শান্তি আর সৌহার্দের আবেদন কি হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীদের কানে পৌঁছেছে

সন্দীপ পাণ্ড্যে, যুগলকিশোর শাস্ত্রী এবং লুবনা সারোয়াথ

তর্জমা: সত্যব্রত ঘোষ

 

অয্যোধ্যা মন্দির-মসজিদ বিবাদ মেটাতে সুপ্রিম কোর্টের রায়দান উপলক্ষে কয়েকজন বাদে, প্রত্যেক রাজনৈতিক নেতা এবং সমাজে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ জনগণকে শান্তি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখবার জন্য আবেদন রেখেছেন। রায়টিতে বলা হয়েছে অকুস্থলের ২.৭৭ একর এলাকার সমগ্রটাই রাম মন্দিরের নির্মাণে ব্যবহৃত হবে। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সরকারকে মসজিদ নির্মাণের জন্য অন্যত্র ৫ একর জমির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, “আদালতের রায়কে সমাজের প্রতিটি শ্রেণি, প্রতিটি ধর্মের মানুষ যেভাবে স্বাগতম জানিয়েছেন তা ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতি এবং পরম্পরার প্রতি তাঁদের আস্থার প্রমাণ দেয়।” রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের পক্ষ থেকেও জনসাধারণকে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায়ের আবেদন রাখা হয়েছে। ৯২ সালে রথযাত্রার কাণ্ডারি লালকৃষ্ণ আদবানি তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন তিনি নিজের দায়িত্ব প্রতিপালন করে আজ ধন্য। এবার দেখা যাক বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত বর্ষীয়ান এই বিজেপি নেতার জন্য আদালতে কী রায় দেওয়া হয়।

সুপ্রিম কোর্টের রায়টিতে বলা হচ্ছে, “১৮৫৭ সালে আউধকে ব্রিটিশরা সংযুক্তিকরণের আগে জমিটির ভিতরের অংশটিতে হিন্দুদের আরাধনা করবার সম্ভাব্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। মুসলমানরা কিন্তু এমন কোনও প্রমাণ দাখিল করেননি যাতে বোঝা যায় যে ভিতরের সেই অংশটি ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মাণের সময় থেকে ১৮৫৭ অবধি শুধুমাত্র তাঁদেরই মালিকানায় ছিল।” দাখিল করা সব নথিপত্র ঘেঁটে মহামান্য আদালত বিবাদের কেন্দ্রস্থল রূপে চিহ্নিত জমিটির মালিকানা হিন্দুদের জিম্মায় দিয়েছে। রায়টিতে আদালত এই প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, “২২/২৩শে ডিসেম্বর ১৯৪৯-এর রাতের অন্ধকারে জমির মধ্যে বিগ্রহ রাখবার পরে মুসলমানেরা এখানকার মসজিদে প্রার্থনার অধিকার এবং মালিকানা হারিয়েছেন।” সেই বিষয়ে আদালতের অবস্থান স্পষ্ট। “সাড়ে চারশো বছরের বেশি সময় আগে নির্মিত একটি মসজিদের অধিকার থেকে মুসলমানদের বঞ্চিত করাটা অন্যায়।”

অর্থাৎ, আদালত স্বীকার করে নিচ্ছেন যে ১৮৫৭ থেকে ১৯৪৯ অবধি মুসলমানেরা এই মসজিদে নামাজ পড়েছেন, যদিও ১৮৫৭ সালের আগে সেই ব্যাপারে কোনও প্রমাণ নেই। একই সঙ্গে আদালত মেনে নিচ্ছেন ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মাণের সময় থেকে ১৮৫৭ অবধি স্থানটি মুসলমানদেরই মালিকানায় ছিল। এই বিষয়ে আদালতের রায়টিতে বলা হচ্ছে, “জমিটি বাঁটোয়ারা করে দিলে কোনও পক্ষেরই স্বার্থ পূরণ হবে না, এবং এলাকায় শান্তি স্থাপন করা যাবে না” বলেই জমিটি হিন্দুদের হাতে তুলে দেওয়া হল। তাই ভারসাম্য বজায় রাখতে আদালতকে বলতে হয়, “ধর্মনিরপেক্ষ এক রাষ্ট্রের সংবিধান প্রদত্ত আইন অনুসরণ করে যদি মুসলমানদেরই মালিকানা অগ্রাহ্য করা হয়, তাহলে এই আদালতের থেকে সুবিচার পাওয়া সম্ভব নয়। সংবিধানে যে সাম্যতার ভাবনাকে মান্যতা দেওয়া হয়েছে, তা সেক্ষেত্রে ব্যর্থ হবে। সকল ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ায় সহাবস্থানের মধ্যে দিয়েই ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখবার জন্য আমাদের রাষ্ট্রের এবং জনগণের দেওয়া দায়বদ্ধতার ভাবনাকে নিবিড় করা প্রয়োজন।”

এই রায়ের উদ্দেশ্য এবং রায়দানের আগে এবং পরে কর্তৃপক্ষ দ্বারা জারি করা রাজনৈতিক এবং সমাজ সংগঠনের নেতৃবৃন্দদের যে আবেদন আমরা শুনেছি, তার প্রতিপাদ্য বিষয় আমাদের চোখে স্পষ্ট। অযোধ্যা বিবাদের মধ্যস্থতায় আদালত যে রায় দিয়েছেন, তাতে সংখ্যাগরিষ্ঠদের মন রাখতে আপস করার অভিপ্রায় ফুটে উঠেছে বলেই বিচারটি যথাযথ কিনা তা নিয়ে সংখ্যালঘুদের মনে জেগে ওঠা সন্দেহ প্রশমিত করবার যথাসাধ্য প্রয়াস রয়েছে এতে। জম্মু কাশ্মিরে ‘শান্তি’ সুনিশ্চিত করতে কড়া সুরক্ষা ব্যবস্থা জারি করবার পদক্ষেপটির মতো।

বর্তমান লেখকদের প্রথম দুজন অযোধ্যায় সরযু কুঞ্জে রাম জানকী মন্দিরে গত ১৭-১৮ আগস্ট ২০১৯-এ একটি সাম্পদায়িক সম্প্রীতি কর্মশালা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাতে বিশিষ্ট লেখক অধ্যাপক রাম পুনিয়ানির অংশগ্রহণের কথা ছিল। কিন্তু সেই কর্মশালা অনুষ্ঠিত করবার অনুমতি দেননি কতৃপক্ষ। ‘সর্ব ধর্ম সদ্ভাব ট্রাস্ট’-এর নামে একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যাপারে নিষেধ ঘোষণা করে আগস্ট মাসে একটি নোটিশ জারি করেন অযোধ্যার রেসিডেন্ট ম্যাজিস্ট্রেট। ‘সর্ব ধর্ম সদ্ভাব ট্রাস্ট’-এর পরিকল্পনা ছিল অযোধ্যায় একটি বহু-ধর্ম-সংহতি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে সবার কাছে এই বার্তা পৌঁছানো যে হিন্দু, ইসলাম, বৌদ্ধ, জৈন এবং শিখ— অন্তত এই পাঁচটি ধর্মের মানুষদের চোখে অযোধ্যা এক পবিত্র স্থান। সেই হিসেবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক মিলনস্থল হিসেবে তা চিহ্নিত করা হোক।

গত ১৯শে আগস্ট উল্লেখিত লেখকরা রাম জানকী মন্দিরে একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজনের উদ্যোগ নিলে স্থানীয় পুলিশ এসে তাঁদের আটক করে। গত চার মাস ধরে সরকার চাইছেন না রাম মন্দির নির্মাণের সপক্ষে বলা ছাড়া আর কোনও অভিমত অযোধ্যায় আলোচিত হোক। এভাবেই দেশে ‘শান্তি’ আর ‘সহাবস্থান’ চাপিয়ে রাখা হয়েছে।

১৯৯২ সালে যখন ভারতীয় জনতা পার্টি উত্তরপ্রদেশে শাসনক্ষমতায় ছিল, তখন যদি এমন কড়া নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে মসজিদটি ভাঙা যেত না। ভাঙবার পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং সুপ্রিম কোর্টে জবাবদিহি করতে এসে জানান সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবার প্রতিশ্রুতি তিনি ফিরিয়ে নিচ্ছেন। কারণ, তাঁর প্রথম পরিচয় তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের একজন সদস্য, তারপরে তিনি ভারতের একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।

২০০২-এ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ি গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ‘রাজধর্ম’ পালনের জন্য সতর্ক করে দেন। তৎকালীন রক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজও সেনা মোতায়েন করতে চান। কিন্তু সব সাবধানবাণী এবং প্রতিরোধের ব্যবস্থা অগ্রাহ্য করে গুজরাটে তিন দিন ধরে দাঙ্গা চলতে থাকে। আমাদের মনে থাকা উচিৎ যে বর্তমান রায়দানের সতেরো বছর আগে করসেবকরা অযোধ্যায় শিলাপূজন করে ফিরছিলেন। পথে গোধরা স্টেশনে তাঁদের ট্রেনটিতে আগুন লাগার পর থেকেই গুজরাটে হিংসার সূত্রপাত।

এই বছরের গোড়ার দিকে সুপ্রিম কোর্ট যখন কেরালার সবরিমালা মন্দিরে ঋতুমতী মহিলাদের প্রবেশাধিকারের নির্দেশ দেয়, তখন গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ এবং মোহন ভাগবত তা মেনে নেননি।

হিংসা আর ঘৃণা নিয়ে হিন্দুত্বের যে রাজনীতি তৈরি হয়েছে, তার সূত্রপাত মহাত্মা গান্ধির হত্যা দিয়ে। ২০১৮ সালে তফসিলি সংরক্ষণ বিধির প্রতিবাদে একদল মানুষ যখন দিল্লির যন্তর মন্তরে সংবিধান বইগুলির পাতা প্রকাশ্যে ছিঁড়ে পোড়ায়, তখন সেই রাজনীতির হোতারা সেই ঘটনাটিকে গুরুত্ব দেননি।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে যে উগ্র রাজনীতি পরোয়া করে না, সেই রাজনীতি যখন সংবিধান প্রদত্ত সাম্যতা এবং সৌহার্দের প্রতি আজ নতুন করে আস্থা খুঁজে পায়, তাহলে তা চিন্তার বিষয় বইকি। বোঝাই যায় এবারকার জনমত গঠনের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল এবং তাতে বহু মুসলমান সংগঠনকে সামিল করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের সঙ্গেও আলোচনা করে আলোচ্য রায়টির প্রেক্ষাপট রচনা করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, শান্তি আর সম্প্রীতি রক্ষার জন্য এই যে জনমত গঠনের উদ্যোগ, তা কি শুধু অযোধ্যা মামলার রায়দানেই আটকে থাকবে?

বিজেপি/আরএসএস যদি সত্যিই ভেবে নেয় এখন থেকে দেশে শান্তি আর সম্প্রীতির পরিবেশ স্থাপিত হল, তাহলে আমরা আশা করতে পারি গণপিটুনি, বুদ্ধিজীবীদের উপর হিংস্র আক্রমণ, সংখ্যালঘু এবং দলিতদের প্রতি বিভেদের মানসিকতা এবং বিদ্বেষমূলক রাজনীতির অবসান হবে। তাঁদের নেতারা কি প্লেসেস অফ ওয়ারশিপ (স্পেশাল প্রভিশন) অ্যাক্ট, ১৯৯১-কে মান্যতা দিয়ে আরাধ্য স্থানের রূপান্তরকে এবার নিষিদ্ধ করবেন? মনে রাখতে হবে অযোধ্যার ক্ষেত্রে আরাধ্য স্থানকে যেভাবে রূপান্তর করা হয়েছে, সেভাবে কিন্তু অন্যত্র করা হয় না।

লখনউ-এর ইন্দিরা নগরে মাজার মোড়ের একদিকে মুসলমানেরা বহুবছর ধরে নামাজ করে এসেছেন। একদিন একটি গাছের নীচে একটি পাথর রাখবার পর হিন্দুরা ওখানে মূর্তিপূজার প্রচলন ঘটিয়েছেন। এখন জায়গাটিতে একটি প্রভিন্সিয়াল আর্মড কনস্টেবিয়ুলারি ক্যাম্প বানানো হয়েছে। গত মাসে, ২৩শে অক্টোবর, একটি টিভি চ্যানেল আয়োজিত বিতর্কসভায় তৃতীয় লেখককেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মুখপাত্র বিনোদ বনসাল স্বীকার করলেন কাশী এবং মথুরা ছাড়াও তাঁদের হাতে ৩০,০০০-টি জায়গার একটি তালিকা আছে যেখানে মন্দির ভেঙে ইসলামি কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছিল। বিজেপি/আরএসএস-এর প্রধানরা কি বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতাদের বুঝিয়ে বলবেন শান্তি আর সম্প্রীতি রক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়েছিল বলেই আতঙ্কবাদীরা এদেশে আক্রমণের সাহস পায়। এর পরেও যদি অবিবেচকদের মতো আচরণ না থামে, তাহলে ভারত আরও গভীর সমস্যার সম্মুখীন হবে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1906 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...