রূপটান

শাশ্বতী বসু

 

বিকেল প্রায় পাঁচটা। সদ্য সমাপ্ত লেখাটার প্রথম কপিটাতে চোখ বোলাচ্ছিল সীমন্তিনী। মনটা খুশি খুশি হয়ে যাচ্ছিল লেখাটা পড়ে— যা চাইছিল তার অনেকটাই বলা গেছে মনে হচ্ছে। মনটা আরও খুশি হচ্ছিল এই ভেবে যে আজকের মতো ওর এই অ্যাকাডেমিক পঠনপাঠন শেষ। প্রতিদিনের কর্তব্য কর্মের লিস্টের শেষ কাজের মাথায় এখনই একটা ঢেঁড়া মারল ও।

এখন সীমন্তিনী গিয়ে বসেছে বারান্দার ইজিচেয়ারে। ছোট্ট একটু বারান্দা— তবে পশ্চিমমুখী। অস্তগামী সূর্যের শেষ ছটা এখনও দূর দিগন্ত ছেয়ে আছে। হাওয়াটা ঠান্ডা না হলেও গরম নয়। অক্টোবরের শেষ।

সন্ধ্যার এখনি চা দেবার কথা। বিকেলের। কিন্তু কোথায় সন্ধ্যা? কারও সাড়া শব্দ এখনও পাওয়া যাচ্ছে না।

–ও তুমি বারান্দায় বসে গেছ? ঈইশ— এখনই চা করে আনছি। এই তো বউ দেখেই ছুটতে ছুটে এলাম। কি সুন্দর বউ হয়েছে গো দিদি— ঠিক যেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। রান্নাঘরে ঢুকে গ্যাস স্টোভের ওপর কাপ মেপে সসপ্যানে জল বসাতে বসাতে সন্ধ্যা বলে।

–ও তুই বুঝি এতক্ষণ শেখরদের ফ্ল্যাটে ছিলি?
–হ্যাঁ, বলেই তো গেলাম তোমায়। ভুলে গেলে? বললাম না আজ শেখরদা বউ নিয়ে আসবে বিকেলে। বউ দেখেই তো আমার চোখ ট্যারা হয়ে গেছে দিদি। শেখরদা— হায় রে— ওই তো চেহারা— লম্বা বটে— তবে কুঁজো— রোগা খ্যাংরা কাঠি— চোখে একটা বোতলের মত চশমা— ম্যাগো—

বলতে বলতে চায়ের কাপ, বিস্কুটের টিন, চামচ, দুধের পট, টি পট শুদ্ধ চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে সীমন্তিনীর সাইড টেবিলে রাখে সন্ধ্যা।

–হত যদি তাও আমাদের দাদার মত চেহারা। কি সুন্দর যেন অক্ষয়কুমার। এই হয় বুঝলে? চাটা ঢেলে দেব না নিজেই ঢালবে? সন্ধ্যা হাত বাড়ায় টি পটের দিকে…

–না আমিই ঢেলে নিচ্ছি।

–এই হয় বুঝলে— পাশের মোড়াটা টেনে নিয়ে বসতে বসতে সন্ধ্যা বলতে থাকে— ভগবানের হাত। তাই শেখরদার অমন বউ আর তুমি আমাদের দাদার পাশে…

বলে কথা শেষ করে মিটি মিটি হাসতে থাকে সন্ধ্যা।

–এই তুই যা তো এখান থেকে? সীমন্তিনী এবার না ধমকে পারে না।

দুদ্দার করে সন্ধ্যা উঠে পড়ে এবার। বলে— আরে আমায় তো আবার পনিরের প্যাকেট আনতে হবে দোকান থেকে। একদম ভুলে গেছি। রাতে তোমায় পনির-ক্যাপসিকাম খাওয়াব। ওই যে গো বুধবার টিনাদির কিচেন পোগ্রামটাতে ওই মুটকিটা দেখাচ্ছিল না?

–সন্ধ্যা! এবার আরও জোরে গলা তোলে সীমন্তিনী।

–হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝেছি গো বুঝেছি— তোমার শুধু ধমকানি। মোটাকে মুটকি বলতে পারব না— রোগাকে খ্যাংরা কাঠি বলতে পারব না। তবে বলবটা কি শুনি? আমার অত সব রাখঢাক নেই। যা বলার তা বলবই। হ্যাঁ, তালে তো সুন্দরীকেও সুন্দরী বলা যাবে না।

রান্নাঘরের দরজার পেছন থেকে প্লাস্টিকের ব্যাগ আর কিচেনের তাকের ময়দার কৌটোর পেছনে রাখা ছোট একটা চামড়ার পার্স নিয়ে সন্ধ্যা চটি ফটাস ফটাস করতে করতে বেরিয়ে যায়।

সত্যি মেয়েটা পারেও বটে বকতে। বকার যেন বিরাম নেই। তবে অনেক দিন ধরে আছে সীমন্তিনীর কাছে। মেয়ের মতো। ওর মা কাজ করত সীমন্তিনীর মায়ের কাছে দমদমে। সঙ্গে আসত ছোট্ট সন্ধ্যা। নাক দিয়ে সর্দি গড়াচ্ছে। সীমন্তিনী ওকে নিয়ে আসত ঘরের মধ্যে। রুমাল দিত নাক মোছার আর হাতে লজেন্স বা চকলেট। সেই সন্ধ্যা ধীরে ধীরে চোখের সামনেই বড় হল। মা কাজে না এলে নিজেই আসত। তারপরে সীমন্তিনীর বিয়ের পর নিজের ফ্ল্যাটে এসে সারাদিনের একটা বিশ্বাসী কাজের লোকের দরকার হয়ে পড়ে। যে শুধু ঘরবাড়ি দেখবে সারাদিন কর্তাগিন্নির অনুপস্থিতিতে। সন্ধ্যা এসে গেল। সেই শুরু।

সীমন্তিনীর সকালে কলেজ। ভোর ছটার মধ্যে ও বেরিয়ে পড়ে। আসতে আসতে বেলা একটা বেজে যায়। ওর যাবার পরে বিজন বেরোয়। কাজের মেয়েটি আসে, আসে রান্নার দিদি গঙ্গা। সব মিলিয়ে ব্যস্ততার সময়।

সকালের চাটা সীমন্তিনী বিজনকে বিছানার পাশেই এনে দেয়। নিজের কাপটা স্টাডিতে নিয়ে ব্যাগ গোছগাছ করার সময় চুমুক দিতে থাকে। ঝোলা ব্যাগে বইপত্র ঢুকিয়ে হাতব্যাগের জিনিসপত্র চেক করে ও বাথরুমে ঢোকে। ছটার আশেপাশেই ও বেরিয়ে যায়। বিজন তখন চাটা শেষ করে আবার একটু গড়াচ্ছে। চোখ বেডরুমের টিভির পর্দায়। বিজন অফিসফেরত বাড়তি কিছু করছে, না কি সরাসরি বাড়িতে আসছে— এসব টুকিটাকি জেনেই সীমন্তিনী পা বাড়ায় বাইরে।

–সন্ধ্যা যাচ্ছি আমি। দেখিস সব।
–দিদি তোমার কানের নীচে ক্রিম লেগে আছে। সোফার কুশনগুলো ঝাড়তে ঝাড়তে সন্ধ্যা বলে। আর আসার সময় ভুলো না কিন্তু আমার শাজাহান আনার কথা।
–হ্যাঁ, আনব মনে আছে।

বাব্বা মেয়েটা সাজতে সাজতেই গেল। গতকালই বলেছিল ওর শাজাহান আনার কথা। কিন্তু সীমন্তিনী ভুলে গেছিল জিজ্ঞেস করতে যে শাজাহানটা আসলে কী জিনিস। পরে সন্ধ্যা তাকে বিশদ করে বুঝিয়েছে যে ওটা আসলে কাজলের একটা ব্র্যান্ডের নাম। কেন যে ওটা সম্রাট মোগল শাজাহানের নাম— সেটা ভেবে পেল না সীমন্তিনী। যাইহোক আজকে ওটা মনে করে আনতে হবে। কোনওভাবেই ভোলা যাবে না।

কত যে কাজ পড়ে আছে আজ— পা চালাতে চালাতে ভাবে সীমন্তিনী। সাউথ চব্বিশ পরগনার হোটরে সীতাদির আশ্রমে যোগাযোগ করতে হবে। সীতাদির সঙ্গে একটা ইন্টারভিউয়ের টাইমের ব্যবস্থা করতে হবে। সীতাদি একটা এনজিও চালান এবং উনিই সেটার ফাউন্ডার। এনজিও বললে ভুল হবে। ওটা সীতাদির আশ্রম বলে সবাই। গরিব মেয়েদের আশ্রয় দিয়ে তাদের কিছু একটা স্কিল ট্রেনিং দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে দিতে চেষ্টা করে এই আশ্রম।

আরও আরও অনেক কাজ আছে আজ। লাইফ ইন্সিওরেন্সের প্রিমিয়াম দেওয়া নিয়ে কী এক জট পাকিয়েছে— সেটা ফোনে সারতে হবে। ওদের ডিপার্টমেন্ট হেড বদলি হচ্ছে তার ফেয়ারওয়েল পার্টি অর্গানাইজ করার জন্য একটা মিটিং আছে দুপুরের পরে। ফিরতে ফিরতে আজ নির্ঘাত দুটোর বেশি হবে।

বেলা তিনটে। সীমন্তিনী ফিরছে তার ফ্ল্যাটে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে দরজার সামনে দাড়িয়ে বাঁ হাতে কলিং বেল টেপে ও। কোনও সাড়া নেই। আবার এবং আবার। চতুর্থবার টিপতে যেতেই ভেতর থেকে দুরদার করে দরজা খুলে দেয় সন্ধ্যা।

–ও তুমি এসে গেছ? আমি স্নান করছিলাম এখন। ভাবলাম তোমার দেরি হবে আসতে, যাই একটু শেখরদার বউকে দেখে আসি। তাই দেরি… কি সুন্দর বউ গো দিদি! আমায় বলে তোমার চোখদুটো তো ভারী সুন্দর— দরজা বন্ধ করতে করতে সন্ধ্যা বলে। আজ একটা সাটিনের মেরুন রঙের কাফতান পরে ছিল। গোড়ালি থেকে এই একটু উচুঁতে। সে পা যদি তুমি দেখতে— না দেখলে বিশ্ব্বাস করবে না তুমি। আমায় বসতে বলল পাশে। আমি মেঝেতে বসে শুধু পাই দেখছিলাম।

সীমন্তিনী ততক্ষণে জুতো ছাড়ছে। অজান্তেই চোখ যায় নিজের পায়ের দিকে। তারপর ব্যাগপত্র নিয়ে পা বাড়ায় নিজের ঘরে।

–এক কাপ চা খাওয়াবি সন্ধ্যা? খেয়ে বাথরুমে ঢুকি।

ধরাচুরো ছেড়ে সীমন্তিনী ওর হাউসকোট পরে ডাইনিং টেবিলে এসে বসে। হাতে ওর শাজাহান কাজলের কৌটো।

–এই নে তোর কাজল।

–ওঃ এনেছ? দারুণ— দাও দাও দেখি। সন্ধ্যা প্রায় ছিনিয়ে নেয় কাজলের কৌটো। প্যাকেটটা দেখতে দেখতে বলে—

–আরও ভালো হত যদি আইভুরু পেন্সিল আনতে। শেখরদার বউকে দেখলাম আজ লাগাচ্ছে।

জানো দিদি— চা করতে করতে বলে চলে সন্ধ্যা।

সীমন্তিনী বসে থাকে চোখ বুজে। বড় টায়ার্ড লাগছে তার।

–আমার সঙ্গে আজ অনেক কথা হল শেখরদার বউয়ের। আমাকে বলছিল ওর বেডরুমটা গুছিয়ে দিতে। তো সব গুছিয়ে দিতে দিতে দেখছিলাম। কী নেই সেখানে? কত যে জিনিস, কত রঙের লিপিস্টিক, কত রঙের নেলপালিশ। কত পাউডার— কত ব্রাশ— আহ্ চোখ যেন জুড়িয়ে গেল।… তবে শেখরদার বউ যেন কীরকম একটু। আমি যতক্ষণ ছিলাম ঠায় বসে ছিল সোফায়। একটু নড়ল না পর্যন্ত। শেখরদার মা ডাকছিল…
–নে অনেক হয়েছে। এবার তোর কাজ কর। আমি চানটা সেরে আসি।

চা শেষ করে সীমন্তিনী ওঠে।

–আজ কিন্তু বিকেল পাঁচটায় কিছুক্ষণের জন্য শেখরদার বাড়িতে যাব।
–কেন? পাঁচটায় ওদের বাড়িতে কী?

–শেখরদার বউ যেতে বলেছে। কী বলবে কে জানে। যাব দিদি? বলে সন্ধ্যা।

ওর চোখে ব্যাকুল আগ্রহের আতিশয্য দেখে সীমন্তিনী বলে: হ্যাঁ, নিশ্চয়ই যাবি।

সন্ধ্যা নাচতে নাচতে চলে যায়।

কে জানে শেখরের বউয়ের মনে কি আছে। সন্ধ্যার ওই একটা দোষ। সুন্দর দেখলে ওর আর কিছু মনে থাকে না। যে কোনও সুন্দরী ওকে দিয়ে যা খুশি করিয়ে নিতে পারে। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যাকে না নিয়ে নেয় শেখরের বউ— ভাবে সীমন্তিনী। কিন্তু কী করে সে সন্ধ্যাকে আটকাবে? সন্ধ্যার ওপর তার কীসের জোর? তবু কল্পিত বিচ্ছেদের আশঙ্কায় মনটা কেঁপে ওঠে সীমন্তিনীর।

রাত প্রায় নটা ছুঁইছুঁই। বিকেলে চা দিয়ে সেই যে সন্ধ্যা গেছে আর ফিরবার নাম নেই। সীমন্তিনী ভাবছে কী করবে।

হঠাৎ হুড়মুড় করে দরজা খুলে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে ঢুকল সন্ধ্যা।

–কী হল রে এত দেরি?
–আমি কী করে বুঝব এত দেরি হবে? পাতা বাটতে দিয়েছিল শিলনোড়াতে। সে শিল আবার আমায় পরিষ্কার করতে হল হলুদ লঙ্কার ঝাঁঝ তুলতে। তারপরে এই বাটোরে ওই থেতো করোরে ওই ভেজাও রে— সে এক মহা মচ্ছব। কাল আবার যেতে বলেছে— এই একই সময়ে।
–তুই আবার যাবি? বলিস কী রে? এই এত সময় ধরে তোকে এসব করাল!

–করলাম, তোমার তো এসময়ে কোনও কাজ থাকে না দিদি। তাই করে দিয়ে এলাম। কিন্তু— এই পর্যন্ত বলেই সন্ধ্যা চুপ করে কী যেন ভাবে।

–বল কী বলছিলি?
–না জানো বলছিলাম কী, জানো শেখরদার বউয়ের মুখ— বাব্বা একদমে সুবিধের নয়। আমাকে যা একটা গালাগাল দিল না— পাতাবাটা হাতটা দেয়ালে লেগে গেছিল বলে। অবশ্য মানে কী বুঝলাম না— কিন্তু ওটা গালাগাল— ঠিক জানি— যেভাবে বলল…

হা হয়ে যায় সীমন্তিনী। বলে কী? তোকে ভালোভাবে চেনেই না শেখরের বউ— সে তোকে গালাগাল দিল? গরম হয়ে যায় সীমন্তিনী। বলে ফেলে—

–কাল তুই যাবি না ও বাড়িতে।

সন্ধ্যা কিছু না বলে ঘরে ঢুকে গেল। খুব যে সীমন্তিনীর কথাটা পছন্দ হল মনে হল না।

পরের দিন ঠিক আবার সেই এক ঘটনা।

–আমি যাচ্ছি দিদি শেখরদার বাড়িতে।
–কিন্তু তোকে আমি না করেছিলাম। তোর মাও আসবে আজ বিকেলে।

–এই যাব আর আসব। বলেই সন্ধ্যা ছুট।

বিকেলে সন্ধ্যার মা আসে। সীমন্তিনীর কাছে ওরা মায়ের আমল থেকে চেনা লোক। সীমন্তিনী ওকে দেখে খুশিই হয়।

–তুমি যে বলেছিলে সন্ধ্যার জন্য ব্যাঙ্কে একটা পাস বই খুলব তুমি তার জন্য টাকা দেবে… এসেই সন্ধ্যার মা শুরু করে তার নিত্যকার অভাব অভিযোগের কাহিনী। সে কাহিনী প্রলম্বিত হতে থাকে ধীরে ধীরে সন্ধ্যার অপেক্ষায়। সন্ধ্যা ফেরে না।

অবশেষে টাকা নিয়ে চলে যায় সন্ধ্যার মা।

সন্ধ্যা ফেরে রাত আটটায়। ক্লান্ত কিন্তু মুখ একেবারে উজ্জ্বল। জানো আজ বিউটিপার্লার থেকে শিল্পা শেঠের লোক এসেছিল বৌদির ফেসিয়াল করতে। একটা নেপালি মেয়ে। কি যে সুন্দর মেয়েটা। ওর জিনিসগুলো আমি দেখেছি। কত রকমের যে টিউব আর কত রকমের যে স্প্রে। তারপর ফিটকিরি, ফিটকিরি দিয়ে যে মুখ পরিষ্কার করা যায়— না না, টোনিং করা যায়— জানতামই না। খুবই চিন্তিত দেখায় সন্ধ্যাকে।

সন্ধ্যার নবলব্ধ জ্ঞানের বাহার দেখে সীমন্তিনীও অবাক হয়ে যায়। স্বীকার করতেই হবে সন্ধ্যার মাথাটা পরিষ্কার।

–ওদের আমি চা করে দিলাম। চাওমিন করে দিলাম— সন্ধ্যা বলে চলে। বৌদির একটা শাড়ি আছে যা না— ভাবতেই পারবে না। বৌদি বলছিল ওটা নাকি সোনার সুতো দিয়ে কাজ করা। জানো দিদি, বৌদি ওটা আমায় বলল ভাঁজ করে দিতে। দিলাম। ঈইশ, কবে যে আমার একটা ওরকম শাড়ি হবে।

–খেয়েছিলি কিছু? সীমন্তিনী বলে।

–না এই তো খাব এখন।
–এই এতক্ষণ না খেয়ে ওখানে আছিস?
–কিন্তু অত দামী একটা শাড়ি যে আমাকে ভাঁজ করতে দিল? কেউ কি দেয়? তুমি দেবে?

সীমন্তিনী ভেবে পেল না এর উত্তর সে কী দেবে। যে শাড়ি কাউকে ছুঁতে দেওয়া যায় না সেটা সে কিনতে যাবেই বা কেন?

–কিছু খেয়ে নে এখন আগে। বলে সীমন্তিনী।

গোগ্রাসে খায় সন্ধ্যা। তর্জনীটা আলগা করে মুখে পরটা তরকারি পুরতে থাকে। দাঁতের সঙ্গে আঙুলটা লাগতেই বলে ওঠে— উঃ।

–কী হল? ডাইনিং টেবিলের একপাশে বসে একটা মাগাজিন দেখতে দেখতে সীমন্তিনী জিগ্গেস করে।

–দেখো না একগাদা চুড়ি আজ আমাকে পরাতে হয়েছে বৌদিকে। একটা চুড়ি মট করে ভেঙে আমার আঙুলে লেগে গেল। জানো বৌদি খুব সরিসরি করেছে আজ। বৌদি খুব ভালো। আমায় একটা লেহেঙ্গাচোলি দিল আজ। ভাগ্গিস আমার হাতটা কেটেছিল— বৌদিরটা কাটেনি। তাহলে লেহেঙ্গার বদলে মিলত কীসব গালাগাল। বলে হেসে গড়াগড়ি খায় সন্ধ্যা কাটা আঙুলটা সাবধানে আলগা করে রেখে।

কী একে বলবে সীমন্তিনী ভেবে পায় না। ব্যাপার তো অনেকদুর গড়িয়েছে। সন্ধ্যা বৌদির সব কাজ করে দেবে এটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে এখন।

ডেটল দিয়ে সন্ধ্যার হাতটা মুছে ব্যান্ড এইড লাগাতে লাগাতে সীমন্তিনী জিজ্ঞেস করে—

–হ্যাঁরে, তোকে যে হাতের লেখা দিয়েছিলাম একপাতা তার কী হল?
–মনে নেই। করিনি। কখন করব বলো? বিকেলে আমি তো এখন ওই বাড়িতে।
–ওই বাড়িতে থাকলেই চলবে?
–হ্যাঁ চলবে। জানো বৌদি না কোনওদিন কলেজে যায়নি। কী করে শেখরদাকে বিয়ে করল গো? হ্যাঁ রূপ আছে মানতেই হবে। ওতেই তো কাজ হয়, না দিদি? এই যে তুমি এত পড়েছ তাতে কী হয়েছে? শেখরদাও শুনি অনেক বড় কাজ করে দাদার মত। তাহলে? না পড়েও আমার অনেক ভালো বর জুটবে বলো? শুধু একটু সাজতে হবে।

আমের চাটনি লেগে থাকা আঙুল চাটতে চাটতে সন্ধ্যা উঠে দাঁড়ায়। কী করে সন্ধ্যাকে বোঝায় সীমন্তিনী যে ও আর শেখরের বউ এক নয়।

ব্যস্ততার মধ্যে কিছুদিন কেটে গেছে সীমন্তিনীর। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার গ্রামে গেছিল সীতাদির ইন্টারভিউ নিতে। আশ্রমের মেয়েদের ট্রেনিং দেখতে দেখতে ভাবেছিল যদি সন্ধ্যাটাকে এখানে কিছু শেখানো যেত? কিন্তু ও কি এখানে আসতে রাজি হবে? যেসব মেয়েরা ওখানে ট্রেনিং নিচ্ছে নিতান্তই তারা গরিব ঘরের মেয়ে। কিন্তু তাদের চোখে যেন অন্য জগতের স্বপ্ন। কী পরিষ্কার কথা আর চিন্তাভাবনা। সীমন্তিনী মুগ্ধ হয়ে গেছিল।

–নাও, তোমার চাটা নাও। আমার আজ একটু ফিরতে দেরি হবে। সন্ধ্যার কথায় চিন্তাসূত্র ছিন্ন হয় সীমন্তিনীর। তারপরেই সন্ধ্যাকে দেখে চোয়াল ঝুলে যায় তার। কি পোশাক সন্ধ্যার আর কি সাজগোজ।

সর্ষেতেল রঙের ওপর সোনালি আর সবুজ কাজ করা লেহেঙ্গা চোলি— কী কাপড়ের লেহেঙ্গা? সেটা যেন একেবারে ফুলে ফেঁপে আছে। তার সঙ্গে কনুই অব্দি চুড়ি। গলায় মালা, চুল খোলা— এ কাকে দেখছে সীমন্তিনী? আর এই মে মাসের প্রচণ্ড গরমে এই পোশাক পরে ভরদুপুরে কোথায় চলেছে এ?

–তোর গরম লাগছে না? এই সাজগোজ করে কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি? অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করে সীমন্তিনী।

–যাই একটু ঘুরে আসি, সিনেমা দেখব। রীতা দাঁড়িয়ে থাকবে হলের সামনে। দেখবে দাদা আসার আগেই ফিরে আসব। বলেই চম্পট দেয় সন্ধ্যা।

বিরক্তি ঝেড়ে ফেলে নিজের কাজে ডুবে যেতে চেষ্টা করে সীমন্তিনী। কতক্ষণ কেটেছে কে জানে। ক্রিং ক্রিং টেলিফোনের শব্দে ওর মনোযোগ কেটে যায়।

–হ্যালো? কে বলছেন?

–তারাতলা থানা থেকে বলছি। সীমন্তিনী দত্তগুপ্তর সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই। জরুরি দরকার।

থানা! সীমন্তিনী যেন শক খায়। কী হয়েছে? কার কী হল? কে সে? ভেসে যাবার মুখে মুখে কোনওরকমে কথাগুলি বলতে পারে সে।

তারপরে যা শোনে সেটা আর কহতব্য নয়। থানাতে সন্ধ্যা নস্কর বলে একজন ষোড়শীকে ধরে আনা হয়েছে প্রকাশ্য রাস্তায় ভদ্র ঘরের একটি মেয়ের ওপর চড়াও হয়ে তাকে মারধর করার জন্য। ব্যাপারটা এইজন্য থানা অব্দি গড়ায়। মেয়েটি থানায় এসে একদম চুপ। কোনও কথা বলছে না। একবার শুধু বলেছে সীমন্তিনী দত্তগুপ্তর বাড়িতে সে থাকে। সুতরাং মিসেস দত্তগুপ্ত যদি একবার থানায় আসেন…।

সীমন্তিনী ছোটে তারাতলা থানায়। তারপরের ঘটনা একেবারে সংক্ষিপ্ত।

কয়েক ঘণ্টা পড়ে যবনিকা উত্তোলিত হয় সীমন্তিনী দত্তগুপ্তর ডাইনিং কাম ড্রয়িংরুমে। সীমন্তিনী বসে আছে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে। উল্টোদিকের চেয়ারে আসীন নায়িকা ষোড়শী সন্ধ্যা নস্কর। সদ্য থানাফেরত। মুখে তার এখনও কালবৈশাখী ঝড়ের মেঘ।

–তোকে কি ভূতে পেয়েছিল যে হঠাৎ একটা মেয়ের গায়ে হাত তুললি? সীমন্তিনীকে বলতে শোনা যায়।

সন্ধ্যা চুপ।

–কী? কথা বলছিস না কেন?
–কী বলব? হাত তুলব না তো কি তুলব? আমি বাসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই আমায় দেখে ফিচফিচ করে দুই বন্ধু মিলে হাসছিল। বারে বারে, বারে বারে।
–কী করে বুঝলি তোকে দেখেই হাসছিল? আরও অনেকেই তো ছিল বাসে।

–হ্যাঁ, অনেকেই ছিল— সন্ধ্যা ঠিকরে ওঠে। আমি তো বসতে না পেয়ে ওদের সামনেই বাসের হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়েছিলাম। আর ওরা দুজন আমাকে দেখিয়ে দেখিয়েই হাসছিল। লুকিয়ে লুকিয়ে, নয় হাত দিয়ে মুখ ঢেকে।

–হাসবে না? ভরদুপুরে যেরকম করে সেজে বেরোলি তাতে যে কেউ হাসবে।
–হাসুক হাসুক। আমি কেয়ার করি না। গর্জে ওঠে সন্ধ্যা। আমি ওদের পাশে বসতেই ওরা নাক চাপা দিয়ে অন্য দিকে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। কেন আমার গায়ে কি মুতের গন্ধ? আবার মুখে শব্দ না করে ওয়াক ওয়াক করছিল। আর বাসশুদ্ধ লোক মিটমিট করে হাসছিল।
–হারামজাদি… আমি আর থাকতে পারিনি। ওরা নামতেই ওদের সঙ্গে নেমেছি বাস থেকে। নেমেই কষে মেরেছি এক ঘুষি একজনের মুখে। মেরে রাস্তায় একেবারে শুইয়ে দিয়েছি। তারপরে তো পা দিয়ে মারতে গেছিলাম। কে একজন ধাক্কা মেরে আমাকে সরিয়ে দিল। তারপরে তো অনেক লোকজন ছুটে এল। পুলিশ এল। থানায় নিয়ে গেল। বলল বাড়িতে যেতে দেবে না পাঁচ হাজার টাকা না দিলে।

সন্ধ্যা মুখ নীচু করে বসে থাকে।

–তারপর কী হল?

–প্রথমে তোমাকে ডাকিনি আমি জানো? শেখরদার বউয়ের নম্বর দিয়েছিলাম পুলিশকে। ওর মোবাইল নম্বর আমার কাছে আছে। মিনমিন করে বলে সন্ধ্যা।

–তারপর কী হল? এল তোর শেখরদার বউ?

–হ্যাঁ… আসবে ওই শয়তানি। পুলিশকে বলেছে সন্ধ্যা বলে কাউকে আমরা চিনি না। কোনওদিন নামও শুনিনি। বলে কিনা নামও শোনেনি। হারামজাদি, বদ মেয়েছেলে। আর এই আমিই কিনা দিনরাত বিনি মাংনায় তোর গতর টিপেছি, পা নখ পরিষ্কার করেছি, শালি বিচ— শালি… থু থু থু থুক…। সমস্ত ঘৃণা উজার করে দিয়ে সন্ধ্যা গালাগাল দিতে থাকে। উগরে দিতে থাকে চোখাচোখা গালি যার অর্থ সে বুঝতে পারেনি কোনওদিন— যা সে তার প্রিয়তমা শেখরদার বউয়ের কাছ থেকে তাকে ভালোবাসতে গিয়েই পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিল।

সীমন্তিনী সরে যায় সামনে থেকে। এ জলস্রোত আটকানোর ক্ষমতা বা ইচ্ছে কোনওটাই তার নেই এখন।

সন্ধ্যার কথা হঠাৎ থেমে যায়। সীমন্তিনী চলতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়ায়। দেখে উবু হয়ে বসে মাথা ঝুঁকিয়ে খোলা হাতব্যাগটায় হাত ঢুকিয়ে আঁতিপাতি করে কী খুঁজে যাচ্ছে ও।

–কী হল?
–খুঁজছি…
–কী?

–ওই সেইটা। শেখরদার বৌ দিয়েছিল। বলেছিল হারাসনি, খুব দামী জিনিস… ধাক্কাধাক্কির সময়ে রাস্তায় ব্যাগটা খুলে পড়ে গেছিল… দেখছি সেটা আছে নাকি…। বিড়বিড় করে সন্ধ্যা…

–সেটা কী?
–লিপিস্টিক… তুমি বুঝবে না… লরিলের… খুব দামী…

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1906 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...