অসঙ্গতির সঙ্গত — ৬ষ্ঠ পর্ব

হিন্দোল ভট্টাচার্য

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

যে লেখা যে কোনও সময়ে শেষ হয়ে যেতে পারে, সে লেখাই মনে হয় লিখে যেতে ভালো লাগে। কারণ লেখাটির শুরু বা শেষের জন্য এমনকী কোথাও লেখাটিকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কোনওরকম বাধ্যবাধকতা থাকে না। বাধ্যবাধকতাহীন যে শিল্প, তা-ই মনে হয় শিল্পের অন্তরাত্মাকে ধারণ করে থাকে। কিন্তু সমস্যা হল মানুষের সভ্যতা যত এগোল, মানুষ তত শিল্পকে খাতা লেখার মতো করে ভাবতে শুরু করল। তা না হলে কখনও হয়ত কোনও লেখা শেষ-ই হওয়ার কথা নয়। হয়তো খাতা লেখার অলঙ্কারে অনেকে ক্ষুব্ধ হবেন। কিন্তু ভালো করে ভেবে দেখলে মনে হয় হুইটম্যান-ই একমাত্র সঠিক কাজটি করেছেন। কারণ পৃথিবীতে একজন লেখক আসলে একটিই বইই লিখে যান। হয়তো সেই বইয়ের মধ্যে বিভিন্ন যাত্রাপথ থাকতে পারে। যেমন একটি জার্নির মধ্যে থাকে অসংখ্য জার্নি। কিন্তু আমাদের এই বিভিন্ন অভিযাত্রাগুলিকে আমরা ছোট ছোট করে আলাদা আলাদা বিশ্ব হিসেবে ভাবতে থাকি আমাদের নিজেদের সুবিধার-ই জন্য। কারণ একটা জায়গায় গিয়ে হয়তো আমি থাকলাম পাঁচ বছর। সেই জায়গাটাই হয়ে উঠল আমার বাড়িঘর, সেখানেই বাজার দোকান, সেখানেই সুখ-দুঃখ, প্রেম, সংসার, এমনকী বিচ্ছেদ পর্যন্ত হল। তার পর যখন মন যাই যাই বলল, তখন হয়ত সব ছেড়ে আবার চলতে শুরু করলাম। আবার হয়তো অন্য কোথাও, অন্য কোনওখানে পেতে বসলাম আমার সংসার। কিন্তু এ সবকিছুই কি আলাদা অভিযাত্রা হল? না কি আমরা একটা গ্র্যান্ড অভিযাত্রার মধ্যে আছি?

জীবনের প্রতি এই যে চরম মোহ আমাদের, তা থেকেই হয়তো জীবনের এই খণ্ড খণ্ড অভিযাত্রাগুলিকে পূর্ণাঙ্গ অভিযাত্রা হিসেবে ভাবতে ভালোবাসি আমরা। সেভাবে দেখতে গেলে এগুলি হয়তো খুব একটা অসঙ্গতিও নয়। বরং বলা ভালো স্বাভাবিকতা। কিন্তু স্বাভাবিকতা তো আসলে অসঙ্গতিই। না হলে আমার অভিযাত্রা এ মহাসংসারে, মহাজগতের কাছে কতটা ঠিক গুরুত্বপূর্ণ? প্রাণী এবং উদ্ভিদজগতের এই যে বিশাল সমারোহ, এমনকী এই পৃথিবীকে বাদ দিলে যে বিপুল মহাবিশ্ব, তার কাছে কোনটা স্বাভাবিক আর কোনটা নয়, সে বিষয়ে আমরা কীভাবেই বা কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারি? তবে সে বিষয়টি এতটাই বৃহৎ, যে সচরাচর আমাদের কল্পনাতেও আসে না। বাস্তবতার কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে থাকি। এই কথাটি আমাদের কাছে হয়তো সহজভাবে আসে না, যে আমাদের যে তথাকথিত বাস্তবতা আছে, তা আমাদের মধ্যে একপ্রকার কুসংস্কারের জন্মও দিয়েছে। কিন্তু সেই কুসংস্কার এতটাই যুক্তির, কার্যকারণ সম্পর্কের কুসংস্কার, যে আমরা সেই কুসংস্কারকে বিশুদ্ধ যুক্তি হিসেবেই ভাবি। যারা বাস্তববাদী তাদেরকেই একমাত্র প্রগতিশীল মনে করি। সেখান থেকেই আসে এই খণ্ডকে পূর্ণ ভাবার (যদিও পূর্ণ বলে এখানে কিছু সীমিত অবস্থার কথা বলছি না। কারণ যা কিছু আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সীমায় ধর্তব্য, তা অসম্ভবের কল্পনা হলেও, ইংরিজিতে ফাইনাইট) সমস্যা। কিন্তু আদতে আমরা কোথাও থেকে শুরু করিনি এবং শেষ করব না। শুরু বা শেষ কিছুই হয়নি। কিন্তু অভিযাত্রাটা চলছে। কিন্তু যদি এই কথাটি কাউকে বলি, সে আমাকে বাস্তববাদী বলবে না। বরং বলবে চূড়ান্ত ভাববাদী। যেন ভাব, বাস্তব নয়। তা না হলে ভাবুন বস্তুবাদী এবং ভাববাদীর মধ্যে এত বিরোধ কীসের? বস্তু তো ভাবের-ই অংশ এবং ভাব-ও বস্তুর অংশ। তাহলে আলাদাভাবে ভাববাদ, দর্শন, কাব্য এবং বিজ্ঞান, যুক্তি, বস্তুবাদ বলে আলাদা করব কেন?

এই যে আলাদা করার অভ্যেস মানুষ সভ্যতার ক্রমবিবর্তনে আবিষ্কার এবং প্রতিষ্ঠিত করল, তখন থেকেই শুরু হল মানুষের এত সমস্যা। ধর্ম বলে আমরা কিছু আমাদের তৈরি অনুশাসন রচনা করে ফেললাম, দর্শন বলে একধরনের যুক্তিসিস্টেম চালু করলাম, বিজ্ঞান নিজের মতো করে চলতে শুরু করল, সাহিত্য বলল আমি সবার অংশ, কিন্তু সবাই আমার অংশ নয়— এভাবে চলতে লাগল সমস্যা। ধর্মের নানা অনুশাসনের মধ্যে সমস্যাগুলি তো সকলেই জানেন। আস্তে আস্তে বিভিন্ন মতবাদ, বিভিন্ন জাতিবাদ, বিভিন্ন অঞ্চলবাদ নিজেদের মধ্যে যুযুধান হয়ে উঠল। কিন্তু মানুষ কি একবারের জন্যেও ভাবল, যে আদিমানব এসব কিছুই জানত না। তখন সে প্রকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে আছে এবং প্রকৃতি তার সামনে। পরবর্তীকালে মানুষ যা যা অনুশাসন তৈরি করল, সেগুলি হয় পর্যবেক্ষণ, বিজ্ঞান অথবা সম্ভাব্য দর্শন। আর তার চেয়েও বেশি হল ধর্মের নামে সামাজিক অনুশাসন। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের মধ্যে যে বিপন্ন বিস্ময়সূচক যোগাযোগ, তা আর প্রতিফলিত তো হলই না, উপরন্তু মানুষের সঙ্গে মহাপ্রকৃতির যোগাযোগ ক্রমেই কমতে লাগল। এখানে এসে খটকা লাগে। মহাপ্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ কমবে কী করে? মানুষ তো মহাপ্রকৃতির অংশ। আসলে কমল না। কিন্তু মানুষের বাহ্যিক বৌদ্ধিক এবং বেঁচে থাকার যে আপাত বাস্তবতা সেখানে কমল। মানুষ প্রকৃতিকে শোষণ করতে জানার প্রাথমিক স্তরেই নিজেকে প্রকৃতির মহাপ্রভু হিসেবে ভাবতে শুরু করল, তার প্রমাণ মানুষ ঈশ্বরের যে যে রূপ ভাবল, এমনকী ভিন গ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীদের যে যে রূপ ভাবল, তাতেও মানুষের মতো অবয়ব-ই আঁকতে শুরু করল। এক মুহূর্তের জন্যেও ভাবল না, মানুষ যেমন এই মহাপ্রকৃতির অংশ, তেমন অংশ একটি কুকুরও, একটি বাঘও এমনকী একটি আরশোলাও। তাহলে ঈশ্বর যদি থাকেন, তাকে মানুষের মতো শুধু দেখতে হবে কেন? মানুষ কল্পনা করছে বলে?

কিন্তু এই কথাগুলি বলা সামাজিকভাবে খুব ঝুঁকিপূর্ণ যে হয়ে যাবে তা বলাই বাহুল্য। এমনকী এই কথাও যদি কাউকে বলি, যে একজন কবি বা একজন লেখক তো সারাজীবন ধরে আসলে একটিই বই লেখেন এবং সে লেখারও শুরু কিংবা শেষ নেই, তাহলেও চরম বিপদ ঘনিয়ে আসবে। কিন্তু আদতে তো তাইই ঘটে। লেখকের সারাজীবন ধরে অসম্পূর্ণ, না শুরু হওয়া এবং না শেষ হওয়া অভিযাত্রার নাম-ই লেখা। তিনি কোনও কবিতার বইতে, কোনও উপন্যাসে, কোনও ছোটগল্পে, কোনও প্রবন্ধেই আসলে কোথাও-ই পৌঁছন না, কারণ তিনি মাঝপথেই কোথাও কলম থামিয়ে দিতে বাধ্য হন, যেমন তিনি তুলে নিয়েছিলেন একদিন মাঝপথেই, তাঁর কলম।

কিন্তু এর অর্থ আরেকটাও, আর তা হল, আমরা প্রত্যেকে মিলেই একটি মহাগ্রন্থের লেখক।

কিন্তু এই ব্যাপারটি আরেকটু বিস্তারের প্রয়োজন আছে।

 

(ক্রমশ)

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...