সব দিক হেরে যাওয়া এক মানুষের গল্প

সৌমিত দেব

 

I used to think life is tragedy, but now I realize it’s nothing but comedy.

এক বিখ্যাত ছবিতে এক লোক একবার বলেছিল যে “Comedy is a tragedy that is stretched for too long.” টড ফিলিপসের জোকার তারই একটা ডার্ক, ভায়োলেন্ট, পরিবেশনা। একটা সব দিকে থেকে হেরে যাওয়া মানুষের ‘দা জোকার’ হয়ে ওঠার গল্প।

যদিও অরিজিন স্টোরি হিসেবেই ‘জোকার’ ছবিটা প্রচারিত হয়েছিল, কিন্তু ফিলিপসের এই ছবি জোকারের ছবি নয়, ছবিটা আর্থার ফ্লেকের।

১৯৮০ দশকের গোথাম। সেই চিরাচরিত গল্প। বড়লোকরা আরও বড় হচ্ছে, গরীবরা আরও গরীব। শহরতলির সঙ্গে বস্তির তফাৎ প্রায় নেই বললেই চলে। রাস্তার ধারে ময়লার ডাঁইয়ের ওপর ইঁদুর ঘোরাফেরা করছে। আর এই সমস্ত কিছুর মধ্যে রাস্তায় হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে পেশাদার জোকার আর্থার ফ্লেক। হাতে একটা প্ল্যাকার্ড। একটু পরেই কয়েকজন সেটাকে নিয়ে পালাবে, তারপর আর্থার তাদের ধাওয়া করলে তাকে একটা গলির মধ্যে নিয়ে গিয়ে সেই প্ল্যাকার্ড দিয়েই মেরে রাস্তায় ফেলে দেবে, তারপর আবার মারবে। পরদিন আর্থার আবার আয়নার সামনে বসে জোকার সাজবে, নিজের মুখের মধ্যে দুটো আঙুল ঢুকিয়ে যখন জোর করে ‘হাসি’ ফুটিয়ে তুলবে তখন এক চোখের মেকাপ নষ্ট করে নেবে আসবে জল। বলতে বাধ্য হবে ‘I don’t want to be sad anymore.’

একটা দমবন্ধ হয়ে থাকা সোশাল স্ট্রাকচারের একমাত্র ভিকটিম সে যে সেই সোসাইটির চাপা আর্তনাদটা শুনতে পায়।

আগেকার টিম বার্টনের ব্যাটম্যান বা বিভিন্ন অ্যানিমেটেড সিরিজে জোকার ‘তৈরি’ হয়েছিল একটা কেমিকেলের ট্যাঙ্কারে পড়ে গিয়ে। টড ফিলিপসের আর্থার ফ্লেক ‘দা জোকার’ হয়ে ওঠে এমন একটা সোসাইটিতে পড়ে গিয়ে যেটার সঙ্গে সে কিছুতেই কানেক্ট করতে পারছে না। তার চারপাশে যা ঘটছে সেই সমস্ত সে কিছু দেখছে এক বহিরাগত দর্শকের মতো। যখন রাস্তার ধারে পড়ে মার খাচ্ছে তখনও। মানসিক সমস্যায় জর্জরিত, ক্রমাগত ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে চলা এক অসফল স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান। যে আস্তে আস্তে নিজের অন্ধকার থেকে উঠে আসা হাসির দমকটাকে আর সামলাতে পারছে না। লোকসমাজে সামলাতে না পেরে আবার মার খাচ্ছে। কারণ সে ‘Freak’। গোথামের মতো ভেঙেচুরে পড়া একটা শহরের হাতে মার খাওয়া আরও ভেঙেচুরে পড়া ‘Freak’, যে কিনা পরবর্তীকালের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য, ভায়োলেন্ট, ‘Freak Show’ করেই চলবে একের পর এক।

জোয়াকিম ফিনিক্সের অভিনয় এই ছবিতে সমস্ত কিছুকে ছাপিয়ে গেছে। ওয়ান ম্যান শো বলা যায় যাকে। হাঁটাচলা, অভিব্যক্তি, কথা বলা, তাকানো, তিনিই আর্থার ফ্লেক। নিজের বাড়িতে ক্রমাগত কুঁকড়ে যাওয়ার সময় পিঠের হাড়গুলো বেরিয়ে আসছিল। ফিনিক্সের সঙ্গে হিথ লেজারের তুলনা টানা হলে তা বোকামো। কারণ এই ‘জোকার’ আমরা এর আগে দেখিনি।

আর্থারের মা পেনি হিসেবে ফ্রান্সেস করনোয় আর প্রতিবেশী সোফিয়া ডায়ন্ডের চরিত্রে জেজি বিটজ অনবদ্য। তবে সোফিয়া চরিত্রটিকে আরেকটু জায়গা দেওয়া যেত বলে মনে হয়।

এই ছবিতে খারাপ লাগার জায়গা তেমন কিছু নেই, কিন্তু ছোট ব্রুস ওয়েনের (ব্যাটম্যান) সঙ্গে আর্থারের দৃশ্যটা DC Cinematic Universe–এর টাইমলাইনটা একটু ঘেঁটে দেয়। তাছাড়া টমাস ওয়েনের হিপোক্রেসিটা বেজায় গিভেন আর প্রেডিক্টেবল। রবার্ট ডি’নেরো ছোট্ট ক্যামিওতে একেবারে লেট নাইট হোস্ট ম্যুরি ফ্র্যাঙ্কলিন।

লরেন্স শেরের সিনেম্যাটোগ্র্যাফিতে গোথামের অন্ধকার, স্যাঁতস্যাতে, ঠান্ডা, ভাঙাচোরা ইঁটকাঠপাথর একটা আলাদা চরিত্র হয়ে উঠেছে। তবে জোকারে থিম মিউজিক হিসেবে হিলদুরের চেলোর পার্টটুকু দর্শক সিনেমা হল থেকে নিয়ে বেরুবেন।

ছবিটার একটা দৃশ্যের কথা বলে শেষ করি। একদম সাধারণ একটা দৃশ্য। কিন্তু সাধারণ একটা দৃশ্য দিয়েও এতটা অস্বস্তিকর, ডার্ক, প্রভাব ফেলতে পারাটাই টড ফিলিপসের ‘জোকার’। দৃশ্যে আর্থার আর তার প্রতিবেশী সোফিয়ায় সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে লিফটে। যথারীতি ভাঙাচোরা বাড়ির ভাঙাচোরা লিফট, চলছে না, থেমে থেমে যাচ্ছে, লাইট ফ্লিকার করছে। এমন সময়ে এই সোফিয়া হাত দিয়ে একটা বন্দুকের মতো ইশারা করে অবস্থাটা বোঝাতে। আর্থার আলতো হাসে। লিফট থামে। আর্থার লিফট থেকে নামে এবং দা জোকার সেই হাতের মাধ্যমে বন্দুকের ইশারাটা ফিরিয়ে দেয় সোফিয়াকে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...