অলোকপর্ণা

 

 

ফাঁক পেলেই স্নেহলতা আজকাল বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে চলে যাচ্ছেন। তারপর ধরা পড়ে গিয়ে “কোথায় যাচ্ছ মা?” প্রশ্ন করলে অনেকক্ষণ হাঁ করে রাজুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকছেন। একসময় তাঁর রাজুকে মনে পড়ে যাচ্ছে। তারপর নিজেকেও। আর সাথেসাথেই ভীষণ ভয় পেয়ে তিনি রাজুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলছেন। এখন রাজু তাঁর একহাতে একটা লম্বা দড়ি বেঁধে দিয়েছে যার অপরপ্রান্ত তার নিজের হাতের সাথে বাঁধা। এখন দড়ি বাঁধা স্নেহলতা চুপ করে বসে বাটি থেকে জলে ভেজা মুড়ি তুলে তুলে খাচ্ছেন।

পাখিগুলো আজকাল অচঞ্চল। রাজু সবাইকে দানা দিয়ে একটাকে খাঁচা থেকে বের করে আনে। এরা কেউ আজ অবধি কথা কইতে শিখল না। যেন মানুষকে নকল করা তাদের ধর্ম নয়। একেকটা সন্ন্যাসীর মত সবুজ টিয়া এখন রাজুর নড়বড়ে বাঁ কাঁধে হাঁটাচলা করছে। রাজু একটা আঙুল তার মাথায় বুলিয়ে দেয়। আর তার হাতের দড়িতে টান পড়ে— “কোথায় যাচ্ছ মা?”

ঘরে এসে সে দেখতে পায় স্নেহলতা দরজা অবধি গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন। পাতলা নাইটি ভেদ করে তাঁর শুকনো দেহাবয়ব— দরজার সামনে থমকে আছে। রাজু মায়ের পাশে এসে দাঁড়ায়। স্নেহলতা রাজুর দিকে ফেরেন। তাঁর রাজুকে মনে পড়ে। নিজেকে মনে পড়ে। বাড়ি ঘর জীবন ছোট পাপগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। তিনি ধীরে ধীরে নিরুৎসাহে মুড়ির বাটির কাছে ফিরে আসেন। রাজু তার মায়ের মাথায় টিয়াটাকে বসিয়ে দেয়। স্নেহলতাকে দূর থেকে একটা লাইটহাউসের মত দেখাচ্ছে এখন। পাখিটা আলো হয়ে এদিক ওদিক করছে।

রান্নাঘর থেকে একটা শব্দ এল। রাজু ছুটে এসে দেখতে পেল একটা সাদা বিড়াল তাদের রান্নাঘরে! গ্যাসের উপর রাখা দুধের বাটির ঢাকনা সরিয়ে দুধ খাচ্ছে! প্রচণ্ড বিস্ময়ে রাজু চিৎকার করে উঠল, “হ্যাট!” আর সঙ্গে সঙ্গে তার আফশোস হল। কেঁদো বিড়ালটা পালাতে গিয়ে জানালার গ্রিলে আটকে গেছে। ছটফট করতে করতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিচ্ছে বিড়ালটা। রাজু চুপ করে তার পলায়ন দেখল। তারপর দুধের বাটি হাতে নিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে এল। তখনও বিড়ালটা গলি দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। রাজু ডাকল, “যাস না, আয়! আয়!” বিড়ালটা পিছু ফিরে রাজুকে দেখে আরও ভয় পেয়ে ছুটে পালায়।

দড়ি বাঁধা হাতে নষ্ট দুধের বাটি ধরে দাঁড়িয়ে থাকে রাজু। কোথাও একটা কষ্ট হচ্ছে। বিড়ালের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে একটু পরে নর্দমা দিয়ে নষ্ট দুধের নদীটা বয়ে চলে যায়।

 

রাজুকে কারা যেন রাজা বলে ডাকত। এখন তারা কেউ আর বেঁচে নেই। রাজু মায়ের পাশে এসে বসে। টিয়াটা এখন স্নেহলতার হাতে, দড়ির বাঁধন ঠোঁট দিয়ে খুলতে চেষ্টা করছে। রাজু তাকে নিজের পঞ্চাশোর্ধ কাঁধে বসিয়ে দেয়। টিয়া এখন রাজুর জীর্ণ কাঁধে হেঁটেচলে বেরাচ্ছে। স্নেহলতার মুড়ির বাটি থেকে সে এক থাবা মুড়ি তুলে আনে। স্নেহলতার বয়স আজকাল কমছে। রাজু একহাত দিয়ে মায়ের মাথার এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে দিয়ে বলে, “মা টিভি দেখবে?”

টিভিতে পাহাড় দেখাচ্ছে। রাজু চুপ করে মায়ের পাশে বসে পাহাড় দেখতে দেখতে মানুষের সঙ্গমের ছবি আঁকছে। খাতায় কলমে। দ্রুত হাতে খুব অল্প চেষ্টাতেই রাজুর সাদা খাতায় এক পেশীবহুল পুরুষ ও এক নিখুঁত রমণী রমণ করছেন। প্রতিদিন এই সময় রাজু তার খাতায় একটা করে সঙ্গমের ছবি আঁকে। মানুষের, কুকুর-কুকুরীর, গুবরে পোকাদের, মাকড়শার। খুব দ্রুত হাতে আঁকে। বেশি কিছু ভাবে না। পেনসিল দিয়ে খসখস করে এঁকে দিয়ে উঠে চলে যায়। পাখিটাকে খাঁচায় ভরে দিয়ে আসে। বিভিন্ন ভঙ্গিমায় মানুষেরা, কুকুর-কুকুরীরা, পতঙ্গের দল, কীটের দল রাজুর আঁকার খাতায় সঙ্গমরত।

রাজু কখনও পৃথুল মানুষের সঙ্গমের ছবি আঁকে না। ওসব কসরত।

 

রাজুর কাছে যে বাচ্চাগুলো আঁকা শিখতে আসে তাদের কোনওদিন কিছু হবে না। দুপুরবেলা ঘুম থেকে উঠে বসে গম্ভীর হয়ে যায় রাজু। মাঝে মাঝে ঘুম তাকে গম্ভীর করে। সামনে বসে একটা বাচ্চা ছেলে এখন কালো পেনসিল দিয়ে সাদা ইরেজারের গায়ে বিভিন্ন জায়গায় গর্ত বানাচ্ছে।

রাজু চুপ করে গর্ত করে দেওয়া দেখছে। রাজু ভাবছে খনন। ডিম থেকে বেরিয়েই মানুষ কালো তীক্ষ্ণ পেনসিল ফুঁটিয়ে দিচ্ছে সাদা রাবারের গায়ে।

“আঁকছিস না কেন!” রাজু বাচ্চাটাকে ধমকায়।

রাজু নিজে একটা সাদা কাগজ কুড়িয়ে নেয়। বাচ্চাটার উপর নজর রেখে, পেনসিল দিয়ে একটানে খসখস করে একটা এলো ন্যাংটা নারী এঁকে ফেলে কাগজটা ড্রয়ারের মধ্যে ভরে রেখে দেয়। হাতের দড়িটা নড়ে উঠছে। “কোথায় যাচ্ছ মা?”

ঘর থেকে বেরিয়ে এসে রাজু দেখে স্নেহলতা দরজা অবধি গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর সবকিছু মনে পড়ে গেছে। রাজু দূর থেকে দেখে স্নেহলতা হেঁটে হেঁটে নিজের বিছানার কাছে ফিরে আসছেন। রাজু আবার গম্ভীর মুখে ঘরে ফিরে বাচ্চাটার সামনে চেয়ারে বসে একটা বিড়ি জ্বালায়। কিছুক্ষণ পর বলে, “অ্যাশট্রেটা দে তো।”

 

রাজুর হাতে বাঁধা দড়ি চায়ের দোকান অবধি যায়। চায়ের দোকানে বসে রাজু যেসব কথা বলতে নেই সেসব বেশি বেশি করে বলে আর ঝগড়া বেঁধে যায়। কানে গুঁজে রাখা পেনসিলটা হাতে নিয়ে রাজু দ্রুত খবরের কাগজের তাবড় খবরের উপর দিয়ে বৃহৎ শিশ্নময় এক অশ্বের ছবি এঁকে দেয়। আর চায়ের দোকানের সাদাকালো জামাকাপড় পরা লোকগুলো রে রে করে ওঠে। পেনসিলটা কানে গুঁজে বেঞ্চ থেকে উঠে দড়ির পিছু পিছু রাজু বাড়ি ফিরে আসে। ঘরে ঢোকার আগে দেখতে পায় চায়ের দোকানের সামনে কেঁদো বিড়ালটা একমনে বসে আছে। এতক্ষণ খেয়ালই করেনি!

কাঁধে টিয়া নিয়ে কলঘরে ঢোকে রাজু। কল খুলে দেয়। পাখিদের কোনও ঘাম নেই। রাজুর আছে। কলের নিছে বালতি বসিয়ে দিয়ে বালতির গায়ে পাখিটাকে দাঁড় করায় রাজু। পাখিটা দুই পায়ে বালতি আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। “ড়” যুক্ত শব্দগুলো রাজুর পছন্দ। ম্যাড়ম্যাড়ে। ল্যাড়। পকড়। বলতে ভালো লাগে। শুনে আরাম হয়।

বালতি উপচে জল কলঘর ভাসিয়ে দিলে রাজু চুপ করে কলঘরের মেঝেতে শুয়ে পড়ল। তার দেহের চারপাশ দিয়ে এখন ঠান্ডা জল বয়ে যাচ্ছে। পিঠের নিচে, পাছার নিচে ঠান্ডা জল। উপচে যাওয়া বালতি দু পায়ে শক্ত করে ধরে পাখিটা জলে মাথা ডুবিয়ে ডুবিয়ে দিচ্ছে। নিজের পায়ের নখ নিজেই ঠোঁট দিয়ে কামড়ে ধরছে। কামড়। ড়। চোখ বন্ধ কড়ে কলঘড়ে জলেড় মধ্যে শুয়ে আছে ড়াজু। পাখিটা অল্প উড়ে তাড় গায়ে এসে বসল। নিজেকে শবদেহ বলে মনে হচ্ছে এখন। জলে ভাসমান। পেট ফোলা।

তাড় গা দিয়ে টিয়াটা হেঁটেচলে বেড়াচ্ছে। বুকেড় লোমেড় মধ্যে ঠোঁট ড়াখছে টিয়া। চোখেড় মধ্যে ঠোঁট ঢুকিয়ে দিচ্ছে। নাভিড় মধ্যে ঠোঁট ঢুকিয়ে দিচ্ছে। হাঁটু কামড়ে ধড়ছে টিয়া। ড়াজু জলেড় উপড় দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। হাতে বাঁধা দড়িতে টান পড়ে। “মা কোথায় যাচ্ছ?”

কলঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসে রাজু দেখে স্নেহলতা দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তোয়ালে জড়িয়ে রাজু এসে দাঁড়ায় মায়ের পাশে। “মা কোথায় যাচ্ছ?”

 

বাচ্চাগুলো আজকে সকাল থেকে চারকোল নিয়ে যেখানে যা পারছে এঁকে দিচ্ছে। রাজু বারণ করছে না। বারণ করার সে কেউ নয়। আজকে সরস্বতী পুজো তাই আঁকা এমনিই বন্ধ। চারকোল নিয়ে হাতাহাতি বাঁধলে রাজু চেয়ারে বসে বসে বাচ্চাগুলোকে ধমকাচ্ছে। আওয়াজ শুনে টিকটিকিটা সকালবেলাই বেরিয়ে এসেছে প্রকাশ্যে। রাজু চেয়ারে বসে বসে টিকটিকি দেখে। টিকটিকি টিউব লাইটের পাশে শুয়ে শুয়ে রাজু দেখে। তারপর চপক চপক চপক চপক করে দেওয়াল দিয়ে চার পায়ে হেঁটে হেঁটে চলে যায়। রাজু বাড়িতে কখনও স্ত্রী টিকটিকি দেখেনি। টিকটিকির ডিমও দেখেনি বহুকাল। ড্রয়ার খুলে একটা সাদা পাতা বের করে আনে রাজু, তারপর কান থেকে পেনসিলটা নিয়ে খসখস করে টিকটিকি আর স্ত্রী টিকটিকির সঙ্গম এঁকে দেয়।

“কী আঁকছ কাকু?”

রাজু দেখে একটা বাচ্চা উপুড় হয়ে পড়েছে তার কাগজের উপর। উপুড়। ড়াজু ধমকায়, “তোড় কী!” হাতে বাঁধা দড়িটা নড়ে ওঠে। “কোথায় যাচ্ছ মা?”

 

বাচ্চাগুলো চলে গেছে বেলার দিকে। ফুলের মত শুকিয়ে ছোট হয়ে স্নেহলতা এখন চেয়ারে একা বসে আছেন। রান্নাঘরে ভাতে ডালে বসিয়ে দিয়ে রাজু মায়ের কাছে এসে বসল। স্নেহলতা আওয়াজ শুনে রাজুর দিকে ফিরে তাকালেন। তাঁর দৃষ্টি দেখে রাজু বুঝতে পারছে তিনি রাজুকে চেনার চেষ্টা করছেন। সে চুপ করে তাকিয়ে থাকে স্নেহলতার দিকে। একটা সময় পর স্নেহলতার দৃষ্টি বদলে যায়। রাজু বোঝে তিনি রাজুকে, নিজেকে, জীবনকে চিনতে পেরেছেন। স্নেহলতা সবকিছু চিনতে পেরে টিভির দিকে ফেরেন। এখন সেখানে অসংখ্য কাচের বাটি, যাদের একসাথে দাম পাঁচ হাজার টাকা কিন্তু বিশেষ ছাড়ে মাত্র নশো টাকাতেই দেওয়া হচ্ছে, এমন বিজ্ঞাপন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে। একটা চামড়া দেখানো ফরসা মেয়ে বাটিগুলো নিয়ে একবার মাইক্রোওভেনে রাখছে। একবার রেফ্রিজারেটরে। একবার খাবার টেবিলে। বিভিন্ন খাবার রাখা অসংখ্য কাচের বাটি সম্পর্কে মেয়েটা কথা বলছে। হাসিমুখে। কাচের বাটি সম্পর্কে তার অনেক কিছু বলার আছে।

একটা সাদা কাগজ নিয়ে রাজু ফরসা মেয়েটাকে চারকোল দিয়ে দ্রুত এঁকে দেয়। এখানে মেয়েটাকে অত হাসিখুশি দেখাচ্ছে না। একা, বিবস্ত্র মেয়েটা রাজুর আঁকাতে কাচের বাটি সম্পর্কে কিছুই বলছে না। চুপ করে নিজের পায়ের বুড়ো আঙুলের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। মেয়েটার শিরদাঁড়ায় গোনাগুনতি কিছু হাড় বের করে দিল রাজু। একটু পরে খেয়াল হল স্নেহলতা এদিক ফিরে রাজুর আঁকা মেয়েটাকে দেখছেন।

“দেখি মা…”

 

চারকোল দিয়ে রাজু স্নেহলতার মুখে সুন্দর একটা তা দেওয়া তাজা গোঁফ এঁকে দিয়েছে। গুঁফো স্নেহলতা এখন টিভিতে সবজি কাটার মেশিনের বিজ্ঞাপন অনেকক্ষণ ধরে দেখছেন।

 

চায়ের দোকানে বসে যা বলার নয় তাই বলছে রাজু। সাদাকালো জামা পরা লোকগুলোর তা পছন্দ হচ্ছে না। এরা কেউ রাজুকে আজু বলে ডাকে না। খবরের কাগজের খবরের উপর ঘোড়া এঁকে দেবে কিনা ভাবছে রাজু। হঠাৎ খেয়াল হল বিড়ালটা চায়ের দোকানে এসে বসেছে।

“ওকে দুধ দে তো একটু…”
“নিজের বাড়ি নিয়ে গিয়ে খাওয়ানগে, একবার দুধ দিলে মাথায় চড়ে বসবে…”

চড়ে। ড়াজু বিড়ালটাকে ডাকল, “আয়,”

ভিতু প্রাণ তাকিয়ে আছে ড়াজুড় দিকে। হাতে বাঁধা দড়িড় বাঁধন আলগা হয়ে আসছে, ড়াজু টেড় পাচ্ছে। ড়াজু ডাকছে, “আয়, আয়…”

বিড়ালটা ড়াজুড় দিকে একটু এগিয়ে আসে।

“রাজু তোর মা…”

রাজু দেখল স্নেহলতা পাতলা নাইটি পরে খালি পায়ে চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছেন। রাজু ভাবল ডাকবে কি না। স্নেহলতার ঠোঁটের উপর কালো পাকানো গোঁফ আঁকা। স্খলিত পায়ে স্নেহলতা নিজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।

 

চায়ের দোকানে বসে ড়াজু ডাকল, “আয়, আয়…”

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1906 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

3 Comments

  1. অসম্ভব ভাল লাগল এ’গল্পের বিষাদ, মায়া এবং লিখনের আশ্চর্য নির্লিপ্তি।

  2. এ গল্পের বিষাদ ও মায়া, তার সঙ্গে মানানসই গল্পের চলন এবং কথনের আশ্চর্য নির্লিপ্তি মুগ্ধ করল। দীর্ঘদিন মনে থাকবে।

আপনার মতামত...