সনকা সেনের পরীক্ষা

কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়

 

সনকা সেন বস্তুবাদ, সাম্যবাদ, বর্ণবৈষম্যবিরোধবাদ, জাতিভেদহীনতাবাদ, পরধর্মসহিষ্ণুতাবাদ, ইন্দোচিনিভাইভাই-বাদ, ইউএফও-বাদ সবেতে বিশ্বাস করতেন, নারীবাদে করতেন না। বলতেন, ও বাদ আমি বুঝি না। কেউ যদি বলত, না বোঝার তো কিছু নেই, নারীবাদ হল নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের বাদ, সনকা বলতেন, ওই সমানত্বের জায়গাটাই তাঁর দুর্বোধ্য লাগে। কারণ নারী ও পুরুষ আলাদা। শরীরে আলাদা, মনে আলাদা, গুণপনা এবং শয়তানিতে আলাদা।

শুধু আলাদা নয়, সনকা বিশ্বাস করতেন— নারী পুরুষের থেকে সর্বাংশে উৎকৃষ্ট। সেবা, সংযম, সহনশীলতা, মায়ামমতা, লাবণ্য, ক্ষমা ইত্যাদি ভালোভালো গুণ তো ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের বেশিই, তার ওপর মেয়েরা সংসার ধরে রাখতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, এই পৃথিবীর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ, পবিত্রতম, মহত্তম কাজ যেটা সেটাও মেয়েরাই পারে। ছেলেরা পারে না।

মেয়েরা মা হতে পারে।

কোনও বাদ এসে স্রেফ সমান অধিকারের মুখ চেয়ে মেয়েদের এ সব অ্যাডভান্টেজ গুঁড়িয়েমিশিয়ে ছেলেদের সমান করে দিয়ে যাবে, এ সনকার সইত না। আর এমন ধ্বংসাত্মক বাদের যারা বাদী, এই ষড়যন্ত্রের যারা হোতা, সেই নারীবাদীদের দেখলে সনকার গা রি-রি করে জ্বলত।

*****

উদ্বাস্তু পরিবারের আট ভাইবোনের মধ্যে একজন ছিলেন সনকা। ছোট থেকেই মাথা পরিষ্কার ছিল, টপাটপ ফার্স্ট সেকেন্ড হয়ে পরীক্ষা পাস করতেন। বায়োলজি ছিল প্রিয় বিষয়, স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। বাবা বললেন, ‘আমি একজনকেই ডাক্তারি পড়াতে পারি,’ বলে সনকার সেজদার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। সনকা দমে গেলেন। সবাই সান্ত্বনা দিল, ডাক্তারি ছাড়াও মহৎ পেশা আছে। যেমন শিক্ষকতা। একদিক থেকে ডাক্তারের থেকে শিক্ষক হওয়া ভালো, কারণ শিক্ষকরা ডাক্তার তৈরি করতে পারে, ডাক্তাররা শিক্ষক তৈরি করতে পারে না। তাছাড়া, হিতৈষীরা গলা ঝাড়লেন, মেয়েদের পক্ষে স্কুলকলেজে পড়ানোর চাকরিটা একেবারে ফরমাশ দিয়ে বানানো। ধরাবাঁধা টাইম। ছুটিছাটা প্রচুর। স্বনির্ভরও হওয়া হল, সংসারও ভেসে গেল না।

পরামর্শটা সনকার মনে ধরল। তিনি স্থির করলেন গার্লস স্কুলের দিদিমণি হবেন। মেয়েদের গড়েপিটে আদর্শ নারী করে তুলবেন। মেয়েদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে নিঃসংশয় হলেও সনকা অনুভব করতেন মেয়েরা সে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুবিচার করতে পারছে না। আদর্শ নারীর যে চিত্রটা সনকার মাথায় আঁকা ছিল, বাস্তবের মেয়েরা সর্বদাই তার থেকে কম পড়ত। নিজের স্কুলের, পাড়ার সমবয়সী মেয়েদের অষ্টপ্রহর খিলখিল, ফিসফিস দেখলে সনকার গা রি রি জ্বলত। বরং তাঁর জমত ভালো ছেলেদের সঙ্গে। ছেলেদের সঙ্গে মেশার সুযোগ সনকার যে খুব ছিল তা নয়। তাঁদের আমলে ছেলেমেয়েতে অত মেশামেশি চলত না। কিন্তু সনকার বিশ্বাস ছিল যে তাঁকে কেউ বুঝলে ছেলেরাই বুঝবে। বিকেলবেলা পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে ঝাঁক বেঁধে বেড়াতে বেরোনোর থেকে সিগারেটের গন্ধমাখা, ব্রুস লি-র পোস্টারসাঁটা চিলেকোঠায়, যেখানে দাদা আর দাদার বন্ধুরা ক্যারাম পেটাত, বসে থাকা সনকা প্রেফার করতেন। তারা সনকাকে পাত্তা দিত না, তবে এঁচোড়ে পাকা, চশমা আঁটা, বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত গম্ভীর সনকাকে ঘরের কোণে বসে থাকতে দিতে আপত্তি করত না। ক্যারাম পেটাতে পেটাতে ক্রিকেট, ফুটবল, ভিয়েতনামের যুদ্ধ, কিউবার বিদেশনীতি নিয়ে আড্ডা চলত। সনকা মুগ্ধ হয়ে শুনতেন আর সিনেমার পোস্টারের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকা মেয়েগুলোর প্রতি করুণায়, তাচ্ছিল্যে, তাঁর হৃদয় আর্দ্র হত। কোনও কোনও বিকেলে সেই সব মেয়েদের মৃদুমন্দ কলকাকলি চিলেকোঠার ঘরে ভেসে এলে যখন ক্যারামের গুটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হত, সনকার সব রাগ গিয়ে পড়ত মেয়েগুলোর ওপর।

পড়াশোনা সাফল্যের সঙ্গে শেষ করে সনকা বালিকা বিদ্যালয়ে চাকরি নিলেন। ঘটক পাত্র নিয়ে এল। সরকারি চাকরি, নাক চোখ কান সব যেখানে থাকার সেখানে। হীরের টুকরো ছেলে, বলল সবাই। মাথার চুলটা একটু কম, কিন্তু চুলওয়ালা হীরে কে কবে দেখেছে। ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল। যথাসময়ে দুই ছেলেও হল। সনকা গোপনে হাঁপ ছাড়লেন। মেয়ে মানুষ করার শখ তাঁর স্কুলেই মিটে গিয়েছিল। সনকার স্বামী ভালো মানুষ ছিলেন, অফিসের কাজে দড় ছিলেন কিন্তু বাড়িতে জল না গড়িয়ে দিলে খেতে পারতেন না। ভোর সাড়ে চারটে থেকে ছেলেদের খাইয়ে পরিয়ে, চুল আঁচড়িয়ে, নিজের স্কুল সামলে, তাড়াতাড়া খাতা দেখে, স্বামীকে জলের গ্লাস মুখের সামনে ধরে দিয়ে রাত এগারোটায় শরীরের প্রতিটি বিন্দু শক্তি নিঃশেষ করে সনকা ঘুমোতে যেতেন। পাড়াপ্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন যে-ই দেখত বলত, দশভুজা। গর্বে সনকার বুক ফুলে উঠত।

কাজের জায়গায় কিন্তু সনকার সুখ ছিল না। যে আদর্শের মুখ চেয়ে তিনি বাকি সব মহত্তর পেশার মায়া কাটিয়ে গার্লস স্কুলে পড়াতে এসেছিলেন, সে আদর্শ সাধনে তাঁর বারবার বাধা পড়তে লাগল। সনকার ধারণা ছিল ছোটমেয়েরা কাদার তালের মতো, টিপেটুপে বকেঝকে আদর্শ নারীর আকার দিতে কোনও অসুবিধেই হবে না। কিন্তু দেখা গেল কাজটা অতটাও সোজা নয়। ছোট হলে কী হবে, সে সব মেয়েদের নিজস্ব ইচ্ছে অনিচ্ছে, ঠ্যাঁটামো টনটনে। ছোট ক্লাসের মেয়েদের সনকা দৌড়তে, চেঁচিয়ে কথা বলতে বারণ করতেন। সনকার কল্পনার আদর্শ নারীর চরিত্রের সঙ্গে ও সব খাপ খেত না। তারা সনকার সামনে ঘাড় ঝুঁকিয়ে হাঁটত, উল্টোদিকে ফিরলেই লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে, বক দেখিয়ে, এর ওর চুলের ঝুঁটি ধরে টানত। আরও সাঙ্ঘাতিক ছিল বয়ঃসন্ধিক্ষণের মেয়েরা। সারাদিন হিরোদের নিয়ে ফিসফাস, কিউবার রাষ্ট্রপতির নাম জিজ্ঞাসা করলে ফ্যালফ্যাল। তাছাড়া ওই বয়সেই কী রংঢং, কী ঠমকঠামক! সনকা যথাসাধ্য লড়াই চালিয়ে যেতে লাগলেন। কোনও ছাত্রীর চুল কপালের ওপর পড়লে স্টাফরুম থেকে কাঁচি এনে কুচ করে কেটে দিতেন, পেটিকোট ব্লাউজের মাঝখান থেকে চামড়া উঁকি মারলে অকুস্থলে ডটপেন চেপে ধরে ঘুরিয়ে দিতেন। তাছাড়া ক্রমে সনকার মনে সন্দেহ জাগল যে সেবা, ভক্তি, মাতৃত্বে বাজিমাত করলেও আই কিউতে সম্ভবত মেয়েরা ছেলেদের থেকে কমা। বিশেষ করে সায়েন্স বা অঙ্কের মতো বিষয়ে। কোচিং থেকে ফিরে সনকার ছেলেরা যখন নালিশ করত মেয়েগুলো স্রেফ গাঁতিয়ে বেশি নম্বর পেয়ে যাচ্ছে, অনাচারে সনকার মাথা ঝনঝন করত।

আদর্শ নারী তৈরির এই অবিরাম সংগ্রামে সহশিক্ষিকাদের থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা সনকা ত্যাগ দিয়েছিলেন। ক্লাস নেওয়ার সময়টুকু ছাড়া তাঁরা হয় শাড়িগয়নার চর্চা করতেন নয় শাশুড়ির নিন্দে। ওদিকে স্বামীর অফিসের পিকনিকে গিয়ে সনকা দেখেছেন স্বামীর সহকর্মীরা রাজনীতি, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, শেয়ার বাজার নিদেনপক্ষে ক্রিকেটের স্ট্যাটিসটিকস নিয়ে কেমন সুন্দর বোলচাল দেন। পিকনিক থেকে ফেরার পর কিছুদিন সনকা স্টাফরুমে খবরের কাগজের শেয়ারের পাতা কিংবা খেলার পাতা জোরে জোরে রিডিং পড়ে শিক্ষিকাদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন; ভস্মে ঘি ঢাললেও ওর থেকে বেশি কাজে দিত।

দিনে দিনে পরিস্থিতি খারাপতর হল। পুরনো দিদিমণিরা একে একে অবসর নিলেন, নতুনরা এসে স্টাফরুম ভরালেন। তাদের একজন, সনকা হতভম্ব হয়ে দেখলেন, সালওয়ার কামিজ আর খটখট আওয়াজতোলা জুতো পরে স্কুলে চলে এসেছেন। সনকা দিনদুয়েক দম বন্ধ করে রইলেন, তারপর হেডমিস্ট্রেসের কাছে গেলেন।

‘আপনি কিছু বলবেন না?’

হেডমিস্ট্রেস সনকাকে দেখেই নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলেন, আমতা আমতা করতে লাগলেন। মেয়েদের শিরদাঁড়ার অভাব সনকার মাথায় নতুন করে আগুন জ্বালাল। পরদিন স্টাফরুমে জোরে জোরে বললেন, ‘যারা সুস্থরুচিসম্মত পোষাক পরতে জানে না, তারা আবার পড়াবে কি?’ নতুন শিক্ষিকাটি ঘুরে দাঁড়াল। স্টাফরুমশুদ্ধু শিক্ষিকার হৃদপিণ্ড গলার কাছে ধকধক করতে লাগল। সনকাকে তাঁরা দু’চক্ষে দেখতে পারতেন না কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস পাননি কোনওদিন। ‘আমার পোশাকটা পড়ায় না সনকাদি। মাথাটা পড়ায়।’ বলে তর্জনী দিয়ে টকটক করে নিজের মাথায় টোকা মেরে মুচকি হেসে খটখট আওয়াজ তুলে বেরিয়ে গেলেন নতুন দিদিমণি।

রিটায়ারমেন্টের পর এ যমযন্ত্রণা ফুরোল। ছেলেরা যে যার মতো বিয়েথা করে সংসার করতে চলে গেল। পুত্রবধূরা সনকাকে হতাশ করল। মেয়েদের থেকে হতাশা ছাড়া আর কিছু পাওয়ার আশা সনকা অনেকদিন আগে ত্যাগ দিয়েছিলেন কাজেই বাড়তি বিস্মিত হলেন না। কিছুদিন পর তাঁর হীরের টুকরো স্বামী জীবনে দ্বিতীয় এবং শেষবার রজনীগন্ধার মালা পরে ট্রাকের মাথায় শুয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।

সনকা আবিষ্কার করলেন তাঁর আর কোনও কাজ নেই। কাউকে গড়াপেটার নেই। দশভুজা হওয়ার কোনও সুযোগ নেই।

চব্বিশঘণ্টা সনকার অনন্ত ঠেকতে লাগল, একেকটা দুপুর যেন একেকটা যুগ, বিকেল যেন ফুরোতেও চায় না। ঝাড়িয়েমুছিয়ে সনকা বাড়ির ছালচামড়া তুলে ফেললেন, কাচিয়ে কাচিয়ে জামাকাপড়ের রোঁয়া তুলে ফেললেন, অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তিনমাসে তিনজন কাজের মেয়ে পালাল, তবু তাঁর সময় ফুরোল না।

সনকা নানাভাবে সময় কাটাতে চেষ্টা করলেন, খবরের কাগজ এমাথা থেকে ওমাথা মুখস্থ করে ফেললেন। মাঝেমাঝে টিভি দেখতে বসতেন, কিন্তু মোটরবাইক থেকে শুরু করে কনডোম থেকে শুরু করে সবেতে মেয়েশরীরের এমন উন্মুক্ত যৌনতা, এমন খুল্লমখুল্লা প্যারেড দেখলে তাঁর মাথা ঘুরত। এরা সব কোন বাড়ির মেয়ে ভেবে তিনি কূল পেতেন না। এ সব মেয়েদের চাবকে সিধে করায় বাবাদাদার অক্ষমতায় সনকা না হয় বুঝতে পারতেন, আফটার অল, তাঁরা পুরুষ। কিন্তু মায়েরা? মায়ের জাতের এই রকম অধঃপতন দেখেও কোন ধরনের মায়েরা চুপ করে থাকতে পারে, ভেবে ভেবে সনকার মাথা ভোঁ ভোঁ করত।

সনকা এমনিতে সিনেমানাটকের ধার ঘেঁষতেন না, ছেলেদের রেকোমেন্ডেশনে একটা সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন, একজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর জীবনী। বিজ্ঞানীর থেকেও সনকার মনে দাগ কেটেছিলেন বিজ্ঞানীর স্ত্রী। স্ত্রীর নামধাম কিছুই মনে নেই সনকার, কিন্তু সেগুলো জরুরি নয়। জরুরি হচ্ছে স্ত্রীর সহ্যশক্তি এবং স্বামীর জন্য আত্মত্যাগ। পাগল স্বামী বাচ্চাকে বাথটাবের জলে ডুবিয়ে মারতে যাওয়ার পরও স্বামীকে ছেড়ে না যাওয়া। এত আত্মত্যাগের ফল শেষে ফলল তো? সিনেমার শেষ দৃশ্যে যখন বিজ্ঞানী মঞ্চে পুরস্কার নিতে উঠলেন, সারা হল বিজ্ঞানীর দিকে তাকিয়ে, ক্যামেরা বিজ্ঞানীর দৃষ্টি অনুসরণ করে সেই সর্বংসহা নারীর মুখের ওপর থামল। নারীত্বের গর্বে সনকার বুক দশ হাত ফুলে উঠল।

বিহাইন্ড এভরি সাকসেসফুল ম্যান দেয়ার ইজ আ উওম্যান।

সনকার দৃষ্টি আপসে চলে যেত দেওয়ালে ঝোলানো প্লাস্টিকের রজনীগন্ধার মালা পরানো ছবির দিকে। মেয়েগুলো না হয় গাঁতিয়ে আর রংঢং করে তাঁর ছেলেদের উন্নতিতে বাগড়া দিল, কিন্তু স্বামীও তো বিশেষ সুবিধে করতে পারলেন না। অথচ সম্ভাবনা তো ছিল। বিয়ের আগে হীরের টুকরোফুকরো কত কিছু বলেছিল লোকে। ফ্রেমের ভেতর থেকে কাষ্ঠহাসি হেসে তাকিয়ে থাকা টেকো স্বামীর দিকে তাকিয়ে সনকার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসত। তাঁর জীবনের পুরুষদের মহত্বের দ্বারে তিনি পৌঁছে দিতে পারলেন না কেন? ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোই কেন তাঁর সার হল? তবে কি তিনি কি আদর্শ নেপথ্য-নারী নন?

*****

ক্রিং ক্রিং ক্রিং!

‘হ্যালো, পিসি? কেমন আছ?’

সনকার ভাইঝি। মাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করেছিল, সনকাশুদ্ধু সব আত্মীয়স্বজন ভেবেছিল মেয়ে অ্যামেরিকায় সেটল করবে। যথারীতি হতাশ করেছে। কলকাতার কোন একটা এনজিও-তে চাকরি করে।

সনকার হাঁটু, শিরদাঁড়া, আর ঘাড়ের ব্যথার খবর নিয়ে, নিজের ছেলের ইংরিজি মিডিয়ামের ক্লাস ফাইভের সিলেবাসের চাপের খবর দিয়ে ভাইঝি বলল, ‘হ্যাঁ পিসি, যে জন্য ফোন করেছিলাম।’

ভাইঝির বরের চেনা কোন কোটিপতি বন্ধু সাঙ্গোপাঙ্গদের সঙ্গে মিলে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ খুলেছে। কলেজে এক প্রফেসরের প্রাইভেট সেক্রেটারির পদ খালি হয়েছে। সনকা যেহেতু একাকিত্বের অভিযোগ করছিলেন, ভাইঝি সনকার নাম প্রস্তাব করেছে।

সনকা হাঁ হয়ে গেলেন। প্রাইভেট সেক্রেটারি? প্রাইভেট সেক্রেটারির চাকরি তাঁকে অফার করছে ভাইঝি? তাঁকে এতদিন ধরে চেনা সত্ত্বেও? তাঁর ক্ষমতা, যোগ্যতা সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও? রং মেখে যে সব মেয়েরা বসের দরজার বাইরে বসে থাকে আর ফোন ধরে তাদের নিয়ে সনকা চিরদিন সংশয়ে ভুগেছেন। চেয়ারটেবিল ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারেননি।

ভাইঝি সনকাকে শান্ত করল। এ সেক্রেটারি সে সেক্রেটারি নয়। রিসেপশনে বসে যার তার সঙ্গে কথা বলতে হবে না। আলাদা ঘর থাকবে। প্রফেসরের ক্লাস, টিউশন আওয়ার্স, কনফারেন্স ইত্যাদি গুরুতর বিষয়ের দেখাশোনা করার জন্য একজন দায়িত্বশীল মানুষ চাই। রীতিমত সম্মানজনক ব্যাপার।

‘তোমার বাঁয়ে হাত কা খেল, পিসি।’

সনকা নরম হলেন। প্রফেসরের নামধাম সিনিয়রিটি জানতে চাইলেন। তাঁর থেকে বয়সে ছোট খোকাখুকুর, সে যতই নামের আগে প্রফেসর থাকুক, অঙ্গুলিহেলনে উঠতেবসতে পারবেন না তিনি।

‘খুব বিখ্যাত প্রফেসর, পিসি। এরা অনেক টাকা খরচ করে, অনেক ঝুলোঝুলি করে এক সেমেস্টারের জন্য এনেছে। প্রফেসর বারিদবরণ চট্টোপাধ্যায়। বিবিসি বলে অনেকে, তুমি নাম শুনেছ কি না জানি না।’

শুনেছেন সনকা। দেখেওছেন। কারণ বিবিসিকে না দেখেশুনে থাকা অসম্ভব। লাইমলাইটের আড়ালে আজীবন ঘাপটি মেরে থেকে জ্ঞানের সাধনা চালিয়ে যাওয়া শুকনো প্রফেসরদের মধ্যে পড়েন না বিবিসি। দেশবিদেশের কনফারেন্সে নিত্য ঘোরাঘুরির সঙ্গে সঙ্গে শারদসম্মানের জাজ হিসেবে কাঁথা স্টিচের ধুতিপাঞ্জাবি পরে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলেও ভিজিট দেন ফি বছর। হাউসিং-এর ভাসানে তাঁর ধুতি পরে ধুনুচি নাচের ভিডিও পর্যন্ত ভাইরাল হয়েছে। টিভি চ্যানেলের গেম শো-তে অতিথি হয়ে এসে নিয়মিত খেলা দেখেন, যার সুবাদে তাঁর প্রিয় বিরিয়ানির দোকানের নাম থেকে শুরু করে প্রথম চুম্বনের দিনক্ষণ, সারা বাংলাদেশের কারও জানতে বাকি নেই।

সনকা রাজি হয়ে গেলেন।

*****

সেদিন সকাল থেকে বৃষ্টি থামল না। রাস্তায় জ্যাম; প্রতি সিগন্যালে ট্যাক্সি দাঁড়াচ্ছিল। সনকা আশ্বস্ত হচ্ছিলেন। একটা গুরুতর কিছু যেন ঘটতে চলেছে, যার জন্য সনকা যথেষ্ট প্রস্তুত নন। শহর ফুরিয়ে ফাঁকা রাস্তায় মিনিট কুড়ি চলে খাঁখাঁ মাঠের মাঝখানে ধপধপে ইমারত ভেসে উঠল। দারওয়ানশোভিত গেট পেরিয়ে, পিচরাস্তায় বাঁক নিয়ে ট্যাক্সি দাঁড়াল। ঘুরন্ত দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন সনকা। চড়া এসিতে শিরদাঁড়া কেঁপে উঠল। দেওয়াল, মেঝে, সিলিং-এর আড়ালে লুকোনো নরম আলোর মায়াবী পরিবেশ। দেওয়াল ঘেঁষে সারি সারি হাতপাখা পামগাছ।

নিজের স্কুলের রংচটা স্টাফরুম আর চুনখসা বাথরুমের ছবি মাথা থেকে ঠেলে সরিয়ে রিসেপশনের দিকে এগোলেন সনকা। সুগন্ধী, সুবেশা মেয়েটি টুকটুকে ঠোঁট ছড়িয়ে লিফটের অবস্থান চিহ্নিত করল। তিনতলায় উঠে ডানদিকের করিডর ধরে হেঁটে গেলেই স্যারের রুম। বাইরে নেমপ্লেট আছে। স্যার এখনও আসেননি, সনকা যেন অ্যান্টিচেম্বারে অপেক্ষা করেন।

চেম্বারটি দেখে সনকা খুশি হলেন। সম্ভবত এটিই তাঁর অফিস হবে। কাঁচটপ টেবিলের ওপারে গদিআঁটা চেয়ার। দেওয়ালে জলরং নিসর্গদৃশ্য, শেলফে মানিপ্ল্যান্ট। লাগোয়া বড় ঘরটির দরজা ঠেলে উঁকি দিলেন সনকা। ঘর, টেবিল, দেওয়ালের পেন্টিং, গাছ সবই বাইরের ঘরটির অনুপাতে বড়, সঙ্গে গাদাগাদা বই। বুকশেলফে, টেবিলে, অগোছালো, এলোমেলো জমে উঠেছে। ঘরটি যেন আপনভোলা সাধকের সাধনাকক্ষ।

নিজের ঘরে ফিরে এসে সনকা টের পেলেন ঘরটিতে তাঁর শিকড় অলরেডি চারিয়ে যেতে শুরু করেছে। চল্লিশ বছর ধরে স্কুলের স্টাফরুমের কোণের চেয়ারটির প্রতি যত না, তার থেকে ঢের বেশি আত্মিকতা তিনি অনুভব করছেন পেন্টিং আর পাম গাছে ছাওয়া এই ছোট্ট ঘরটির চেয়ারটির প্রতি। গভীর শ্বাস নিয়ে ঘরের একটিমাত্র জানালার দিকে এগিয়ে গেলেন সনকা।

পরের ছ’মাসে সনকা অসংখ্যবার ওই জানালার সামনে দাঁড়াবেন। সবুজ মাঠ দেখবেন, মাঠভরা ছাত্রছাত্রী, মাঠ-পাঁচিলের সীমানায় চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, নয়নতারার ওপর ঝুঁকে পড়া ইউনিফর্মের নীল পিঠ দেখবেন। কিন্তু তাঁর জীবনের এই দ্বিতীয়, সংক্ষিপ্ত এবং রোমহর্ষক কেরিয়ারটির কথা যখনই সনকার মনে পড়বে, প্রথম দিন জানালা দিয়ে দেখা ওই দৃশ্যটির কথাই মনে পড়বে। জলচকচকে পিচপথ বেয়ে এগিয়ে আসা সাদা রঙের গাড়ি, গাড়ি থেকে নামা মাথার ওপর খবরের কাগজের আড়াল করে মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা দীর্ঘ শরীরের আভাস।

পাঁচ মিনিট পর দরজা ঠেলে ঢুকে সনকাকে দেখে থতমত খেলেন ভদ্রলোক। ছ’ফুট পার করা টানটান শরীর, কপাল ঢাকা সাদাকালো চুল। কালো ফ্রেমের চশমার ওপারে উজ্জ্বল চোখ। খাড়া নাক। একমুখ দাড়ি। দাড়ির আড়াল থেকে হাসি ফুটে উঠল, সনকার দেবশিশুর কথা মনে এল।

‘মিসেস সেন?’

ভেজা হাত বাড়িয়ে বিবিসি সনকার দুই হাত ধরলেন। ঝাঁকাতে লাগলেন জোরে জোরে। আর সনকা টের পেলেন মুহূর্তটা তাঁর জীবনকে পরিষ্কার দু’ভাগে ভাগ করে দিচ্ছে।

*****

সেমেস্টার শুরু হল। নতুন ছাত্রছাত্রীরা এল, ক্লাস শুরু হল, গার্জেনরা এল। কোকাকোলায় বরফের মতো সনকা তাঁর নতুন জীবনে মিশে গেলেন। ছাত্রছাত্রীদের ধমকে, গার্জেনদের চমকে সনকার দিনরাত আলো হয়ে উঠল। কলেজে আসার তর সইত না। শনিরবি বাড়িতে মন টিকত না। রাতে ঘুমিয়ে সনকা তাঁর চেয়ারটেবিল, পাম গাছ এবং পেন্টিং-এর স্বপ্ন দেখতেন। চান করতে করতে সনকা গুনগুন করতে লাগলেন, রাস্তার ভিখিরি বাচ্চাদের দেখে জীবনে প্রথম সামান্য কষ্টও হতে লাগল।

বলা বাহুল্য, সনকার চানঘরে গানের মূলে পাম ট্রি বা পেন্টিং ছিল না। বিবিসিকে যত দেখতেন তত অবাক হয়ে যেতেন সনকা। এত বিখ্যাত একজন মানুষ, এত সফল, অথচ দিনের মধ্যে পাঁচবার পেন হারিয়ে ফেলেন, ছাত্রছাত্রীদের টাইম দিয়ে ভুলে যান, সনকা না মনে করিয়ে দিলে কনফারেন্সের ডেট গোলমাল করে ফেলেন।

ঝড়ে পড়া পাখির মতো বিবিসিকে সনকা বুকে তুলে নিলেন। বিবিসি হাঁ করার আগে পেন আঙুলে পৌঁছে যেত, বক্তৃতার খসড়া টাইপ হয়ে যেত, খবরের কাগজে ছাপা দেশিবিদেশি ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে বিবিসির করমর্দন বা অট্টহাস্যরত ক্যান্ডিড ক্যাপচার ফ্রেমবদ্ধ হয়ে ঝুলে যেত অফিসের দেওয়ালে।

সনকার প্রত্যাশা বেশি ছিল না, কিন্তু বিবিসি কৃপণ ছিলেন না। অফিসে দেখা করতে আসা বন্ধুবান্ধব, সহ-অ্যাকাডেমিশিয়ানদের সমক্ষে উচ্চৈঃস্বরে কবুল করতেন, মিসেস সেন না থাকলে কী যে হত। দেশবিদেশের কনফারেন্স থেকে সনকার জন্য উপহার এনে দিতেন। প্যারিস থেকে নিয়ে এলেন নীল গোলকের ভেতর গাউন পরা মেয়ে আর সুট পরা ছেলের যুগলমূর্তি। সুইচ টিপে দিলে টুংটাং বাজনার সঙ্গে তারা ঘুরতে থাকে আর গোলক জুড়ে মোলায়েম বরফপাত হয়।

বিবিসি যখন গোলকখানা তাঁর হাতে তুলে দিলেন জানালার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন সনকা। অথচ বাইরে মেঘ করেছিল না রোদ উঠেছিল পরে অনেক ভেবেও মনে করতে পারেন না তিনি। তাঁর শরীরের দু ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে চশমার ডাঁটিটা ঘোরাতে ঘোরাতে আনমনা কণ্ঠে বিবিসি বলেছিলেন, ‘আমার সহকারী হিসেবে একজন পরিণত নারীকেই যেন নিয়োগ করা হয়, এটা আমি স্পেসিফিক্যালি রিকোয়েস্ট করেছিলাম। কেন বলুন তো মিসেস সেন?’

সনকার জিভ প্লাস্টার অফ প্যারিস, হৃদপিণ্ড ঢেঁকি।

‘কারণ আজকালকার মেয়েরা স্রেফ মেয়ে হয়ে থেকে যায়। আমাদের যুগের মেয়েরা নারী হতে জানত।’

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে জানালার কাঁচ নামিয়ে ভিখিরি বাচ্চার হাতে পাঁচটাকার একটা কয়েন ফেলে দিলেন সনকা।

*****

পুরোটাই অবশ্য নিষ্কণ্টক ছিল না। সনকা লক্ষ করেছিলেন, বিবিসি যত মনোযোগ সনকাকে দেন ততটাই দেন নিচের তলার অর্ধশিক্ষিত রিসেপশনিস্টগুলোকেও। যাতায়াতের পথে হাত নাড়েন, চোখ মটকান, মাঝে মাঝে রিসেপশনে কনুই রেখে গল্পও জোড়েন। ভেনিসের গন্ডোলায় চড়ে যাওয়ার সময় ইতালিয়ান ললনার তাঁকে দেখে হাত নাড়ার গল্প শুনে নির্লজ্জ মেয়েগুলো খি খি গড়িয়ে পড়ে। ঘরে ছাত্রীরা দেখা করতে এলেও আবহাওয়ায় সন্দেহাতীত বদল টের পেতেন সনকা, যেটা ছাত্ররা এলে ঘটত না। বিবিসি বেশি বেশি হাসতেন, ছাত্রীদের কাঁধে হাত রাখতেন। বাতাসে একটা ফুর্তি ভেসে বেড়াত।

ব্যাপারটা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হত ওই মেয়েটা এলে। মেয়েটাকে সনকা প্রথম থেকেই লক্ষ করেছিলেন। না করে উপায় ছিল না। মেয়েটা চিৎকার করে কথা বলত, হা হা করে হাসত, কথার মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে নোংরা গালিগালাজ গুঁজে দিত। লজ্জাশরম বলে কোনও বস্তু ছিল না, ছেলেদের গা ঘেঁষাঘেঁষি করত অবলীলায়। মেয়েটার টপের আঁটোত্ব দেখে সনকার মুখে থুতু জমত, স্কার্টের ঝুল দেখে ইচ্ছে হত টেনে থাপ্পড় কষানোর।

মেয়েটা সনকাকে দেখেনি সম্ভবত। অন্য ছাত্রছাত্রীরা, বিশেষ করে ছাত্রীরা সনকাকে সমঝে চলত। স্যারের ঘরে যাওয়ার আগে তাঁর পারমিশন নিত। সনকা খুশি হতেন। কটমটিয়ে তাকাতেন, মেয়েগুলো কুঁকড়ে যেত।

ওই মেয়েটা যেত না। মাথা উঁচু করে গটগটিয়ে ঢুকে যেত। সনকা যখন প্রথমদিন, ‘অ্যাই, অ্যাই, কোথায় যাচ্ছ?’ বলে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠেছিলেন, থমকে কান থেকে ইয়ারফোন টেনে নামিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়েছিল। যেন সনকা একটা চেয়ার কিংবা টেবিল, দেওয়ালের ওই ছবিটা কিংবা কোণের পামগাছ, হঠাৎ জ্যান্ত হয়ে উঠে কথা বলতে লেগেছেন।

‘সোজা ঢুকে যাচ্ছ যে? অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?’

‘আসতে দিন, মিসেস সেন। অসুবিধে নেই।’ বিবিসির গলা এসেছিল ঘরের ভেতর থেকে।

চুল ঝাঁকিয়ে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল মেয়েটা।

তার পর থেকে যখনতখন আসত। সনকার দিকে দৃকপাত না করে ঢুকে যেত বিবিসির ঘরে। অন্য ছাত্রছাত্রীরা থাকাকালীন দেওয়ালের ওপার থেকে বিবিসির প্রশংসা কিংবা তিরস্কার ভেসে আসত, সে রকম কিছুই শোনা যেত না মেয়েটা ঘরে থাকার সময়। সনকা প্রাণপণ কান খাড়া রেখেও শুনতে পাননি। ক্বচিৎকদাচিৎ চাপতে চেয়েও উপচে পড়া হাসির শব্দ, ব্যস।

বাকিরাও লক্ষ করেছিল। দুজনের পাশাপাশি দাঁড়ানোর মাঝখানের সামান্য ফাঁকটুকু যেন তড়িৎস্পৃষ্ট, একে অপরের দিকে তাকানোর মধ্যে যেন অনেকটা গোপনীয়তা। রিসেপশনের মেয়েগুলো ঠোঁট বাকিয়ে নিজেদের মধ্যে ভ্রুভঙ্গি করত, সনকা শিহরিত হতেন।

নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে পরীক্ষা যখন ঘাড়ের ওপর, অফিস আওয়ার্স উপচে পড়ছে ছাত্রওছাত্রীর উৎকণ্ঠিত ভিড়ে, শীতের ছুটিতে বস্টন আর সুইটজারল্যান্ড আর নিউজিল্যান্ড আর পাপুয়া নিউগিনিতে টক দেওয়ার নেমন্তন্নে বিবিসির বোঝাই ইনবক্স সামলাতে সনকা যখন গলদঘর্ম কিন্তু আবার তৃপ্তিতে টইটম্বুর, এমন সময় একদিন ভারি বুটের আওয়াজে করিডর ছেয়ে গেল। বাড়তে বাড়তে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল ঘরে। সাদা ইউনিফর্ম কালো বেল্ট আঁটা পুলিস, সনকার দিকে তাকালও না।

কলেজশুদ্ধু লোকের হতভম্ব চোখের সামনে দিয়ে বিবিসিকে ভ্যানে তুলে নিয়ে চলে গেল পুলিসগুলো। আধঘণ্টা পর চ্যানেলে চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ চমকাল।

ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে ধৃত শহরের প্রথিতযশা প্রফেসর।

*****

বাংলার সমাজ, সংস্কৃতিমহল, মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিস্ফোরণ হল। অনেক সওয়াল জবাব হল, অনেক কাদাছোড়াছুঁড়ি, অনেক কুশপুত্তলিকাদাহ, অনেক চরিত্রহনন। চ্যানেলে চ্যানেলে প্যানেল বসল। শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের নিরাপত্তার দাবি নিয়ে মিছিল বেরোল, স্লোগান লেখা হল। যে নারীবাদীরা পত্রপাঠ ঘৃণায় ছিটকে উঠলেন তাঁরা গুড নারীবাদী এবং যারা সিদ্ধান্তে আসার আগে ঘটনার সত্যাসত্য বিচারের দাবি করলেন তাঁরা ব্যাড নারীবাদী হিসেবে খ্যাত হলেন। শিক্ষাজগতে আর কারা কারা এইরকম সব আচরণ করেই আসছেন তাদের নামের লিস্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় ছাড়া হল। বহুদিন ধরে যারা মুখ বুজে ছিলেন, মুখ খুললেন। তাঁদের সবাই চেপে ধরলেন, এতদিন বলেননি কেন?

এ সব নরকের কীটের প্রত্যঙ্গছেদন করা উচিত মর্মে পোস্টে লাইক পড়ল সাতশো ঊনপঞ্চাশ, নাইটক্লাবে বিয়ারের বোতল হাতে নিয়ে মেয়েটার জিভ বার করা ছবির নিচে ‘এক হাতে তালি বাজে না’ ক্যাপশন দেওয়া ছবিতে লাইক পড়ল এগারোশো তেতাল্লিশ। ছশো সতেরোটা লাইক দুটো ছবিতে কমন বেরোল।

বিবিসির সহকর্মী সহগবেষক ছাত্রছাত্রীরা কেউ বলল, ‘নো কমেন্টস,’ কেউ বলল, ‘সভ্য দেশ হলে স্ল্যান্ডারিং-এর জন্য জেল খাটতে হত,’ কেউ বলল, ‘কই আমাদের সঙ্গে তো হয়নি।’

যেটা সকলেই বলল, ‘ইউ ক্যান নট ইগনোর দ্যাট ম্যান’স ব্রিলিয়ান্স।‘

শুধু সনকা মুখ বুজে রইলেন। তাঁর আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, চেনাপরিচিত, যারাই সনকার নতুন চাকরির কথা জানত, সকলেই ‘ভেতরের খবরে’র আশায় খোঁচাখুঁচি চালিয়ে ব্যর্থ হল। ভাইঝি অ্যাপোলোজেটিক হয়ে বলল, ‘কী করে বুঝব বলো পিসি, তোমাকে এইসব নোংরামোর মধ্যে পড়তে হবে, ছি ছি ছি।’ সনকা চুপ করে রইলেন।

সবাই বলল,‘শক। কয়েকদিন সময় দাও, কেটে যাবে।’

অনিদ্রার সমস্যা সনকার কোনওদিন ছিল না। সনকা যদিও দাবি করতেন কেরামতিটা তাঁর ঝকঝকে বিবেকের, সত্যিটা হচ্ছে যে সারাজীবন বাড়িতে আর বাইরে গাধার মোট বওয়ার পর ঘুমোনো ছাড়া সনকার শরীরের আর কোনও উপায় থাকত না।

সেই সনকা রাতের পর রাত অন্ধকার সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে কাটাতে লাগলেন।

কলেজের সকলেই, মেয়েটির সঙ্গে বিবিসির সম্পর্ক স্বীকার করল। বিবিসি সাক্ষাৎকারে বললেন, ‘আমি ওর প্রতি সহানুভূতিশীল। ওই বয়সের ছেলেমেয়েদের প্রচুর মানসিক বিচলন ঘটে, ওর যদি সাহায্যের দরকার হয় আমি সবসময় আছি।’

ধর্ষণ প্রসঙ্গ উঠতে বিবিসি বললেন, ‘অভিযোগটা অস্বীকার করতেও আমার সম্মানে বাধছে। আমার ছাত্রছাত্রীরা আমার সন্তানের মতো।’

আরেকটি চ্যানেল মেয়েটিকে নিয়ে এল। ফোন করে দর্শকেরা জানতে চাইলেন, বিবিসির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল কি? মেয়েটি কি বিবিসির তার প্রতি আকর্ষণ বুঝতে পারেনি? পেরে থাকলে সেটা প্রতিরোধের জন্য মেয়েটি কী ব্যবস্থা নিয়েছিল?

মেয়েটার চোখের কোণের কালি, ঝোঁকা কাঁধ, শূন্য দৃষ্টি সনকার চোখ এড়াল না। মেয়েটা দুমড়ে গেছে। সনকা টের পেলেন, এই প্রথম মেয়েটার প্রতি তাঁর মন দ্রব হয়ে আসছে।

মিডিয়া মিডিয়ার কাজ করতে লাগল, পুলিস পুলিসের। ইউনিভার্সিটিতে বিবিসির ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ থেকে তিনি যে বাদ পড়বেন না সনকা জানতেন। যথাসময়ে পুলিস এল।

সনকাকে দেখে পুলিসেরও ভরসা জাগল। ঘটনার প্রমাণ এবং প্রত্যক্ষদর্শী না থাকায় গোটা তদন্তটাই তাঁদের দেখা, শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে চালাতে হচ্ছিল। লোকজনের সাক্ষ্যের থেকে তার অন্তর্নিহিত স্বার্থ আলাদা করা, দুধ থেকে জল আলাদা করা। সনকার দৃঢ় চিবুক, চাপা ঠোঁট, সোজা শিরদাঁড়া তাঁদের ভরসা জাগাল।

সনকা পুলিসের প্রশ্ন মন দিয়ে শুনলেন। বললেন, আমি মেয়েটিকে দেখে থাকলেও চিনতাম না, কাজেই ওর সম্পর্কে আমি কোনও মন্তব্য করব না, কিন্তু প্রফেসর বারিদবরণ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে গোটা একটা সেমেস্টার কাজ করার পর আমি এইটুকু বলতে পারি, এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি বিশ্বাস করি না এ ধরনের কোনও ঘটনা ঘটতে পারে বা ঘটেছে।

*****

যারা বলে স্বপ্ন সাদাকালো হয়, ভুল বলে। শেষ নভেম্বরের বিষণ্ণ নীল বিকেলে সবুজ মাঠের মাঝখান দিয়ে কালো পিচরাস্তার ওপর হাঁটছেন সনকা। সনকার চামড়া রং চটিতে শুকনো পাতা ঠোক্কর খাচ্ছে। গালে একফোঁটা জল পড়াতে সনকা মুখ তুললেন। চশমার কাঁচে আরেক ফোঁটা জল পড়ল। আকাশের রংটা এর মধ্যে নীল থেকে কালো হয়ে গেছে।

ছাতাটা তো ব্যাগেই ছিল। জোরে পা চালিয়ে ফিরলেন সনকা। রিসেপশন খালি। ফাঁকা হলে এসি আরও চড়া লাগছে। করিডরের মার্বেলে আলোর প্রতিবিম্বের ওপর পা ফেলে সনকা অফিসঘরে ঢুকলেন।

ওই তো ছাতা। সকালে আসার সময় বৃষ্টি হচ্ছিল, চেয়ারের পেছনে আড়ালে শুকোতে দিয়েছিলেন। এগোতে যাবেন, পাশের ঘর থেকে হাসি ভেসে এল। রমণীয় হাসি।

সনকা থেমে গেলেন। তিনি বেরোনোর সময় ও ঘরে বিবিসি একা ছিলেন।

হাসিটা থেমে গেল।

নড়াচড়ার শব্দ।

‘স্যার কী করছেন! হোয়াট দ্য হেল ডু ইউ থিঙ্ক ইউ আর ডুয়িং?!’ প্রশ্নের শেষদিকটা আতঙ্ক মেশামেশি হয়ে গেল।

একটা চড়ের শব্দ।

কয়েক সেকেন্ড সমস্ত নিস্তব্ধ। তারপর একটা চাপা গর্জন আরেকটা আর্তনাদ ডুবিয়ে দিল। সম্ভবত একটা চেয়ার উল্টে পড়ল, একগাদা বই ছিটকে গেল। ধস্তাধস্তি। একটা চিৎকারের মুখে কেউ হাতচাপা দিয়েছে। কিল চড় ঘুঁষি, একের পর এক আঘাত।

‘চড় মারবি আমাকে? আমাকে চড় মারবি? রেন্ডি…’

গলাটা কাঁপছে। সশব্দ, ভারি শ্বাসপ্রশ্বাস। একটা কিছুর পায়া ঘষা খাচ্ছে মেঝেতে।

গোঙানিটা একসময় কান্নায় বদলাল। শ্বাসপ্রশ্বাস ধীরে হয়ে আসছে।

‘শাট আপ। কান্নার কী আছে?’

সনকা থরথর করে কাঁপছেন। মানুষের মন বিচিত্র, এই ভয়াবহতার মধ্যেও ছাতার কথা ভুলতে দেয়নি। ছাতা নিয়ে, যত নিঃশব্দে সম্ভব বেরিয়ে যাচ্ছেন তিনি ঘর থেকে। যত দ্রুত পালানো সম্ভব এই দুঃস্বপ্ন থেকে।

অন্ধকার ঘরে চোখ খুললেন সনকা। গলা শুকিয়ে চড়চড় করছে। সারা শরীর পাথর। কেবল চোখ দিয়ে জল পড়ছে। গত কয়েকমাস ধরে তাঁর অস্তিত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ধরে এই একই দুঃস্বপ্নের থেকে পালাতে পালাতে তিনি ক্লান্ত।

কিন্তু সনকা জানেন, পালানোর উপায় নেই। কারণ স্বপ্ন থেকে পালানো সম্ভব, যা স্বপ্ন নয়, আদ্যন্ত বাস্তব, তার থেকে তিনি পালাবেন কোথায়?

*****

বছরখানেক পর টিভির পর্দাজোড়া একখানা মুখ দেখে সনকার আঙুল রিমোটে থমকে গেল। কপালঢাকা অবিন্যস্ত কাঁচাপাকা চুল, একমুখ দাড়ি, চশমার আড়ালে জ্বলজ্বলে চোখ, দাড়ির ফাঁকে দেবশিশুর মতো হাসি। নেপথ্যে ঘোষকের উত্তেজিত গলা।

প্রফেসর বারিদবরণ চট্টোপাধ্যায় গবেষণায় মৌলিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। দেশের রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী, রাজ্যপাল সকলেই অভিনন্দন জানিয়েছেন। চ্যানেল থেকে তাবড় তাবড় কৃতী ব্যক্তিত্ব, অভিনেতা, রাজনীতিবিদ, নৃত্যশিল্পীদের ফোন করে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হচ্ছে। খারাপ কানেকশনের চ্যাঁ চো আওয়াজের মধ্য দিয়ে তাঁরা জানাচ্ছেন, ‘আজ আমাদের গর্বের দিন, উৎসবের দিন। প্রফেসর চট্টোপাধ্যায় আমাদের রাজ্যের, আমাদের দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।’

‘ইউ ক্যান নট ইগনোর দ্য ব্রিলিয়ান্স অফ দ্যাট ম্যান।’

সনকা তাকিয়ে রইলেন। এক বছর আগে সনকাকে একটা পরীক্ষায় বসতে হয়েছিল। মালটিপল চয়েস কোয়েশ্চেন। একটা মেয়ের জীবনের সাড়ে সাত মিনিট, আর একজন প্রথিতযশা প্রফেসরের সারা জীবনের সাধনা, সংবর্ধনা, উত্তরীয়, শারদসম্মানের ডিজাইনার ধুতি, ধুনুচিনাচের ভাইরাল ভিডিও, অ্যাকাডেমিক ব্রিলিয়ান্স।

কোনটা ইগনোর করবেন সনকা? কোনটা বাছবেন?

ঠিক বেছেছিলেন কি না, সে সংশয়ে সনকা গত একবছর ধরে দীর্ণ হয়েছেন। দু চোখের পাতা এক করতে পারেননি।

অবশেষে ফল বেরিয়েছে।

সনকা ঠিক উত্তর বেছেছেন। সনকা একশোয় একশো।

পর্দায় বিবিসির পাড়ায় বিজয়মিছিল। বিবিসির সংস্পর্শে যারা এসেছেন, তাঁর সঙ্গে ক্যারাম খেলার সুবাদে, তাঁর বাড়ির সামনে দিয়ে রোজ বাজার যাওয়ার সুবাদে, দলে দলে মিছিলে যোগ দিয়েছেন। চিৎকার করে বলছেন, আমাদের দেশের, আমাদের রাজ্যের, আমার ভাষার সন্তানের এই সাফল্যে আমরা অভিভূত উচ্ছ্বসিত গর্বিত।

এরা কেউ জানে না, কোনওদিন জানবে না, প্রফেসর বারিদবরণ চট্টোপাধ্যায়ের এই জগৎজোড়া সাফল্যে সনকা সেনের নিশ্চিত অবদান আছে। এক বছর আগে সনকা ভুল উত্তর বাছলে, বলা যায় না, এই মহত্বের চুড়োয় বিবিসি আরোহণ নাও করতে পারতেন।

টিভিতে উৎসব চলতে লাগল, মুঠো থেকে রিমোট খসে গেল, সোফার কাঁধে মাথা হেলে গেল। নারীত্বের সর্বোত্তম সার্থকতা অবশেষে অর্জন করে, সনকা সেন অঘোরে ঘুমোতে লাগলেন।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...