সোশ্যাল মিডিয়ার নারীবাদী আন্দোলন: কনসেন্ট, পরিকাঠামো, এবং ক্ষমতা

মৌমিতা সেন

 

১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে নারীবাদী “যোদ্ধা কবি” অদ্রে লর্ড একটি সম্মেলনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন:

My silences had not protected me. Your silence will not protect you. But for every real word spoken, for every attempt I had ever made to speak those truths for which I am still seeking, I had made contact with other women while we examined the words to fit a world in which we all believed, bridging our differences. And it was the concern and caring of all those women which gave me strength and enabled me to scrutinize the essentials of my living.[1]

নীরবতা থেকে বেরিয়ে আসা আমাদের সমাজের মেয়েদের পক্ষে একটা ভয়ঙ্কর ঝুঁকি— ভয়, লোকলজ্জা, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শেখানো মার্জিত আচরণ, অন্যের প্রয়োজনে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া— এই অনুশীলন কাটিয়ে সত্যি কথা নির্ভীকভাবে লোকসমক্ষে বলা কঠিন। তার ওপর, উঁচু-জাতের মধ্যবিত্ত হিন্দুঘরের মেয়েদের সতী-সাবিত্রী হতে পারার কিছু মুনাফা আছে, অন্যদিকে অবজ্ঞা করলে কঠোর শাস্তি। স্বাভাবিকভাবে, লাভ-লোকসান হিসেব করে হোক, ভয় পেয়ে হোক, বা নিরুপায় হয়ে হোক, মেয়েরা নীরবতার পথটাই বেছে নেন। অথচ নীরবতার বদ্ধ ঘরে কারও রেহাই নেই এ কথা অদ্রে লর্ড বারবার বলেছেন।

গত বছর চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে একটা ব্যঙ্গাত্মক লেখা লিখেছিলাম— “কালচারপাড়ার দাদাদের” বা সংস্কৃতি জগতের সুপ্রতিষ্ঠিত পুরুষমানুষের পিতৃতান্ত্রিক ভাবতত্ত্ব নিয়ে। এ বছর সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়, মলয় মিত্র, এবং রঞ্জন ঘোষালের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উঠে এসেছে, তারপর আর ব্যঙ্গাত্মক কটাক্ষের হাসিটুকুর রসদও ফুরিয়েছে।

সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় আমাদের সঙ্গে ক্যান্টিনে, ক্লাসরুমে, বন্ধুর বাড়ির আড্ডায়, নারীবাদ নিয়ে, বিপ্লবী চেতনা নিয়ে, অনেক তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। পারফরম্যান্স নিয়ে অনেক জটিল প্রগতিশীল কথা বলতে শুনেছি ভদ্রলোককে। কয়েক সপ্তাহ আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন একাধিক চেনা-অচেনা মেয়েদের অভিযোগ ও বয়ান পড়ি, তখন এক মুহূর্ত অবাক হয়েছি, দাদাদের এই অনবরত দায়বদ্ধতাহীন যৌন শোষণের এরকম নজির দেখে যে তীব্র রাগ-ঘেন্না হয়েছে, সেটা এখনো সংবরণ করতে পারিনি। কিন্তু একই সঙ্গে এই মেয়েগুলোর সাহস দেখে গর্ব বোধ করেছিও বটে।

এই লেখায় দুটি বিষয় আলোচনা করব যা ইদানিং ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলিতে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: ১) সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীবাদী আন্দোলনের নতুন দিক এবং ২) কনসেন্টের ধারণার সঙ্গে ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামোর যোগসূত্র।

 

পার্হেসিয়া বা নির্ভীক সত্যবচন

যখন আমার ও আমার আশেপাশের মেয়েদের আঠেরো, বা কুড়ি, বা পঁচিশ, তখন আমাদের এই সাহস ছিল না। আমাদের মা-মাসি-আন্টি-ম্যাডামরা ব্যক্ত বা অব্যক্তভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে জন পরিসরে খেটে খেতে হলে খুব সাবধানে গা-বাঁচিয়ে চলতে হবে: “পুরুষমানুষ ওরমই, সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পরবে, আর দোষ হবে তোমার!” আমি বা আমরা এগুলো পুরোপুরি মানিনি, কিন্তু জন পরিসরে রুখে দাঁড়ানোর যে সাহস এবং আত্মবিশ্বাস এঞ্জেলা বা রাজেশ্বরীর আছে, তা অন্তত আমার ছিল না। নিজে ভুগেছি, কাছের বন্ধুদের ভুগতে দেখেছিI সেই অক্ষমতা আর বিবশতার বোঝা ফি বছর আরও আরও ভারী মনে হয়। ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি, আমি না মানতে পেরেছি, না সঠিক কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হতে পেরেছি। পালানোরও পথ পাইনি। পিতৃতন্ত্র বিশ্ব-ব্যাপী এবং ট্রান্স কালচারাল— পালানোর জায়গা নেইI

এই ধরুন দু বছর আগে শহরের এক নামজাদা অধ্যাপকের বাড়ির বিখ্যাত সান্ধ্য আড্ডায় মিটু নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অধ্যাপক-মশাই প্রথমে রেগে গেলেন, তারপর আমাকে কটাক্ষ করে বলে বসলেন: “নারীর আবার স্বেচ্ছা!” এই ধরনের উক্তিকে ইংরিজিতে বলে পোস্ট-আয়রনি। যে ভদ্রলোক আমাকে জেন্ডার-স্টাডিজ পড়িয়েছেন, তাঁর সঙ্গে তর্কে পেরে ওঠা কঠিন। কী আর করব? কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি চলে এলাম। এর সঙ্গে, ওর সঙ্গে ফোনে অনেক কুৎসা-নালিশ ইত্যাদি করলাম। শুনতে হল: “এত সহজে ভেঙে পড়লে চলবে? শক্ত হতে হবে”, বা “ধুস! ওই বুড়োর কথায় এত পাত্তা দিচ্ছিস বোকা? গায়ে না মাখলেই হল!” এই তো পরিবেশ। এর মধ্যে এঞ্জেলা আর রাজেশ্বরীর ছবি সমেত বয়ান যে কী সাহসের চিহ্ন, তা যারা নির্বাক হয়ে সহ্য করে এসেছে, তাঁরা সবচেয়ে বেশি বুঝবেন। ওদের বয়ান এই ধরনের ভণ্ড মানুষের ব্রাহ্মণ-বাড়ির ভদ্রতার মুখোশ এক টানে খুলে দিয়েছে। আজ যা লিখছি তাঁর মূলে এই দুই নারীর অসামান্য সাহস ও আত্মবিশ্বাস।

সার্ভেলেন্স, ট্রোলিং, ইত্যাদি নানান সমস্যা থাকা সত্ত্বেও, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশ্ব-ব্যাপী নারী-সংহতি একটা নতুন চিন্তা ও আলোচনার জায়গা তৈরি করেছে। আমাদের যখন একুশ-বাইশ, পরিবার-পরিজন প্রভৃতির ভাবতত্ত্বের বাইরে কথা বলা ও শোনার সুযোগ বিরল ছিল। যে অনুভূতিটা সত্য বলে ঠেকত, সেই কথাটা নিজেকে বলতে পারার মত একটা ছোট্ট চিন্তার ঘর আমাদের অনেকেরই ছিল না, জন পরিসরে বলতে পারা তো আরও দুরূহ। ধর্ষণ, যৌন হেনস্থা, “ছোটখাটো” যৌন বৈষম্যবাদী কথা বা আচরণ আমাদের মা-মাসির মতন আমরাও মেনে নিয়েছি। মা ছোটবেলা থেকে শিখিয়েছেন, “বেশি প্রতিবাদ করলে ওরা পিষে মারবে, মাথা নিচু করে নিজের কাজ গুছিয়ে নে।” কথাগুলো সত্যি। নারীবাদী লেখিকা সারা আহমেদের গবেষণা এই একই কথা প্রমাণ করেছে: যারা বৰ্ণ-বৈষম্য নিয়ে প্রতিবাদ করেন, তাদের আরও আরও বর্ণ-বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়; যারা যৌন-হেনস্থার অভিযোগে সোচ্চার হন তাদেরকে সোশ্যাল মিডিয়ায় রেপ থ্রেট পাঠানো হয়।

এই যে প্রতিবাদ না করে “মাথা নিচু করে কাজ গুছিয়ে নেওয়া”— এই কথাগুলো খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে। আমাদের একটা ধারণা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে: সংস্কৃতি জগৎ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতে হলে কিছু আপস করতে হবে। কারণ উচ্চপদস্থ কোনও নাট্যকর্মী বা অধ্যাপকের পৃষ্ঠপোষকতা ও সমর্থন না পেলে এই ধরনের কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। প্রতিবাদ করলে কী হয়? মা বলেন: “ব্লেড মেরে দেবে… অ্যাসিড মেরে দেবে!” সংস্কৃতির জগতে আমার সেই ভয় হয়নি, কিন্তু ভেবেছি: “স্যার রেগে গেলে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সুপারিশ-চিঠি লিখবেন না, বা পরের অ্যাকাডেমির প্রদর্শনীতে আমাকে নেবেন না, বা নাটকের দল থেকে বার করে দেবেন।”

নির্ভয়ে সত্যি কথা বলার শিক্ষা মেয়েদের কেউ দেয় না; বরং সত্যি বলার ঝুঁকিটা আচ্ছা করে শিখিয়ে দেওয়া হয়। দার্শনিক মিশেল ফুকোর লেখায়[2] পার্হেসিয়া শব্দটির অর্থ আসন্ন বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে, বিপদ সত্ত্বেও অকুতোভয় সত্যবচন। যারা নিজেদের প্রোফাইল থেকে নিজেদের অভিজ্ঞতা সোশ্যাল মিডিয়া, বন্ধু-পরিজন, এবং পুলিশের কাছে নির্ভয়ে জানিয়েছেন, ফুকোর ভাষায় তাঁরা পার্হেসীএস্টেস, “those who speak truth to power.”

গতবছর লরেন্স লিয়াংয়ের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ দিল্লির এক বিশ্ববিদ্যালয়ে একপ্রকার ধামা-চাপা পড়ে যায়। বেঞ্জামিন জাকারিয়ার বিরুদ্ধে ডজনখানেক মহিলা ফেসবুকে তাদের ব্যক্তিগত যৌন হেনস্থার কথা লেখা সত্ত্বেও তিনি দিব্যি এক ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। আমি যতদূর জানি, এঁদের অপরাধ আইনত তদারক করা হয়নি। যতই সোশ্যাল মিডিয়ার ঝড় উঠুক না কেন, এঁরা ঠিক আরেকটা শহর, আরেকটা চাকরি, আরেকটি প্রেমের সম্পর্ক খুঁজে নেন। পাবলিক ওপিনিয়নের কোর্টের হাওয়াও আস্তে আস্তে পাল্টে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার “ক্যাঙ্গারু কোর্ট” দেশের আইন অবধি পৌঁছতে পারছিল না। সুদীপ্তবাবু কিন্তু গ্রেপ্তার হয়েছেন। লিস্ট না, বেনামি বয়ান না, এই মেয়েরা জন পরিসরে বেরিয়ে এসে ন্যায় দাবি করেছে।

তবুও একটা প্রশ্ন উঠছে— বিশেষত যারা ধর্ষণের মামলায় অভিযুক্ত তাদের উচ্চপদস্থ বন্ধুদের মধ্যে— “যাদের এত জ্ঞান, এত বৈপ্লবিক চেতনা, তাঁরা এমন হীন কাজ কি ভাবে করতে পারেন?” অনেকে জিজ্ঞেস করছেন, “মেয়েগুলো নিশ্চয়ই শুরুতে রাজি ছিল!” এই কনসেন্টের বিষয়টা অত্যন্ত জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ।

 

কনসেন্ট: প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো ও ভাবতত্ত্ব

যে মধ্যবিত্ত নারীর এই শিল্প-জগতে কাজ করার অর্থনৈতিক সুবিধে আছে, আর পাঁচটা মেধাবী ছাত্রের মতন, তারাও মনেপ্রাণে শিল্পী বা বুদ্ধিজীবী হতে চান। সমস্যা হল যে বেশিরভাগ ক্ষমতাশালী পুরুষমানুষের চোখে এই “ঝকঝকে কচি মামনিরা” হয় ট্রফি, নয় শিকার, বা শুধুমাত্র টাইমপাস। ক্ষমতা, সংস্কৃতি ও অ্যাকাডেমিক জগতের প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, এবং পৃষ্ঠপোষকতার মধ্যে জটিল সম্পর্কটা না ধরতে পারলে এই ধরনের যৌন হেনস্থার প্রতিকার দুঃসাধ্য। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে চায়ের দোকানের আড্ডায় লোকে বারেবারে প্রশ্ন করছেন: “ও মা, মেয়েটি একা একা ভরদুপুর-বেলা একটা লোকের বাড়ি চলে গেল?”

আমি নয় এই মুহূর্তে নারীর নিজের শরীর ও যৌনতার ওপর সম্পূর্ণ অধিকারের বিষয়ে নাই গেলাম। এই গোড়ার কথাটা বোঝা খুব প্রয়োজন যে প্রথমত, সংস্কৃতি জগতে শিক্ষা, ট্রেনিং, চেতনার উন্মেষ শুধু ক্লাসরুমে সীমাবদ্ধ নয়, এই ধরনের পরিবেশ (বাড়ির আড্ডা, কলেজের ক্যান্টিন, গ্যালারির বাইরের চায়ের দোকান) শিল্প-জগতের পরিকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয়ত, যদি কোনও অল্প-বয়স্ক মহিলা নাট্যকর্মী বা শিল্পী ইজ্জত যাওয়ার ভয়ে এই ধরনের পরিবেশ থেকে দূরে থাকেন, তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবে এই পরিকাঠামোর প্রান্তে বা বাইরেই আটকে পড়বেন; তাঁর শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন হবে না। আবার এটাও সত্যি যে ক্ষমতাশালী পুরুষমানুষের পরিহাস, বা হেনস্থা, বা খুচরো সেক্সিস্ট মন্তব্য হেসে উড়িয়ে দিতে পারার মতো কঠিন চামড়া তৈরি করাটাও এক ধরনের মানসিক শ্রম। এই মানসিক শ্রমের মাসুলটা না দিতে পারলে, শিল্প বা অ্যাকাডেমিকসের জগতে মেয়েরা সুস্থভাবে কাজ করতে পারেন না।

আঠেরো-উনিশের একজন ছাত্রী যখন শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ইউনিভার্সিটি বা নাটকের দল বা আর্ট কলেজে ঢোকে, সাধারণত তখন সেই মানুষটির প্রধান লক্ষ হয় তাঁর শিল্পীসত্তার পরিচয় ও বিকাশ। সেই লক্ষ্য নিয়ে সে বই পড়ে, এসআরএফটিআইতে সিনেমা দেখতে যায়, মিলনদার ক্যান্টিনে দাদা-দিদিদের কথা শোনে, ইউনিয়ন ঘরে আড়ি পাতে, বা সন্ধেবেলা স্যারের বাড়ির আড্ডায় যায়। এ মানুষটা একজন ইন্টেলেকচুয়াল বা ক্রিয়েটিভ শ্রমিক। এটাও তাঁর কাজ।

২০১৬-র LoSHA থেকে একটা আলোচনা বারবার উঠে এসেছে কনসেন্ট নিয়ে। ২০১৭ সালের আঠাশে অক্টোবর স্ক্রোল পত্রিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হেনস্থা নিয়ে একটি আলোচনায়, কনসেন্ট, শ্রম, ও ক্ষমতার যোগসূত্র স্বাতী মৈত্র এই ভাবে তুলে ধরেছেন: “Consider also the murky world of male faculty and an endless supply of starry-eyed women (…), navigating a world of dubious consent and an absolute imbalance of power.”[3] প্রিয়ম্বদা গোপাল সেই একই সময় লিখেছেন যে বয়েস ও ক্ষমতার এই ভীষণ তারতম্যে কনসেন্ট কতটা স্বেচ্ছা আর কতটা স্যারের শেখানো উদারনৈতিক নারীবাদ, সেটা বোঝা কঠিন। এটাকে দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি বলবেন হেজেমনি।[4] একটা গোটা পিতৃতান্ত্রিক ভাবতত্ত্বের মধ্যে এই শোষণ, নারী শরীরের প্রতি ক্ষমতাসম্পন্ন পুরুষের অধিকারবোধ, এবং নারী শরীর ও নারীসত্তার পণ্যীকরণ এতটাই স্বাভাবিক ও সাবলীল যে এটাকে দণ্ডনীয় অপরাধ বলে ভাবতেই সুদীপ্তবাবুদের অসুবিধে হয়। অথচ এদের ক্লাসেই আমরা ইডিওলজি, হেজেমনি, ক্ষমতা ইত্যাদি নিয়ে ভাবতে শিখেছি।

সুদীপ্তবাবু, মলয়বাবু, ও রঞ্জনবাবুদের আইনত শাস্তি হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু এই তিনজন ব্যক্তিকে যদি বিকৃতমস্তিস্ক, বা বিকৃতকামী বলে মিডিয়ায় স্কেপগোটের মত ব্যবহার করা হয়, তাহলে শুধু কিছু রোগের লক্ষণের চিকিৎসা হবে, রোগ কিন্তু থেকেই যাবে। পিতৃতন্ত্র একটি ইডিওলজি, ধরে নিন জল-হাওয়ার মত এটা সর্বব্যাপী। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমরা একই কুঁয়োর জল খাইI এই ভাবতত্ত্বের বাইরে অন্য কিছু ভাবাটা কঠিন— যাঁরা এই মতাদর্শের বাইরে কথা বলেন তাঁরা কোনঠাসা হন। সারা আহমেদ এঁদের বলেন “ফেমিনিস্ট কিলজয়”।[5] “কিলজয়”, অর্থাৎ স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দের হত্যাকারিনী। সত্যিই তো, পুরুষ-প্রধান ভাবতত্ত্বে যাদের মুনাফা, তাঁরা হয়তো বুঝতেই পারেন না কার না-বলা কথা, বহু-কষ্টে-সহ্য-করা হেনস্থা ও মানসিক শ্রমের ভিত্তিতে তাদের সাবলীল আনন্দের সৌধ খাড়া হয়েছে। সারা আহমেদ লিখছেন প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ নিয়ে— এই অভিযোগ পুলিশ-কোর্ট-কাছারিতেও হয়, আবার একা একটা দলের মধ্যে সেক্সিস্ট মন্তব্যে না-হাসার মুহূর্তেও হয়। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো যাদের জন্যে তৈরি নয়, তাঁরা বুঝতে পারেন কোন জায়গায় তাদের প্রবেশ-অনুমতি নেই, কোন জায়গায় দরজা-জানলা খুলতে গেলেই কঠিন শাস্তি অবশ্যাম্ভাবী।

ক্লাসরুমে নারীবাদ পড়ানো আর নিজের জীবনে নারীবাদ প্রাকটিস করাটা এক জিনিস নয়I বিশেষত একজন ক্ষমতাসম্পন্ন পুরুষ যখন নিজের ক্ষমতার সঠিক মূল্যায়ন না করে ক্ষমতা নিয়ে, নির্যাতন নিয়ে, বা যৌনশোষণ নিয়ে নাটক বা প্রবন্ধ বা সিনেমা করেন, তখন সেটা শুধুমাত্র অতিসরলতা বললে ভুল হয়, সেটা ভণ্ডামি।

 

“ভাবুন, ভাবা প্রাকটিস করুন”

সোশ্যাল মিডিয়ায় ও জনপরিসরে যে ট্রান্সন্যাশনাল, ট্রান্সকালচারাল, বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের ভাষা তৈরি হচ্ছে, তাতে ভরসা রাখি। এই যে বিধ্বংসী রাগ— আমার, আমার মায়ের, আমার চেনা অজস্র নারীর— এই রাগটা রাজনৈতিক। এবং এই রাজনীতি আস্তে আস্তে একটা চেহারা নিচ্ছে। আন্তোনিও নেগ্রি আর মাইকেল হার্ট তাদের সাম্প্রতিক ‘অ্যাসেম্বলি’ নামক বইতে সমসাময়িক গণতন্ত্র, সোশ্যাল মিডিয়া সংশ্লিষ্ট আন্দোলনের অধিনায়কত্বের বিষয়ে কিছু প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা করেছেন। যে জনসাধারণ মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার স্ক্রিনে আন্দোলনে নেমেছেন তাদেরকে এঁরা বলছেন “অ্যাসেম্বলি”।[6] এঁদের আন্দোলনের ব্যাকরণ বুঝতে হলে আমাদের চেনা বিপ্লবের ফর্মুলা যথোপযুক্ত নয়। সমাজবাদী নারীবাদীরা এই আন্দোলনকে “ক্যাঙ্গারু কোর্ট” বলে খারিজ করতেই পারেন— রাস্তায় স্লোগান নেই, পতাকা নেই, নির্ধারিত নেতৃত্ব নেই। নেগ্রি ও হার্ট কিন্তু লিখছেন যে এটা আগামী-আন্দোলনের অধিনায়কত্বের মডেল। নেতা বা নেত্রী কোনও একক ব্যক্তি নন— নেতৃত্ব হবে ফ্লুইড বা তরল, চিন্তার সঙ্গে তারও নিরন্তর পরিবর্তন ঘটবে। কোনও একক নেতার অধিনায়কত্ব এই আন্দোলন মানবে না— এবং এটাই এর বৈশিষ্ট।

অদ্রে লর্ডের বিখ্যাত উক্তি: “the master’s tools will never dismantle the master’s house.”[7] সোশ্যাল মিডিয়া আর মিটু মুভমেন্টের দরুণ নারীবাদ এখন বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিও অফিস, লিটিল ম্যাগাজিন, আর্ট গ্যালারির বাইরে জনপরিসরে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশা করি এই আলোচনায় আমাদের হারানো বা না-পাওয়া প্রতিবাদের উপকরণগুলো উঠে আসবে। মনে রাখতে হবে, এটা একটা কি দুটো মানুষের যৌনবিকৃতিজনিত অপরাধের বিষয় নয়, এটা পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষের মর্যাদা ও অধিকারের লড়াই, বহু শতাব্দীর ভাবতত্ত্বের পরিবর্তনের লড়াই, নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে পিতৃতান্ত্রিক চিন্তা থেকে নারীবাদী চিন্তার দিকে এগিয়ে যাওয়ার লড়াই।


[1] Lorde, Audre. Sister outsider: Essays and speeches. Crossing Press, 2012.

[2] Foucault, Michel. “Discourse and Truth-The Problematization of Parrhesia.” (1983).

[3] Moitra, Swati. Sexual misconduct on Indian campuses: The name and shame list always existed in whispers and rumours, published Oct 28, 2017 on Scroll.in, accessed 30.10.2019. URL: https://scroll.in/article/855702/sexual-misconduct-on-indian-campuses-the-name-and-shame-list-always-existed-in-whispers-and-rumours

[4] Gramsci, Antonio. The Gramsci reader: selected writings, 1916-1935. NYU press, 2000.

[5] Ahmed, Sara. “Feminist killjoys.” The promise of happiness (2010): 50-87.

[6] Hardt, Michael, and Antonio Negri. Assembly. Oxford University Press, 2017.

[7] Lorde, Audre. Sister outsider: Essays and speeches. Crossing Press, 2012.

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...