রামপ্রসাদ সেনের গানে সেই সময়ের বাংলার অর্থনীতি এবং সমাজ

বিকাশ এস জয়নাবাদ

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

বাংলার টাকশাল ছিল রাজস্থানের মাড়োয়ার রাজ্যের রাজধানী যোধপুরের নাগর গ্রামের জগৎশেঠদের হাতে। ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে, কবি রামপ্রসাদ সেনের জন্মের এক বছর আগে, মুঘল সম্রাট মুহম্মদশাহ এদেরকে ‘জগৎশেঠ’ উপাধি দেন। বাংলায় টাকশাল পরিচালনা, মুদ্রা টক্কন ও ব্যাঙ্কিং সম্পর্কিত সমস্ত ব্যাপারে ‘জগৎশেঠ’রা ছিলেন সর্বেসর্বা। মুর্শিদকুলি-সুজাউদ্দিন-সরফরাজ-আলিবর্দিরা জগৎশেঠদের গদিতে টাকা খাটাতেন। অবাঙালি পরিবারের হাতে বাংলার টাকশাল! সুজাউদ্দিনের সময় (১৭২৭-১৭৩৯) মুঘল সম্রাটের প্রাপ্য রাজস্ব এবং দেওয়ানি পর্বে (১৭৬৫-৭২) সম্রাট শাহ আলমের প্রাপ্য রাজস্ব জগৎশেঠদের হুন্ডির মাধ্যমে দিল্লি যেত। শতাব্দীর শেষদিকে বেনারসের বণিকগোষ্ঠী গোপালদাস-মনোহরদাস-দ্বারকাদাস, পাঞ্জাবি হুজুরিমল, আর্মেনীয় খাজা ওয়াজেদদের মতো বণিকরা এবং ‘জগৎশেঠ’রা ইউরোপীয় বণিকদের ব্যক্তিগত ব্যবসার জন্য মূলধন যোগান দিত।

বাংলায় অনেক ইউরোপীয় বণিক বাণিজ্য করেছে। বেলজিয়ামের অস্টেন্ড কোম্পানি (আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দে) বাংলাদেশে অন্য বণিকদের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে বাংলার মসলিন, রেশমবস্ত্র, সোরা ইত্যাদি কিনে নিত, বাংলার কারিগর-চাষি এতে বেশি লাভবান হত। অন্যদিকে ইউরোপ থেকে আমদানি করা পণ্য প্রচণ্ড সস্তায় বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি করত। অর্থশাস্ত্রের প্রচলিত নিয়মে বলা যায় এই অস্টেন্ড কোম্পানির বাংলাদেশের বাজারে থেকে যাওয়ার কথা। থাকেনি। এটাই বাস্তব। রামপ্রসাদ লিখেছেন— ‘প্রসাদ বলে সাধু বাণিজ্যে, যে ধন ব্যাপারে পাবি/ সে ধন বিলাইলে ফুরাবে না, যখন চাবি তখন পাবি।’

বাংলার ভালো, বাঙালির ভালো কে দেখতে চায়! রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে ভোগ করাই রাষ্ট্রপিতাদের কাজ, আম জনতার ভালো তাদের কাছে ভালো না হলে (কিছু কাটমানির ব্যবস্থা না থাকলে) ভালো নয়! ১৭৩২ খ্রিস্টাব্দে বাংলার নবাব সুজাউদ্দিন অস্টেন্ড কোম্পানিকে ‘ঘাড় ধাক্কা’ দিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়নের কথা ঘোষণা করেন। বাংলার মাটিতে জমিদারি করাও হাজারো সমস্যা। রামপ্রসাদের গানে আছে— ‘প্যাদার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, তার নামেতে নিলাম জারি। যে পান বেচে খায়, কৃষ্ণপান্তি তারে দিলি জমিদারী।’

বাংলার বেশ কিছু অঞ্চলের জমিদারি দখল করে রাজা হয়ে বসেছে অবাঙালি গোষ্ঠী। লাহোরের কাপড় ব্যবসায়ী আবুরায়রা বংশ পরম্পরায় জমিদারি ভোগ করে গেছে। বাংলার আমজনতার মাথার উপর বিদেশি শক্তিধররা, সেই শোষণের ক্ষেত্রে কোনও ধর্ম নেই, সবাই শোষক। বাংলার মানুষের সহজ সরল মানসিকতাকে ধর্ষণ করেছে অবাঙালি বণিকেরা, সেই বহিরাগতদেরকে সহযোগিতা করেছে, মহিমান্বিত করেছে বাংলার রাজশক্তি। সপ্তদশ শতকের শেষভাগে বাংলায় খেটে খাওয়া, নিম্নবর্গীয় মানুষদের বিদ্রোহ দেখা দিলেও তা বেশিদূর ছড়িয়ে পড়েনি। সমসাময়িক রাজদরবারে (আসলে পড়তে হবে জমিদারের দরবারে) আশ্রিত কবিরা উল্টে স্থানীয় মানুষের সেই সব বিদ্রোহকে কটাক্ষ করেছে। ১৭২০ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমানের রাজা চিত্রসেন অধুনা দুর্গাপুর মহকুমার গোপভূমের রাজাকে পরাজিত এবং নিহত করেন। যদিও ১৭২০ খ্রিস্টাব্দের গোপভূম জয়ে মহারাজা চিত্রসেনের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ সম্ভব নয় বলে মনে করেন কিছু ঐতিহাসিক, কারণ তাঁরা বলেন ১৭২০ খ্রিস্টাব্দে চিত্রসেন নাবালক ছিলেন।

নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রামপ্রসাদ সেনকে একশত বিঘা নিষ্কর ভূমি দান করেছিলেন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে প্রতিদানে রামপ্রসাদ সেন রচনা করে দিয়েছিলেন ‘বিদ্যাসুন্দর’। রামপ্রসাদ সেনের ‘বিদ্যাসুন্দর’ ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দর’-এর মতো তর্কাতীত সার্থক হয়নি। রাজদরবার রামপ্রসাদ সেনের উপযুক্ত স্থান নয়। রামপ্রসাদ সেন রোমান্টিক মনের কবি মানুষ, তাই তিনিই বলতে পারেন, ‘কাজ কী মা সামান্য ধনে।’ বলেন আমজনতার কথা। রাজা প্রজাকে রক্ষা করতে পারেন না, ধোঁকাধারী আইন বিচারের চেয়ে অন্যায় বেশি করতে অভ্যস্ত। রামপ্রসাদ সেন অসংখ্য কবিতায় নিজের কথা বলতে গিয়ে আমজনতার কথা বলে গেছেন। তাঁর সেইসব গানে তিনি জনগণের মধ্যে একাত্ম হয়ে গেছেন। কবি রামপ্রসাদ সেনের ঘর-সংসারী চিত্রকল্পে, গানে বহুমুখী বিচ্ছুরণ হয়েছে। একের মধ্যে বহু কথা বলেছেন। তিনিই বলতে পারেন, ‘এ সংসার ধোঁকার টাটি’, ‘অর্থ বিনা ব্যর্থ যে এই সংসার সবারি’, ‘ভাই বন্ধু দারা সুত কেবলমাত্র মায়ার গোড়া’, ‘যেজন কাঞ্চলের মূল্য জানে, সে কি ভুলে পেয়ে কাচ’, ‘ফল ফলাচ্ছে ফলা গাছে’ ইত্যাদির মতো অসংখ্য অমর বচন। ইতিহাস বলছে কবি রামপ্রসাদ সেন কিছুদিন কলকাতায় জমিদারি সেরেস্তায় কাজ করেছেন। মনিবের দাসানুদাস হয়ে থাকাটাই চাকুরিজীবীদের ভবিতব্য। তাঁর মনিব উদার ছিলেন তাই তিনি ‘তবিলদারি’র মতো সংসারসম্পৃক্ত নীরস একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। এই ‘তবিলদারি’র চিত্রকল্প তাঁর সাহিত্য জীবনে বা শিল্পকর্মে মুখ্য এবং স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিল, যেমন—

এ সংসারে ডরি কারে—
রাজা যার মা মহেশ্বরী
আনন্দে আনন্দময়ীর খাসতালুকে বসত করি।
নাই কো জরিপ জমাবন্দী
তালুক হয় না লাটে বন্দী—

শিবের দলিল সই মোহরে, রেখেছি হৃদয়ে তুলে।
এবার করব নালিশ আগে, ডিক্রি লব এক সওয়ালে।।
জানাইব কেমন ছেলে, মোকদ্দমায় দাঁড়াইলে।
যখন গুরুদত্ত দস্তাবেজ গুজরাইব মিছিল কালে’।।

এযে বিষম লেটা।
যেটা কবুলতি সেই সত্য হল মিথ্যা করে দিলি পাটা।।

আমি মায়ের খাসে আছি বসে, আসল কসে সারে জমি।

দীর্ঘ আশা চড়ক গাছ, বেছে নিলে বাছের বাছ।

কারা চাকরী কর (রে মন)।
ওরে তুই বা কে তোর মনিব কে রে, হলিরে তুই কার নফর
মোহাছিবা দিতে হবে নিকাশ তৈয়ার কর।
ও তোর আমদানিতে শূন্য দেখি, কর্জ জমা ধর। (ওরে মন)।।

দ্বিজ রামপ্রসাদ বলে তাবার নামটি সার।
ওরে মিছে কেন দারা সুতের বেগার খেটে মর। (ওরে মন)।।

কবি রামপ্রসাদ সেন যখন বলেন ‘নুন মেলে না আমার শাকে’ তখন বাংলার নুন ব্যবসার চিত্র দেখলে দেখা যায় ‘পলাশীর যুদ্ধের আগে সুবা বাংলায় মুঘল সম্রাটের নাতিপুতিদের ব্যক্তিগত ব্যবসায় মৃগয়া ক্ষেত্র’। বাংলার লবণ যেত উত্তর ভারত এবং হিমালয়ের উত্তর দক্ষিণ দুই ঢালের রাজ্যে। নৌকাযোগে লবণ চলে যেত। ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার রাজকোষে লবণ ব্যবসার জন্য রাজস্ব জমা হত বার্ষিক গড়ে চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা। লবণ ব্যবসার একচেটিয়া অধিকার ছিল আর্মেনীয় বণিক খাজা আনোয়ারের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর। লর্ড ক্লাইভ ‘সোসাইটি ফর ট্রেডের’ (১৭৬৬-৬৮ খ্রিস্টাব্দে) নামে লবণ ব্যবসা একচেটিয়া করে লভ্যাংশ কোম্পানির কর্মচারীদের মধ্যে উৎসাহ ভাতা হিসাবে বন্টনের ব্যবস্থা করে দেন। প্রাক-পলাশী যুগে লবণের দাম ছিল গড়ে প্রতি একশ মণ চল্লিশ থেকে ষাট টাকা। লর্ড ক্লাইভের সৌজন্যে লবণের দাম গিয়ে দাঁড়ায় গড়ে প্রতি একশ মণে তিনশো টাকা! জেমস গ্রান্টের হিসাব অনুসারে সেই সময় লবণ শিল্পে বাঙালি শ্রমিক ছিল ৫৫/৬০ হাজার জন। বাংলায় বছরে গড়ে লবণ তৈরি হত আটাশ লক্ষ মণ।

কবি যখন বলেন, ‘নুন মেলে না আমার শাকে’ তখন ধর্মীয় কাব্যিক ব্যখ্যা করার সময় সেই সময়ের অর্থনীতির কথা মনে রাখা উচিত। বাংলার প্রকৃতি বড় উদার। এখানে শাক কচু ঘেঁচুর অভাব ছিল না। তার বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়নি, মানুষ শাক পাতা খেয়ে অনেক সময় পেট ভরাত।

রামপ্রসাদ লিখেছেন— ‘চিনি বলে নিম খাওয়ালে, ঘুচল না মুখের তিতা’ বা ‘ওমা নিম খাওয়ালে চিনি বলে, কথায় করে ছল/ ওমা! মিঠার লোভে, তিত মুখে সারা দিনটা গেল।।’ প্রাজ্ঞজনেরা চিনি নিম নিয়ে অনেক ব্যাখ্যা দেবেন। দেন। কিন্তু কবির সেই সময় বাংলার এক লাভজনক শিল্প ছিল চিনি শিল্প। ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলার মোট উৎপন্ন চিনির পরিমাণ ছিল পাঁচ লক্ষ মণ। ১৭৩৭ থেকে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ, এই দুই দশকে চিনি রপ্তানি হয়েছিল, বাংলা আয় করেছিল ষাট লক্ষ টাকা। এত প্রাচুর্য অথচ ছলনা করে নিম খাওয়ানো! মাটির মানুষের কথা।

রামপ্রসাদের জন্ম (১৭২৩ খ্রিস্টাব্দ) থেকে ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দ বাংলার অভ্যন্তরীণ পণ্যমূল্য খুব কম ছিল। তখন এক টাকায় চার থেকে পাঁচ মণ সাধারণ চাল পাওয়া যেত। একজন দিনমজুর আয় করত এক পণ বারো গন্ডা কড়ি। ‘রিয়াজ-উস-সালাতীন’-এর লেখক গোলাম হোসেন সেলিম বলেছেন— এযুগে লোকে এক টাকা ব্যয় করে সারা মাস কালিয়া পোলাও খেত। দ্রব্যমূল্য কম থাকার জন্যে গরিবেরা শান্তি ও স্বস্তিতে ছিল। ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে বিভিন্ন কারণে মানুষের সামনে কঠিন দুঃখ নেমে আসে। ১৭৪১ খ্রিস্টাব্দে পঙ্গপালের আক্রমণ, ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্গি আক্রমণ। জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বমুখী দাম, ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে তা বার্ষিক প্রায় তিরিশ শতাংশ। ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দ বাংলার অর্থনৈতিক জীবন বড় গতিশীল, বাংলার অনেক অর্থনৈতিক পণ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের একচেটিয়া ব্যবসায় রূপান্তরিত হয়ে পড়ে। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রাণ হারায়, এক-তৃতীয়াংশ জমি অনাবাদী হয়ে পড়ে। ১৭৬৮-৬৯ দুই বছর খরার কবলে বাংলা। ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দের রাজস্ব আদায় ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দের চেয়ে বেশি।

‘ধৈর্য-খুঁটা’, ‘ভবের গাছ’, ‘বিবেক হলদি’, ‘মুক্তকেশীর শক্ত বেড়া, ‘অম্বলে-সম্বরা’ এরূপ অসংখ্য শব্দবন্ধে মাটির মানুষের কথা। ‘ভুমৈব সুখম নাল্পে সুখমস্তি’ ভারতীয় জীবনদর্শনের সার কথা কবি অনায়াসে বলতে পারেন ‘কাজ কি মা সামান্য ধনে’! আটপৌরে ভাষা, চাষার ভাষা, মেঠো ভাষা এবং কেঠো চিত্রকল্প কবির কবিতাকে স্বাতন্ত্রমণ্ডিত করেছে। ‘কালী বলে কালকে কলা দেখাব’ কথার মধ্যে রামপ্রসাদের আন্তরিকতার ঐশ্বর্যে মাটির মানুষের গুণের কথাই প্রমাণ করে।

রামপ্রসাদের সময় বাংলার মানুষের কৃষি এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পই ছিল প্রধান জীবিকা। তাঁত শিল্পী-তাঁতকে কেন্দ্র করে কোম্পানির গোমস্তা, দালাল, পাইকার, জাছনদার, গুটিপোকা পালক-মালঙ্গি-কাগজী, প্রাক পলাশী যুগে বেনিয়ন গোমস্তা, পলাশী উত্তরকালে দোভাষী দালাল, (বিদেশি বণিকেরা যখন ব্যক্তিগত ব্যবসা করত তাদের কোম্পানির ব্যবসার সাথে তখন তারা ব্যবসা পরিচালনা করতে স্থানীয় মানুষকেই দালাল নিয়োগ করত। দালালেরা শ্রমিকের ঘর থেকে উৎপাদিত সামগ্রী নিজের মনমানি দামে কিনত) হিসাবরক্ষক, সেক্রেটারি, পুঁজির জোগানদার, খাজাঞ্চির মতো বিভিন্ন লোভনীয় সুযোগ ছিল। সেই সময় বেকারত্ব প্রায় ছিলই না। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় বর্তমান ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ তৈরির শুরুতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে যথেষ্ট সংখ্যক শ্রমিক জোগাড় করা কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছিল। (সূত্র— সি আর উইলসন, দ্য বিল্ডিং অফ দ্য প্রেজেন্ট ফোর্ট উইলিয়াম, ক্যালকাটা রিভিউ, জুলাই, ১৯০৪) কোনও জমিদারের সেরেস্তায় কাজ বা বিদেশি বণিকের ব্যক্তিগত কাজ করার জন্য বিদেশি ভাষা শিখতে হত।

বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা কিছু জাতির প্রায় কুক্ষিগত ছিল। রাঢ় বঙ্গের ‘শুভঙ্করী’র আর্য্যার বেশ কিছু অংশে ‘শুন কায়স্থ শিশু’ উল্লেখ আছে। বাংলার গণিতশাস্ত্র ছিল নিজস্ব ঘরানায় সমৃদ্ধ। শিক্ষাব্যবস্থা বাংলার বিভিন্ন জাতের এবং ধর্মের কিছু মানুষের জন্য প্রায় চিহ্নিত ছিল। অধিকাংশ সময়ে ভাষা শিক্ষাই ছিল কাজের শিক্ষা৷ শাসকেরা কখনওই চান না আমজনতা শিক্ষিত হোক, আবার শিক্ষিত হলেও তারা যেভাবে বলবেন সেইভাবেই শিক্ষিত হতে হবে, এটাই শাসক গোষ্ঠীর মনোবাঞ্ছা। পড়াশুনার সাথে আমজনতার জীবনের যোগ সবসময় থাকবে না৷ রামপ্রসাদ সেন হয়ত এই জন্যই বলেছেন—

মনরে আমার এই মিনতি।
তুমি পড়া পাখি হও করি স্তুতি।।
যা পড়াই তাই পড় মন পড়লে শুনলে দুধি ভাতি।
ওরে ‘জান না কি ডাকবে কথা, না পড়িলে ঠেঙ্গার গুঁতি।।

১২০২ খ্রিস্টাব্দের পরে অনেক বাঙালি বিভিন্ন বাস্তব কারণে ধর্ম পরিবর্তন করেছিলেন। ইসলাম ধর্মে জাতিভেদ প্রথা নেই। সাম্যই বড় কথা। বাস্তবে ধর্ম পরিবর্তনেও এই জাতপাতের কঠিন বেড়া ভেঙে বেড়িয়ে আসা বাঙালির পক্ষে সম্ভবপর হয়নি। প্রাজন্মক্রমিক নিস্তরঙ্গ পেশাজীবী বাঙালি পরিবারের সন্তানদের, আমজনতার সন্তানদের সাধারণত লেখাপড়া শেখানোর গরজ থাকত না। লেখাপড়া শেখা অধিকাংশ সময়েই ছিল ব্যয়বহুল এবং শিখতে হত বিদেশি ভাষায়, যা কষ্টসাধ্য এবং ধর্মভিত্তিক৷ যারা অল্পবিস্তর শিখত তাদের কেউ কেউ “মোল্লা, মুয়াজ্জিন, খোন্দকার, আখন্দ, আকুঞ্জি, মোক্তার, মুন্সি, মৌলবি, আমিন নায়েব, গোমস্তা, সরকার, পাটোয়ারী, মৃধা, সিপাহি হোত।” বাঙালির ভাগ্য খুব ভালো থাকলে কাজী ও ফৌজদারের পদ জুটত। তুর্কি থেকে মুঘল, পলাশির যুদ্ধের আগে, প্রায় সাড়ে ছয়শো বছরের ইতিহাসে বাংলার কোনও নবাব বাঙালি দেশজ মুসলমানকে উঁচু পদে বসাননি। এই দীর্ঘ সময়ে কোনও দেশজ (বাঙালি) মুসলমানকে শাসনকর্তা-সেনানী-উজির পদে খুঁজে পাওয়া যাবে না। “তুর্কি-মুঘল আমলে দেশজ মুসলিমদের সাথে সামাজিক সাংস্কৃতিক, শাস্ত্রিক ও বৈবাহিক সম্পর্ক প্রায়ই ছিল না বিদেশাগত ও উত্তর-ভারতীয় উত্তমন্য শাসকগোষ্ঠীর।” [সূত্র ৩]

বাংলার মানুষের প্রথাগত শিক্ষার প্রয়োজন না থাকলেও যে শিক্ষা ছিল তার গুণগত মান অতি অবশ্যই বাস্তবসম্মত ও জীবন উপযোগী। অভিজ্ঞতালব্ধ বংশপরম্পরা শিক্ষার এক প্রবাহমানতা ছিল। বাংলার মানুষ বিভক্ত ছিল বিভিন্ন ধর্মে। জাতে। ‘জাতি ধর্ম সর্প খেলা’। অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই বিভিন্ন রকমের বিভাজন।

কবিরা সাধারণ আমজনতার চেয়ে অনেক অনেক আগে বিচরণ করেন অথবা চোখের সামনে যা ঘটে চলে যা সাধারণ মানুষ দেখেও দেখে না কবিরা দেখতে পান। দেখেন না, নিজের মতো করে উপলব্ধি করেন। এইজন্যই রামপ্রসাদ লিখেছেন—

আমার মন মাতাল মেতেছে আজ, মদ মাতলে মাতাল বলে

মন যদি মোর ঔষধ খাবা।
আছে শ্রীনাথ দত্ত পটল স্বত্ব, মধ্যে মধ্যে এই চাবা

মন রে কৃষি কাজ জান না

ভ্রু মধ্যে দ্বিদলে মন, শিবলিঙ্গ চক্র যোনি

এরকম অসংখ্য গান কবির উন্নত মানসিকতার পরিচয় বহন করে শুধু নয়, দেবতাকে নিজের স্তরে নিয়ে আসে। সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কার্য নয়, রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে শুধু শোষণের জন্য। দেশে আইন থাকলেও তা সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য নয়, সেইজন্য মানুষের সমস্ত অভিযোগ জানানোর একমাত্র স্থল অদৃশ্য শক্তি—

দুখ কই গো পাষাণের মায়্যা মনের দুখ তোমারে কই
দারুণ পেটের জ্বালায় পরের বোজা মাথায় করে বই।
আমরা তবু হায় কোনও কোনও দিন উপবাসী রই
আমরা কি তোমার পাকা ধানে দিয়েছিলাম মই।
কারে দিলে রাজ-দেয়ানি তার সুধার (সীমা) নাই
তারা কি তোমার বাপের ঠাকুর আমরা কি কেউ নই।
পুত্র সপুত্র আমি যে হই সে হই
জন্মাবধি মোর কপালে লিখ নাই দুখ বই।
প্রসাদ বলে গুরুর বচন শুন ব্রহ্মময়ী
এ ভবেতে কবার এলাম কবার গেলাম এই তোরে।।

রামপ্রসাদ যে সময়ে জন্মেছিলেন সেই সময়ে বাংলার অর্থনীতি ব্যবসা বাণিজ্য ভিনদেশি মানুষের করায়ত্ত। রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তন হয়, আমজনতার কোনও পরিবর্তন হয় না। বড় জোর ৫০/৬০ হাজার লবণ শ্রমিকের দাসত্ব ঠিকা শ্রমিকে রূপান্তরিত হয়৷ লক্ষ লক্ষ তাঁত শ্রমিকের সুখদুঃখ ভিনদেশি দালালের হাতে খেলার পুতুল। বাংলার মা বোনেরা মেয়েরা হার্মাদদের দ্বারা ধর্ষিত হন। সমাজ জীবন থেকে পরম বৈষ্ণব বিনয় উধাও। নীতিহীন প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত।

রামপ্রসাদের ‘বিদ্যাসুন্দর’ কাব্য, রামপ্রসাদের গান বিশেষ এক ধর্মের কথা বলে না, বলে সেই সময়ের সমাজ ব্যবস্থা, অর্থনীতির কথা৷ রামপ্রসাদ সুন্দরভাবে শ্রেণিবিন্যাস করেছেন যে শ্রেণিপার্থক্য তথাকথিত সভ্যতার শুরু থেকেই বিদ্যমান যা সভ্য সমাজে থাকা উচিত নয়। রামপ্রসাদ লিখেছেন—

কেবা বুকের কেবা পিঠের, বল দেখি মা তাই শুনি
কেহ সারা দিনে পায় না খেতে, কেহ দুধে খায় সাঁচা চিনি।
কেহ শুয়ে তেতলাতে, পালঙ্কে মশারি টানি।
আমরা মরি শুড় শুড়য়ে, ভাঙা ঘরে নাইক ছা’নি।
কেহ পরে শাল দোশালা, কেহ পায় না ছেঁড়া ছালা
অনুভবে বুঝি তারা, তেলা মাথায় তেল ঢালনি।।


সূত্রনির্দেশ-

  1. আবদুল করিম, মুর্শিদকুলী অ্যান্ড হিজ টাইম (পৃ ৮২)
  2. আলেকজান্ডার ডাও: দ্য হিস্ট্রি অব হিন্দুস্থান (লন্ডন ১৭৬৮-১৭৭২)
  3. খোন্দকার ফজলে রব্বী: অরিজিন অফ দ্য মুসলমানস অফ বেঙ্গল, ১৮১৫

 

সহায়ক গ্রন্থ –

  1. প্রশান্ত সেন সম্পাদিত ‘সাধক রামপ্রসাদ ও তাঁর পদাবলী’।
  2. সুবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘বাংলার আর্থিক ইতিহাস’ (অষ্টাদশ শতাব্দী)।
  3. সুজন রায় ভাণ্ডারী, ‘খুলাসাৎ-উৎ-তাওয়ারিখ’, অনুবাদ— যদুনাথ সরকার।
  4. মদনমোহন গোস্বামী (সঙ্কলন ও সম্পাদনা), ‘ভারতচন্দ্র’।
  5. সুকুমার সেন, ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’।
  6. মমতা বৈষ্ণব, ‘রাঢ় বাংলার ইতিহাস ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য’।
  7. ‘রামপ্রসাদ সেনের গ্রন্থাবলী’, বসুমতী দাহিত্য মন্দির।
  8. বিনয় ঘোষ, ‘পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’।
  9. অতুল বসু, ‘বাংলা ও বাঙালীর বিবর্তন’।
  10. নিখিল সুর, ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ও সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ’।
  11. অতুল বসু, ‘আঠারো শতকের বাঙলা ও বাঙালী’।
  12. অনিমা মুখোপাধ্যায়, ‘আঠারো শতকের বাঙলা পুঁথিতে ইতিহাস’।
  13. শ্রী হেমেন্দ্র নাথ পালিত, ”শুভঙ্করী’ রাঢ় বঙ্গের গণিত পদাবলী’।
  14. অনিরুদ্ধ রায় রত্নাবলী চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘মধ্যযুগে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতি’।
  15. আবদুস সামাদ, ‘বর্ধমান রাজসভাশ্রিত বাংলা সাহিত্য’।
  16. যজ্ঞেশ্বর চৌধুরী, ‘বর্ধমান: ইতিহাস ও সংস্কৃতি’।
  17. ইরফান হাবিব, ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস প্রসঙ্গ’।
  18. গৌতম ভদ্র, ‘মুঘলযুগে কৃষি-অর্থনীতি ও কৃষক বিদ্রোহ’।
  19. দীনেশচন্দ্র সেন, ‘বৃহৎ বঙ্গ’, ২য় খণ্ড।
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...