বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে এই ঘটনা একটি মাইলস্টোন হয়ে থাকবে

পাঞ্চালী কর

 

শতাব্দী-প্রাচীন বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে আমাদের গর্ব করার মত উপাদান অঢেল রয়েছে: ঐতিহাসিক মাইলস্টোন সেট করে নাটক, খ্যাতনামা অভিনেতা, অভিনেত্রী, নির্দেশক, আলোক শিল্পী; থিয়েটারকে হাতিয়ার বানিয়ে রাজনৈতিক লড়াই, সামাজিক অভ্যুত্থান, শোষকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অস্ত্র হয়ে ওঠা। এরই পাশাপাশি আলোর পৃষ্ঠে অন্ধকারের মত রয়ে গিয়েছে কিছু গ্লানি যা থিয়েটারকে কলুষিত করে আসছে সুদীর্ঘকাল ধরে, কিন্তু তার সুরাহা এত বছরেও হয়নি। থিয়েটারে যৌন হেনস্থা তেমনই একটি সমস্যা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সমস্যা এতই ভয়াবহভাবে প্রকট যে বহু মানুষ চাননি তা সামনে আসুক, কারণ তাতে এমন অনেক নাম জড়িয়ে পড়বে, যাঁদের আমরা এই শিল্পের শীর্ষস্থানে মর্যাদার আসনে বসিয়েছি। কিন্ত যে মর্যাদা, যে খ্যাতি, যে সম্মানের পিছনে মেয়েদের অধিকার খণ্ডনের দীর্ঘ ইতিহাস থাকে, তা গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়।

সম্প্রতি প্রখ্যাত নট সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ আনে বছর কুড়ির এক ছাত্রী এবং থিয়েটার অভিনেত্রী। ওই ছাত্রী ফেসবুকে তাঁর বয়ানে প্রাথমিকভাবে জানান যে উক্ত সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় তাঁকে ডায়াফ্রাম ব্রিদিং এবং সাইকো-ফিজিক্যাল আ্যক্টিং শেখানোর অছিলায় তাঁর সম্মতির বিরুদ্ধে তাঁর সঙ্গে অশ্লীল আচরণ করেন। উক্ত ছাত্রী যেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, সেখানেই শিক্ষকতা করতেন সুদীপ্ত। সেই প্রতিষ্ঠানের প্রযোজনায় একটি নাটকের অডিশন দিতে গেলে সেখান থেকে অভিযোগকারীকে নিজের দলের একটি প্রযোজনার জন্য নির্বাচন করেন সুদীপ্ত। সেই প্রযোজনায় অভিনয়ে কিছু খামতি থেকে যাচ্ছে এবং তা সংশোধনের দরকার এই মর্মে ওই ছাত্রীকে নিজের বাড়িতে ডাকেন এবং যৌন হেনস্থা করেন। এই ঘটনা ওই ছাত্রীর মনে এমন গুরুতর মানসিক আঘাত সৃষ্টি করে যে বেশ অনেকগুলো মাস ধরে সে সত্যিটা মানুষের সামনে তুলে ধরার প্রত্যয় জুটিয়ে উঠতে পারেননি। ধীরে ধীরে সাহস সঞ্চয় করে তিনি শেষ পর্যন্ত ওঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন, এবং অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবেই এই লিখিত অভিযোগের এক দিনের মাথায় সুদীপ্ত সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পদত্যাগ করেন। এরপরই ওই ছাত্রী সোশ্যল মিডিয়ায় নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

এই বয়ান সোশ্যল মিডিয়ায় আসার সঙ্গে সঙ্গে তা বিভিন্ন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং অল্প সময়ের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। হাজারের বেশি মানুষ ওঁর বয়ানটি শেয়ার করে, কেউ সলিডারিটি জানায়, কেউ সাহস যোগায়, কেউ অপরাধীর চরমতম শাস্তির দাবি করেন। ইতিমধ্যে আরও একটি মেয়ে জানান যে তাঁরও অভিজ্ঞতা একই রকমের। তাঁকেও ডায়াফ্রাম ব্রিদিং শেখানোর অছিলায় তাঁর সঙ্গেও সুদীপ্ত অসভ্য আচরণ করেন। আরও দুজন মেয়ে এগিয়ে আসেন এবং জানান যে তাঁদেরও সুদীপ্ত-র অশিষ্ট আচরণের শিকার হতে হয়েছে। সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়ের পাশাপাশি আর একটি নাম উঠে আসে বিভিন্ন ভিক্টিমের বয়ানে: সুপ্রিয় সমাজদার, যে দীর্ঘদিন ধরে থিয়েটার ট্রেনিংয়ের নামে তাঁর বিকৃত যৌন বাসনা পরিপূর্ণ করার চেষ্টা করে আসছেন। এক থিয়েটার প্র্যাকটিশনার জানান যে আনুমানিক ১০ বছর আগে থিয়েটার ট্রেনিংয়ের নামে সুপ্রিয় তাঁর সঙ্গে যৌন হেনস্থা করেন। সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশ কিছু মানুষ জানান যে সুপ্রিয় ট্রেনিংয়ের নামে, কাজ দেওয়ার নামে, প্রসেসের নামে বিভিন্ন সময়ে কী কী ভাবে থিয়েটার কর্মীদের সম্মতির উল্লঙ্ঘন করেছেন।

সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন যে সে যা করেছে তা সমীচীন, তা প্রসেসের অংশ, এবং এই প্রসেস তিনি শ্রদ্ধেয় নট ও নাট্যকার প্রয়াত অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে শিখেছেন। ইতিমধ্যে সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা দুই থিয়েটার কর্মী পুলিশের কাছে আইনি নালিশ দাখিল করেন যার ভিত্তিতে পুলিশ সুদীপ্তকে গ্রেফতার করে, এবং পরের দিন আদালত সুদীপ্তর জামিন অগ্রাহ্য করে তাঁকে দুই দিনের পুলিশি হেফাজত দেন। বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে এই ঘটনা একটি মাইলস্টোন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর এই প্রথম কোনও যৌন হেনস্থাকারীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভাব হয়েছে। লড়াই এখনও অনেক বাকি, কিন্তু থিয়েটার অনেকটা পথ এগিয়েছে এই কয়দিনে।

যখন এতদিনের গোপনীয়তা ভেঙে যৌন হেনস্থার অভিযোগ একের পর এক সামনে আসছে তখন অত্যন্ত দুর্ভাগ্যবশত নাট্যজগৎ দুই ভাগে বিভক্ত: একদল মনে করেন থিয়েটার কম্যুনিটিকে ‘সেফ স্পেস’ হিসেবে তৈরি করতে এইসব ঘটনা সামনে আসা দরকার এবং দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা নিজেদের নাম, যশ, খ্যাতি, শিক্ষাকে হাতিয়ার করে নিজেদের সীমা লঙ্ঘন করে চলেছেন, তাঁদের মুখোশ খুলে দেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে থিয়েটার জগতের বহু বিশিষ্ট মানুষকে এই বিষয়ে মুখ খুলতে দেখা যায়নি। কিছু মানুষ সদর্পে মতামত দিয়েছেন যে এইসব ঘটনায় ভিকটিমও সমান দায়ী, বা কোনও প্রমাণ ছাড়া কেউ অভিযোগ আনছে কীসের ভিত্তিতে, অথবা ঘটনা ঘটে যাওয়ার এতদিন পরে বলছে কেন। এই অযাচিত ভিকটিম ব্লেমিং থেকে বোঝা যায় যে লিঙ্গ হিংসা এবং যৌন নির্যাতন সম্বন্ধে তথাকথিত শিক্ষিত বা এগিয়ে থাকা মানুষের জ্ঞানও কতটা পিছিয়ে আছে। থিয়েটারে গুরু প্রথা ভীষণভাবে বিদ্যমান, সেখানে শিক্ষক যদি তাঁর প্রিভিলেজড পজিশন, জ্ঞান ইত্যাদি ব্যবহার করে এক সদ্য থিয়েটার যোগ দেওয়া অল্পবয়সী মেয়েকে বা ছেলেকে যৌন হেনস্থা করেন, তাঁর দায় কোনওভাবেই শিক্ষার্থীদের হতে পারে না। শিক্ষার্থী কেন গিয়েছে, কেন না বলেনি এসব প্রশ্ন অবান্তর, অশ্লীল, এবং কুৎসিত। ভিকটিম বুঝেই উঠতে পারে না অনেক সময় তার সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে, কারণ তাদের জানা নেই কোনটা প্রসেস আর কোনটা প্রসেসের দোহাই দিয়ে কদর্য ব্যবহার।

এই বিষয়ে আলোকপাত করতে একটি প্রতিবাদ সভার ডাক দেওয়া হয় ১৯ অক্টোবর, ২০১৯-এ। বিভিন্ন নাট্য ব্যক্তিত্ব এবং জেন্ডার আ্যক্টিভিস্ট মতামত রাখেন দোষীর শাস্তির দাবিয়ে, মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির দাবিতে যাতে তারা বুঝতে পারে কোনটা মেথড এবং কোনটা মলেস্টেশন। কনসেন্ট কী ও কেন, সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ধর্ষণ নির্ণয় করতে যে টু ফিঙ্গার টেস্ট ব্যবহৃত হয় তা আর এক ধাপের ভায়োলেশন, সেই বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুযোগ্য ছাত্রছাত্রী অশোক মুখোপাধ্যায়, অশোক চট্টোপাধ্যায়, মায়া ঘোষ সুদীপ্ত-র বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান অজিতেশের নাম নিয়ে নিজের কুকর্ম ঢাকার প্রচেষ্টাতে। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁদের কথায় থিয়েটারের যুগ যুগ ধরে চলে আসা পিতৃতান্ত্রিক, ব্রাহ্মণ্যবাদী দিকগুলি ফুটে ওঠে। এটা সর্বৈব সত্যি যে কয়েক যুগ আগের মানুষের কাছ থেকে আমরা এখনকার ভাবনাচিন্তা আশা করতে পারি না, এবং সেই সময় দাঁড়িয়ে মায়া ঘোষের মত মানুষ বেরিয়ে এসে থিয়েটারটাই করে গিয়েছেন দাপটের সঙ্গে, সেই অবদান অবশ্যই নারীবাদী, নিজের সমস্ত সীমাবদ্ধতা নিয়েও নারীবাদী, কারণ তাঁরা ছিলেন মার্গদর্শক, যার ফলে পরবর্তীকালে মেয়েদের থিয়েটার করায় বাধা পেতে হয় না। কিন্তু সেই লিগ্যাসি মাথায় করে রাখার সঙ্গে সঙ্গে পিতৃতান্ত্রিক মননকে ভেঙে নতুন করে ভাবনার পরিসর তৈরি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ এই দূষিত মতবাদ পুরনো সময়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তার ধারক ও বাহক বহু সংখ্যক এখনকার মানুষেরাও।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...