রেশমি সুতোর পাকে পাকে

কণিষ্ক ভট্টাচার্য

 

নয়ের দশক। ‘আর্থার ডাঙ্কেল ড্রাফট’ আর ‘জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ’ হয়ে বিশ্বায়নের আগমন হচ্ছে দেশে। গোটা বিশ্বভাবনা নাকি তাতে এসে হাজির হচ্ছে ঘরের উঠোনে। নতুন শব্দ আসছে আমার ভাষায় ভুবনগ্রাম। অথচ কেউ কেউ পাগল মেহের আলীর মত চিৎকার করে যাচ্ছে, ‘তফাৎ যাও! তফাৎ যাও! সব ঝুট হ্যায়। সব ঝুট হ্যায়।’ কী আশ্চর্য! এমন উল্টোধারার কথা কেন বাপু! তখন এমন এক মেহের আলী বলেছিল এক আশ্চর্য দশকের কথা।

ছয়ের দশক।

গান গাইছে বিটলস। জর্জ হ্যারিসন সেতার শিখছেন রবিশঙ্করের কাছে। মানুষের অধিকারের গান ছড়িয়ে পড়ছে পিট সিগারের ম্যান্ডোলিনের ঝঙ্কারে। জোন বায়েজের গলায় আর বব ডিলানের কলমে। এই দশকের শেষে এসে ঘটবে উডস্টক ফেস্টিভ্যালের বিপর্যয়। কলকাতায় সুনীল শক্তির সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন অ্যালেন গিন্সবার্গ। সেই কলকাতায় তিনি নেই। তিনি তখন সান ফ্রান্সিস্কোতে ‘সিটি লাইটস’ বইয়ের দোকানে গিন্সবার্গকে লেখা চিঠি শিগেকোর হাতে দিয়ে আসছেন। সেই পিট সিগার যখন কলকাতার পার্ক সার্কাস ময়দানে গান গেয়েছিলেন শুনতে গিয়েছিলেন তিনি।

বিশ্বযুদ্ধ থেমে গেছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে স্বাধীন হয়েছে নানা দেশ। কিউবান বিপ্লবও ঘটে গেছে সামান্য আগেই। তবু একটা অপ্রত্যক্ষ যুদ্ধের মধ্যেই আছে পৃথিবী। শীতল যুদ্ধ। এরই মধ্যে আমেরিকার ভিয়েতনাম আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সে দেশের প্রবাদপ্রতিম বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছাত্রছাত্রীরা ফেটে পড়ছে বিক্ষোভে। আমেরিকায় সেনাবিমান প্রতিদিন নিয়ে ফিরছে দেশের ছেলেদের কফিন ভিয়েতনামের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে। গোটা পৃথিবী অবাক হয়ে দেখছে দৈত্যাকৃতি আমেরিকার রাসায়নিক নাপাম বোমার বিরুদ্ধে প্রায় হাতুড়ে অস্ত্র নিয়ে একটা পুচকে দেশ ভিয়েতনামের প্রতিরোধ। বার্ট্রান্ড রাসেলের নেতৃত্বে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিরুদ্ধে চলছে প্রচার। মাত্র দুদশক আগের হিরোশিমা নাগাসাকির প্রজন্মান্তিক ক্ষয়ের প্রতিবেদন আসছে তখন। সেখানে তখন তিনি।

আমেরিকার অন্ধকার দক্ষিণে চলছে বর্ণবিদ্বেষ বিরোধী বিপ্লব। একদল দুঃসাহসী সাদা ও কালো স্বেচ্ছাসেবক একসঙ্গে ওয়াশিংটন থেকে দক্ষিণের বাসে চড়ে বসলেন। বর্ণবিদ্বেষীদের নির্মম আক্রমণ আর রক্তপাত অগ্রাহ্য করে দলে দলে ‘ফ্রিডম রাইডার্স’ বাসে যেতে লাগলেন দক্ষিণে। তাঁর কৃষ্ণাঙ্গ বান্ধবী জেন বন্ডের ছোট ভাই জুলিয়ান বন্ড তাদের সঙ্গে যুক্ত। ম্যালকম এক্স আফ্রো আমেরিকান মিলনের জন্য নতুন ইসলাম ধর্ম চালু করে সারা ফেলেছেন কৃষ্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদের ধারণায়। বাংলার উচ্চবর্ণ পরিবারের মেয়েটি হোস্টেলের মধ্যেই জেনের কাছে শিখছে শেষ রাতে উঠে রান্না করে রোজা রাখার ব্যাপারে। চোদ্দ বছরে কিশোরী অবস্থায় বৈধব্য হয়েছিল তাঁর মায়ের। সেই সামান্য বয়সেই সুলেখিকা নিঃসন্তান বিধবার বিবাহ হয়েছিল আরেক লেখকের সঙ্গে। সে বিবাহের দুই কারিগরকে সেই মেয়েটির দেশ চেনে বিশ্বকবি আর অমর কথাশিল্পী বলে। সেই বিবাহের ফলে তাঁর জন্ম বলে সে মেয়ে পরে কবিতায় কৃতজ্ঞতা জানায় হুগলি জেলার বীরসিংহ গ্রামের এক বিপ্লবীকে।

যাইহোক, সে মেয়ে তো তখন আমেরিকায়। সেই সময়েই লক্ষ লক্ষ বুকে আগুন জ্বেলেছিল বিখ্যাত সিভিল রাইটস মার্চে মার্টিন লুথার কিং-এর ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ ভাষণ। তাঁর সঙ্গে মানুষের মনে জুড়ে গেল ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদ। বার্কলিতে শান্তিকামী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে শুরু হল ফ্রিডম রাইডারদের জন্যে চাঁদা তোলা। কিন্তু বার্কলি কর্তৃপক্ষ বাধা দিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে রাজনৈতিক কারণে চাঁদা তোলা বা রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা চলবে না। বার্কলিতে শুরু হল ‘ফ্রি স্পিচ মুভমেন্ট’। বাঁধন ছিন্ন করার, বৃত্ত বড় করার, যুদ্ধের বিরুদ্ধে, অসাম্যের বিরুদ্ধে মুক্তকণ্ঠে কথা বলার দাবির পাশেও তিনিই। আমেরিকায় আধুনিক নারীমুক্তি আন্দোলনের সাক্ষী থাকছেন তিনি। বেটি ফ্রিডানের ‘দ্য ফেমিনিন মিস্টিক’ তাঁর চোখ খুলে দিল আরেকবার। ‘মিস আমেরিকা’র দেহ প্রদর্শনীর প্রতিবাদে ‘ব্রা বার্নিং’ শব্দের উৎপত্তি হল সেই দশকে। আর সেই দশকেই বলিভিয়ার জঙ্গলে ফায়ারিং স্কোয়াডে চে গেভারার দিকে গুলি চালাবার সময় হাত কাঁপছিল সেনাদের। ওই ছয়ের দশকেই তাঁর বন্ধু সুনীল লিখলেন, ‘চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়।’

এই ছয়ের দশকের সামগ্রিক অভিঘাত তো ছড়িয়ে পড়েছিল দেশে দেশে পরের দশকে নানা গড়ন আর মেজাজের ছাত্রযুব আন্দোলন হয়ে। সেই মেহের আলীর কথায় তখন ভেবেছি সত্যিই তো, তিনিই তো সেই অস্থির সময়ে অকুস্থলে আমাদের প্রতিনিধি। আমাদের ভাঙাচোরা রেনেসাঁর রেশমি সুতো রয়েছে তাঁর আঙুলে জড়ানো। আমাদের প্রগতিভাবনার আধুনিক সক্ষম মেধাবিনী তিনি। ভারতের তিনশো অধিক রামকথার সন্ধান জানে সেই আঙুল। সেই আধুনিকা মানুষী নারীর কথনের রামকথাকে পরতে পরতে ভাঁজ খুলে তিনি চোখের আলোয় ফেলে দেখান মহাকাব্যের ধীরোদাত্তগুণান্বিত নায়কের মুখে।

একুশ শতকের দ্বিতীয় দশক। বহু আন্দোলনের অর্জন অধিকারগুলো যখন হারিয়ে ফেলছে মানুষ, সামগ্রিক প্রগতিভাবনাকে যখন নস্যাৎ করা হচ্ছে এক কথায়, মহাকাব্যের নায়কের নামের জয়ধ্বনি যখন ভক্তির বদলে আতঙ্ক আনছে তখন তিনি চলে গেলেন।

নবনীতা দেবসেন।

আমরা যে সেই রেশমি সুতোর সন্ধান জানি না আর।

 

ঋণ: হ্যালো সিক্সটিজ – নবনীতা দেবসেন।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1920 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

আপনার মতামত...