মুসাফির এ মন

নীলাঞ্জন হাজরা

 

চতুর্থ পর্বের পর

মুসাফিরি ৫

চান থেকে বাঁচান!

স্নানটা আমার কাছে একটা জরুরি ব্যাপার৷ নতুন কোনও জায়গায় যখনই পৌঁছই না কেন, আগে গিয়ে টুক করে স্নান সেরে নিতে পারলে বেশ ফ্রেশ লাগে৷ কিন্তু ইস্তানবুলে যে আশ্চর্য চানের অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তেমনটি আর কখনও হয়নি৷

‘টার্কিশ বাথ’-এর কথা কে না শুনেছে৷ মূল গপ্পোটা হল ছোট ছোট গরম কুঠরিতে গা ঘামিয়ে, একটা বড়সড় হল ঘরে এসে সাবান দিয়ে দলাই মলাই আর ঠান্ডা-গরম জলে চান৷ তবে একা নয়, সম্পূর্ণ অপরিচিত একগাদা লোকের সঙ্গে৷ পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, যেমন জার্মানিতে, এমন ‘বাথ’ এনতার রয়েছে৷ আর দু’একজন বন্ধুবান্ধবের কাছে সেখানে নাইতে যাওয়ার বর্ণনা শুনেই ইস্তানবুলে এক তুর্কি বন্ধুর বাড়িতে বেশ কয়েকদিন কাটানো সত্ত্বেও এ নিয়ে বিন্দুমাত্র উচ্চবাচ্য করিনি, যদিও কথায় বলে হামামে না নাইলে নাকি ইস্তানবুল বেড়ানো অর্ধেক বাকি রয়ে গেল! পশ্চিম ইউরোপের টার্কিশ বাথে মহিলা-পুরুষ দিব্যি একসঙ্গে চান করেন৷ সম্পূর্ণ উদোম হয়ে৷ রক্ষে করো ভাই, আমার ইস্তানবুল ভ্রমণ অর্ধেকই থাকুক, ওটি আমার দ্বারা অসম্ভব৷

কিন্তু শেষ রক্ষা হল না৷ হঠাৎই আমার বন্ধু আয়েচা ইলমাজ় একদিন কথা নেই বার্তা নেই তাল তুলে বসল,

‘নীলাঞ্জন, তোমাকে তো হামামে যেতে দেখলাম না?’

বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে, ‘না-না৷ থাক না৷ এত কিছু দেখা এখনও বাকি৷ সেখানে যাওয়া মানেই তো শুনেছি বেশ কয়েক ঘণ্টার ধাক্কা৷’ আয়েচা নাছোড়, ‘ধুর! ওটা কোনও কথা নাকি৷ ইস্তানবুলের শ্রেষ্ঠ হামামগুলোর একটা আমাদের বাড়ির কাছেই, আজই ঘুরে এসো৷’ প্রায় ডুকরে উঠি, ‘অসম্ভব!’

‘কেন?’ আশ্চর্য নিরপরাধ চোখে আয়েচা আমার দিকে চেয়ে৷

কোনও ক্রমে তাকে আমার সমস্যাটা বলি৷ সে তো হেসেই কুটিপাটি, ‘কে বলল তোমায় যে জামাকাপড় সব খুলতেই হবে?’

আমি কিঞ্চিৎ অবাক, ‘হবে না?’

আয়েচা আশ্বস্ত করে, ‘মোটেই না৷’

কিন্তু আরও বাকি আছে৷ আমতা আমতা করে সেটাও বলে ফেলি, ‘মেয়েদের সঙ্গে একসঙ্গে চান করতে তো হবে?’

‘আরে না রে বাবা, না৷ আমাদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ঘর৷ আর তোমাদের আলাদা৷’

অনেকটা ভরসা পাই৷ আরও একটা সমস্যা রয়েছে— সে হামামে কেউ এক বর্ণ ইংরেজি বোঝে না, বলা তো দূর-অস্ত্৷ আয়েচা ফোন করে৷ ম্যানেজারকে বুঝিয়ে দেয়, হিন্দ থেকে একজন যাবে৷ তাকে চান করিয়ে দিতে হবে, সে কিন্তু একটুও তুর্কি জানে না৷ আমি পাশ থেকে ক্রমাগত বলতে থাকি— ‘আর বলে দাও যে যিনি যাবেন তিনি কিন্তু শর্ট্‌স্‌ পরে চান করবেন!’ সেটা সে বলে কি বলে না তা অবশ্য বুঝতে পারি না৷ দুরু দুরু বুকে হামামের গেটে হাজির হই৷ উস্কুদারের চিনিলি হামাম৷

বিশাল একটা খয়েরি বাড়ি৷ গেটের উপর পরিষ্কার ইংরেজিতে লেখা— Historical Turkish Bath for Men. 1640. Cinili Hamami৷

বোঝাই যায় মহিলাদের ঢোকার দরজাও আলাদা৷ অটোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সম্ভবত সবথেকে প্রভাবশালী নারী, প্রথম সুলতান আহমেৎ-এর স্ত্রী কোসেম সুলতান প্রায় চারশো বছর আগে তৈরি করেছিলেন এই হামাম৷ এ দেশে তখন শাহ জাহানের রাজত্ব৷ ভিতরে ঢুকি৷ দেখেই বুঝি হামামের ম্যানেজার আমার অপেক্ষাতেই ছিলেন৷ তার হাতে নির্ধারিত মূল্য গুঁজে দিই৷ আজ আর ঠিক মনে নেই, তবে সম্ভবত ৩৫-৪০ তুর্কি-লিরার মতো হবে৷ মানে আমাদের ৭০০-৮০০ টাকা৷ বারান্দার দু’পাশে পালিশ করা কাঠের দরজা দেওয়া ছোট কুঠুরি৷ তর্জনী সঙ্কেতে পাঠিয়ে দেন একটাতে৷ ঘরের একপাশে সরু বিছানা৷ ক্লান্ত হয়ে এসেছ৷ চানের আগে দু’দণ্ড জিরিয়ে নাও শুয়ে৷ জামা-কাপড় ছাড়ো৷ পরিপাটি ভাঁজ করে রাখা ফিনফিনে তোয়ালে৷ পরে নিতে পারো৷ মেঝেতে এক জোড়া স্যান্ডেল৷ আমি শর্ট্‌সে্‌র উপর তোয়ালে জড়িয়ে, চটি পরে খালি গায়ে ঘর থেকে বেরোই৷ আর একটা বিশাল হল ঘিরে আরও সারি সারি কুঠুরি৷ তাতে কাঠের বেঞ্চি৷ গা-ঘামানো ঘর৷ যাকে বলে ‘sauna’৷ কেন জানি না, হয়তো আপিসের দিন ভরদুপুর বলেই, আর একটাও লোক দেখি না কোত্থাও৷ কেমন একটা গা ছমছম লাগে৷ চারশো বছর ধরে কত লক্ষ মানুষ বসে বসে গা ঘামিয়ে গিয়েছে এই বেঞ্চিতে! খানিকক্ষণের মধ্যেই দরদর করে ঘামতে থাকি৷ আর তার পরেই খেলা জমে ওঠে!

হঠাৎ দেখি কোমরে এক চিলতে কাপড় জড়ানো এক পাহাড় আমার সামনের দরজাটা ঢেকে ফেলে দাঁড়িয়ে আছেন৷ হল ঘরের মাঝখানে মার্বেলের উঁচু একটা বেদি৷ সেই বেদিতে বসে পড়তে নির্দেশ হয়৷ ঝপাঝপ হিম ঠান্ডা জল৷ তারপর আমাদের সানলাইট সাবানের বারের দ্বিগুণ সাইজের বার দিয়ে শুরু হয় আমাকে কাচা৷ ঘুরিয়ে, ফিরিয়ে, উপুড় করে, চিৎ করে৷ চটকিয়ে, রদ্দা মেরে, টেনে, মুচড়িয়ে৷ আমার স্পন্ডিলোসিস৷ যতবার কঁকিয়ে উঠে কাতর অনুরোধ করি, ‘এবার রেহাই দিলে ভালো হয় না?’ উত্তরে একটা শব্দ আসে, যার বাংলাটা ঠিক আমার জানা নেই কিন্তু সদ্য মারা শিকার পাহারা দেওয়া বাঘের বর্ণনা দিতে গিয়ে ইংরেজিতে তাকেই বোধহয় কর্বেট সাহেব বলেছিলেন, ‘angry grunt’! একটা সময় ঝড়ের রাতে করাল সমুদ্রের বুকে ডিঙি নৌকোর মতো নিজেকে ছেড়ে দিই৷ কতক্ষণ সেই ধোলাই চলেছিল আজ আর মনে নেই৷ তবে যখন শেষবারের মতো আমায় আপাদমস্তক জলে চুবিয়ে সে ভদ্রলোক একটা বিপুল দুধ-সাদা তোয়ালে এগিয়ে দেন, তখন তাঁর চোখে-মুখে স্পষ্ট লেখা— শাল্লা! নোংরা জানোয়ার! এতক্ষণে সাফ করেছি তোকে৷ আজও যখন শীতের রাতে কোমরের ব্যথা ঝিলিক দিয়ে যায় সেই আশ্চর্য পরিতৃপ্ত চোখ জোড়া স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে!

***

ইস্তানবুল

আমার ইস্তানবুল সফরে মহাস্নান একটা হাইলাইট নিশ্চয়ই৷ কিন্তু অন্য হাইলাইটগুলি কী হতে পারে? মনে করার চেষ্টা করি৷ মনে পড়ছে অদ্ভুত এক বাস সফরের কথা৷ প্রায় অবিশ্বাস্য৷ আর এক ‘পিম্প’-এর আশ্চর্য প্রস্তাবের কথাও৷ আসলে ইস্তানবুলের মতো ডাকসাইটে শহরে, বা যে কোনও শহরেই যা কিছু বিখ্যাত দর্শনীয় সেগুলির কথা তো বলাই যায়৷ কিছু কিছু বলবও৷ কিন্তু আমার মুসাফির মনে প্রধানত আটকে থাকে সেই সব ঘটনা, সেই সব মানুষের কথা, যা থেকে একটা শহরের, একটা জায়গার রং, তার ফ্লেভারটা বোঝা যায় খানিকটা৷

এ এক্কেবারে ইস্তানবুলে আমার প্রথম দিনের কথা৷ ইউরোপ, আমেরিকার অনেক শহরের মতো ইস্তানবুলেরও ট্রান্সপোর্টেশন কার্ড আছে৷ মানে একটাই কার্ড, আমাদের ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের মতো দেখতে, সেটা বাস, মেট্রো, লঞ্চ— হরেক রকমের পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ব্যবহার করা যায়৷ ইস্তানবুল পৌঁছেছিলাম আগের দিন সন্ধ্যায়৷ প্রায় ভোর অবধি আমার বন্ধু হাকান গুলস্বেনের বাড়ির ব্যালকনিতে বসে মার্মারা সমুদ্রের নোনতা মুচমুচে হাওয়ায় চুটিয়ে তুর্কির দেশি মদ রাকি পান করেছি পাইন-নাট্‌স্‌ দিয়ে৷ কাজেই পরদিন ঘুম ভাঙতেই ঘড়ি দেখে আঁতকে উঠলাম— সকাল গড়িয়ে বেলা হয়ে গিয়েছে৷ তাড়াতাড়ি চানটান করে বেরিয়ে পড়তে তৈরি হয়ে নিই৷ এ সময় হাকান জানাল— ‘আজকের দিনটা তুমি একটু একা একাই ঘোরো, আমি একটু কাজে ফেঁসে আছি৷ কাল থেকে আমি থাকব৷’ কুছ পরোয়া নেহি৷ আমার মন তখন অলরেডি রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে৷

ঠিক বেরোনোর আগে হাকান বলল— ‘শোনো, আমার ট্রান্সপোর্ট কার্ডটা নিয়ে যাও অনেক সস্তা হবে৷ তবে কাল খেয়াল করলাম একদম টাকা ফুরিয়ে গিয়েছে, একটু লিরা (তুর্কির টাকা) ভরিয়ে নিও৷’

‘কোথায় ভরাব?’
‘আমার বাড়ি থেকে বেরিয়েই একটা ‘টোবাকো শপ’ পাবে, সেখানে৷’

এখানে বলে রাখা ভালো, এ ব্যাপারটা আমি ইউরোপেও, যেমন ভিয়েনাতেও, দেখেছি৷ এ ধরনের কার্ড ভরানো হয় তামাক-সিগারেটের দোকানে, জার্মানে যাকে ‘তাবাক’ বলে৷ তো যাই হোক, আমি তো কিছু লিরা ভরিয়ে জাহাজঘাটায় যাওয়ার প্রথম যে বাসটি পেলাম তাতেই উঠে পড়লাম (হাকান নম্বর বলে দিয়েছিল, এমন বাসের যার শেষ স্টপ জাহাজঘাটা)৷ বসফরাস পার করে লক্ষ্য ইস্তানবুলের বিখ্যাত নীল মসজিদ৷

দিনটা ঠিক মনে নেই৷ হয়তো ছুটির দিন ছিল৷ কিংবা হয়তো ভর দুপুর বলেই, বাসে দেখি আমি ছাড়া জনা পনেরো যাত্রী৷ এবং সক্কলেই বুড়ো৷ বৃদ্ধ৷ এবার, ইস্তানবুলের বাসের ব্যবস্থা হল, সামনের দরজা দিয়ে উঠতে হবে৷ ড্রাইভার বাঁ দিকে (ইংল্যান্ডের উপনিবেশ ছিল না, এমন যে সব দেশে গিয়েছি, দেখেছি লেফ্ট হ্যান্ড ড্রাইভিং)৷ আর তার পাশেই সেই ট্রান্সপোর্ট কার্ড পাঞ্চ করার মেশিন৷ সাড়ে ছ’ফুটি তুর্কি ড্রাইভার বাস ছেড়ে দিয়ে বাঁ হাতে স্টিয়ারিং আর ডান হাতে আমার কার্ড পাঞ্চ করে দিলেন৷ ফরফর করে টিকিট বেরোনোর কথা৷ কিছুই বেরোল না৷ তিনি ফের পাঞ্চ করলেন, ফের কিসুই হল না৷ তিনি আবার পাঞ্চ করলেন, মেশিন নীরব৷ এইবার বেশ বিরক্তির সঙ্গেই তিনি কার্ডটা ফেরৎ দিয়ে দিলেন৷

সে কী? আমি আঁতকে উঠি৷ এই যে ভরালুম৷ ড্রাইভার সাহেবকে বেশ ডাঁটের মাথাতেই বলি— ‘বাট আই জাস্ট পুট ইন সাম মানি৷’ এবং তারপরই আমার প্রথম উপলব্ধি হল, আমি এমন দেশে এসে পড়েছি যেখানে অধিকাংশ মানুষ এক বর্ণ ইংরেজি বোঝেন না৷ আমাদের বাসের ড্রাইভারটিও সে গোত্রেরই৷ তিনি বিরক্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বুড়ো আঙুল আর তর্জনী একে অপরের সঙ্গে ঘষে বুঝিয়ে দিলেন— ক্যাশ নিকালো! আর তখনই আমার এও খেয়াল হল, আগের দিন সন্ধ্যায় এয়ার্পোর্টে কয়েক শো ডলার ভাঙিয়েছিলাম বটে, কিন্তু সব বড় বড় নোটের লিরা৷ কী করি? তাই একটা বার করলুম৷ এবার ড্রাইভার এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন যে, এতক্ষণ কার্ড পাঞ্চ করছিলেন, এবারে আমাকে পাঞ্চ করবেন৷

এ দিকে বাস চলছে৷ কিন্তু আর চলল না৷ তিনি বাস থামিয়ে আমায় পরিষ্কার ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন— এবার মানে মানে নেমে পড়ো৷ আমার তখন কান্না পাচ্ছে৷ শেষ পারানির কড়ি হিসেবে, সেই তাবাকের দোকানের টাকা ভরানোর রিসিটটা বার করি৷ বার করে একেবারে সামনে বসা বৃদ্ধকে বলি, ‘আপনি দেখুন৷ আমি লিরা ভরিয়েছি৷ কার্ড না কাজ করলে আমি কী করতে পারি বলুন?’

এবং সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি ওই বাসটিতে পনেরো জন বুড়োর একজনও ইংরেজি বোঝেন না৷ এ দিকে বাস দাঁড়িয়ে আছে৷ আমার মানে মানে নেমে যাওয়ার অপেক্ষায়৷ কোথায় এলাম? কোন রাস্তা? এর পর কোন দিকে যেতে হবে? কীভাবেই বা যাব? কিছুই জানি না৷ এমতাবস্থায় বুড়ো আমার হাত থেকে কাগজটি নিলেন৷ এবং তারপর যা ঘটল, তা কোনওদিন ভুলব না৷ স্পষ্ট বুঝলুম, বুড়ো ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন— বাস ছাড়ো৷ এই স্লিপই যথেষ্ট৷ এতে পরিষ্কার তারিখও দেওয়া আছে টাকা ভরানোর (দেখলাম তিনি ছাপা তারিখটার উপর আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন বার বার)৷ ড্রাইভার বললেন, ‘অসম্ভব৷ বিনা টিকিটে আমি কাউকে ভ্রমণ করতে দিতে পারি না৷’ সম্পূর্ণ দুর্বোধ্য ভাষায় রুদ্ধশ্বাস সেই নাটকে এবার একে একে প্রত্যেকে যোগ দিলেন৷ সেই স্লিপ আরও চোদ্দোটি হাতে হাতে ঘুরল৷ তারপর তাঁরা দাবি তুললেন, এখুনি বাস ছাড়তেই হবে৷ এ লোকটাকে কিছুতেই নামিয়ে দেওয়া যাবে না৷ স্পষ্ট বুঝলুম তাঁদের সাফ কথা, কার্ডে যে টাকা আছে সেটা প্রমাণিত৷ হঠাৎ যদি কার্ড খারাপ হয়ে যায় ইনি কী করবেন? তা ছাড়া, প্রায় সকলের মুখেই ‘তুরিস্ত’ কথাটাও শুনলাম৷ নিশ্চয়ই বলছেন, ইনি টুরিস্ট, একে এইভাবে বিপদে ফেলা যায় না৷ খুব যে চ্যাঁচামেচি হয়ছিল তা নয়৷ কিন্তু মিনিট পাঁচেক রীতিমতো তর্কাতর্কি৷ শেষে হার মানলেন ড্রাইভার৷ আমি নির্বিঘ্নেই জাহাজঘাটায় পৌঁছলুম৷

আর এক দিনের কথা৷ তাক্সিম স্কোয়্যার থেকে হাকানের বাড়িমুখো৷ একাই সে দিনও৷ বিকেল বেশ গড়িয়ে গিয়েছে৷ বসফরাস পেরিয়ে আমায় উস্কুদার অঞ্চলে যেতে হবে৷ মেঘ করেছে৷ ঝড় না হলেও একটা শনশন হাওয়া উঠেছে৷ ইস্তানবুলের এ সব অঞ্চলে দেখেছি বিকেল একটু গড়ালেই রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়৷ সে দিনও তাই৷ আমি হনহনিয়ে হাঁটছি৷ হাকানের বউ আয়েচা পাখি পড়া করে পড়িয়ে দিয়েছে— অমুক বাস নেবে৷ তমুক জাহাজঘাটায় যাবে৷ সেখান থেকে অমুক নম্বরের লঞ্চ ধরবে, সেই সব মনে মনে আউড়াতে আউড়াতে চলেছি৷ কোনও দিকে লক্ষ্য নেই আর৷ হঠাৎ দেখি আমি একা হাঁটছি না৷ আমার সঙ্গে আরেকজন হাঁটছে৷ প্রথমে পাশে তাকাতে তার কাঁধের তলা চোখে পড়ল৷ নির্ঘাৎ এও সাড়ে ছ’ফুটিয়া তুর্কি৷ পরনে প্যান্ট আর ফুলহাতা সাদা শার্ট৷ আমি চলেছি৷ সেও চলেছে৷ কী ব্যাপার? এবার কানে আসে একটা খসখসে গলা, ‘মিস্তার, ইউ নিদ এনিথিং?’

এ আবার কী বলছে লোকটা? আমার কী চাই? ‘হোয়াট এনিথিং,’ ভুলবশত আমি পাল্টা জিজ্ঞাসা করে ফেলি৷

‘এনিথিং ইউ লাইক?’

‘নো-নো৷ আই অ্যাম ফাইন৷ আই ডোন্ট নিড এনিথিং,’ ভাবি নির্ঘাৎ কোনও টুর গাইড, আমায় ইস্তানবুলের ডাকসাইটে কাপালি চারশি গ্র্যান্ড বাজারে নিয়ে গিয়ে মাথা মোড়াবে৷ (বাজারটার নাম শুনেছিলাম, কিন্তু তখনও জানতাম না সেটা কোথায়?)

‘মিস্তার, আই হ্যাভ এভরিথিং!’

তখনও আমার মাথায় আসেনি৷ বিরক্ত হয়ে একটু খেঁচিয়েই দিই, ‘ডিড আই নট টেল ইউ? আই ডোন্ট নিড এনিথিং৷ ওকে-এ-এ-এ৷’

‘মিস্তার, এনিথিং৷ এনি এজ৷ এনি কান্ত্রি৷ ব্ল্যাক৷ হোয়াইত৷ লাইক ইউ৷ লাইক মি৷ এনিথিং৷’

সর্বনাশ! এইবার বুকটা ধড়াস করে ওঠে৷ পিম্পের খপ্পরে পড়েছি৷ কী করি৷ বিদেশ বিভূঁই৷ রাস্তা শুনশান৷ সন্ধ্যা হব হব৷ চলার স্পিড ডবল করে দিই৷ কিন্তু সে সাড়ে ছ’ফুটিয়ার সঙ্গে আমি পারব কেন? সে চলতেই থাকে, আর সঙ্গে সেই এক বুলি,

‘মিস্তার, এনিথিং৷ নো প্রোবলেম৷ আই তেল নো প্রোবলেম৷’

ভারি মুশকিল৷ শেষে আমি বলি, ‘লুক, আই অ্যাম ইন্ডিয়ান৷ পুয়োর ইন্ডিয়ান৷ নট আমেরিকান৷ নো মানি৷ নো মানি৷ ওকে?’ যদি রেস্তো নেই বললে রেহাই পাই৷ কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে উত্তর আসে— ‘নো প্রোবলেম৷ মিস্তার৷ নো মানি৷ নো মানি৷ ক্রেদিত কার্দ৷ ইউ হ্যাভ ক্রেদিত কার্দ?’

জীবনে অনেক শক্ পেয়েছি৷ কিন্তু এমন মোক্ষম শক্ আর পেয়েছি বলে মনে পড়ে না৷ বেশ্যালয়ে ক্রেডিট কার্ড?

‘আরে হবে না কেন?’ আমার অভিজ্ঞতা শুনে হাকান জানায় ডিনারের সময়, ‘যৌনকর্মীরা তো আইনি এখানে৷ এ পেশায় যাঁরা আছেন তাঁরা তো সকলে রেজিস্টার্ড৷ আর পাঁচটা পেশার মতো, এই যে তোমার আইডি কার্ড আছে, তাঁদেরও আছে৷ এমনকী আদম শুমারিতেও দেওয়া থাকে দেশে কত যৌনকর্মী আছেন৷’

সত্যিই, কত অভিজ্ঞতাই হল মুসাফিরি জীবনে!

***

 

নীল মসজিদের জাদু মুহূর্ত

ফোটোগ্রাফির দুনিয়ায় ‘ম্যাজিক মোমেন্ট’ বলে একটা কথার চল আছে৷ সূর্য যখন দিগন্তের নীচে ডুবে গিয়ে নির্দয় হয়ে আকাশকে রক্তাক্ত করে তার কাছ থেকে আলোর শেষ রেখাগুলোকেও টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলে যায়, সেটাই ম্যাজিক মোমেন্ট৷ অ্যাডোবি কোম্পানি দাবি করে ফটোশপ বলে যে সফ্টওয়্যার আছে তাতে নাকি কম্পিউটর স্ক্রিনে ১ কোটি ৭০ লক্ষ রঙের শেড তৈরি করা যায় তিনটি রং মিলিয়ে— লাল, সবুজ আর নীল৷ শেষ বিকেল থেকে গোধূলি হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত গড়াতে গড়াতে দীর্ঘ ম্যাজিক মোমেন্টে প্রকৃতির মহাশিল্পী আকাশের স্ক্রিনে যে সংখ্যক রং তৈরি করতে পারেন তা গোনার মতো কোনও সুপার কম্পিউটার আজ অবধি তৈরি হয়েছে বলে বোধ হয় না৷

ম্যাজিক মোমেন্টের রং নিয়ে এই পাঁয়তাড়া কেন কষছি? কারণ কথার স্ক্রিনে ধরতে চাইছি নীল মসজিদ৷ ইস্তানবুলের নীল মসজিদ৷ তুর্কিরা যাকে বলবে— সুলতান আহমেৎ জামি৷ জামি— মসজিদ৷ তৈরি করিয়েছিলেন অটোমান সম্রাট প্রথম সুলতান আহমেৎ৷ সময় লেগেছিল পাঁচ বছর— ১৬০৯ থেকে ১৬১৬ সাধারণাব্দ৷ এটিই ইস্তানবুলের একমাত্র মসজিদ যার চারটি নয় ছ’টি মিনার, যাদের উচ্চতা ২১০ ফুট৷ বিপুল এই মসজিদের পাঁচটি বড় এবং আটটি ছোট গম্বুজ৷ দেওয়ালে আর গম্বুজে ব্যবহৃত হয়েছে ২০ হাজার আনাতোলিয়ার ইজনিক শিল্পকলার নীল ফুলকারি করা টালি৷ রয়েছে রঙিন কাচের দুশোটিরও বেশি পেল্লায় পেল্লায় জানালা৷ প্রার্থনায় বসতে পারেন ১০ হাজার মানুষ৷

তবে এ সবই তথ্য৷ সুলতান আহমেৎ জামি বিষয়ক তথ্য৷ কিন্তু নীল মসজিদ যখন বলছি? হ্যাঁ, সেই একই মসজিদ বটে, কিন্তু ওই ‘নীল’ কথাটা জুড়ে দেওয়া মাত্র সে তো আর তথ্য থাকল না৷ রং হয়ে গেল৷ আর রং মানেই তো আলোর খেলা৷ আমার কাছে নীল মসজিদ আশ্চর্য আলোর খেলা৷ আর আজ চোখ বন্ধ করে সে আলোর খেলার কথা মনে করতে গেলে সবার আগে মনে পড়ে নীল মসজিদ প্রথম দূর থেকে দেখতে পাওয়ার, বা সামনে দাঁড়িয়ে দেখার কোনও মুহূর্ত নয়, বরং সে মসজিদ দেখে ফিরে যাওয়ার সময়, লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে বসফরাসের ঢেউ পার করে প্রকৃতির সেই মহাশিল্পীর আকাশের স্ক্রিনে এক্কেবারে শেষ বিকেল থেকে গোধূলি হয়ে সন্ধ্যা গড়িয়ে যাওয়ার জাদু মুহূর্তে সে মসজিদের ধীরে ধীরে দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়া৷ সে ছবি ধরে রাখার মতো না আছে আমার ক্যামেরা, না আমি তেমন ফোটোগ্রাফার৷ তবু এই আনাড়ি হাতে তোলা ছবিগুলোর দিকে এত বছর পরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আজও যেন বসফরাসের ঢেউয়ের মতোই স্মৃতিতে চলকে চলকে আসে সেই রং৷

কিন্তু নীল মসজিদের আলোর রঙের সেটাই একমাত্র খেলা নয়৷ আকাশ যে দিন সম্পূর্ণ নির্মেঘ সেদিন ইস্তানবুলের একটা রঙিন মজা হল সেই আকাশের নীলের সঙ্গে দিনে-দুপুরেও বসফরাস বা মার্মারা সাগরের নীল ঢেউয়ের একটা রুদ্ধশ্বাস কম্পিটিশন৷ আর সেই নীল আকাশের পটে বুক চিতোনো, মাথা উঁচু নীল মসজিদ দেখাও একটা অভিজ্ঞতা বৈকি৷

আর তারপর, সে মসজিদের আঙিনা পেরিয়ে মূল প্রার্থনা-হলে ঢুকে পড়ে যে অভিজ্ঞতাটা হয় তা হজম করতেই আমার বেশ খানিকক্ষণ সময় লেগেছিল৷ মানুষের শিল্প-কল্পনা আর প্রকৃতির মহাশিল্পীর সে এক বর্ণনাতীত যুগলবন্দি, যার সঙ্গে আমার আর একটি অভিজ্ঞতারই তুলনা করতে পারি— পণ্ডিত রবিশঙ্করের সেতার এবং ইহুদি মেনুহিনের বেহালার যুগলবন্দি৷

সুরের সেই মূর্ছনার মতোই এই বিপুল প্রার্থনা গৃহের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে একটা রঙের মূর্ছনা, যা সৃষ্টি হয়েছে রঙিন কাচের সেই দুশো পেল্লায় জানালা দিয়ে আসা প্রকৃতির আলো আর সমস্ত হল জুড়ে থাকা একটা পেঁচানো চিরাগদান বা শ্যান্ডেলিয়ার থেকে বেরোনো আলো মিশে৷ মধ্যযুগে নিশ্চয়ই এ চিরাগদানে জ্বলত শত শত প্রদীপ, আর সে প্রদীপের শিখা নিশ্চয়ই অল্প অল্প দুলত৷ সেই দুলতে থাকা আলো, জানালার আলোর সঙ্গে মিলে মিশে যে জাদু মুহূর্ত তৈরি করত মসজিদের ‘অ্যায়ওয়াঁ’ বা হলের মধ্যে তার একটা আন্দাজ পাওয়া যায় আজ, কারণ সেই প্রদীপের জায়গায় এখন জ্বলে শত শত ঠিক প্রদীপ শিখার মতোই দেখতে নিচু পাওয়ারের আগুন-রঙা ইলেকট্রিক বাল্ব৷ আর হলের বিভিন্ন কোণে, বিভিন্ন অংশে জানালার কাচের রং, সূর্যের অবস্থান এবং চিরাগদানের আলোর দূরত্বের ওপর নির্ভর করে সে রঙের খেলা কমতে-বাড়তে-বদলাতে থাকে, সুরের মূর্ছনার ওঠা-নামার তরঙ্গের মতোই৷ তবে সে বাল্ব তো আর শিখা নয়, তাই সুরের সেই দোলাটা আর নেই৷ তবুও সব সেরা শিল্পই তো কল্পনাকে চ্যালেঞ্জ করে, নীল মসজিদের আলোর খেলাও তাই— চোখ খুলে যা দেখা যায়, চোখ বন্ধ করে তার থেকে বেশি বৈ কম দেখা যায় না৷ শুনেছিলাম, এই চিরাগদান, মহাঝাড়বাতি যাতে বিশ্বম্ভর রায়ের সেই জলসাঘরের ঝাড়বাতির মতো মাকড়সার জালে ঢেকে না যায়, এর ফাঁকে ফাঁকে রাখা থাকত মাকড়সা তাড়ানো উটপাখির ডিম৷ উটপাখির ডিম দিয়ে মোক্ষম অমলেট হয় শুনেছি, কিন্তু তার এই ‘রেপ্যাল্যান্ট’ গুণটির কথা আর কোথাও শুনিনি৷

***

 

বাদশাহি ছোরা

ছোরাটা ফুট খানেক লম্বা৷ খাপের হাতল শুদ্ধু ১৩.৭৭ ইঞ্চি৷ আর আমার ইস্তানবুল সফরে অন্যতম আগ্রহ এই ছোরাটাই, কারণ এটিই নিঃসন্দেহে বিশ্বের সব খেকে বিখ্যাত ছোরা— দ্য ইমারেল্ড ড্যাগার৷ পান্না ছোরা৷ অবিশ্যি ভারি নিরীহ এ ছোরা, কারণ এ ছোরা কারও পেটে ভুঁসিয়ে কোনও খুন-খারাবির কথা জানা যায় না৷ যদিও রোমহর্ষক তার ইতিহাস৷ আর এ ছোরা দেখতে গিয়েই আমার ইস্তানবুলের বন্ধু হাকান গুলস্বেনকে প্রথম ভয়ঙ্কর খাপ্পা হয়ে উঠতে দেখেছিলাম৷ কয়েক মুহূর্তের জন্য তো মনে হল আড়াইশো বছর যা ঘটেনি এবার বুঝি তাই ঘটতে চলেছে— পান্না ছোরা হতে চলেছে রক্তাক্ত! কোথায় যেন পড়েছিলাম, ছোরা মাত্রেই তার একটা রক্ত-পিপাসা থাকে, তা না মেটা পর্যন্ত অতৃপ্ত থাকে সেই ছোরা৷

এর আগে বা পরেও প্লেন থেকেই কোনও শহরের কোনও কিছু দেখে এমন ঘাবড়ে গিয়েছি বলে মনে পড়ে না৷ প্রাসাদ বেশ কিছুই দেখেছি জীবনে বড়সড়৷ জানতাম এটি এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাসাদ৷ এ নিয়ে মেলিনা মার্কুরি আর পিটার উস্তিনভের হলিউডের রোমহর্ষক ছবিও আছে— তোপকাপি! তুর্কিতে বলবে তোপকাপি সরাই৷ প্লেন থেকে সব কিছুই পুটকি পুটকি লাগে, এমনকী ল্যান্ড করার আগে যখন প্লেনটা অনেক নীচে নেমে পড়েছে তখনও৷ তা সত্ত্বেও বসফরাসের স্ফটিক নীল জল পার কোরে গোঁৎ খেয়ে আমাদের প্লেনটা ইস্তানবুলের মাটি ছোঁয়ার আগে জানালা দিয়ে তোপকাপির যা সাইজ দেখেছিলাম, তাতেই বুঝেছিলাম অন্তত দিন দুয়েকের ধাক্কা— প্রায় ঝড়ের মতো সব কিছু দেখলেও৷ ঢোকার পরে স্রেফ ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলাম৷ ভিয়েনায় শ্রোনব্রুন প্রাসাদ দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম৷ তোপকাপি মনে হল একটা গোটা পাড়া৷ ১০০ একরের কাছাকাছি নাকি তার জমি৷ উঠোন বাগান-টাগান বাদ দিয়ে পাকা ইমারতগুলোর ক্ষেত্রফলই ৭৫৩৫০০০ বর্গফুট! ১৪৬৫ সাধারণাব্দ নাগাদ অটোমান সম্রাট দ্বিতীয় সুলতান মেহমেদ এটি তৈরি করান৷ ডাক নাম হয় ইয়েনি সরাই বা নয়া প্রাসাদ, ভালো নাম, সরাই-ই-জেদিদ-ই-আমিরি৷ সেই থেকে ৪০০ বছর ধরে ১৮৫৬ পর্যন্ত এটিই ছিল একের পর এক দোর্দণ্ডপ্রতাপ অটোমান সম্রাটের বসতবাটি আর কাজের জায়গা৷

চার ভাগে বিভক্ত এ প্রাসাদ কমপ্লেক্স— আলে ময়দানি— প্রথম ময়দান, দিওয়ান ময়দানি— দিওয়ান ময়দান, এন্দ্রুন আবলুসু— প্রাসাদ অন্দরমহল, হারেম আগালান তাসলিগি— কৃষ্ণাঙ্গ খোজাদের পাহারা দেওয়া হারেম৷ সব মিলিয়ে যার মধ্যে অন্যান্য বহু কিছুর সঙ্গে রয়েছে সম্রাটের বসতবাটি, দরবার, খাজাঞ্চিখানা, রান্নাঘর, হারেম, একাধিক মসজিদ, একটি বাইজেন্টাইন গির্জা (যা ধ্বংস না করে ব্যবহৃত হত অস্ত্রাগার হিসেবে!), একটি বিশাল গ্রন্থাগার আর বড় বড় বাগান৷ এক নিশ্বাসে বলে গেলাম বটে কিন্তু কলেবরে এই একেকটির সাইজ ঠিক কী রকম ছিল, তা বোঝানোর জন্য দু’একটা উদাহরণ দিই৷ ধরা যাক মতবাহ্-ই-আমিরি-র কথাই— প্রাসাদের হেঁসেল৷ প্রথমেই দেখে একটু চমকাতে হয় যে তার ছাদের মাথায় কারখানার চিমনির মতো ২০টি চিমনি! হবে নাই বা কেন? প্রাসাদে যে ৬০০০ (হ্যাঁ ঠিকই পড়ছেন, ছ’হাজার) পাত পড়ে সব মিলিয়ে৷ শুধু পানীয় তৈরির এক হেঁসেল, তার মধ্যে আবার শরবত তৈরির আলাদা হেঁসেল, দুধের খাবার দাবারের আর এক, মিষ্টি তৈরির আর এক… এই রকম আর কী! ৮০০ খানসামা কাজ করতেন এ সব হেঁসেলে৷ তাঁদের জন্য ছিল আলাদা স্নানাগার, আলাদা মসজিদ আর আলাদা শোবার-থাকবার ব্যবস্থা৷ আবার প্রাসাদের হারেমেই শুধু ছিল ৪০০টি ঘর! এলাহি কারবার বলতে কল্পনাতে যা কিছু আসতে পারে, সব কিছুর ইন্তেজাম ছিল এই পাঁচিলের মধ্যেই৷

কোথা থেকে শুরু করা যায়? এমন একটি প্রাসাদের যে একাধিক সিংহদ্বার হবে তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে? কিন্তু কোনটি দিয়ে ঢুকলে কোথায় পৌঁছব? মুশকিল আসানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় হাকান, ‘সব্বার আগে কী দেখতে চাও?’

সত্যি কথাই বলি, ‘ছোরা৷’

‘ছোরা?’
‘ছোরা৷ ইমারেল্ড ড্যাগার!’

হাকান হা-হা করে হাসে, ‘হলিউডের কী ক্ষমতা বুঝতে পারছি৷’ আসলে তোপকাপি থেকে এই পান্না ছোরা চুরিকে ঘিরেই সেই ‘তোপকাপি’ ফিল্মের ঘটনা৷

‘শোনো, তা হলে আমি তোমায় যে গেট দিয়ে ঢোকাব তা দিয়ে ঢুকে তুমি সোজা প্রাসাদের রত্নভাণ্ডারের প্রদর্শনীতে পৌঁছে যেতে পারবে,’ সে জানায়৷ উত্তম প্রস্তাব৷ সে গেটের নাম তুর্কিতে ওর্তা কাপি, মানে মাঝের দরজা৷ আসলে কাপি মানে সিংহদরজা৷ আর তোপ মানে যে কামান সে তো আমরা সকলেই জানি৷ এ গেটের সামনে অবিশ্যি কোনও কামান-টামান চোখে পড়ল না৷ যা চোখে পড়ল তা হল গিজগিজে ভিড়৷ মনে হল দুনিয়ায় যত শ্বেতাঙ্গ সাহেব মেম আছেন সবাই সেখানে হাজির হয়ে গেছেন৷ তাঁদের অনেকেই আবার বড় বড় দলে, সঙ্গে গাইড৷ আর তাঁদের সঙ্গেই বাধল হাকানের গোলমাল৷ তবে সেটা আরও কিছুটা পরে৷ আপাতত টিকিট কেটে ভিড় কেটে ঢুকে পড়ে প্রথমেই ভিড় দেখে একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ভয়ঙ্কর ধাক্কা খেলাম— ‘চেল্লাত জেসমেসি’, জানাল হাকান৷ দেখি তার মুখে মিটিমিটি হাসি৷ দেওয়ালের মধ্যে কারুকার্য করা একটা চৌকো খাঁচ মার্বেল দিয়ে বাঁধানো, তলায় চৌবাচ্চার মতো৷

‘সেটা কী?’
‘জল্লাদের ঝর্না!’

জানলাম প্রাসাদের জল্লাদ অপরাধীর গলাটা তার বিশাল তলোয়ারে ঘ্যাচাং করে কাটার পর এইখানে এসে তার তলোয়াল আর হাত-মুখ ধুতো, রক্তের ছিটে মুছে ফেলত৷ তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাই৷ আজ আর ঠিক মনে নেই সেই বিশাল প্রাসাদে থৈ থৈ করা টুরিস্টদের ভিড় ঠেলে হাকান ঠিক কোন পথে আমায় নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু হাজির হলাম প্রাসাদের রত্নভাণ্ডারের সামনে৷ চারটি বিশাল হল নিয়ে সেই রত্নভাণ্ডার৷ সেখানেও গমগমে ভিড়৷ সবাই মোটামুটি লাইন দিয়ে ঢুকছে৷ হাকান জানে আমার লক্ষ্য ছোরা৷ সে আমায় একটা কাচের শো-কেসের সামনে হাজির করল৷ ওঃ! সে এক ছোরা বটে৷ ছোরাটা অবিশ্যি দেখা যাচ্ছে না, খাপের মধ্যে পোরা৷ দেখেই কলজেটা বুকের কাছে লাফিয়ে উঠল৷ এ জিনিস যে হলিউডের চোখে পড়বে তাতে আর অবাক হওয়ার কিছু নেই৷

কয়েক সেকেন্ড সেখানে দাঁড়িয়েছি, হঠাৎ কানে এল— ‘নাও ইউ উইল সি দ্য ফেমাস ইমারেল্দ দ্যাগার!’ তার পরেই আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে এক দল পেল্লায় পেল্লায় শ্বেতাঙ্গ শোকেসটা ঘিরে ফেললেন৷ গাইড লেকচার ঝেড়ে যাচ্ছেন৷ হঠাৎ ‍সেই লেকচার ছাপিয়ে শুনি হাকানের গলা— ‘এক্সকিউজ মি৷ ইন তুর্কি (ওরা টার্কি বলে না লক্ষ্য করেছি) উই হ্যাভ আ সিস্তেম অফ ফর্মিং আ কিউ!’ সে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল৷ হঠাৎ প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে দু’হাতে ঠেলে সেই টুরিস্টের দলকে সরাতে লাগল৷ এতে খাপ্পা হয়ে উঠলেন সে দলের স্থানীয় গাইড৷ তারপর লেগে গেল দুই তুর্কিতে! হাকান যে এমন বাঘের রূপ নিতে পারে কখনও কল্পনাও করিনি! শেষে মিউজিয়ামের গার্ডরা দৌড়ে এসে লাইন তৈরি করে দিয়ে সমস্যা মেটাল৷

পরে হাকানকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তুমি হঠাৎ এমন সিংহবিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়লে কেন? ওরা তো এমনিই দু’মিনিট পরে চলে যেত?’

‘না-না৷ এই আমেরিকানগুলোর দেমাক আমি একদম সহ্য করতে পারি না!’ বুঝলাম কমরেড হাকানের বিপ্লবী রক্ত চাগিয়ে উঠছে!

যাই হোক সে দল বিদায় নেওয়ার পরে মন দিয়ে দেখেছিলাম সেই ছোরা৷ ১৭৪৭ সাধারণাব্দে পারস্যের ডাকসাইটে সম্রাট নাদির শাহকে অটোমান সম্রাট প্রথম সুলতান মেহমুদ উপহার হিসেবে পাঠিয়ে ছিলেন এই ছোরা৷ ১১ মে সে ছোরা নিয়ে সম্রাটের দূত ইস্তানবুল থেকে রওনা হয়, কিন্তু সে উপহার পৌঁছনোর আগেই নাদির নিজেই খুন হয়ে যান৷ (অনেক বছর পরে, ইরানের অন্যতম পবিত্র শহর মশহদে দেখেছিলাম নাদির শাহর সমাধিও৷ সে গপ্পো আর একদিন)৷ কাজেই ছোরা ফিরে আসে৷ হাতলের ওই লিচুর মতো দুটি এবং একটি চৌকো পান্নার জন্যই এ ছোরার নাম— পান্না ছোরা৷ এ পান্না এসেছিল সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার কলাম্বিয়ার মুৎজো এবং সোমোন্দোকো খনি খেকে৷ আর ছোরার খাপের ছোট ছোট ঝলমলে পাথরগুলো প্রত্যেকটা হিরে৷ ভালো কথা, কেন ছোরাটার হাতলে এমন দুর্মূল্য পান্না বসানো? তাতে নাকি যিনি ছোরাটা চালাবেন তাঁর শক্ত করে ধরতে সুবিধে হবে— এমনভাবে কাটা এবং বসানো সেই পান্না৷ সত্যিই, মনে মনে ভাবি, খুন করারও কী বিপুল আয়োজন— এই না হলে সাম্রাজ্য?! যত বড় সাম্রাজ্য ততই বিপুল তার হত্যার আয়োজন! সাবাশ!

 

(চলবে)

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1906 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...