অন্ধকারের ইতিবৃত্ত— ধর্ষকের মনোজগৎ

কৌশিক দত্ত

 

ধর্ষণের প্রাত্যহিকতা আজ সকলকেই এই বিষয়টি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে, এমনকি কম সংবেদনশীল মানুষকেও। যারা প্রত্যক্ষভাবে ধর্ষক, তাদের বাদ দিলে বেশিরভাগ মানুষই ধর্ষণ নিয়ে চিন্তিত, আতঙ্কিত এবং ধর্ষণ রোধ করতে আপাতদৃষ্টিতে আগ্রহী। ধর্ষণ রোধের উপায় নিয়ে প্রত্যেকেই নিজের মতো করে ভেবে চলেছেন। কেউ কেউ খুব দায়িত্ব নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন, বাস্তব তথ্যাদি অনুসন্ধান করে এবং অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টিকে সঠিকভাবে বুঝতে চাইছেন। কেউ কেউ আবার নিজেদের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস (যা প্রায়শ পিতৃতান্ত্রিক) অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাচ্ছেন এবং নিদান হাঁকছেন। মানুষের সমাজে ভাবনার বিভিন্নতা প্রায় সব বিষয় নিয়েই আছে এবং তার একটা ভালো দিকও আছে, কিন্তু এই বিশেষ ক্ষেত্রটিতে বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ভাবনার মধ্যে শত যোজন দূরত্ব প্রমাণ করে যে বিষয়টি নিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে যথেষ্ট কাজ হয়নি এবং যেটুকু হয়েছে তা সম্বন্ধে অনেকেই ওয়াকিবহাল নন।

ধর্ষণ রোধের উপায় হিসেবে খুব বেশি সংখ্যক মানুষ মেয়েদের পোশাক, মেয়েদের রাতে বেরোনো, আত্মরক্ষার জন্য মার্শাল আর্ট শেখার গুরুত্ব ইত্যাদির কথা বলে থাকেন। কেন? কারণ আমাদের সমাজে ধর্ষণ সংক্রান্ত বীক্ষায় দৃষ্টি নিবদ্ধ থেকেছে মূলত ধর্ষিতার উপর বা সামগ্রিকভাবে নারীর উপর। পুরুষালি বা পিতৃতান্ত্রিক ভাবনায় নারী রক্ষণীয়া, সম্পদ বিশেষ। তাই হয় সেই সম্পদে তালা লাগাতে হবে অথবা তার শরীরকে ছেয়ে দিতে হবে সজারুর কাঁটায়। বাস্তব হল, এই পিতৃতান্ত্রিক ভাবনা ও মূল্যবোধ বহু শতক ধরে আমাদের মগজে ঘাঁটি গেড়ে আছে, কিন্তু এই পদ্ধতিতে এতদিনেও ধর্ষণ রোধের দিকে এক পা-ও এগোনো যায়নি, বরং কয়েক কদম পিছিয়ে যাওয়া গেছে। সুতরাং এই জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি (পিতৃতান্ত্রিক তকমা বাদ দিয়েই বলছি) ধর্ষণ রোধে অকার্যকর, একথা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। সুতরাং দৃষ্টিকোণ ও ভাবনা বদলানোর প্রসঙ্গ আসেই।

প্রশ্ন হল, গলদটা কোথায় হচ্ছিল? একেবারে গোড়ায়। ধর্ষণ একটি ক্রিয়া, যা কর্তৃবাচ্যে ঘটে, কর্মবাচ্যে নয়। ধর্ষণের শিকার সক্রিয়ভাবে ধর্ষিত হন না, ধর্ষক সক্রিয়ভাবে ধর্ষণ করে। প্রক্রিয়াটি বস্তুত একতরফা। এর মধ্যে ধর্ষিতার সম্মতি (কনসেন্ট) অনুপস্থিত, অর্থাৎ ধর্ষিতার কোনওরকম অংশগ্রহণ থাকে না, এমনকি নিষ্ক্রিয় (প্যাসিভ) অংশগ্রহণও নয়। কুকর্মটি শতকরা একশোভাগ ধর্ষকের একার কাজ (বা গণধর্ষণের ক্ষেত্রে ধর্ষক দলটির)। সুতরাং ধর্ষণ সংক্রান্ত আলোচনায় ধর্ষিতার “ভূমিকা” নিয়ে আলোচনা একান্ত অবান্তর, যেহেতু তাঁর কোনও এজেন্সি নেই সেই মুহূর্তে এবং ভূমিকা ব্যাপারটাই নেই। অতএব ধর্ষণের কারণ তথা নিরাময় খোঁজার জন্য আলোটা আগে সঠিক জায়গায় ফেলতে হবে… ধর্ষকের মুখে। ধর্ষকদের মধ্যেই আছে ধর্ষণের কারণ… কিছুটা ব্যক্তি হিসেবে, কিছুটা সমাজের অংশ হিসেবে। আলোচনা তাই হওয়া উচিত ধর্ষক নির্মাণের প্রক্রিয়া সম্বন্ধে। এর মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিকের আলোচনা (অর্থাৎ ধর্ষণের সংস্কৃতি কীভাবে এই অপরাধের বীজ ধারণ করে এবং ভবিষ্যৎ ধর্ষকের চরিত্রে তা বপন করে), খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুখের বিষয়, অন্তত নারীবাদী আকাদেমিক গোষ্ঠীগুলির মধ্যে এই আলোচনা এখন জোরদার এবং শিক্ষিত সাধারণ মানুষও আজকাল “রেপ কালচার” বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত। তুলনায় অবহেলিত আরেকটি অংশ হল ধর্ষকের মনোজগত সম্বন্ধে গবেষণা।

ধর্ষকের মনোজগৎ সম্বন্ধে গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য হল ধর্ষকের চরিত্র বুঝে নেওয়া, যাতে সম্ভাব্য ধর্ষক চিনতে সুবিধা হয় এবং তাদের ওপর নজরদারি করা যায়। এই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে সমস্যাজনক পরিস্থিতিতে থাকা (at risk) ছেলেদের চিনে নিয়ে তাদের ধর্ষক হয়ে ওঠা আটকানো যায় (বা অন্তত চেষ্টা করা যায়)। এছাড়াও ইতোমধ্যে ধর্ষণ করেছে এমন ব্যক্তিদের সংশোধনের দুরূহ চেষ্টাও করে দেখা যেতে পারে, যদি তাদের মনোজগতের চাবিকাঠি খুঁজে পাওয়া যায়। অবশ্য এই সংশোধন ব্যাপারটা নারী-নির্যাতন বা ধর্ষণের অপরাধে যুক্ত অপরাধীদের ক্ষেত্রে বাস্তবে সম্ভব কিনা, তা নিয়ে দ্বিমত আছে। তবে যারা এখনও অপরাধ করেনি, তাদের ক্ষেত্রে অন্তত চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। কঠোর আইনের পাশাপাশি এই চেষ্টাও চালালে সুফল ফলতে পারে, এই ব্যাপারে হয়ত অনেকেই একমত হবেন। এটুকুও যদি করতে চাওয়া হয় তবে নিষ্ঠার সঙ্গে ধর্ষকদের বোঝার চেষ্টা করতে হবে। সস্তা চটকদার মন্তব্য, অতিরিক্ত সাধারণীকরণ (over-generalisation), অপরায়ন (otherisation) বা পৃথকীকরণ (alienation) কোনও সদর্থক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে হয় না।

দুঃখের বিষয়, ধর্ষণ সংক্রান্ত আলোচনায় যাঁরা সঠিকভাবে ধর্ষিতার বদলে ধর্ষকের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন, তাঁদের মধ্যেও অধিকাংশ দৃষ্টিক্ষেপের স্থানটিতে আলোর বদলে বেশ খানিকটা অন্ধকার ছড়িয়ে নেন প্রথমেই। তার ফলে তাকানো হয়, কিন্তু দেখা হয় না। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা প্রবণতা আছে ধর্ষকদের হিংস্র জন্তু বা ভয়ানক রাক্ষস ভাবার। ভদ্রসমাজে সসম্মানে বসবসকারী পুরুষদের এই প্রবণতা থাকে, কারণ তাঁরা ধর্ষকদের থেকে নিজেদের আলাদা করে সম্মান, প্রতিষ্ঠা, সম্পর্ক ইত্যাদি বাঁচাতে চান। “ধর্ষণ ওরা করে, আমরা না। ওরা ভয়াবহ জীব, আমি তো নিরীহ।” এই জাতীয় যুক্তি নিজের ঘনিষ্ঠ মহিলাদের কাছে, এমনকি নিজের কাছেও পেশ করতে থাকি আমরা, যাতে “পোটেনশিয়াল রেপিস্ট” হিসেবে চিহ্নিত হয়ে না যাই। নিজেকে সম্ভাব্য ধর্ষক ভাবার গ্লানিটা সহ্য করা খুব কঠিন। নিজে চেষ্টা করে দেখেছি, আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে। মহিলারা কেন একইরকম কথা বলেন? নিজের অজান্তেই তাঁরা হয়ত পরিচিত পুরুষদের বিশ্বাস করে নিরাপদ বোধ করতে চান, সম্পর্কগুলোকে অক্ষত রাখতে চান। অথচ পরিচিত পরিমণ্ডল আর পরিবারের মধ্যেই যে অধিকাংশ ধর্ষণ ঘটে চলেছে, সেই কুৎসিত সত্যটা আমরা সবাই জানি। অনেকে হয়ত নিজের পরিবারে বা পরিচিতদের মধ্যে এরকম ঘটনার কথা জানেন, সুবেশ, সুভদ্র, উচ্চশিক্ষিত ধর্ষকদের কথাও জানেন, তবু ধর্ষকদের ভিন গ্রহের জীব ভাবতে চেষ্টা করেন, কারণ এই ভাবনাটার দ্বারা সম্ভাব্য ধর্ষকদের সঙ্গে যে কাল্পনিক দূরত্বটুকু তৈরি করা যায়, তারই মধ্যে লুকিয়ে আছে আতঙ্কিত মেয়েদের বেঁচে থাকার পরিসরটুকু। মনকে বোকা বানিয়েই তো তাঁদের স্বাভাবিক থাকতে হয় ধর্ষক অধ্যুষিত উপত্যকায়।

এর বিপ্রতীপে আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি আছে, যা একইরকম সমস্যাজনক, কারণ তা অতি-সামান্যীকরণের মাধ্যমে সমস্যাকে তরল এবং সমাধানকে অলীক করে তোলে। সেটা হল “সব পুরুষই ধর্ষক” (all men are rapists) নামক ধারণা বা রাজনৈতিক বক্তব্য। মেরিলিন ফ্রেঞ্চের উপন্যাস থেকে জনপ্রিয়, বিখ্যাত ও স্লোগান হয়ে ওঠা উক্তিটি একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক মুহূর্তে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু ধর্ষকের মনোজগৎ বোঝা এবং তাকে কাজে লাগিয়ে ধর্ষণ প্রতিরোধের প্রকল্পের পক্ষে ক্ষতিকর। অনেক উল্লেখযোগ্য নারীবাদী তাত্ত্বিকও এই তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, এই জাতীয় কথা বলেন, এমনকি থার্ড ওয়েভ ফেমিনিজমের যুগেও। “সব পুরুষই ধর্ষক, যারা ধরা পড়ে না তারাই ভদ্রলোক” জাতীয় বক্তব্য এখনও নিয়মিত শুনি। বিনীতভাবে তাঁদের এটুকু বলতে চাই যে এই বক্তব্য পিতৃতন্ত্রের “men will be men” জাতীয় বক্তব্যগুলির মতোই নিয়তিবাদী (fatalistic), একটি নির্দিষ্ট চরিত্রের পৌরুষের অবশ্যম্ভাবিতায় বিশ্বাসী (essentialist) এবং হতাশা উদ্রেককারী। জানলে আশ্চর্য হবেন এবং দুঃখ পাবেন যে আপনারা যা ভাবেন, দণ্ডপ্রাপ্ত ধর্ষকেরাও অধিকাংশ ঠিক তাই ভাবে। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে অনেক ধর্ষকই মনে করে যে সব পুরুষই ধর্ষণ করে, তারা নেহাৎ ধরা পড়ে গেছে।

বাস্তব হল, সব পুরুষ নারীর প্রতি আকৃষ্ট নয়। সব পুরুষের এমনকি যৌন অঅনুভূতিও থাকে না, কেউ কেউ “অযৌন” (asexual) হন। বিষমকামী পুরুষদের সকলেই বহুগামী হবেন, এমন নয়। সব পুরুষই বলপূর্বক যৌনতায় আনন্দ পেতে সক্ষম, এমনও নয়, অনেকের তেমন ভাবনাতেই যৌন ইচ্ছা চলে যায়, তাও দেখেছি। যে সব পুরুষ নারীদেহের প্রতি আকৃষ্ট, প্রেমের সম্পর্কহীন একটি নারীদেহ দেখলেও যৌন অনুভূতি টের পান, তাঁরাও সকলেই ধর্ষক বা মলেস্টার হন না, যদিও তাঁদের মতো অন্য অনেকেই এই কুকর্মগুলো করে থাকেন। কোথায় কীভাবে কয়েকজন নিজেদের থামান (বা স্বাভাবিকভাবে বিনা চেষ্টায় থেমে যান) আর অন্যরা পারেন না, সেটা বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। শিশ্ন থাকলেই সম্ভাব্য ধর্ষকের তকমা দেওয়ার পিছনে কিছু যুক্তি অবশ্যই আছে, ঠিক যেমন রাস্তায় বেরোলেই পথদুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে। তবে দুর্ঘটনা কমানোর জন্য যেমন রাস্তায় বেরোনো বন্ধ করা যায় না বলেই আরও নির্দিষ্টভাবে বিপদের কারণ (risk factors) খুঁজতে হয়, ঠিক তেমনি পুরুষশূন্য সমাজ বাস্তবে সম্ভব নয় বলে মহিলাদের জন্য নিরাপদ সমাজ গঠন করার স্বার্থে আরও নির্দিষ্টভাবে ধর্ষকের চরিত্রচিত্রণ প্রয়োজন। “সব পুরুষ” নামক সুবৃহৎ বর্গটি সেক্ষেত্রে কাজে আসবে না। বলা বাহুল্য “not all men” গোছের যে হ্যাশটাগগুলো মাঝেমধ্যে দেখা যায়, সেগুলো দায় এড়ানোর চেষ্টামাত্র। অনেকটাই ধর্ষকের অপরায়নের ওপর নির্ভরশীল তারা। তাদের সঙ্গে এই প্রবন্ধের বক্তব্যের কোনও সম্পর্ক নেই।

ধর্ষকের মানসিকতা নিয়ে লেখা বেশ কঠিন কাজ অতএব। নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার মানুষের সঙ্গে কাজ করার কিছু অভিজ্ঞতা থাকলেও ধর্ষকদের নিয়ে কাজ করার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলনায় খুবই কম। ধর্ষকদের মনোজগৎ নিয়ে গবেষণাও যথেষ্ট পরিমাণে হয়নি। যেটুকু হয়েছে, তার অধিকাংশ অন্য দেশে, অন্য সংস্কৃতিতে।

আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হল, এই গবেষণার বেশিরভাগটাই কারাগারে বন্দি ধর্ষকদের উপর। বন্দি, দণ্ডপ্রাপ্ত ধর্ষকেরা আসলে সমাজে ছড়িয়ে থাকা ধর্ষকদের একটি বিশেষ অংশ, বর্তমান সমাজ এবং আইনের পরিমণ্ডলে যাদের ধরা পড়ার এবং অপরাধী সাব্যস্ত হবার সম্ভাবনা বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এরা কাজটি এমনভাবে করেছে, যা হিংস্র অথবা খুব মোটা দাগের হবার ফলে জনমানসে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে বা প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হয়েছে সহজেই। এর বাইরেও সমাজে অজস্র ধর্ষকাম ব্যক্তি বা ধর্ষক লুকিয়ে আছে, যারা ধরা পড়ে না বা দোষী সাব্যস্ত হয় না। এদের বেঁচে যাবারও কিছু সামাজিক কারণ আছে। প্রায়শ এদের আর্থসামাজিক অবস্থান, শিক্ষা, রুচি এবং অপরাধ করার পদ্ধতি আলাদা। সুতরাং কারাবন্দি অপরাধীরা কতটা এই ঘুরে বেড়ানো অপরাধী ভদ্রলোকদের প্রতিনিধিত্ব করে, তা বলা কঠিন। লস এঞ্জেলসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ববিদ নীল মালামুথ কারাবন্দি ধর্ষকদের “generalists” বলে অভিহিত করেছেন, যারা নানা ধরনের অপরাধ করে থাকে ধর্ষণ ছাড়াও। “They would steal your television, your watch, your car. And sometimes they steal sex.” এই ছিল তাঁর বক্তব্য। দুটো খটকা লাগে। তবে কি নানারকম চুরি-ডাকাতি করে বলেই এরা অপরাধীর তকমা বহন করে এবং সহজে ধরা পড়ে? শুধু ধর্ষণ করলে কি শাস্তি পাবার সম্ভাবনা কম থাকত? ভদ্রলোকের মুখোশ এঁটে সম্ভ্রান্ত পেশার যেসব ধর্ষক সমাজে মিশে থাকে, যাদের “specialists” বলা হয়েছে যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে, তাদের নিরুপদ্রব জীবনযাত্রা এবং সামাজিক সম্মান দেখলে তেমনই সংশয় হয়। টিভি, গাড়ি, ঘড়ি চুরির সঙ্গে ধর্ষণকে একাসনে বসিয়ে “যৌনতা চুরি করা” হিসেবে দেখা হচ্ছে ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়, কিন্তু বাস্তব হয়ত তার চেয়েও খারাপ। অন্যান্য চৌর্যে যে অভিযুক্ত নয়, তাকে ধর্ষণের অভিযোগ সাব্যস্ত করাই হয়ত দুঃসাধ্য।

ভারতে নির্ভয়া কাণ্ডের পর ধর্ষকদের মন বোঝার চেষ্টায় একটি গবেষণা হয়েছে। ব্রিটেনের অ্যাংলিয়া রাস্কিন ইউনিভার্সিটির অপরাধতত্ত্ব (criminology) বিভাগের পিএইচডির ছাত্রী মধুমিতা পাণ্ডে তাঁর থিসিসের জন্য তিহার জেলে বন্দি একশো বাইশজন ধর্ষকের সাক্ষাৎকার নেন। গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ। মধুমিতা ধর্ষকদের ব্যক্তিগত খোলামেলা প্রশ্ন করেছেন, জানতে চেয়েছেন তারা কেন ধর্ষণ করল, অনুতাপ হয় কিনা, ইত্যাদি। পাশাপাশি তিনি দুটি প্রশ্নমালা ও ‘রেটিং স্কেল’ ব্যবহার করেছেন, যা সরাসরি নির্দিষ্ট ঘটনা সম্বন্ধে প্রশ্ন এড়িয়ে উত্তরদাতার কিছু ধারণা বা মনোবৃত্তি বুঝতে সাহায্য করে।

“The Multicultural Masculinity Ideology Scale” (MMIS) মেপে দেখে পুরুষদের কেমন হওয়া উচিত বা কেমন আচরণ করা উচিত, সেই ব্যাপারে নির্দিষ্ট অঞ্চল, দেশ বা জাতির সাংস্কৃতিক ধ্যান-ধারণা একজন ব্যক্তি কীভাবে এবং কতটা আত্তীকরণ করেছে। বিভিন্ন আলাদা জায়গায়, ভিন্ন সংস্কৃতিতে গবেষণা চালিয়ে ১৯৯৮ সালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে দেখা গেছে দুটি বিষয় প্রায় সব সংস্কৃতির পৌরুষের ধারণার মধ্যেই সমানভাবে বিদ্যমান। সেগুলো হল সাফল্য (achievement) আর অতি-পুরুষালি হাবভাব (hypermasculine posturing)। এর বাইরে বিভিন্ন আলাদা সংস্কৃতিতে কিছু বিশেষ বিশেষ দিক আদর্শ পৌরুষের ধারণা নির্মাণ করে। সাধারণত দেখা যায় অধিকাংশ ধর্ষক একধরনের আগ্রাসী, আক্রমণাত্মক পৌরুষের ধারণায় বিশ্বাসী।

“Attitude Towards Women Scale” হল পঁচিশটি প্রশ্ন সম্বলিত একটা পরীক্ষা, যা সমাজে নারীর অবস্থান ও ভূমিকা সম্বন্ধে একজন ব্যক্তির ধারণা বুঝতে সাহায্য করে। দেখা যায় অধিকাংশ ধর্ষক বা নারী নির্যাতক মহিলাদের মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধা করে না এবং সমাজে মহিলাদের ভূমিকা মূলত পুরুষের আজ্ঞানুসারে হওয়া উচিত, এমন মনোভাব লালন করে।

মধুমিতা পাণ্ডে এই স্কেলদুটি ব্যবহার করেছিলেন। ফলে তাঁর গবেষণা থেকে বোঝা সম্ভব, ভারতীয় ধর্ষকেরা পৌরুষ ও নারীত্ব সম্পর্কে কী জাতীয় ধারণা পোষণ করে। এই অনুসন্ধান মূল্যবান। গবেষণাটির সীমাবদ্ধতা মূলত তিন জায়গায়।

  1. গবেষক মূলত সমাজতত্ত্ব ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের (social psychology) দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রশ্নমালাগুলো ব্যবহার করেছেন। অপরাধীদের মধ্যে কোনও মনোবিকলন আছে কিনা, তা খুঁজে দেখার পরীক্ষাগুলো তাঁর গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
  2. গবেষণা হয়েছে শুধুমাত্র কারাবন্দি ধর্ষকদের ওপরেই। এই বিষয়টি আগেই আলোচিত হয়েছে।
  3. তিনি কেস স্টাডি হিসেবে গবেষণাটি সাজিয়েছেন, সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দিকে যাননি। এর ফলে প্রাপ্ত তথ্যকে বড় মাপের পূর্বানুমান বা ভবিষ্যদ্বাণী করার জন্য ব্যবহার করায় কিছু সমস্যা হবে।

অবশ্যই তা সত্ত্বেও এই কেস স্টাডিগুলি থেকে ধর্ষক মানস সম্বন্ধে মূল্যবান ধারণা পাওয়া সম্ভব। দুঃখের বিষয় সম্পূর্ণ দলিলটি এখনও আমাদের হাতে নেই।

এই গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যের যেটুকু জানা গেছে, তার বেশ কিছু অংশ অন্যান্য দেশে হওয়া সমধর্মী গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে মেলে, আবার কিছু অংশে ভারতীয় সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়। দেখা গেছে বন্দি ধর্ষকদের অধিকাংশ কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত নয়। তারা নিজেদের কাজের কিছু ব্যাখ্যা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তি সাজিয়ে ফেলে মনে মনে। এই সাজানো যুক্তিগুলো সামাজিক নির্মিতির সঙ্গে মিলে যায়। প্রায়শ দেখা যায় নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে এরা ধর্ষিতাকেই দোষী করে। তার পোশাক, একা ঘুরে বেড়ানো, ঔদ্ধত্য, এমনকি প্রতিরোধ বা ধর্ষিত হতে অনীহাও বলপূর্বক ধর্ষণ, নির্যাতন বা ধর্ষণ করে হত্যার কারণ (justification) হিসেবে তুলে ধরে এরা। নির্ভয়া কাণ্ডের অপরাধীদের একজন, বাসচালক মুকেশ সিং ওই সাক্ষাৎকারে বলেছিল যে মেয়েটি যদি অত বাধা না দিত, তাহলে অতটা অত্যাচার করা হত না। অর্থাৎ নারীসুলভ হবার এবং সতীলক্ষ্মী হবার যাবতীয় সামাজিক ধারণার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবার পাশাপাশি বিনা বাধায় ধর্ষণ মেনে নেওয়াও ধর্ষিতার কর্তব্য, যদি তিনি প্রাণ বাঁচাতে চান। এই মানসিকতা ধর্ষকের বৈশিষ্ট্য অবশ্যই, কিন্তু এহেন কুযুক্তির নির্মাণেও সমাজের ভূমিকা স্পষ্ট বোঝা যাবে যদি মনে রাখি যে এই সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ বলেছেন, ধর্ষণ এড়ানো সম্ভব না হলে মহিলাদের তা উপভোগ করা উচিত। এই জাতীয় ভাবনার মধ্যে স্পষ্ট হয় ধর্ষক চরিত্রের আরেকটি দিক… অন্য মানুষের প্রতি সহমর্মিতা (empathy) অনুভব করার ক্ষমতার চূড়ান্ত অনুপস্থিতি। আশ্চর্য ও হতাশ হয়ে লক্ষ করতে হয় যে সামাজিক মানুষদের অনেকের মধ্যে (এমনকি সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কারও কারও মধ্যে) রয়েছে একইরকম এম্প্যাথির অভাব।

অনুতাপের অনুপস্থিতি ধর্ষকদের খানিকটা আলাদা করে অন্যান্য অপরাধীদের থেকেও। এই অনুতাপহীনতা শুধু ভারতে নয়, অন্যান্য দেশের ধর্ষকদের মধ্যেও দেখা গেছে বিভিন্ন গবেষণায়। দেখা গেছে যে খুনের আসামীদের বেশিরভাগ স্বীকার করে যে কাজটি ভুল হয়েছে এবং অপরাধটির জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজেকেই দায়ী করে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকেই দোষী সাব্যস্ত করা (victim blaming) ধর্ষণ নামক অপরাধটির এক আশ্চর্য দিক। খুনের দায়ে কঠোর সাজা পেতে হলেও অধিকাংশের অনুতাপ থাকে কেন? সম্ভবত সামনে একটি মৃতদেহ থাকলে অপরাধটি খুব বেশি জ্যান্ত হয়ে ওঠে এবং অপরাধবোধ বিবেকের দরবারে অপরাধীর আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তিগুলোকে পরাভূত করতে পারে। দুঃখের বিষয় বিবেকের আদালতে জীবিত ধর্ষিতার পক্ষে কোনও উকিল নেই। লক্ষণীয়, যে ধর্ষণের ঘটনাগুলির পর ভারতে গণরোষ বা রাজনৈতিক উত্তাপের সৃষ্টি হয়েছে গত এক দশকে, তার প্রত্যেকটিতে ধর্ষিতাকে হত্যা করা হয়েছে বীভৎসভাবে। সুজেট জর্ডনের মতো যাঁরা ধর্ষণের পর প্রাণে বেঁচে গেছেন, তাঁদের জন্য বরাদ্দ থেকেছে ভিক্টিম ব্লেমিং। তাহলে আমরা আসলে কী কারণে ব্যথিত? কীসের বিরোধিতা করছিলাম? কোন ঘটনা কড়া নাড়ল আমাদের গণ-বিবেকের দরজায়? ধর্ষণ নাকি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড?

মধুমিতা পাণ্ডের গবেষণায় অনুতাপের অনুপস্থিতির এক বিচিত্র ব্যতিক্রম কেস নং ৪৯। এক মধ্যবয়স্ক পুরুষ, যে একটি পাঁচ বছর বয়সী মেয়েকে ধর্ষণ করে কয়েদ হয়েছে। অনুতাপের কারণ শুনলে স্বস্তির বদলে অস্বস্তি বেশি হবে। না, ধর্ষণকে ঘৃণ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার জায়গায় সে পৌঁছয়নি। এমনকি শিশুধর্ষণের জন্য পাপবোধও নেই। তার আক্ষেপ এই যে মেয়েটা তো নষ্ট হয়ে গেল, এখন আর তার বিয়ে হবে না। ধর্ষক ব্যক্তিটি প্রায়শ্চিত্ত করার পথও ভেবে রেখেছে… জেল থেকে ছাড়া পেলে সে নিজেই ওই মেয়েটিকে বিয়ে করবে। সে ধরেই নিয়েছে ধর্ষিত মানেই নষ্ট (বস্তু), বিবাহই নারীজীবনের মোক্ষ, ধর্ষক স্বয়ং ধর্ষিতাকে বিয়ে করে উদ্ধার করতে পারে এবং সে বিয়ে করতে চাইলে ধর্ষিতার তরফ থেকে সেই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করার প্রশ্নই ওঠে না।

কেস নং ৪৯-এর এই বিচিত্র বিবাহকেন্দ্রিক চিন্তা ভারতীয় সংস্কৃতির অবদান (culture specific), সন্দেহ নেই, কিন্তু এর পিছনে একটি গভীর পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধ আছে, যা বিশ্বজনীন। লোকটি ধরে নিয়েছে যে পুরুষই একমাত্র সকর্মক। ইচ্ছা-অনিচ্ছা, অনুতাপ, প্রায়শ্চিত্ত, নিজের পছন্দমতো ভুল শোধরানো, বিবাহের ক্ষেত্রে সঙ্গী নির্বাচনের অধিকার, সঙ্গম করার বা না করার অধিকার… সবকিছুই পুরুষের একচেটিয়া। নারীর কোনও ন্যায্য অধিকার বা সক্রিয় ভূমিকা (agency) নেই। এই মনোভাব সারা বিশ্বের প্রায় সব ধর্ষকের তো থাকেই, পিতৃতান্ত্রিক সমাজেরও গঠনের মধ্যেই আছে এই ভাবনা। এই কারণেই দেখা গেছে সারা পৃথিবীতেই ধর্ষকেরা ‘সম্মতি’ (consent) ব্যাপারটার প্রয়োজনীয়তা বোঝে না। ছোটবেলা থেকে মানুষ হিসেবে মেয়েদের স্বতন্ত্র সত্তা এবং তাঁদের কনসেন্টের গুরুত্ব ছেলেদের বোঝালে সম্ভবত পরবর্তী প্রজন্মে কিছু সংখ্যক ধর্ষক কম তৈরি হবে।

বিজ্ঞজনেরা অনেকে হয়ত আমার এই মন্তব্যটির সঙ্গে একমত হবেন না। বিশিষ্ট অপরাধ মনস্তত্ত্ববিদ এবং “নির্ভয়া এক শক্তি” নামক সংস্থার প্রতিষ্ঠাত্রী অনুজা কাপুর ‘দ্য লজিকাল ইন্ডিয়ান’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যেমন জানিয়েছেন যে ধর্ষক ও খুনিরা সকলেই অনুতাপহীন, সংশোধনের অযোগ্য এবং অধিকাংশই ‘সাইকোপ্যাথ’, তাদের জিনে বা মস্তিষ্কের সামনের অংশে (frontal cortex) গোলমাল আছে। শেষে তিনি এও বলেছেন যে সম্ভাব্য ধর্ষক সুযোগ পেলে ধর্ষণ করবেই এবং শিক্ষা বা লিঙ্গ-রাজনীতি সচেতনতা (gender sensitization) কোনওভাবেই একজন সম্ভাব্য ধর্ষককে নিরস্ত করতে পারবে না বা অপরাধের সংখ্যা কমাতে পারবে না। শ্রীমতী কাপুরের কথা মানলে যাবতীয় নারীবাদী প্রচার ও সামাজিক স্তরে জেন্ডার সেন্সিটাইজেশনের প্রকল্পকে অর্থহীন বলে মেনে নিতে হয়। শুধুমাত্র পুলিশ প্রশাসনকে কঠোর করে অপরাধীদের আটকানো ও আটক করা ছাড়া কোনও উপায় দেখা যায় না। হয়ত এনকাউন্টারে ধর্ষক নিধনকে অপরাধ ও অপরাধী কমানোর একটা সহজ ও দ্রুত উপায় মনে হতে পারে। শ্রীমতী কাপুর সম্ভবত জৈব নির্ধারণবাদে (biological determinism) বিশ্বাসী। অপরপক্ষে বর্তমান লেখক পেশাগতভাবে জীববিজ্ঞানের সঙ্গে আরও বেশি পরিমাণে যুক্ত হওয়া সত্ত্বেও এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক গঠনে স্নায়ু ও জিনের গুরুত্ব সম্বন্ধে শ্রদ্ধাশীল হওয়া সত্ত্বেও এক্ষেত্রে জৈব নির্ধারণবাদের দাসত্ব করতে অসম্মত, কারণ তা করলে ধর্ষক হওয়াকে জৈব নিয়তি বলে মেনে নিতে হয়। বস্তুত অনুজা কাপুর নিজে কোনও ধর্ষকের সঙ্গে কথোপকথনের সুযোগ পাননি। আমেরিকা গিয়ে একবার মাত্র দুজন খুনির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য তাই অনেকটাই পূর্বানুমান নির্ভর। আরেকটু কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেলে বা বিশ্বের গবেষণাগুলির তথ্যে মনোনিবেশ করলে তিনি অন্তত এটুকু দেখতে পেতেন যে ধর্ষক আর খুনির মনস্তত্ত্ব হুবহু একরকম নয় এবং একেকটি দলের সকলেই একই মনোভাবের নয়। এদের মনোগঠনে সমাজের ভূমিকাও চোখে পড়ত এবং সেই জায়গায় কিছু প্রতিষেধক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা মনে আসত।

জেলের বাইরে থাকা, ধরা না পড়া মানুষদের ধর্ষকামী মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা আমাদের দেশে নেই, দুনিয়াতেও খুবই কম। ১৯৭৬ সালে ক্লেয়ারমন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ছাত্র স্যামুয়েল স্মিদিম্যান লস এঞ্জেলস জুড়ে সব খবরের কাগজে ব্যক্তিগত কলামে বিজ্ঞাপন দিয়ে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণ করে ধরা না পড়া মানুষদের টেলিফোনে সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু করেন। বিজ্ঞাপনের শিরোনাম ছিল, “Are you a rapist?” আদৌ কেউ নিজেকে ধর্ষক বলে চিহ্নিত করে ফোন করবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় ছিল। অথচ প্রায় দুশো ফোন এসেছিল, হয়ত আমেরিকা বলেই। গবেষণার শেষে ধর্ষকদের এক বিশেষ ধরনের পশু ভাবার অভ্যাস বা মিথ দূর হয়ে গেল স্মিদিম্যানের মন থেকে। তিনি দেখলেন যে বিভিন্ন সামাজিক অবস্থানের, বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার পুরুষেরা নানাবিধ কারণে বা অজুহাতে, বিভিন্ন উপায়ে, বিবিধ সম্পর্কে আবদ্ধ অথবা নিঃসম্পর্ক মহিলাদের ধর্ষণ করেছে। তাঁর ধারণা হল যে ধর্ষকেরা বহুপ্রকার এবং তাদের সম্বন্ধে হয়ত সাধারণভাবে কিছুই বলা সম্ভব নয়।

পরবর্তীকালে এই বিষয়ে আরও গবেষণা হতে থাকে এবং গবেষকেরা ক্রমশ বুঝতে পারেন যে ধর্ষকদের মধ্যে নানারকমের মানুষ আছে ঠিকই, কিন্তু তাদের মধ্যে কতগুলো সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও আছে। যেমন অনুমতি নেবার গুরুত্ব এরা বুঝতে চায় না। এদের মধ্যে অনেকেই স্বীকার করে যে তারা বিনা অনুমতিতে কোনও মহিলার সঙ্গে সহবাস করেছে, কিন্তু সেটাকে ধর্ষণ বলে মানতে রাজি নয়। দেখা গেছে এই জাতীয় যৌন অপরাধীরা বেশিরভাগই অল্প বয়সে অপরাধ শুরু করে, প্রায়শ কলেজ যাবার বয়সে, এমনকি টিন এজের মধ্যেও। অনেকে একটি-দুটি ধর্ষণ বা যৌন অপরাধ করে থেমে যায়, কিন্তু কিছু অপরাধী ক্রমাগত অপরাধ করে যেতে থাকে। কারও কারও ক্ষেত্রে এমনকি অপরাধের মাত্রা ও হার ক্রমশ বাড়তে থাকে। এই বাড়া নির্ভর করে ব্যক্তির চরিত্রের ওপর এবং ধর্ষণ পরবর্তী অভিজ্ঞতার ওপর (অর্থাৎ কী ধরনের ফিডব্যাক বা রিএনফোর্সমেন্ট সে পাচ্ছে, তার ওপর)।

কে বারবার অপরাধ করতে থাকবে আর কে থামবে, তা নির্দিষ্টভাবে বলা খুব কঠিন। ওয়েন রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ববিদ আন্তোনিয়া অ্যাবে ২০১৫ সালে “Sexual assault perpetrators’ justifications for their actions: Relationship to rape supportive attitudes, incident characteristics and future perpetration” নামক একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন রিয়ানা ওয়েজনার, জ্যাকলিন ওরনার ও অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে “Violence against women” জার্নালে। সেখানে তাঁরা জানিয়েছেন যেসব ধর্ষক কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়, পরবর্তী এক বছরের মধ্যে একই অপরাধ করার সম্ভাবনা তাদের মধ্যে কম। সামাজিক স্তরের গবেষণায় জেলবন্দি ধর্ষকদের মতো অনুশোচনার সার্বিক অনুপস্থিতি দেখা যায় না, কিন্তু যারা অনুতপ্ত হয় না, নির্যাতিতাকেই দোষ দেয় তাকে যৌনভাবে উত্তেজিত করার জন্য, তাদের দ্বারা একই অপরাধ বারবার হতে থাকার সম্ভাবনা খুবই বেশি। এছাড়া “না মানেই হ্যাঁ” জাতীয় ধর্ষণ সংস্কৃতির ভ্রান্ত তত্ত্বে (rape myths) বিশ্বাস, অতিরিক্ত মদ্যপান, যৌনভাবে সক্রিয় থাকার বা নিজের যৌন সক্ষমতা প্রমাণ করার জন্য সামাজিক চাপ (বাস্তব না হলেও অনুভূত বা কল্পিত চাপ) ইত্যাদিও ধর্ষক হবার “রিস্ক ফ্যাক্টর”।

ব্যক্তিত্বের কিছু দিক এসব ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে পারে। যে ব্যক্তির চরিত্রে সমমর্মিতা বা এম্প্যাথি ব্যাপারটি যথেষ্ট পরিমাণে উপস্থিত, অন্যান্য সমস্যা থাকলেও তার পক্ষে ধর্ষক হবার সম্ভাবনা কম। উল্টোদিকে যাদের চরিত্রে “নার্সিসিস্টিক” প্রবণতা বেশি, তাদের ধর্ষক হবার সম্ভাবনা বেশি। নার্সিসিস্টিক চরিত্রের সঙ্গে যদি অল্পবয়সে জনপ্রিয় না হতে পারার বা নারীসঙ্গ থেকে বঞ্চিত হবার হতাশা থাকে, তাহলে মহিলাদের প্রতি একটি সামগ্রিক বিক্ষোভ থাকতে পারে এদের মনে। সেক্ষেত্রে একপ্রকার প্রতিশোধমূলক ধর্ষণে এদের জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট। পরিচিতা বা অপরিচিতা যেকোনও মহিলাই এদের কাছে সেই না পাওয়া নারীত্বের প্রতিনিধি এবং যে কেউ অত্যাচারের শিকার হতে পারেন।

পুরুষ মানুষ যৌন তাড়নায় ধর্ষণ করে ফেলতেই পারে, এই জাতীয় একটি মিথ সামাজিক স্তরে ধর্ষকদের ক্ষমা করে দেবার ছুতো হিসেবে ব্যবহৃত হত। প্রধানত তরুণ ধর্ষক, ভালো খেলোয়াড়, ছাত্র, শিল্পী বা সেলিব্রিটিদের অপরাধকে লঘু করার জন্য এসব যুক্তি ব্যবহৃত হত বা এখনও হয়। এই মিথটি পুরুষদের ধর্ষক হতে উৎসাহ দেয় একভাবে। এই ভাবনার গোড়ায় আছে ধর্ষণকে একটি প্রায় স্বাভাবিক যৌনকর্ম ভাবার প্রবণতা। এই ভাবনা বদলাতে নারীবাদী প্রতিরোধের গুরুত্ব বিপুল। নারীবাদী তাত্ত্বিকেরা ধর্ষণকে যৌন অপরাধের বদলে যৌনতার মোড়কে একটি দমনমূলক অপরাধ বলে চিহ্নিত করলেন। সুজান ব্রাউনমিলার বললেন, “Rape is nothing more or less than a conscious process of intimidation by which all men keep all women in a state of fear.” ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত “Against our will” নামক বইটিতে ব্রাউনমিলার ধর্ষণকে পিতৃতান্ত্রিক নারীবিদ্বেষের একটি একটি স্বরূপ তথা একটি দমনমূলক হাতিয়ার হিসেবে অভিহিত করেন। “Rape is not a crime of irrational, impulsive or uncontrollable lust, but is a deliberate, hostile, violent act of degradation and possession on the part of a would-be conqueror, designed to intimidate and inspire fear.” এই কথাগুলি তিনি স্পষ্টাক্ষরে লেখেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী ধর্ষকের মনস্তত্ত্ব বুঝতে চেষ্টা করলে দেখা যাবে যে সেখানে যৌন ইচ্ছা, লোভ বা যৌন অপ্রাপ্তির বোধ ইত্যাদি বিশেষ নেই। আছে মূলত নারীর প্রতি ঘৃণা, ঈর্ষা, নারীকে দমন করার ইচ্ছা। মেয়েরা যাতে বাড়ির বাইরে বেরোতে না পারে, কাজের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় সামিল না হতে পারে, তা নিশ্চিত করার প্রবণতা। এর সঙ্গে আছে পুরুষানুক্রমে চলে আসা একটি জ্ঞান… প্রাচীন পুরুষ আবিষ্কার করেছিল যে তার যৌনাঙ্গটিকে অত্যাচারের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। লক্ষ্যণীয়, ব্রাউনমিলারের তত্ত্ব অনুসারে পুরুষের যৌনাঙ্গ আর যৌনাঙ্গ থাকে না, সেটি পরিণত হয় জৈব উত্তেজনা থেকে বিযুক্ত একটি দণ্ডে, যার মূল দায়িত্ব নারীকে পীড়ন করা। সুতরাং ব্যক্তি ধর্ষক আসলে সব পুরুষের তরফ থেকে নারী-নির্যাতনের দায়িত্বটি নিজের কাঁধে তুলে নেয় এবং একজন নারীর মধ্য দিয়ে সমগ্র নারীজাতিকে আক্রমণ করে।

যুদ্ধ, দাঙ্গা ইত্যাদির সময়ে যে অজস্র ধর্ষণ হয়, তা মূলত দমনমূলক নিঃসন্দেহে। তার বাইরেও সমাজে প্রতিদিন বিভিন্ন শত্রুতা ও হিংসার জেরে অনেক ধর্ষণ হয়ে চলেছে, যাদেরকে ‘hate crime’ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এসবই ব্রাউনমিলার ও অন্য নারীবাদীদের এই রাজনৈতিক অবদমনের তত্ত্বটির সারবত্তা প্রমাণ করে। নির্ভয়া কাণ্ড বা সাম্প্রতিক হায়দ্রাবাদ কাণ্ড যে পাশবিক অত্যাচারের ছবি তুলে ধরল, তাও এই তত্ত্বকে পুষ্ট করে। তার পরেও প্রশ্ন থাকে, ধর্ষণ কি সর্বদাই একটি অযৌন ঘটনা? অনেক মনস্তত্ত্ববিদ ও গবেষক দাবি করে থাকেন যে দমনের পাশাপাশি যৌনতার দিকটিও ধর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ। রিয়ানা ওয়েজনারদের মতো মহিলা বিজ্ঞানীদের গবেষণাতেও দেখা গেছে বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ধর্ষকাম বা যৌন বুভুক্ষু পুরুষেরা কীভাবে বিনা অনুমতিতে যৌন আমোদ আদায়ের চেষ্টা করে। এসব ক্ষেত্রে যৌন উদ্দেশ্য স্পষ্ট। শ্যানন বার্টন-বেলেসাও “sexual gratification rapist” নামে ধর্ষকের একটি নির্দিষ্ট বর্গের উল্লেখ করেছেন, যারা যৌন আনন্দ লাভের উদ্দেশ্যেই ধর্ষণ করে।

পুরুষের যৌন অধিকারবোধ (entitlement) ধর্ষক হয়ে ওঠার পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। রিচার্ড ফেলসন ও জেমস টেডেসচি ১৯৯৪ সালে “Aggression and coercive actions: A social-interactionist perspective” নামে একটি বই প্রকাশ করেন। তাতে তাঁরা দাবি করেন যে নারীর উপর আধিপত্য করার আগ্রাসী মানসিকতার চেয়ে পুরুষের যৌন অধিকারবোধ ধর্ষণের পিছনে বেশি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। ফেলসন বিশ্বাস করেন যে ধর্ষণ শুধু নারীবিরোধী হিংস্রতা নয়, বরং যৌন আগ্রাসন, যার মধ্যে যতটা আগ্রাসন আছে, ততটা যৌন ক্ষুধাও। কারাবন্দি ধর্ষকদের উপর গবেষণায় দেখা গেছে যে বলপূর্বক যৌনসঙ্গমের দৃশ্য দেখে তারা সাধারণ পুরুষদের চেয়ে বেশি যৌন উত্তেজনা লাভ করে। Penile plethysmography পদ্ধতিতে শিশ্নের আকারের পরিমাপ নিয়েও এই তথ্য প্রমাণিত হয়েছে। পরবর্তীকালে হিল ও ফিশার ২০০১ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে প্রমাণ করেছেন যে এই অধিকারবোধ হল পৌরুষ অর্থাৎ সমাজ নির্মিত পুরুষোচিত ভূমিকা (masculine gender role) এবং ধর্ষণপ্রবণ মানসিকতা ও আচরণের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী সেতু।

ধর্ষকেরা সাধারণত নিজেদের ধর্ষক হিসেবে চিহ্নিত করতে চায় না, নিজেদের দোষ ঢাকতে চেষ্টা করে। এমনকি শাস্তি পাবার পরেও নানারকম ব্যাখ্যা দিয়ে নিজেদের কাজকে খানিকটা ন্যায্য প্রমাণ করার চেষ্টা করে, তাতে কোনও আইনি সুবিধা না হলেও। এর জন্য কি তাদের “সাইকোপ্যাথ” আখ্যা দেওয়া যায়? অনুজা কাপুরের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এর উত্তর অবশ্যই “হ্যাঁ”। কিন্তু “Psychology of Violence” জার্নালের সম্পাদিকা শেরি হ্যাম্বি বলেন ঠিক উল্টো কথা। তাঁর মতে, এতেই প্রমাণিত হয় যে ধর্ষকেরাও আদতে আর পাঁচটা মানুষের মতো, যারা দাবি করে যে ধর্ষণ তো আসলে কোনও দানবীয় ‘অপর’-এর কাজ। “No one thinks they are a bad guy.” এই হল হ্যাম্বির বয়ান… কেউ নিজেকে খারাপ মানুষ ভাবতে চায় না, ধর্ষকেরাও নয়। অর্থাৎ তাদের মনের গভীরে প্রোথিত অধিকারবোধ, মিথ এবং কুযুক্তিগুলোকে যদি আক্রমণ করা যায়, সেগুলোকে উপড়ে ফেলা যায় এবং আত্মপক্ষ সমর্থনে সাজানো যুক্তিগুলোকে দুর্বল করে দেওয়া যায়, তাহলে ধর্ষক আয়নায় নিজেকে খারাপ মানুষ হিসেবে দেখতে বাধ্য হবে, যা সে দেখতে চায় না। এতে হয়ত বেশ কিছু ধর্ষক ভেঙে পড়বে এবং নিজেদের ধর্ষক সত্তা নিয়ে সমস্যায় পড়বে। তারপর শাস্তির মেয়াদের মধ্যে নিজেদের শোধরাতে পারবে কিনা তা পরের প্রশ্ন, অন্তত তার অনুতাপহীন সুখের জায়গাটা ভেঙে যেতে পারে। সুতরাং ধর্ষণ সংস্কৃতি ও তার গালগল্পগুলোকে আক্রমণ করার কিছু সারবত্তা তো আছেই।

দূর থেকে আমাদের চোখে সব ধর্ষণকে একইরকম অপরাধ এবং সব ধর্ষককে একই ধরনের অপরাধী মনে হয়। গবেষকদের চোখে কিন্তু এদের প্রকারভেদ আছে। এতজন গবেষক এতরকম শ্রেণিবিভাগ করেছেন যে ব্যাপারটা গুলিয়ে যেতে পারে। ১৯৫০-এর দশকে শুরু হওয়া Kinsey study চলেছিল অনেক বছর, এমনকি কিনসের মৃত্যুর পরেও। এই গবেষণার কারিগরেরা ধর্ষকদের “assaultive, amoral, drunken, explosive, double-standard, mental defective and psychotic”— এই সাতভাগে ভাগ করেন। মনোবিদ্যা বা মনোরোগ চিকিৎসার আজকের দিনের জ্ঞান অনুসারে এর মধ্যে কয়েকটি বিভাগের নাম আপত্তিকর মনে হবে।

  • কিংস্টনের কুইনস ইউনিভার্সিটির হাওয়ার্ড বার্বারি আরেকরকম ভাগ করেন। তাঁর মতে বেশিরভাগ ধর্ষক হঠকারী (impulsive) এবং সুযোগসন্ধানী (opportunistic)। এরা অন্য ধরনের হঠকারী কাজও করে থাকে। ধর্ষিতার প্রতি কোনও ক্রোধ এদের থাকে না এবং বাধা না পেলে বলপ্রয়োগ করে না। এর বাইরে আছে যৌন ফ্যান্টাসিতে আক্রান্ত কিছু ধর্ষক, যারা মনে করে ধর্ষিতা তাদের প্রেমে পড়বে। এরা সবচেয়ে কম বলপ্রয়োগ করে এবং বাধা পেলে পালিয়ে যায়। এর বাইরে আছে একটি হিংস্র তৃতীয় গোষ্ঠী, যারা তাদের শিকারের উপর নির্যাতন করতেই চায়, কেউ যৌন কারণে (sexual sadism), কেউ প্রতিশোধস্পৃহায়।
  • নিকোলাস গ্রথ ধর্ষকদের ভাগ করেছেন Power rapist, anger rapist এবং sadistic rapist গোত্রে। প্রথম গোত্র নিজেদের অপূর্ণতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব ইত্যাদিকে পুষিয়ে নিতে ধর্ষণ করে, অর্থাৎ এভাবে নিজেদের ক্ষমতায়ন ঘটায়। দ্বিতীয় গোত্র একজন নারীকে অপমান, নির্যাতন করে নিজেদের ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। তৃতীয় গোত্রটি নারীর শরীরের উপর দীর্ঘ অত্যাচারের মাধ্যমে বিকৃত যৌন আনন্দ উপভোগ করে।
  • কোহেন, গারোফালো, বাউচার ও সেগহর্ন ধর্ষকদের aggressive, sexual এবং sex-aggresion diffusion (অর্থাৎ উভয়ের মিশ্রণ) এই তিনটি ভাগে ভাগ করেছিলেন।

এই শ্রেণিবিভাগগুলোর মধ্যে কিছু মিল আছে। দেখা যাচ্ছে আগ্রাসন, নিষ্ঠুরতা ও যৌন ক্ষুধার মাত্রা অনুসারেই ভাগগুলো করা হয়েছে। ধর্ষকের মনে যৌন আকাঙ্খার সঙ্গে আগ্রাসন ও হিংস্রতা মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে, একথা প্রায় সকলেই বুঝেছেন।

আলোচনা আর দীর্ঘায়িত করব না। বহু গবেষণার মধ্যে সীমিতসংখ্যক কয়েকটির কথা সংক্ষেপে বলা হল। ধর্ষকদের মানসিকতা সম্বন্ধে সবকিছু আমরা এখনও জানি না, কিন্তু যেটুকু জানি, সেখান থেকেই শুরু করা যায়। সাজাপ্রাপ্ত ধর্ষকদের সংশোধন সম্ভব হোক বা না হোক, আগামী প্রজন্মের অনেক শিশু-কিশোর-তরুণকে ধর্ষক হয়ে ওঠার থেকে বিরত করা সম্ভব বলেই আমার বিশ্বাস। সেই প্রচেষ্টায় ধর্ষকের মনোজগৎ সম্বন্ধে এই প্রাথমিক ধারণাটুকু কাজে লাগবে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2039 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...