ওরা তিনজন

সোমেন বসু

 

কিট কিট কিট করে আওয়াজটা হয়ে চলেছে। হাতুড়ি পড়ছে গজালের মাথায়। গজাল মার খেতে খেতে নির্বিকার ভেঙে চলেছে ইট সিমেন্ট সুড়কির গাঁথনি। দেখা যাচ্ছে না, বোঝা যাচ্ছে। আওয়াজটা আসছে সামনের ওই ফ্ল্যাটবাড়িটা থেকে। বাড়ি নয়, বাড়ির ধাঁচা। গতরে পেশি, মাংস; গায়ে রং এসব বাকি আছে। গড়া হচ্ছে। ভাঙতে ভাঙতেই গড়া হয়। এখানে আপাতত বোমা-গুলির হিসেবনিকেশ শেষ, এখন খালি টাকার হিসেব। তা বলে বোমা-গুলিরা মহাপ্রস্থানে যায়নি মোটেই পাণ্ডবদের মতো। বিশ্রাম নিচ্ছে, প্রয়োজন হলেই বেরোবে। বেরোবে না আর এই ফ্ল্যাটের নীচে সমাধিস্থ হয়ে যাওয়া জলাটা। এক বুক কচুরিপানা নিয়ে এই সেদিনও বসেশুয়ে ছিল এখানটায় আলিস্যিভরে। সবুজ পুরুষ্টু পাতা, বেগুনি ফুল। জায়গাটার নাম বিলকান্দা। সে অবশ্য প্রাণপণে অপূর্বনগর হয়ে জাতে উঠতে চাইছে বেশ ক বছর আগে থেকেই। সেই তাড়না বেড়ে গেল পাশ দিয়ে কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে যাওয়ার পর। পরের প্রজন্মই হয়তো আর জানবে না জায়গাটার আদতে নাম ছিল বিলকান্দা। নাহ, না জেনে যাবে কোথায়! যে সুবিশাল বিলটা গ্রাস করে এসব উন্নয়ন-উন্নয়ন খেলা, সে তো ফিবছর অন্তত একবার করে গুমরে উঠবেই, মনে পড়াবেই নিজেকে। বর্ষার সময়ে মানুষগুলো তখন মোটর সাইকেলের কথা ভুলে কাঠ খুঁজবে ভেলা বানাতে। খুঁজতে হয়, হবেও, প্রতি বছরই। প্রতিশোধ কি অমোঘ? যেকোনও? কিট কিট আওয়াজটা হয়েই চলেছে। ওটার আবেশেই এত এপাশ ওপাশ ঘুরে এল কর্ণ। সম্মোহিত করে দেয় যেন। হস্তিনাপুরের অস্ত্রশালা মনে পড়ে যায়।

কালই ফিরেছে। গভীর রাতে। এবার কাশ্মির থেকে। পাঁচজনকে গুম করতে হয়েছে এ দফায়। এরকমই থাকে অ্যাসাইনমেন্টগুলো। এতজনকে গুম করতে হবে, এরকম নয়— অমুক জায়গায় অমুক ঘটনা ঘটছে বা ঘটতে চলেছে, যা রাষ্ট্র বা ক্ষমতার পক্ষে বিপজ্জনক। সরকারি বাহিনী যেমন যা করছে করছে, তুমি— কর্ণ, অঙ্গরাজ— তোমাকে ঢুকতে হবে সেখানে সন্তর্পণে। যেমন বুক চিতিয়ে ঢুকে পড়েছিলে হস্তিনাপুর রাজকুমারদের অস্ত্রপ্রদর্শনীতে, সেরকম নয় মোটেই। সেসব অন্য যুগ ছিল, তুমিও তারপরে চারবার মরেছ, অতএব ওসব ফ্যান্টাসির আর কোনও জায়গা নেই। তোমার বেসিক কাজটা শুধু এক থাকবে, ব্যস! তোমার বেসিক কাজ। মহর্ষি ব্যাসদেব যে কাজ তোমার জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। যে কাজের জন্য তোমাকে তিনি সৃষ্টি করেছেন। তাই তো করে গেল কর্ণ এই সব জীবনগুলি ধরে। দুর্যোধনদের আমলে তাও কিছু সম্মান ছিল, আন্তরিকতা ছিল। দুর্যোধন ওকে মিত্র বলত, মিত্রোঁ নয়! মহাভারত গেছে। ভণিতারও মরণ হয়েছে।

লোকগুলো সরাসরিই বলেছিল। অশ্বত্থামাদের কাছে শুনেছে পরে ওদেরও একই অভিজ্ঞতা। একটা আধো অন্ধকার ঘর, টেবিলের ওপারে তিনজন, এপারে ও। কারা যে এখন আর মনে পড়ে না। চার জন্ম আগের কথা।

–আমরা জানি আপনি অঙ্গরাজ কর্ণ।
–হুম, আমিও জানি।
–দুর্যোধন কেন আপনাকে অঙ্গরাজ্য প্রদান করেছিল, সেটাও কি মনে আছে মহাবীর?
–হুম। আমার বীরত্ব ওর প্রয়োজন ছিল।
–ঠিক তাই। আমাদেরও প্রয়োজন আছে। আর আপনাকে সেটাই করতে হবে।
–কোনটা?
–এই যে আমাদের হয়ে কাজ করাটা। ক্ষমতার হয়ে। রাষ্ট্রের হয়ে। আপনি ক্ষমতার একজন অনুগত বীর যোদ্ধা অঙ্গরাজ। এটাই আপনার স্রষ্টা ব্যাসদেব-নির্দিষ্ট ভূমিকা আপনার। জন্মজন্মান্তরের ভূমিকা…
–কিন্তু আমার কবচকুণ্ডল? পাব সেগুলো??

আর্তচিৎকার! গ্রাস হয়ে যেতে যেতে মরিয়া আর্তচিৎকার। অসংলগ্ন বটে। অবান্তরও। কিন্তু কিছু তো একটা চাই! গ্রাস না হয়ে আর তো উপায় ছিল না কোনও। ব্যাসদেব-নির্দিষ্ট ভূমিকা যে। ওর সে জন্মের স্ত্রী সন্তানকে কোথায় লোপাট করে দিয়েছিল সেদিন থেকেই। বলেও দিয়েছিল সেটা…

–আপনার পিছুটান আমরা মুক্ত করে দিয়েছি অঙ্গরাজ। আপনি এখন থেকে খোলা মনে রাষ্ট্রের সেবা করে যান। আপনার মহাভারতীয় ক্ষমতাগুলি রাষ্ট্রের প্রয়োজন…
–মানে?? পিছুটান মুক্ত করেছেন মানে?
–আপনার স্ত্রী সন্তানের কথা বলছি। তাদের দায়িত্ব রাষ্ট্র নিয়েছে। তাদের নিয়ে আপনাকে আর চিন্তা করতে হবে না।
–বুঝলাম না ঠিক… কোথায় তারা এখন?
–বললামই তো অঙ্গরাজ! আমাদের দায়িত্বে রয়েছে…
–হ্যাঁ, কিন্তু কোথায়? আমার বাড়িতে কি?
–না না! আমাদের দা-য়ি-ত্বে!
–আমি দেখা করব ওদের সঙ্গে…
–কী দরকার! মায়া বাড়বে…

একলব্য নাকি এক বনজ হুঙ্কার দিয়ে সবচেয়ে কাছে থাকা লোকটার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এই সময়টায়। রাষ্ট্রের চতুরতা, হায় নিষাদরাজ, তুমি এখনও বুঝলে না!! তোমার এই প্রতিক্রিয়া হতে পারে, এ কি ওরা ক্যালকুলেশন করেনি? নইলে টেবিলটা অত লম্বা রাখা কেন? শুধু টেবিল? এই ঝাঁপানোর পরেই একলব্য টের পেয়েছিল টেবিলের উল্টোদিকে বসে থাকা তিনজন ছাড়াও ঘরে আরও দুজন আছে। ওর পেছনে। দাঁড়িয়ে। যখন ঝাঁপাল তখন ওরাও ঝাঁপিয়ে ওর কাঁধ ধরে বসিয়ে দিয়েছিল আবার। সরল নিষাদ। আবেগপ্রবণ। তিনটে বাচ্চা ছিল ওর। আর মায়াবী চোখওলা একটা কালো বৌ। চোখদুটোর দিকে তাকিয়েই নেশা হয়ে যেত নিষাদরাজের। এতটাই, যে এখনও সেই চোখ খুঁজে বেড়ায়। চার চারটে জন্মের পরেও। রাস্তায়, ঘাটে, অপারেশনের সময়, জঙ্গল থেকে হটবে না বলে গোঁ ধরেছে যে মাঝিয়ারাম— ধরেছে আর ধরাচ্ছে— তাকে রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় তার ঘরের ভেতরে… আঁতিপাতি করে খোঁজে একলব্য… ওই চোখজোড়া আর ওর ডানহাতের বুড়ো আঙুলটা…

পেছনের লোকদুটোর কথা শুনে কর্ণ বলেছিল অশ্বত্থামার দিকে তাকিয়ে, ‘আমাদের পেছনেও ছিল তার মানে! আমি তো টেরই পাইনি…’

অশ্বত্থামা উত্তর দেয়নি। প্রবৃদ্ধ পুরুষ। কর্ণ-একলব্যরা তাও বার চারেক মরার সুযোগ পেয়েছে। সেই যে একটা পাখি আছে না, বালিহাঁস মনে হয়, জ্যোৎস্না পান করে, জ্যোৎস্না রাতে দলে দলে বেরিয়ে পড়ে ফাঁকা রাতের আকাশে উড়তে থাকে আর শিকারির গুলি খায়, প্রতি জ্যোৎস্নায়, একই কায়দায়, নিয়ম করে। এমনই অমোঘ ব্যাপারটা যে মনে হবে আত্মহত্যাই উদ্দেশ্য বুঝি ওদের। কর্ণ-একলব্যও মৃত্যুকে আবাহন করে অনেকটা ওইভাবেই। হিন্দি সিনেমার হিরোর মতো একা ঢুকে পড়ে জোটবাঁধা ক্ষমতাহীনদের কোনও ডেরায়, জুলজুল করে তাকায় সবার মুখের দিকে, আকুতি— কেউ একটা সীসা ঠুঁসে দিক বুকে বা কপালে। বা যাকে তুলে নিয়ে এসেছে গুমখুন করে লাশটাকে ফেলে দেওয়ার জন্য— সে হয়তো হিমালয় বা কারাকোরামের কোনও ভয়ঙ্কর সুন্দর খাদে বা কোনও মালভূমির গহীন জঙ্গলের মধ্যে বসে থাকা কোনও বক্সাইটে ভরা পাহাড়ের গা দিয়ে তিরতির করে বয়ে যাওয়া কোনও ঝোরায় বা কোনও হাওরের মাঝে জল আর মাছেদের নিশ্চিন্ত রাজ্যে— মারতে চায় না তাদের তখন। নানা অছিলায় সময় নষ্ট করে, কখনও বা ফেলেও দেয় নিজের অস্ত্রটা, চায় ওরাই মারুক ওটা তুলে ওকে। আহ, মৃত্যু! মৃত্যু মানে বেশ একটা বিরতি। কমার্শিয়াল ব্রেক। রিফ্রেশমেন্ট টাইম। একবার মরা, তারপর জন্মানো, আর মোটের ওপর জোয়ান হয়ে ওঠা। এই কটা দিন মহাভারতটা ভুলে থাকা যায়। ক্ষমতা ততদিন ওদের লোকেট করতে থাকে। আর তারপরই… ব্যাসদেব-নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন।

অশ্বত্থামার সেই প্রয়োজনীয় বিরতিটুকুও নেই!

কিট কিট কিট কিট…

একটা আস্ত পড়ে আসা বিকেল আর এই ঘোর লাগা শব্দটার মধ্যে দিয়ে কর্ণর হঠাৎ মনে হল হস্তিনাপুরের অস্ত্রশালায় যেসব কামাররা রাতদিন খেটে তাদের অস্ত্রশস্ত্র বানাত, ব্যাসদেব তাদের কথা লেখেনি কিন্তু কোথাও।

ঘাড় ঘোরাল কর্ণ। অশ্বত্থামা এই চায়ের দোকানটা করেছে বেশ একটা ফাঁকা জায়গায়। সামনে একটু পড়ে থাকা জমি, তাতে নানা ঝোপ ধার ঘেঁষে ঘেঁষে, তারপর একটা বড় ঝিল। কদিন থাকবে? ঝিলের ওপারে দেমাকি বড়লোকের মতো ঘ্যাম নিয়ে শুয়ে আছে কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে। রাস্তার ধারের দুটো বারও দেখা যাচ্ছে এখান দিয়ে। বন্ধ। কাল রাতে একটা বারমালিক খুন হয়েছে। তাই আজ সব বন্ধ। নইলে ভিড় লেগে যেত এতক্ষণে। বাঁদিকে তাকায় কর্ণ। বাড়ি। সার সার। এখনও টালি টিন বিস্তর। দালানও আছে। তবে দোতলা হাতে গোনা যায়। এই হল বিলকান্দা, ওরফে অপূর্বনগর। ছেলেগুলো গতর খাটাত আগে খুব। একটা পাশ দিল কি দিল না, গোঁফের রেখা গজাল কি গজাল না, লেগে যেত সব হাতের কাজে। গ্যারেজ মেকানিক, সাইকেল সারাই, টেলারিং, রাজমিস্ত্রির জোগাড়…। এখন যায় না। এখন কাঁচা পয়সা উড়ছে এখানে। জলাকে জলা ভরাট হচ্ছে। ফ্ল্যাট উঠছে। এখন হাতের কাজ শেখা মানে বোম বাঁধা, পিস্তল চালানো শেখা। তারপরই সিন্ডিকেট। অনিবার্য গন্তব্য। মাতালের শুঁড়িখানা যথা। আর সন্ধের পরের গন্তব্য এই বারগুলো। আক্ষরিক শুঁড়িখানা। চোলাই, বাংলা, গাঁজা… এসব এখানে আগেও চলত। এখন বার। বারমালিকরা আবার শুধুই বারমালিক নয়। যে বারমালিক, সে-ই প্রোমোটার, আবার অনেক ক্ষেত্রেই সে নেতাও বটে। ফলে বারও শুধু বার নয়। জুয়ার ঠেক, নারীমাংসের দোকান, মিটিং রুম, ওয়ার রুম, এমনকি কখনও ওয়ার ফিল্ডও। কাল যে লোকটা খুন হয়েছে, এরকমই বারমালিক কাম প্রোমোটার কাম নেতা ছিল। ভারি নেতা, পাশাপাশি একটা বড়সড় এলাকা জুড়ে বেশ দাপুটে নেতা। খুব অদ্ভুতভাবে মরেছে মালটা। আধাল্যাংটা হয়ে ঘুমাচ্ছিল বাড়িতে বৌয়ের পাশে। ভোরের দিকে ভিজে ভিজে অনুভূতিতে বৌয়ের ঘুম ভাঙে। দেখে পাশে শুয়ে থাকা লোকটার গলাটা নিপুণভাবে কাটা। বিছানা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয়টা হল, আততায়ী বা আততায়ীরা যে বাড়িতে ঢুকে এই কাণ্ডটা করে বেরিয়ে গেল, কেউই কিছু টের পায়নি। কোনও শব্দ, কোনও চিহ্ন কিচ্ছু না। এমনকি কোথা দিয়ে ঢুকেছিল তারা বাড়িতে সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। একদম প্যাঁচার মতো নিঃশব্দে শিকার!

ডানদিকে বড় পুরনো রাস্তাটা। দেখা যায় না এখান দিয়ে। বাড়ি, ঘর, বিল্ডিং, নতুন নতুন ফ্ল্যাট। এখনও একলব্যর বলিষ্ঠ কালো চেহারাটা দেখা যাচ্ছে না। আসবে ওই রাস্তা দিয়েই। দুটো চা নিয়ে অশ্বত্থামা এসে বসল ওর পাশে।

হিরণ্যধনুর পুত্র নিষাদরাজ একলব্যর ঋজু শরীরটা দেখা গেল এবার। এগিয়ে আসছে রাস্তা ধরে। আকাশের রং এখন ফিকে কমলা। কাকেদের বাসায় ফেরার ডাক শোনা যাচ্ছে ইতিউতি। পাশের কিট কিট শব্দটাকে গুটিয়ে রেখে বাড়ির পথ ধরেছে মিস্ত্রিরা। নিষাদরাজের ঋজু শরীরটা সামনে ঈষৎ নুয়ে পড়েছে, পদচারণা শ্লথ। ওরা জানে, এ ক্লান্তি পথশ্রমের ক্লান্তি নয়। অশ্বত্থামা উঠে গেল আরেকটা চা নিয়ে আসতে।

ছোট বড় মাঝারি নানান উচ্চতার পাহাড়, শাল সেগুন মহুয়ার জঙ্গল, পাতাহাতু রুরুডেগা এসব নাম, রোরো নদী… আঃ… বড় আপনার মনে হয় নিষাদরাজের এইসব জায়গা। ওর নিজস্ব চারণভূমি, জন্মপরম্পরায়। সারাদিন খাটো, আর সূর্যটা ডুবলেই হাঁড়িয়া মহুয়ার উষ্ণতায় নিজেকে নিশ্চিন্তে সঁপে দিয়ে বুঝে নাও জীবনের শাশ্বত রহস্যগুলোকে। মাঝে মাঝে ধামসা মাদল বের করো। তোমার সঙ্গে নেশাতুর কোমর দোলাবে বনের শ্বাপদেরাও, ওরাও তো আমাদেরই, ওদের তো আলাদা ভাবেনি কখনও এই কোলহান গোণ্ড সাঁওতাল নিষাদ আদি দেশের আদিমতম জনগণ। অশ্বত্থামা তাই যখন খুঁজে বের করে যোগাযোগ করেছিল ওর সঙ্গে— কর্ণকেও ওই খুঁজে বের করেছে— একলব্য বলেছিল—

–এসব বিলকান্দাফান্দা কেন? চ না, জঙ্গলে যাই! শান্তিতে থাকব…
–এখনও একইরকম সরল রয়ে গেছেন আপনি নিষাদরাজ! পাঁচ জন্ম পরেও!
–তা তো বটেই! নইলে…
–হ্যাঁ… জানি, জানি! নইলে আর আমার বাপ… ইত্যাদি ইত্যাদি…

হেসেছিল একলব্য। হেসে বলেছিল—

–কিন্তু জঙ্গলের সঙ্গে সরলতার সম্পর্কটা কী?
–সে তো খুবই নিবিড় সম্পর্ক। কিন্তু আপাতত কি এটা বুঝছিস না, রাষ্ট্রের এখন নজর মূলত জঙ্গলের দিকেই? জঙ্গলের আকাশে এখন শকুন উড়ছে দেখতে পাস না? তোর শেষ অ্যাসাইনমেন্টগুলোর কথা ভাব না…

ঠিকই। অশ্বত্থামা আবার বলেছিল—

–দেখ, ডাক আসার সময়টা বাদ দিলে আমাদের অবসর খুবই কম। সেটুকু একটু ফাঁকায় নিজেদের মতো করে থাকতে চাই। তাই এখানে…
–আর নিজেদের মতো কিছু কাজ করে, কর্ণ বলেছিল। অশ্বত্থামার সঙ্গে ওর যোগাযোগটা আগে হয়েছে।
–ঠিক। আর তাই আমার বাপের এই দুই ভিকটিমকে খুঁজেপেতে বের করেছি…

হেসেছিল। ওরা তিনজনই।

–চায়ের দোকানটা আসলে… এই বঙ্গদেশে চায়ের দোকানগুলো বেশ একটা আড্ডার জায়গা, জানিস? মানুষ আসে, বসে, গল্পগাছা করে। ভালো লাগে দেখতে, শুনতে… তাই। একটু যেন লাজুক হেসে কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে যোগ করেছিল বৃদ্ধ অশ্বত্থামা।

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রোরো নদীর ধার ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে সেই শকুনদের কথাই মাথায় ঘুরছিল একলব্য। আসার সময় শহরে চোখে পড়েছে আর্য রাজনৈতিক দলের অশ্লীল হোর্ডিংগুলো, এই যে এত ভেতরে, এই নেশা ধরানো শান্ততার মধ্যেও হাঁড়িয়ায় জল পড়ে যাওয়ার মতো ঢুকে রয়েছে মিশনারিরা। আরও গভীরে, আরও জঙ্গলে, যেখানে এখনও একটু শান্তি, একটু মত্ততা, একটু ওর সেই দ্বিতীয় জন্মের প্রেয়সীর খোঁজ, একটু ডানহাতের কাটা আঙুলটার তল্লাশে ইতিউতি প্রেক্ষণ, সেখানেও খোপেখাপে ছাউনি, জংলা পোশাক। এ তো সিয়াচেন নয়, সীমান্তও নয় কোনও, একটু ফাঁকা জঙ্গল পেলে এখনও নিজস্ব ভাষায় চিৎকার করে ওঠে একলব্য— চিৎকার, না হাহাকার?— ওরে, এটা আমাদের দেশ, আমাদের ভূমি… আ-মা-দে-র…

অশ্বত্থামা বলেছিল—

–এখন তোর অশ্লীল লাগে কেন, নিষাদরাজ? নিজেও তো একই ফাঁদে পা দিয়েছিলি! কী দরকার ছিল তোর সেই জরাসন্ধ শিশুপাল পৌণ্ড্রক বাসুদেবদের মতো ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে ওঠবোস করার?

কর্ণ সায় দিয়েছিল—

–হ্যাঁ, আমরা যেরকম হস্তিনাপুরের চক্করে পড়ে গেছিলাম, তোর কেসটা তো তা না! চার আঙুলেও তোর বীরত্ব ছিল প্রশ্নাতীত। জরাসন্ধরা তোকে সমীহও করত সে কারণেই। থাকতে পারতিস নিজের মতো জঙ্গল পাহাড়ের রাজত্বে… নিজের ভূমে…

–কিন্তু এই এটা? এটার যন্ত্রণা?? ভুলতে পারতাম না যে…! প্রায় চিৎকার করে একলব্য লাইক দেওয়ার ভঙ্গিতে তুলে ধরেছিল ওর ডান হাত। লাইক নেই, আঙুল নেই, মুষ্টি শুধু!

আর কথাও নেই। শুধু অশ্বত্থামা হাত বোলাল নিজের কপালে। কর্ণ বাহুতে, কানে। নিজেদের অগোচরেই যেন। মাঝরাতে কেবল একটা কাক ঘুম ভেঙে ডেকে উঠেছিল বিলকান্দার কোনও গাছের মাথা থেকে।

কোলহান লোকটা, লোক কই, ছেলেই হবে, কতই বা বয়স, ভুগিয়েছিল খুব, মরতে চায়নি সহজে। অরণ্যবাসীদের অরণ্য থেকে উৎখাতের আইন হয়েছে। তিন পুরুষ বসবাসের কাগজ দেখাও, নয়তো ফোটো, বলছে রাষ্ট্র! ছোঃ, তিন পুরুষ!! ওরে এই পাহাড় জঙ্গল জীবজন্তু যত দিন আছে ততদিন ধরে আছি হামরা! হ্যাঁ, হামরাই! তোমার রাষ্ট্র তো এই সেদিনকার, দুধের ছোয়া, গাল টিপলে এখনও দুধ নিকলাবে! এবার হিসেব করে নাও গে, কত পুরুষ হয়! হামরা গতর খাটাই, জঙ্গলে বেড়াই শ্বাপদের মতো, হাঁড়িয়া খাই, মহুয়া খাই, মাদল বাজাই… অত কাগজ টাগজের হদিশ হামরা পাব কোথা? আসল কথাটা বলো না খোলসা করে, এই পাহাড়টার পেটের ভেতর অভ্র আছে, তোমরা খবর পাইছ, তাই হামাক হাটানোর দরকার তোমার। তা আছে আছে। আগেও ছিল, এখনও আছে, থাকবেও। হামার জান থাকতে এখান থেকে তোমরা না হামাক হাটাতে পারবে, না পারবে আমাদের এই পাহাড় জঙ্গল সব ধ্বংস করতে! ছেলেটাকে এসব বলতে শুনেছে একলব্য। সেইজন্য ওর জানটারই দরকার হয়ে পড়েছিল ক্ষমতার। কিন্তু…

ওর কথাগুলো তো সত্যি সবই। বেবাক।

–এগুলো আমাদের দিয়ে করান কেন? আপনাদের পুলিশ-মিলিটারি তো যথেষ্ট।

প্রতিটা জন্মের পর যখন নতুন করে আবার কাজ শুরু হয় একলব্যের আর কর্ণের, তখন একবার করে সেই আধো অন্ধকার ঘরটার টেবিলের এপারে ওপারে বৈঠকিটা হয়। পেছনে জনা দু-তিনেক দাঁড়িয়েও থাকে। মুখগুলো পালটে যায় নিশ্চয়ই, তবে সে আর ওরা দেখার আগ্রহ পায় না। কর্ণ জানে ওরা শকুনি-দুর্যোধন নয়, একলব্যও জানে ওরা জরাসন্ধ-রুক্মী-শিশুপাল নয়, ব্যস! আর জেনে কী হবে?

সেরকমই এক বৈঠকে একলব্য জিজ্ঞেস করেছিল কথাটা।

–আসলে নিষাদরাজ, বিয়িং আ ডেমোক্র্যাটিক স্টেট, উই হ্যাভ সাম অবলিগেশনস ইউ নো! সব কাজ প্রকাশ্যে করা যায় না। তাই তো দরকার আপনাদের…

ক্রূর, শীতল, নির্দিষ্ট উত্তর।

ছেলেটার জানটা কড়া ছিল।

খুব ক্লান্ত লাগছে।

–আপনাদের মিলিটারিতেই নিয়ে নিন না তাহলে আমাদের! এই কাজগুলো বড় অসহ্য হয়ে যায়। কর্ণ প্রস্তাব দিয়েছিল শেষে একটা দীর্ঘশ্বাস সমেত।

–না না মহাবীর কর্ণ। শ্রদ্ধা বিনয় যেন গলে গলে পড়ে— আপনাদের যেসব মহাভারতীয় ক্ষমতা আছে সেগুলি আমাদের সেনাদের মনে একটা ইনসিকিওরিটি তৈরি করবে। ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সও গ্রো করতে পারে। উই কান্ট অ্যাফোর্ড দ্যাট…

–আর ওই যে বললাম বিয়িং আ ডেমোক্র্যাটিক… আরেকজন।

চা শেষ। একলব্যের গল্প শুনতে শুনতে অসম-ফেরত অশ্বত্থামার হাওর মনে পড়ছিল। হাওরের জল… মাছেদের গুবগাব… কেমন হয় সেই কাচের মতো জলের কোনও জায়গায় যখন একদলা কালচে লাল ভুলকে ওঠে…

কর্ণ তার দুই বলিষ্ঠ বাহু প্রসারিত করে হাত রাখে দুই সঙ্গীর পৃষ্ঠদেশে। এক আর্য, এক অনার্য, আর মধ্যে, কর্ণ, ক্ষত্রিয় হলেও যে সুতপুত্র পরিচয়েই গর্ববোধ করে এসেছে চিরকাল।

উঠে দাঁড়াল তিনজন। এই সময়টাই ওদের নিজস্ব কাজের সময়। অভিসার।

পাশের জনপদ এখন বিশ্রামরত। কৃষ্ণপক্ষ। আকাশে চাঁদ আসবে শেষ রাতে। দূরের সড়কে অন্তরে অন্তরে নিয়ন।

একটা কুকুর সচকিত হয়ে ডেকে উঠতে গিয়ে একলব্য এবং তার হাতের তিরধনুক দেখতে পেল। পালাল দুদ্দাড় করে লেজ গুটিয়ে।

সামনের ঝিলের জলের ওপর দিয়ে ভেসে গেল তিন মহাভারতীয় পুরুষ। পেঁচার মতো।

খুঁজে দেখা যাক একটি মণি, একটি কবচকুণ্ডল, এবং দক্ষিণহস্তের একটি কর্তিত বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ কোথাও পাওয়া যায় কিনা…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1858 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

6 Comments

  1. খুব ভাল গল্প। মহাভারতের চরিত্রদের এনে আধুনিক পটভূমিকায় খুব সুন্দর মিলিয়েছ।

  2. চমৎকৃত হবার মত গল্প সোমেনদা। এত কম গল্প কেন লেখেন এই লেখক সেটা একটা প্রশ্ন হতে পারে।

আপনার মতামত...