিকে বুঝিতে চেষ্টা করিব। ইহাই হইবে আমাদের অক্টোবরের রিজার্ভড বগির বিষয়। ভারতের সঙ্গে সঙ্গে উপমহাদেশ তথা বিশ্বের নিরিখেও গণতন্ত্রের অবস্থান এখন ঠিক কী অবস্থায়, স্বল্প পরিসরে বুঝিবার প্রয়াস থাকিবে তাহাও। এবং, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধির সার্ধ শতবর্ষে উপলক্ষে গণতন্ত্রের নিরিখে আমরা তাঁহার চিন্তাভাবনাগুলিকেও বুঝিতে চাহিব।

রিজার্ভড বগিতে রহিলেন আশীষ লাহিড়ী, প্রতিভা সরকার, ধীমান বসাক। সঙ্গে রহিল সায়েলাশ্রী শঙ্করের একটি অনূদিত নিবন্ধ। গণতন্ত্র বিষয়ে আশিস নন্দী মহাশয়ের একটি নিবন্ধও আমরা পুনঃপ্রকাশ করিলাম স্টিম ইঞ্জিন বিভাগে।

সঙ্গে অন্যান্য নিয়মিত বিভাগগুলি– কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, ধারাবাহিক, গদ্য, অনুবাদ, ফটোফিচার, হুইলার্স, অণুগল্প এবং সবুজ স্লিপারভালো খবর— যথাবিহিত থাকিল। 

পাঠক, আমরা গৌরী-কালবুর্গিদের দেখিয়াছি, দেখিতেছি কাশ্মির, দেখিতেছি অসম, আসুন, এই উৎসবের মরশুমে আমাদের সাধের গণতন্ত্রটিরই বা কীরূপ অবস্থা তাহাও কিঞ্চিৎ বুঝিবার প্রয়াস পাই।

অলমিতি।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...