পরিবেশ সংরক্ষণ ও ভারতের মথমানবী

চার নম্বর নিউজডেস্ক

 

পরিবেশের জন্য যাদের লড়াইয়ের কথা আমরা জানি তাদের বেশিরভাগই প্রতিষ্ঠানের তোয়াক্কা না করা মানুষজন। যাদব পায়েং, ‘সালুমারাদা’ থিম্মাক্কা যেমন। এঁরা এতটাই অচিরাচরিত যে এদের অনুসরণ, এমনকি অনুকরণ করাও মুস্কিল। প্রথাগত শিক্ষাদীক্ষা নয়, এঁদের কাজের প্রেরণা হৃদয়। কিন্তু যদি রীতিমতো শিক্ষা ও ম্যানেজমেন্ট স্কিল যুক্ত হয় পরিবেশের জন্য কাজ করার সদিচ্ছার সঙ্গে? সেই দুর্লভ মণিকাঞ্চনযোগের এক উদাহরণ হলেন ডক্টর ভায়ালুর শুভলক্ষী। বম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির সাথে দীর্ঘ দু’দশক মথ-গবেষক ও এডুকেটর হিসেবে যুক্ত থাকার পর চাকরি ছেড়ে দিয়ে যিনি জন্ম দিয়েছেন তিনটি সফল ব্যবসায়িক উদ্যোগের– লেডিবার্ড এনভায়রনমেন্টাল কনসালটেন্সি, আই-নেচারওয়াচ ফাউন্ডেশন এবং বার্ডউইং পাবলিশার্স। শুধুই পরিবেশবাদী নন, আবার শুধু উদ্যোগপতিও নন– নিজের বিশেষ অবস্থানটি বোঝাবার জন্য তিনি ব্যবহার করেন Ecopreneur শব্দটি। ব্যাপারটা ঠিক কী তা বোঝার জন্য ডক্টর শুভলক্ষীর গড়া লেডিবার্ড এনভায়রনমেন্টাল কনসালটেন্সি-র ফেসবুক পেজ থেকে উদ্ধৃতি দিলাম– So, if you are looking for environmentalists donning academic feather on their business managerial cap, then we fit the bill.

মুম্বাইয়ের অ্যান্টপ হিলে সিজিএস কলোনির যে বাড়িতে বেড়ে ওঠা, তার সামনে ছিল বিরাট খোলা মাঠ। হরেকরকম বুনো গাছপালায় ভরা এই মাঠে ফড়িং আর প্রজাপতির পেছনে ছুটতে ছুটতেই তৈরি হয় প্রকৃতি আর প্রাণের প্রতি ভালবাসা। স্যাংচুয়ারি এশিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডক্টর শুভলক্ষী বলছেন,” বিএনএইচএস এ আমার প্রাক্তন বস ডক্টর আরশাদ রহমানির কথায়, ‘নেচার বাগ’ এর কামড় খাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় শৈশব। আমার ক্ষেত্রে তাই হয়েছিল৷”


বিজ্ঞান নিয়ে যারা পড়ছে তাদের কেরিয়ার অপশন সেই বেড়ে ওঠার সময় ছিল সীমিত–হয় ডাক্তার, নয় ইঞ্জিনিয়ার। ডাক্তার হওয়ার ছাড়পত্র না মেলায় শুভলক্ষী জুলজি নিয়ে বিএসসি-তে ভর্তি হন। আর সেইসময় থেকেই শুরু হয় বম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির সাথে সম্পর্ক–একজন ছাত্র সদস্য হিসেবে। “সেইসময় আমার হাতে সোসাইটি-আয়োজিত ট্রিপে যাওয়ার মত পয়সাকড়ি থাকত না। গ্র‍্যাজুয়েশনের পর এটা ওটা একাধিক কাজ করতে হয়েছে পকেট মানির জন্য। কিন্তু কি এক ভালবাসার টানে আবার ফিরে গেছি বিএনএইচএস-এই। সোসাইটির তখনকার লাইব্রেরিয়ান আইজ্যাক কিহিমকর আমাকে উৎসাহ দিয়ে বলেন নিয়মিত সোসাইটি আয়োজিত নেচার-ট্রেইল এবং নেচার-ওয়াকে অংশ নিতে। আমারও ভালো লাগত এমন সব মানুষের সাহচর্য যাদের সর্বক্ষণের আলোচনার বিষয় প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণ।” ১৯৯৩ সালে বিএনএইচএস-এই কনজার্ভেশন এডুকেশন সেন্টারের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে চাকরিতে ঢোকা। এরপর এখান থেকেই মাস্টার্স ডিগ্রি এবং ডক্টরাল রিসার্চ করা– প্রথমে প্রজাপতি নিয়েই কাজ করার কথা ভেবেছিলেন, পরে রিসার্চ গাইডের পরামর্শমত বেছে নেন তুলনায় উপেক্ষিত মথ-দের। কনজার্ভেশন এডুকেশনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিইসি-তেই এডুকেশন অফিসার হয়ে যোগ দেন ১৯৯৭ তে। এরপর ২০০৩ এ ফুলব্রাইট ফেলোশিপ পেয়ে আমেরিকা যাত্রা। ফিরে এসে নতুন নতুন ধারণার প্রয়োগ করতে শুরু করেন সিইসি-তে। যে সমস্ত কনজার্ভেশন এডুকেশন প্রোগ্রাম চালু হয় তাদের কয়েকটার নাম বললেই বোঝা যাবে তাদের বিশিষ্টতা–ব্রেকফাস্ট উইথ বাটারফ্লাইজ, ব্রাঞ্চ উইথ বার্ডস, ট্যুর উইথ ট্রীজ, ব্যাশ উইথ বাগস, মীল উইথ মথস। শহুরে জনতার মধ্যে সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়িয়ে তোলার মজাদার এইসব প্রোগ্রাম বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে পরবর্তী এক দশকে। পিঠোপিঠিই শুরু করেন আর এক ‘ফার্স্ট’– এনটমোলজির ওপর ভারতের প্রথম অনলাইন কোর্স। এভাবে, তাঁর নিজের কথাতেই, শুধু সিইসি-র কর্মপদ্ধতিই বদলে যায় না, সাথে সাথে প্রকৃতিপাঠের জগতে লাগে গ্ল্যামারের ছোঁয়া।

নিজের মত করে কিছু করার জন্য ভেতর থেকে ছটফটানি অনুভব করতে শুরু করেন ২০০৯ সালে হুবার্ট এইচ হাম্ফ্রে প্রোগ্রামে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে নন-প্রোফিট ম্যানেজমেন্ট শিখতে গিয়ে। ফিরে আসার পর থেকে মনে হতে থাকে যে সিইসি-তে যে সব প্রোগ্রাম চলছে সেগুলো বড় করে ছকার একটা সীমা আছে। নেহাত একজন এডুকেটর সেই সীমা অতিক্রম করতে পারে না। শুভলক্ষী তখন উদগ্রীব বৃহত্তর এবং জটিলতর কোনও চ্যালেঞ্জের জন্য। ২০১২ সালে ইউ এস স্টেটস ডিপার্টমেন্টের ভারতের জন্য অ্যালামনাই ইনোভেশন এনগেজমেন্ট ফান্ড জিতে নেন শুভলক্ষী, এবং আইজ্যাক কিহিমকর সহ আরওল চারজনকে নিয়ে গোটা দেশের দেড়শজনকে নন-প্রফিট অর্গানাইজেশনাল ডেভেলপমেন্ট নিয়ে প্রশিক্ষণ দেন। “এরপর ২০১৪ সালে যখন ভারত সরকার ইন্ডিয়ান কম্প্যানিজ অ্যাক্টে সমস্ত রেজিস্টার্ড সংস্থার জন্য মোট বাৎসরিক লাভের দুই শতাংশ কর্পোরেট সোশাল রেসপন্সিবিলিটি খাতে খরচ করা বাধ্যতামূলক করল, আমার প্রথমেই মনে হয়েছিল এটা এনভায়রনমেন্টাল এনজিও দের জন্য খুব ভাল খবর। আমি চেয়েছিলাম বিএনএইচএস এই সুযোগটা নিক, কিন্তু আমি সফল হইনি।”

এই অসাফল্যের ভেতরেই নিহিত ছিল লেডিবার্ড এনভায়রনমেন্টাল কনসালটেন্সির বীজ। “আমি জানতাম এতশত মানুষী সমস্যা থাকতে কর্পোরেট সংস্থা বন্যপ্রাণ-সংক্রান্ত পরিবেশ প্রকল্পে টাকা ঢালতে আগ্রহী হবে না। এনভায়রনমেন্টালিস্টরা টাকা তুলতে ব্যর্থ হন তার একটা প্রধান কারণ প্রস্তাবিত প্রকল্প থেকে কী কী লাভ হতে পারে সেটা তাঁরা স্পষ্ট করে বোঝাতে পারেন না।” একদিকে কর্পোরেটদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে নন-প্রফিট সেক্টর সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা–এই দুয়ের যোগ হয়েছিল শুভলক্ষীর মধ্যে। তাই লেডিবার্ডের সাফল্য পেতে সময় লাগে নি। মাত্র দু বছরেই একুশ ক্লায়েন্টের সাথে ঊনত্রিশখানা প্রোগ্রাম এবং সাতটা প্রোজেক্ট! গড়ে উঠছে সাতখানা প্রজাপতি-উদ্যান, যাতে বসানো হয়েছে একত্রিশ হাজার চারা। তৈরি হয়েছে আই-নেচারওয়াচ, আই-ট্রী, আই-বাটারফ্লাই সমেত চারটে অ্যাপ যার মাধ্যমে প্রকৃতি চেনার প্রাথমিক পাঠ নিতে পারবে শহুরে উৎসাহীরা।

এনভায়রনমেন্টাল সিএসআর নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কিছুদিনের জন্য ছেদ পড়েছিল নেচার-ট্রেল এবং নেচার-ওয়াক জাতীয় কর্মসূচীতে। কিন্তু সিইসি-তে থাকাকালীন যারা এইসব প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন তাদের একটা বড় অংশের দাবিতে আলাদাভাবে গড়তে হয় আই-নেচারওয়াচ ফাউন্ডেশন। একইরকমভাবে প্রয়োজনের তাগিদেই জন্ম নেয় বার্ডউইং পাবলিশার্স-এর, যার প্রথম প্রকাশিত বইটি, ‘ফিল্ড গাইড টু ইন্ডিয়ান মথস’, ডক্টর শুভলক্ষীর দীর্ঘ পনের বছরের গবেষণার ফসল। “স্বাধীন ভারতে মথদের নিয়ে এমন কোনো বই আগে প্রকাশ হয়নি। এর আগে ১৮৮১ সালে ছাপা ‘দ্য ফনা অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, ইনক্লুডিং সিলোন অ্যান্ড বর্মা’-র কটি ভলিউমই ছিল ভারতীয় মথ নিয়ে একমাত্র কাজ।”

কর্পোরেট মানেই পরিবেশবাদীর কাছে অচ্ছুৎ, অথবা টেক-স্যাভি হওয়ার দায় তার নেই–এমনতর একাধিক প্রচলিত ধারণাকে দৃঢ়তার সাথে খণ্ডন করেছেন ডক্টর শুভলক্ষী তাঁর কাজ দিয়ে। রেটরিকের বদলে ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করাতেই চিরকাল বিশ্বাস। ঠিক কেমন মানুষ তিনি? শোনা যাক তাঁর নিজের কথায়। “ভারতে যারা মথ নিয়ে কাজ করেন তাদের বেশিরভাগই পুরুষ, কিন্তু আমি খুশি যে অন্তত কয়েকজন মহিলা এখন এই ফিল্ডে এসেছেন। আমি যখন ডক্টরাল রিসার্চ করছি তখন সঞ্জয় গান্ধী ন্যাশনাল পার্কের তৎকালীন ফিল্ড ডাইরেক্টর আমাকে প্রশ্ন করেন যে একজন মেয়ে হয়ে দিনের আলোয় প্রজাপতি স্টাডি না করে আমি কেন রাতের বেলা ঝোপেঝাড়ে মথের পেছনে ঘুরি। মেয়ে হয়ে ব্যাপারটা ঠিক মানায় না, উনি বলেন। আমি ওনাকে উত্তর দিই, কাউকে না কাউকে তো এই রাতের বেলায় অস্বস্তিকর কাজটা করতেই হত। তাহলে আমিই নই কেন?”

ডক্টর শুভলক্ষীর তৈরি করা দৃষ্টান্ত অনুসরণযোগ্য। শহুরে, শিক্ষিত মানুষ অনেক সহজেই তার সাথে নিজেকে মেলাতে পারবেন। আশা করা যাক অদূর ভবিষ্যতে পরিবেশ ও সংরক্ষণ নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে ওনার দৃঢতা ও দূরদৃষ্টি পরিবেশবাদীদের পথ দেখাবে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...