বুবুন চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা

পাঁচটি কবিতা

 

বাবা

পশ্চিমের বারান্দায় রোদ এসেছে আজ।
সেই বাবার আমলের রোদ।
অনেকদিন পর।

এই রোদের কাছে আমার ছেলেবেলা ছিল।
জ্যোৎস্নাভেজা টেপ ফ্রক ছিল।
লোডশেডিং-এ বাবার হাতে হাতপাখা
আমার মাথার কাছে
কতো ধুলোবালিমায়া।
আমাদের বোরোলীনের সংসার।
আজও আমার পাশে হাঁটতে, হাঁটতে
ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

তবু রোদ আসে মাঝে মাঝে।
ঘামে ভেজা বাবার নরম ফতুয়ার পকেট ছিঁড়ে।

 

প্রিয় পাঠ

তোমাকে পড়িনি অনেকদিন।
চাল, ডাল আর ইএমআই-এর ধান্দাবাজি করতে করতে ভুলে গিয়েছি।
বারান্দার টবে ফুলগাছগুলোও মরে যাছে।
তোমাকে পড়া আর ফুলগাছের যত্ন নেওয়া আমার কাছে একইরকম ছিল।
এখন সমস্ত পড়াশোনা রাষ্ট্র নির্ধারিত।
হনুমান চালিশা আর অবতার রাম-এর মধ্যে তোমাকে কোথায় খুঁজে পাব!
এতো ধুনো লাগা হাওয়া-বাতাস।
চোখ আবছা হয়ে গেছে।
দিগন্ত মানে শুধু পাঁচিল।
জেলখানার চেয়ে একটু বড়ো।
সমস্ত শহর বরাবর।
তোমাকে দেখিনি অনেকদিন।
ছুঁয়ে, ছুঁয়ে প্রিয় বইয়ের মতন।

 

আঠা

কাল যদি আর ফিরে না আসি।
এই বনভূমি, মেঠো পথ।
রোজ মায়া কুড়োতে আসি।
সংসারে নিয়ে যাব বলে।
মায়া ছাড়া এই নশ্বর সংসারে কী-ই বা আছে।
সেই তো দিনান্তের আঠা।
সন্তানের পাশে বেবাক বসে থাকি।
পাঁজরেও ঘুণ ধরে। ঘুণাক্ষরেও জানতে দিই না।
রোজ মায়া কুড়োতে যাই।
চালে-ডালে রেখে দিই রোজ।
আর যদি না আসি কখনো।
তবু ঘর-দোর আঠালো যেন হয়।

 

নীল প্রচ্ছদ

নিঃসঙ্গতার গল্পগুলো আজ বের করেছি।
মাঝে, মাঝে রোদে না দিলে পোকায় কাটে।
যেকোনো স্মৃতিকাতরতার মধ্যে পোকামাকড় বাসা বাঁধে।
কারণ সমস্ত স্মৃতিকাতরতাই আসলে স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকার।
বাতাস ভারী করে।
প্যালেটে স্মৃতি আর মৃত্যু মিশিয়ে দিলে নীল রঙ হয়।
সুড়ঙ্গজীবীরা জানে নীল প্রচ্ছদের মানে।

 

প্রান্তর

আর কোথাও পাবে না আমাকে।
চরাচর জুড়ে শুধুই শূন্যতা।
মৃত্যুর মতো সম্মোহন।
সমুদ্রে ফেলে যাওয়া নীল স্কার্ফ
ঢেউয়ে ভেসে গেছে।
নীল স্কার্ফে বাঁধা ভাঙা সম্পর্ক ছিল।
বন্যতা ছিল।
বুনো স্ট্রবেরির মতো মগ্নতা ছিল তবু।
ঢেউয়ে ভেসে গেছে।
কোথায় খুঁজবে আমাকে।
প্রান্তরেও সন্ধ্যা নেমে গেছে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1920 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...