প্রিয় মাস্টারমশাই

শৈলেন সরকার

 

হায়ার সেকেন্ডারির রেজাল্ট নিয়ে মেন গেট পার হওয়ার সময় মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি আর কোনও দিনই আমাকে বইখাতা নিয়ে এই স্কুলে আসতে হবে না। আমার মনের মধ্যে তখন কলেজ। আইআইটি-তে সুযোগ পাবই এটা না ধরলেও অন্তত প্রেসিডেন্সিতে ফিজিক্স নিয়ে পড়ার আশা করছি৷ দশরকম না ভেবে এটা নিজের থেকেই ঠিক করে নিয়েছিলাম। আইআইটি না হলে বিএসসি করব ফিজিক্স নিয়ে৷ এবং তা প্রেসিডেন্সিতেই। আইআইটি-তেই হয়ে গেল। আমাদের পাড়ার সেই স্কুল থেকে ভারতের একেবারে প্রথম সারির এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসে কিছুদিন অস্বস্তিতে কাটলেও এখন বেশ ভালোরকমই মানিয়ে নিয়েছি। পড়াশুনোর একেবারে অফুরন্ত সুযোগ। অধ্যাপকরা ছাড়াও এখানে লাইব্রেরি, কম্পিউটার সিস্টেম আর ইন্টারনেটের ব্যবহার আমাকে একেবারে গোটা পৃথিবীর অধিবাসী করে দিয়েছে। আমাদের অধ্যাপকরাও পৃথিবীর নানা ইউনিভার্সিটি বা কলেজের কথা এমনি করেই বলেন যেন সেসব মাত্র এপাড়া ওপাড়ারই ব্যাপার।

হস্টেলে সেদিন পড়াশুনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল৷ নিজেদের মধ্যেই। সবাই যে বাঙালি বা বাংলার তা অবশ্য নয়। অনেকে অসম, বিহার, মহারাষ্ট্র, ওড়িশার— এমনকি বাঙালিদের মধ্যেও অনেকেই বাইরের রাজ্য থেকে আসা। এক সময় স্কুলের মাস্টারমশাইদের কথা উঠল। সুরেশ বলে একটা ছেলে ওর স্কুলের স্যারের কথা তুলল। ভদ্রলোক নাকি কলেজেও পড়াতে পারতেন ইচ্ছে করলে। তা না করে স্কুলেই পড়ে রইলেন সারা জীবন৷ অঙ্কে সুরেশের যাবতীয় দক্ষতা নাকি সেই ভদ্রলোকের জন্যই। রাঁচির এক ইংরেজি স্কুলের নাম করল ও। বন্ধুদের বাকি সবাই এলোমেলোভাবে যার যার স্কুল বা মাস্টারমশাইদের কথা তুলে কখনও মজা করছিল, কখনও বা ওঁদের অবদানের কথা মনে করে নিজের স্যারেদের সম্পর্কে ভালবাসা প্রকাশ করছিল। ওদের কথা বলার ভঙ্গিতে হেসে উঠছিলাম কখনও, কখনও বা চুপ করে থেকে মুখে একটা বিস্ময়ের ভাব ফুটিয়ে তুলছিলাম। আলাদা আলাদা করে আমারও এক একজন স্যারের কথা মনে পড়ছিল— সেই স্কুলের৷ ইংরেজির, অঙ্কের, বিজ্ঞানের। অনেকদিন পর তাঁদের হাঁটাচলা, কথাবলার ধরন, ধমকানোর কায়দা— সব চোখের ওপর ভেসে উঠছিল ফের। হালকাভাবে আমিও আমাদের অবিনাশ স্যার, বিমলবাবুদের কথা তুললাম। অঙ্ক, ফিজিক্স। এর পর যেমন হয়, আড্ডা শেষ হয়ে গেলে যে যার কাজের কথা তুললাম। কাজের কথা মানে কোনও সমস্যার কথাই। ভবিষ্যৎ ভাবনা। যার যার বাড়িঘরের কথা উঠল এর পর। ক্লাস আর পড়াশুনোর ফাঁকে এইসব কথাবার্তাই বলতে গেলে বাঁচিয়ে রাখে আমাদের। আমাদের ঘরবাড়ি ছবি হয়ে ফোটে তখন। বাড়ির সামনেকার রাস্তা, গাছগাছালি। ফেলে আসা দিন, ছেলেবেলার বন্ধু। মায়ের কথা। বাবা, ভাইবোন। ওরা সব এখন কী করছে, কে জানে? বোনের সঙ্গে শেষ ঝগড়ার কথা মনে পড়ে। ওর চুল ধরে টানা, আমার সঙ্গে ওর আড়ি করা।

সেদিন ঘুমের আগের মুহূর্তে চোখ লেগে এসেছিল প্রায়, হঠাৎ দেখি অল্প দাড়িওয়ালা একটি মুখ। রোগাটে। চোখদুটো যেন ভেসে যাবে কোথাও। আমার দিকে তাকিয়ে— তবু ঠিক ঠিক আমাকেই দেখছে কিনা বুঝতে পারি না। না, স্বপ্ন নয়, ওই যেমন ঘুমের আগে আগে আসে। কিছু মুখ, কিছু ছবি। লোকটাকে ঠিক মনে করতে পারি না। বয়স কত হবে, ত্রিশ নয়— বড়জোর পঁচিশ-ছাব্বিশ। কে রে বাবা? কোথায় দেখলাম ওকে? আত্মীয়-স্বজন, বাবার বন্ধু, পাড়ার দাদা— কে হতে পারে? ভাবতে ভাবতেই ঘুম চলে এল কখন! হয়তো ভুলেই যেতাম, বা এইরকম একটি মুখ ভেসে ওঠার কথা মনেই পড়ত না কোনও দিন, কিন্তু পর দিন ফের। এবার দিনের বেলাতেই। অত্যন্ত সাধারণ আর সহজ এক কথার খেই ধরেই কে যেন সকালের টিফিনের কথা তুলে বলল, এর চেয়ে মুড়িই তো ভালো…। ব্যস, নিজের মনেই ডেকে উঠলাম, স্যার আপনি? চারপাশের বসে বা শুয়ে থাকা হস্টেলের বন্ধুদের অগোচরে আমার মনের মধ্যে আগের রাতে ভেসে ওঠা সেই রোগাটে মুখটার স্পষ্ট একটা ছবি এবার নিজের থেকেই ফুটে উঠল। রোগা, একটু লম্বাটে একটি মানুষ। ক্লাস ফাইভের দিনগুলির সেই প্রশান্তস্যার না? দেখি, হাত তুলে ডাকছেন আমাকে।

–কী হল? চুপ করে বসে আছ যে? খাতা দেখি।

পাশে কে যেন? বিমল? হ্যাঁ, বিমলই তো। পরে কোথায় চলে গেল কে জানে! কেমন নালিশ করল দ্যাখো, ‘ও অঙ্ক করছে না স্যার— বসে আছে চুপ করে।’

কী ভয়! আমার তখন কান্না পাচ্ছে। ক্লাসের সবাই তখন দেখছে আমাকে হাঁ করে। এমনকি ক্লাসের দরজা আর জানালা দিয়ে ঘরের সব বাতাস যেন বাইরে বেরিয়ে যাবে— উড়ে যাবে আকাশে। স্যার এক্ষুণি যেন লাফিয়ে পড়বেন বাঘের মতো করে।

–কী হল, কাঁদছ কেন? আমি কি বকেছি তোমাকে?

কাঁধের ওপর স্যারের সেই হাত, হাতের সেই ছোঁয়া এই এত বছর পরেও চোখে কেমন জল আনে দ্যাখো। হস্টেলের বন্ধুরা এই মুহূর্তে যে যার কাজে ব্যস্ত। খাতায় নোট লিখছে কেউ, কেউ বা পড়ছে কিছু মনোযোগ দিয়ে। কেউই আমাকে আলাদা করে দেখছে না যদিও, তবু কায়দা করে নিজের চোখটাকে একটু মুছে নিলাম। কে জানে, কেউ হয়তো দুম করে জিজ্ঞেস করে বসল, জল কেন তোর চোখে?

আমার তখব কান্না পাচ্ছে খুব। বড় স্কুলে এই প্রথম কোনও স্যার আমার সঙ্গে কথা বললেন আলাদা করে। এই প্রথম আদর করলেন কেউ।

–খেয়ে আসোনি? খেয়েছ, বাড়িতে?

ঘাড় নাড়লাম। সত্যি কথাই। বাবা ফেরেনি আগের দিন। ফিরত না অবশ্য প্রায়ই। ফ্যাক্টরির মালিক হঠাৎ করেই বাবাকে পাঠাত কোথাও কাজ দিয়ে। যেতেও হত বাবাকে। বাড়িতে তখন হয়তো পয়সা নেই একটাও। বাজার হবে কীভাবে?

স্যারকে বললাম, মুড়ি।

–মুড়ি তো ভাল জিনিস৷ আমি, আমি তো…।

কেন কে জানে, স্যার শেষ করলেন না কথাটা। শেষ না করে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। দেখলেন আমাকে। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী করেন তোমার বাবা?’

বললাম। স্যার চুপ করে রইলেন ফের। তার পর আমার কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ‘বোকা কোথাকার, খিদে পেলে কাঁদতে আছে?’

কী অদ্ভুত কথা না! খিদে পেলে কী করব তবে? খেতে না পেলে কী করে সবাই?

স্কুলে গিয়ে কান্নার ওটাই আমার শেষ দিন। এর পর কাঁদিনি কখনও। না, ভুল বললাম, কেঁদেছি মাত্র আর একটি দিন। প্রশান্ত স্যারের কী যেন হয়েছে। পুলিশ ধরবে স্যারকে। পুলিশ? ফাইভের আমরা সবাই তখন ভয় করি পুলিশকে। আমরা তাই জানতেও চাই না কিছু। শুধু বড়দের মুখে প্রশান্ত স্যারের নাম উঠলে কান খাড়া করি। শেষ দিনের ক্লাসেও স্যার কিন্তু বুঝতে দেননি কিছুই। বা তাঁকে নিয়ে গোপনে যে এত গল্প— তা নিজেও জানতেন না হয়তো। আমরা সবাই অবশ্য জানতাম আলাদা করে। জানতাম, আজকেই কী যেন হবে একটা। হঠাৎ দেখি ক্লাসের পাশ দিয়ে বারান্দা ধরে হনহন করে দুটো লোক ঢুকল ব্যস্ত হয়ে, পেছন পেছন স্কুলের দারোয়ান— কে জানে কেন উপরে চলে এসেছে গেট ছেড়ে। বেঞ্চে বসেই বুঝতে পারি পাশের ক্লাসঘর ছেড়ে এক-দুই জন স্যারও বারান্দায় বেরিয়ে এসেছেন কেন যেন! দু-জন আমাদের ফাইভ বি-র ঘরের সামনে এসে প্রশান্ত স্যারকে দেখেও গেলেন আলাদা করে। পর দিনের অঙ্ক দেবেন বলে স্যার যখন চক-ডাস্টার হাতে বোর্ডে যাচ্ছেন, ঠিক তক্ষুণি দারোয়ান মিশিরজি এসে ডাকল প্রশান্ত স্যারকে।

–হেডস্যার ডাকছেন আপনাকে…
–ক্লাস শেষে গেলে হবে না?
–না, বললেন, এক্ষুণি। খুব দরকার।

আমরা সবাই জানি, এমনকি স্কুলসুদ্ধু সবাই, কিছু একটা হতে যাচ্ছে আজ। বাড়ির পাশের ঘরের সুধীরকাকুর কাছেই শুনে এসেছি, অন্যের নামে মাস্টারি করতে এসেছে লোকটা। ‘জাল’।

–জাল মানে?

মায়ের জানতে চাওয়ায় সুধীরকাকুই বলেছিল, সার্টিফিকেট তো ওর দাদার। ওর দাদা নাকি মরে গেছে দু’বছর আগেই।

স্যার যখন চলে যাচ্ছেন পুরো স্কুল তখন বারান্দায়। সবার কাছেই দারুণ রোমাঞ্চকর দৃশ্য ছিল সেটা। সব ছাত্র, সব স্যার— যেন একেবারে অচেনা, অদ্ভুত একটা লোককে দেখছিল হাঁ করে। আর লোকটা যখন গেট পার হচ্ছে, যখন বরাবরের জন্য হারিয়ে যাচ্ছে, কে যেন চিৎকার করে উঠেছিল ‘স্যার’ বলে। এক জনই। দোতালার সেই আমাদের বারান্দা থেকেই। সবাই অবশ্য আমার দিকেই তাকাচ্ছিল চোখ বড় বড় করে। কেন কে জানে, জল বেরিয়ে আসছিল দুচোখ ভরে। আমার। মানে ফাইভ বির সুনীল মণ্ডলের। কাঁধ থেকে একটা হাত যেন সরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

রোগাটে আর অল্প দাড়িওয়ালা সেই মুখ ঘাড় ফিরিয়ে একবার তাকাল ফাইভ বির বারান্দার দিকে। সম্ভবত শেষবারের মতো দেখে নিতে চাইল স্কুলটাকে। স্কুলটাকেই। এত এত ছেলের ভিড়ে ফাইভের ছোট কোনও ছেলেকেই স্কুলের গেট থেকে দেখতে পাওয়ার কথা নয়। আমার যদিও তখন ভুল হয়েছিল, মনে হয়েছিল আমাকেই খুঁজছে লোকটা। যেন শেষবারের মতো মনে করিয়ে দিচ্ছে, যেন বলতে চাইছে, ‘বোকা কোথাকার, খিদে পেলে কাঁদতে আছে?’

খিদে পেলে কাঁদতে নেই কখনও। কী অদ্ভুত কথা, না? খেতে না পেলে তবে কী করব? আমার কী হয়েছিল কে জানে? বিহারের সেই রমেশ জিজ্ঞাসা করল, কী হল? ঘনঘন চোখ মুছছিস এত? কাঁদছিস নাকি?

–না, না, কিছু না তো!

রাতে ঘুমের আগে কাল নিজের থেকেই সেই ছবিটাকে আঁকার চেষ্টা করলাম। আমার সেই ক্লাস ফাইভ। দোতালার ঘর, সেই বারান্দার ভিড়। দারোয়ান, সেই হেডস্যার! অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই কিন্তু ছবিটাকে পুরো করতে পারছিলাম না। মেন গেট পার হতে থাকা যে লোকটা বরাবরের মতো স্কুল ছেড়ে চলে যাবে, অল্প দাড়ি আর রোগাটে মুখের যে লোকটা কার যেন চিৎকার করে ওঠা ‘স্যার’ শুনে ফিরে তাকাবে একবার, সেই মুখটাকে কিছুতেই আর আমি নিজের মনে এঁকে উঠতে পারছিলাম না। নিজের মনে বারবার করে ডেকে উঠছিলাম, স্যার…! প্রতিবারই আশা করছিলাম এই বুঝি ঘাড় ফেরাবে লোকটা। এই বুঝি মাথা ঘুরিয়ে ফাইভ বির বারান্দাটা খুঁজবে৷ এই বুঝি ক্লাস ফাইভ বির কোনও ছেলে চিৎকার করে বলে উঠবে কিছু, বলবে, ‘আমি আর কাঁদব না স্যার, খিদে পেলেও….।’

খড়্গপুর আইআইটি হস্টেলের আলো নিভে গেছে কখন৷ সাঁতার দেওয়া মাছের মতো আমি এখন একটা স্বপ্ন থেকে আরেকটা স্বপ্ন হয়ে একেবারে গভীর ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছি৷

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...