মুসাফির এ মন

নীলাঞ্জন হাজরা

 

তৃতীয় পর্বের পর

মুসাফিরি ৪

মায়ায় ভিয়েনায়

প্রথমে লন্ডন৷ তার পরে ভিয়েনা৷ পাঁচ বছর পরে৷ ব্রেক্সিট কাণ্ডের পর মনে পড়েছিল লন্ডনের বেকার স্ট্রিট টিউব স্টেশনের বাইরে খবরের কাগজ বেচা এক বুড়োর কথা৷ আর সেই প্রসঙ্গেই একটু নেট ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে একটা খবরে হোঁচোট খেয়ে মনে পড়ল ভিয়েনার এক নির্মল সকালের কথা৷

এমন সাঙ্ঘাতিক ভয় এর আগে বা পরে আমি জীবনে দু’বারই পেয়েছি মাত্র৷ যেমন পেয়েছিলাম সে দিন ভিয়েনায় স্ফটিক শুভ্র সকালে৷ প্রথমবার, তখন প্রেসিডেন্সি কলেজে ফার্স্ট ইয়ার-এ পড়ি৷ থাকি হিন্দু হস্টেলে৷ থাকি মানে, শরীরটা থাকে৷ মন আর মাথা, যাকে উর্দুতে বলে দিল-ও-দিমাঘ, সেটা কোথায় থাকত ঈশ্বরও ঠিক ঠাহর করতে পারতেন না মাঝে সাঝে৷ বিকেল তিনটে-ফিনটে পর্যন্ত ঘুমিয়েই কাটত৷ তারপর জলপথ হয়ে দিল-ও-দিমাঘ ধোঁয়াটে শূন্যে পাড়ি দিত৷ প্রায় রোজই৷ প্রথমে বুড়ো সন্ন্যাসী, যাকে বলে ‘ওল্ড মঙ্ক’-এর সঙ্গে রাম নাম৷ তারপর ব্যোম ভোলেনাথের শরণাপন্ন৷ দ্বিতীয়টির সরঞ্জাম মিলত সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ-এর বাটা-র সামনের ফুটপাথে সারা জীবন কাটানো ধূসর ধোঁয়া ধোঁয়া লোকগুলোর কাছে৷ দাদারা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, তাই কোনও দিন সমস্যা হয়নি৷ রাত যতই হোক না কেন, লেনদেন আটকাত না৷ তখন বোধহয় রাত্রি দু’টো-টুটো হবে৷ আমার পালা৷ হাজির হয়েছি৷ টাকা দিয়েছি৷ হাতে সবে কল্পদ্রুমপল্লবের পুরিয়াটি পড়েছে, একটা জিপের দুটো হেডলাইট সটান আমার ওপর৷ চোখের সামনে দেখলাম, ছায়ামূর্তিগুলো হাওয়ায় মিলিয়ে গেল৷ হেডলাইট জ্বলছে৷ তার তীব্র আলোয় একা আমি দাঁড়িয়ে আছি৷ পরের ৩০-৪০ সেকেন্ড বুঝেছিলাম ভয় কাকে বলে৷ চোখের সামনে তখন ভাসছে, অধ্যাপক নীহার হাজরা তাঁর পুত্রর জামিন নিচ্ছেন আদালত, জোড়াসাঁকো থানার কাছ থেকে৷ জিপটা ব্যাক গিয়ারে গিয়ে, সামান্য ঘুরে নিজের মনে বেরিয়ে চলে গেল৷ তখন আমার জামা সপসপে ভিজে৷

দ্বিতীয় বার— সন্দাকফু থেকে রিম্বিক ফিরছি৷ ১৯ কিলোমিটার মতো উৎরাই৷ এখন সে পথের কী হাল হয়েছে জানি না৷ ১৯৮০-র দশকে কোনও রাস্তা ছিল না, মানুষের পায়ে পায়ে তৈরি হওয়া একটা আঁকাবাঁকা দাগ৷ একটা জায়গায় এসে দেখি, এক দিকে খাড়া পাহাড় উঠে গিয়েছে৷ তার উল্টো দিকে সটান নেমে গেছে খাদ হাজার হাজার ফুট৷ মাঝখানে খাঁজ কেটে সেই সরু মেঠো পথ চলে গেছে৷ মানে, চলে যাওয়ার কথা৷ সেখানটায় পাহাড়টার একটা বাঁক৷ সেই বাঁকে শ’খানেক ফুট ধরে জমে রয়েছে আগের রাতে পড়া তুষার৷ পা রেখেই বুঝলাম পালিশ করা মার্বেল মেঝের মতো শক্ত আর পিচ্ছিল৷ একবার পিছলে গেলে সোজা খাদের মধ্যে৷ মরে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি৷ আর কোনও পথ নেই৷ পিঠে ২০ কিলোর রুকস্যাক৷ কী ভাবে যে আমি আর আমার বন্ধু অলোক সেই ১০০-১৫০ ফুট পেরিয়েছিলাম আস্তে আস্তে হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে তা আমরাই জানি৷ আসলে সন্দাকফু ট্রেকিংটা এমনিতে এতই জলভাত যে এর জন্য কেউ বিশেষ কাঁটা-মারা জুতো, দড়ি-দড়া, পোর্টার এসব নেয় না৷ কিন্তু এই ট্রেকেই ট্রেকার মৃত্যুর ঘটনাও একেবারে বিরল নয়৷ সে দিন সেই মৃত্যুভয়ই পেয়েছিলাম আমি৷

তেমনই ভয় ধরেছিল মনে সে দিন, ভিয়েনায়৷ সক্কাল সক্কাল ক্যামেরা কাঁধে বেরিয়ে পড়েছি৷ হোটেলের সামনের রাস্তাতেই৷ তখনও ভালো করে লোক চলাচল শুরু হয়নি৷ গোটা ভিয়েনা শহরটাই যেন একটা বিশাল পার্ক৷ নির্মেঘ আকাশ থেকে সোনা ঝরছে৷ সেপ্টেম্বর মাস৷ হঠাৎ একটা দৃশ্য দেখে চোখটা আটকে গেল৷ রাস্তার ধারে একটা অদ্ভুত টিউবকল৷ মাথাটা পিতলের৷ ছুঁচলো৷ চকচক করছে৷ আর ওই পাশে একটা পেল্লায় মধ্যযুগীয় বাড়ি৷ তার গায়ে একটা বিশাল বিলবোর্ড, যাতে হামাগুড়ি দিচ্ছেন এক স্বল্পবাস মহিলা৷ আমার চোখে গোটা ফ্রেমটার মধ্যে একটা অদ্ভুত যৌনতা ধরা পড়ছিল৷

ক্যামেরা তাগ করে দৃশ্যটা ফ্রেমবন্দি করার চেষ্টা করছি— হঠাৎ পিছন থেকে আমার পায়ে সজোরে লাথি৷ আর একটু হলে পড়েই যেতাম৷ ফিরে দেখি এক প্রৌঢ়া মহিলা৷ কত বয়স হবে, ৫০? বেশ গাঁট্টাগোঁট্টা৷ এখনও স্পষ্ট মনে আছে পরনে একটা ময়লা ছেঁড়া নীল জ্যাকেট আর একটা নীল জিন্স৷ পায়ে সাদা-কালো ছেঁড়া ছেঁড়া স্নিকার্স! সোজা আমার দিকে তাকিয়ে আছেন এবং জার্মান ভাষায় গালাগালি করছেন৷ সেও ওই ৩০-৪০ সেকেন্ডই হবে৷ কিন্তু মহিলার চোখে সেদিন যা ঘৃণা দেখেছিলাম, তা আর কখনও কারও চোখে দেখিনি৷ কয়েক সেকেন্ড আমার মনে হল, এখুনি পিস্তল বার করে ফায়ার করবে৷ সৌভাগ্যবশত ঠিক সেই সময়েই এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক যাচ্ছিলেন পাশ দিয়ে, নিমেষে পরিস্থিতিটা বুঝে তিনি দৌড়ে এসে যে প্রায় কুকুর তাড়ানোর মতো সে মহিলাকে তাড়িয়ে ছিলেন তাও পরিষ্কার মনে আছে।

আর তার পরেই দিনটা বদলে গেল! গতরাত্রের ঘণ্টা আটেকের ত্রিশঙ্কু ফ্লাইট-সফরে মোটেই ঘুম হয়নি৷ ঘড়িতে সকাল আটটা৷ ভাবলাম হোটেলে ফিরে গিয়ে আর একটু গড়িয়ে নিই৷ আসলে এসেছি এক মার্কিন কর্মিসভায় যোগ দিতে৷ নিজস্ব বাউণ্ডুলেপনার তাগিদে এসেছি দিন তিনেক আগেই৷ আর সেই বাউণ্ডুলেপনাটাই মনকে ঘরে রইতে দিল না৷ ঠিক করলাম হোটেলের লবি থেকে শহরের একটা ম্যাপ নিয়ে, সারা দিনটা কোথায় কীভাবে কাটাব ছকে ফেলে, বেরিয়েই পড়ি৷

পাঁচতারা হোটেলের ফুলে সাজানো ফিসফিসে লবি৷ সেই শীত-শীত, সেই হাসি, সেই সাবধানী চলাফেরা৷ দুনিয়ার সব পাঁচতারা হোটেলের কর্মীদের মুখে হুবহু নিক্তি মেপে একই রকমের পলকাটা হাসি ঠিক কোন কারখানায় তৈরি হয় আজও খুঁজে বার করতে পারলুম না৷ সবে শহরের পর্যটন ম্যাপটা কোলে ছড়িয়েছি৷ হঠাৎ সাঙ্ঘাতিক বেমানান উচ্চতায় ঝনঝনিয়ে প্রাচ্য নারী কণ্ঠ— ‘গশ! হোয়াট শ্যাল আই ডু?’ চোখ আটকায়৷ চাঁদপানা মুখ৷ কোনও আবরণ নেই৷ চুলও খোলা৷ কিন্তু দেহের বাকি অংশ কালচে জোব্বার মতো পোশাকে ঢাকা৷ হিজাব৷ তাঁকেই ফিসফিস করে কী যেন বলছেন রিসেপশনিস্ট৷ এবার তাঁর ডান হাত উঠল, তর্জনী সোজা আমার দিকে৷ মনে হল এক ছুটে পালাই— এক দণ্ডও কি একা হওয়ার জো নেই দুনিয়াতে? উপায় নেই৷ পথ আটকে ফেলেছে উদ্ভাসিত চাঁদের হাসি৷

সমস্যা আর্থিক৷ হাস্যময়ী এসেছেন একই কর্মিসভায়৷ এসেছেন আমারই মতো দিন তিনেক আগেই৷ কিন্তু সঙ্গে শুধুই ডলার৷ কিছু খুচরো ছাড়া ইউরো নেই৷ মাঝরাতে এয়ারপোর্ট থেকে এসেছেন হোটেলের শাটলে চড়ে৷ টাকা লাগেনি৷ এয়ারপোর্টে ডলার ভাঙাননি কম রেট পাওয়ার ভয়ে৷ ইত্যাদি নানা অজুহাত৷ মোদ্দা সমস্যা— ইউরো নেই৷ আজ রোববার এ হোটেলের কারেন্সি এক্সচেঞ্জ কাউন্টার নাকি বন্ধ— ‘বিশ্বাস করতে পারো? বলছে, কাছাকাছি কোনও ডলার ভাঙানোর জায়গাও নেই৷’ কাজেই এই বাঁকড়োর বান্দার কাছে কাতর অনুনয়৷

পরিচয় হয়— ‘আমি আশকাবাদ থেকে৷ তুর্কমেনিস্তান৷ আমি মায়া৷’ বুকটা ধড়াস করে ওঠে৷ পিঠ অবধি ছড়ানো সোনালি চুল৷ পারা-দানা হাসির চপলতায় রাশ টেনে আছে প্রশান্ত বড় বড় চোখ দুটো৷ কিন্তু আমি সে সব কিচ্ছু দেখছি না৷ দেখছি না কারণ, মন ছাপিয়ে তখন কলেজ জীবনে পড়া এক আশ্চর্য কবিতা৷

‘ব্যস্ত বুঝি? দেখি ম্যাপটা৷ আমিও তো বেরোব ভেবেছিলাম৷ কিন্তু…।’ কিন্তু কিচ্ছু কানে ঢুকছে না৷ কারণ, মন ছাপিয়ে তখন ‘আশকাবাদ কি এক শাম’৷ ফয়েজ় আহমেদ ফয়েজ়-এর সেই আশ্চর্য কবিতা—

সূর্য যখন
ঢলে যেতে যেতে
আশকাবাদের নীল দিগন্ত থেকে
নিজের সোনালি পেয়ালাতে
ঢেলে নিল প্রথম সায়াহ্নের
তরতাজা লাল
সে পেয়ালা তোমার সামনে রেখে
তোমারই সাথে
শুরু করল কথোপকথন
বলল, প্রণাম
বলল এবার তবে ওঠো, দেহের বিছানা থেকে
উঠে, কোনও মধুর খবর
লিখে দাও না কারও নামে
লিখে দাও না এই সন্ধ্যায়
লিখে দাও না পেয়ালার এই কিনারায়
হয়তো তুমি মেনেই নিলে
সেই অনুরোধ
কারও উদ্দেশে, এই সন্ধ্যায়
উপহার দিলেই না হয়
গোলাপি দুটো ঠোঁট
পেয়ালার এই কিনারায়
কিংবা হয়তো পরিপূর্ণ সাজে
গাঢ় আরামের মাঝে
ডুবে রইলে নিজের দেহের বিছানায়
আর দু’চোখ মেলে পথ চেয়ে
বসে রয়ে রয়ে
পেয়ালার প্রদীপ বুঝি নিভে গেল শেষে
আশকাবাদের নীল দিগন্তে এসে
তিলে তিলে সন্ধ্যা গেল ক্ষয়ে৷

জীবনের এই বার দরিয়ায়, লক্ষ্যবিহীন এক সকালবেলায়, অপরিচিত এই ভিয়েনায় হঠাৎ মুখোমুখি সেই আশকাবাদের নারী৷ ‘মায়া’ ছাড়া তার কী-ই বা আর নাম হতে পারে? ইউরো আর ডলারের প্যাঁচে আটকে থাকবে সেই পরিচয়? তা কি হয়? ‘চলো, যথেষ্ট ইউরো আছে আমার সঙ্গে৷’ আশকাবাদের হাত ধরে ভিয়েনার পথে বাঁকুড়ার বান্দা৷ গ্লোবালাইজেশন আর কাকে বলে!

ইতিহাসের ছাত্র আমি৷ সময়ের দূরত্ব সযত্নে মাঝখানে রেখে সাবধানে শুরু করি কথোপকথন৷ ‘তুমি জানো তো, মায়া, ভিয়েনার ইতিহাস?’ মায়া হাসে৷ সবে জেগে ওঠা মারিয়া হিলফার স্ট্রাসসের ফুলে সাজানো কাচের জানালার সারি দূরে সরিয়ে হাজার আড়াইয়েক বছর আগের কেল্টিকদের এক গ্রামের ধুলো-ধূসরিত পথে নামি৷ পাঁচশো বছর ধরে দানুব নদীর স্নেহে বেড়ে উঠছিল সেই জনপদ৷ ১৫ সাধারণাব্দে রোম সাম্রাজ্যের থাবা টগবগিয়ে না এসে পড়া পর্যন্ত৷ বাউণ্ডুলে জার্মান যাযাবরগুলোকে শায়েস্তা করা দরকার৷ তৈরি হয়ে গেল সৈন্যঘাঁটি আর সীমান্ত শহর ভিন্দোবনা৷ আজকের ভিয়েনা৷ মধ্যযুগে ব্যাবেনবুর্গ বংশের রাজধানী৷ ১৪০০ সাল থেকে দোর্দণ্ডপ্রতাপ হ্যাবসবুর্গ রাজত্বের রঙিন স্বর্গপুরী৷ উচ্ছ্বল হাইডেন-এর শহর৷ অবাধ্য মোৎজার্টের শহর৷ তোলপাড় বিঠোফেন-এর শহর৷ অবহেলিত, অপমানিত শুবার্টের শহর৷ নেপোলিয়নের শহর৷ যাঁর জীবনের করুণ কাহিনির কিচ্ছু না জেনে আমরা যাঁর কপালে সেঁটে দিয়েছি এমনই এক উক্তি যা তিনি কখনও বলেননি সেই মারি আঁতোয়ানেত-এর শহর৷ না৷ ‘এরা রুটি পাচ্ছে না তো কেক খায় না কেন?’ এমন কথা মারি কখনও বলেননি৷ বরং, শোনা যায়, গিলোটিনে ঘ্যাচাং করে গলাটা কেটে মাথাটা ঝুড়ির মধ্যে পড়ে যাওয়ার আগে তিনি জল্লাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন, গিলোটিনে ওঠার সময় গায়ে পা লেগে যাওয়ার জন্য৷ ভিয়েনা সেই মারি আঁতোয়ানেতের বাপের বাড়ির শহর৷ হিটলারের ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরে বেড়ানো এবং পরে মদমত্ত বক্তিমে ঝাড়ার শহর৷ যৌনতার নানা জটিল মার-প্যাঁচের গোপন খবর ফাঁস করে দেওয়া সিগমুন্ড ফ্রয়েডের শহর৷ অরসন ওয়েলস-এর থার্ড ম্যান ছবির শহর৷

স্ট্রাসসে আর গাসসের অলি-গলি দিয়ে এই সব নানা ভিয়েনার পরত পেরোতে পেরোতে ‘মায়া’ কথাটার বাংলা মানে তাকে ইংরেজিতে বোঝালাম৷ সে আমায় একটা আপেল ধরিয়ে বলল— ‘তুর্কমেনিস্তানের৷ খেয়ে দেখো, মায়া নয়!’ তারপর যে কখন মায়া আমায় তুর্কমেনিস্তানের বরফ ঢাকা পাহাড় আর ঠাঠা কারকুম মরুভূমির বন্ধুর বালিয়াড়ির সফরে নিয়ে চলে গেল খেয়ালই করিনি৷ শুধু মনে আছে দানুব ক্যানালের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি আসলে আমুদরিয়ায় নৌকা বাইছিলাম৷ কিন্তু আমরা যাচ্ছি কোথায়?

এবার একটু সুর কাটতেই হল— ‘কোথায় চলেছি আমরা, মায়া?’

‘স্টাডথহাল, হালেনকোমপ্লেক্স ভোগেলওয়েইডপ্লাৎজ্!’’

সর্বনাশ৷ কোনও আর্ট গ্যালারি নয়, মিউজিয়াম নয়, পার্ক নয়, কফি হাউস নয়, এ সব কী ভয়ঙ্কর শব্দ বলছে? পাগল? না বিশুদ্ধ শয়তান?

‘আজ সন্ধ্যায় মার্কিন জাদুকর ডেভিড কপারফিল্ডের শো আছে জানো তো? আগাম টিকিট কাটলে ভালো সিট পাওয়া যাবে৷’

হঠাৎ ভীষণ হতাশ লাগছিল৷ ভিয়েনার প্রথম সন্ধ্যা কাটাতে হবে মার্কিন বাতেলাবাজির কাছে বোকা বনে৷ মুখে বললাম— ‘আচ্ছা, আচ্ছা! তাই নাকি৷’ আমুদরিয়ায় তখন জোয়ার৷ হাজির হলাম সেই ভীষণ গন্তব্যে৷ কাটা হল দুটি টিকিট৷ আমার ইউরোয়৷ ‘মায়া’-র কি আর ঋণ হয়? নাকি তাকে তা বলা যায়? এবার?

এবার আমাকে হাল ধরতেই হল৷ বললাম, ‘তুমি যেখানে খুশি যেতে পারো৷ আমি চললাম মাত্র ৩২ বছর বয়সে অবহেলিত, অপমানিত হয়ে মারা যাওয়া সুরের কিংবদন্তি রাজকুমারের বাড়ি৷ ফ্রান্‌জ্‌ শুবার্ট-এর বাড়ি৷ শুবার্ট গেবুর্টস্‌হাউস৷’’

ফের ভাঁজ করা সেই পেল্লায় ম্যাপ বার করল মায়া৷ তার ওপর দ্রুত চলছে তার আঙুল৷ মাথায় বসে যাচ্ছে ভিয়েনার স্ট্রাসসে আর গাসসে-র পথ-রাজপথ৷ ‘অনেকটা হাঁটতে হবে কিন্তু৷ ঘণ্টা খানেক৷ অবিশ্যি মাঝপথে কোনও একটা পার্কে বসে আমরা জিরিয়ে নিতে পারি!’ জানায় সে৷ পা বাড়ালাম৷ লক্ষ্য ফ্রান্‌জ্‌ শুবার্টের জন্মস্থান— শুবার্ট গেবুর্টসহাউস৷

কী ভাবছিলাম ঠিক সে মুহূর্তে? যা মনে পড়ছে তাই ভাবছিলাম কি? নাকি আজও বিজ্ঞানের কাটা-ছেঁড়া পরাস্ত করে স্মৃতি নামক জটিল রহস্য লুকোচুরি খেলছে আমার সঙ্গে? কোনটা কতটুকু মনে রাখে মানুষ? কত দিন? কত বছর? কেন এটা মনে রাখে, ওটা ভুলে যায়? যা মনে থাকে তার পুরোটাই কি সত্যি ঘটেছিল? নাকি যা মনে করতে ভালো লাগে, তারও খানিকটা মিলে মিশে যায় স্মৃতির অলীক ছবিতে? শুধুই ইট-কাঠ-পাথর-ধাতু আর খুঁজে পাওয়া পৃষ্ঠার আঁকিবুকি ঘেঁটে গড়ে ফেলা যায় কি কোনও নির্ভুল ইতিহাস? সহজ উত্তর নেই৷

তবু তো আমরা ইতিহাস লিখি৷ ভাগ্যিস লিখি৷ ‘রণরক্ত সফলতার’ কথা কবিকে ইতিহাসই জানায়৷ আর এও জানায় যে, সেটাই ‘শেষ সত্য নয়’৷ আমরা জানতে পারি আজীবন দারিদ্র আর অবহেলার সঙ্গে মারামারি করে এক তরুণের গড়ে তোলা ‘আনফিনিশ্‌ড্‌ সিম্ফনি’-র কথা৷ পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের মুকুটহীন রাজপুত্র ফ্রান্‌জ্‌ শুবার্টের কথা৷

সে তো দুশো বছর আগের কথা৷ ১৭৯৭ সালে তাঁর জন্ম৷ এক গরিব ইস্কুল মাস্টারের ১৪ সন্তানের একজন হয়েও যে রাজা-রাজড়াদের ধ্রুপদী সঙ্গীতের দুনিয়ায় ঢুকে পড়ার স্বপ্ন দেখা যায়, তা আমরা জানতে পারি শুবার্টের জীবনের ইতিহাস থেকেই৷ কোনও কাউন্ট কোনও দিন পিঠ চাপড়ে দেননি তাঁর৷ ভিয়েনার অজস্র চোখ ছানাবড়া করা ‘অপেরা হাউস’-এ গমগমে কনসার্টের শেষে মহাবোদ্ধা গণ্যমান্যদের হাততালির ঢেউয়ে ভেসে পড়ার কোনও সুযোগ হয়নি এই গোলগাল নাকে চশমা আঁটা যুবকটির৷ আর ৩২ বছর গড়াতে না গড়াতেই তাঁর জীবন শেষ৷

এই সব কথাই বলছিলাম মায়াকে হাঁটতে হাঁটতে৷

‘কেন? সে সময় তো সুরের গুরুদের গুরু বিঠোফেনও তো এ শহরে থাকতেন৷ তাঁর কথাই তো তখন সঙ্গীতের দুনিয়ায় শেষ কথা৷ তিনিও কি চিনতে পারেননি শুবার্টের প্রতিভাকে?’ মায়া উদগ্রীব৷

‘পেরেছিলেন, শোনা যায়, কিন্তু তখন বড় দেরি হয়ে গেছে৷ আর শুধু তিনিই নন, জার্মান মহাকবি গ্যেটেরও তখন এ শহরেই বাস৷ যোগাযোগ হয়েছিল৷ কিন্তু অবহেলা ছাড়া আর কিছুই পাননি শুবার্ট৷’

একবার গ্যেটের ১৬টি কবিতায় সুর দিয়ে, সুন্দর করে খাতায় লিখে গ্যেটের কাছে পাঠিয়ে ছিলেন শুবার্ট৷ সঙ্গে অনুরোধ— ‘গানগুলি আপনার নামে উৎসর্গ করতে চাই৷ অনুমতি দিন৷’ হপ্তা গড়িয়ে মাস গেল কোনও উত্তর নেই৷ তারপর ঠিক যেমনটি পাঠানো হয়েছিল তেমনি ফিরে এল সেই খাতা৷ সঙ্গে কোনও চিঠি নেই৷ ভালো-মন্দ-উচ্ছ্বাস-গালাগাল কিচ্ছু না৷ এক্কেবারে আমাদের মহাকবি মির্জ়া গালিবের সেই শের—

‘ম্যায় অওর সদ্-হাজ়ার জিগর-খরাশ / তু অওর উয়ো না-শুনিদান কে কেয়া কহু’ (আবু সয়ীদ আইয়ুবের অনুবাদে, ‘আমি— শত সহস্র আর্তনাদ / আর তুমি এক পরমাশ্চর্য না-শোনা’)৷ কী আশ্চর্য, শুবার্টের মতোই মির্জারও তো জন্ম সেই ১৭৯৭-এ৷ এক্কেবারে একই বয়সি দুজনেই৷

তখনকার দুই বিখ্যাত সঙ্গীত প্রকাশক ব্রেইটকফ আর হার্টেলকেও শুবার্ট পাঠিয়ে ছিলেন তাঁর গানের খাতা৷ দুজনেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন৷ ব্রেইটকফ আবার ড্রেসডেন শহরের আর এক বাজনদার ফ্রান্‌জ্‌ শুবার্টের কাছে সে খাতা পাঠিয়ে দেন ভুল করে৷ সেই শুবার্ট তৎক্ষণাৎ সে খাতা ব্রেইটকফকে ফেরত পাঠিয়েছিলেন৷ সঙ্গে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য— এ রকম জঘন্য সঙ্গীত রচনা আমার পক্ষে সম্ভব নয়! কী আশ্চর্য কালের কষ্টিপাথর! সেই ‘জঘন্য’ সঙ্গীত, সেই ট্রাউট কুইন্টেট (আমার সব থেকে প্রিয়), চেলো কুইন্টেট, পিয়ানো সোনাটা, স্ট্রিং কোর্টেট আজ দেশ বিদেশের তাবড় অপেরা হাউস মাতিয়ে রাখে৷

এই জাদু একদিন চিনে ফেলেছিলেন বিঠোফেন৷ কিন্তু, অনেক দেরিতে৷ আসলে ২৭ বছরের বড় এই জীবন্ত কিংবদন্তির সঙ্গে ভয়ে কোনও দিন দেখাই করেননি শুবার্ট৷ বন্ধুরা ঠেলেঠুলে একবার পাঠিয়েছিল৷ বাড়ির দরজায় ঠকঠক করতেই চাকর জানিয়ে দিল— ‘মাস্টার’ বাড়ি নেই৷ সেই যে পালালেন শুবার্ট আর সে মুখো হননি৷

কী করা যায়? অনেক ভেবে বন্ধুরা নিজেদের পয়সাতেই ছাপালেন কয়েকটি স্বরলিপি৷ বিঠোফেনের বন্ধু ফেলিক্স শিন্ডলার-এর কাছে তা পাঠিয়ে দেওয়া হল৷ সৌভাগ্যের কথা, তিনি সেগুলি দেখিয়েছিলেন বিঠোফেনকে৷ আর তখনই খবর এল সুরের গুরু মৃত্যুশয্যায়৷ শোনা যায়, শিন্ডলারকে নাকি বিঠোফেন বলেছিলেন একটি মাত্র বাক্য— সত্যিই শুবার্টের মধ্যে দৈব আগুন আছে৷ বিঠোফেন মারা গেলেন কিছুদিন পরেই৷ আর তার এক বছর পরে, ১৮২৮ সালের ১৯ নভেম্বর মারা গেলেন শুবার্ট৷ শেষ ইচ্ছা মতো তাঁকে শুইয়ে দেওয়া হল বিঠোফেনের পাশে৷

শুবার্ট গাসসে থেকে ঘুরে নুসডোর্ফার স্ট্রাসসেতে পড়েই ৫৪ নং বাড়ি দেখে চমকে উঠেছিলাম৷ গরিব ইস্কুল মাস্টারের এমন বড়সড় বাড়ি৷ ভুল ভাঙল ঢুকেই৷ ১৬টি পরিবার থাকত ওই বাড়িতে৷ শুবার্ট পরিবারের জন্য বরাদ্দ ছিল একটি ঘর৷ যদিও আজ তিনটি কামরা নিয়ে তৈরি হয়েছে শুবার্ট মিউজিয়াম৷ খুব একটা বেশি কিছু নেই৷ এ বাড়িতেই শুবার্টের জন্ম৷ এই বারান্দাগুলোতেই খেলে বেড়াত এটা ভাবতেই শরীরে একটা শিহরণ খেলে গেল৷ আর দেখলাম তার কাচ ফাটা গোলগোল চশমাটা৷ আর আছে একটা পিয়ানো৷ ভালো করে লক্ষ করে দেখি— তার ওপর লেখা আছে, তাঁর নয় পিয়ানোটি তাঁর দাদা ইগনাৎজ-এর৷ পিয়ানো কেনার পয়সা শুবার্টের কোনও দিনই হয়নি৷

আর পিয়ানোর পিছনে একটি মেয়ের ছবি৷ থেরিজ গ্রোব৷ ১৭ বছর বয়সে শুবার্ট তৈরি করেছিলেন তাঁর প্রথম ‘মাস্’৷ লিশটেন্থাল গির্জায় পরিবেশিত হয়েছিল সেই মাস্৷ সোপ্রানো কণ্ঠে ছিলেন থেরিজ৷ শুবার্টের প্রথম প্রেমিকা৷ বিয়ে হয়নি৷ কেন? তা প্রিয় বন্ধু হুটেনব্রেনারকে শুবার্ট জানিয়েছিলেন এই ভাষায়— ‘ভালোবেসেছিলাম ওকে৷ সেও বেসেছিল৷ অপেক্ষা করেছিল তিন বছর, যদি বিয়ে করতে পারি৷ পারিনি৷ এমন একটা চাকরি জোটাতে পারিনি যাতে দু’জনের সংসার চলতে পারে৷’ পরে খবর পেয়েছিলেন, এক পাঁউরুটি কারখানার মালিককে বিয়ে করে নিয়েছে থেরিজ৷

আর বেশিক্ষণ থাকতে ইচ্ছে করল না সে বাড়িতে৷ এবার? এবার সত্যিই ঝেড়ে ফেলতে চাইছিলাম সব মনখারাপ৷ দুজনেই৷ দুজনেই এক সঙ্গে বলে উঠলাম— এবার শোনব্রুন প্রাসাদ৷ ভিয়েনার দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজারাজড়াদের এলাহি কাণ্ড-কারখানার এক অলীক প্রতীক৷

ফের সেই পেল্লায় ম্যাপ বার করল মায়া৷

আমি প্রমাদ গুণলাম— ‘একটা ট্রাম নিলে হয় না?’

‘কেন, তুমি হাঁটতে ভালোবাসো না?’

মনে হল বলেই ফেলি, ‘ক্রমাগত তুর্কমেনিস্তান থেকে অস্ট্রিয়া হাঁটাহাঁটি করা কি চাট্টিখানি কথা!’ বললাম, ‘না-না৷ তবে হাঁটতে হাঁটতে ঠিক আড্ডা দেওয়া যায় না৷’ ট্রামে চড়ে পাশাপাশি বসে মায়া আশকাবাদে ফিরে গেল, আমি রইলাম ভিয়েনায়৷ কিংবা তার উল্টোটা৷ বুঝলাম স্বাভাবিকভাবে পরিশ্রমী তুর্কমেনরা বসার অবসর আজম্ম বসে থাকা বাঙালির মতো বকবক করে নষ্ট করে না৷

বিস্তীর্ণ সবুজের গায়ে সোনালি আর সাদার এমব্রয়ডারি শোনব্রুন প্রাসাদ৷ অদ্ভুত মায়াবী দুনিয়া৷ ‘গ্র্যান্ড টুর’-এর টিকিটের সঙ্গে পাওয়া অডিও গাইডের টেপরেকর্ডার আর হেডফোন নিয়ে প্রাসাদে ঢুকলাম জার্মান টানে ভারী নারীকণ্ঠের ইংরেজি অভ্যর্থনার ফটক দিয়ে৷

প্রাসাদের ১৪৪টি কামরার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ৪০টির মধ্যে দিয়ে নিয়ে যেতে যেতে তিনি শোনালেন ইতিহাস৷ বারোক স্থাপত্য আর চিত্রকলার এক অনন্য উদাহরণ এ প্রাসাদ-চত্বরে ফুলবাগান, ফোয়ারা, ঝর্না, আন্দোলিত মাঠ, বাড়িঘর সব মিলেমিশে একাকার৷ জরির কাজের মতো৷ চতুর্দশ শতকে এই শোনব্রুন এস্টেটের নাম ছিল ক্যাটারবুর্গ৷ এখানে তখন ছিল বিস্তীর্ণ আঙুর ক্ষেত আর একটি মধ্যযুগীয় জলকল৷ হ্যাব্‌স্‌বুর্গ সম্রাট দ্বিতীয় ম্যাক্সিমিলিয়ন এখানে একটি মৃগয়াকুঞ্জ তৈরি করেন৷ কেবল স্থানীয় পাখিই নয়, সারা দুনিয়া থেকে ময়ূর, হরেক রকমের বন-মোরোগ ও অন্যান্য পাখ-পাখালি এনে ছেড়ে দেওয়া হয় এই সযত্নে গড়ে তোলা অরণ্যে৷ শোনা যায়, ১৬২২ সাধারণাব্দে সাঙ্গোপাঙ্গ, সখী-সহচরদের নিয়ে শিকার খেলার সময় সম্রাট মাঠিয়াস এখানে একটি ফোয়ার আবিষ্কার করেন৷ তিনি তার নাম দেন অপূর্ব ফোয়ারা— Schoner Brunnen! ন্যুরেমবুর্গ শহরে ঠিক এই নামেরই আরও প্রাচীন একটি সত্যিই অপূর্ব ফোয়ারা রয়েছে, তার নামেই এ নাম রাখা হয়েছিল কি না, তা অবিশ্যি আমি জানি না৷ সেই থেকেই এস্টেটটির নাম হয় ‘শোনব্রুন’৷

সম্রাট দ্বিতীয় ফার্ডিন্যান্ড এবং তাঁর স্ত্রী ইলিওনারা গনজাগা মৃগয়ার ছুতোয় অনেক রঙিন সময় কাটিয়েছেন এই কুঞ্জের মনোরম আড়ালে আবডালে৷ ১৬৩৭-এ সম্রাটের মৃত্যুর পর, ইলিওনারা শেষ বছরগুলি কাটিয়েছিলেন এই কুঞ্জেরই নিভৃত দূরত্বে৷ ভালোবাসার সে সব দিনগুলির গভীর স্মৃতিতে ইলিওনারা এখানে একটি অপরূপ ‘শাতো দ্য প্লেইসঁস’ তৈরি করেন৷ সেটা ১৬৪২৷ সেই প্রথম তার নাম সরকারিভাবে হয় শোনব্রুন৷ তবে সে শাতো আর নেই৷

১৬৮৩-তে এই শাতো-র মখমল হাসি-গান ছাপিয়ে গেল ধেয়ে আসা ঘোড়ার খুরের শব্দ আর যোদ্ধাদের হুঙ্কারে৷ ভিয়েনা অবরুদ্ধ হল তুরস্ক সেনার হাতে৷ এর তিন বছর পর, ১৬৮৬-তে সম্রাট প্রথম লিওপোল্ড ঠিক করলেন এই বিধ্বস্ত কুঞ্জেই তৈরি হবে বিরাট প্রাসাদ, বাগান, অরণ্য৷ আর তা তিনি উপহার দেবেন পুত্র জোসেফকে৷ যেমন কথা তেমনি কাজ৷ হুকুম হল— বোলাও কোনো নামজাদা স্থপতি৷ রোম থেকে এলেন ইয়োহান বের্নহার্ড ফিশার ফন এরলাক৷ দুবছর রাতের পর রাত ল্যাম্পের তেল পুড়িয়ে, মাথা চুলকে ইয়োহান সম্রাটকে দিলেন ব্লু প্রিন্ট৷ শুরু হয়ে গেল শোনব্রুন প্রকল্প৷ সে সত্যিই এক এলাহি কারবার৷

এরপর বিভিন্ন সম্রাট-সম্রাজ্ঞী নব নব সাজে সাজিয়েছেন শোনব্রুনকে৷ কিন্তু তার ছটা ইউরোপময় ছড়িয়ে পড়ল ১৭৪০-এ ভিয়েনার রাজতন্ত্রের অনন্যা নারী মারিয়া থেরিজা সিংহাসনে বসার পর৷ হ্যাব্‌স্‌বুর্গ বংশের শেষ দিন পর্যন্ত শোনব্রুন ছিল তাঁদের নয়নের মণি৷ ১৯০৪-এ তৈরি হয় তার শেষ সংযোজন— সারা দুনিয়া থেকে আনা লতা-গুল্ম-উদ্ভিদের বাগান ‘সান ডায়াল হাউস’৷

গ্র্যান্ড টুর-এর শেষে প্রাসাদের প্রাচুর্যের নগ্নতা থেকে বেরিয়ে, একটাও কথা না বলে বিশেষ গোলাপ বাগানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম দিগন্ত অবধি পাতা সবুজ গালিচার উপর দিয়ে৷ পথে পড়ল বিশাল নেপচুন ফোয়ারা৷ মারিয়া থেরিজা-র নির্দেশে চার বছর ধরে তৈরি হয়েছিল সে ফোয়ারা৷ ফোয়ারার কোলে একটা ছোটখাটো জলাশয়৷ তার মধ্যে জল ভেঙে ওঠা পাহাড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন সাগর দেব নেপচুন৷ হাতে ত্রিশূল৷ তাঁর বাঁ পাশে এক ঊর্বশী৷ ডাইনে দেবী থেটিস৷ পায়ের কাছে অর্ধেক মাছ, অর্ধেক পুরুষ ট্রাইটানের দল৷ যাদের দুন্দুভির শব্দ সমস্ত প্রাণীজগতের রক্ত জল করে দেয়৷

কিন্তু আজ তাদের তোয়াক্কা না করে সেই জলাশয়ে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক দল হাঁস৷ আশ্চর্য আন্তর্জাতিক তাদের ছন্দ৷ যেন বাংলার গ্রাম! মনে পড়ে গেল আমার প্রিয় কবি উৎপল বসুর সেই অসাধারণ কবিতা—

যিশুর বাড়ির হাঁস অনাদরে বেড়ে উঠেছিল,
আমার সঙ্গে তারা মুস্তফী দীঘির জলে কেটেছে সাঁতার
স্বৈরতন্ত্র থেকে তারা রাজতন্ত্রে, অরাজকতায়
অবলীলাক্রমে নানা ঢেউ তুলে, অকাতরে করে পারাপার…

মায়া সেই জলে টস্ করার মতো করে একটা কয়েন ছুড়ে দিল৷ পয়সাটা সাঁ করে উপরে উঠে, নীচে নেমে, জলতলে আছড়ে পড়েই যেন মত বদলিয়ে স্পিড কমিয়ে হেলতে দুলতে তলিয়ে গেল৷ সেই ডুবে যাওয়া অনেকক্ষণ মন দিয়ে দেখে মায়া জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি জানো, তুর্কমেন ভাষায় ‘মায়া’ কথাটার কী মানে?’

‘কী মানে?’
‘উটের ক্যারাভান যখন ভীষণ বিপদ মাথায় নিয়ে পাড়ি দেয় মরু, তাদের পথ দেখায় এক পবিত্র নারী উট৷ আমরা তাকেই বলি ‘মায়া’৷’

ব্যাপারটার মধ্যে মেয়েদের চুলের গন্ধের মতো একটা রোমান্টিক গন্ধ থাকলেও মায়াকে কিছুতেই উট বলে কল্পনা করতে পারছিলাম না৷ যতবার চেষ্টা করলাম কেবলই মনে হল, এখনই ভেসে আসবে হাল্লার সেনাপতির চিৎকার— উ-উ-উট, উঠো-ও-ও-ও৷ সামনে তখনও ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠে যাওয়া পান্না-প্রান্তর৷ তার চূড়োয় সোনালি-তুষার-সাদা ‘গ্লোরিয়েট’৷

তার সামনে আরও একটি পুকুর৷ পুকুরে হাঁসেদের সেই অলস সাঁতার৷ আর তার পাড়ে পায়রাদের বাচাল বক-বকম৷ সামনে দিগন্ত অবধি পড়ন্ত বেলার রোদে নিজের দেহের বিছানার গাঢ় আরামে এলিয়ে রয়েছে সমগ্র শোনব্রুন প্রাসাদ, মাঠ, বাগান৷ তারও ওপারে অতিকায় ডায়নোসর ক্রেনগুলোর গলার নীচে ইতি উতি জ্বলে উঠছে নতুন ভিয়েনার আলো৷ তারও ওপাশে ঝাপসা নীল আল্পস-এর সারি৷ পুকুরের পাড়ে পা ছড়িয়ে বসে অনেকক্ষণ সে দৃশ্য দেখার পর না-খাওয়া বাদাম ভাজার না-থাকা খোসা হাত থেকে ঝেড়ে ফেলার মতো মনখারপের ভাবটা ঝেড়ে ফেলে উঠে পড়ে লক্ষ্যহীন ভারতীয়, তুর্কমেন মায়ার তাড়ায় ছুটল মার্কিন জাদুকরের কাছে বোকা বনতে৷ ভিয়েনার সন্ধ্যায়৷

সেই যে সকালে আমরা টিকিট কেটেই রেখেছিলাম— বিশ্বের সেরা জাদুকরের শো৷ তাঁর পোশাকি নাম আবার ডেভিড কপারফিল্ড!

এ দেশে কোনও দিনই তাঁর আশ্চর্য কাণ্ডকারখানা দেখা যাবে বলে মনে হয় না৷ বিনোদনের দুনিয়ায় তিনি অনায়াসেই টক্কর নিতে পারেন মাইকেল জ্যাকসন বা ম্যাডোনার সঙ্গে৷ ভিয়েনায় গিয়ে তাঁরই পাল্লায় পড়ে যে এমন ফাইভ স্টার বোকা বনতে হবে এটা কল্পনাও করিনি৷ ম্যাজিক৷ সে অভিজ্ঞতা যার না হয়েছে তার পক্ষে কল্পনা করা সত্যিই অসম্ভব৷ আর তা শুরু হয়ে যায় মায়াবী শোনব্রুন প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আমার তুর্কমেন সহকর্মী মায়ার সঙ্গে সেই ভয়ঙ্কর খটমট নামের স্টেডিয়ামের পথে হাঁটতে হাঁটতে!

ডেভিড কপারফিল্ড৷ এ নামটা শুনলে বিখ্যত ভিক্টোরিয়ান উপন্যাসের সেই বড় দুখী ছেলেটির কথা ছাড়া আর কিছুই বিশেষ মনে পড়ে না আমার৷ কাজেই পালা রদবদল হয়৷ সকাল থেকে আমিই বকবক করেছি৷ এবার মায়ার পালা৷

ডেভিড কপারফিল্ড, মায়া দাবি করে, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাদুকর৷ ম্যাজিশিয়ান৷ না শুধু মায়াই নয়৷ ওপরা উইনফ্রে, যিনি কৃষ্ণাঙ্গিনী মার্কিন বিনোদনের দুনিয়াটাকে প্রায় নিয়ন্ত্রণ করেন বললেই চলে, সেই ওপরারও তাই মত৷ দ্য নিউ ইয়র্ক টাইম্‌স্-এরও৷ দ্য গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড্‌স-এরও৷ এমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন ২১টি৷ জাদুকরদের মধ্যে একমাত্র তিনিই হলিউড হল অফ ফেম-এর স্টার পেয়েছেন৷ বিশ্বের বৃহত্তম গ্রন্থাগার ‘লাইব্রেরি অফ কংগ্রেস’ ২০০৮ সালে তাঁকে ‘লিভিং লিজেন্ড’ বলে ঘোষণা করে৷ তিনিই বিশ্বের একমাত্র জাদুকর যাঁর নামে ছটি দেশ ডাকটিকিট বের করেছে৷ তাঁর শোয়ের টিকিট বিক্রির মোট মূল্য ৪০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে (মাইকেল জ্যাকসন বা ম্যাডোনা-র স্থান এ তালিকায় তাঁর পরে!)৷ তিনি ১১টি দ্বীপের মালিক৷ এবং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যাজিক মিউজিয়াম— জাদু জাদুঘরের (!) প্রতিষ্ঠাতা৷ মায়া নির্ঘাৎ আরও বেশ কিছুক্ষণ চালিয়ে যেত, যদি না আমি তাকে মাঝ পথে আটকে বলতাম, ‘বুঝেছি, বুঝেছি৷ খুব পপুলার৷ চলো দেখা যাক তার দৌড়৷’

‘শুধু পপুলারই নয়, নীলাঞ্জন, ডেভিড কপারফিল্ড ম্যাজিক নামক এক আশ্চর্য শিল্পের, যে শিল্পটাকে আমি ঠিক বুঝি না তোমাদের ইন্টেলেকচুয়াল প্রিটেনশনস-এ এত উপেক্ষা করা হয় কেন, সেই শিল্পের দুনিয়ায় একটা স্তম্ভ৷ হুডিনির মতো কিংবদন্তি শিল্পীর সঙ্গেই যাঁর নাম উচ্চারিত হয়৷’ মায়া চটেছে৷ জাদু ব্যাপারটাকে হেলাফেলা করলে যে মায়া নামের মেয়ে চটবে তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে! কিন্তু সত্যিই আমি মোটেই হেলাফেলা করিনি৷

করতেই পারি না৷ পারি না কারণ সত্যজিৎ রায়৷ আমার ভ্রাতৃস্থানীয় সহকর্মীরা রসিকতা করে বলে, ‘নীলাঞ্জনদা আসলে Rayist!’ আর যে কোনও ‘রেয়িস্ট’-ই জানবেন ম্যাজিক ব্যাপারটার প্রতি সত্যজিতের কী আশ্চর্য দুর্বলতা ছিল৷ তাঁর ছোট্ট আত্মকথা ‘যখন ছোটো ছিলাম’-এ আছে একেবারে ঘরোয়া পরিবেশে এবং স্টেজে এমন ম্যাজিক দেখার অভিজ্ঞতার কথা যা তিনি সারা জীবনেও ব্যাখ্যা করে উঠতে পারেননি৷ তাঁর শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পগুলির একাধিক ম্যাজিক নিয়ে৷ তাঁর সৃষ্ট দুই অমর চরিত্র ফেলুদা এবং শঙ্কু, দু’জনেই ম্যাজিকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল৷ কাজেই সেই কৈশোরে সত্যজিৎ হাতে তুলে নেওয়ার দিনটি থেকে ও বিষয়টায় আমার একটা দীর্ঘমেয়াদি আগ্রহ আছে৷

আর সেটা আছে বলেই আমি জানি, ভারতীয় হওয়ায় আমি সেই ঐতিহ্য আমার রক্তে বয়ে বেড়াচ্ছি যার সঙ্গে হাজার হাজার বছর ধরে ‘জাদু’ ব্যাপারটা জড়িয়ে আছে৷ তা অস্বীকার করা মূর্খামি৷ আশ্চর্যের বিষয় হল একটু খোঁজখবর করলেই দেখা যাবে, দুনিয়া জুড়ে জাদুর ইতিহাস নিয়ে যে বিপুল গবেষণা হয়েছে তার প্রায় পুরোটাই পশ্চিমি গবেষকদের করা৷ সৌভাগ্যের কথা তাঁরা কেউই অস্বীকার করেন না যে ‘ম্যাজিক’ ব্যাপারটা সভ্যতাকে একেবারেই প্রাচ্যের দান৷ আসলে ম্যাজিক শব্দটাই এসেছে প্রাচ্য থেকে৷ ২০০০ বছর আগের রোমান প্রকৃতিবিদ প্লিনি আমাদের জানাচ্ছেন, ২৫০০ বছর আগে, ৪৮০ পূর্ব-সাধারণাব্দে ইরানের জরথুষ্ট্রীয় ধর্মাবলম্বী সম্রাট খাশেয়ারশাহ্ যখন গ্রিসের ওপর হামলা করেছিলেন তখন তাঁর সঙ্গে ছিল ওস্থানেস (এটা রোমান উচ্চারণ অবশ্য) নামের এক জাদুকর৷ প্রাচীন ফারসিতে যাঁদের বলা হত ‘মাকুশ’৷ সেই থেকেই গ্রিকদের জাদুতে আগ্রহ৷ আর এই ‘মাকুশ’ শব্দটাই গ্রিকদের হাতে পড়ে হল ‘মাগোস’, তার থেকে ‘মাজিয়া’ তার পরে ‘ম্যাজিক’৷

এখানে অবিশ্যি বিনোদন হিসেবে ম্যাজিক আর নানা ধর্মীয় উপাচার-লোকাচারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ‘ম্যাজিক’ (যার বাংলা কী হতে পারে আমার ঠিক মাথায় আসেনি৷ হিন্দিতে বোধহয় যাকে বলে জাদু-টোনা), এ দুটোকে আলাদা করতে হবে৷ সমস্যা হল একেবারে আধুনিক যুগ অবধি প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য দু জায়গাতেই দুটো এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল যে সাধারণের পক্ষে প্রায়শই তা ভয়ঙ্কর একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত৷ তার কারণ, অনেকেই এই ম্যাজিক-এর জোরে লোক ঠকাত৷ আর সে ভয়কে কাজে লাগিয়েই নানা আর্থিক-সামাজিক-ধর্মীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতে কী প্রাচ্য কী পাশ্চাত্য দু’জায়গাতেই শুরু হয়েছিল ডাইনি হত্যা, ‘উইচ হান্টিং’৷ ইউরোপে সে ছিল এক ভয়াবহ সময়৷ কেউ যদি এমন একটাও কথা কয়েছে যার সঙ্গে চার্চের মতের গরমিল, ব্যস তাকে খুঁটিতে বেঁধে জীবন্ত জ্বালিয়ে দাও৷ কিন্তু শুধু খ্রিশ্চান ধর্মেই নয়, বা ইউরোপেই নয়, ওয়েন ডেভিজ-এর বই ‘ম্যাজিক’ (অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস) পড়লে দেখা যাবে শত শত বছর ধরে, এই সে দিন পর্যন্ত, যে যাকে পেরেছে ম্যাজিক করার ‘অপরাধে’ বদনাম দেওয়া থেকে হত্যা পর্যন্ত করেছে— রোমানরা খ্রিশ্চানদের বলত ব্যাটারা ম্যাজিক করে, খ্রিশ্চানরা ইহুদিদের আর মুসলমানদের, মুসলমানদের মধ্যে গোঁড়া (যেমন ওয়াহাবি-রা) আর প্রগতিশীল (যেমন তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক) দুপক্ষই সুফিদের, আমাদের ভারতে দয়ানন্দ সরস্বতী ব্রাহ্মণদের৷ আর পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গ্রামান্তরে জাদু করার বদনাম দিয়ে ডাইনি হত্যার কী ভয়ঙ্কর কাণ্ড চলে তা নিয়ে এক অনবদ্য হাড় হিম করা ধারাবাহিক রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল আমার বন্ধু সুমিত চৌধুরী এই বছর কুড়ি আগে৷ অথচ, জানাচ্ছেন ডেভিজ, ১৮৯০ থেকে ১৯১৫ অবধি, পঁচিশ বছর ধরে লেখা ১৩ খণ্ডের ক্ল্যাসিক ‘The Golden Bough’ বইতে কেমব্রিজের নৃতত্ত্ববিদ জেম্‌স্‌ ফ্রেজার দেখিয়েছেন বিশ্বের সর্বত্র সভ্যতার অগ্রগতির তিনটি স্তর ম্যাজিক, ধর্ম এবং বিজ্ঞান৷

গভীর আশ্চর্যের বিষয়, হাজার হাজার বছর ধরে এত ভয়ঙ্কর দমন সত্ত্বেও শিল্প হিসেবে ম্যাজিক বেঁচে গিয়েছে৷ শুধু বেঁচে গিয়েছেই নয় ধীরে ধীরে তা এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যার তুলনা আর কোনও শিল্পের সঙ্গে হতে পারে না৷ আধুনিক ম্যাজিকে কী নেই? আধুনিকতম প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, অঙ্ক, আলোর খেলা (থিয়েটারে যা একটি বিশেষ আলাদা শিল্প বলেই ধরা হয়), অভিনয় (প্রত্যেক জাদুকর এক একজন প্রথম সারির অভিনেতা), স্টেজ সজ্জা, সাঙ্ঘাতিক শারীরিক ক্ষমতা এবং যা সব কিছুর মূলে, অকল্পনীয় অধ্যবসায় আর একাগ্রতা৷ এর কোনওটির একচুল এদিক ওদিক হলে মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রবল৷ সত্যি বলতে কী, কঠিন খেলা দেখাতে গিয়ে জাদুকরের মৃত্যু কোনও নতুন ঘটনা নয়৷ আর যেটা সবথেকে বেশি আমার মন জাত-জাদুকরের প্রতি শ্রদ্ধায় ভরে তোলে, যেমনটা মহাজাতি সদনে আমাদের সেরা জাদুশিল্পী পি সি সরকার (জুনিয়ার)-কে বার বার বলতে শুনেছি— তা কোনও মন্ত্র-তন্ত্র, অলৌকিক ব্যাপার স্যাপার নয়— আমি আপনাদের বোকা বানাব স্রেফ বিজ্ঞান আর কঠোরতম অধ্যবসায়ে রপ্ত করা ক্ষমতায়৷

আর বিনোদনের জন্য এই যে আশ্চর্য শিল্প, যাকে আজ আমরা ‘ম্যাজিক শো’ বলি, এর ইতিহাস নিয়ে অনেক বইয়ের মধ্যে রয়েছে একটি অনবদ্য বই৷ সুদূর ১৮৯৫ সালে প্রকাশিত— The History of Magic and Magicians৷ লেখক H J Burlingame৷ সে বই শুরুই হয়েছে ভারতীয় ‘জাগলার’-দের লোম খাড়া করা দুটি ম্যাজিকের বর্ণনা দিয়ে৷ একটি পারস্য সম্রাটের দরবারে৷ অন্যটি এক্কেবারে রাস্তায়৷ তার পর সে বইতে রয়েছে ডাকসাইটে নানা ইউরোপীয় ম্যাজিশিয়ানের কাণ্ডকারখানা৷

এই সব আলোচনা করতে করতেই সেই ভয়ঙ্কর নামের স্টেডিয়ামে গিয়ে পৌঁছলাম— স্টাড্‌থ্‌হাল, হালেনকোমপ্লেক্স ভোগেলওয়েইডপ্লাৎজ্! আর পৌঁছেই আমি বুঝতে পারলাম মায়া কী সাঙ্ঘাতিক বুদ্ধিমত্তায় একটা জরুরি কাজ সকালেই সেরে রেখেছিল৷ লোকে লোকারণ্য৷ লম্বা লাইন দিয়ে স্টেডিয়ামের ভিতরে ঢুকেও দেখি থিক থিক করছে দর্শক৷ শো শুরু হতে বেশ দেরি, একটাও সিট খালি নেই৷ আমাদের এক একটি টিকিটের দাম ৬০ ইউরো! মানে, আজকের হিসেবে অন্তত ৫৫০০ টাকা! এমনকী ইউরোর হিসেবেও ৬০ ইউরো ভীষণ খরচসাপেক্ষ৷ ভেবেছিলাম নির্ঘাৎ একেবারে সামনের দিকে সিট পড়বে৷ পড়ল মাঝামাঝি৷ সত্যি বলতে কী বেশ বিরক্তই হয়েছিলাম৷ চারপাশে বিরাট বড় বড় স্ক্রিন ছিল অবশ্য৷ বুঝলাম দেখতে অসুবিধা হবে না৷ কিন্তু তবু এ সব শোয়ে স্টেজের কাছাকাছি থাকার মজাই আলাদা৷ আর সে কথা ভাবতে ভাবতেই প্রথম লক্ষ করলাম এ স্টেজ কিন্তু প্রসেনিয়াম স্টেজ নয়৷ এ স্টেজ ৩৬০ ডিগ্রি খোলা৷ থিয়েটারের ভাষায় যাকে বলা হবে ‘থিয়েটার ইন দ্য রাউন্ড’৷ গোল উঁচু মঞ্চ৷ নাটক মঞ্চস্থ করার হাল হকিকত যাঁরা খবর রাখেন তাঁরা জানেন এ স্টেজে আলোক সজ্জা কত কঠিন (যাতে এক পাশের আলোয় অন্য পাশের দর্শকের চোখ ঝলসে না যায়), এ স্টেজে মঞ্চসজ্জা কত কঠিন (যাতে কারও দৃষ্টি আটকে না যায়, পরে লক্ষ করেছিলাম যে প্রপগুলি ব্যবহার করা হচ্ছে তার অধিকাংশই স্বচ্ছ) এবং এ স্টেজে কুশীলবদের সাবলীলভাবে ঘোরাফেরা করা কত কঠিন (যাতে কিছুতেই কারও মনে না হয় যে, কেবলই আমি পশ্চাদ্দেশ দেখছি, তাদের সারাক্ষণ ঘুরে বেড়াতে হয়)৷

মায়া কোত্থেকে পপ-কর্নের বিপুল দুটো ফানেল-ঠোঙা নিয়ে হাজির হল৷ এতই বড় যে, পাশাপাশি ধরে আনার সময় তার শরীরের উপরিভাগ দেখাই যাচ্ছিল না৷ আর সেই ঠোঙাই হয়ে উঠল মানদণ্ড৷ আমি লক্ষ করেছি দুধরনের দর্শক হয়৷ একদল নাটক বা ফিল্ম বা ম্যাজিক বা সার্কাস সাঙ্ঘাতিক রোমহর্ষক হলে খেতে ভুলে যায়৷ খাবার হাতে ধরাই থাকে৷ আর এক দলের, যার মধ্যে আমিও পড়ি, যত উত্তেজনা বাড়ে ততই স্পিডে মুখ চলতে থাকে৷ আমার মনে আছে বিপুল বাজনা, হাততালি, শিস, হৈ চৈয়ের মধ্যে কপারফিল্ড সাহেবের স্টেজে আবির্ভাব হওয়ার দশ মিনিটের মধ্যে আমি ওই পেল্লায় ঠোঙা সাবাড় করে দিয়েছিলাম৷ শো বোধ হয় ছিল দুঘণ্টার! ওঃ! সে এক অভিজ্ঞতা বটে৷

যতদূর মনে পড়ে খেলা যে-সব দেখেছিলাম তার অনেকগুলিই এখানেও দেখেছি৷ কিন্তু পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে শোম্যানশিপ৷ তবে একটা খেলার কথা একটু বলি৷ চোখ বন্ধ করে বল ছুড়ে দিয়ে এক মহিলা দর্শককে আনতাবড়িভাবে ডাকা হল৷ মনে আছে আসলে প্রথমে বলটা ধরেছিল যে, সে পুরুষ৷ তাকে আবার চোখ বুজে যে দিকে খুশি বলটা ছুড়তে বলা হল৷ দ্বিতীয়বার লুফলেন এক মহিলা৷ তাকে ডাকা হল স্টেজে৷

এবার কপারফিল্ড সাহেব, আহ্বান জানালেন— দর্শকদের মধ্যে যে কোনও রেডিওলজিস্ট, গাইনেকোলজিস্ট বা এমনকী অন্যান্য ডাক্তার থাকলে স্টেজে চলে আসুন৷ ঠিক কজন গিয়েছিলেন মনে নেই, কিন্তু ডজন খানেক তো বটেই৷ এবার আনা হল একটা ইউএসজি মেশিন৷ তাতে সেই মহিলাকে পরীক্ষা করে দেখা গেল মহিলা সন্তানসম্ভবা নন৷ ডাক্তারদের বলা হল ইউএসজি যন্ত্রটি ভালো করে পরীক্ষা করে দেখতে৷ এমনকী ইচ্ছে হলে নিজের ওপরেও৷ সবাই বললেন যন্ত্র ঠিকঠাক৷ এবার কপারফিল্ড জানালেন— তোমায় আমি সন্তান দিলাম (আমি তো চমকে উঠলাম, সর্বনাশ, এ তো রামায়ণের বশিষ্ঠ মুনির কথা বলছে!)৷ সংক্ষেপে, ফের তার ওপর ইউএসজি পরীক্ষা চালাতেই দেখা গেল তিনি বেশ কয়েক মাসের গর্ভবতী হয়ে উঠেছেন! ডাক্তারদের ফের বলা হল যন্ত্র পরীক্ষা করে দেখতে, তাতে কোনও কারসাজি আছে কি না৷ তাঁরা ফের বললেন সব ঠিক আছে৷ (তবে মনে আছে মহিলাটিকে দৈহিকভাবে পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়নি৷ যদিও ডাক্তাররা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন৷)৷ সে কী হাততালি৷ পরে অবশ্য জাদুকর মহিলাকে ফের যেমনটি ছিলেন তেমনটি করেই ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন৷

আর এই রুদ্ধশ্বাস সন্ধ্যা যে-জাদু দিয়ে শেষ হল, খুব সংক্ষেপে তা এরকম— এক দর্শককে সঙ্গে নিয়ে মঞ্চ থেকে কপারফিল্ড একটা দ্বীপের বালুকাবেলায় চলে গেলেন (কোন দ্বীপ ছিল আজ মনে নেই৷)৷ তারপর ফিরে এসে যখন আমাদের গায়ে ছিটিয়ে দিলেন সেই সমুদ্র তটের বালি, ততক্ষণে সত্যিই মাথা ঝিমঝিম করছে!

ভালো কথা ডেভিড কপারফিল্ড কিন্তু নিজেকে ম্যাজিশিয়ান বলেন না৷ বলেন— ইলিউশনিস্ট৷ সবই মায়ার খেলা!

 

(চলবে)

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1858 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...