বিচারের বাণী… দিল্লি দরবারে ডামাডোলের গল্প

সৌরাংশু

 

 

ভারতীয় সংবিধান টিকে আছে তার তিনটে পায়ের উপর। সংবিধানের তিন স্তম্ভ: আইন প্রণয়ক লেজিসলেচার, বিচারব্যবস্থা জুডিশিয়ারি এবং প্রশাসন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। সংবিধান এবং তার প্রয়োগকে খুব মন দিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে কেউই কারুর ঊর্ধ্বে নয়। তিনটি ইনস্টিটিউশন বা প্রতিষ্ঠানই একে অপরের পরিপূরক। সভ্য সমাজকে টিকিয়ে রাখতে গেলে কিছু নিয়মকানুন তৈরি করতে হয়। সেই নিয়ম প্রয়োগ করা এবং তার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়াও হয়েছে এই আইনসভা, বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসনেরই কিছু সহায়ক প্রতিষ্ঠানকে।

পুলিশ এবং আইনজীবী এমনই দুটি প্রতিষ্ঠান যাঁরা প্রাথমিকভাবে সাধারণ মানুষের জন্য, তাদের অধিকারের জন্য কাজ করে। অন্তত সেটাই বিধান, সেভাবেই করা উচিত। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখি? ক্ষমতা সে যতটাই হোক না কেন, কম বেশি সকলের উপর কুপ্রভাব ফেলতে সক্ষম। ক্ষমতার সদ্ব্যবহারের থেকে অপব্যবহারের নমুনা চতুর্দিকে অহরহ দেখতে পাচ্ছি। ‘জানিস আমি কে?’ ‘খাকি উর্দি’ ‘কালো কোট’ ‘বাঘে ছুঁলে এক ঘা, পুলিশ ছুঁলে আঠারো ঘা’ এইসব উক্তি বা মন্তব্য বা প্রবাদগুলি নিশ্চয় শীতের সকালের গুড়ের মোয়া খাওয়ার জন্য রাখা হয়নি।

এই পুলিশের লাঠি আর আর উকিলের মুখ সাধারণ মানুষ সন্দেহের চোখে দেখে না বলাটা অপকথা বলা হবে। যদিও আতান্তরে পড়লে সাধারণ মানুষ কিন্তু এদেরই শরণে উপস্থিত হয়। কিন্তু সে নিয়ে তো আজকের আলোচনা নয়। তবে এই ধান ভাঙতে শিবের অর্কেস্ট্রা কিসের জন্য? আর কিছু নয়। দীপাবলির পরে পরেই সমগ্র দিল্লি যখন দূষণের কবলে হাঁসফাঁস করছে, তখনই একটা খবর ভেসে এল, দিল্লির জেলা আদালত, তিশহাজারি কোর্টে সামান্য পার্কিং নিয়ে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

আইনজীবীরা বলছেন, যে বরিষ্ঠ পুলিশ অফিসারের নির্দেশে পুলিশ সামনাসামনি গুলি চালিয়েছে। যদিও কেউ মারা গেছেন বা গুলিতে আহত হয়েছেন বলে খবর নেই। অপরদিকে পুলিশের অভিযোগ তো বেশ কিছু। কমসংখ্যক পুলিশকে প্রায় একশো দুশো আইনজীবী মিলে বেধড়ক ঠেঙিয়েছে। নিজেদের বাঁচাতে যখন পুলিশরা কোর্ট চত্বরের লকআপে নিজেদের বন্ধ করে ফেলেছিল, তখন তাদেরই বাইক লকআপের সামনে ফেলে লাথি মেরে টেরে আগুন জ্বালাবার চেষ্টা করা হয়েছিল। তারপর লকআপ থেকে কনস্টেবলদের বার করে নিদারুণ আদর সৎকার করা হয়। ডিজি, ডিআইজি স্তরের পুলিশ অফিসারকেও ছাড়া হয়নি। এমনকি মহিলা ডিসিপি, মনিকা ভরদ্বাজের সঙ্গে শারীরিক নিগৃহের অভিযোগ করা হয়। এক বরিষ্ঠ পুলিশ অফিসারের সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়া হয়, ইত্যাদি।

এই অভিযোগ এবং সেই সম্পর্কিত হতাশা রাগ ইত্যাদি পুলিশবাহিনীতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে যখন দিল্লির নগরপাল অমূল্য পটনায়েক এই ঘটনায় আহত পুলিশদের দেখা তো দূরের কথা বরং শান্ত থাকতে নির্দেশ দেন। এবং দাবানলের আগুন দেবালয়ে পৌঁছয় যখন দক্ষিণ দিল্লির সাকেত জেলা আদালতে এক বিনা হেলমেটের মোটরবাইক সওয়ার পুলিশ মুষ্টিমেয় আইনজীবীর চড় থাপ্পড়ের শিকার হওয়ার ভিডিও শেয়ার করা হয়।

নিচুতলার পুলিশকর্মীরা নিজেদের স্বভাবতই অভিভাবকহীন মনে করে দলে দলে পরিবারসহ হাজির হয় মধ্য দিল্লির দিল্লি পুলিশের মুখ্যালয়ে। অভূতপূর্ব প্রতিবাদে মধ্য দিল্লির যানজীবন স্তব্ধ। বরিষ্ঠ পুলিশ অধিকারীরা একে একে ট্যুইটে বা সোশাল মিডিয়ায় নিজেদের ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছেন। এই অবস্থায় দেশের গৃহমন্ত্রীর থেকে কোনও বক্তব্য নেই। শুধুমাত্র ক্রীড়ামন্ত্রী কিরণ রিজুজু ট্যুইট করলেন ‘আইন নিজের হাতে নেওয়া ঠিক নয়!’ কার জন্য, কার চাপে এসব নিয়ে ভাবনাচিন্তার আগেই সে ট্যুইট মুছে গেল। আর তারপর আরও দুটো ট্যুইট এল যার তীব্রতা অনেক কম।

পুলিশের কার্যকলাপ নিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ কিছু ক্ষোভের কারণ অবশ্যই ঘটে। সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা তাইই বলে, তবুও এটাও সত্য যে পুলিশের কর্মপরিস্থিতি মানবাধিকারের কিনারায় হাঁটাচলা করে। দিল্লি পুলিশের ক্ষেত্রে ছুটি দেওয়া যায় না বলে বারো মাসে তেরো মাসের মাইনে দেওয়া হয়। অনিয়ন্ত্রিত কর্মসময়, লোকবল কম, ইত্যাদি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের কোনও জায়গা নেই। নিচুতলার পুলিশকর্মীরা শুধুমাত্র হুকুম তামিল করতে আর রাজনৈতিক ছোট বড় মেজ নেতাদের জোহুজুরিতে দিন অতিবাহিত করে। প্রতিবাদ দূরে কথা, নিদেনপক্ষে নিজের ক্ষোভের কথাও প্রকাশ করা বারণ।

এই অবস্থায় বার বার করে একজনের নাম উঠে এল। কিরণ বেদী। ভদ্রমহিলা অবসরপ্রাপ্তা, তবুও। দেশের প্রথম আইপিএস কিরণ বেদী একদা শিরোনামে এসেছিলেন কনট প্লেসে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভুল জায়গায় পার্ক করা গাড়ি ক্রেন দিয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে। এহেন কিরণ বেদী বা তদানীন্তন ‘ক্রেন’ বেদী ১৯৮৮তে এই তিশহাজারি কোর্টেই চুরির মামলায় এক আইনজীবীকে হাতে হাতকড়া দিয়ে পেশ করাকে কেন্দ্র করে সবলে অধস্তন পুলিশকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে খবর হয়েছিলেন। এই দুর্দিনে পুলিশকর্মীরা যে তাঁকেই স্মরণ করবে, তাতে আর অবাক হবার কী আছে!

যে দাবীটা আরও জোরালো হয়ে উঠছে, সেটা হল নিচুতলার পুলিশকর্মীদের একটা নিজস্ব সংগঠন। আইপিএস অধিকারীদের আছে, তাহলে কনস্টেবল বা এএসআই, এসআইরা কী দোষ করল!

এদিকে, দিল্লি হাইকোর্টের ভূমিকাও প্রশ্নের উর্ধে নয়। যদিও তাঁরা এক বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু তারই সঙ্গে সঙ্গে এই নির্দেশও বলবত করেছেন যে এই ঘটনায় তদন্তের আগে কোনও আইনজীবীকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। অপরদিকে পুলিশের ভূমিকা এবং বিক্ষোভ প্রদর্শনকে নিয়ে জনস্বার্থ মামলা গ্রহণও করেছেন।

ওদিকে বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার ভূমিকাও তথৈবচ। নিজেদের সদস্যদের চাপেই হোক আর যাই হোক, গত পাঁচদিন ধরে তারাও সমস্ত জেলা আদালতের কাজ বন্ধ করে রেখে দিয়েছে, ধর্মঘট! হরতাল! কর্মবিরতি! ঘুণধরা বিচারব্যবস্থা, যেখানে বছরের পর বছর সাধারণ মানুষ তারিখের পর তারিখের চক্করে জীবনটাই গোলকধাঁধায় হারায় তাদের জন্য বিষফোঁড়া।

অবশ্য বার কাউন্সিলের প্রধান মনন মিশ্রের নেতৃত্ব একটি প্রতিনিধি দল পুলিশের সঙ্গে শান্তিবার্তালাপে উদ্যোগী হয়েছে। সেটা বেগতিক দেখে না কি নিজেদের পিঠ বাঁচাতে সেটা আপনারাই বুঝুন।

সব কথা স্বভাবে বলা যায় না। তবুও একটা দুটো কথা না বলে পারছি না। এই যে পুলিশ মানেই ঘুষখোর আর আইনজীবী মানেই চশমখোর এগুলো ভয়ঙ্কর সরলীকরণ। তাহলে প্রতিটি লম্বা দাড়িওলা রবীন্দ্রনাথ, প্রতিটি জিরাফ সত্যজিৎ রায় আর অন্ধকার রাতের প্রতিটি স্ট্রিটলাইট প্রিয়ার জ্যোৎস্নাস্নাত মুখ।

সোশাল মিডিয়া মাধ্যমে মন্তব্য করার সময় এগুলোকে যদি মাথায় রাখি তাহলে এটাও হৃদয়ঙ্গম হবে যে পুলিশেরও মানবিক মুখ আছে, আইনজীবীর সামাজিক জীবন থাকে এবং কার্গিলে সত্যি সত্যিই মাইনাস কুড়ি ডিগ্রিতে সেনাবাহিনি দাঁড়িয়ে থাকে। দোষগুণ সব মিলিয়েই মানুষ আর সেই মানুষই সবাই মিলে সামাজিক নিয়ম তৈরি করে। সেই নিয়মের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। নিয়মরক্ষক বা নিয়মজীবী কেউই নয়। আইন হাতে নেওয়ার ঘটনা শুধু পুলিশ নয় ক্ষমতাবান মানুষ যে যার হিসাবে করতে থাকে, সেটা আমূল বন্ধ হওয়া দরকার। আইনজীবীদের ক্ষেত্রেও এই ধরাকে সরা জ্ঞান করা যেনতেনপ্রকারেণ বন্ধ করতেই হবে। যেখানে পুলিশ কেন সাধারণ মানুষও কোন ছাড়। একইভাবে মানুষের সেবা যাঁদের পেশা তাঁদেরও পেশার প্রতি সৎ থাকতে হবে।

এসব জ্ঞানের কথা বলা সহজ কিন্তু ক্ষমতার ফোসকা যাদের গায়ে, তাদের পক্ষে সাধারণ হয়ে চলাটাই মুশকিল হয়। আর হয় বলেই দলবদ্ধভাবে সত্য-মিথ্যার ঊর্ধ্বে উঠে ক্ষমতা জাহির করা। তবুও স্বপ্ন দেখে যাই। ঠিক যেমন দূষণমুক্ত পৃথিবীর খোঁজে প্রতিদিনের বেঁচে থাকা, তেমনই মানবিক দূষণহীন সমাজের খোঁজে নিয়মিত মাথা চুলকানো। এক প্রতিবাদী চিত্র পরিচালক, যাঁর কদিন আগেই জন্মদিন গেল। তার মিথ হয়ে যাওয়া মন্তব্যটাই না হয় ধরে থাকি প্রাণপণে। ভাবি, ভাবা প্র্যাকটিস করি। যূথবদ্ধ নিয়মহীনতা থেকে যদি মুক্তি পাওয়া যায়!

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1920 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...