রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধি: অনৈক্যের মধ্যে ঐক্য

সৈয়দ কওসর জামাল

 

দুজনেই জন্মেছেন একই সময়ে, উনিশ শতকের ছয়ের দশকে— রবীন্দ্রনাথ জন্মেছেন ১৮৬১তে ও গান্ধি ১৮৬৯এ; দুজনেই ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করেছেন; একজন দেশের স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেননি, অন্যজন স্বাধীনতা দেখলেও স্বপ্নভঙ্গের ভিতর দিয়েই বেঁচেছেন কিছুদিন, কিংবা আমরা তাঁকে আর বাঁচতে দিইনি। কিন্তু গান্ধির সে মৃত্যু ছিল শারীরিক, তাঁর চিন্তা গোটা বিশ শতকের পৃথিবীকে তুমুলভাবে প্রভাবিত করেছে। বিশ শতক ছিল গান্ধির, বিশ শতক রবীন্দ্রনাথেরও।

তবু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আমাদের জীবনের প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে জড়িয়ে আছেন শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো, গান্ধি যেখানে যেন বেশ দূরের মানুষ, তাঁর প্রতি এখন শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয়ের চোখে আমরা তাকিয়ে দেখি। তাঁর সুউচ্চ মূল্যবোধের কঠোর অনুশাসন, তাঁর দুর্জয় সাহস, একা এগিয়ে চলার ক্ষমতা ও মানবকল্যাণে কাজ করার অসীম আকাঙ্ক্ষা, এবং প্রয়োজনে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করার দৃঢ়তা ভারতবাসী আগে কখনও দেখেনি। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় তাঁর ডাকে সাড়া দিতে দেশের মানুষ মুহূর্ত দেরি করেনি। রবীন্দ্রনাথ এই গান্ধির প্রতি মুগ্ধ না হয়ে পারেননি, শুধু মুগ্ধতা নয়, প্রভাবিত হয়েছেন। কিন্তু গান্ধিজিকে ভুল বোঝার মানুষেরও অভাব ছিল না। তাঁর জন্মের সার্ধশতবর্ষেও ভারতীয়মানসকে একদিকে প্রগাঢ় শ্রদ্ধা অন্যদিকে দ্বিধার সংকটে দীর্ণ হতে দেখি। এই দ্বিধার কারণ সম্ভবত তাঁর ওই বিরল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও তাঁর জীবনদর্শন, যা শুধু অনেকের ভাবনার সঙ্গে মেলেনি তাই নয়, অনেকে তাঁকে ভুল বুঝেছেন। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসে গান্ধিজির সঙ্গে সুভাষচন্দ্র বসুর মতবিরোধ সেসময় বাঙালিরাও সহজভাবে নিতে পারেননি, অথচ বাংলা ও বাঙালির সঙ্গে তাঁর সদ্ভাবও কম ছিল না। দেশের নানা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও গান্ধিজির মতবিরোধ ঘটেছে, কিন্তু কখনও একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অভাব ঘটেনি। দুজনেই স্বাধীন চিন্তা ও চেতনার প্রবক্তা; দুজনেই মনেপ্রাণে চেয়েছেন দেশের স্বাধীনতা; এবং স্পষ্টভাষী তাঁদের দুজনেরই পথ অবিচল সত্যের। এখানেই তাঁদের মিল, এখানেই তাঁদের মধ্যে সংযোগের সেতু, আবার এখান থেকেই ভিন্ন চিন্তারও শুরু।

ফরাসি মনীষী রম্যাঁ রলাঁ গান্ধিজিকে নিয়ে একটি পুস্তিকা রচনা করেছিলেন। ২ মার্চ, ১৯২৩ তাঁর তরুণ বন্ধু রবীন্দ্রানুরাগী কালিদাস নাগকে চিঠিতে লিখছেন: “আমি আমার ‘গান্ধি’ শেষ করেছি, যেখানে আমি তোমাদের নদীর মতো ঐশ্বরিক চিন্তায় প্লাবিত দুই মহৎ আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছি, টেগোর ও গান্ধি।” রলাঁ গান্ধি ও রবীন্দ্রনাথের ভাবনার স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে অবহিত ছিলেন, কোনও কোনও সময় তিনি কবির ভাবনার সঙ্গেই সায় দিয়েছেন তাঁর আন্তর্জাতিকতার জন্য, কিন্তু তবু গান্ধির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা কমেনি। রবীন্দ্রনাথকে তিনি একই তারিখের চিঠিতে জানাচ্ছেন: “গান্ধিজির সব কথার সঙ্গে একমত না হয়েও তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রতি এক অসীম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আমার হৃদয়ে জেগেছে, কারণ তাঁর মহৎ হৃদয়ে ভালোবাসা সততই প্রজ্জ্বলিত।” নিজের ডায়েরিতে তিনি লিখেছেন, “অ্যান্ড্রুজ আমার সঙ্গে একমত হয়েছেন আমার এই তুলনায় যে গান্ধি হলেন সেন্ট পল আর রবীন্দ্রনাথ প্লেটো।” অন্য এক জায়গায় তিনি গান্ধিজিকে সেন্ট ফ্রান্সিস আসিসি-র সঙ্গে তুলনা করেছেন। ১৯২৫-এ কালিদাস নাগের চিঠিতে গান্ধি সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য লক্ষ করে রলাঁ তাঁকে লিখছেন: “গান্ধি ও তাঁর রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বিষয়ে এত রূঢ় হোয়ো না। সবার ভূমিকা এক নয়, টেগোর ও গান্ধির মতো মহৎ আত্মার প্রত্যেকের আলাদা স্থান আছে; এঁরা প্রত্যেকেই আমাদের মানবিক ঐতিহ্যের মূল বিষয়গুলোকে রক্ষা করছেন। হিংসা যেভাবে সৃষ্টি হচ্ছে, সব সীমা ভেঙে দেবার ভয় দেখাচ্ছে, সেখানে গান্ধি যদি হিংসা আটকাতে পারেন বা অন্তত বিশ বছর তাকে পিছিয়ে দিতে পারেন, ভারত ও বিশ্বের কাছে তার অমূল্য উপকার হবে… নিজেকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে তিনি রাজনীতিকে মানবিক করে তুলবেন, শুধু তা-ই নয়,আমি বরং বলব, তিনি রাজনীতিকে ঐশ্বরিক করবেন।”

রবীন্দ্রনাথ কবি, অথচ ঋষিসুলভ দৃষ্টি তাঁর। এক মানবিক কণ্ঠস্বর তাঁর। বস্তুতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে, আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে তাঁর সন্ধান ছিল সৌন্দর্যের। তাঁর এই কণ্ঠস্বর এক বার্তা হয়ে গোটা বিশ্বকে মুগ্ধ করেছিল। যেকোনও সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নিজস্ব কল্পনাপ্রতিভা দিয়ে বিচার করার ক্ষমতা ছিল তাঁর। অন্যায় সামাজিক হোক বা রাজনৈতিক, তিনি প্রতিবাদ করেছেন। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি যখন দক্ষিণ আফ্রিকায় মানবাধিকারের দাবিতে আন্দোলন করছেন, চোখ এড়ায়নি রবীন্দ্রনাথের। তাঁর শুভেচ্ছাবার্তা বয়ে নিয়ে গেছেন সি-এফ অ্যান্ড্রুজ। আর এভাবেই গান্ধি ও রবীন্দ্রনাথের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল। এরপর গান্ধিজি যখন দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়লেন, তিনি ও তাঁর ফিনিক্স বিদ্যালয়ের ছাত্ররা শান্তিনিকেতনে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। এক সপ্তাহ পর গান্ধিজি ফিরে গেলেন, ছাত্ররা থেকেছেন আরও এক মাস। এটা ১৯১৫ সালের কথা। রবীন্দ্রনাথ গান্ধিজিকে চিঠিতে জানাচ্ছেন:

আপনাকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য এই চিঠি লিখছি, আপনি আপনার ছেলেদের আমাদের ছেলে হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন, আর এইভাবে আমাদের দুজনের জীবনের সাধনার জীবন্ত যোগসূত্র তৈরি হয়েছে।

 

গান্ধিজির শুরুটা কিন্তু খুবই সাধারণভাবে। লন্ডনে আইন পড়তে যাওয়ার সময় বিক্রি করতে হয়েছে স্ত্রীর গয়না। ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন, কিন্তু নিজের নৈতিক সমুচ্চতার কারণে আইনের পেশায় সফল হতে পারেননি। চুক্তিবদ্ধ হয়ে একবছরের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় গেছেন ওকালতি করতে, ১৮৯৩ সালে। সেই শুরু। তারপর তাঁর মোহনদাস থেকে মহাত্মা হয়ে ওঠার কাহিনি। এর জন্য কম আত্মত্যাগ করতে হয়নি তাঁকে। অনেক অনিশ্চয়তা, ত্যাগ ও তপস্যা, দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে এগোতে হয়েছে। তবু সত্যের পথ থেকে সরে যাননি। সহায় হয়েছে তাঁর সাহস ও নিষ্ঠা। দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয়দের সম্মান ও আত্মমর্যাদার লড়াইয়ে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন যে মারাত্মক অস্ত্র তার নাম সত্যাগ্রহ। অহিংসার আদর্শে আত্মোপলব্ধির সুযোগ হয়েছে তাঁর। সত্যাগ্রহকে তিনি করে তুলেছেন সত্য সন্ধানের সহায়ক, আর শিক্ষা দিয়েছেন অহিংসার পথ ধরে সত্যানুসন্ধানের।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই দর্শনের সফল প্রয়োগ করতে চেয়েছেন গান্ধিজি। তার জন্য কম বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়নি তাঁকে। অন্য দর্শনে বিশ্বাসীরা তাঁর ওপর আস্থা রাখতে পারেননি। গান্ধিজির চিন্তা অনেকের কাছেই যথেষ্ট প্রগতিশীল মনে হয়নি। এ ধারণা রবীন্দ্রনাথেরও হয়েছিল। গান্ধিজির পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিরোধিতাও রবীন্দ্রনাথ মানেননি। তাঁর কথা ছিল, নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসার অর্থ অন্য সংস্কৃতিকে ঘৃণা করা নয়; ভালো ও মন্দ সব সংস্কৃতির মধ্যেই আছে— বিভিন্ন সংস্কৃতির ভালো দিকগুলোর সমন্বয়-ভাবনার আকাঙ্ক্ষা ছিল তাঁর মনে। বিশেষ করে, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক সমন্বয় ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ভাবনার বিষয়, কেননা তাঁর ধারণা ছিল এভাবেই মানবজাতির মধ্যে ঐক্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।

এ কথা আজ স্পষ্ট যে গান্ধিজি ও রবীন্দ্রনাথের মতবিরোধে কোনও মোটা দাগের বিতর্ক ছিল না। এ বিতর্ক কখনওই একজন তপস্বী ও রাজনীতিবিদের সঙ্গে একজন কবির কিংবা একজন কুসংস্কারে বিশ্বাসী প্রাচীনপন্থীর সঙ্গে আলোকিত আধুনিক মানুষের বিতর্ক নয়। এ বিরোধ ছিল দার্শনিক ভাবনার মৌলিক পার্থক্যের অন্তর্গত, বৌদ্ধিক, জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের। এ কারণে ব্যক্তিগত স্তরে তাঁদের মধ্যে কখনও শ্রদ্ধার অভাব ঘটেনি। দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে উভয়ের লক্ষ্য ছিল অবিচল। ১৯১৯ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধিজি নিয়মিত সংযোগ রক্ষা করে চলেছেন। ব্যক্তিগত, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে তাঁরা বিতর্ক করেছেন। এই বিতর্ক চিঠিপত্র ছাড়িয়ে পত্রিকার পাতায় হাজির হয়েছে। একে অপরের যুক্তির বিরুদ্ধে নিজের মত উপস্থাপিত করেছেন, কিন্তু কখনও সে বিতর্কে তিক্ততার লেশমাত্র ছিল না, সৌজন্য ও শ্রদ্ধার অভাব ঘটেনি। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ডেকেছেন মহাত্মা নামে, আর তিনি ডেকেছেন গুরুদেব।

১৯১৯ সালের মার্চ মাসে রাউলাট আইন পাস হলে ভারতে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়, কারণ এই আইনে বিনা বিচারে কারাবাসের বিধান ছিল। মাহাত্মা গান্ধি এই আইনের বিরোধিতা করেন এবং রবীন্দ্রনাথ তাঁকে সমর্থন করেছেন। এই বছরই গান্ধিজিকে কারাবন্দি করা হয় এবং তার প্রতিবাদে দেশজুড়ে আন্দোলন গড়ে ওঠে। অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে পুলিস প্রায় চারশো নিরীহ মানুষকে গুলি করে হত্যা করলে রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদে তাঁর নাইট উপাধি ত্যাগ করেছেন। তিনি বলেছেন, মহাত্মার নেতৃত্বেই ভারতের মুক্তি ঘটবে। ১৯২০ সালে গুজরাটের বার্ষিক সাহিত্য সম্মেলনে গুরুদেবকেই আমন্ত্রণ জানিয়েছেন গান্ধিজি। আবার গুরুদেবের প্রতিবাদেই গান্ধিজি রাজা রামমোহন রায়ের সম্পর্কে ভ্রান্ত মন্তব্য সংশোধন করে নিয়েছেন। ১৯১৮তে ইন্দোরে হিন্দি কনফারেন্সের আগে গান্ধিজি হিন্দি-উর্দুকে জাতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করার সম্ভাব্যতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মত জানতে চেয়ে চিঠি লেখেন। রবীন্দ্রনাথ এ প্রস্তাবকে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি এই যুক্তিতে যে দক্ষিণ ভারতের মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

গান্ধিজি ও রবীন্দ্রনাথের বিতর্ক নতুন মোড় নেয় গান্ধিজির ডাকা অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে। ১৯২১ সালের পর থেকে যে বিষয়গুলো রবীন্দ্রনাথকে বিক্ষুব্ধ করেছে, সেগুলো হল সত্যাগ্রহ, ছাত্রদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ত্যাগ, অসহযোগ আন্দোলন, চরকা ও বিদেশি কাপড় পোড়ানোর ডাক।

প্রথমত, সত্যাগ্রহকে হাতিয়ার হিসেবে দেখায় রবীন্দ্রনাথের আপত্তি ছিল। তাঁর মনে হয়েছিল রাজনীতিবিদরা মহাত্মার সত্যাগ্রহকে যেকোনও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জুয়ার মতো ব্যবহার করবে; অ-সত্যে ভরা মন নিয়ে তাদের পক্ষে গান্ধিজির মহৎ উদ্দেশ্য ও তাঁর দেশকে ভালোবাসার গুরুত্ব অনুধাবন করা সম্ভব হবে না। দ্বিতীয়ত, সরকারি বিদ্যালয়-ত্যাগের ডাক রবীন্দ্রনাথকে অসন্তুষ্ট করেছে। যেখানে সুশিক্ষার কোনও বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি সেখানে এই ডাক যথার্থ নয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচক রবীন্দ্রনাথ নিজেও, কিন্তু–

আমাদের ছাত্ররা কার উদ্দেশে তাদের আত্মত্যাগ করবে? সম্পূর্ণ শিক্ষার প্রতি নয়, শিক্ষাহীনতার প্রতি। এর পিছনে আছে হত্যার তীব্র আনন্দ, যা খুব ভালো হলে তা হবে আত্মনিগ্রহ, আর খুব খারাপ হলে তা হবে উন্মত্ত ভয়াবহতা, যেখানে সাধারণ জীবনের মৌলিক বাস্তবতায় বিশ্বাস হারিয়ে মানব-প্রকৃতি অর্থহীন ধ্বংসের মধ্যে নির্লিপ্ত আনন্দ পায়, যেমন দেখা গেছে আমাদের নিকটে আসা শেষ যুদ্ধে ও অন্যান্য ঘটনায়। না, তার নিশ্চেষ্ট নৈতিক অবস্থায় থাকে তপস্যাব্রত আর তার সক্রিয় নৈতিক অবস্থায় থাকে হিংসা। ঝড়ে উত্তাল সমুদ্রের মতোই মরুভূমিও এক হিংসার রূপ, দুই-ই জীবনের বিরুদ্ধে।

(রবীন্দ্রনাথের চিঠি, মডার্ন রিভিউ, মার্চ, ১৯২১)

তৃতীয়ত, অসহযোগ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ধারণা জন্মেছিল যে যেখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলন তাঁর সাধনা যা তাঁর মতে বিশ্বমানব-ঐক্যের পথ, সেখানে অসহযোগ বিচ্ছিন্নতার সুযোগ করে দেয়। তিনি বললেন:

আমি মানুষকে ভালোবাসি ও তাদের ভালোবাসার মূল্য দিই। তবু ভাগ্যের পরিহাসে যেখানে বিরুদ্ধ স্রোত সেখানেই আমাকে নৌকা বাইতে হয়। ভাগ্যের এ কেমন পরিহাস যে আমি সমুদ্রের এপারে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির সহযোগিতার কথা বলছি এমন এক সময়ে যখন অন্যদিকে অসহযোগিতার নীতি ঘোষিত হচ্ছে! আমি জানি যে আমি পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী সভ্যতায় বিশ্বাস রাখি না, যেমন আমি বিশ্বাস করি না জৈবিক শরীরের মধ্যে মানুষের উচ্চ সত্য নিহিত থাকে। কিন্তু এ জৈবিক শরীর ধ্বংস করাতে ও  জীবনে বস্তুর প্রয়োজনকে অস্বীকার করাতে আমার বিশ্বাস কম। যা প্রয়োজন তা হল মানুষের জৈবিক ও আধ্যাত্মিক প্রকৃতির ঐক্য প্রতিষ্ঠা; ভিত্তি ও উপরিস্থলের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করা। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সত্যিকার মিলনে আমি বিশ্বাস করি। ভালোবাসা হল আত্মার চূড়ান্ত সত্য। সত্যকে লঙ্ঘন না করার জন্য ও সব বাধা কাটিয়ে তার পতাকা বহন করার জন্য আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করা উচিত। অসহযোগিতার ধারণা অনর্থক সত্যকে আহত করে।

চতুর্থত, রবীন্দ্রনাথের ধন্দ ছিল চরকা নিয়েও। তাঁর কখনও মনে হয়নি চরকা স্বাধীনতা লাভের ক্ষেত্রে কোনও সদর্থক ভূমিকা নিতে পারে। চরকা কোনও নতুন চিন্তার জন্ম দেয় না। আমাদের দারিদ্রের কারণ সুতোর অভাব নয়, অভাব আমাদের শক্তির, ঐক্যের। পঞ্চমত, বিদেশি বস্ত্র পুড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না, বরং আমাদের অর্থনীতি দুর্বল হবে। সবশেষে, সার্বিকভাবে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে প্রাচীন ও সত্যানুসন্ধানবিরোধী ধারণা দিয়ে দেশের উন্নতি সম্ভব নয়।

রবীন্দ্রনাথের মডার্ন রিভিউ পত্রিকার চিঠির প্রেক্ষিতে গান্ধিজি ১ জুন, ১৯২১ ইয়ং ইন্ডিয়া-তে ‘ইংলিশ লার্নিং’ (ইংরেজি শিক্ষা) ও ‘পোয়েটস অ্যাংজাইটি’ (কবির উদ্বেগ) নামে দুটি নিবন্ধ লেখেন। উদ্দেশ্য কবির চিঠির উত্তরে তাঁর নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করা। তিনি লিখলেন যে এটা ভালো হয়েছে যে কবি তাঁর ধারণার কথা এত সুন্দর ও স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখলেন:

আমি তাঁকে ও পাঠকদের, যারা তাঁর বাগ্মিতায় প্রভাবিত হয়েছেন, বোঝাতে ব্যর্থ হব কি না জানি না, কিন্তু আমি তাঁকে ও ভারতকে নিশ্চিত করতে চাই যে চিন্তা হিসেবে অসহযোগ যা তিনি ভয় পাচ্ছেন তা অমূলক। এবং অসহযোগ গ্রহণ করার জন্য তাঁর দেশ সম্পর্কে লজ্জিত হওয়ারও কোনও কারণ নেই। বাস্তবে কার্যকর করার সময় যদি দেখা যায় যে তা ব্যর্থ হয়েছে তবে সে দোষ অসহযোগ নীতির নয়। … অসহযোগ তার সময়ের আগেই হাজির হয়েছে। তাই ভারত ও বিশ্বের অপেক্ষা করা দরকার, তবে সে ক্ষেত্রে হিংসা ও অসহযোগের মধ্যে বাছবিচার করার সুযোগ থাকবে না। কবিরও আর ভয় পাওয়ার কিছু থাকবে না যে ভারত ও পাশ্চাত্যের মধ্যে চিনের দেওয়াল তুলতে চায়নি অসহযোগ। অসহযোগ বরং বাস্তবের পথ সুগম করতে চেয়েছে, সম্মানজনক ও স্বেচ্ছায় অসহযোগ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বর্তমান আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছে বাধ্যতামূলক সহযোগিতার বিরুদ্ধে, একতরফা মিশ্রণ ও শোষণের আধুনিক পদ্ধতির সশস্ত্র আরোপণের বিরুদ্ধে, যা সভ্যতার নামে চালানো হয়েছে। অজ্ঞাতসারে ও অনিচ্ছা সত্ত্বে অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে অসহযোগ।

ছাত্রদের বিদ্যালয়-ত্যাগের বিষয়ে গান্ধিজি জানালেন, সরকারি বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কুশিক্ষা দিচ্ছে; নিজেদের কাজে লাগাবার জন্য সরকারের উদ্দেশ্য দাস তৈরি করা; তাদের দরকার কেরানি ও দোভাষী; তাই সরকারি বিদ্যালয়ে ছাত্রদের পাঠানো পাপ বলে মনে হয় তাঁর।

এরপর ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউট-এ রবীন্দ্রনাথ ‘সত্যের আহ্বান’ নামে একটি বক্তৃতা দেন। প্রথমে প্রবাসী পত্রিকায় বাংলায় ও পরে মডার্ন রিভিউ-এ (১৩ অক্টোবর, ১৯২১) ইরেজিতে প্রকাশিত হয় ‘দ্য কল অফ ট্রুথ’ নামে। এই বক্তৃতায় তিনি জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ সীমাবদ্ধতার ব্যাখ্যা করেন। তাঁর আহ্বান বিশ্বমানবতার প্রতি।

তিনি জানান: “মহাত্মা তাঁর ভালোবাসা দিয়ে ভারতের হৃদয় জয় করেছেন; এই কারণে আমরা সবাই তাঁর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেছি। তিনি আমাদের সত্যের শক্তিকে দেখার চোখ দিয়েছেন; আমাদের তাই সীমাহীন কৃতজ্ঞতা তাঁর প্রতি। গ্রন্থে আমরা সত্যের কথা পড়ি: কিন্তু আজ আমাদের স্মরণীয় দিন যখন আমরা তাকে মুখোমুখি দেখছি।” তিনি জাতীয় জাগরণের প্রয়োজনের কথা বলেন, যখন আমাদের ‘গুরু’ আমাদের কর্মের প্রতি আহ্বান জানাবেন।

ঈশ্বর মহাত্মাকে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি এই ডাক দেওয়ার অধিকারী; কারণ তাঁর ভিতরে সত্য বিরাজমান। এটা কেন আমাদের দীর্ঘ অপেক্ষার সুযোগ হয়ে উঠবে না? কিন্তু তাঁর ডাক এসেছে একটা সংকীর্ণ ক্ষেত্র থেকে শুধু। তিনি সবাইকে বলছেন– ‘চরকা ঘোরাও ও বোনো, ঘোরাও ও বোনো।’ এটা কি সেই ডাক যা বলবে, ‘সত্যসন্ধানী সবাই এসো চারদিক থেকে ?’ এটা কি নতুন সৃষ্টির নতুন যুগের ডাক?

অসহযোগ আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যেকোনও প্রকার ক্ষমতা প্রদর্শনের বিরুদ্ধে তিনি। “স্বরাজ মানে শুধু স্বদেশি কাপড় নির্মাণে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া নয়। স্বরাজ আমাদের অন্তরের জিনিস, বহুমুখী ও শক্তিশালী আমাদের মন, সে নিজের ভিতরেই স্বরাজ নির্মাণ করতে থাকে।” তিনি বলেন:

আমি বারবার বলেছি, আবারও বলছি যে বাইরের কোনও লাভের জন্য আমরা আমাদের মনকে হারাতে চাই না। সারা পৃথিবীতে নিষ্পেষণকারী যন্ত্রের অত্যাচারের বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধি যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন, আমরা তাঁর পতাকার নীচে জড়ো হয়েছি। কিন্তু মায়াতাড়িত জাদুকরি দাস-মানসিকতা যা আমাদের সকল দারিদ্র ও অপমানের মূলে এবং আমাদের দেশ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, তাকে আমাদের বন্ধু বলে মানতে পারব না।

রবীন্দ্রনাথকে আহ্বান করে গান্ধিজি ২৭ এপ্রিল, ১৯২১ এর ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’তে লিখলেন তাঁর নিবন্ধ ‘দ্য গ্রেট সেন্টিনেল’, মহৎ প্রহরী। এটা যেন ‘সত্যের আহ্বান’-এর উত্তরদান। তিনি লিখলেন:

মডার্ন রিভিউএ বর্তমান আন্দোলন সম্পর্কে শান্তিনিকেতনের কবি এক অত্যাশ্চর্য প্রবন্ধ লিখেছেন। একের পর এক ছবি যা শুধু তিনিই আঁকতে পারেন। কর্তৃত্ব, দাস-মানসিকতা, কিংবা ভয়ে বা আশা নিয়ে অন্ধভাবে কিছু গ্রহণ করা বলতে যাকিছু বোঝায়,  তার বিরুদ্ধে এ এক বাককুশল প্রতিবাদ। সামগ্রিকভাবে যা সব কর্মীকে মনে করিয়ে দেয় যে আমরা অধৈর্য হব না, কোনও কর্তৃত্ব তা সে যত বড়ই হোক আমরা চাপিয়ে দেব না। কবির আহ্বান যা আমাদের হৃদয় বা যুক্তির কাছে আবেদন রাখে না, তা ত্যাগ করতে হবে। যদি স্বরাজ পেতে চাই আমাদের যে কোনও মূল্যে সত্যের পাশে দাঁড়াতে হবে।

গান্ধিজি স্বীকার করলেন যে অন্ধভাবে তাঁকে অনুসরণ করতে গিয়ে কেউ কেউ গোঁড়ামিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন, কিন্তু তাঁরা কেউ তাঁর অনুগামী নন। তিনি বললেন: “আমি কবিকে প্রহরী হিসেবে শ্রদ্ধা করি যিনি গোঁড়ামি, নিশ্চেষ্টতা, অসহিষ্ণুতা ইত্যাদি শত্রুর বিরুদ্ধে আমাদের সতর্ক করে দেন।” কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন না যে অসহযোগ এমন কোনও শত্রুর কবলে পড়েছে। সরকারি স্কুল ও কলেজ বয়কটের প্রসঙ্গে পুনরায় লিখলেন যে, যে শিক্ষা ওখানে দেওয়া হয়, তা আমাদের অসহায় ও ঈশ্বরহীন করে তুলেছে। তিনি রবীন্দ্রনাথের চরকা সম্পর্কে আপত্তির কথাও মানলেন না, যুক্তি দিলেন খাদি কাপড়ের।

বিদেশি কাপড়ের প্রতি আমাদের ভালোবাসা চরকাকে তার সম্মানের স্থান থেকে বিচ্যুত করেছে। আমি তাই বিদেশি কাপড় পরাকে পাপ বলে মনে করি। আমি অবশ্যই বলব যে আমি অর্থনীতি ও নৈতিকতার মধ্যে কোনও সূক্ষ্ম তফাত টানতে পারি না।… আমি (অর্থনীতির) বৃদ্ধি চাই, আমি আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকার চাই, স্বাধীনতা চাই, কিন্তু আমি এই সবকিছু চাই আমাদের অন্তরাত্মার জন্য।

চরকা নিয়ে বিতর্ক পুনরায় উঠে এসেছে ১৯২৫ সালে। তার আগে, ১৯২২-এ্রর মার্চ মাসে গান্ধিজি জেলবন্দি হয়েছেন। জেল থেকে বেরোতেই রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রাম করেছেন মহাত্মাকে— ‘উই রিজয়েস’, আমরা আনন্দিত। রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে অসুস্থ গান্ধিজিকে পুণার হাসপাতালে দেখতে গেলেন অ্যান্ড্রুজ। ১৯২৫ থেকে গান্ধিজি প্রায় দু’বছর সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে গেলেন। এ সময় তাঁর লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ উন্নয়নের ‘সৃষ্টিশীল কর্ম’ ও অস্পৃশ্যতা দূর করার কাজ। জাতীয় রাজনীতি নেতৃত্বহীন হয়ে পড়েছে তাঁর অনুপস্থিতিতে। অসহযোগ আন্দোলনও হতাশায় পর্যবসিত হয়। ১৯২৯-এ গান্ধিজি পুনরায় জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছেন এবং কংগ্রেস দল অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠেছে। কয়েক বছর ধরেই দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে হিন্দু ও মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। গান্ধিজি ও রবীন্দ্রনাথের কাছে এই বিষয়টিই প্রধান আলোচ্য হয়ে উঠেছে। ১৯২৯এর লাহোর কংগ্রেস-এ ‘পূর্ণ স্বরাজ’ লক্ষ্য হিসেবে স্থির হয়েছে। আর গান্ধিজি ডান্ডি যাত্রাসহ (১২ মার্চ ১৯৩০) Civil Disobedience Movement ঘোষণা করেছেন। এই সময়ের চিঠিপত্রে দেখা যাচ্ছে যে অনেক বিষয়েই গান্ধিজি রবীন্দ্রনাথের পরামর্শ চাইছেন। আন্দোলন শুরু করার আগে (জানুয়ারি ১৯৩২) গান্ধিজি লিখছেন– “I try to steal a wink of sleep and I think of you. I want you to give your best to the sacrificial fire that is being lighted.”

শুধু বিতর্কই হয়েছে তাও নয়, দুজনে একমত হয়েছেন অনেক বিষয়েই। গান্ধিজির অহিংসার ধারণা রবীন্দ্রনাথকে যে প্রভাবিত করেছিল তার প্রকাশ আমরা দেখতে পাই ‘মুক্তধারা’ নাটকের এই অংশে:

গণেশ। আর সহ্য হয় না, হাত দুটো নিশ্‌পিশ্ করছে।
ধনঞ্জয়। তাহলে হাত দুটো বেহাত হয়েছে বল্‌।
গণেশ। ঠাকুর, একবার হুকুম করো ওই ষণ্ডামার্কা চণ্ডপালের দণ্ডটা খসিয়ে নিয়ে মার কাকে বলে একবার দেখিয়ে দিই।
ধনঞ্জয়। মার কাকে না বলে তা দেখাতে পারিস নে? জোর বেশি লাগে বুঝি? ঢেউকে বাড়ি মারলে ঢেউ থামে না, হালটাকে স্থির করে রাখলে ঢেউ জয় করা যায়।
— তাহলে কী করতে বল?
ধনঞ্জয়। মার জিনিসটাকেই একেবারে গোড়া ঘেঁষে কোপ লাগাও।
— সেটা কী করে হবে প্রভু?
ধনঞ্জয়। মাথা তুলে যেমনি বলতে পারবি লাগছে না, অমনি মারের শিকড় যাবে কাটা।

ধনঞ্জয়ের মুখে আমরা গান্ধিজির কথারই প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধিজি দুজনেই প্রেমের শক্তিতে আস্থা রেখেছেন। দুজনেই বিশ্বাস করেছেন হিংসা নয়, প্রেমের শক্তিতেই মানুষের জয় সম্ভব।

রবীন্দ্রনাথের কাছে এ দেশ কোনও ভৌগোলিক এলাকা নয়, একটা ধারণামাত্র। তাঁর মনে, পাশ্চাত্যের জাতীয়তাবাদ সংক্রান্ত ধারণার পরিচয় এ দেশে কখনও ছিল না। সমাজই ছিল ভারতীয় সভ্যতার মূল, যেমন রাজনীতি পাশ্চাত্য সভ্যতার মূল। জাতীয়তার পরিবর্তে রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করেছেন ‘স্বদেশি সমাজ’। তাঁর মতে, জাতি সমাজকে গ্রাস করে বেড়ে ওঠে। ভারতের ঐক্য কোনও রাজনৈতিক বিষয় নয়, তা এক সামাজিক সত্য। তিনি বলেছেন: “রাষ্ট্রপ্রধান দেশে রাষ্ট্রতন্ত্রের মধ্যেই বিশেষভাবে বদ্ধ থাকে দেশের মর্মস্থান; সমাজপ্রধান দেশে দেশের প্রাণ সর্বত্র ব্যপ্ত হয়ে থাকে… পাশ্চাত্য রাজার আসনে এইখানে ভারতবর্ষ আঘাত পেয়েছে। গ্রামে গ্রামে তার যে সামাজিক স্বরাজ পরিব্যাপ্ত ছিল, রাজ্য শাসন তাকে অধিকার করলে” (স্বদেশি সমাজ)। তাঁর আরও বিশ্বাস যে ‘নেশন স্টেট’ শুধু সমাজকে গ্রাস করে না, তার ভিতরে আত্মবিধ্বংসী ও হিংস্র প্রবণতা আছে বলে ব্যক্তি-স্বাধীনতা হরণ করে। সর্বজনীন ও বিশ্বকেন্দ্রিক ভাবনার জন্যই তিনি ঔপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে ভারতের স্বাধীনতা চেয়েছেন যাতে রাজনৈতিক বিচার ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার পথ সুগম হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তাঁর ধারণা জন্মেছিল যে অন্ধ জাতীয়তাবাদের মধ্যেই সমস্ত দ্বন্দ্ব ও শত্রুতার বীজ নিহিত আছে। একইভাবে দেশপ্রেমও নেশন-স্টেট উদ্ভুত ধারণা যা নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য দাবি করে, এমনকি, রাষ্ট্র দেশপ্রেমের নামে মানবিকতাবিরোধী কাজ করলেও এ দাবি অটুট থাকে। নাৎসি জার্মানির ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটতে দেখা গেছে। রবীন্দ্রনাথের ভাবনা থেকে জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের ধারণাকে বর্তমানের প্রেক্ষিতে বিচার করলে তাঁর দূরদৃষ্টির প্রতি সপ্রশংস হতেই হয়।

গান্ধিজির সঙ্গে এইখানে রবীন্দ্রনাথের মিল দেখতে পাই। তিনিও দেশের ঐক্যের জন্য সমাজকেই শক্তিশালী দেখতে চেয়েছেন। গ্রামীণ সমাজ মানে আত্মীয়সমাজ, প্রতিবেশীসমাজ। রাষ্ট্র কিন্তু আত্মীয়তা বোঝে না, সে এক হৃদয়হীন যন্ত্র। গান্ধিজিরও এমনই উপলব্ধি। তিনি বলেছিলেন: The individual has a soul, but the state is a soulless machine। দেশ থেকে রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীর দিকে চোখ রেখেছেন একই আত্মীয়তার সন্ধানে। বিশ্বমানবতার কাছেই তাঁর আবেদন। জ্ঞান বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির জগতে তিনি সত্যের সন্ধান পান। কিন্তু যখনই রাষ্ট্র ও জাতীয়তার কথা উঠেছে, তাঁর মনে হয়েছে সত্যের অভাব থেকে গেছে। গান্ধিজি কিন্তু জাতীয়তাবাদে আস্থা রেখেছেন; তাঁর মতে আগে জাতীয়তাবাদ তারপর আন্তর্জাতিকতাবাদ।

গান্ধিজি ও রবীন্দ্রনাথ দু’জনেই আধুনিক সভ্যতার কুফলগুলো সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। সভ্যতা মানেই ক্ষমতা প্রদর্শন ও ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সভ্যতা মানেই অপরিমিত ভোগলিপ্সা, ভারতবর্ষের মতো দরিদ্র দেশে যা কুরুচিকর। গান্ধিজি একে সভ্যতার ব্যাধি বলে মনে করেছেন। তাই এ নিয়ে তিনি অনেকবেশি সোচ্চার হয়েছেন। উপলব্ধি রবীন্দ্রনাথেরও ছিল। কিন্তু দুজনের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ছিল। গান্ধিজি যেখানে সংযম ও নৈতিকতার ওপর জোর দিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথের সেখানে জোর দিয়েছেন সৌন্দর্যবোধের ওপর। এই দৃষ্টিভঙ্গির তফাত অনেক ক্ষেত্রেই ধরা পড়েছে। রবীন্দ্রনাথের কাছে যা ‘আনন্দ ও তপস্যা’, গান্ধিজির কাছে তা ‘তপস্যা ও আনন্দ’। গান্ধিজির কাছে নৈতিকতাই জীবনের ভিত্তি, সৌন্দর্য তারই রূপ। রবীন্দ্রনাথের কাছে জীবনের সৌন্দর্য অপরিসীম, তিতিক্ষা তার নৈতিক দিক। রবীন্দ্রনাথ নিজেই একটি চিঠিতে এ সম্পর্কে লিখেছেন– “According to the Upanishad the reconciliation of the contradiction between tapasya and ananda is at the root of creation— and Mahatmaji is the prophet of tapasya and I am the poet of ananda.”।

এমন সব মৌলিক বিষয়ে পার্থক্য সত্ত্বেও দুজনেরই লক্ষ্য ছিল দেশের স্বাধীনতা। একের প্রতি অন্যের আকর্ষণ কমেনি কখনও। ব্যক্তিগত স্তরে তাঁরা আরও সমীপবর্তী হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের টানে ছুটে এসেছেন শান্তিনিকেতনে। ইয়ং ইন্ডিয়া-য় ২৫ জানুয়ারি ১৯২৬ গান্ধিজি লিখেছেন: “আমি অনেক বিষয়েই কবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করিনি। আবার কোনও দ্বিমত না থাকাটাই আশ্চর্যের…। বস্তুত, আমাদের পরস্পরের বন্ধুত্ব সবসময় সমৃদ্ধ, তবে বুদ্ধিবৃত্তি ক্ষেত্রে পরস্পরের মধ্যে সত্যিই তফাত ছিল।” ১৯৩৩ সালে পুণার ইরেবাদা জেলে বন্দি গান্ধিজি হরিজনদের পক্ষে ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডোনাল্ডের ‘ইলেকটোরাল অ্যাওয়ার্ড’ বা ‘সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা’র বিপক্ষে অনশনের সিদ্ধান্ত নেন। অনুন্নত হিন্দুদের জন্য আলাদা নির্বাচনের ব্যবস্থা করে যে বিভেদনীতি ইংরেজরা তৈরি করেছে তার বিরুদ্ধে গান্ধিজির প্রতিবাদ। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের সভায় বললেন: “সূর্যের পূর্ণ গ্রাসের লগ্ন যেমন ক্রমে ক্রমে দিনকে আচ্ছন্ন করে তেমনি আজ মৃত্যুর ছায়া দেশকে আবৃত করেছে। এমন সর্ব্বদেশব্যাপী উৎকণ্ঠা ভারতের ইতিহাসে আর ঘটেনি।… যিনি সুদীর্ঘকাল দুঃখের তপস্যার মধ্য দিয়ে সমস্ত দেশকে গভীরভাবে আপন করে নিয়েছেন, সেই মহাত্মা আজ আমাদের সকলের হয়ে মৃত্যুব্রত গ্রহণ করলেন।” উদ্বিগ্ন রবীন্দ্রনাথের টেলিগ্রামের উত্তরে গান্ধিজি স্বহস্তে লিখেছেন:

Dear Gurudev,

This is early morning 3 o’clock of Tuesday. I enter the fiery gate at noon. If you can bless the effort, I want it. You have been to me a true friend because you have been a candid friend often speaking your thoughts aloud. I had looked forward to a firm opinion from you, one way or the other. But you have refused to criticize. Though it can now only be during my fast, I will yet prize your criticism, if your heart condemns my action. I am not too proud to make an open confession of my blunder, whatever the cost of the confession, if I find myself in error. If your heart approves of my action I want your blessing. It will sustain me. I hope I have made myself clear. My love,

M K Gandhi

গান্ধিজি আমরণ অনশন শুরু করলে রবীন্দ্রনাথ মহাত্মার স্বাস্থ্যের কথা ভেবে চিন্তিত হয়ে উঠেছেন। তাঁর পক্ষে শান্তিনিকেতনে বসে থাকা সম্ভব হল না, অশক্ত শরীরে তিনি গান্ধিজির সঙ্গে দেখা করতে পুণা পৌঁছোলেন। গান্ধিজির সঙ্গে ছিলেন কস্তুরবা গান্ধিসহ আরও অনেকেই। সেদিন গান্ধিজির মৌনপালনের দিন। তিনি একটি কাগজে রবীন্দ্রনাথকে তাঁর নিজের একটি গান গাইতে বললেন। রবীন্দ্রনাথ গাইলেন– “জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো” গানটি। পুণা চুক্তি সম্পন্ন হলে গান্ধিজি অনশন ভঙ্গ করেন।

১৯৩৪ সালের প্রথম দিকে কোনও পক্ষ থেকে গান্ধিজির বিরুদ্ধে সৌজন্যহীন সমালোচনা ও আক্রমণ করা হয়েছে দেখে ক্ষুব্ধ রবীন্দ্রনাথ এক স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে জানান:

সত্যিকার সমালোচনায় কারও কিছু বলার থাকে না কিন্তু সমালোচনা ও কুৎসার মধ্যে পার্থক্য আছে। … মহাত্মার নামে মিথ্যা অপবাদের বিরুদ্ধে যদি আমি না দাঁড়াই তাহলে আমি আমার কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হব। কেননা মহাত্মা এমন একজন মানুষ যিনি দীর্ঘ শতকের অবনত অবস্থায় থাকা মানুষকে হতাশার ভূমি থেকে উদ্ধার করেছেন। তাঁর আশা ও বিশ্বাসের বার্তা রাতারাতি না হলেও জনগণের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিটাই বদলে দিয়েছে। দীর্ঘ শতক ধরে যারা মাথায় অমর্যাদার বোঝাকে চিরকালের বলে ধরে নিয়েছিল, তাদের হৃদয়ে তিনি সাহস ও আত্মমর্যাদা জুগিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় গান্ধিজি শেষবার শান্তিনিকেতনে আসেন ফেব্রুয়ারি ১৯৪০এ। তিনি যখন ফিরে যাচ্ছেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর হাতে একটি চিঠি দিয়ে পরে পড়ার অনুরোধ করেন। ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০-এর সেই চিঠিতে বিশ্বভারতী সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে:

আপনি জানেন তাৎক্ষণিক বিচারে এই প্রতিষ্ঠান জাতীয় স্তরের হলেও অন্তরের দিক থেকে তা আন্তর্জাতিক হয়ে সর্বতোভাবে বিশ্বের অন্যান্য অংশের কাছে ভারতের সাংস্কৃতিক আতিথেয়তা দান করছে। এই প্রতিষ্ঠানের ঘোর দুর্দিনে আপনি তাকে ভেঙে পড়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন ও নিজের পায়ে দাঁড় করিয়েছেন। আমরা আপনার সেই বন্ধুত্বপূর্ণ কাজের জন্য কৃতজ্ঞ। আজ আপনার শান্তিনিকেতন ছেড়ে যাওয়ার সময় আপনার কাছে আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ— এই প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় সম্পদ মনে করলে একে আপনার সুরক্ষাতলে গ্রহণ করুন ও তাকে স্থায়িত্ব দান করুন। বিশ্বভারতী একটা জাহাজের মতো হয়ে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ বয়ে নিয়ে চলেছে, একে রক্ষা করার জন্য আমি দেশবাসীর কাছ থেকে এক বিশেষ মনোযোগ আশা করি।

আমাদের মনে রাখতে হবে বেশ কিছুদিন ধরেই রবীন্দ্রনাথের শরীরের অবস্থা ভালো যাচ্ছিল না, হয়তো মৃত্যুচিন্তাও ছিল; এ অবস্থায় বিশ্বভারতীর ভবিষ্যৎ ভেবে তিনি চিন্তিত হয়ে উঠবেন তা স্বাভাবিক; চিঠিতে আমরা তারই প্রতিফলন দেখছি। কলকাতা ফেরার পথেই গান্ধিজি চিঠির উত্তর লিখলেন। গান্ধিজির মূল চিঠিটি ছিল এইরকম:

Dear Gurudev,

The touching note that you put into my hands as we parted has gone straight into my heart. Of course Visva-Bharati is a national institution. It is undoubtedly also international. You may depend upon my doing all I can in the common endeavour to assure its permanence. I look to you to keep your promise to sleep religiously for about an hour daily during the day. Though I have always regarded Santiniketan as my second home, this visit has brought me nearer to it than ever before. With reverence and love,

Yours

M K Gandhi

১৯৪১ সালের ৭ অগাস্ট রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পর পুত্র রথীন্দ্রনাথকে গান্ধিজি চিঠি লিখে শোকপ্রকাশ করেছেন– “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুতে আমরা শুধু এ যুগের একজন বিখ্যাত কবিকে হারালাম না, হারালাম একজন উদ্দীপ্ত জাতীয়তাবাদী ও মানবতাবাদীকেও। জনজীবনের এমন কোনও কর্ম ছিল না যেখানে তিনি তাঁর প্রতাপশালী ব্যক্তিত্বের ছাপ রাখেননি।” রবীন্দ্রনাথ-গান্ধি বিতর্কে গান্ধিজি রবীন্দ্রনাথের চিন্তাকে কবির ভাবনা, কবির উদ্বেগ বলে উল্লেখ করতেন। এ ধারণা এখনও অনেকেরই আছে কিন্তু সমাজ ও রাজনীতির বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কথাকে শুধু কবির কল্পনাপ্রবণ মনের প্রকাশ বলে দূরে করা যাবে না। গান্ধিজির শোকপ্রকাশের চিঠিতে সে কথারই স্বীকৃতি মিলেছে।

এ প্রবন্ধের শুরুতে আমরা রম্যাঁ রলাঁর কথা বলেছি, শেষ করা যাক তাঁর কথা দিয়েই, কেননা তিনি রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধিজি দু’জনকেই দীর্ঘদিন ধরে জেনেছেন ও অনুধাবনের চেষ্টা করেছেন। ১৯ অক্টোবর ১৯২৫ কালিদাস নাগকে রলাঁ লিখছেন:

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গান্ধির কাজ ও চিন্তার পার্থক্য আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ছে। আমি তাঁকে বুঝতে পারি। দুজনেরই জীবনের উদ্দেশ্য আছে, তাঁদের একজনও তা ত্যাগ করতে পারবেন না। টেগোরের লক্ষ্য উঁচু স্তরের, বেশি দূরবর্তী; তাঁর লক্ষ্য সব শ্রেণি জাতি ও শতাব্দী পেরিয়ে মানবাত্মার উত্তরণ। গান্ধির লক্ষ্য একটা যুগ ও একটা জাতির প্রয়োজন অনুসারে নির্দিষ্ট।

 

গান্ধিজির আরব্ধ অনেক কাজ এখনও শেষ হয়নি। যুগ ও জাতির প্রয়োজনে এখনও তাঁকে আমাদের স্মরণ করতেই হয়; একুশ শতকে তিনি আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছেন ভারতীয় জীবনে। আর রবীন্দ্রনাথ— তিনি আমাদের অনন্ত অপার জীবনের আশ্রয়।

 

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1906 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...