অন্তেবাসী — সপ্তম পর্ব

পীযূষ ভট্টাচার্য

 

ষষ্ঠ পর্বের পর

আমি তো জেগেই ছিলাম তারই মধ্যে সূর্যোদয় হয়ে গেল কাঞ্চনজঙ্ঘায়। কিন্তু একবারের জন্যও দেখবার ইচ্ছে হয়নি। বাবলু উঠে এসেছে এ ঘরে কেননা ওর একা থাকতে ভীষণ ভয় করছে। মা তার নিজের শোবার জায়গায় ওকে শুইয়ে দিয়ে বলে ‘ভয় কীসের রে আমি তো আছি!’

মা অবশ্য জেগেই থাকে কেননা সে জানে এত রাত্রিতে স্টেশনে টেলিফোন ধরবার মতন কেউ থাকবে না— যদি কেউ থাকে সেই আশাতে মেসোমশাই ফোন করেই চলেছে। মা শুধু মাঝেমধ্যে উঠে গিয়ে দরজা একটু ফাঁক করে দেখছে জামাইবাবুর ঘরে আলো জ্বলছে কিনা। দরজা এমনভাবে খুলছে যাতে হিমেল হাওয়া সরাসরি বিছানা অবধি না আসে। দেখেই ফিরে আসছে নিজের জায়গায়। প্রতিবার ফিরে আসবার সময় একটাই বাক্য উচ্চারণ করছে ‘স্ট্রেচার এখনও জোগাড় হয়নি।’ ‘স্ট্রেচারের মানে কী?’

‘স্ট্রেচারের কোনও মানে হয় না, স্ট্রেচার স্ট্রেচারই’ বাবলু এ কথা বলে থামিয়ে দেয়। কিন্তু মা অনেকক্ষণ পর উত্তর দেয়, ‘স্ট্রেচার মানে হচ্ছে পীড়িত, আহত বা মৃত ব্যক্তিকে বহন করে নিয়ে যাবার খাটুলি।’

বড় হয়ে ডিকশনারিতে মার কথার হুবহু একই শব্দের সমাহার দেখেছি। কিন্তু ‘মৃত’ শব্দটাই আমাকে সেই সময় ভীত করে তোলে এমনভাবে যে লেপের তলাতে মাথাশুদ্ধু ঢুকে যাই। যদি বেলুদি সত্যি সত্যি মৃত হয়ে যায় তবে তার ভূত নিশ্চয় নিজের ঘরে ফিরে আসবে। তখন তো এ ঘরের মধ্য দিয়েই তাকে যেতে হবে, যাবার সময়ে আমাকে দেখতেই পাবে না। বাবলু অবশ্য ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে— পাশের ঘর থেকে ডলিদির নাক ডাকার শব্দ এ ঘর থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। কেবলমাত্র আমি ও মা বাড়িতে জেগে আর স্টেশনে মেসোমশাই জেগে।

ট্রলিম্যান সহ বাইরে সবাই ছুটছে, কার্শিয়াং যে কত দূর কোনও ধারণা না থাকার জন্য সময়ের কোনও হিসেব নেই, ঘরে অবশ্য একটা দেয়ালঘড়ি আছে, গতকাল মার নজরে আসে ওটা বন্ধ। চাবি দিয়ে আবার চালু করেছে। আবার চলছে টিক টিক করে। কিছুই যখন করার নেই, এক-দুই করে টিক টিক শব্দ গুনতে থাকি, ষাট হয়ে গেলেই একবার থামি আবার একে ফিরে যাই, কতক্ষণ গুনেছি ঠিক নেই, একসময় ঘড় ঘড় শব্দে চারবার বেজে উঠতেই মা ধড়ফড় উঠে পড়ে দরজা হাট করে খুলে দিতেই দেখে মেসোমশাই দাঁড়িয়ে।

‘ঠিকঠাক পৌঁছে গেছে? স্টেশনে কি স্ট্রেচার ছিল? বেলু কেমন আছে?’ এক নিশ্বাসে মা প্রশ্নগুলো রাখলে মেসোমশাই বলে ওঠেন, ‘স্টেশনমাস্টারকে ঘুম থেকে তুলতেই যা ঝামেলা হয়েছিল। তারপর সব ঠিকঠাক— এতক্ষণে হয়তো ইঞ্জেকশন পড়ে গেছে।’

–এবার থেকে ইঞ্জেকশনটা বাড়িতে রাখবেন।
–ডাক্তার তো কার্শিয়াং-এ।
–আমিই দেব, ইঞ্জেকশন দিতে আমি জানি। ডাক্তারমামার কাছে শেখা…

এবারে মার শেষ প্রশ্ন, ‘রাস্তায় কি রক্তবমি হয়েছিল?’

মেসোমশাইকে সেই মুহূর্তে অসহায় দেখাচ্ছিল। কথাগুলো ঠিক ঠিক শোনার জন্য লেপের ভেতর থেকে মাথাটা বাইরে নিয়ে এসেছিলাম। মেসোমশাই থমথমে মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কেননা এ বিষয়টা তিনি জানতে চাননি। জানতে চাওয়া যে উচিত ছিল সন্তানের পিতা হিসেবে সেটা মনে করিয়ে দেওয়াতেই মার সামনেই চোখের জল ফেলেন। তা দেখে মা শশব্যস্ত হয়ে উঠে বলে— এখানে বসুন, চা করে নিয়ে আসছি।

এবার স্টোভের একটানা শোঁ-শোঁ শব্দে ঘড়ির টিক টিক ধ্বনি চাপা পড়ে যায়—আমারও গোনা বন্ধ। তাই ঘুমিয়েও পড়ি।

 

সকালের আপ ট্রেনের সঙ্গে ট্রলিটা লাগিয়ে রামছাগল এবং মালকিনকে দেখতে পেয়ে হাত নাড়াতেই দেখি মালকিন আমার দিকে তাকাচ্ছেই না। বেলুদির রক্তমাখা লেপতোষক নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে ট্রেন থামতেই পিছন দিকের লাইনের ওপর কখন লাফিয়ে নেমে গেছে রামছাগল দেখতেই পায়নি! যখন কোয়ার্টারমুখো তখন প্ল্যাটফর্মের ওপর ধীরেসুস্থে নামে মাথায় লেপতোষক।

যেহেতু রামছাগল ঘরে প্রথম ঢুকেছে তাকে তো কোনও প্রশ্ন করা নিরর্থক তাই মা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে মালকিনের জন্য। রামছাগল সোজা বেলুদির ঘরে ঢুকে গিয়ে নিভন্ত আগুনের সামনে বসে সারা রাত্রির ধকল সামলে নেবার জন্য। একসময় ঘুমিয়ে পড়ে।

কিন্তু তার মালকিনকে অবিরাম কথা বলে যেতে হচ্ছে বা বলতে বাধ্য করছে মা। মাকে জানতেই হবে বেলুদি রাস্তায় রক্তবমি করেছিল কিনা। যখন জানতে পারে আর রক্তবমি হয়নি তখন তার স্বগতোক্তি ‘শরীরে তো আর রক্তই নেই— বেরিয়ে আসবে কোথা থেকে!’

রাজা যেন বেলুদির শরীরে বাসা বেঁধে রক্ত কুরে কুরে খেয়ে একসময় অরুচি হয়ে গেলে মুখ দিয়ে বের করে দেয়। কেননা তা হয়নি বলে মা নিশ্চিন্ত, রাজার উগলে দেওয়া রক্ত তো শেষ পর্যন্ত মানুষেরই রক্ত, তার গন্ধে চিতাবাঘ চলে আসতে পারে। তার রাস্তায় রক্তবমি হলে তা একবারে তাজা রক্ত— এই রক্তের আস্বাদই আলাদা চিতাবাঘের কাছে। যখন শোনে রাস্তায় একটা শেয়ালের দেখা গিয়েছিল লাইন ক্রসিং করতে—

–শেয়াল বাঁদিক থেকে এসে ডানদিকে গেছে? না ডানদিকে…
মাকে থামিয়ে মালকিন বলে ওঠে— বাঁদিক…
স্বস্তিতে মা বলে ওঠে— এ যাত্রায় ফাঁড়া কেটে যাবে।

রামছাগলের মালকিন এইসব কথাবার্তা বেশিদূর এগোতে দিল না কেননা রামছাগলকে একবার বাড়ি নিয়ে যাবে ডাউন ট্রেনে তারপর বেলুদির জন্য দুধ আর ডিমসেদ্ধ নিয়ে আবার স্যানিটোরিয়ামে ফিরে যাবে। তা শুনে ডলিদি ঘর থেকে বলে ওঠে— সেও যাবে। ‘যাবি তো চল।’ কিন্তু কথাটার উত্তর দিল ঘর থেকে সিঁড়ির ধাপে পৌঁছে।

ততক্ষণে স্টোভ শোঁ শোঁ করে জ্বলে উঠেছে, ঠিকমতন পাম্প দিয়ে স্টোভের শিখাকে উসকে দেবার জন্য মা একবার পিন করে দিল। ডলিদিকে হুকুম দিল ফ্লাস্ক আর টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে আসতে। ডলিদি তার সাজ বন্ধ রেখে ফ্লাস্ক আর টিফিন ক্যারিয়ার শব্দ করে রাখতেই আবার হুকুম ‘মেজদির জন্য ফ্রেশ জামাকাপড় গুছিয়ে নে!’

কালুদা ও মেজমাসির জন্য টিফিন, বেলুদির জন্য দুধ ডিমসেদ্ধ যখন হয়ে গেছে তখন ডলিদি রান্নাঘরে ঢুকে চায়ের কেটলিটা এগিয়ে দেয়। এবারে মা হেসে ওঠে— সকালের চা খাওয়া হয়নি, আরও একটা ফ্লাস্ক থাকলে বের করে দে ওদের জন্য চা পাঠিয়ে দিই। তোর টিফিনটা আগে খেয়ে নে, হাসপাতালে খালি পেটে যেতে নেই—।

ডাউন ট্রেন আসবার আগেই স্টেশনে ডলিদি পৌঁছে যেতে চায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মা বলে, ট্রেন ঢুকতে এখনও অনেক দেরি। ‘ও’ আসুক।

‘ও’ বলতে মালকিন। সে এসেই ফ্লাস্ক দুটো আর টিফিন ক্যারিয়ার হাতে নিয়ে নেয়। ডলিদিকে বিশ্বাস নেই। ওকে কাপড়ের ব্যাগটি হাতে ধরিয়ে দেয়। পিছনে ডাকতে নেই বলে কাউকে উদ্দেশ্য করে না বলে মা জানিয়ে দেয় জামাইবাবু যেন ট্রেন চলে গেলে চলে আসেন।

ট্রেন ছাড়ার পূর্ব মুহূর্তে ডলিদি কামরার দরজা খুলে আমাদের দিকে হাত নাড়ল তারপর মিলিয়ে গেল। কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধতায় ভরে গেল বাড়িটা। তখন ঘড়ির কাটার টিক টিক শব্দ বুঝিয়ে দিচ্ছে সে আছে এবং চলছে। অর্থাৎ যতক্ষণ দম থাকবে সেও ঠিকঠাক চলবে। কিন্তু কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলাম না ট্রেন চলে যাবার পর মা আকাশের দিকে তাকিয়ে কেন প্রণাম করল। এখন তো আকাশ শূন্যগর্ভ, তারা বা নক্ষত্রের চিহ্নমাত্র নেই, এ তারার সঙ্গে ওই তারা— নক্ষত্রের সঙ্গে অন্য নক্ষত্রের সরলরেখা টেনে কোনও কাল্পনিক দেবদেবীর অবয়ব তৈরি করবে সে সম্ভাবনাও নেই। সূর্যকে যে নয় তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে— সূর্য তো কাঞ্চনজঙ্ঘা টপকে এদিকে আসছে মাত্র। যেদিকের আকাশের উদ্দেশ্যে প্রণাম সেদিকে সূর্যের আসতে অনেক দেরি। সে সময়ে অবাক হয়ে দেখলাম গতরাতের শিশির পাহাড়ি গোলাপ গাছে মাকড়শার জালে বন্দি হয়েও রংবাহারি হয়ে যাচ্ছে।

–অত ঝুঁকে কী দেখছিস?

পিছন ফিরতেই মনে পড়ে গেল মালকিনের কাছে জানতে চাওয়া হয়নি— কালুদা বন্দুকে সেফটি ক্যাচটা লক করেছে না করেনি। লক না করলে চরম একটা দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে…

 

আবার আগামী সংখ্যায়

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1907 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...