হে মহামানব, আর এ কাব্য নয়

আশীষ লাহিড়ী

 

মার্কসের অনেক ধারণা নিয়েই আজ অনেক প্রশ্ন উঠেছে, যদিও তার অধিকাংশেরই দায় মার্কসের ওপর বর্তায় না, বর্তায় মার্কসবাদ বলতে চট-জলদি যে-ধারণার ক্যাপসুলটাকে কোঁত করে গিলতে আমাদের বাধ্য করা হয়েছিল তার ওপর। যেমন, পূর্ব ইউরোপের অর্ডারি সমাজতন্ত্র ধসে পড়ার কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়ন ভিতর থেকেই পচে যাওয়ার ঘটনাটাকে অনেক মার্কসবাদের পরাজয়ের চরম নিদর্শন বলে তুলে ধরেন। অথচ ভেবে দেখতে গেলে ওই ঘটানাটা মার্কসের ভাবনাচিন্তার অভ্রান্ততারই নিদর্শন। যে-আমলাতান্ত্রিক পুঁজিতন্ত্র সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিস্ট পার্টির বিশেষাধিকারভোগী হাত ধরে গড়ে উঠেছিল, এক সময় যাকে ‘সমাজতন্ত্ররূপী সাম্রাজ্যবাদ’ বলে চিহ্নিত করা হত, তার অবধারিত পরিণতিই তো লেনিনের স্থাপিত ‘সোভিয়েত’ শাসনের অবলুপ্তি। যে-পুঁজিতন্ত্রর আরও ভয়াবহ ‘সাফল্য’র রূপ ইদানীং চিন। মাও সেতুঙের আশঙ্কাকে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণ করে পুঁজিতন্ত্র-পথযাত্রীরা সেখানে একনায়কত্ব বিস্তার করেছে; সর্বহারার একনায়কতন্ত্রর বদলে সেখানে আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পুঁজিপতিশ্রেণির একনায়কতন্ত্র। তারই দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না চৈনিক শাসকদের। অবাধ পুঁজিতান্ত্রিক ‘উন্নয়নে’র পথে গণতন্ত্র যে কত বড় বাধা তার অকাট্য নিদর্শন হিসেবে চিনের মডেলকে আজ তুলে ধরা হচ্ছে। আজ সারা পৃথিবীতেই খেটে-খাওয়া মানুষের অধিকার, গণতান্ত্রিক ও মানবিক অধিকার, পদদলিত। একতরফা শোষণের অধিকারটাই সবচেয়ে বড় অধিকার বলে মান্য।

কিন্তু মার্কস-প্রকল্পিত সমাজতন্ত্র ও শ্রেণিহীন কমিউনিস্ট সমাজের অবাস্তবতা নিয়ে যতই আলাপ আলোচনা হোক, একটা কথা তো দিবালোকের মতো স্পষ্ট, বস্তুত আজ স্পষ্টতর, যে সমাজটা শ্রেণিবিভক্ত এবং সর্বময় ক্ষমতা— হেজিমনি— সেই শ্রেণির ওপর ন্যস্ত, উৎপাদনের উপকরণগুলি যাদের হস্তগত, যেমন ভারতবর্ষে আম্বানি-আদানি ও তাঁদের ভাই-বেরাদরদের। আবার এটাও ঠিক, যত ছোট আকারেই হোক, ওই হেজিমনির বিরুদ্ধে লড়াইটাও অবধারিত। মাওয়ের কথায়, ‘যেখানে অত্যাচার, সেখানে প্রতিরোধ।’ সেই লড়াইয়ের অবকাশ একটা সমাজে কতখানি থাকবে, তাই দিয়েই সেই সমাজের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্যর মাত্রা ও গুণমান নির্ধারিত হবে। ‘খোলা সমাজ’-এর প্রবক্তা কার্ল পপারের মতে স্বৈরাচার আর গণতন্ত্রর মধ্যে তফাত এই যে, বিপ্লব না ঘটিয়েই সাধারণ মানুষ— জনগণ— নেতাদের স্বৈরাচারী অপকীর্তিগুলো দূর করতে পারে, প্রয়োজনে নেতাদের দূর করতে পারে, যাতে সমাজটা— অর্থাৎ সমাজের শোষণকাঠামোটা— অক্ষত থাকে। ওটাই যেন গণতন্ত্রর সবচেয়ে বড়, বস্তুত একমাত্র, উপযোগিতা। এই হতাশ্বাস পটভূমিতে স্বভাবতই মনে হয়, রাজনীতিতে ‘নৈতিকতা’র অগ্রাধিকারের প্রবক্তা মহাত্মা গান্ধির ভাবনাচিন্তা কি অন্ধকারে কিছু পথ দেখাতে পারে?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধর সময় একটা রসিকতা খুব চালু ছিল: ‘আমি জানি আপনি নিরপেক্ষ, কিন্তু কাদের হয়ে নিরপেক্ষ?’ গণতন্ত্র, অহিংসা, সমানাধিকার, সামাজিক সুবিচার প্রভৃতি বিষয়ে গান্ধির অত্যন্ত উচ্চাঙ্গের বাণী ও ধ্যানধারণাগুলি পড়লেই কেন জানি না, ওই রসিকতাটির কথা মনে পড়ে যায়। পড়ত না, যদি তিনি হতেন শুধুই ভাবুক, শুধুই দার্শনিক, শুধুই লেখক। কিন্তু গান্ধি ছিলেন সবার উপরে একজন ধুরন্ধর রাজনীতিবিদ। তাঁর কারবার জ্যান্ত মানুষকে নিয়ে। তিনি আধুনিক ভারতের প্রথম রাজনীতিবিদ যিনি লক্ষ লক্ষ মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছিলেন। ভারত তার আগে কখনও এ-জিনিস দেখেনি। কংগ্রেসের মধ্যেও তাঁর সাংগঠনিক কূটকুশলতা খুবই লক্ষণীয় ছিল। সুতরাং তাঁকে টলস্টয়, রাস্কিন কিংবা রবীন্দ্রনাথের মতো রিয়্যালপলিটিক না-করা আদর্শবাদী ভাবুক-দার্শনিকের গোত্রে ফেলে বিচার করতে পারি না। তাঁর মতামতের একটা বাস্তবগ্রাহ্য, স্পর্শনীয় রূপ আমরা দেখতে চাইব বইকি। সেই চাহিদা থেকেই আমরা গণতন্ত্র, রাষ্ট্র প্রভৃতি বিষয়ে তাঁর ধারণাগুলিকে বিচার করে দেখব। ঠিক যেভাবে আমরা কার্ল মার্কস, লেনিন কিংবা মাও সেতুংকে বিচার করি, তাঁদের সার্থকতা-ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করি।

গান্ধি ছিলেন স্বঘোষিত ‘নৈরাষ্ট্রবাদী’। তাঁর লক্ষ্য ছিল ‘রাষ্ট্রহীন সমাজ’। রাষ্ট্র কিংবা গণতন্ত্রর মতো জিনিসগুলো তাঁর কাছে ছিল লক্ষ্যসাধনের উপায় মাত্র। রাজনৈতিক ক্ষমতাও তাই: ‘আমার কাছে রাজনৈতিক ক্ষমতা কোনও লক্ষ্য নয়; মানুষ যাতে জীবনের প্রতিটি বিভাগকে আরও উন্নত করে তুলতে সক্ষম হয়, রাজনৈতিক ক্ষমতা তার অনেকগুলি পন্থার মধ্যে একটি। রাজনৈতিক ক্ষমতা বলতে বোঝায় জাতীয় জীবনকে জাতীয় প্রতিনিধিদের মারফত নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। যদি জাতীয় জীবন এতটাই অনিন্দ্য হয়ে ওঠে যে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন হবে না, তাহলে আর কোনও প্রতিনিধিত্বর প্রয়োজনই থাকবে না। তখন একটা আলোকিত নৈরাজ্যর দশা উপস্থিত হবে। সেহেন এক রাষ্ট্রে সবাই সবার প্রভু। প্রত্যেকেই নিজেকে এমনভাবে শাসন করবে যাতে সে কখনওই তার প্রতিবেশীর পথের কাঁটা হয়ে উঠবে না। সেই আদর্শ রাষ্ট্রে অতএব রাজনৈতিক ক্ষমতা বলে কিছু থাকবে না, কারণ সেখানে রাষ্ট্র বলেই কিছু থাকবে না। কিন্তু জীবনে আদর্শ অবস্থার পূর্ণ বাস্তবায়ন তো কখনও ঘটে না। তাই থোরো-র সেই বহুপরিচিত উক্তিটি অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে: সেই শাসনপ্রক্রিয়াই শ্রেষ্ঠ যা সবচেয়ে কম শাসন করে।’ (ইয়ং ইন্ডিয়া, ২ জুলাই ১৯৩১) এ অতি মূল্যবান ও মহৎ কথা।

সুতরাং গান্ধি জানেন ও মানেন, বাস্তবে একটা কেজো গণতন্ত্র ছাড়া চলবে না। কেবল দেখতে হবে, সেই গণতন্ত্রর অপব্যবহার যেন না ঘটে। মানুষের তৈরি কোনও জিনিসই নিখুঁত নয়; সুতরাং মানুষের তৈরি গণতান্ত্রিক চন্দ্রে কলঙ্ক থাকবেই। তাঁর মতে সে-কলঙ্কের মাত্রা কমানোর পথ হল অহিংসা। তাই ফলিত গণতন্ত্র অপেক্ষা তিনি জোর দিলেন গণতান্ত্রিক চেতনার ওপর: ‘গণতান্ত্রিক চেতনা একটা যন্ত্রবৎ জিনিস নয় যাকে বিভিন্ন রূপের অবসানের মধ্য দিয়ে ঠিকঠাক গুছিয়ে নেওয়া যাবে।’ তাহলে করণীয় কী? এখানেই উঠে আসে তাঁর বহুখ্যাত বিকেন্দ্রীকরণের তত্ত্ব: ‘ক্ষমতা যদি সকলের মধ্যে ভাগাভাগি করে না-নেওয়া যায় তাহলে গণতন্ত্র কোনওদিনই সম্ভবপর হয়ে উঠবে না। … এমনকী যে-অস্পৃশ্যটি, যে-শ্রমিকটির দৌলতে আপনি আপনার জীবিকা অর্জন করেন, এই স্বয়ং-প্রশাসনে তারও ভাগ থাকবে, তারই নাম স্বরাজ্য অথবা গণতন্ত্র।’ (Young India, December 1, 1927) এ-ও অতি মহৎ ও যুক্তিযুক্ত কথা। গণতন্ত্র বলতে তিনি যে ‘এলিট’দের গণতন্ত্র বোঝাচ্ছেন না, তা পরিষ্কার। তাই তাঁর কাছে আমরা জানতে চাইব, একজন অস্পৃশ্য আর একজন বর্ণহিন্দুর মধ্যে, একজন শ্রমিক আর একজন মালিকের মধ্যে, সম্পত্তির, সুযোগসুবিধার, সামাজিক অবস্থানের বৈষম্য কীভাবে দূর করা যাবে? যারা সুবিধাজনক অবস্থান দখল করে আছে, বিনা-বলপ্রয়োগে কীভাবে তাদের সেই অবস্থান থেকে সরানো যাবে? ওইসব বৈষম্য দূর করা, সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা, এ তো সব রাজনৈতিক দার্শনিকেরই অন্তিম লক্ষ্য? সেখানে গান্ধির মতে ‘অছিগিরি’-তত্ত্ব খুব কার্যকর। সম্পত্তিবানরা সম্পত্তিহীনদের ‘অছি’ হিসেবে কাজ করবে। চাকর আর মনিবদের মধ্যকার ভেদাভেদ দূর করে দেবে এই অছিগিরি পন্থা: ‘খাওয়া-পরার অভাবে কাউকে যেন ভুগতে না হয়। অর্থাৎ কিনা, প্রত্যেককেই এমন কাজ দিতে হবে যা তার দিন গুজরানের পক্ষে যথেষ্ট। আর এই আদর্শকে সর্বজনীনভাবে বাস্তবায়িত করা যাবে, যদি উৎপাদনের উপকরণ আর জীবনের অপরিহার্য মূল জিনিসগুলি জনসাধারণের নিয়ন্ত্রণে থাকে। ঈশ্বরের দেওয়া জল আর বাতাসের মতোই সেগুলি সকলের বিনামূল্যে লভ্য, অন্তত লভ্য হওয়া উচিত। কোনও দেশ, কোনও নেশন, কোনও ব্যক্তিগোষ্ঠী যদি তার ওপর একেচেটে অধিকার কায়েম করে, সেটা হবে অন্যায়। এই সরল সূত্রটিকে অগ্রাহ্য করার ফলেই শুধু আমাদের এই সুখময় দেশটিতেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য অংশেও দুর্দশার চিত্র এমন প্রকট হয়ে উঠেছে।’ আদপেই মৌলিক বা নতুন না হলেও কথাগুলি অত্যন্ত মহৎ। কিন্তু অহিংসা তত্ত্ব দ্বারা কীভাবে এ আদর্শ রূপায়ণের লক্ষ্যে এগোতে হবে, সে বিষয়ে এ থেকে কিছু জানা গেল কি? যারা একচেটে অধিকার দখল করে রেখেছে, তাদের হৃদয় পরিবর্তনই নাকি এর একমাত্র পথ! অত শস্তা নয় তাদের হৃদয়: আমার হৃদয় আমারই হৃদয়, বেচিনি তো তাহা কাহারও কাছে! না, একজন রিয়্যালপলিটিক করা বড় মাপের রাজনীতিবিদের কাছ থেকে একথা আমরা শুনতে চাই না।

অপর দিকে, অধিকার আর কর্তব্যর মধ্যে তিনি জোর দেন দ্বিতীয়টির ওপর। ‘কর্তব্যগুলি না সেরে আমরা যদি অধিকারের পিছনে ছুটি, তাহলে সেটা হবে আলেয়ার পিছনে ছোটার সামিল।’ (Young India, January 1, 1925) এখানেও তাত্ত্বিক দিক থেকে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু বাস্তব চিত্রটির কথা খেয়াল রাখলে একটা প্রশ্ন উঠেই পড়ে। শ্রমিকের কর্তব্য মালিকের হয়ে কাজ করা; সেই কর্তব্য পালন না করে, অর্থাৎ কাজে ‘ফাঁকি’ দিয়ে অধিকার দাবি করা অন্যায়। কিন্তু মালিকের মালিকানাটা, পুঁজিতান্ত্রিক শোষণের প্রক্রিয়াটা কি ন্যায়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে? সমাজের পরিস্থিতিটা যেহেতু একেবারেই একঝোঁকাভাবে মালিকের অধিকারকে স্বতঃন্যায্যতা দান করে, তাই শ্রমিকের কর্তব্য আর মালিকের অধিকারকে এক মানদণ্ডে বিচার করা চলে কি? আর ওইভবে বিচার করলে কার্যত মালিকদেরই সমর্থন করা হয় না কি?

মৃত্যুর কিছুকাল আগে গান্ধি বলেছিলেন, ‘আজ পুঁজিপতি আর জমিদাররা নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলছে, অন্যদিকে শ্রমিকরাও তাদের অধিকারের কথা বলছে, রাজন্যরা বলছে শাসন করার দেবদত্ত অধিকারের কথা, রায়তরা বলছে প্রতিরোধ করার অধিকারের কথা। সবাই যদি স্রেফ অধিকারের ওপর জোর দেয়, কর্তব্যর ওপর যদি জোর না-দেয়, তাহলে তো চরম বিভ্রান্তি আর বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে।’ তার বদলে, ‘অধিকারের ওপর জোর না দিয়ে, প্রত্যেকে যদি আপন আপন কর্তব্যটা করে, তাহলেই কিন্তু তৎক্ষণাৎ মানবজাতির মধ্যে শৃঙ্খলার শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। শাসন করবার কোনও দেবদত্ত অধিকার নেই রাজাদের, মালিকদের প্রতি নতজানু হয়ে শ্রদ্ধা জানাবার মতো হীন কর্তব্যও নেই কোনও রায়তের।’ (Harijan, July 6, 1947) এই ‘শৃঙ্খলার শাসনে’, যার অন্য নাম স্থিতাবস্থা,  কার ক্ষতি, কার লাভ? অধিকার আর কর্তব্যকেইভাবে স্থান-কাল-পাত্র-নিরপেক্ষভাবে বিচার করলে সে-বিচার কিন্তু সমাজের স্থিতাবস্থাকেই বজায় রাখে, যেটা সর্বান্তঃকরণে কাম্য সমাজের মালিকদের। আবার সেই অদ্ভুত রসিকতাটা মনে পড়ে: আপনি কাদের হয়ে নিরপেক্ষ?

গান্ধিজির গণতন্ত্র, তাঁর অহিংসা তত্ত্বরই মতো, খুব মহৎ এক কবিতার সঙ্গে তুলনীয়। তার ব্যঞ্জনাগুলি বড়ই সূক্ষ্ম, তার পথ এতই অদৃশ্য, যে তাকে তারিয়ে তারিয়ে একটু একটু করে উপভোগ করা যায়; কিন্তু রূঢ়-কঠিন বাস্তবতার মোকাবিলায় তার উপযোগিতা কতখানি, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...