খেসারত

নাহার তৃণা

 

আজমত একটা সরকারি অফিসে ক্যাজুয়াল হিসেবে চাকরি করে। টাইপিস্টের পদে। ইন্টার পাশ করে বহুদিন বেকার থাকার পর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এই চাকরিটা পেয়েছে। চাকরিটা স্থায়ী হবার কথা ছিল পাঁচ বছর পর। কিন্তু দশ বছর পার হবার পরও স্থায়ী হবার কোনও লক্ষণ নাই। প্রমোশন নাই, ইনক্রিমেন্ট নাই, বয়স চলে গেছে অন্য চাকরি খোঁজারও সুযোগ নাই। ওই বেতনের টাকায় সংসার চলে না। তবে এক পেট কোনমতে চালিয়ে নেয়া যায়। বিয়ে করেছিল। কিন্তু বউ চলে গেছে তার বেহাল দশা দেখে। এখন সে একা একটা মেসে থাকে, কোনওমতে দিন কাটায়।

অথচ এই আজমতের একদিন একটা স্বচ্ছল পরিবার ছিল। বাবার সরকারি চাকরি, সরকারি কোয়ার্টারে সুন্দর জীবন। বিশাল পরিবার হলেও অভাবের মুখ দেখেনি সেভাবে। বাবার মৃত্যুর পর গোটা দৃশ্যপট পাল্টে গেল। ভাইবোন সবাই ছিটকে পড়ল একেক দিকে। তবে শেষমেশ যে যার মতো ব্যবস্থা করে নিয়েছে। শুধু আজমত একা রয়ে গেল এই শহরে। আজমত হল সেই দলের লোক যাদের মাথায় বুদ্ধির পরিমাণ কম থাকে, যারা প্রতিযোগিতায় কখনও টিকতে পারে না। লাইন ভেঙে এগোতে পারে না। সবাই আজমতের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে এগিয়ে যায়। আজমত পেছনে পড়ে থাকে।

মধ্য বয়সে এসে হঠাৎ একদিন আজমতের সঙ্গে পরিচয় ঘটে এক নারীর। আজমতের মতো তাকেও ছেড়ে গেছে স্বামী। দুজনে সুখদুঃখের গল্প করে মাঝে মাঝে। দেখা হয় এখানে সেখানে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিচয়ের মিহি স্তর খসে সম্পর্ক গাঢ় হয়ে ওঠে দুজনের। বহুদিন পর আজমতের বুকে একটা সুখের রিনিরিনি বাজে। কিন্তু দুজনেই ঘরপোড়া গরু। আবার ঘর বাঁধতে খুব একটা রাজি নয় তারা। অথচ একটা সংসারের সুপ্ত ইচ্ছা দুজনের বুকে নতুন চর জাগার ইঙ্গিত নিয়ে জেগে থাকে দিব্যি। বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক স্বাধীনভাবে যাপনের চিন্তা আজমতের শরীর-মনে, সময়ে সময়ে, নানাভাবে বুড়বুড়ি কাটলেও, অতটা বুকের পাটা না থাকায় বাস্তবে সে ভাবনা পাখা মেলতে ব্যর্থ হয়।

সেদিক থেকে জুলেখা বরং অনেকটা আগ্রাসী। প্রায় সে আজমতকে পরিচিত গণ্ডি ছেড়ে মফস্বলে গিয়ে একসঙ্গে বসবাস করার প্রস্তাব দেয়। অপরিচিত জায়গায় তাদের পরিচয় নিয়ে কেউ তেমন মাথা ঘামাতে আসবে না। তাছাড়া পরিচিত তিলোত্তমা এ শহরের গণ্ডি কেটে দুজন মানুষের বেরিয়ে যাওয়ায় সমাজ সংসারের কোথাও হেলদোল হবে না। তারা গুনতিযোগ্য কেউ নয়।

সেসব মুহূর্তে শরীরে একটা মোচড় তুলে, শেভহীন অমার্জিত গালটা খসখস করে খানিক চুলকে, ভোটার হিসেবে তাদের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টা জানাতে ভুলে না আজমত। তারপর চুপ মেরে থাকে। জুলেখার প্রস্তাবের বিপরীতে আজমত সরাসরি হ্যাঁ কিংবা না কিছুই বলে না। নানান ভাবনায় সে হাবুডুবু খায়। শুধুমাত্র ঢাকা শহর ছাড়তে হবে তা তো নয়, একই সঙ্গে তার সবেধন চাকরির মায়াও যে ত্যাগ করা লাগবে। নতুন জায়গায় চাকরি জুটানোর সম্ভাবনাহীনতা আর সাহসের অভাব, আজমতের সবকিছুকে তালগোল পাকিয়ে দেয়। খুচরো পয়সার মতো কথাদের গড়িয়ে দেয়া ছাড়া আদতে তাদের কোনও মীমাংসায় পৌঁছানো হয় না।

দীর্ঘদিন শরীরবঞ্চিত দু’জন মানুষ নিজেদের অবদমিত চাহিদার উসখুসানি লুকিয়ে যে যার বৃত্তে ফিরে যায়। হয়ত কোনও এক ভেসে যাবার মতো বিকেল, অথবা বর্ষণমুখর সন্ধ্যায়, আজমত কিংবা জুলেখার শরীর জেগে ওঠার আকাঙ্ক্ষায় উন্মুখ হলে আবারও মীমাংসাহীন পুরোনো আলোচনাটা প্রাণ পায়। কিন্তু কাজের কাজ কিস্যু হয় না।

 

২.

দু’জন নারী পুরুষের সম্পর্ক যখন নিজেদের সুখদুঃখ ভাগাভাগির স্তর পেরিয়ে শরীর সীমানায় এসে থমকে যায়, তখন মরিয়া হবার এক ধরনের তাগিদ জন্ম নেয় বুঝি। শরীরের অবদমিত চাহিদা পূরণের ষোলোআনা ইচ্ছা থাকলেও কিভাবে ব্যাপারটা ঘটানো যায় সেটা বুঝতে পারে না আজমত। জুলেখা তাকে পছন্দ করে, কিন্তু সেটার সীমানা সম্পর্কে সে নিশ্চিত নয়। কিছুদিন থেকে আজমত দেখেছে রিকশায় পাশাপাশি বসলে জুলেখা তার দিকে গাঢ় চোখে তাকায়, সেটা কোনও ইঙ্গিত কিনা সে জানে না। তার সাহস কম, মুখ ফুটে বলতে পারে না। সে চায় প্রস্তাবটা জুলেখার দিক থেকে আসুক। নইলে তাকে শরীরলোভী, অসভ্য মনে করতে পারে। কিন্তু জুলেখা নিজে থেকে কিছু বলে না। আজমত প্রায় হতাশ।

একদিন পার্কে ঝোপের আড়ালে বসে জুলেখা তার হাত ধরে। আজমত এবার একটু ভরসা পায়। সেও জুলেখার হাতটা ধরে থাকে। সন্ধে হলে পার্কে বসা নিরাপদ না। কিন্তু একটা চুমু খাওয়ার জন্যও অন্ধকার প্রয়োজন এই শহরে। আরও বেশি কিছুর বাসনায় তার ভেতরে চুলবুল করতে থাকে। অবশেষে মুখ খোলে আজমত। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তারা যদি লালদীঘির পর্দা ঘেরা রেস্তোরার কেবিনে বসে, কেমন হয়? ওখানে মাঝে মাঝে অনেক যুগলকে ঘনিষ্ঠ চেহারায় দেখেছে আজমত। একদিন তারাও যদি একটু কাছাকাছি হয়। প্রস্তাবটা দিতেই জুলেখা এমন একটা কথা বলে শুনে আজমতের কান ঝাঁ ঝাঁ করতে থাকে। পাঁচশো টাকা খরচ করে এক ঘণ্টা কোনও রেস্তোরায় কাটানোর চেয়ে আটশো টাকা দিয়ে কোনও হোটেলে রুম নিলে দুজনে একান্তে একটা রাত পার করতে পারে সে সম্পর্কে আজমতের কোনও ধারণা আছে কিনা।

লজ্জায় কান লাল হয়ে গেলেও আজমতের বুকের ভেতর কেমন একটা আনন্দের ঝঙ্কার বাজতে শুরু করে। আটশো টাকা তার জন্য অনেক বড় একটা অঙ্ক। তবু সে আনন্দের মূল্য তার চেয়ে অনেক বেশি। বিবাহিত হয়েও স্ত্রীসঙ্গ বঞ্চিত জীবনে একবারও সে যদি এই আনন্দে সামিল হতে না পারে তাহলে জীবন বৃথা। জীবনে অন্তত একবার দুঃসাহসী হবার সিদ্ধান্ত নিল আজমত।

শহরের সবচেয়ে সস্তা হোটেলগুলো স্টেশন রোডের দিকে। বৃহস্পতিবার অফিস ছুটির পর জুলেখাকে নিয়ে স্টেশন রোডের একটা হোটেলে ঢুকে পড়ল আজমত। হোটেলের ডেস্কে বসা লোকটা ওদের দিকে একটু সরু দৃষ্টিতে তাকাল। আজমত গা করল না।

সে জানতে চাইল রুম খালি আছে কিনা। উত্তরে ডেস্কের লোকটা জানতে চাইল তারা স্বামী স্ত্রী কিনা। প্রশ্ন শুনে থতমত খেয়ে গেল আজমত।

কিন্তু জুলেখা প্রস্তুত ছিল, সে বলল তারা স্বামী স্ত্রী। পাল্টা ঝামটা দিয়ে বলল— হোটেলে রুম পেতে কাবিনও লাগে নাকি?

ঝামটা শুনে নরম হল লোকটা। নির্লিপ্ত স্বরে বলল— রুমের ভাড়া এক হাজার। অগ্রিম দিয়ে চাবি নিতে হবে।

আজমতের পকেটে আছেই সাকুল্যে দু হাজার। এক হাজারের কথা শুনে বুকটা কেঁপে উঠল। জুলেখা বলল আমাদের সিঙ্গেল বেড হলেই চলবে। রাতটা কাটানো কোনওমতে, সকালেই তো হাসপাতালে চলে যেতে হবে টেস্ট করাতে।

আজমত বোকা বনে গেলো জুলেখার কথা শুনে। কিসের হাসপাতাল, কিসের টেস্ট, সে কিছুই বুঝতে পারছে না! তবে সিঙ্গেল বেডের কথায় হোটেল ভাড়া সাতশো টাকায় নেমে আসল। টাকাটা দেবার পর চাবি দেয়া হল। দোতলায় ১৭ নাম্বার কক্ষ। একজন বয় গিয়ে রুম খুলে দিল।

দুজনে রুমের ভেতর ঢুকে দরোজা বন্ধ করে বাতি জ্বালাল সুইচ খুঁজে। পুরনো স্যাঁতস্যাঁতে ধাঁচের ঘর। ছোট একটা কাঠের জানালা। মলিন পর্দা উড়ছে বাতাসে। ছোট্ট বিছানা। দুটো বালিশ পাশাপাশি রাখা দায়। চাদরের কোণাটা ছেঁড়া। ছোপ ছোপ দাগ বসে আছে এখানে ওখানে। মাথার উপরে ফ্যান আছে একটা, সেটা অনেক কষ্ট সয়ে ঘুরে চলেছে। ভাগ্যিস বৃষ্টি হয়েছিল, বাতাস একটু সহনীয়।

আজমত জানতে চাইল কিসের হাসপাতালের কথা বলল জুলেখা। তখন খিকখিক করে হেসে উঠল সে। বলল, হাসপাতালের কথা বলা মানে ওরা স্বামী স্ত্রী এটা বোঝানো, গ্রাম থেকে এসেছে ডাক্তার দেখাতে। তাহলে আর কারও সন্দেহ জাগবে না।

জুলেখার উপস্থিত বুদ্ধিতে রীতিমত চমকিত আজমত। সে তো ঘাবড়ে গিয়েছিল রীতিমত। কখনও ভাবেনি হোটেলে উঠতে গেলে এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে।

গলাটা শুকিয়ে গেছে তার। কিন্তু রুমে পানি নাই। একটা পানির বোতল আনার দরকার ছিল। টেবিলে গ্লাস আছে একটা। ওটা বেসিনে নিয়ে কল ছেড়ে ধুয়ে ভর্তি করে আনল। কলের পানি খাওয়ার ব্যাপারে জুলেখা বারণ করলেও, তাতে কান দেবার অবস্থায় ছিল না আজমত। উত্তেজনায় তার ভেতরটা শুকিয়ে গেছে। তাছাড়া সে কলের পানি খেয়েই অভ্যস্ত। ঢকঢক করে পুরোটা পানি খেয়ে ফেলল। তারপর জুলেখার দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করল পরবর্তী কর্মসূচি কী হবে। আগে চা নাস্তা খেয়ে আসবে নীচের কোনও হোটেল থেকে, নাকি…..। জুলেখা তাকে সেই অবসর দিল না। বহুদিনের হামুখো শরীরী বুভুক্ষু ভাব ততক্ষণে উড়িয়ে নিয়ে গেছে জুলেখার মেয়েলি জড়তা। আজমতকে জড়িয়ে ধরে গড়িয়ে পড়ল সে নড়বড়ে খাটটায়। জমে থাকা দেহতৃষ্ণার অবসান ঘটলো এক ঘণ্টা পর।

বিকেলে কিছু খাওয়া হয়নি। প্রমোদ মত্ত সময় কাটিয়ে একটু থিতু হবার পর রাত আটটার দিকে প্রচণ্ড খিদে পেল আজমতের। রুমে তালা দিয়ে দুজনে বের হল হোটেল থেকে। কাছের একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে পরোটা মাংস দিয়ে ভুড়িভোজ হল। তারপর কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করল রেলস্টেশন চত্বরে। ঘুরে ঘুরে ভবঘুরে মানুষের জীবনচিত্র দেখল কিছুক্ষণ। তারপর হোটেলে ফিরে এল রাত দশটার আগেই।

খাওয়ার পরপর বিছানায় উঠে নাক ডেকে ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যেস আজমতের। কিন্তু আজ রাত বারোটা পর্যন্ত তাকে জাগিয়ে রাখল জুলেখা। তারপর যখন ঘুমটা বেশ গাঢ় হয়ে এসেছে, অমনি জুলেখা তাকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দিলো। বলল, কে যেন দরোজায় ধাক্কা দিচ্ছে। ঘুম চোখে আজমত কিছু বুঝতে পারল না। একটু পর সেও দমাদম শব্দটা শুনতে পেল। সেই সঙ্গে বাঁশির শব্দ। বাইরে হৈ চৈ। পুলিশ, দরোজা খোল, নইলে ভেঙে ফেলব। এমন চিৎকার শুনল। তাক লেগে যাবার মতো দ্রুততায় দুজনে ভদ্রস্থ হয়ে নিল। দরোজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড চড় দিল কেউ একজন আজমতের গালে। চড় খেয়ে ঘুরে পড়ে যাচ্ছিল, টেবিল ধরে দাঁড়াল কোনওমতে। পুলিশের ইউনিফর্ম দেখে বুঝে গেল আর রক্ষা নাই।

হাতে পায়ে ধরে, পকেটে থাকা এক হাজার টাকার নোট দিয়েও নিস্তার পাওয়া গেল না। দশ হাজারের দাবী শেষ পর্যন্ত পাঁচ হাজারে এসে নেমেছিল। কিন্তু অত টাকা কোথায় পাবে আজমত। বহুকষ্টে এই দুহাজার টাকা ধার করে এনেছিল এক সহকর্মীর কাছ থেকে। পুলিশের সঙ্গে থাকা সাংবাদিকের ক্যামেরায় অন্যদের সঙ্গে তাদের দুজনের ছবিও তোলা হল। তারপর সবাইকে প্রিজনভ্যানে তুলে থানার দিকে রওনা দিল গাড়ি।

পরদিন স্থানীয় পত্রিকার শেষ পাতায় দুই কলামে ছোট্ট একটি সংবাদ ও ছবি। স্টেশন রোডের হোটেল থেকে আপত্তিকর অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকা অবস্থায় কয়েকজন তরুণ তরুণীসহ মাঝবয়সী দুই নারী-পুরুষকে আটক করা হয়েছে।

রঙিন ছবিতে মাথা নীচু করা মাঝবয়সী দুই নারী-পুরুষকে দেখে সদ্যবিবাহিত লজ্জিত স্বামী স্ত্রী বলে কারও কারও মনে হতে পারে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...