এক সুবর্ণ সুযোগ উপস্থিত হয়েছে ভারতের মুসলমানের সামনে

রেজাউল করীম

 

অযোধ্যা মামলা একটি জটিল ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক বিষয় যার পরিধি ব্যাপৃত প্রায় দেড়শো বছর ধরে। এই মসজিদের ইতিহাস এখন সবাই জানেন। ১৫২৮ সালে বাবরের একজন সেনাপতি মীর বাকি এই মসজিদ নির্মাণ করেন। বাবর ইব্রাহিম লোদিকে হারিয়ে দিল্লির মসনদ অধিকার করেন ১৫২৬ সালের এপ্রিল মাসে। ১৫২৮ সালের আগে তিনি নিষ্ঠাবান মুসলিমের কর্তব্য পালনে যে বাধ্যবাধকতা তা মানতেন না। তিনি সুফি মতবাদে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু গোঁড়া ধর্মপ্রাণ ছিলেন না। তিনি মদ্যপান ও মাজুন (আফিম) খেতেন বলে নিজের স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন। ১৫২৮ সালে তিনি তাঁর সোনার পানপাত্রগুলি ভেঙে ফেলেন বলে গুলবদন বেগম জানিয়েছেন (হুমায়ুন নামা)। তাঁর মদ্যপান ও অন্যান্য নেশার ফাঁকে ফাঁকে তিনি ধর্মীয় কর্তব্য পালনও করেছেন। কিন্তু, তাঁর স্মৃতিকথায় ধর্মের কচকচানি নেই বললেই চলে। তাঁর মদ্যপান ত্যাগ যতটা না ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের জন্য, তারচেয়ে বেশি হল অসুস্থ পুত্রসন্তানের অকালমৃত্যুর ভয়ে। বস্তুত গুলবদন বেগম তাঁর ভাইয়ের জীবন রক্ষার্থে বাবরের প্রার্থনার কাহিনি লিখেছেন। যদিও একথা মনে রাখতে হবে যে গুলবদন বেগম তাঁর পিতার মত কোন ডায়েরি লেখেননি। তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই হুমায়ুন সিংহাসন লাভ করলে তাঁদের পিতার সম্পর্কে সবার কাছে জানতে চান। গুলবদন তখন এই কাহিনি রচনা করেন। অনেক কিছুই তাঁর অজান্তে হয়েছে, প্রাসাদের রাজনীতি সম্পর্কেও তিনি অজ্ঞ ছিলেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর পিতার সাক্ষাৎ যথেষ্ট অনিয়মিত ছিল। তাই, তাঁর রচনায় যতটা সাহিত্যগুণ ততটা ইতিহাস নেই। সেই কারণে পুত্রের জন্য পিতার জীবন দানের গল্পটি সন্দেহজনক। যাইহোক, বাবর ও তাঁর কন্যা কেউ মীর বাকির মসজিদ নির্মাণের উল্লেখ করেননি। বস্তুত তাঁর বিস্তৃত ডায়েরিতে তিনি অকপটে তাঁর যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়, পানাভ্যাস, পারিবারিক সমস্যা, গঙ্গা দর্শন, বিহারের আরার মত ছোট শহর পরিদর্শনের কথা লিখলেও অযোধ্যা বা সেখানে মসজিদ নির্মাণের কোনও উল্লেখ করেননি। এ কথা ঠিক জানা সম্ভব নয় যে, এই মসজিদ মীর বাকি নিজে থেকেই বানিয়েছিলেন নাকি বাদশার তাতে সম্মতি ও নির্দেশ ছিল। অনেকে অবশ্য মনে করেন আওরঙ্গজেব এই মসজিদ নির্মাণ করেছৃন।  যাইহোক, সুপ্রিম কোর্ট এই মসজিদকে বাবরি মসজিদ বলেই সম্বোধন করেছে।

এই মামলার রায়ের দ্বিতীয় প্যারায় কোর্ট মন্তব্য করেছে, “This Court is tasked with the resolution of a dispute whose origins are as old as the idea of India itself.” এই ভাষা নির্দেশমূলক নয় বলেই ধারণা। কোর্ট এখানে যেন arbitration করছে বলে মনে হয়। এই প্যারাটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, কোর্টের যে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ তার সঙ্গে তার কার্যকরী নির্দেশের কিছু তফাৎ আছে। কোর্ট বলছে: মসজিদের বাইরের আঙিনায় পুজো হত। ভেতরে মুসলিমরা নামাজ পড়ত। মুসলিমরা এই মসজিদের উপর তাদের দাবী ত্যাগ করেনি। ১৯৪৯ সালে রামলালার মূর্তি মসজিদের ভেতরে স্থাপন বেআইনি। মসজিদ ভেঙে ফেলা বেআইনি। অর্থাৎ মসজিদের মালিকানা যৌথ। যে ২.৭৭ একর জমি নিয়ে এত কাণ্ড তা কি করে তাহলে রামলালাকে দেওয়া হয়? রামলালা ও মসজিদ দুটির আইনি স্বীকৃতি তো সুপ্রিম কোর্ট স্বীকার করে নিয়েছেন। দুটি পার্টির সমানাধিকার স্বীকার করে কেবল একটি পার্টিকে বেছে নিয়ে মন্দির নির্মাণ করতে দেওয়া যুক্তির দিক থেকে ফাঁকা ও একপেশে মনে হয়। লাগাতার শুনানি উপলক্ষে মাননীয় প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন: মামলাটি জমির বিবাদ, এখানে বিশ্বাস ও আস্থার কোনও স্থান নেই। বিচারপতি রায় লিখবেন, তার পরে কী হবে তা দেখার দায়িত্ব সরকারি প্রশাসনের। মালিকানা নিয়ে dispute resolution-এর দায়িত্ব নিয়ে আদালত কেন ASI রিপোর্ট দেখতে চাইল, কোন যুক্তিতে এক পক্ষকে মালিকানা প্রমাণ করতে বলল তা যেমন পরিষ্কার নয়, তেমনি কোথাও বলা নেই মালিকানা সমস্যার সমাধান করতে কেন যথাক্রমে সরকার ও ল বোর্ডকে মন্দির ও মসজিদ নির্মাণ করতে বলল। কোর্ট সরকারকেই মন্দির ও মসজিদ নির্মাণের দায়িত্ব না দিয়ে সরকারকে মন্দির নির্মাণে ট্রাস্ট গঠন করতে বলল, অথচ বাদীপক্ষ কোর্টের কাছে এই রিলিফ চায়নি। আরও আশ্চর্যের কথা পাঁচ একর জমি যাদের দেওয়া হচ্ছে তাদের উপর জমি ব্যবহারে কোনও নির্দেশিকা নেই। মন্দির নির্মাণের জন্য ২.৭৭ একরের বাইরে আরও জমি লাগলে তাও দিতে বলেছে। এই রায় তাই অনেকের কাছে খুব আশ্চর্যজনক ঠেকেছে।

অবশ্য, এই রায় তখন সম্ভব যদি মামলাটিকে arbitration বলে আখ্যা দেওয়া যায়। যেখানে বেশিরভাগ পিটিশনারের সম্মতির ভিত্তিতে একটি আইনি বিসম্বাদের সুরাহা হয়। এই পরিপ্রক্ষিতে দেখলে এই দীর্ঘ রায়ের যৌক্তিকতা স্বীকার করা যায়। সুপ্রিম কোর্ট একাধিক জায়গায় এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিত ব্যাখা করতে গিয়ে আস্থা ও বিশ্বাসের প্রশ্নটিকে গুরুত্ব না দেওয়ার কথা বলেছে অথচ, মসজিদের নীচে কি কি কাঠামো খুঁজে পেয়েছে তার বিস্তৃত ব্যাখা করেছেন। মনে হচ্ছে যেন আস্থার প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্ট নিজের নিরপেক্ষ অবস্থানের সপক্ষে যুক্তি খুঁজে বেড়াচ্ছে। দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়ের লেখায় দেখেছি তিনি বলেছেন যে বঙ্গভূমি একসময় বৌদ্ধ স্তূপে ছেয়ে ছিল এবং এমন গ্রাম খুঁজে পাওয়া যেত না যেখানে তথাগতের ভজনা হত না। মন্দির মসজিদের তলা খনন করলে সেখানে হয়তো কোনও না কোনও ভগ্নাবশেষের অস্তিত্ব ধরা পড়বে। হয়তো অনেকের বাড়ির নীচেও সেরকম কাঠামো পাওয়া যাবে। তাহলে সে বাড়ি বা সম্পত্তি কি পুরনো কাঠামোর মালিক পাবেন। পরবর্তীকালে কৃষ্ণ জন্মভূমির আন্দোলন শুরু হলে তার মালিকানা কার হবে? এই সব নানা প্রশ্ন উঠে এসেছে। সম্পত্তির আইনি মামলায় অতীত কাঠামোর কোনও গুরুত্ব নেই। তাই, অতীত কাঠামোর ভিত্তিতে নির্দেশ অত্যন্ত হাস্যকর ও ছেঁদো যুক্তি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, মন্দির সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়েও মন্দির বানানোর নির্দেশ আর মসজিদের সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েও মসজিদের সম্পর্কে কোনও রায় না দেওয়া। একদিকে মসজিদ ভাঙাকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে আবার যারা আইন ভেঙেছেন তাদের পুরো জমি দান করা। এই রকম নানা বিতর্ক এই রায় নিয়ে হবে এটা স্বাভাবিক।

আমার বিশ্বাস, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মুখ্য উদ্দেশ্য দেশে শান্তির বাতাবরণ তৈরি করা ও হিন্দু পক্ষকে মন্দির বানাতে সাহায্য করলেও মুসলিম পক্ষকে উপযুক্ত জমি দিয়ে বিতর্কিত অংশের বাইরে মসজিদ নির্মাণ করতে সাহায্য করা। এই আইনি ব্যবস্থা অবশ্যই দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।এই একখণ্ড জমির বিনিময়ে শান্তি ও সুস্থিতির বাতাবরণ তৈরি করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই, মুসলিম পক্ষের উচিত এই রায় মেনে যে পাঁচ একর জমি তারা পাবে তার সদ্ব্যবহার করা।

জাফর জিলানি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ নিয়ে আইনি পদক্ষেপের কথা বলেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এই পদক্ষেপ অপ্রয়োজনীয়। দেশের সবচেয়ে বড় আদালতের এই রায় মেনে নেওয়া উচিত। তিনি কথায় কথায় শরিয়ত ইত্যাদির তুলনা টেনেছেন। একথা ভুললে চলবে না যে, তথাকথিত শরিয়তের নাম করে উপমহাদেশে  যা জাহির করা হয় তা হল উম্মায়েদ ও আব্বাসি খলিফাদের মনোমত ধর্মীয় বিধিনিষেধ। মুসলিমদের কাছে তার থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হল হজরত মহম্মদের জীবন ও বাণী। হাদিস নামে যে সব কথা মুসলিমদের এই উপমহাদেশে পালন করতে দেখা যায় সংখ্যার দিক থেকে তা এত বেশি যে অবিশ্বাস্য। বেশিরভাগ হাদিস তাই জইফ (দুর্বল)। সহিহ হাদিস মুষ্টিমেয়। এইসব হাদিস নিয়ে মুসলিমরা যেমন চর্চা করেছেন তেমনি বিরোধী খ্রিস্টান ও ইহুদিরাও চর্চা করেছেন। উপমহাদেশে মহম্মদের নামে যেসব উপকথা চালু আছে, তার অনেক কিছুই যে অবাস্তব তা মুসলিম ও অমুসলিম জীবনীকাররা স্বীকার করে নিয়েছেন। দুটি ঘটনার উল্লেখ প্রায় সবাই করেছেন। একটি আবরাহার কাবা আক্রমণের সময় মুহম্মদের পিতামহের সিদ্ধান্ত। আরেকটি ৬২৮ সালে স্বয়ং নবীর জীবনের ঘটনা।

আবরাহার ঘটনাটি কোরানেও উল্লেখ আছে। আবরাহা যখন মক্কা আক্রমণ করেন তাঁর অর্থনৈতিক কারণ ছিল তাঁর নিজের নির্মিত কাবার প্রতি আরবদের উদাসীনতা। তাঁর বিশাল সৈন্য যখন মক্কা আক্রমণ করে তখন কাবার রক্ষাকর্তা আব্দুল মোত্তালিব তাঁর উটগুলি নিয়ে নিকটবর্তী পাহাড়ে আশ্রয় নেন। প্রাণহানি কমানো ও শক্তিক্ষয় বাহুল্য মনে করে তিনি বললেন: আল্লাহর ঘর আল্লাহ্ রক্ষা করুন, আমার উট আমি রক্ষা করব।

হোদায়বিয়ার সন্ধি নামে খ্যাত ঘটনাটি ঘটে ফেব্রুয়ারি ৬২৮ সালে। মক্কার পবিত্র মাসে নবী ঠিক করলেন তিনি হজ্বে যাবেন ও উমরা করবেন। কোরেশরা তা করতে দেবেন না। নবির সঙ্গে প্রায় ১৪০০ যোদ্ধা থাকা সত্ত্বেও তিনি অসম্মানজনক চুক্তি মেনে নেন। চুক্তির মুসাবিদা করেন আলী। যখন কোরেশরা বললেন, চুক্তিতে আল্লাহর নবী শব্দটি লেখা চলবে না, তখন নবী হেসে বললেন আবদুল্লার পুত্র মুহম্মদ লেখো। এই অনাক্রমণ চুক্তির শর্ত অনুসারে মুসলমানরা উমরা না করে আবার মদিনায় ফিরে যান।

চুক্তি বা রায় আপাতদৃষ্টিতে অসম্মানজনক মনে হলেও দেশের স্বার্থে তা মেনে নেওয়া উচিত। এই মন্দির মসজিদের লড়াইয়ে হাজার হাজার মানুষের জানমালের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ খুন হয়েছেন, ভিটেমাটি ছাড়া হয়েছেন।

অথচ, নামাজের জন্য মসজিদ লাগবেই এমন বাধ্যবাধকতা ইসলামে নেই। তাই মসজিদের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হল বিদ্যালয়, শিক্ষাকেন্দ্র— যেখানে জ্ঞানচর্চা হবে। মুহম্মদ নিজে জ্ঞানচর্চা করার উপর গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, “যে নিজেকে চিনল সে আল্লাহকে চিনতে পারল” (মান আরাফা নাফসুহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহ। বা আল ইনসানা সিররি ওয়া আনা সিররুহু)। কীভাবে নিজেকে চিনতে হবে তাও কোরানের একাধিক জায়গায় বলে দেওয়া আছে। তা হল জ্ঞান ও বিজ্ঞানের চর্চা। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনও ধর্মগ্রন্থ নেই যেখানে অন্য-বিশ্বাসী মানুষ খুন করার বিধান দেওয়া হয়নি। কোরানের মূল নিয়মাবলী ইহুদি ধর্মপুস্তক থেকে নেওয়া। কোরানে তার উল্লেখও আছে। সেখানে হাত কেটে দেওয়া, পাথর ছুঁড়ে মারার বিধান দেওয়া আছে। অন্য আরও অনেক ধর্মপুস্তকে এমনকি আত্মীয় খুনে প্ররোচিত করা হয়েছে। কোরান তার ব্যতিক্রম নয়। তার মধ্যে যা যুগোপযোগী তা গ্রহণ করাই বাঞ্ছিত। কোরান গ্রন্থনার সময় প্রায় ৫৫০টি আয়াত বাতিল করা হয়। কোরান সঙ্কলনে সবচেয়ে বেশি অবদান আলী ও মাসুদের। আলী যে সঙ্কলন করেছিলেন— “The surahs were sorted according to the order of their descent in Ali’s manuscript and according to their lengths in the manuscript of Abdullah ibn Masood”। কিন্তু যে কোরান এখন পাওয়া যায় তা হল দৈর্ঘ্য অনুসারে সাজানো। তাই, ঘটনা পরম্পরা বোঝা যায় না। এমন অনেক বিধান আছে যা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর কিন্তু যেহেতু সময় অনুসারে সাজানো নয়, তাই এই বিবরণ অনুপস্থিত। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, নানা কারণে মাসুদকে গুরুত্ব না দেওয়া ও তাঁকে প্রথমে জোর করে বসরায় পাঠিয়ে দেওয়া। যা কোরানের সঙ্কলনে কালানুক্রমিকতার পক্ষে সহায়ক হয়নি। কোরানে নোক্তা যোগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে উচ্চারণগত ভেদ দূর হয়েছে কিন্তু অনারবীয়দের ভাষান্তরে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এই জটিলতা আরও বেশি হয়েছে রূপকার্থে ব্যবহৃত আয়াতে। তাই, যে ব্যাখ্যা সাধারণ মুসল্লিরা দেন আর যে ব্যাখ্যা তানজুল ইমান বা মহাকবি রুমির মসনবিতে আছে তা প্রায়শ মেলে না। বস্তুত মসজিদের জায়গায় অন্য কিছু করা যাবে না এ সংক্রান্ত ব্যাখ্যাটি তাই গ্রহণযোগ্য নয়। এই ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা তাঁদের যাঁরা ইসলামের রীতির চেয়ে তত্ত্বে বেশি শিক্ষিত— যাঁরা রীতি জানেন তাঁরা আলেম বা মওলানা; যাঁরা তত্ত্ব জানেন, তাসাউফ যারা চর্চা করেছেন (ইলমে ইলাহি); তাঁরা তাত্ত্বিক, সুফি, মার্গদর্শক। তাই, যেসব বিশ্লেষণ থেকে জিলানি সাহেব পুনরায় কোর্টে যাওয়ার কথা বিবেচনা করছেন তা ভালো করে ভাবা দরকার ও সেই সব শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করা দরকার যারা তাসাউফের জ্ঞানে উজ্জ্বল। আমার বিশ্বাস বর্তমান পরিস্থিতিতে মুসলিমদের কাছে একটি সুবর্ণ সুযোগ উপস্থিত হয়েছে সাম্প্রদায়িক স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করার। ফ্যাসিস্ট শক্তি ও তাদের হোয়াটসআপ বিশ্ববিদ্যালয়  মুসলিমদের সম্পর্কে উপমহাদেশের মানুষের মন বিষিয়ে তুলেছে। মুসলিমরা এখন স্বচ্ছন্দে তাদের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারেন। এই রায়কে সহজভাবে গ্রহণ করা তার প্রথমিক পদক্ষেপ। যেভাবে নবী একসময় অসম্মানজনক শর্তে হোদায়বিয়ার সন্ধি করেছিলেন অথচ, কোরানে এই সন্ধিকে ফতহুম মবিন অর্থাৎ মহাবিজয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রাগসর হয়ে, আধুনিক শিক্ষার আলোকে আলোকিত জাতি সম্প্রদায় ও দেশকে আলোকিত করবে। জাগতিক ও পারত্রিক লাভের জন্য শিক্ষা প্রয়োজন। আত্মানং বিদ্ধির কথা ভাবতে গিয়েই ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ হয়েছিল। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ যে ধারা তৈরি করেছিলেন, তা এক সময়ে দেশে জ্ঞানবিজ্ঞানের জোয়ার এনেছিল। তিলকের জ্ঞানের দীপ্তিতে হিন্দুধর্মেরও প্রভূত উপকার হয়েছিল। ব্রাহ্মণ্য-প্রতিবাদী সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসও প্রায় একরকম। শিক্ষার চেতনা বিপ্লবের সূচনা করে। বর্তমান সময়ে একটি আদ্যন্ত ফ্যাসিবাদী সরকারের রাজত্বকালে মুসলিমদের হাতে সুপ্রিম কোর্ট একটি অস্ত্র তুলে দিয়েছে। সারা পৃথিবীর কাছে নিজের মর্যাদা তুলে ধরে হিন্দু ও ওয়াহাবী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বৌদ্ধিক সংগ্রাম শুরু করার এই সুযোগ হেলায় হারানো উচিত হবে না বলে আমার অভিমত।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1906 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...