মহারাষ্ট্রের মহা কোন্দল

রৌহিন ব্যানার্জি

 

মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনের ফল সামনে আসার পর নানান টালবাহানার পর আপাতত রাষ্ট্রপতি শাসন জারি। কারণটা সকলেই জানেন, যদিও এই ভোটে বিজেপি ১০৫টি আসন সহ একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এবং বাকিদের থেকে অনেকটাই এগিয়ে, তবুও একা একা সরকার গড়ার মত গরিষ্ঠতা তারা পায়নি— কিন্তু তাদের জোটসঙ্গী শিবসেনার ৫৬টি আসন ধরলে অবশ্যই সেই গরিষ্ঠতা হয়। কিন্তু রাজনীতি এক মজার খেলা— ভারতীয় রাজনীতি আরওই মজার। এখানে একটা কথা চালুই আছে যে রাজনীতি হল সম্ভাবনার শিল্প এবং এখানে কেউই সম্পূর্ণ ব্রাত্য নয়। মহারাষ্ট্র এই সম্ভাবনার শিল্পের এক রূপ দেখে ফেলেছে গত এক সপ্তাহে। এই নাট্যরঙ্গ আমাদেরও মোটামুটি জানা, তবু একবার একটু ঝালাই করে নেওয়া যাক।

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর যখন বিরোধীরাও ধরে নিয়েছেন বিজেপি-শিবসেনা জোট এবারেও মহারাষ্ট্রে সরকার গড়ছেন এবং দেবেন্দ্র ফডনবীশ প্রত্যাশিতভাবেই দ্বিতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন, তখন একটি দল অন্যরকম ভেবেছিল। বালাসাহেবের মৃত্যুর পর রাজ ঠাকরের নেতৃত্বে মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা তৈরি হবার পর শিবসেনার সেই আগের বোলবোলাও অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়েছিল, গত নির্বাচনের পর অপেক্ষাকৃত অপমানজনক শর্তেই বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে সেই হারানো জায়গা কিছুটা পুনরুদ্ধার করেছিল তারা। আর এবারে যখন সরকার গড়ার ক্ষেত্রে তারা একটা নির্ণায়ক অবস্থানে আসতে পারল, আর দেরি না করে প্রতিশোধের খেলায় নেমে পড়ল। বিজেপির কাছে তারা দাবী জানাল উদ্ধব ঠাকরেকে অন্তত আড়াই বছরের জন্য মুখ্যমন্ত্রী করতে হবে। বিজেপি শিবসেনাকে উপমুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়তে রাজী থাকলেও মুখ্যমন্ত্রীর পদটা তাদের কাছেও স্পর্শকাতর— এই শর্তে তারা রাজী হতে পারল না। ঘোড়া কেনাবেচা করে যাতে বিজেপি সরকার গরে ফেলতে না পারে তাই শিবসেনা তাদের সব বিধায়ককে হোটেলে এনে রাখল। অতঃপর জোটভঙ্গ। বিজেপি রাজ্যপালকে জানাল তারা সংখ্যালঘু সরকার গড়তে রাজী নয়। এই নির্বাচনের অন্য দুই দল, কংগ্রেস এবং এনসিপি-র প্রাপ্ত আসন যথাক্রমে মাত্র ৪৪ এবং ৫৪, ফলে তাদের জোট হলেও প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা আসছে না। এই ত্রিশঙ্কু অবস্থায় অগত্যা বাধ্য হয়েই রাষ্ট্রপতি শাসন।

এরপরে খেলা নতুন মোড় নিল। কংগ্রেস এবং এনসিপির সঙ্গে শিবসেনার কথা চালাচালি শুরু এবং প্রচুর আলোচনার পর মোটামুটি একটা বোঝাপড়ায় পৌঁছানো যে এরা তিনজনে একত্রে সরকার গড়বে। শর্ত, মুখ্যমন্ত্রী শিবসেনার। এক হিসাবে এটি ন্যায্য দাবীও বটে কারণ এই তিনটি দলের মধ্যে প্রাপ্ত আসনের নিরিখে তারাই গরিষ্ঠ দল। ফলত কংগ্রেস এবং এনসিপি খানিকটা বাধ্য হয়েই এই দাবীতে নিমরাজি। এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত চুড়ান্ত না হলেও আপনারা যখন এটা পড়ছেন, ততক্ষণে সম্ভবত এই নতুন জোট সরকার গড়ার দাবী নিয়ে রাজ্যপালের কাছে উপস্থিত হয়েছেন। মজাটা হল কংগ্রেস, এনসিপি এবং শিবসেনা ভোটে লড়েছে পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রচার করে। সম্ভাবনার শিল্প। লাইনের নীচে পড়তেই পারেন যে এই সমস্ত নির্বাচনী প্রচারকে আসলে অধিকাংশ প্রচারকই যথেষ্ট সিরিয়াসলি নেন না— যদিও তার জন্য দাঙ্গা করতে তাদের আটকাবে না— কারণ দাঙ্গাকেও, আমাদের রাজনীতিবিদদের একটা বড় অংশ আসলে সিরিয়াসলি নেন না। সবটাই ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছানোর সোপান মাত্র, তার বাইরে এসবের যে কোনও অভিঘাত থাকতে পারে, তা ধর্তব্যের মধ্যে আনলে এতটা ক্যাজুয়ালি এইসব কাণ্ড করা যায় না মনে হয়।

যাই হোক এবার মজার অন্য পিঠটা একটু চোখ বোলানো যাক। ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি এই জোটকে “অনৈতিক” বলেছে। লোকশ্রুতি যে বলার সময়ে টিভি অ্যাঙ্করকে শব্দ মিউট করে রাখতে হয়েছিল কারণ গণতন্ত্র নাকি হা হা করে হেসে উঠেছিল, থামানো যাচ্ছিল না। এখনও বছর ঘোরেনি, মেঘালয়ে ৬০টির মধ্যে মাত্র দুটি আসন পেয়ে সরকার গড়েছে বিজেপি। মিজোরামে চল্লিশের মধ্যে একটি আসন পেয়ে তারা সরকারের জোটে। বিহারে ২৪৩-এর মধ্যে মাত্র ৫৪ আসন পেয়ে সরকারে। এহেন একটি দল যখন অন্য কাউকে নীতিকথা শোনাতে আসে, তখন গণতন্ত্রের পেট ফাটিয়ে হাসা ছাড়া আর উপায় কী? রাজনীতি সম্ভাবনার শিল্প— সেই শিল্পের দক্ষ শিল্পী এভাবে নিজের খেলায় নিজেই শিকার হয়ে যাবে এটা তাদের হিসাবে ছিল না। আমাদের বাংলায় একটা কথা আছে— বাঁশবনেই ডোম কানা হয়। এ হয়েছে সেই বৃত্তান্ত।

অতঃকিম? নিশ্চিত করে আমরা কেউই জানি না— সবাই দেখছি খেলা কোনদিকে গড়ায়। এখন অবধি যতটা গড়িয়েছে, তাতে উপভোগ্য বিষয় কম নেই। বিজেপির নৈতিকতা বা শিবসেনার প্রতিশোধের খেলা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি— এইসঙ্গে এবার যদি শিবসেনা কংগ্রেস জোট হয়েই যায়, সেটাও তো কিছু কম উপভোগ্য খেলা নয়। গত শতাব্দীর ছয়ের দশকে মহারাষ্ট্রে যখন শিবসেনার উত্থান হয়, সরকারে তখন এক ও অভিন্ন ভারতের জাতীয় কংগ্রেস। বিজেপির নামও তখন কেউ শোনেনি, জনসঙ্ঘ বলে একটা পার্টি ছিল বটে। মহারাষ্ট্র তখন বাম ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের অন্যতম আঁতুড়ঘর। স্বভাবতই তারা ছিল সরকার এবং ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর দুচোখের বিষ। সেই সময়েই কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার পরিকল্পনায় কংগ্রেস সরকারের প্রচ্ছন্ন মদতে এবং ব্যবসায়ী মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় শ্রমিকদের মধ্যে নিজের প্রভাব বৃদ্ধি করতে শুরু করলেন বালাসাহেব থ্যাকারে বা বাল থ্যাকারে। তার অস্ত্র ছিল মূলত উগ্র মারাঠি অস্মিতা— অনেকটা আমাদের আজকের দিনের বাংলা পক্ষের মতই। এবং এই মারাঠি অস্মিতার আড়ালে আসল লক্ষ্য অবশ্যই বাম ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা, যারা খুন হতে লাগলেন একের পর এক। বলা যায় পরবর্তী এক দশকে শুধু পেশীশক্তির জোরে (এবং অবশ্যই সরকারি এবং ব্যবসায়ী মদতে) মহারাষ্ট্রের শ্রমিক আন্দোলনের কোমর ভেঙে তাকে নিজের কব্জায় আনলেন বাল থ্যাকারে। এরপরে ইতিহাস চলেছে নিজের গতিতে। ১৯৯৫ সালে প্রথমবার মনোহর যোশীর মুখ্যমন্ত্রীত্বে মহারাষ্ট্রে ক্ষমতায় এল শিবসেনা। তারপর জোটসঙ্গী বিজেপি— দীর্ঘ দাম্পত্য এবার ভাঙল বুঝি। এখন পুরনো প্রেমিকা ভারতের জাতীয় কংগ্রেস তাকে আবার বুকে টেনে নেবে কি না, তা তো নাটকের পরের দৃশ্যেই জানা যাবে। আসুন, গ্যালারিতে গুছিয়ে বসি। বাদাম খাওয়ান দিকি…।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1906 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...