লিগ্যাসি কোড ১৯০৫১৯৬১

অরিজিৎ আদিত্য

 

গত সংখ্যার পর

অর্জুন: (কর্তাবাবার বয়ানে) স্টেশানে মানুষ আর মানুষ। পিকেটার। আমার তখন আর কত বয়স। কাটিগড়া থেকে একদল আমরা গেছি স্টেশানে। গোটা স্টেশানে সেদিন তুমুল উন্মাদনা—

বয়স কোনও বাধা মানেনি, বুড়োমানুষ থেকে শুরু করে আমাদের মতো টিনএজার, পুরুষ মহিলা, স্কুলের ছাত্রছাত্রী— সবাই, সব্বাই এসেছে স্টেশানে। সব্বাই পিকেটার। তারপর হঠাত শুরু হল পুলিশের জুলুম। উন্মাদনা ছিল, কিন্তু কোনও উচ্ছৃঙ্খলতা তো ছিল না, তবু পুলিশ গুলি চালাল। আমার চোখের সামনে মানুষকে লুটিয়ে পড়তে দেখলাম, রক্ত আর রক্ত, চিৎকার চেঁচামেচি, এর মধ্যেও শোনা যায় ‘জান দেব তবু জবান দেব না’— কে যেন স্লোগান দিতে দিতে লুটিয়ে পড়ল, হঠাত থেমে গেল কণ্ঠস্বর।

লোকটার হাতে একটা প্ল্যাকার্ড ছিল, ঠিক আমার সামনে, ওর বুকে গুলি লাগল, লুটিয়ে পড়ার আগে আমার হাতে ছুড়ে দিল প্ল্যাকার্ডটা।

না এগারোজনকে মেরেও পুলিশ ক্ষান্ত হয়নি। খবর এল, পুলিশের ধরপাকড় চলছে। বাবা ভয় পেয়ে গেলেন, আমরা জমিদারবাড়ির মানুষ, যদি আমাকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায়! রাতারাতি আমাকে কলকাতা পাঠিয়ে দেওয়া হল, সেখান থেকে লন্ডন। পিসির বাড়ি। এই লন্ডনেই আমার হায়ার এডুকেশন। চাকরি। কিন্তু জানিস, আমি শান্তি পেতাম না। একটা গ্লানি একটা অপরাধবোধ আমাকে তাড়িয়ে বেড়াত। যত বয়স বেড়েছে, আমি বুঝতে পেরেছি ওই অপরাধবোধ থেকে আমার নিস্তার নেই। নিস্তার নেই। ঘুম ভেঙে যায় মধ্যরাতে, দেখি লোকটা লুটিয়ে পড়ার আগে এই প্ল্যাকার্ডটা আমার হাতে তুলে দিচ্ছে। স্পষ্ট দেখি, এখনও হ্যাঁ হ্যাঁ এখনও স্পষ্ট দেখি, ওই প্ল্যাকার্ডে জ্বলজ্বল করছে জান দেব তবু জবান দেব না… আমি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াই… কিন্তু নিজের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানো সম্ভব? শেষমেশ লন্ডনের চাকরিবাকরি ছেড়েছুড়ে চলে এলাম এই বিহাড়ায়, না হলে আমি বোধহয় পাগল হয়ে যেতাম। আমি ততক্ষণে বুঝে গেছি বাঁচতে যদি হয়, তা হলে ওই প্ল্যাকার্ডের ঋণ আমাকে শোধ করতেই হবে। কিন্তু এ আমি কোথায় এলাম, এই কি সেই একষট্টির বরাক? একষট্টির বাঙালি? এরা তো বাংলাভাষাকেই বিক্রি করে দিচ্ছে। এত রাজনীতি, এত রাজনীতি। আর মানুষ, দেখ, কীভাবে এই রাজনীতিতে গা ভাসাচ্ছে। উনিশে মে এলে ঠাকুরপুজো, আর গোটা বছর ধরে উনিশের বিসর্জন— এই তো, এই তো! পলিটিশিয়ানরা পুরো উনিশকে কিনে নিচ্ছে আর বিকিয়ে দিচ্ছে। ঠুনকো কিছু পাওয়ার জন্য সব্বাই মিলে উনিশকে বিক্রি করে দিচ্ছে। না হলে, ভাবা যায়, তুই ভাবতে পারিস, এই বরাকের মাটিতে দাঁড়িয়ে কোনও পলিটিশিয়ান বলতে পারে, বলার সাহস পায়, উনিশ এখন অতীত, আমাদের সামনের দিকে তাকাতে হবে? উনিশ ধুয়ে কি জল খাবে?

অর্জুন: লও বোঝো ঠ্যালা, কর্তাবাবার তো দেখি ভীমরতির চূড়ান্ত অবস্থা! কই এলাম আমার লিগ্যাসির খোঁজ নিতে, তা উনি কীসব উনিশ-বিশ বকবকাচ্ছেন! না, যা থাক কপালে, এইবার সোজাসুজি জিজ্ঞেস করেই ফেলি… ইয়ে কর্তাবাবা, কই কি, আপনি যে শহিদের কথা বললেন, এনাদের বাড়ি তো মনে হয় আমাদের শিলচরেই। তো, কর্তাবাবা, এঁদের বাড়ির কোনও ঠিকানা পাওয়া যাবে, একবার চেষ্টাচরিত্তির করে দেখতাম, যদি আমার লিগ্যাসির কোনও কাগজ পাওয়া যায়!

ওরে পাগল, তাহলে তো লিগ্যাসি খুঁজতে তোকে ঢাকাতেও যেতে হবে। সালাম বরকত জব্বারের বাড়ি। ওদের লিগ্যাসিও তো বইছিস তুই না কি!

দেখেন তো বুড়োর কাণ্ড! একটু রাগ করেই বলি, কর্তাবাবা এইগুলান তো মোসলমানের নাম, এদের সঙ্গে আমার লিগ্যাসির কী সম্পর্ক? আর কী বললেন ঢাকা? তো ঢাকা তো বাংলাদেশ— এসব শুনলে পুলিশ তো এমনিতেই আমাকে বাংলাদেশ লাথি মেরে ফেলে দিয়ে আসবে!

কর্তাবাবা বলেন, হ্যাঁ বরকত জব্বার সালাম ওরা মুসলমান। কিন্তু ওঁরা আগে বাঙালি, বাংলাভাষার জন্য ওঁরা প্রাণ দিয়েছেন, যেমন কমলা বীরেন্দ্র সুকোমল চণ্ডীচরণরা। এঁদের চেয়ে বড় বাঙালি আর কাঁরা আছেন? বলতে পারিস, যাঁরা মায়ের ভাষার জন্য নিজের প্রাণ পর্যন্ত দিয়ে দেয়…

জানেন স্যার, দপ করে মাথায় একটা রাগ জ্বলে উঠল। শুধু কর্তাবাবা বলে কথা, তাই নিজেরে সামাল দিই। তবে বলি, এ আপনি কী কন কর্তাবাবা? এই মোসলমানরাই তো আমার বাপঠাকুর্দাকে মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে, আর আপনি বলছেন, কোন জব্বর আর বরকতের কাছেও আমার লিগ্যাসি বাঁধা রয়েছে। না না কর্তাবাবা, আপনার এ কথা ঠিক নয়, আমি মানতে পারব না। আপনি জানেন না কর্তাবাবা, আমার দাদু আর ঠাকমা বুড়ো বয়সে কী কান্নাটাই না কাঁদত ওই দেশের বাড়ির জন্য— বানিয়াচং না কি যেন জায়গাটার নাম, বুড়াবুড়ি খুব কইত, কইত ওইখানেই না কি ঘর ছিল, জমি ছিল, জলা ছিল, সব ছিল— কার জন্য গেছে কন তো ওইসব, কারা তাড়ায়ে দিয়েছিল? ওই মোসলমানরাই তো?

বুঝলেন স্যার, আমার দাদু বুড়া বয়সে, চোখ দুটা ছানি পইড়্যা প্রায় অন্ধের মতো হয়ে গিয়েছিল, শুধু জল পড়ত। আমি বলতাম, ও দাদু কান্দো ক্যান? কীসের কষ্ট তোমার? বুড়া হাসত। বলত, কষ্ট? বাপ, কষ্টের তুই কী বুঝবি? বড় ইচ্ছে হয় জানিস, একবার ওই দেশের বাড়িতে যাই, ওই দেশের মাটিতেই যেন আমার শেষ শ্বাসটা পড়ে— জানিস অর্জুন, আমার দেশের বাড়ির পাশেই ছিল ইয়া বড় একটা দীঘি, টলটলা সবুজ জল, আর ওই পাড়ে শ্মশান, গাঁয়ের হিন্দুদের সৎকার ওই শ্মশানেই হত… আমারে বাপ ওই শ্মশানটা বড় টানে… যেন ডাকে অনাথবন্ধু, তোর সৎকার এখানে হবে না?…

কাঁদত বুড়োটা, জানেন স্যার, ছোট্ট একটা গ্রাম ছিল ঠাকুর্দার। আমরা, জানেন তো, নমঃশুদ্দর মানুষ, মাছ ধরাই আমাদের পূর্বপুরুষের পেশা। জলেই জীবন, জলেই মরণ, জলের সঙ্গেই দিনরাত, অষ্টপ্রহর। আমার ঠাকুর্দা অনাথবন্ধু নমঃশূদ্র গরীব মানুষ, কিন্তু সুখী মানুষ। নিজের জমিজিরেত ছিল, গরু ছিল, নিজের নাও ছিল, ছবির মতো সুন্দর ওই গাঁও, বাপ মা ভাই ভাতিজা বউ নিয়ে দিব্যি সুখের সংসার। দেশে তখনও সাহেবদের সরকার। তবে হ্যাঁ, ওই ছোট গাঁওয়েও স্বাধীনতা আন্দোলনের ঢেউ লেগেছিল। গান্ধিবাবার নামে ওই গাঁয়ের হিন্দু মুসলমান সবাই পাগল।

(ব্যাকগ্রাউন্ডে ‘গান্ধিবাবা বড় লোক গো’ ধামাইল গানটি)

অর্জুন: সবাই বিশ্বাস করত, গান্ধিবাবাই দেশকে স্বাধীন করে দেবে। দেশ স্বাধীন হবে, আর সব কষ্ট সব দুঃখ ফুড়ুৎ করে উইড়্যা হারায়ে যাবে আকাশে।

তারপর একদিন গাঁয়ে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে জানান দেওয়া হল— দেশ স্বাধীন হচ্ছে। পনেরো আগস্ট। পনেরো আগস্ট সাহেবরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে ভারত ছেড়ে চলে যাবে আর আমরা সবাই স্বাধীন হব। স্বাধীন স্বাধীন। আনন্দে অস্থির অস্থির অবস্থা। কিন্তু কিন্তু আরও যেন কী ঘোষণা করে! এসব কী বলে ওরা… দেশ নাকি ভাগ হয়ে গেছে? এই দেশ, অনাথবন্ধুর এই সবুজ দেশ, জমি-জলা-গরু-নাও। এই দিঘি, দিঘির পাড়ের ওই শ্মশান— এসব নাকি বিদেশ হয়ে যাবে? হিন্দুরা আর এদেশে থাকবে না গো, এটা হবে মুসলমানের দেশ, আর হিন্দুর দেশ ইন্ডিয়া— ভারতবর্ষ, তো আমরা তো এই ভারতবর্ষেই আছি না কি? তাইলে, তাইলে? সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যায়।

অশিক্ষিত অনপঢ় অনাথবন্ধু বোঝে না, এ কেমনধারা স্বাধীনতা? কথা না ছিল, স্বাধীনতা এলে আমরা সবাই রাজা হব, তা হলে মানুষ পলায় ক্যান? জানেন কর্তাবাবা, অনাথবন্ধু যেখানে যায় সেখানেই এক কথা, এটা এখন মুসলমানের দেশ, চল আমরা পলাই।

হরিমতি কাঁদে, বলে, ওগো আমার বড় ডর লাগে। কই যাব আমরা বলো তো? কয়, আমি তোমার পায়ে পড়ি, আমি দেশবাড়ি ছেড়ে কোথাও যাব না, যদি মুসলমানে আমারে ধরে তো ওই দা’টা আছে না, ওইটা দিয়া আমার মুণ্ডুটা এক কোপে আলাদা করে দিও। দিয়ে দিঘির পাড়ে শ্মশানে চিতায় তুলে দিও। অনাথবন্ধু দু হাতে মুখ চাপা দেন। থাম হরিমতি, কীসব অলুক্ষুণে কথা বলিস।

অনাথবন্ধু বোঝেন না কী করবেন। চারপাশ থেকে খবর আসে, হিন্দুরা পালাচ্ছে, মিজানচাচা একদিন ডেকে বলল, কেন যাবি অনাথ, কোথায় যাবি ব্যাটা? এটা তোর দেশ না? গান্ধিবাবা ভাগ করেছে বলেই দেশটা ভাগ হয়ে যাবে? তুই আমি, আমরা ভাগ হয়ে যাব? যাস না বাপ, এটা তোরও দেশ। এটাই তোর দেশ।

বুঝলেন কর্তাবাবা, অনাথবন্ধু সে যাত্রায় থেকে যান। দিন গড়ায়, বছর গড়ায়। স্বাধীনতা কী বস্তু অনাথবন্ধু টের পায়। হরিমতিকে বলে না অনেক কথা, চেপে যায়, খামোখা ভয় পাবে বৌটা। কিন্তু অনাথবন্ধু বোঝে দেশটা তার পালটে যাচ্ছে। মানুষগুলো সব কেমন যেন পালটে যাচ্ছে। জন্মইস্তক এই গাঁয়ে ওদের সঙ্গে ওঠবোস, ওরা মাইমাল আমরা নমঃশূদ্র, একই নদীতে মাছ মারা, কিন্তু অনাথবন্ধু এখন বোঝে, ওরা যেন মালিক, আর সে প্রজা। ‘দেশভাগ’ ‘ইন্ডিয়া’ ‘পাকিস্তান’— এই শব্দগুলো পালটে দিয়েছে সবকিছু। সেই একই গ্রাম, একই জন, একই মাঠ— কিন্তু দেশভাগ বদলে দিয়েছে মানুষকে।

অনাথবন্ধু খবর নেয়, আশপাশের গাঁ থেকে হিন্দুরা এখনও পালাচ্ছে। দিনের বেলায়ও বোঝা যায়নি, সন্ধেবেলায় তুলসিতলায় পিদিম জ্বলেছে, উলুধ্বনি শোনা গেছে। পরদিন সকালে উঠে দেখা যায়, হিন্দু বাড়িটি ফাঁকা, রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গেছে সবাই।

ইকবাল অনাথবন্ধু সেই ন্যাংটো বয়সের বন্ধু। অনাথবন্ধু বোঝে, ইকবালও পালটে যাচ্ছে। একদিন ভোররাতে হরিমতি ঘর থেকে বেরিয়েছিল বাহ্যি করতে, দেখে, কয়েকটা লোক তাদের জমির ধান ন করছে। ইকবালভাই না? হরিমতি ভয়ে মুখ চাপা দিয়ে থাকে। সকালে দেখা যায় সব শেষ। হরিমতির কাছে সব শুনে দপ করে আগুন জ্বলে ওঠে অনাথবন্ধুর মাথায়। সোজা চলে যায় থানায়, ইকবালের নামে ডাইরি লেখে। পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায় ইকবালকে। বুকটা থম মেরে থাকে অনাথের। কদিন পর থানা থেকে বেরিয়ে আসে ইকবাল, আসে সোজা অনাথের বাড়িতে, আগুন জ্বলে ওর চোখে, বলে, ওই রাতে তো শুধু ধান কাটছি, এবার দেখিস তোর কী কাটি, শালা মালাউনের বাচ্চা।

ওইদিনই সন্ধ্যায় মিজানচাচা আসে। অনাথবন্ধুর হাত ধরে বলে, না বাপ, তোরে আর আটকাব না। কোন ভরসায় আটকাই বল তো? তোরাও যা গিয়ে এই দেশ ছেড়ে।

হরিমতি এখন পোয়াতি। অনাথবন্ধু বোঝেন আর দেরি করা ঠিক নয়। ভাইদের সঙ্গে শলা করেন। ঠিক হয় এই ভরা শ্রাবণেই নৌকায় চেপে পালাবে পুরো পরিবার। হরিমতি কাঁদে— গাভীটি ধরে কাঁদে, সুপারিগাছকে ধরে কাঁদে, সাধের নাওটারে ধরে কাঁদে… বলে, আমার পেটে যে এসেছে, সে কি তাইলে বাপঠাকুর্দার ভিটেমাটির ছোঁয়াটুকুও পাবে না?

রাতে সেদিন ঝমঝমাইয়া বৃষ্টি নামছে, সে কী ঝড়, ওই শোনেন বাজ পড়ে কোথায়, প্রকৃতি যেন আজ পাগলা হয়ে গেছে। বিয়ের সময় একটা টিনের ট্রাঙ্ক দিয়েছিলেন বাবা, প্রজাপতি আঁকা, তাতে সুন্দর করে লেখা, সংসার সুখের হোক, হরিমতি সেই ট্রাঙ্কে কাপড় গোছায়। কে যেন কড়া নাড়ছে দরজায়, এত রাতে এই ঝড় বৃষ্টির মধ্যে কে আসে… ইকবালরা কি খবর পেয়ে গেল, অনাথবন্ধু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, কে… ও পাশ থেকে ফিসফিসিয়ে জবাব আসে, দরজা খোল, অনাথ…

মিজানচাচা। এত রাতে। এই পাগলা বাদলার রাতে। অনাথবন্ধু দরজা খোলে, ভিজে চুপসে গেছে বুড়ো মানুষটা… অনাথকে জাপটে ধরে, যাবি গিয়া, যা… যা… তোরে আটকাই কোন মুখে… যা ব্যাটা যা… জোব্বা থেকে কী একটা যেন বের করে মিজানচাচা, ধর এটা তোর চাচিয়ে দিছে। অনাথ দেখে, একটা রূপার মাদুলি। মিজানচাচা বলে, তোর পরিবারের পেটে যে আইতা আছে, সে পুড়াকপাল্যা তো দেশের মাটির পরশ পাইল না… তোর চাচি দিয়া দিয়ে, হ, এর ভেতরে এই গাঁয়ের মাটি আছে, পরাইয়া দিস, পরাইয়া দিস তার জন্মের পরে… বাপঠাকুর্দার গাঁয়ের মাটির পরশ তো পাক হতভাগাটা।

নৌকা তৈরি হয়। শ্রাবণ মাসের রাত, আকাশ আজ ঠেলে দিয়েছে। এত বৃষ্টি ছিল, এত মেঘ ছিল, সব… সব সব আজ ঢেলে দিয়েছে আকাশ… অনাথবন্ধু পোয়াতি স্ত্রী, ভাই পরিবার নিয়ে নৌকা ভাসায়…

(দু হাত চোখের ওপর দিয়ে এদিক ওদিক ডাঙা খোঁজে অনাথবন্ধু)

অর্জুন: বুঝলেন কর্তাবাবা ওই ডাঙা খুঁজে খুঁজেই গেল দাদুর জীবনটা। শুধু কি দাদুর জীবন, আমার বাপ, এরপর আমি— আমরা এখনও ওই ডাঙাই খুঁজে বেড়াচ্ছি, বুঝলেন না। অনাথবন্ধু এই রিফিউজি ক্যাম্প থেকে ওই রিফিউজি ক্যাম্প ঠোক্কর খেয়েছেন, কিন্তু কর্তাবাবাকে কে বোঝায়, বলেন তো! আমি বললাম, কর্তাবাবা আপনিই বলেন, এই মুসলমানদের জন্যই আমার দাদু থেকে শুরু করে আমার আজ এই অবস্থা, তা হলে মুসলমানরা আমার দেশে থাকবে কেন?

ও হরি। বুড়োর কথা শুনে তো আমি থ। বুড়ো বলে, তুই মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, তোকে দোষ দিই না বাবা। তবে ব্যাপারটা বোঝ। এই যে আমার দেশটা না, এই যে আসাম, এর ভূগোল নিয়ে এর ইতিহাস নিয়ে এর মানুষদের নিয়ে গত সাতশো বছর ধরে বারবার লাগাতার কাটাকুটি খেলা হয়েছে। কত বছর? না এক-দুই নয়, সাতশো বছর। বখতিয়ার খিলজির নাম শুনেছিস? সেই সাতশো বছর আগে এই বখতিয়ার খিলজির সময় প্রথম আসামে মুসলমানরা আসে। সেই থেকে শুরু। তারপর আহোম, মুঘল, কাছাড়ি, ব্রিটিশ— একের পর এক রাজা এসেছে, আর ভূগোলকে কেটে এর সঙ্গে ওকে জুড়ে দিয়েছে, ওর সঙ্গে একে। তারপর আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে সিলেট, কাছাড় আর গোয়ালপাড়াকে এভাবে ঢাকা ডিভিশন থেকে কেটে এনে আজকের এই আসামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হল। তো, বাংলাভাষী এই তিন জেলার মানুষগুলার কী দোষ বল তো? এই যে তুই বলছিস মুসলমানরা এ দেশে থাকবে কেন, আরে গাড়ল, দেড়শো বছর ধরে এ দেশে থাকার পরও এই দেশ একটা মানুষের হবে না? আসলে কী জানিস, এই যে আসামের ভূগোল আর বাঙালিদের নিয়ে বারবার কাটাকুটি খেলা, এতে জানিস কী হয়েছে, সারাটা দেশই বেমালুম ভুলে বসে আছে যে, এই যে আসাম এতে বাঙালিরাও যুগ যুগ ধরে রয়েছে, বাঙালিরাও হান্ড্রেড পার্সেন্ট খিলঞ্জিয়া। তুই লেখাপড়া শিখিসনি, তুই নাও বুঝতে পারিস, কিন্তু আশ্চর্য লাগে যখন দেখি পড়াশোনা জানা দিগগজ সব মানুষরাও হিন্দু মুসলমান করে করেই মরল। একেক সময় মনে হয়— না, এই হিন্দু বাঙালি আর মুসলমান বাঙালি কোনও দিনও এক হবে না, এদের একজোট করা যাবে না। আজকের দিনে হিন্দু বাঙালি মুসলমান বাঙালি এক হয়ে ভাষার জন্য লড়বে— না এটা আকাশকুসুম কল্পনা— মনে হয় জানিস, খুব মনে হয়— মনে হয় এ যেন কাঁঠালের আমস্বত্ব, সোনার পাথরবাটি— কিন্তু তারপরই মনে পড়ে, এই বাঙালিই তো ধর্মকে সরিয়ে ভাষার জন্য একটা আস্ত দেশ ছিনিয়ে এনেছে— হ্যাঁ, হিন্দু বাঙালি আর মুসলমান বাঙালি একসঙ্গে মিলে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে— বাঙালিই একমাত্র জাত যে কাঁঠাল দিয়ে আমস্বত্ব বানিয়েছিল— বানিয়েছিল বাহান্নতে, বানিয়েছিল একষট্টিতে। তুই তোর লিগ্যাসি খুঁজছিস না অর্জুন? ওই কাঁঠাল দিয়ে আমস্বত্ব বানানোই তোর লিগ্যাসি…

না, মাথাটা বুড়োর এক্কেবারেই গেছে দেখছি। কাঁঠাল আমস্বত্ব হায় হায়। গেলাম একটা বিপদে পড়ে, কই বলবেন কোথায় গেলে আমার লিগ্যাসির কাগজ খুঁজে পাব, তা নয়, বুড়ো বকবক করে আমার কানের পোকা বের করে দিল। বুড়ো হিন্দু-মুসলমান মাড়াচ্ছে। চড়াক করে মাথার তারটা ছিঁড়ে গেল। মুসলমান… মুসলমান। বুড়োকে বলি, কর্তাবাবা, সারাদিন ঘরে বইস্যা থাকেন, জানেন না, এই মোছলমানগুলার কী বাড়নটাই না বাড়ছে। ওই যে ওদের এক নেতা গজাইছে, আরে ওই যে, হেলিকপ্টারে উড়াইয়া আসে, ঝাঁড়ফুঁক করে, দেদার নাকি টেকা উনার, তো সেদিন কালাইনে ওদের সভা, গিজগিজ করতাছে দাড়ি আর তক্কি, তো শুনলেন আলখাল্লা পরা নেতায় কী কয়?

মুসলিম নেতা: ভাইসব, আপনারাই কইন আমরা মোছলমানরা কি তা ফুটবল নি যে হিন্দুয়ে আমরারে শুধু লাথাইতো? লাথ ভুট আইলে একবার লাথ মাইর‍্যা ওই দিকে ফালায় তো একবার এই দিকে, ফুটবল নি আমরা? শুনইন, আমরা হইলাম মোছলমান, ইমানদার মোছলমান, ধর্ম আইজ্ঞা হ্যাঁ, ধর্মই আমরারে জিইয়াইয়া রাখছে। তাইন তাইন কইন বাংলা ভাষা, কইন আমরা হকলে বাঙালি— আহা শুনতে কী মধুর, কিন্তু, দেইননি, দেইননি আমরারে সম্মান? দেইননি আমরারে আমরার হক? ভাষা? বাংলা ভাষা? ওইসব মিঠা মিঠা বাত কিতাবে ভালা, কাজের কথা হইল, সরকারের যে ভাষা, সেটাই ইমানদার মোছলমানের ভাষা। ভাইসব, বাংলা ভাষা ধুইয়া কি তা জল খাইতামনি? উলটা মায়ের ভাষা বাংলা শুনলে এনআরসি থাইক্যা নাম ঘ্যাচাং। সোজা ঘাড় ধইর‍্যা জেলে নিয়া হামাইবো? তখন কোন কাজে আইবো তোমার ভাষা? আ মরি বাংলা ভাষা? ভাইসব, এখনও সময় আছে, এনআরসি চলছে, এখনও সময় আছে, এখানে থাইকতে হলে বুইঝ্যা লন, সরকারের ভাষাই মোছলমানের ভাষা।

অর্জুন: কিন্তু বুড়ারে বোঝায়টা কে? মাত বাড়াইয়া লাভ নাই, মানে মানে কেটে পড়ি। কিন্তু আপনারাই কন কই যাই আমি? কার কাছে গেলে একটা পথ পাব, বলতে পারেন স্যার? আর যে টানতে পারি না। কাজকর্ম বন্ধ, নাও নাও-এর ঠাই, লাঙল লাঙলের ঠাই, সংসারটা চলবে কী করে, বলুন, বলুন আপনারাই? বউরে লুকাইয়া, বুঝলেন, খানিকটা জমি বিক্রি করে দিলাম। বুকটা স্যার ফাইট্যা যাচ্ছিল, আমার বাপ অনন্ত নমঃশূদ্র বড় শখ করে বড় ঘাম ঝরিয়ে রক্ত ঝরিয়ে এই জমি কিনেছিল। বাপ বলত, বুঝলি ব্যাটা, নিজের জমি থাকলে একটা হক থাকে। তোর দাদু এই দেশে এসে শুধু লাথিঝ্যাটা খেয়েছে, জীবনের শেষ দিন অব্দি হাপিত্যেস করে গেছে নিজের নামে এক টুকরা জমি করে যেতে পারেনি বলে। সেই জমি, স্যার… আমার বাপের রক্ত জল করা জমি আমি বিক্রি করে দিয়েছি। দেশের বাড়িতে আমার দাদুর নাকি কোন মিজানচাচা আছে, মোছলমান, তো মোছলমানরা যখন দাদুদের তাড়ায়ে দিল, তখন ওই মিজানচাচা একটা রূপার মাদুলি দিছিল দাদুরে। আমার বাপে কইত, ক্যাম্পে তার জন্ম হওয়ার পর আমার ঠাকমা নাকি বাবার গলায় ওই মাদুলিটা বান্ধায়ে দিছিল, ওই মাদুলিতে নাকি দেশের বাড়ির মাটি ছিল। আমার জন্মের পর বাপে আমার গলায় সেটা ঝুলিয়ে দিয়েছিল, কইত, একদিন দেখিস এই দেশেও আমাদের মাটি হইব, জমি হইব, এই দেশ আমাদের আপন কইর‍্যা নিব। নিল? নিল? বড় কষ্ট কইর‍্যা এই টুকরা জমি কিনছিল বাপে, কোর্ট আর পুলিশের ঠ্যালায় দিলাম শালা সেই জমিই বেইচ্যা। ভেতরটা কান্দে… কান্দে ভেতরটা… কত কষ্ট কত শখের ছিল বাপের ওই টুকরা জমিটা… দিলাম শালা বেইচ্যা… বেইচ্যা দিয়া কালাইন থিক্যা নাও-এ কইর‍্যা ফেরার পথে শালার ওই মাদুলিটা টান মাইর‍্যা দিলাম শালা হাওরের জলে ভাসাইয়্যা… যা যা… দ্যাশের মাটি… তোর গুষ্টির পিণ্ডি করি শালা…

(গান)

 

আগামী সংখ্যায় সমাপ্য

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1858 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...