ভারতীয়ত্ব ও গণতন্ত্র

ধীমান বসাক

 

আমরা ভারতীয়। ভারত নামক বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বাসিন্দা। কিন্তু কথাটা হচ্ছে, ভারতীয় বলতে রাষ্ট্র ছাড়া অন্য কী পরিচয় আছে, যা দিয়ে ভারতীয় বলে চেনা যাবে?

প্রথমে নেওয়া যাক ধর্মকে। হিন্দু নিঃসন্দেহে এক বড় অংশের পরিচয়। কিন্তু সবাই তো হিন্দু নন। মুসলমান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি, ক্রিশ্চান, প্রকৃতিপূজক আছেন। তারা কি ভারতীয় নন? মানে, ধর্মপরিচয়ের অভিন্নতা দিয়ে ভারতীয় চেনা গেল না।

এবার ভাষা। ভারতে হাজারের ওপর ভাষা, সরকার স্বীকৃত ভাষাও প্রচুর। আর সেগুলোর মধ্যে কোনও মিল নেই। খাড়ি বোলি, অওধি, মাগধি, ভোজপুরি, উর্দু, বাংলা, অসমিয়া, ওড়িয়া, ছত্তিশগড়ি, রাজস্থানি, গুজরাটি, মারাঠি প্রভৃতি ভাষাগুলো নিজেদের মধ্যে প্রচুর তফাত। তাও যদিও বা এগুলো ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে বলে এদের মধ্যে কোনও মিল পাওয়াও যাও, তামিল তেলেগু কন্নড় মালয়ালি তো একেবারেই অন্য ভাষাগোষ্ঠী। তারপর আছে উত্তরপূর্বের বিভিন্ন ভাষা। তারপর মুণ্ডা সাঁওতাল কোল ভীল এদের ভাষার গোষ্ঠীও একেবারে আলাদা। তাহলে কোনও একটা ভাষাও ভারতীয়ত্বের পরিচয় নয়।

এরপর পোশাক, খাবার, আচার, অনুষ্ঠান কোনও একটাকেও ভারতীয়ত্বের পরিচায়ক বলা যাবে না।

তাহলে একটা লাগোয়া ভূখণ্ড এবং একই রাষ্ট্রের অধীনে থাকা, যেমন অনেকটা অশোক বা মুঘল বা ব্রিটিশ আমলে বা হাল আমলে থাকা, এছাড়া ভারতীয়ত্বের আর কোনও কমন বা সাধারণ চিহ্ন নেই?

এবার যেটা বলতে যাব, নিশ্চিতভাবেই সেটা বিতর্কিত। কিন্তু হোক্ না বিতর্ক।

আমার ভাবনায় একটি কমন বিষয় আছে, যা রাষ্ট্র এবং ভৌগোলিক এলাকা ছাড়াও সব ভারতীয় পরিচয়ে অন্তর্লীন। তা হল জাতপাত। এই প্রথাটি, দুঃখের এবং লজ্জার হলেও সব ভারতীয় সমাজে বিদ্যমান। হিন্দু তো বটেই, ভারত বা ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, এমনকি খ্রিশ্চান সমাজেও জাতপাতের বিভাজন আছে। এই সমাজব্যবস্থাটি যে সমস্ত গোষ্ঠীতে প্রবিষ্ট হয়েছে বা আছে, তাদের মধ্যে এক পরিচয়গত ঐক্যও আছে। এটি ভারতের নিজস্ব পরিচয়ও বটে। পৃথিবীর আর কোথাও জন্মের ভিত্তিতে পেশা বিবাহ এবং একত্রে আহার নির্ধারণ হয় বলে আমার জানা নেই।

নিশ্চিতভাবেই এই জাতপাত, একটি গণতন্ত্রবিরোধী প্রগতিবিরোধী শোষণ ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা। একে না ভেঙে, একে না নির্মূল করে, ভারতের প্রগতি বিকাশ গণতন্ত্র সম্ভব হয়ে উঠবে না। ভারতের আশু কাজগুলোর মধ্যে একটা হল এই জাতপাতের জঘন্য ব্যবস্থাটার একেবারে শেকড় থেকে উচ্ছেদ।

কিন্তু এতে করে ভারতীয় পরিচয়ের হয়তো একমাত্র কমন বা ঐক্যের বিষয়টাই উড়ে যাবে। নতুন গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল ভারতবর্ষের ঐক্য কিসের ওপর আধারিত হবে?

ভারতীয় সমাজের পুরনো ক্ষয়ে আসা শক্তিগুলো এটা জানে। তাদের কেউ কেউ তাই এই ব্যবস্থাকে যে কোনও মূল্যে টিঁকিয়ে রাখতে চায়। এটাই তাদের কাছে ভারত। কেউ কেউ অন্য ঐক্য চাপাতে চায়। ধর্মের ভিত্তিতে ঐক্য (হিন্দুরাষ্ট্র), ভাষার ভিত্তিতে ঐক্য (রাষ্ট্রভাষা হিন্দি), বা গণতন্ত্রের ভেক ধরে কেউ কেউ বলেন যে হিন্দুত্ব একটা সংস্কৃতি, ভারতে বসবাসকারী সবারই সংস্কৃতি, ভারতীয় মানেই সবাই এই পরিচয়ের মধ্যেই পড়েন।

এমনকি স্থানীয় স্তরেও এই ঐক্য চাপানোর প্রক্রিয়া চলে। বিহারিরা ঝাড়খণ্ড স্বীকার করতে চান না, বাঙালিরা গোর্খাল্যান্ড, অসমিয়ারা বাঙালিয়ানা।

এর সঙ্গে এটাও দেখার বিষয় যে আদিবাসী বা জনজাতি বলে আমরা যাঁদেরকে বলি, তাঁরা কিন্তু এই জাতপাতের বিভাজনকে এখনও আত্মস্থ করেননি, এখনও তাঁদের নিজস্ব ভাষা রয়েছে, সংস্কৃতি রয়েছে, আর তাই জাতপাতের মধ্য দিয়ে যে ঐক্য ভারতীয়ত্বের পরিচয়কে বয়ে নিয়ে চলে, তাঁরা তার শরিক নন, তাই বারবার রাষ্ট্রীয় শক্তি তাঁদেরকে অস্ত্রের মাধ্যমে, সেই অশোকের আমল থেকে, অধীনস্থ করেছে, আর তাঁরাও তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন।

এর বিপরীতে, যাঁরা নতুন গণতান্ত্রিক ভারতের কথা বলেন, যাঁরা মনে করেন যে জাতপাতের উচ্ছেদ না করে ভারতীয় সমাজের অগ্রগতি সম্ভব নয়, তাঁরা ভারতীয়ত্বের কোন্ নতুন পরিচয়ের কথা তুলে ধরবেন?

এই জাতপাতের ব্যবস্থায় সবচেয়ে নিপীড়িত অংশটিই বা কী ভাবেন? রাষ্ট্রগত একতা, হিন্দু একতা, ভাষার একতা, এগুলোই কি তাদের কাছে কাম্য? নাকি পুরনো ব্রিটিশ-পূর্ব পরম্পরাগত বন্ধনেই তারা সুখ খুঁজবেন?

ব্রিটিশ আমলে ব্রিটিশ বিরোধিতা একধরনের ঐক্যের জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু সেই চেতনাতেও ভীমা-কোরেগাঁও-এর মতো বহু ফাটল রয়ে গেছে।

পাশ্চাত্যে জাতীয় পরিচয়ের ঐক্য মূলত গড়ে উঠেছিল ভাষাগত, কোথাও কোথাও তার সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে। ভারতে তা হবার জো নেই। শিখরা কি আলাদা একটি জাতি? পাঞ্জাবিরা কি আলাদা একটি জাতি? যদিওবা হয়, সেই জাতিতে দলিত শিখের স্থান কোথায়?

ভারতের সমাজের গণতান্ত্রিক আমূল পুনর্গঠন যাঁরা চান, তাঁদেরকে এ প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।

পুরনো জাতিগঠনের প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিয়েছিল পুঁজিপতি শ্রেণি, সহযোগী ছিল চাষিরা। চাষিকে সামন্ততন্ত্রের কবল থেকে মুক্ত করে, পুঁজিপতিরা এক ভাষার এক ধর্মের এক অখণ্ড বাজার নির্ভর জাতির জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু এখনকার পুঁজিপতিরা চাষিকে সামন্ততন্ত্রের বাঁধন থেকে মুক্ত করতে ব্যর্থ, তাই নতুন জাতির বিকাশেও তারা ভূমিকা নিতে ব্যর্থ।

নতুন যে শ্রেণিটি এই দায়িত্ব নিতে পারে, তা হল শ্রমিকশ্রেণি। কিন্তু শ্রেণিগতভাবেই এই শ্রেণিটি আন্তর্জাতিক, কোনও জাতীয় গণ্ডিতে মতাদর্শগতভাবে সে আবদ্ধ নয়। থাকতে পারেও না। কারণ সে হল একমাত্র শ্রেণি যার নিজেকে মুক্ত করতে হলে সমস্ত শ্রেণির মুক্তির জন্য, সমস্ত নিপীড়িতের মুক্তির জন্য তাকে লড়তে হবে।

ভারতে জাতপাত ভাঙার লড়াইটাও তাই শুধুমাত্র জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলার লড়াই হবে না। দলিতরা শুধু নতুন ভারতের জন্য লড়বেন না, তাদেরকে লড়তে হবে নতুন দুনিয়ার জন্যও, এক শোষণমুক্ত ভারতের সঙ্গে এক শোষণমুক্ত পৃথিবীর জন্যও। শ্রমিকশ্রেণির মতবাদ কমিউনিজম ছাড়া তাদের মুক্তির রাস্তা নেই। ঠিক একইভাবে ভারতের কমিউনিস্টরা বারবার ব্যর্থ হবেন যদি দলিতদের জাতপাত ভেঙে ফেলার লড়াইকে তারা নিজেদের লড়াই হিসেবে না দেখেন।

আর ভারতীয় ঐক্য? ভারতবর্ষের শোষণমুক্তির লড়াই এক নতুন রাস্তা খুলতে বাধ্য, যেখানে জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম আন্তর্জাতিকতাবাদের ঝাণ্ডা ধরবে।

আপনি বলবেন, যে প্রশ্ন দিয়ে শুরু করেছিলেন, তার উত্তর কৈ, কী হবে নতুন ভারতীয়ত্বের পরিচয়? আংশিক উত্তর হল, ভারতীয় জাতি গড়ে ওঠার পরিচয় পাশ্চাত্যের মতো এক ভাষা এক ধর্ম এক বাজারের পরিচয়ের গণ্ডির মধ্যে থাকবে না। বাকি উত্তরটা প্রয়োগে খুঁজতে হবে।

কারণ, দার্শনিকরা জগতটাকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু কথা হল সেটাকে পালটানো। কারণ, জ্ঞান কোনও স্কলারের মস্তিষ্কপ্রসূত শুধু নয়, জনগণের প্রয়োগে তা যাচাই হবে, সেটাও গণতন্ত্রই। অতএব কথা হল, বাস্তবকে না পালটে কোনও কিছুই জানা সম্ভব নয়। ভারতীয়ত্ব। এবং গণতন্ত্রও।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1802 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...