চিঠি, কৈশোর এবং …

মিলন চট্টোপাধ্যায়

 

চিঠ্‌ঠি আয়ি হ্যেয়, আয়ি হ্যেয়
চিঠ্‌ঠি আয়ি হ্যেয় …

পঙ্কজ উধাসের উদাস করা গলায় এই গান যখন প্রথম শুনি তখন কতই বা বয়স। গান বোঝার মত ক্ষমতাও হয়নি। তবু এক মন কেমন করা সুর ঢুকে যেত মগজের অলিতে-গলিতে! চিঠি শব্দটাই বুঝতাম শুধু। মাঝে মাঝেই ডাক-হরকরার গলার গমগমে আওয়াজ ছড়িয়ে যেত বাড়ির উঠোনে— ‘চিঠি আছে’।

তখন সবেমাত্র পড়তে শিখছি। নানা চিঠি আসত বাড়িতে। বেশিরভাগই নিমন্ত্রণ। ওই বয়সেই বুঝে গিয়েছিলাম— হলুদ সিঁদুর মাখানো চিঠি মানেই— আনন্দ,মজা, হইচই আর সাদা খামে, ‘ওঁ গঙ্গা’ লেখা অবস্থায় আসত যে চিঠি, তার মানেই— খারাপ খবর। সেই চিঠির গায়েই কেমন যেন বিষাদ মাখানো থাকত।

একদিন পুরনো জিনিসপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ হাতে পেলাম হালকা সবুজ কাগজে লেখা একটা চিঠি। কাগজটা পছন্দ হওয়ায় মাকে দেখাতেই মা ছিনিয়ে নিয়ে বলল— ‘এটা তোমার কাজের জিনিস নয়।’ বাবা দেখি মুচকি হাসছে! মা বাবাকে হাসতে দেখে বলল— ‘আ মরণ! আদিখ্যেতা দেখে বাঁচিনে।’ সে বয়সে এর গূঢ় তত্ত্ব বোঝার ক্ষমতা না হলেও মায়ের কৃত্রিম রাগ বুঝতে পেরেছিলাম। সেদিন লুচি হয়েছিল বাড়িতে।

এরপর এক বালকের ক্রমশ পরিধি বিস্তার। রানাঘাট নামক এই অলস মফঃস্বলে রাস্তাগুলো হয়ে যেতে থাকল নিশ্চিন্দিপুর, চাঁদের পাহাড়, মায়া সভ্যতার মায়াবী অঞ্চল। কৈশোর এল স্বাভাবিক নিয়মে। কবিতা ভালো লাগতে শুরু করল। ছবি আঁকার ক্লাসে স্টিল লাইফের বদলে মেয়েদের দিকে চোখ, তাদের কালো চুল থেকে নাকে আসতে শুরু করল মন কেমন করা গন্ধ। অমোঘ বসন্ত তখন সারা বছর জুড়ে! প্রেম এল।

সে সময় কোথায় মোবাইল, কোথায় ইন্টারনেট। এসএমএস নামক চটজলদি বার্তা বিনিময় ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানের পাতায়।

তখন চিঠির যুগ।

পড়ার ব্যাচে, বইয়ের ফাঁকে বন্ধুদের গুঁজে দিতে দেখেছি ছোট্ট চিরকুট। নানারকমের লেখা, অদ্ভুত তার ভাষা। কেউ রক্ত দিয়ে চিঠি লিখছে আঙুলে ব্লেড চালিয়ে— ‘তোমায় না পেলে এ জীবন বৃথা!’ কেউ লিখছে— ‘তুমি আমার O2। তোমার বাবা নামক CO2-র জন্য কি বিবাগী হব শেষে?’

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক ঘটনা ঘটতে দেখেছি। বারবার প্রেম প্রত্যাখ্যান করা বান্ধবীকে দেখেছি আকাশকুসুম কল্পনা করতে। তার খুব শখ ছিল রাজপুত্রের মত কেউ এসে তাকে ঘোড়ায় চাপিয়ে নিয়ে যাবে। এখন সে এক আড়তদারের বউ। ঘোড়া না পেলেও ছোটা হাতিতে তাকে দেখেছি এক পিকনিকে আসতে।

আর একটু ছোট বয়সে দূতের কাজ করতাম। পাড়ায় ভালো ছেলে সুনাম থাকায় প্রত্যেকের বাড়ির অন্দরমহলে অবাধ যাতায়াত ছিল আমার। রাঙা আলুর মত দেখতে ছিলাম বলে কেউ সন্দেহও করত না। ফলে দিদিদের, পিসিদের হাতে যথাসময়ে পৌঁছে যেত রোমিওদের সুগন্ধি পত্র। এক কাকা আতর লাগিয়ে রাখত চিঠিতে। একজন কিনে আনত নানা রঙের প্যাড। চিঠি পৌঁছে দেওয়ার পারিশ্রমিক হিসেবে— ক্যাডবেরি, গুঁজিয়া, কাঠিলজেন্স, লাট্টু কিংবা ঘুড়ি কিছুতেই আপত্তি ছিল না আমার।

যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন আমার মাসতুতো দাদা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে গেছে। সে সময় কোনওভাবে আমার ডায়েরি তার হাতে আসে। কোনওরকম প্রেম সংক্রান্ত লেখা না থাকা সত্ত্বেও সে আমাকে বেছে নেয় চিঠি লেখক হিসেবে। ব্যাপারটা আমার কাছে আজও বড্ড অবাক করা! কী কারণে যে তার আমাকে লেখক মনে হয়েছিল তা আজও বুঝিনি! সেই অর্থে এই দাদাই আমার প্রথম সম্পাদক। ওর নানা মেয়েকে ভালো লাগত। আর প্রত্যেকের জন্যই ব্যবহার করত নতুন নাম, নানারকমের কাগজ আর কালি। চিঠি লেখার জন্য নানারকমের সঙ্কলন থেকে কবিতার বই কিনে ফেলত সেই দাদা। হাতের লেখা ভালো হওয়ার কারণে পরবর্তীতে আমাকেই সে চিঠি লিখে দিতে হত। প্রথমদিকে দাদা লেখা নিয়ে বিস্তর চিন্তাভাবনা করত। কোন কবিতার লাইন কোথায় বসাতে হবে, কোন কোটেশন কোন জায়গায় লাগসই সেসব বিস্তর কাটাকুটির পর ফাইনাল হত। ক্রমশ দাদা নাক গলানো বন্ধ করল। শুধু বলে দিত সম্বোধন কোন নামে হবে। প্রত্যেকটি মেয়েকে সে নিজস্ব নামে ডাকত। কেউ বিয়াস, কেউ তিতাস, কেউ বা আবার সীমন্তিনী। এই প্রেমপত্র লিখেই আমার গদ্য লেখার হাতেখড়ি। রাস্তায় দাদার সেই বান্ধবীদের দেখেই চিনে ফেলতাম কিন্তু তারা জানত না— যে চিঠি পড়ে ওরা উত্তর দিচ্ছে তা আসলে আমারই লেখা। একজন চিঠির তলায় লিখেছিল— ‘তোমার স্নেহধন্যা…’, সে চিঠির সম্বোধন ছিল— ‘প্রাণনাথ’। পড়াশোনায় উজ্জ্বল হওয়া সত্ত্বেও কেন যে সে প্রাণনাথের স্নেহধন্যা হয়ে উঠতে চেয়েছিল তা তখন যেমন বুঝিনি আজও বুঝি না!

ব্যক্তিগতভাবে আমি কাউকেই প্রেমপত্র লিখিনি। পেয়েছি বেশ কিছু। এক মেয়ে তার বুকের খাঁজ থেকে বের করে দিয়েছিল ঘামে ভেজা একটা চিঠি। সে চিঠি যখন পাই তখন উচ্চমাধ্যমিক পড়ি। বানানে বিস্তর ভুল থাকায়, প্রুফ দেখার মত দেখে চিঠিটি ফেরত দিই। মেয়েটি মারাত্মক রেগে গিয়েছিল। আজ বুঝি সব জায়গায় মাস্টারি করতে নেই। যদিও এখন সে দিব্যি আছে আমারই পরিচিত একজনের স্ত্রী হিসেবে। এরপর একটি চিঠি পাই এক ফোটোফ্রেমের ভেতরে। ছবির বদলে চিঠিটি ছিল, লেখা ছিল— ‘সোনাই, আমি রাগ করে নিজের ছবি ছিঁড়ে ফেলেছি তাই এটা দিলাম।’

যখন কলেজে উঠলাম তখন— ‘ভালোবাসা মানে আর্চিস্‌ গ্যালারি’। প্রচুর কার্ড পেতুম, দিয়েওছি অনেক। তবে সাহস করে কাউকেই— ‘ভালোবাসি’ লিখতে পারিনি! রাজনীতি সে সময় বেশি টানত। একদিন এক বন্ধুর বাড়ি গেছি ভোরবেলা কলেজ সেরে। দেখি সে প্রচুর মশা মেরে জড়ো করেছে। বললাম— ‘এসব কী?’ দার্শনিকের মতো উত্তর এল— ‘চুপ করে দ্যাখ্‌ শালা।’ পরবর্তী চল্লিশ মিনিট সে খরচা করল প্রতিটা মশা টিপে সেই রক্ত দিয়ে এক সুদৃশ কাগজে আঁকাবাঁকা অক্ষরে— ‘I LOVE YOU’ লেখায়! আমি তো অবাক! পরে জানলাম তার প্রেমিকার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাচ্ছে প্রায় তাই এ চিঠি। সে সময়ের মেয়েরাও হয়তো একটু বোকা ছিল নইলে কীভাবে আবার জোড়া লাগল সে সম্পর্ক তা আজও রহস্যের! ছ’মাস বাদেই সেই মেয়েটিকে আমার বন্ধু বিয়ে করে ফেলে। লেখাটা যদি তার কাছে পৌঁছায় তবে নির্ঘাত তুমুল খিস্তি করবে।

এরপরেই কোমায় চলে যাওয়া শুরু চিঠির। তার বদলে হাতে হাতে মুঠোফোন। তাতে প্রচুর প্রাইভেসি। বাবা, দাদা, কাকার হাতে ধরা পড়ার ভয় নেই। দূত অবধ্য সে নিয়ম না মেনেই পিটুনি, চমকানো নেই— সময়, সুযোগ সবই হাতের মুঠোয়। কখন ফাঁকা থাকবে বাড়ি আর প্রেম হবে জমিয়ে সেটা সহজ থেকে ক্রমশ সহজতর। নাম্বার মিলিয়ে একাধিক প্রেমেও বিপদের মাত্রা কম। কিন্তু সেই অম্লান, মায়াবী প্রেম চিঠির সঙ্গেই হারিয়ে গেছে জীবন থেকে। কৈশোরের কথা ভাবলেই কেন জানি না, আমার সেই ঘামে ভেজা চিঠিটার কথাই বারবার মনে হয়!

হায়! সেই অমলিন কৈশোর— একবার, যদি একবার ফিরে পেতাম…

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...