মধুময় পাল ও ‘আরণ্যরজনী’

বিমল দেব

 

জাদু-বাস্তবতার ছায়া বাংলা সাহিত্যে প্রচলিত ধারার বাইরে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে যায়। মধুময় পালের গল্পসঙ্কলন ‘আরণ্যরজনী’ এরকমভাবেই উঁকি দিয়ে দেখেছে জাদু-বাস্তবতাকে। ঠিক উল্টো তার উপস্থিতি। জাদু-বাস্তবতা নয়, মধুময়ের ‘আরণ্যরজনী’ই দেখেছে জাদু-বাস্তবতাকে। কারণ এখনও সঠিকভাবে নির্ধারিত নয় জাদু-বাস্তবতা। কী ও কেন প্রশ্ন থেকেই যায়। আসলে, ‘আরণ্যরজনী’র প্রতিটি গল্পই ছক ভেঙে বেরিয়েছে। প্রথা ভেঙেছে বারবার। ঔপনিবেশিক খোয়ারিকে প্রত্যাখ্যান করেছে বহুবার। ভাষা, শব্দচয়ন, চলন— অর্থাৎ নির্মাণের সকলদিকই আরেক রকম হয়ে উঠেছে। এই হয়ে-ওঠাই মধুময়ের গন্তব্য অথবা যাত্রাপথ। ‘দোলাদের জাদুবাড়ি’ গল্পে পড়ছি— ‘থোকা থোকা ফুলে রঙ্গন নুয়ে আছে। গন্ধরাজের গোড়ায় ছোট্ট অপরাজিতা কয়েকটা নীল ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে। এই গাছটা কিভাবে যে এখানে হয়ে উঠল তিমির ভেবে পায়নি। আজব মাঝি বলেছে, কী দরকার অত বোঝার। হয়েছে, থাক, আদরে থাক। সব কিছুর কি ব্যাখ্যা মেলে?’

সত্যি তো সব কিছুর ব্যাখ্যা মেলে না। ‘দোলা তাকে নিয়ে যেতে চায়। হয়তো কুড়ি কুড়ি বছরের পর। দেখা যাক, কুড়ি কুড়ি বছরের আগে যাওয়া যায় কিনা।’ এইভাবেই মধুময়ের নির্মাণে গতকাল কথা বলে আজকের প্রান্তে। একটা খোঁজা চলতে থাকে সমগ্র গল্পগুলি জুড়েই।

‘আরব্যরজনী’ নয় ‘আরণ্যরজনী’। তাৎপর্যময় মধুময় পালের গল্পসঙ্কলনের শিরোনাম। এইভাবেই লেখক মধুময় পপুলার রাইটিংস-কে চ্যালেঞ্জ জানান। প্রশ্ন করেন। ভেঙে দেন ছক। আসলে লেখক গল্প লিখতে চাননি। লিখেছেন নিজেকেই। আবহমানকালের পিঠে দাঁড়িয়ে কথকের ভূমিকায় যেন লেখক মধুময়।

ধরুন ‘গল্পপাঠের পথে’ গল্পটি। ভয়ঙ্কর অথচ সারকাস্টিক মজা। মনে হয়, চারদিকে বুদ্ধিজীবীদের ছদ্মবেশে জোকাররা ঘুরছে। এরকম রচনাশৈলী দুর্লভ। ‘লালকুঠি নীলকুঠি’, ‘আরণ্যরজনী’, ‘কিংসাহেবের ঘাটবাংলো’, ‘কী লিখি তোমায়’ এবং অবশ্যই ‘রক্তমেঘ সাঁতরায় আজও’ গল্পগুলি আমাদের ঘুম ভাঙাতে সাহায্য করে।

মধুময়ের গল্পে রেলওয়ে স্টেশন। স্টেশনের ঘোষণা। গাছপালার রহস্য। প্রাকৃতিক পরিবেশের বিস্তৃত বর্ণনা। রাস্তার বর্ণনা। বাড়িঘরের রঙের পরিচয়। এগুলো সবই যেন সেলুলয়েডে ধরা আছে। চলচ্চিত্র পরিচালকের কাছে এগুলি সাহায্যকারী হিসেবে খুবই জরুরি হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রকারের নির্মাণে সুবিধা হয়।

আসলে বিষয় যেমন জরুরি ঠিক তেমনই জরুরি তার আঙ্গিক। একথা মনে রেখেই মধুময় এগিয়েছেন তাঁর যাত্রাপথে। মধুময় পাল একজন গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি গবেষক। জলপানি-না পাওয়া গবেষক। ক্ষেত্রসমীক্ষাতেও মগ্ন থাকেন। এই গবেষণাধর্মী মানসিকতাই মধুময়কে এই আখ্যান রচনায় প্রাণিত করেছে। এরকম গল্প বলার চলন বাংলা সাহিত্যে বিরল। যাপনের ক্যাটাস্ট্রফি প্রত্যেকটা গল্পে উপস্থিত। যেমন চেকভের গল্পে দেখতে পাই। আর আছে মার্কেজের জাদু-বাস্তবতার ছায়া। শুধু ছায়া মাত্র। হুবহু নয়। বঙ্গীয় যাপনচিত্র— রাজনীতির টানাপোড়েন বারবার উঁকি দিয়েছে তাঁর গল্পে। ইলা মিত্র এসেছেন। দ্রোণাচার্য ঘোষও উপস্থিত।

স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গদেশে ইতিহাসচর্চা— তার স্থানাঙ্ক নির্ণয়। দর্শনের অমীমাংসিত স্বপ্ন। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিত ছায়া ফেলেছে তাঁর সমগ্র নির্মাণে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতোই তাঁর জীবন-জিজ্ঞাসা। তবে ভাষায়, নির্মাণে ভিন্ন ব্যক্তিত্ব। রবার্ট ফ্রস্টের কবিতার সেই অমোঘ পঙক্তি, যেখানে কবি বলছেন ছকভাঙা-ছন্দভাঙা মানেই জাল (নেট) ছাড়া টেনিস খেলা। হ্যাঁ, মধুময় পাল সর্বদাই ছন্দ ভেঙে এগিয়েছেন তাঁর যাত্রাপথে। তাঁর নেটের প্রয়োজন হয় না।

আরণ্যরজনী
মধুময় পাল
দীপ প্রকাশন
দাম ২৫০ টাকা

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1906 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...