সন্তোষ পাল — চার

মৃণাল চক্রবর্তী

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

অণু চুল কেটে ফেলেছে। জিনস পরেছে। ওপরে জ্যাকেট আর মাথায় একটা কটকটে হলুদ রঙের টুপি। মোটা হয়ে গেছে আমার স্বপ্নের অণু। আমার কাছে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল—

–বাব্বা, তোমাকে দেখতে পেয়ে অত দূর থেকে নেমে এলাম। কেমন আছ তুমি? মিসেস কোথায়?

এটা একটা পচা টাইপের চালাকি। ও খুব ভাল করে দেখেছে আমি একা এলাম। তাহলে এধরনের পিনিকপনা কীসের জন্যে?

–আমি একটা গোলমেলে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি অণু। আমার এক্স-বৌ আর আমি ডিভোর্সের জন্যে অপেক্ষা করে আছি। ডিভোর্স হয়ে গেছে কিন্তু একটা কাগজ লাগবে। আমরা দুজনেই অপেক্ষা করে আছি তার জন্যে। তিন মাস হয়ে গেছে, এদিকে রাই আমাকে পাগল করে দিচ্ছে।

গল্পটা ভাল লাগছে আমার। অণুর মুখটা ভেপসে গেছে। এ-ধরনের কোনও সিরিয়াল ও দেখেনি।

–ও বাবা, এর মধ্যে এত কিছু! রাইটা কে?
–রাই ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এক কথায় চলে এসেছে আমার সঙ্গে থাকবে বলে। ওর তখনকার স্বামী প্রমথনাথ সেই দুঃখ সহ্য করতে না পেরে কানাডায় চলে গেছে। ওদের ডিভোর্সের কাগজ পেতে এত দেরি লাগে না। কাগজ করাই থাকে। শুধু সই করে নিয়ে এলেই হল।

শেষ কথাটা আমি কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকিয়ে বললাম। সে দেখি কিচ্ছুটি না পরে সূর্যের আলোয় গা ধুচ্ছে। মল জুড়ে মানুষের শরীরে নেমে আসছে, ছড়িয়ে পড়ছে আনন্দ। এরকম অবস্থায় আমি আমার দাড়িদের কথা ভুলে গেলাম। মনে হল এই আকাশেই আমার মুক্তি। হতে পারে আমি একটা বিয়ে করে উঠতে পারিনি। কিন্তু পেরেওছি তো। নাহলে রাই কেন ছুটে এল ক্যালিফোর্নিয়া থেকে? কেন মলিন হয়ে গেল অণুর মুখ। কেমন একটা গজগজে গলায় বলল—

–ওদিকে মন বলছিল তুমি নাকি আমাকে বিয়ে করতে না-পারার জন্যে আর বিয়েই করলে না।
–মন কে?
–আমার ননদ।
–ও, রাই?
–রাই কে?
–ওই তো মন

এতে ঘেঁটে গেল অণু। বিড়বিড় করে কীসব বলে হঠাৎ গলা তুলল—

–ওকে নাকি তুমি বলেছ…
–বানিয়ে বলেছি। অল্পবয়েসি একটা মেয়েকে কনফিউজ করে দেওয়া ঠিক না।
–ও এমন কিছু অল্পবয়েসি নয়। … আর তোমার এক্স? সে কী করে?
–ওওও। হেলেনা? ও ইটালির একটা নেচার স্কুলে ছবি আঁকা শেখায়। দারুণ একটা জায়গায় থাকে। সেনোলিতা। আঙুরবনে ঘেরা আর লুসিয়ানো নদীর পাশে কতগুলো ছোট কটেজ নিয়ে ওই স্কুল। ওখানে আমরা হানিমুন করেছিলাম।
–স্কুলের মধ্যে হানিমুন! কীসব কথা।

গোটা ব্যক্তিত্ব ফেটে পড়তে চাইছে ওর। পঁয়তাল্লিশ বছরের অণু হাঁফাতে হাঁফাতে জানতে এসেছিল, জেনে আনন্দ পেতে চেয়েছিল, আমি সত্যিইইই ওর জন্যে বিয়ে না করে বসে আছি কিনা। আমি কিন্তু ওকে দুঃখ দিতাম না যদি না ও মিসেস কথাটা বলত। আর এখন আমি ওকে দুঃখ দিচ্ছিও না। আমি স্বপ্ন দেখছি কাঞ্চনজঙঘাকে বাঁ-দিকে রেখে।

–স্কুলের মধ্যে নয়। একটা লাল নৌকো, নীল পাল তোলা। সেই নৌকোয় চড়ে  লুসিয়ানো পেরিয়ে ছোট ঘোড়ার গাড়ি, ওরা বলে লা তক্তো। সেই গাড়িতে দুদিকে আঙুরবনের মধ্যে লাল কাঁকড় বিছানো পথ। একটু এগোলে ছোট্ট একটা পাহাড়ের ওপর কটেজ নত্তো আমোরা। নাইট অব লাভ। সেখানে হানিমুন করেছিলাম। ওঃ!

আমি সত্যিই গন্ধ পাচ্ছিলাম জলপাই বনের।

–তা এত রোমান্টিক বিয়ে ভেঙে গেল কেন?

আমরা হাঁটছিলাম কেভেন্টার্সের দিকে। কাঞ্চনজঙ্ঘা ঝুলন্ত মেঘের টিপিন খাচ্ছিল।

–ওর খুব গিলটি লাগছিল ওর এক্স-বয়ফ্রেন্ড সার্দিনোর জন্যে। সার্দিনোর বিয়েটা জাস্ট ভেঙে গেছে। ওরা এখন পার্টনারশিপ ট্রাই করবে।

অণু হঠাৎ ‘বেটা বেটা’ বলে একদিকে ছুটে গেল। সেখানে ওর টিন-এজার ছেলে কোন স্বাভাবিক দুষ্টুমি করছিল। ও ব্যাপারটাকে চটকাতে চলে গেল। একটু বেশিই চাপ পড়বে ছেলেটার ওপর। একটা সিরিয়ালের গল্প ধূলিসাৎ হয়ে গেলে এমনটাই হয়। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে হোটেল শ্যালের পাশ দিয়ে নামছি, চারদিকে পাহাড়ি দোকানদারি। মদ খাব ভাবছিলাম একটা ঘুপচিমত বার-এ। পুল্টুশ খুব ভদ্রভাবে বলল—

–একটা কথা বলব?

এই বিনয়ী ব্যবহারে আমি খুব উদার হয়ে গেলাম।

–বলো বলো, কেন বলবে না। তোমার স্বপ্নের কথা বলবে না কেন? বলো।
–তুমি একটা ঢ্যামনা।

বলে নিজেই মিউট করে দিল নিজেকে। জীবনে এই প্রথমবার নিজেকে নিজেই মিউট করে দিল পুল্টুশ। খিস্তিটায় আমি বিশেষ মাইন্ড করিনি। কথাটা ভুল নয়, মানে যাই হোক। ঢ্যামনা কথাটায় লোকে খিস্তির আঁচ পায় কেন কে জানে? শহরের মানুষদের সভায় আমি কথাটা প্রয়োগ করে দেখেছি। বিশেষ করে মেয়েরা কথাটা পছন্দ করে না। আমি যতদূর জানি এর মানে নির্বিষ। হয়ত ধ্বনিটার মধ্যে একটা গদগদানি আছে বলেই লোকে বিব্রত হয়ে পড়ে। ত্রিদিবের দেওয়া স্ল্যাং অভিধান ঘেঁটে দেখতে হবে। কিন্তু পুল্টুশের এভাবে নিজেকে মিউট করে দেওয়ায় আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম।

ওই তো আমার সাধের দেনজং। বাইরে থেকে ছোট্ট মোমোর দোকান। কিন্তু ভেতরে বসার ব্যবস্থা আছে। কাউন্টারে এক নেপালি ভদ্রলোক খবরের কাগজ পড়ছিলেন। আমি গরম জল দিয়ে ব্র্যান্ডি খাব বললাম। ভদ্রলোক হেসে কাগজ পড়া শেষ করতে ফিরে গেলেন। এখানে অত তাড়া নিয়ে কেউ আসে না। পাশের ক্যাবিনে আঞ্চলিক ছোকরারা মদ খাচ্ছে। আমার সিগারেট খেতে ইচ্ছে করল। ভদ্রলোক মুখ তুলে আবার হাসলেন। সব পাব আমি। ধৈর্য ধরতে হবে। কিন্তু পাব সবই। রাইকে পাব না। ধৈর্য পাড়াগাঁর প্রশান্ত পুকুর হয়ে গেলেও রাই মোবাইলে গান শুনেই যাবে।

দোকানদার আমাকে সব দিলেন। ওঁর কাগজ পড়া শেষ। নিশ্চিন্তে মোমো বানাতে লাগলেন।

অনেক দিন পরে আমি সিগারেট খাচ্ছি। খুব ভাল লাগছে। একসময় রোজ খেতাম। বেশি খেতাম। কিন্তু তারপর আমি মেয়েদের মধ্যে একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম। বেশির ভাগ মেয়েরাই সিগারেট খাওয়া পছন্দ করে না। অনেকে একটা-দুটো মাইন্ড করে না। তার বেশি হলে খুনসুটি করে সেটা আদায় করতে হয়। এই দ্বিতীয় ব্যাপারটা ভেবে, খুনসুটির রোমান্টিক সম্ভাবনা মাথায় রেখে, আমি সিগারেট খাওয়া বেশ কমিয়ে দিলাম। এর ফলে কদিন পরে আমার খিদে বেড়ে গেল। কিন্তু তখন দিশার সঙ্গে যোগাযোগ হল। ওর খিদে কম ছিল বেশি সিগারেট খেত বলে।

দু-পেগ ব্র্যান্ডি দ্রুত শেষ করে এবং ভরপেট মোমো খেয়ে আমি টাকা মিটিয়ে বাইরে এলাম। ভেতরে একটা বেশ তলতলে আনন্দ হচ্ছিল। তাই আমি আবার সিগারেট ধরালাম। এটাই হতে পারত রাইয়ের সঙ্গে দেখা করার মোক্ষম মুহূর্ত। আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল অনেক। মনের মধ্যে নানা রকম গান ঘোরাফেরা করছিল। কিন্তু দাড়ি কামানোর ব্যাপারটা মাথায় এল। একটা সেলুনে ঢুকলাম। কলকাতার পাড়ার মোড়ের মডার্ন সেলুন কিম্বা স্মার্ট সেলুনের পাহাড়ি ফ্র্যাঞ্চাইজি বলা যায়। ভেতরে ঢুকলাম আর তখনই সেই ব্যাপারটা হল।

এত ভয় আমি অনেক দিন পাইনি। আমার পথ জুড়ে দাঁড়িয়ে একজন পুরুষ। এমন কিছু বড় শরীর নয়। ছ-ফুটের নিচে হবে, চোখে একটা ধুলোলাগা চশমা, আমার চেয়ে অনেকটা রোগা একজন মানুষ। বহুদিন চুল দাড়ি কামায়নি। ওর হাসি আমার আতঙ্ক বাড়িয়ে দিল। এ-যদি মালিক হয়, তাহলে এখানে দাড়ি কামাব না।

সব চেয়ে ভয়ঙ্কর ওর ঝাপসা চোখদুটো। মুখে বিশাল বয়সের ছাপ। যেন বহু বছর একটা গুহার মধ্যে থেকেছে অন্যরকমের মানুষদের সঙ্গে। আজ সকালেই বেরিয়েছে। হাতে রেজর পেলে ও যা খুশি করে ফেলবে। অথচ আমার মনে হচ্ছিল ওকে আমি চিনি। ও কি তবে পুল্টুশ? সত্যিই বাইরে বেরিয়ে এসেছে? আমি চশমা খুলে তাকালাম ওকে ভাল করে দেখব বলে।

সেলুনের আয়নায় আমি নিজেকে দেখছিলাম।

 

আবার আগামী সংখ্যায়

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...