মানুষ সংবাদ এড়িয়ে যাচ্ছেন কেন?

জোশুয়া বেনটন

 

এর কারণ হয় তারা আমাদের বিশ্বাস করেন না, নয় তারা মনে করেন সংবাদপত্র তাঁদের জীবনে আলাদা কোনও কিছুই যোগ করে না। হয়তো এরকমটাও হতে পারে, সংবাদপত্রের প্রতি অবিশ্বাসের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় সংবাদ পরিবেশনের ধরন— যা মানুষকে উদ্বিগ্ন, অবসাদগ্রস্ত, ভীত, সন্ত্রস্ত ও ক্লান্ত করে তোলে। আলোচনা করলেন নিয়েমান ল্যাবের জোশুয়া বেনটন। তর্জমা— অপর্ণা ঘোষ। মূল লেখার লিঙ্ক নিচে দেওয়া হল।

এই আধুনিক ডিজিটাল যুগের মানুষ (যাদের Homo Smartphonicus বলা যেতে পারে— ঝুঁকে পড়া কাঁধ আর ঝাপসা চোখ দিয়ে যাদের চেনা যায়) পূর্বের যে কোনও মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সংবাদ ও তথ্য আহরণ করতে পারে, চাইলেই, এবং বেশিরভাগটাই বিনামূল্যে।

শুধু তো সংবাদ নয়, সব তথ্যই তাদের কাছে সুলভ। ইন্টারনেট গেমস থেকে মিমস, পুরনো বন্ধুর ছবি থেকে অ্যারিফনা গ্রান্দের টিকটকের গান। এগুলি নিখুঁত বিনোদন দেয়। গ্রাহককে সন্তুষ্টি দেয়। আজকের দিনে সংবাদ কিন্তু এই সুখ বা সন্তুষ্টি উৎপাদন করতে পারে না। সুতরাং বহু মানুষ মিম-এ আটকে থাকতেই ভালোবাসেন, এড়িয়ে যান ট্রাম্প-ইরান-পুটিন-জলবায়ু পরিবর্তন-গণহত্যা-ব্রেক্সিট-বর্ণবিদ্বেষ সম্পর্কিত সংবাদগুলি— সম্পূর্ণভাবে।

এই লক্ষণটি এখন সুস্পষ্ট ও সুপ্রতিষ্ঠিত— উন্নত প্রযুক্তি একদিকে সংবাদকে সুলভ করেছে, একই সঙ্গে সহজ করেছে সংবাদকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা। গত কয়েক বছর ধরেই খুব আগ্রহ সহকারে এই প্রবণতার বাড়বাড়ন্ত লক্ষ করছি, অ্যাকাডেমিক সাহিত্য এর নাম দিয়েছে News Avoidance বা সংবাদ পরিহার। আমার মতো মানুষ— এবং আপনারা, এই নিয়েমান ল্যাবের প্রিয় পাঠকেরাও— সংবাদ আহরণ করতে এবং ইন্টারনেটের বিপুল ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে সংবাদ শিরোনামের বিপুল জোয়ারে ভেসে যেতে ভালোবাসেন। তবে আমরা ব্যতিক্রমী অদ্ভুত, বেশিরভাগ স্বাভাবিক মানুষ কিন্তু ইন্টারনেটের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে স্বচ্ছন্দে সংবাদকে এড়িয়ে যেতেই পছন্দ করছেন।

নিয়েমান ল্যাবের গত সপ্তাহের সংখ্যায় এ নিয়ে কিছু তথ্য পরিবেশিত হয়েছে। ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাপী যে সমীক্ষা করা হয়েছিল তাতে বিশ্বের ২৯ শতাংশ মানুষ জানিয়েছিলেন যে তাঁরা মাঝেমাঝেই সংবাদ পাঠের ব্যাপারটা এড়িয়ে যান, এর মধ্যে ৩৮ শতাংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ, ২৪ শতাংশ ব্রিটেনের। আজ ২০১৯-এ এসে হিসাবটা দাঁড়িয়েছে বিশ্বব্যাপী ৩২ শতাংশ, যার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪১ এবং ব্রিটেনের ৩৫ শতাংশ। এমনকি জাপানিরা— যাদের বিশ্বের সবচেয়ে মনোযোগী সংবাদগ্রাহক হিসেবে গণ্য করা হয়— তাদের মধ্যেও এই সংবাদ বর্জনের প্রবণতা ৬ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১১ শতাংশ হয়েছে।

কেন মানুষ সংবাদ বর্জন করতে চায়? ২০১৭ সালের তথ্য বলছে, আমেরিকানদের ক্ষেত্রে প্রধান কারণগুলি হল— “আমার মুডের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে” (৫৭ শতাংশ) এবং “আমি সংবাদগুলির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারি না” (৩৫ শতাংশ)।

আমি এই বিষয়ের কিছু গুণগত তথ্যের প্রস্তাবনা হিসেবে সমস্ত ধরনের সংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্য পেশ করতে পারি। গত শনিবার লিঙ্কেডিন-এর সিনিয়র এডিটর অ্যাট লার্জ ইসাবেল রুগল একটি ছোট নিবন্ধে চলতি বছরের ডিজিটাল নিউজের সারসঙ্কলন করেছেন। তাতে তিনি সংবাদ এড়িয়ে যাওয়ার এই প্রবণতাটিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে শিরোনামে উদ্ধৃত করেছেন এবং এ সম্পর্কে পাঠকদের নিজস্ব মতামতও জানতে চেয়েছেন। আমার মনে হয়েছে, পাঠকদের মন্তব্যগুলি থেকে বোঝা যায় সাংবাদিক ব্যতীত অন্য মানুষ সংবাদকে রোজকার একটি তুচ্ছ কার্যকলাপ হিসেবে দেখেন যাকে মোটের ওপর এড়িয়ে যাওয়া যায়। অবশ্যই একটিমাত্র কমেন্ট সেকশন কোনও প্রামাণ্য বৈজ্ঞানিক নমুনা হিসেবে গ্রাহ্য হতে পারে না, কিন্তু সম্ভবত এই মানুষগুলিই কোনও সংবাদগোষ্ঠীর প্রধান উদ্দিষ্ট, এবং তারা সংবাদ এড়িয়ে যাচ্ছেন।

তাদের মন্তব্যের কিছু কিছু আমি হুবহু সাজিয়ে দিচ্ছি, শুধু কিছু টাইপো সংশোধন করলাম।

মেট্রো নিউজপেপারের শিরোনামে চোখ রাখতে ভয় পাই। আমি নিশ্চিত যে প্রতি পাতায় এবং শিরোনামে নেতিবাচক শব্দ রয়েছে। মূলধারার সংবাদপত্র পাঠ সময় ও শক্তির অপচয়। সেইজন্যই— হ্যাঁ আমি— সংবাদ এড়িয়ে চলি।

.

সংবাদপত্রগুলি কামপ্রবৃত্তি প্রচারে বেশি উৎসাহী এবং একই সঙ্গে ক্লান্তিকর। আমি সযত্নে নিজেকে ওই ভীতি উৎপাদনকারী কারখানা থেকে যতটা সম্ভব রক্ষা করি।

.

আমি প্রয়োজনীয় বা অত্যাবশকীয় হালনাগাদের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করি।

.

আমি খবর পড়া বা শোনা খুবই কমিয়ে দিয়েছি। কারণ, যথেষ্ট আত্মানুসন্ধান ও বিস্তারিত আত্মবিশ্লেষণের ফলে আমি বুঝতে পেরেছি যে মানসিক স্বাস্থ্য এবং সাধারণ মুডের ওপর এর গভীর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। আমি এখনও এর থেকে পুরোপুরি বেরনোর রাস্তা খুঁজে বের করতে পারিনি। আর, বড় খবর সচরাচর জানা হয়েই যায়।

.

ট্রাম্প কী করছে না করছে সেসব খবর আমি সোজা ডিলিট করে দিই। কেন? কারণ আগামী বছরের ভোটের ওপর আমার কোনও নিয়ন্ত্রণও নেই আর ভোট থেকে কোনও প্রত্যাশাও নেই। যা আমি সত্যিই চাইছি তা হল, ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে হাটাতে এবং একজন মহিলাকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে দেখতে।

.

যখন থেকে বুঝতে পেরেছি এসব খবর-টবর আসলে গুরুত্বহীন, তুচ্ছ; এতে কিছুই আসে-যায় না, তখন থেকে আমি খবরের কাগজ পড়া বন্ধ করে দিয়েছি। রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য সিদ্ধ করা ছাড়া এদের আর কোনও কাজ নেই, পুরোটাই অস্বাস্থ্যকর।

.

দশ বছর আগে আমি খবর পড়া বা শোনা বন্ধ করে দিয়েছি। চারপাশের এত সব খারাপ ঘটনা আমায় খুব হতাশ করে দিয়েছিল, আর আমি বুঝতে পেরেছিলাম অসহায় বোধ করা ছাড়া আর আমার কিছু করার নেই। তার আগে আমি কিন্তু খুব খুঁটিয়ে কাগজ পড়তাম, দিনে অন্তত এক ঘণ্টা তো বটেই।

.

প্রায়শই উল্টেপাল্টে দেখি (সংবাদপত্র) তবে খুব গুরুত্ব দিই না।

.

আমি নিউজ দেখাটা এড়িয়েই যেতে চাই যথাসম্ভব, কিন্তু আমার রুমমেটরা আবার নিউজ নিয়ে মোহগ্রস্ত। ফলে একটু আধটু দেখা হয়েই যায়। তবে আমি হয় ঘর থেকে বেরিয়ে যাই নয়তো চ্যানেলটা চেঞ্জ করতে অনুরোধ করি।

.

ধুর… শুধুশুধু স্ট্রেস নেওয়া!

.

যেসব ঘটনার ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই সেগুলো দেখে নিজেকে অসহায় বোধ করানো অনুচিত।

.

এর (সংবাদের) মধ্যে কোনও ইতিবাচক কিছু নেই। সবসময়েই নেতিবাচক। আমি নেতিবাচক ব্যক্তি নই। ফলে আমি ক্রমাগত খারাপ প্রতিবেদন পড়তে বা শুনতে বীতস্পৃহ বোধ করি।

.

শুধু নেতিবাচক তাই নয়, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কী করা যেতে পারে তা নিয়েও চূড়ান্ত অস্বচ্ছতা।

.

সংবাদ গোষ্ঠীগুলি সম্পূর্ণভাবে উত্তেজক এবং চমকপূর্ণ খবরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে আমি একমত যে ভয়ঙ্কর খবরগুলি ও নিপীড়নের খবরগুলির ওপর আলোকপাত প্রয়োজন, পৃথিবীতে যা কিছু ভালো ঘটছে তার সঙ্গে তুল্যমূল্য আলোচনাও দরকার, কিন্তু যদি আমাকে খারাপ খবরগুলি পরিবেশন করা হয় আমাকে জানাতে হবে সেগুলি সংশোধনের জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, বা আমরা তার বিরুদ্ধে কী করতে পারি। আপনাদের কাছে আমার একটাই প্রশ্ন— আমি কেন আপনাদের ছাপানো বিমর্ষ ছবি ও মনখারাপ করা সংবাদের পিছনে নিজের সময়, উৎসাহ ও ভালো-থাকাকে জলাঞ্জলি দেব? এর বদলে আমি বিজ্ঞাপন ভর্তি একটি পত্রিকা নাড়াচাড়া করব, যেখানে একটিও সংবাদ নেই।

.

আমি আমার কাজের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সংবাদগুলির খোঁজ রাখি, কিন্তু স্থানীয় দুর্ঘটনার খবর শোনা বন্ধ করে দিয়েছি বহুকাল ধরে।

.

কী ধরনের খবর শুনব বা জানব সে ব্যাপারে কৌশলী হওয়া প্রয়োজন। কোনও বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকার জন্য আপনাকে সে বিষয়ের ওপর গাদা গাদা নিউজ বা ধারাবিবরণী না শুনলেও চলবে। তা ছাড়া, এসব থেকে প্রয়োজনমতো নিজেকে দূরে রাখাটাও জরুরি। একটা ছোট্ট কাজ আমি করি— প্রতিদিন নিজেকে উৎসাহিত করার জন্য ইতিবাচক খবর শোনায় এমন কোনও চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করে রাখি।

.

[একজন সাংবাদিকের কথা] আমি অবশ্যই খবর এড়িয়ে চলি না, কিন্তু কিছু পাঠকের সংবাদের প্রতি চরম নিরাসক্তিটা বুঝতে পারি। আমার আগের কর্মক্ষেত্রে আমি সারাদিন পাঁচটা স্ক্রিনের সামনে কাটাতাম— দুটো স্ক্রিন কাজের জন্য, একটা টুইটার ফলো করার জন্য, একটা রয়টারের নিউজওয়ার আর ওয়ার্ল্ড মার্কেট ফলো করার জন্য, এবং আরেকটা চারটে বড় কেবল নেটওয়ার্কের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার জন্য। যখন আমি নতুন কাজে ঢুকলাম, নাটকীয়ভাবে আমার মানসিক চাপের মাত্রা কমে গেল। এটা হয়তো একটা চরম উদাহরণ, কিন্তু আমি বুঝতে পারি কেন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত নন এমন ব্যক্তিরা নিউজ ফিড এড়িয়ে যেতে চান। আমার পরামর্শ হল, সকালের খবরের কাগজটা পড়া উচিত অন্তত, বা মিনিট কুড়ি খরচা করে তাদের ওয়েবসাইটটা দেখে নেওয়া উচিত।

.

বেশিরভাগ বিকল্প চিকিৎসকরাই শুধু ডিজিটাল জগত থেকেই নয়, সবরকম চাপ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করার পরামর্শ দেবেন। তাই একদম সুইচ অফ করে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়াটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। কতটা বিশ্বাস করব, সেটা তো অন্য কথা হল— সত্যিটা যে কী, সেটা জানাই তো অসম্ভব।

.

বহু বছর আমি কোনও সংবাদপত্র পড়ি না। কারণ তা খুবই মানসিক চাপ তৈরি করে, আর আমার পড়ার জন্য যথেষ্ট জিনিস রয়েছে।

.

অনেক বছর আমি খোনও খবরের কাগজ পড়ি না। গাড়িতে যখন রেডিওয় খবর হয়, সাইলেন্ট করে দিই; আর বাড়িতে তো রেডিও নেইই। আমার ছেলেকে স্কুল থেকে সাম্প্রতিক খবরগুলির আলোচনা করবার একটি হোমওয়ার্ক অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছিল, আর সেই সময়েই সে তার স্কুলশিক্ষিকাকে আমার ব্যাপারটা জানায়। শিক্ষিকা ছেলেকে বলল আমি খুবই দায়িত্বজ্ঞানহীন অভিভাবক। একটুও দুঃখিত নই! সংবাদগুলি সর্বক্ষণ সবাইকে যে নেতি গিলিয়ে যায় তা গলাধঃকরণ করার জন্য আমার জাস্ট সময় এবং মানসিক ক্ষমতা নেই। ইতিবাচক রিপোর্টিং বলে কিছু হয় না।

.

বিষাক্ত এবং মিথ্যা নিউজের পেছনে সময় ও উৎসাহ নষ্ট করে লাভ কী! বরং ভালো জিনিসে মনোনিবেশ করাই তো ভালো। যদি আকর্ষণের নিয়মে বিশ্বাস করেন, তবে খবর দেখা, শোনা বা পড়া মানেই হল জীবনে কিছু নেতিবাচক বিষয় নিমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা। আর এতেও বিস্ময়ের কিছু নেই যে, এটাই আজকের পৃথিবী, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক— উভয়ত।

.

আমরা যখন সচেতনভাবে (বাধ্যতামূলকভাবে নয়) আমাদের জীবনযাপন করি, তখন আমাদের খবরের অন্তহীন চক্রের লুপ থেকে দূরে থাকা উচিত। মানসিক স্বচ্ছতা থাকলে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটা বেছে নিয়ে বাদবাকিটাকে পাত্তা না দেওয়া সম্ভব। এটা আসলে বাইরের বিষয় যেন আমাদের অস্তিত্ব নির্ধারণ করতে না পারে সেটা শেখা। বাইরের কোলাহল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারলে তা আমাদের ভেতরটাকে চিনতে সহায়তা করে। ফলে এসব থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে ‘সুইচড অন’ রাখুন।

.

আমি ক্যালরি কমানোর প্রোগ্রামে যোগ দেওয়ার পর প্রথম যে পরামর্শটি লাভ করেছিলাম সেটা ছিল— নিউজ শোনা এবং কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স আলোচনা বন্ধ করুন। ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করলে প্রায়শই অবাঞ্ছিত উত্তেজনার শিকার হতে হয় না। অসম্ভবের পরিবর্তন-চিন্তায় অকারণ উদ্বেগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। ৫০ জন মহিলাকে সিরিয়ায় খুন করা হয়েছে, কোনও রাজ্যে দুজন পথ-দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, কোনও প্রতিভাবান খেলোয়াড় কাউকে এক ঘুষিতে মেরে ফেলেছে এবং প্রতিভার কারণে ছাড়া পেয়ে গেছে— এগুলো এমন কোনও খবর নয় যা নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হবে। দুনিয়ার এইসব খবর নিয়ে দুনিয়া চিন্তা করুক, নিজের দিকে নজর দেওয়া বা নিজেকে নিয়ে চিন্তা করাটা বেশি মূল্যবান।

.

সোজা কথায় আমি ভাবতেই পারি না যে রাজনৈতিক বা অপরাধের খবরগুলিতে আমি আবার মনোযোগ দেব। দশ বছর আগেই আমি এসব ছেড়ে দিয়েছি। এখন লিঙ্কেডিন জাতীয় কিছু বিশ্বাসযোগ্য জায়গা থেকে কেবলমাত্র ব্যবসায়িক খবরগুলিই দেখি। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের মস্তিষ্ক উত্তেজক ও অভিঘাতমূলক খবরের দিকে আকর্ষিত হয় (আমাদের বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি আমাদের শঙ্কিত করে তোলে)। সুতরাং এই আসক্তি ছাড়া সহজ নয়। কিন্তু মানসিক শান্তির জন্য এটা জরুরি।

.

আমি কখনওই সংবাদ শুনি না। যদি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটে, সেটা এমনিতেই জানা হয়ে যায়। ৯৯.৯৯ শতাংশ খবরই হয় গপ্পোগাছা, সেলিব্রিটি-কেন্দ্রিক আবর্জনা নয়তো অন্য এমন কিছু যা আমাকে প্রভাবিতই করে না। যদি বা করে, সেখানে আবার আমার কিছু করার থাকে না। আমি সেই সব বিষয়ে মনোযোগ দিতে চাই যেখানে আমি কিছু করতে পারি।

.

খবর আর তথ্য জোগায় না। সেগুলি বিচ্ছিন্নতাবাদ, মৌলবাদ এবং যতরকম ইজম আছে তার ঢিবি। মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে বা ঘন ঘন এই ধরনের বিষাক্ত খবর গ্রহণ করা খুব ঝুঁকির।

.

আমি ঠিক করেছি পড়ব বা দেখব কিন্তু বিশেষ করে সোশাল মিডিয়ায় কোনও বিতর্কে কোনও কমেন্ট করব না। এতে খুব শৃঙ্খলার প্রয়োজন হয় কিন্তু আমার মানসিক চাপ প্রচণ্ড বেড়ে যায়।

বেশ। এবার কিছু চিন্তার কথা বলা যাক:

  • সলিউশন জার্নালিজম-এর লোকেরা নিশ্চয়ই এই নিবন্ধটি সমস্ত সম্ভাব্য স্পনসরদের কাছে পাঠাবেন। কারণ তারা যে সমস্যা নিয়ে চিন্তিত তার পটভূমিটি এখানে জলের মতো পরিষ্কার— বৃহৎ সমস্যা সম্পর্কিত সংবাদগুলি অত্যন্ত মানসিক চাপ তৈরি করে যদি তার সম্ভাব্য সমাধানগুলির কথা উল্লিখিত না হয়। নিয়মিত সংবাদসেবন এক ধরনের আলোকপ্রাপ্ত অসহায়তা তৈরি করে যা আদর্শগতভাবে ঝুঁকে থাকা খবরের প্রতি একটা আকর্ষণের জন্ম দেয়। সেগুলিতে আবার স্রেফ সাদা কালো, ধূসরের কোনও জায়গা নেই, ফলে আস্তে আস্তে সামগ্রিকভাবে সংবাদকেই এড়িয়ে যায় মানুষ।
  • মন্তব্যগুলি “যদি খবর গুরুত্বপূর্ণ হয়, তা নিজেই আমাকে খুঁজে নেবে” মনোভাবের চমৎকার সাক্ষ্য দেয়। “আমি প্রয়োজনীয় বা অত্যাবশকীয় হালনাগাদের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করি”; “বড় খবর সচরাচর জানা হয়েই যায়”; “যদি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটে, সেটা এমনিতেই জানা হয়ে যায়”— এরা বিশ্বাস করছেন যে সত্যিকারের দরকারি খবর সোশাল মিডিয়া, মুখের কথা বা অন্য কোনও মাধ্যমে ঠিকই আমার কাছে পৌঁছে যাবে। এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা সঠিক। আর যে ক্ষেত্রগুলিতে সঠিক নন, সেগুলি হয়তো তারা শুনতেই চান না।
  • সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ট্রাম্প-উত্তর যুগে এক নম্বর আলোচিত শব্দ বোধহয় ‘বিশ্বাস’। এর কারণ আছে। আমরা দেখেছি টুইটারে পাঁচ মিনিটে একবার ‘ফেক নিউজ’ শব্দবন্ধটি ভেসে ওঠে, অনেকেই ‘মিডিয়া অ্যাজেন্ডা’ এবং সম্পর্কিত বিষয়গুলির দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করেন। খুব সম্ভবত বিশ্বাস-এর ব্যাপারটিতে আমরা একটু বেশি জোর দিয়ে ফেলছি যে এর ফলেই লোকে সংবাদ পড়ছে না, শুনছে না। মনে রাখা দরকার “আমার মুডের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে”-র বিষয়টি এই মুহূর্তে “আমি সংবাদগুলির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারি না”-র চেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে।
  • টুইটারের মাধ্যমে যে নৈরাজ্যবাদী চিত্রটি আমাদের চোখে পড়ে— লোকে বলছে আমরা (সাংবাদিকরা) মিথ্যাবাদী এবং অতিরঞ্জনকারী। কিন্তু যেদিকটা বেশি দুশ্চিন্তার সেটা আমরা খেয়াল করছি না— জনগণের বৃহত্তর অংশটি আমাদের পরিবেশন করা ‘খাদ্যে’ আর ‘স্বাদ’ পাচ্ছেন না। তারা মনে করছেন যে, সংবাদ ক্ষমতার অপচয় ঘটায়, মানসিক চাপ বৃদ্ধি করে, এবং সোজা কথা সেগুলি আর মোটেই সময় ও মনোযোগের যোগ্য নয়। সংবাদ তাহলে কী ধরনের হওয়া উচিত যা এই সমস্যার সমাধান করবে? ওয়েবসাইটের ফুটারে কারেকশন পলিসি ছেপে এর সমাধান হবে কিনা সে নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।

একসময়ে খবর পড়াটা ছিল নিয়মিত অভ্যাস— প্রতিদিন সকালে খবরের কাগজ পড়া, সন্ধে ৬টায় টিভিতে খবর শোনা। এখন খবর চুঁইয়ে চুঁইয়ে জীবনে ঢুকে পড়ে ঠিক ততটুকুই যতটা আমরা তাকে ঢুকতে দিতে চাই। সভ্য জগতের প্রয়োজনীয় সাংবাদিকতাকে এখন অন্যান্য সমস্ত মিডিয়া, কনটেন্ট, এবং এমনকি মোবাইলে প্রাপ্ত বিনোদনের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক মানুষই যুক্তি দিয়ে ঠিক করে নিয়েছেন যে আমাদের ছাড়াই তারা ভালো থাকবেন। তাদেরকে আমরা কীভাবে আবার বোঝাতে পারব?


লিঙ্ক: https://www.niemanlab.org/2019/06/why-do-some-people-avoid-news-because-they-dont-trust-us-or-because-they-dont-think-we-add-value-to-their-lives/

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...