প্রতিবাদ করুন, রুখে দাঁড়ান: একটি প্রতিবেদন

আশরাফুল আমীন সম্রাট

 

কাশ্মিরে ৩৭০ ধারা উচ্ছেদের পর সংবাদেরর শিরোনামে আসেন কান্নান গোপীনাথন। বাকস্বাধীনতা রক্ষা হচ্ছে না বলে আইএসএস অধিকর্তার পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে প্রকাশ্য প্রতিবাদে নেমে পড়েন এই স্বাধীনচেতা মালয়ালি যুবক। কাশ্মিরে সম্পূর্ণ অসংবিধানিকভাবে ৩৭০ ধারা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে প্রতিবাদ থেকে শুরু। স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে কথা বলার পুরস্কার হিসাবে তাঁর অবসরকালীন যাবতীয় পাওনাগণ্ডাও এখন আঁটকে দেওয়া হয়েছে। তবুও সেসবের তোয়াক্কা না করে দেশ জুড়ে একের পর এক সংগঠনের ডাকে কেন্দ্রীয় সরকারের যাবতীয় স্বৈরাচারী জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদসভা ও সচেতনতা শিবিরে যোগদান করছেন কান্নান। এখন তিনি সবথেকে বেশি সরব এনআরসি ও ক্যাবের বিরুদ্ধে।

গতকাল কলকাতার এন্টালির ভূপেশ ভবনে বীরসা মুন্ডার জন্মদিবস উপলক্ষ্যে অল ইন্ডিয়া পিপলস ফোরাম আয়োজিত এমনই এক সভায় তিনি বলেন, “এই এনআরসির জন্য ২২ রকমের কাগজপত্র জোগাড় করার পরও ২৩ নম্বর কাগজে আপনাকে বাদ দেওয়া হবে।” তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে যে, অসমে ১৯ লক্ষ মানুষকে বেনাগরিক করে দেওয়ার পরও দেশের মানুষ নীরব। জোরালো প্রতিবাদ করছে না। এরকম প্রতিবাদহীন নীরবতাই বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি। দেশের সংবিধান মানুষকে নাগরিকত্ব দিয়েছে। হঠাৎ একটা তালিকা বানিয়ে মানুষকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া কোনও সভ্য রাষ্ট্রের কাজ নয়। তিনি আরও বলেন এর ফলে সবথেকে বেশি বিপদে পড়বে গরীব এবং সাধারণ মুসলমান। “গরীব মানুষের পক্ষে ৭০ বছর আগের নথিপত্র হাজির করা সম্ভবই নয়।” তিনি আরও যোগ করেন, “এই সরকার ৫৪৩ আসনে জিতে এসেছে বলে তার সব কাজকে বিনা প্রতিবাদে মেনে নিতে হবে, সেটা হতে পারে না।”

পিপলস ফোরামের সহযোগী হিসাবে প্রতিবাদ সভায় অংশগ্রহণ করেছিল বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চ। তাদের তরফ থেকে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক সামিরুল ইসলাম ও অধ্যাপক সৌম্য সাহিন। উপস্থিত ছিলেন অসমে এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ পার্থপ্রতিম মৈত্র। পার্থপ্রতিমবাবু তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন কীভাবে অসমের সাধারণ গরীব মানুষ পেটের চিন্তা বাদ দিয়ে নিজেকে দেশের নাগরিক প্রমাণ করতে ভিটেমাটি খোয়াচ্ছে। সাধারণ মানুষের উপর কি নিদারুণ অত্যাচার নামিয়ে আনা হয়েছে এনআরসি-র নামে, ডিটেনশন ক্যাম্প চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা দুষ্কর। তিনি আরও বলেন যে বেনাগরিক হওয়া মানুষজন এবার পেটের দায়ে বাধ্য হবে অতি সস্তার শ্রমিক হিসাবে বৃহৎ পুঁজির বাজারে খাটতে। পুঁজিপতিদের সঙ্গে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের এই গোপন আঁতাত এবার ধীরে ধীরে খোলসা হচ্ছে বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করেন।

বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চের সৌম সাহিন বলেন, “ধর্মের নামে মানুষকে বোকা বানানো হচ্ছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে। বিজেপির নেতারা বলছেন, ক্যাবের মাধ্যমে নাকি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাঁচিয়ে দেওয়া হবে। নির্ভেজাল অসত্য কথা। কারন নাগরিকপঞ্জিতে যাদের নাম উঠবে না তারা সবাই-ই নাগরিকত্বের আবেদন জানাতে পারবে ছয় বছর বেনাগরিক থাকার পর। নাগরিক প্রমাণে লাগবে ওপার বাংলায় অত্যাচারিত হয়ে এদেশে আসার নথিপত্র। এহেন উদ্ভট শংসাপত্র অন্য কোনও দেশের সরকার দেবে না। এমনকি ততদিনে লাখ লাখ আবেদন জমা পড়ে যাবে।” সেই সঙ্গে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, সেইসব মামলার নিস্পত্তির জন্য আমৃত্যু অপেক্ষা করেও বিচার মেলার সম্ভাবনা কম। ভোটাধিকারহীন বেনাগরিককে নাগরিক পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কতখানি সদিচ্ছা থাকবে সেটা সহজেই অনুমেয়।

আলোচনায় উঠে এল এনআরসি আসলে দেশের মূল সমস্যা থেকে মানুষের নজর ঘোরানোর এক শাসকীয় চক্রান্ত। গত পঁয়তাল্লিশ বছরের মধ্যে রেকর্ড বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি, কৃষকের আত্মহত্যা, ক্ষুধা সূচকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের চেয়েও নীচে অবস্থান। এরকম জলন্ত সমস্যাগুলোকে এনআরসি ও ক্যাবের নামে আড়াল করা হচ্ছে বলে আলোচকরা মনে করছেন। বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চের সভাপতি সামিরুল ইসলামের কথায়, ব্যাঙ্ক ও স্বল্পসঞ্চয় প্রকল্পে ক্রমাগত সুদ কমিয়ে অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি এবং নিরাপত্তাহীন ফাটকা বাজারে অর্থলগ্নির জন্য মানুষকে প্ররোচিত করছে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার। এমনকি শিক্ষাক্ষেত্রেও মাত্রাতিরিক্ত খরচ বাড়িয়ে তাকে সাধারণের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একশ্রেণির পুঁজিপতির হাতে দেশকে বিক্রি দেওয়ার যাবতীয় অশুভ চক্রান্তকে এনআরসি ও ক্যাবের জিগির তুলে আড়াল করা হচ্ছে।

সাধারণ মানুষকে সচেতন করার জন্য গোটা ভারতবর্ষ ও বাংলা জুড়ে এই সংগঠনগুলো কাজ করছে। মানুষকে যাতে ভিটেমাটি খোয়ানোর ভয়ে সিঁটকে না থাকতে হয়, নূন্যতম মৌলিক অধিকারগুলো নিয়ে নির্ভয়ে দেশের নাগরিক হিসাবে জীবনযাপন করতে পারে সেইজন্য নিরলস চেষ্টা করে চলেছে আদিবাসী অধিকার ও বিকাশ মঞ্চ, গণসংস্কৃতি পরিষদ, ভারতীয় আদিবাসী একতা মঞ্চ, জয় ভীম ইন্ডিয়া নেটওয়ার্ক, নাগরিক উদ্যোগ, আইসা, চেতনা মঞ্চ, সহমন এবং বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চের মতো সংগঠন। বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চের অন্যতম সদস্য সৌম্য সাহিন জানালেন তাঁদের ভবিষ্যৎ কর্মসূচির কথা। জনস্বার্থবিরোধী যাবতীয় কেন্দ্রীয় সরকারি নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে একাধিক ছোটখাট সংগঠনের সঙ্গে মিলে বাংলার বিভিন্ন মফঃস্বল শহরে নাগরিক মিছিল ও জনসভার আয়োজন করছেন তাঁরা। আগামী রবিবার বীরভূমের সংগঠন মহম্মদবাজার সংহতি মহফিলের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এনআরসি ও ক্যাব বিরোধী পদযাত্রা ও সচেতনতা শিবিরের আয়োজন করেছেন। আগামী ২৩ ও ২৪শে নভেম্বর মালদা টাউনে এমনই এক নাগরিক মিছিলে প্রায় আট হাজার মানুষ পা মেলাবেন বলে তাদের আশা। তারা আরও আশাবাদী যে জাতি ধর্ম ভুলে দেশের মানুষ একত্রিত হয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের জনস্বার্থবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে পথে নামলে সরকার পিছু হটবে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1906 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...