বেঁচে থাকার কারণ ও একটি বই

প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী মুখার্জি

 

জাপানিজ ভাষায় ‘ইকিগাই’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘বেঁচে থাকার কারণ’। আমাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভাবি, আমরা বেঁচে থাকি, কারণ একবার জন্মে গেছি যখন, না বেঁচে তো উপায় নেই, তাই। সেক্ষেত্রে এই বইটি পাঠককে একটি অন্য উপলব্ধির সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। ঘুম থেকে উঠে যাদের ‘উফ, আরেকটা দিন শুরু হল’ বলে একটা অবশ্যম্ভাবী রূঢ় সত্যের মুখোমুখি হতে হয়, বইটি হাতে নিয়ে কয়েক পাতা এগিয়ে যেতেই তাদের ভেতরে একটা হাল্কা হাওয়ার দোলা অনুভূত হবে। আরে! ঘুম থেকে উঠে আনন্দের সঙ্গে আরেকটা নতুন দিনের দিকে উৎসাহ নিয়ে দেখার মত উপাদান রয়েছে আমার জীবনেও! কিন্তু ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’। হ্যাঁ, রাগটা নিজের লেন্সের ওপরেই হয়।

দক্ষিণ জাপানের ওকিনাওয়ার একটা গ্রাম ওগিমি, সেখানে শত বর্ষীয়ান মানুষের সংখ্যা পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক। সেখানকার জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ মানুষ ৯০-এর কাছাকাছি বাঁচেন এবং খুব আনন্দের সঙ্গে বাঁচেন। কীভাবে, সেই রহস্য উদ্ঘাটন করতেই একটা গবেষণা চালানো হয়। গবেষণায় যা যা কিছু  উঠে এসেছে, সেই নিয়েই মূলত এই বই। বইয়ের নামের নিচে লেখা রয়েছে ‘The Japanese Secret to a Long and Happy life’। যদি আমরা নিজেদের সুবিধার্থে ‘দীর্ঘজীবন’কে এখান থেকে বাদও দিই, তারপরেও একটা সম্পূর্ণ এবং আনন্দময় জীবন কে না চায়? পড়ার আগে আমিও ভাবছিলাম, দীর্ঘ জীবন চাই না, পরে বুঝলাম, এখানেও একটা দর্শন রয়েছে। আসলে আমরা দীর্ঘ জীবন চাই, আনন্দের সঙ্গে বাঁচতে চাই কিন্তু যেহেতু সে অর্থে জীবনে আনন্দ অবশিষ্ট থাকে না, তাই চাই যত সংক্ষিপ্ত হয় আমার জীবন, ততই ভাল। একে আর বয়ে নিয়ে যেতে হবে না। একেবারে অন্তরের অন্তঃস্থলে থাকা এই ইচ্ছেটাও চাপা পড়ে যায় ‘দিনগত পাপক্ষয়’-এর নিচে। জীবন হয়তো শুধু জীবন হিসেবেই থেকে যায়, যাপন আর হয়ে ওঠে না। আর ‘অবসাদ’ নামক শব্দের সঙ্গে আমাদের এখন পরিচয় খুব গভীর। যখন অবসাদ নামের শব্দের সঙ্গে পরিচয় হাল্কা ছিল, তখনও তার অস্তিত্ব ছিল বটে, কিন্তু চিহ্নিত করতে না পারার দরুণ সরিয়ে রেখে দিয়েছি ‘আমার সঙ্গেই এরকম হয়’  আর ‘জীবনটা শেষ হলে বাঁচি’ এই লাইনগুলো নিজেকে বলতে বলতে। অথচ নিজেই যে নিজের শুশ্রূষা হয়ে ওঠা যায়, নিজেই যে নিজের ভালো থাকার পাসওয়ার্ড হয়ে ওঠা যায়, এই সম্ভাবনার কথা কখনও সম্ভাব্য তালিকাতেও আনিনি। আসলে আমরা নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নই। নিজের সঙ্গে নিজের  সংযোগ স্থাপন করার কথা ভাবি না, ভাবি এ/বি/সি/ডি-র সঙ্গে সংযোগস্থাপন করার কথা। খুব চেষ্টা করি সম্পর্ক ঠিক রাখার ক্ষেত্রে। আর নিজের সঙ্গে নিজের যে দূরত্ব দিনের পর দিন বাড়তেই থাকে সে খেয়াল রাখি না বলে ক্রমাগত একাকিত্বের ভয় চেপে বসে। কারণ, আমরা আমাদের চিনি না। নিজের কাছে আমরা অপরিচিত।

ইকিগাই
হেক্টর কারসিয়া এবং ফ্রান্সিস মিরালেস
২০১৭, পেঙ্গুইন র‍্যান্ডম হাউস
দাম ৪৯৯

এই বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, খুব বড় বড় দর্শন নয়, খুব ছোট ছোট কিছু যত্ন, আর অন্তর্দর্শনই আসলে প্রয়োজন। খুব বেশি কিছু বলব না বইটা সম্পর্কে তাহলে হয়তো নিজে সংগ্রহ করে পড়ার আগ্রহ চলে যেতে পারে। কিন্তু এক-দুটো ব্যাপার না বললেই নয়। যেমন ‘স্ট্রেস’। এর সঙ্গেও আমরা পরিচিত। খুব ভাল করেই। একজনের সঙ্গে কিছুদিন আগে এই নিয়ে কথাও হচ্ছিল, তিনি বলছিলেন, স্ট্রেস-এর আশঙ্কাও আরেকধরনের স্ট্রেস-এর জন্ম দিতে পারে। খুব অবাক হলেও ভেবে দেখেছিলাম ঠিক। অফিসে কোনও এক কঠিন মিটিং-এর আগে শুধুমাত্র ভেবে ভেবেই এক ধরনের ক্রাইসিস তৈরি হয়। অথচ দেখা গেল সেই মিটিং-এ আদৌ কিছুই হল না ভাবনায় পড়ে যাওয়ার মত। অথচ না হওয়া অব্দি সেই স্ট্রেসকে থামানোও যাচ্ছে না। হামেশাই এই ধরনের অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বেশ আশ্চর্যজনকভাবে একটা জায়গায় বলা আছে এই স্ট্রেস একটা পর্যায় অবধি হিতকর। এতে আমাদের মানসিক পরিশ্রম হয় এবং মগজ সক্রিয় থাকে। শারীরিক শ্রম এবং মানসিক শ্রম দুইই জররি, এটা আমরা বইয়ের পরবর্তী অধ্যায়ে এসে পাব, যেখানে শত বর্ষীয়ান কিছু ব্যক্তির সাক্ষাৎকারে তাঁরাও এই বক্তব্য রাখেন। ভেবে দেখলাম, ঠিক। হয়ত কোনও হিসেব, বা কোনও সমস্যা (কর্মক্ষেত্রের উদাহরণই ধরছি) নিয়ে এমন একটা প্যাঁচে রয়েছি, ঠিক উদ্ধার করা যাচ্ছে না। ভাবতে ভাবতে একটা রাস্তা বেরিয়ে এল, এবং কাজ করল। সে যাত্রা বেঁচে গেলাম। এতে আত্মপ্রত্যয় তো বাড়েই, সঙ্গে মনে হয় মাথা খাটানোর একটা জুতসই জায়গা পাওয়া গেল। অন্তর্দর্শন ক্রমাগত চলতে থাকলে এই জায়গাগুলো একদিন ঠিক অভ্যেসে পরিণত হয় আর আমরাও আরেকটু পরিণত হওয়ার সুযোগ পাই। খুব ছোট ছোট উদাহরণ, আর জীবন দর্শন রয়েছে বইটির আনাচে কানাচে, ওঁদের সংস্কৃতির টুকিটাকি পার করে যেতে যেতে। আর কিছু মজার মজার আখ্যান রয়েছে পাতা জুড়ে। সেখানে অবসরের কোনও বয়েস নেই। যার যদ্দিন ইচ্ছে, তিনি তদ্দিন কাজ করবেন। আর যারা শত বর্ষীয়ান, তাঁরা প্রত্যেকেই প্রায় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করছেন। শুধু কায়িক পরিশ্রম নয়, মগজকেও সক্রিয় রাখার প্রচেষ্টা সব সময় জারি রয়েছে। আর রয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক।

লেখকেরা নিজেদের গবেষণার কাজ সেরে যখন ভাবলেন এবারে ঘুরে ফিরে কিছু কেনাকাটা করা যাক, তখন সেই গ্রামে উপহার কিনতে গিয়ে দেখলেন উপহার হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে শুধু সুদৃশ্য বোতল ভর্তি জল। তবে হ্যাঁ, সেই জল সাধারণ নয়, বিশেষ। স্থানীয়রা মনে করেন, সেই ঝর্নার জল খেলে দীর্ঘায়ু হওয়া যায় এবং সুস্থ জীবন পাওয়া যায়। এরকম লোকগাথায় বিশ্বাস করে বা না করেও কেউ যদি প্রিয়জনকে প্রকৃতি থেকে পাওয়া খাঁটি এক মুঠো সম্পদ উপহার দেন, সেই সম্পদ কি অমূল্য নয়?

চেরির মত উজ্জ্বল আর সুন্দর এই বইটি পড়ে দেখতে পারেন। কে জানে, আপনিও আপনার ‘ইকিগাই’ খুঁজে পেলেও পেতে পারেন!

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...