ধর্ষণের সংস্কৃতি আর ন্যায়ের গাল-গল্প

শতাব্দী দাশ

 

তেলেঙ্গানার এনকাউন্টার সংক্রান্ত উত্তেজনা  শেষ হলে আরও কিছু সত্য ঘটনায় দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে হয়ত।

ঘটনা এক:

উত্তরপ্রদেশের মিরাট। বা সাহারানপুর। বা এরকম কোনও শহরের একটি ব্লু ফিল্ম পার্লার। স্থানীয় ক্রেতা সেখানে এসে এদিক-ওদিক দেখে ‘লোকাল ভিডিও’ চান৷ মুহূর্তেই তাঁর হাতে এসে যায় সত্যিকারের ধর্ষণের ভিডিও৷ ‘লোকাল ভিডিও’ হল ছদ্মনাম, যার মানে হল আসলি ধর্ষণের ভিডিও। আল জাজিরার সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, সেখানে এমনকি ধর্ষিতার মুখও স্পষ্ট দেখা যায়। বরং ঝাপসা করে দেওয়া হয়েছে ধর্ষকের/ধর্ষকদের মুখ। একজন চড়াও হয়েছে মেয়েটির উপর। অন্যজন ভিডিও করছে, বোঝা যাচ্ছে। মেয়েটি করুণ মিনতি জানাচ্ছে, তাকে ছেড়ে দিতে বলছে। তারপর পালাবার পথ নেই বুঝে বলছে, অন্তত ভিডিও না করা হোক। তবু সেই ভিডিও তোলা হচ্ছে। বাজারেও আসছে। তার মধ্যে শিশুধর্ষণের ভিডিও-ও বিরল নয়৷ মোটামুটি সস্তার হোটেলে ডাল-ভাত খাওয়ার টাকাতেও উত্তরপ্রদেশের গ্রামে-শহরে এরকম ভিডিও অনেক মেলে৷  দাম ওঠা-নামা করে ২০ টাকা থেকে ২০০ টাকার মধ্যে। চাইলে কাস্টমার নিজের ফোনেও পুরে নিতে পারেন তা৷ ছড়িয়ে দিতে পারেন আরও অনেকের মধ্যে। ভিডিও দোকানের মালিক অবশ্য বলেন, আসলে বাজারে বেচার জন্য এসব ভিডিও প্রাথমিকভাবে তৈরি হয় না৷ তৈরি হয় ধর্ষিতাকে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য। কিন্তু তারপর তা ধর্ষক বা তার বন্ধুদের ফোন থেকে চুরি হতেই পারে, কিংবা টাকার জন্য তা বিক্রি করেও দিতে পারে ধর্ষক বা তার বন্ধুরা৷

ঘটনা দুই:

সাম্প্রতিক গণধর্ষণ কাণ্ডগুলি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একের পর এক প্রতিবাদ  দেখা গেছে। ধর্ষকদের এনকাউন্টারের পর অধিকাংশ মানুষ খুশিও হয়েছেন। গোটা দেশ যখন ন্যায়বিচার প্রার্থনায় উত্তাল বা এনকাউন্টার নিয়ে উদ্বেল, ঠিক সেই মুহূর্তেই উঠে এল এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অনলাইন দুনিয়ায় ট্রেন্ডিং হয়েছে ‘হায়দরাবাদ রেপ ভিডিও’ কিওয়ার্ড। ৪৮ ঘণ্টায়  ৮০ লক্ষ মানুষ একটি পর্ন সাইটে গিয়ে খুঁজেছেন হায়দরাবাদের তরুণীর ধর্ষণের ভিডিও। মানে যাঁরা এনকাউন্টারে উল্লসিত আর যাঁরা ধর্ষণের ঘটনাটি পর্নহাবে গিয়ে চাক্ষুষ করতে চাইছেন, তাঁদের মধ্যে কিছু মানুষ কমন। কিছু মানুষ উভয় সেটেই আছেন।

ঘটনা তিন:

কলকাতায় টকশো-তে ধর্ষণ নিয়ে আলোচনা করতে গেছিলেন বামপন্থী মহিলা কবি৷ পুরুষ সমাজকর্মী ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করলেন। মহিলা কবি ফেসবুক পোস্ট দিলেন। বললেন, তিনি পুরুষজন্ম চান। তাহলে ওই পুরুষ মানবাধিকার কর্মীর মেয়েকে ধর্ষণ করতেন। তারপর দেখতেন সেই মানবাধিকারকর্মী আর ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেন কিনা। অর্থাৎ ধর্ষণের জবাব কী? শুধু ভায়োলেন্সও নয়। এমনকী পালটা ধর্ষণই৷

ঘটনা চার:

বিখ্যাত নারীবাদী আইনজীবী বৃন্দা গ্রোভার আমাদের জানালেন, ধর্ষকের এনকাউন্টারের বিরোধিতা করার জন্য তাঁকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হচ্ছে অহোরাত্র।

আমাদের অস্বস্তি ও রোষের কারণ তাহলে ঠিক কী? ধর্ষণ? তা-ই যদি হয়, তবে ধর্ষণ আমাদের যৌন ফ্যান্টাসিতে বাসা বেঁধেছে কেন? প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ভাষাতেও দাওয়াই হিসেবে ধর্ষণের কথা বারবার উঠে আসছে কেন?

ভারতীয় গণমাধ্যম তথা ভারতীয় সমাজ ‘ধর্ষণ’ বলতে কী বোঝে? ধর্ষণ মানে নির্ভয়া। ধর্ষণ মানে কামদুনি। ধর্ষণ মানে তেলেঙ্গানা। আসিফা। উন্নাও। লক্ষ করুন, সব ক্ষেত্রেই ধর্ষণগুলি বহু-চর্চিত, কারণ ধর্ষিতারা ধর্ষণ ভিন্ন অন্য অপরাধেরও শিকার৷ কাউকে ধর্ষণের পর মেরে ফেলা হয়েছে। কাউকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। শুধু ধর্ষণ নামক ক্রিয়াবাচক বিশেষ্যটি নিজে কতটা অভিঘাত সৃষ্টি করে আসলে আমাদের মনে? ধর্ষিতার মৃত্যু হলে শোরগোল তোলায় আমাদের অবশ্যই উদ্যোগ আছে। মৃত্যু বা মেরে ফেলার চেষ্টা যত নির্মম, ততই বেশি হয় শোরগোল।

কিন্তু ধর্ষিতা যদি মৃত্যুবরণ না করেন? তাহলে ধর্ষিতা হয়ত এফআইআর করেন। তা থেকে ধর্ষণের মামলা হয়। মামলায় নানা প্রমাণ সহ অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে দেখাতে হয় যে তিনিই ধর্ষিতা। কখনও প্রমাণের অভাবে অপরাধী খালাস পায় বেকসুর। আবার, কখনও হয়ত লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষিতা অভিযোগই করেন না৷

সামাজিক ক্ষেত্রে কী প্রভাব পড়ে ধর্ষিতার জীবনে? বেঁচে থাকলে ধর্ষণের পর থেকে শুধু ‘ধর্ষিতা’ নামক বিশেষণ দিয়েই তাঁকে মেপে নেওয়া হয়। সুজেট জর্ডনের মতোই তিনি বাড়ি ভাড়া পান না। পাড়ায় টিটকিরি শোনেন। তিনি স্কুলবালিকা বা কলেজছাত্রী হলে ড্রপ-আউট হয়ে যান৷ চাকুরিরতা চাকরি ছেড়ে গা ঢাকা দেন৷ একটি ঘটনার অভিঘাতে তাঁর জীবনটাই বদলে যায়, অথচ সে ঘটনা ঘটানোর দায় অন্য কারও।

সত্যি অন্য কারও? সে ব্যাপারেও কি সবাই একমত? কোনওভাবে ধর্ষিতার জামাকাপড়ের ছিরি, তাঁর বাইরে বেরোনোর স্পর্ধা, তাঁর পুরুষবন্ধুর সংখ্যা, তাঁর নেশাসক্তি সেসবের কারণ নয় তো? এইসব প্রশ্ন এত বেশি সংখ্যক মানুষ অহরহ করতে থাকেন যে ধর্ষিতা নিজেও বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তিনিই, তিনিই দায়ী।

ধর্ষণ কি তাহলে কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা? নাকি নির্দিষ্ট সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত স্বাভাবিক ঘটনা? আমরা কি পশুচিকিৎসক মেয়েটির ধর্ষণের ঘটনাটি নিয়ে আদৌ ক্ষুব্ধ? ধর্ষিতা মেয়েটিকে সে রাতে ধর্ষণের পর ছেড়ে দেওয়া হলে, মেরে না ফেলা হলে কি দেশে একইভাবে অগ্ন্যুৎপাত হত? এখানেই ধর্ষণ সংস্কৃতির প্রসঙ্গ এসে পড়ে।

 

রেপ কালচার

‘রেপ কালচার’ কী? ধর্ষণ সংস্কৃতি কি নারীবাদীদের কল্পনা-পোষিত মিথ ও মিথ্যা? অনেকেই মনে করেন, অখণ্ড রেপ কালচার বলে কিছু হয় না। তাঁরা বলেন, রেপ কালচারের অস্তিত্ব প্রমাণ করার চেষ্টার মধ্যে একরকম তীব্র পুরুষ-বিদ্বেষ আছে। যেন পুরুষমানুষ মাত্রকেই ধর্ষক হিসেবে চিহ্নিত করে দেওয়া হচ্ছে। তাই কি? দোষারোপ পিতৃতন্ত্রকে যদিও বা করা হয়, পুরুষকে করা হচ্ছে কি? ধর্ষণ সংস্কৃতি বলে যদি কিছু থাকে, তা কি শুধু পুরুষ বহন করে নাকি বহন করতে পারে মহিলারাও?

প্রথমেই মনে রাখা ভাল, যখন আমরা বলি, সবাই ধর্ষণ সংস্কৃতিতে বাস করছি/করছ/করছেন, তখন তা আবশ্যিকভাবে আমার-আপনার দ্বারা কৃত কোনও অপরাধকে সূচিত করা হয় না। আসলে ‘ধর্ষণ সংস্কৃতি’ পরিভাষাটি অপরাধকে নয়, অপরাধের উৎসস্থলকে নির্দেশ করে। সব অপরাধেরই কিছু আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিত থাকে, তেমনই থাকে ধর্ষণেরও। তাই ধর্ষণ সংস্কৃতির নাম শুনলেই আকাশ থেকে পড়ার কারণ নেই। ডিফেন্সিভ হয়ে পড়ারও দরকার নেই। আর হ্যাঁ, ‘রেপ কালচার’-এর ধারক ও বাহক একটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজে শুধু পুরুষেরা নয়, মেয়েরা বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরাও হতে পারেন।

সকালে বাসে উঠেই, ধরুন, এক মহিলা আরেক মহিলার পাশে বসলেন লেডিজ সিটে। দ্বিতীয় মহিলাটি প্রথমজনকে চোখ মটকে বললেন, ‘ব্রা দেখা যাচ্ছে তোমার।’ ভালোমনেই বললেন, যাতে সহমানবী নিজের পোষাক সম্পর্কে সচেতন হন। যাতে ভুল করেও মনে না হয়, তিনি পুরুষকে প্রলুব্ধ করতে তৎপর। উদ্দেশ্য ভালোই ছিল তাঁর, তাই হয়ত আমরা তাঁর দিকে তেড়ে যাব না। কিন্তু ধর্ষণ সংস্কৃতি নামক অন্ধকার তিনিও বহন করছেন বটে। এর পরের মুহূর্তে সহযাত্রিনী ভিড় বাসে যৌন হেনস্থার শিকার হলে সেই মহিলাকে বলতে শোনা যেতেই পারে, ‘ওর তো পোশাক-আশাকের ঠিক ছিল না। আগেই বলেছিলাম, ব্রা-র স্ট্র‍্যাপ লুকিয়ে ফেলতে, এখন হল তো?’ তাই তেড়ে না গেলেও তাঁর ভাবনার গলদগুলি তাঁকে আশু বোঝানো দরকার। গুরগাঁও-এর এক শপিং মলে এক মধ্যবয়সিনী মহিলা এভাবেই একদল তরুণীকে বাচিকভাবে আক্রমণ করেছিলেন, মনে আছে তো? অভিভাবকসুলভ কর্তৃত্ব ফলিয়ে বলতে এসেছিলেন, এরকম ছোট পোশাক পরে মেয়েরা ঘুরে বেড়াবে, আর ছেলেরা ধর্ষণ করলেই দোষ?

এই আমাদের ধর্ষণ সংস্কৃতি। ‘রেপ কালচার’ শব্দবন্ধটি ইউনাইটেড স্টেটসের নারীবাদীরা বিংশ শতকের সত্তরের দশকে ব্যবহার করতে শুরু করেন। ‘রেপ: দ্য ফার্স্ট সোর্সবুক ফর উইমেন’ বইতে প্রথমে এই পরিভাষা ব্যবহৃত হয় বলে মনে করা হয় (১৯৭৪)। ১৯৭৫ নাগাদ ও তার পরবর্তী সময়ে টার্মটি নিয়ে ভাবনাচিন্তার আরও বিস্তার ঘটে।

সমাজতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিকভাবে ‘সংস্কৃতি’ বা ‘কালচার’ বলতে আমরা কী বুঝি? আমরা বুঝি, এমন কিছু কাজ বা আচরণের সমষ্টি যা কিনা সমাজের প্রায় সবাই পালন করেন। এই ধারণার সঙ্গে ‘ধর্ষণ’ শব্দটিকে মেলানো আপাতভাবে কঠিন৷ তাই টার্মটি প্রায় অক্সিমোরোনিক।

প্রাথমিকভাবে এমন এক সংস্কৃতিকে সূচিত করতে পরিভাষাটি এসেছিল, যেখানে ভিক্টিমকেই তাঁর উপর ঘটা যৌন নির্যাতনের জন্য অভিযুক্ত করা হয়৷ যেখানে যৌন নির্যাতন নিত্যদিনের স্বাভাবিক ঘটনা, শুধু নির্যাতিতার মৃত্যু-টিত্যু ঘটে গেলেই তা ‘বিশেষ’ হয়ে ওঠে। কিন্তু আবার, তা কতটা ব্যাপক ও কতটা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে উঠেছে, সে ব্যাপারেও সঠিক তথ্য পেতে বাধা দেয় এই ধর্ষণ সংস্কৃতিই। সেখানে প্রাত্যহিক ভাষায়, ঠাট্টায়, মজাকিতে ধর্ষণ বা তার রূপক ঘুরে ফিরে আসে। কিন্তু সেখানে প্রকৃত অপরাধটি সঙ্ঘটিত হলে ‘ধর্ষণ’ শব্দটিও আদৌ উচ্চারণ করা হবে, নাকি কোনও ইউফিমিজমের আড়ালে সেই শব্দকে ঢাকা হবে, তা নিয়ে দোলাচল থাকে৷ ‘গরিমা যাত্রা’-য় অংশগ্রহণকারী মধ্যপ্রদেশের এক ধর্ষিতা তরুণী বলেছিলেন, এক সভায় ‘ধর্ষণ’ কথাটি উচ্চারণ করায় সেই গাঁয়ের হেডমাস্টারমশাই বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। ‘ওঁরা শব্দটা শুনেই এত নাক সিঁটকোচ্ছেন! অথচ আমরা তো সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি’— বলেছিলেন তিনি।

অনেক নারীবাদীই নিজের নিজের মতো করে সংজ্ঞা দিয়েছেন ধর্ষণ সংস্কৃতির। Emilie Buchwald, যিনি Transforming a Rape Culture বইটির লেখক, তিনি ধর্ষণ সংস্কৃতিকে দেখেছেন এভাবে:

a complex set of beliefs that encourage male sexual aggression and supports violence against women. It is a society where violence is seen as sexy and sexuality as violent. In a rape culture, women perceive a continuum of threatened violence that ranges from sexual remarks to sexual touching to rape itself. A rape culture condones physical and emotional terrorism against women as the norm… In a rape culture both men and women assume that sexual violence is a fact of life, inevitable… However… much of what we accept as inevitable is in fact the expression of values and attitudes that can change.

বাকওয়াল্ড অবশ্য ট্রান্স বা নন-বাইনারিদের কথা বলেননি। কিন্তু মূল কথাটি ফ্যালনা নয়৷ তিনি বলছেন, ভায়োলেন্স বিষয়টাই বেশ আবেদনপূর্ণ বা সেক্সি আমাদের সংস্কৃতিতে৷ তা আমাদের চোখে পুরুষালি, তা ক্ষমতা ও শক্তির পরিচায়ক। আর অন্যদিকে যৌনতা বলতেও আমরা হিংস্র কিছুই বুঝি৷ পারস্পরিক সহমতির ভিত্তিতে যৌনতা অনেকের কাছেই পলিটিকালি কারেক্ট নেকুপুষু ব্যাপার৷ তাই আমাদের যৌন ফ্যান্টাসিতে তার জায়গা নেই৷ এ হেন সংস্কৃতিতে রোজ বাচিকভাবে যৌন আক্রমণ হতে পারে নারীর উপর, তার অমতে তাকে নিত্য ছোঁয়া হতে পারে, আবার রেপ কালচারের চরম পরিণতি হিসেবে ধর্ষণও ঘটতে পারে৷ ধর্ষণ সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য হল, এই সংস্কৃতিকেই স্বাভাবিক ও অনতিক্রম্য বলে মানেন এই সংস্কৃতিতে বাস করা নারী-পুরুষ সকলেই৷

আমাদের কথ্য ভাষায়, রূপকে, ঠাট্টা তামাশায়, আইনে, টিভিতে, সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে এমনকি শিশুপাঠ্য বইতেও তারই ছড়াছড়ি৷ যেমন ধরা যাক, ভারতীয় ক্রিকেট দল বাংলাদেশের ক্রিকেট দলকে ‘ধর্ষণ’ করে না, খেলায় হারায় মাত্র। ‘ধর্ষণ’ শব্দের এরকম আলটপকা ব্যবহার ধর্ষণ সম্পর্কে সামগ্রিক উন্নাসিক মনোভাবেরই পরিচায়ক৷ দুজন পুরুষ পারস্পরিক ঝগড়া-ঝাঁটিতে প্রায়শই ব্যবহার করে এমন খিস্তি, যা আসলে নারীর পক্ষে অবমাননাকর। প্রতিপক্ষর মা-বোনকে ধর্ষণ করার ইঙ্গিত তার মধ্যে থাকেই। এমনকী ধর্ষকের প্রতি ক্ষোভেও অনেকে তার মা-বোনকে ধর্ষণ করার নিদান দেয়। আমাদের বিজ্ঞাপনের ভাষা বলে, ‘মেন উইল বি মেন’। পিতৃতান্ত্রিক নিদান হল, ছেলেরা গর্ব করবে বহুগামিতা নিয়ে। আর মেয়েদের সম্পদ হবে সতীত্ব। যে নারীদের বিয়ের আগে যৌন সংসর্গ হয়েছে, তাদের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকও ‘ফাটা প্যাকেট’ বা ‘সিলখোলা বোতল’ বলে ডাকেন। নারীর বিবাহপূর্ব স্বেচ্ছা যৌনতাকে মেনে নিতে সমাজের বড়ই অসুবিধে।

অথচ নারী ধর্ষিত হলে সে আদৌ ধর্ষিত হয়েছে কিনা, তা নিয়ে কাটাছেঁড়া করা সকলের অধিকার।

আবার ধর্ষণকে যখন নারীর ‘শ্লীলতাহানি’ ধরনের অদ্ভুত নামে ডাকা হয় সংবাদপত্রে, কিংবা যৌন হেনস্থাকে বলা হয় ‘ইভ টিজিং’ তখন সেইসব ভাষার আড়ালে তার গুরুত্ব হ্রাস করার মধ্যেও নিহিত থাকে ধর্ষণ সংস্কৃতি। রেপ কালচারের প্রভাব গণমাধ্যমেও যথেষ্ট। মুম্বাই-এর শক্তি মিলের গণধর্ষিতা মেয়েটি নিজে ছিলেন সাংবাদিক। তা সত্ত্বেও, তাঁর সতীর্থরাই তাঁর বাড়িতে হানা দিয়েছিল খবর-কাগজে ধর্ষিতার রোজনামচা ছাপতে চেয়ে। ধর্ষণ হলেই ধর্ষিতা চলে আসেন আলোচনার কেন্দ্রে। তাঁর নাম ও পরিচয় জানার জন্যই মানুষের আগ্রহ৷ ধর্ষকের পরিচয় নিয়ে মানুষের অত উৎসাহ থাকে কি?

মিমে যখন সুস্তনী বালিকার ছবি দিয়ে বলা হয়, বড় হলে সে আয়েশা তাকিয়া হবে, তখন আয়েশা তাকিয়া ও শিশুকন্যা উভয়কেই বুকের সাইজ দিয়ে মেপে নেওয়াটাও ধর্ষণ সংস্কৃতি। শিশুপাঠ্য বই-এ থাকে প্রসেরপাইনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার রোমান গল্প। কিংবা বিস্ট-এর বিউটিকে জোর করে আটকে রাখার গল্প কেমন অবলীলায় শিশু মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। সেও ধর্ষণ সংস্কৃতি। নারী যেকোনও সীমারেখা লঙ্ঘন করলে, সে রাজনীতিতে অংশ নিলে বা ঠোঁটে সিগারেট ঝোলালে বা তার জামার ঝুল ছোট হলে বা তর্কে হার স্বীকার না করলে বা স্রেফ বিরুদ্ধমত পোষণ করলেই তার যৌনাঙ্গ যখন আলোচিত হয়, সেটা ধর্ষণ সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিতে প্রকৃত ধর্ষণকে উজ্জ্বল রাংতায় মুড়ে ‘প্রেম’ বলে চালিয়ে দেওয়া যায়৷

নায়িকার পিছনে তার অসম্মতি অগ্রাহ্য করে ধাওয়া করার বলিউডি ‘রোমান্টিক’ ধরনটি হল ধর্ষণ সংস্কৃতি। বলিউডের কল্যাণে নারীকে ‘চিজ’, ‘মাল’, ‘চিকনি চামেলি’, ‘তন্দুরি মুর্গী’ ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত হতে দেখতে দেখতে নারী ও পুরুষ উভয়েই বড় হয়। একদল মাতাল কিমি কাতকারকে জোর করছে নায়ক অমিতাভকে চুমু খেতে— এই আমাদের চোখে মডেল প্রেম-দৃশ্য। ধর্ষণ সংস্কৃতি তাই আমাদের চারপাশে।

সামাজিক মাধ্যমেও নারীর ছবি মর্ফ করে বা না করে, সেই ছবি চুরি করে, তা ছড়িয়ে দেওয়া যায় তার উপর ‘বেশ্যা’ পরিচয় আরোপ করে। লোকাল ট্রেনের দেওয়ালে যখন অচেনা মেয়ের নাম্বার লিখে দেওয়া হয় প্রতিশোধস্পৃহায়, তা ধর্ষণ সংস্কৃতি। জেন্টস টয়লেটে নারীর স্তন বা নিতম্বের গ্রাফিত্তি ও সঙ্গের দু-এক ছত্র রসালো বর্ণন— তাও ধর্ষণ সংস্কৃতি৷

এবং অবশ্যই ধর্ষণ সংস্কৃতি হল নারী বা প্রান্তিকের যৌনতায় ‘না’ কে হ্যাঁ বলে ধরে নেওয়া৷ যৌনতায় কনসেন্ট-এর ধারণাকে অস্বীকার করা হল ধর্ষণ সংস্কৃতির অন্যতম চরম প্রকাশ।

সাম্প্রতিক ধর্ষণগুলি নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া যদি দেখি, তাহলে দেখব সেগুলি যে নৃশংস তা নিয়ে কিন্তু কোনও মতবিরোধ নেই। অথচ ধর্ষণ সংস্কৃতি যে ভাষা, চুটকি, সামাজিক আদানপ্রদান, বিনোদনের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তা মানতে মানুষের অনাগ্রহ ভারি৷ তাঁরা ধর্ষককে এক জান্তব বহিরাগত হিসেবে দেখতে ভালোবাসেন। তাই যখন উডি অ্যালেনের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন তাঁর সৎ মেয়ে, পোলান্সকির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে ধর্ষণের, সন্দীপন-সুনীলদের যৌন অভিযানে নারীর কনসেন্টের লেশমাত্রর উল্লেখ থাকে না, যখন আকাদেমিক জগতের একের পর এক মহীরুহ যৌন নির্যাতনে অভিযুক্ত হন, সোজা কথায় আমাদের চোখে যাঁরা সুভদ্র ও বুদ্ধিজীবী, তাঁদের বিরুদ্ধে যখন যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, তখন নাগরিক সমাজ দিশেহারা বোধ করে।

Zoe Peterson এর এক বিখ্যাত সমীক্ষা অনুযায়ী কিন্তু রেপিস্ট ও নন রেপিস্টদের মধ্যে মেয়েদের সম্পর্কে মনোভাবে খুব একটা তফাত পাওয়া যাচ্ছে না৷ ধর্ষণ সংস্কৃতির এখানেই জয় ও চিরস্থায়িত্ব। এত শত ঘটনার পরেও আমরা নারীকে দেখার চোখ অপরিবর্তিত রেখেছি, যৌনতায় সম্মতির ধারণা নিয়ে নিজেদের প্রশিক্ষিত করতে চাইছি না৷ রেপ কালচার মানে এই নয় যে, আমরা সকলে নৃশংস ধর্ষণের ঘটনায় বাহবা দিচ্ছি। রেপ কালচার মানে হল, সমষ্টিগতভাবে আমরা ধর্ষণের কারণ অনুসন্ধান করছি না, সেই কারণগুলির সঙ্গে সমষ্টিগতভাবে ‘এনগেজ’ করছি না।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, পরিচালক সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা সাম্প্রতিক ধর্ষণের ঘটনাবলির পর টুইট করেছিলেন, “FEAR is the only factor which can change things radically in society and FEAR should be the new rule. The brutal sentence will set an example..” অথচ ইনিই কবীর সিং নামক চলচ্চিত্রটির নির্মাতা, যেখানে প্রেমিকার উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে নায়ক, এবং ছবিটি সেই শৌর্যকে উদযাপন করে। টক্সিক ম্যাসকুলিনিটিকে প্রেম ও শৌর্যের ককটেল সহযোগে বেচে ‘কবীর সিং’ কিন্তু বক্স অফিসে হিট করেছিল নারীবাদীদের আপত্তি সত্ত্বেও৷ এই দ্বিচারিতা শুধু ভাঙ্গার একার নয়৷ আমাদের সম্পূর্ণ সমাজের। সাংস্কৃতিকভাবে আমরা একথা মেনে নিতে আজও অপারগ যে ধর্ষক আমাদেরই মতো সাধারণ মানুষ। তাদের বন্ধু-স্বজন আছে৷ তাঁদের স্ত্রী আছে, মা আছে, বোন আছে, হয়ত আছে শিশুকন্যাও৷ তাহলে কোথায় গলদ থেকে গেল? গলদ কি আমাদের সংস্কৃতির নয়?

বাইশবর্ষীয়া মধুমিতা পান্ডে তিহার জেলে একশ কুড়িরও অধিক ধর্ষককে নিয়ে এক সমীক্ষা শুরু করেন ২০১২ সালে নির্ভয়ার ঘটনার পর৷ তিনি সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য হন এটা দেখে যে তাদের কারও মধ্যেই বড় একটা অনুশোচনা বা অনুতাপ দেখা যাচ্ছে না। অধিকাংশই তখনও মনে করেন, এক হাতে তালি বাজে না৷ মেয়েরা আগ বাড়িয়ে তাদের নাকের ডগায় ঘুরে না বেড়ালে ‘রেপড’ হত না৷ এইসব পুরুষরা, বলাই বাহুল্য, টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি বা বিষাক্ত পৌরুষের ধারণা থেকেই ভুগছেন।

মধুমিতা বলেন, “Men are learning to have false ideas about masculinity, and women are also learning to be submissive. It is happening in the same household.” এখানেই ধর্ষণের উৎস লুকিয়ে আছে বলে তিনি মনে করেন, পুরুষের উগ্র ও নারীর দুর্বল ও সর্বংসহা হওয়ার শিক্ষার মধ্যে। পান্ডে বলেন “Everyone’s out to make it look like there’s something inherently wrong with [rapists]. But they are a part of our own society. They are not aliens who’ve been brought in from another world.”

সম্পূর্ণ সমীক্ষায় একজন মাত্র মানুষকে মধুমিতা পান, যিনি কিছুটা হলেও অনুতাপে জর্জরিত৷ কয়েদি নম্বর ৪৯। এই মধ্যবয়সী এক পঞ্চমবর্ষীয়াকে ধর্ষণ করেছিল। কিন্তু তারও অনুতাপ কৃতকর্মটি নিয়ে নয়, বাচ্চা মেয়েটির ‘নষ্ট’ হয়ে যাওয়া নিয়ে। প্রায়শ্চিত্তরও এক পিতৃতান্ত্রিক উপায় সে বের করেছ। ‘ও তো আর কুমারী নেই। কে আর ওকে বিয়ে করবে? জেল থেকে ছাড়া পেলে আমিই ওকে বিয়ে করব।’ ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষিতার বিয়ে দিয়ে ধর্ষিতার সম্ভ্রম রক্ষার নজিরও আমাদের দেশে খুব কম নেই৷ ধর্ষণে যে শারীরীক-মানসিক-আত্মিক যন্ত্রণা, এক বিয়েতেই তার উপশম ঘটে যাবে, এরকম ভাবনাই হল ধর্ষণ-সংস্কৃতি৷

ধর্ষণ সংস্কৃতির ইতিহাস যদি আমরা ঘাঁটি, তাহলে দেখব যুগ যুগ ধরে বিধর্মী বা বিপক্ষ বিজিত হলে জয়ী তার নারীকে ধর্ষণ করেছে। আজও ভারতীয় সেনাবাহিনি মণিপুর বা কাশ্মিরে ধর্ষণ করে, কারণ ভূমিদখল ও নারীদখলই পৌরুষের বিজয় সূচিত করে।

সুতরাং ধর্ষণ সংস্কৃতির মূলে আছে সেই পিতৃতন্ত্রই। পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা ও আধিপত্যের সমীকরণের প্রকাশ তা। লিঙ্গবৈষম্যেই জলহাওয়াতেই তার বেড়ে ওঠা। অতঃপর অত্যাচারিত যে, তাকেই দোষারোপ করাই ধর্ষণ সংস্কৃতির দস্তুর। ধর্ষিতার আত্মগ্লানি, আত্মদোষারোপ আর নৈস্তব্ধ্যই ধর্ষণ সংস্কৃতির প্রাণবায়ু।

মনস্তাত্ত্বিকরা বলেন, ধর্ষণকালে ধর্ষিতার ব্রেন একরকম ডিসোসিয়েশনে ভোগে। তিনি ফ্রিজ করে যান ভয়ে ও আতঙ্কে, তাই প্রতিহত করা সম্ভব নাও হতে পারে। অথচ আজও পুলিশ গিয়ে অকুস্থলে ধ্বস্তাধ্বস্তির চিহ্ন খোঁজে। যথেষ্ট পরিমাণে বাধা-দানের চিহ্ন না পেলে ধর্ষণের অভিযোগ খারিজ হতে পারে। যেমন হয়েছিল মহম্মদ ফারুকির কেসে, যেখানে বলা হয়েছিল ‘দুর্বল না হ্যাঁ-ও হতে পারে।’ আমাদের এক বিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব এনএসডি-তে বক্তৃতা দিতে গেছিলেন। জিগ্যেস করা হয়েছিল, নাটকে যদি প্রযোজক অপ্রয়োজনীয় নাচ-গান ঢোকাতে চান, কেমন লাগে? তিনি বলেছিলেন, ধর্ষণে বাধাদানের উপায় না থাকলে ধর্ষিতার যেমন ধর্ষণ উপভোগ করাই উচিত, তেমনই নাচগান ঢোকাতে বাধ্য হলেও তা ভালো মনেই তিনি মেনে নেন। তিনি বিদগ্ধ, সুসংস্কৃত। অথচ তিনিও জানতেন না, ধর্ষণ উপভোগ করা অসম্ভব। কেউ যথেষ্ট প্রতিরোধ করছে না মানেই, সে ধর্ষণ উপভোগ করছে— এটা ভাবার অসংবেদনশীলতাই হল ধর্ষণ সংস্কৃতি৷

ধর্ষণ সংস্কৃতির ফলে এমনকী ধর্ষিতা নিজেও তাঁর অভিজ্ঞতাকে অনেক সময় ‘ধর্ষণ’ বলে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হন। ধর্ষণ শব্দটি তাঁর কাছে শুধু ভয়ের নয়, লজ্জারও, কলঙ্কেরও। তাই সম্মতি-ব্যতিরেকে যৌনতাকে তিনি অনেক সময়ই স্রেফ ‘জোর খাটানো’ বলেন, ‘ধর্ষণ’ নয়, বিশেষত যদি তা কোনও চেনা লোক ঘটিয়ে থাকে। এ এক অদ্ভুত ‘ডিনায়াল’।

 

ধর্ষণ সংস্কৃতি, আইন ও প্রশাসন

ধর্ষণের সংস্কৃতি নারীকে তার উপর ঘটা অপরাধের জন্য দায়ী করেই ক্ষান্ত হয় না৷ ধর্ষককে বাঁচাতে চায়, তার দোষ লঘু করে দেখতে তৎপর হয়। এই সংস্কৃতি আশা করে, নারী হয় নিজের চলাচলের স্বাধীনতা বর্জন করে, নয় আপাদমস্তক ঢেকে রেখে বা পর্দানসীন থেকে, নির্দিষ্ট আচরণ করে (বা অপর এক ধরনের আচরণ না করে) অথবা নিদেনপক্ষে ক্যারাটের প্যাঁচ ঝেড়ে ধর্ষণ আটকানোর দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করবে৷ প্রশাসনেরই যে ভূমিকা নারীকে সুরক্ষা দেওয়া, তা এই সংস্কৃতি স্বীকার করে না। ফলে ধর্ষিতা ও সম্ভাব্য শিকাররা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর পরিধি এঁকে নেন নিজেদের চারপাশে, তার মধ্যে সিঁটিয়ে বাঁচেন।

ধর্ষকদের বিচার ও শাস্তিতে গড়িমসিও ধর্ষণ সংস্কৃতির অঙ্গ। উন্নাও-এর বিধায়ক বা উন্নাওয়ের গণধর্ষণে অভিযুক্ত সেই পাঁচজন কিন্তু বিচারব্যবস্থার অস্বচ্ছতা বা গড়িমসির কারণেই বারংবার ধর্ষিতাকে বা তার পরিবারকে আক্রমণের সুযোগ পায়।

রেপ কালচারে মনে করা হয়, রেপের অভিযোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুয়ো হয়৷ ধর্ষণ সংস্কৃতিতে বিচারক ও আইনজীবীরা ‘রিয়াল রেপ’ বনাম ‘ফেইক রেপ’-এর এক বিতর্ক গড়ে তোলেন। এই রিয়াল রেপের ন্যারেটিভ খানিক এরকম: এক বলশালী, খল, অচেনা পুরুষ তাঁর শিশ্নটিকে এমন এক নারীর যোনিতে প্রবেশ করাচ্ছে, যে সামাজিক সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘ভালো মেয়ে’, যে ‘সীমানালঙ্ঘনকারী’ মেয়ে নয় কোনওমতেই৷ এই মডেলের সঙ্গে যে যে ঘটনা কোনও না কোনওভাবে মেলে না, সেটি আদৌ ধর্ষণ কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, সংশয় দেখা যায়।

ধর্ষিতা কেমন চরিত্রের, তিনি কী পরেন, কী পান করেন, কীরকম পেশায় যুক্ত, কতদিন পরে বিচার চাইতে এসেছেন, তাঁকে দেখে কতটা ‘বেচারা’ লাগছে— এসবের উপর ভিত্তি করে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বিচারকরাও স্থির করেন ধর্ষণ-অভিযোগ সত্য কিনা৷

২০১২ সালে নির্ভয়ার মৃত্যুর পর ভারতবর্ষে নারীর অধিকার নিয়ে গোটা দেশ সরব হয়ে উঠেছিল। ২০১৫ সালে নির্মিত ইন্ডিয়া’স ডটার তথ্যচিত্রে সেই ধর্ষণে অন্যতম অভিযুক্ত মুকেশ সিং বলেছিল মেয়েটি রাতে প্রেমিকের সঙ্গে বেরিয়ে নিজেই নিজের ধর্ষণ ডেকে এনেছিল৷ বলেছিল, অতটা বাধা না দিলে অত নির্মমভাবে মারতে হত না তাকে। তার উকিল মনোহর লাল একই সুরে মৃত মেয়েটি কর্তৃক সামাজিক সীমানা লঙ্ঘনের কথা বলেছিলেন৷ ভাবতে অবাক লাগে, একটি গণতান্ত্রিক দেশের সর্ব্বোচ্চ আদালতে একবিংশ শতকে এধরণের সওয়াল-জবাব চলেছিল বহু বছর!

প্রশ্ন জাগে, এসব কথা শুনে দেশ সেদিন যেভাবে ক্রোধান্বিত হয়েছিল, তেমনটাই হত কি যদি না মেয়েটিকে ধর্ষণের পর অতটা নির্মমভাবে হত্যা করা হত? রেপ কালচার মানে হল সেই সংস্কৃতি, যে সংস্কৃতির প্রিয়াঙ্কার বীভৎস দগ্ধ লাশ দেখে না ফেললে ধর্ষণ বিষয়ে টনক নড়ে না।

নির্ভয়া কাণ্ডের জেরে ২০১৩ সালের ক্রিমিনাল ল অ্যামেন্ডমেন্ট একটা বড় প্রাপ্তি, যা ভার্মা কমিটির সুপারিশকে বহুলাংশে মেনেছিল। ফেব্রুয়ারিতে অর্ডিন্যান্স পাশ, অতঃপর রাষ্ট্রপতি, লোকসভা ও রাজ্যসভার সম্মতিক্রমে নতুন আইন। এই আইন নিখুঁত নয়, তবে উন্নততর। এখানে বলা আছে, শুধু ‘vagina, anus, mouth’-এ penis এর insertion-ই ধর্ষণ নয়, তা হতে পারে আরও নানাভাবে। এখানে sexual harassment-এর সীমা বাড়ানো হয়েছে বাচিক যৌন হয়রানি, অশালীন ছবি তোলা বা জোর করে পর্ন দেখানো পর্যন্তও। এখানে স্পষ্টতই বলা হয়েছে, passion নয়, power অর্থাৎ ক্ষমতা প্রদর্শনই ধর্ষণের কারণ। এখানে চূড়ান্ত গুরুত্ব পেয়েছে consent বা সম্মতির ধারণা। Consent-কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এভাবে: ‘unequivocal agreement to engage in a particular sexual act.’ তারপরেও যে ২০১৭ সালে মহম্মদ ফারুকি সংক্রান্ত একটি পশ্চাৎপদ রায় বেরোতে পারে ভারতীয় আদালত থেকে, তা দুর্ভাগ্যের।

অবশ্য কার্যক্ষেত্রে, আজও, ২০১৩ সালের নতুন আইন অনুসারে পুলিশের বিরুদ্ধে ধর্ষণের কেস নথিভুক্ত করার ব্যাপারে গড়িমসি দেখালে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে— এই ঘোষণা সত্ত্বেও, অনেক কেস নথিভুক্ত হয় না। এমনকী বহু-আলোচিত হায়দ্রাবাদের ক্ষেত্রেও পুলিসের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অভিযোগ আছে গড়িমসির, এক থানা থেকে আরেক থানায় নিখোঁজ মেয়ের আত্মীয়স্বজনদের ঘুরিয়ে মারার।

ফাস্ট ট্র‍্যাক কোর্ট হয়েছে বটে। সেই ‘ফাস্ট ট্র‍্যাক’ কোর্টেই অগাস্ট, ২০১৬ পর্যন্ত পেন্ডিং কেস ছিল প্রায় সাড়ে তিন হাজার। এবং হ্যাঁ, নারীনির্যাতনের নথিভুক্ত কেস কমেনি, বেড়েছে। ঘটনা বেড়েছে, না পুলিশে রিপোর্টিং-এর হার— তা অবশ্য গবেষণাযোগ্য।

‘মিটু’-র পর যতজন মহিলা নিজেদের যৌন নির্যাতনের গল্প বলেছেন, ততজন অপরাধী কি জেলের ঘানি টেনেছেন? যৌন নির্যাতনে শাস্তি অবশ্যই প্রয়োজন৷ ফাঁসি বিরোধিতা করা বা এনকাউন্টার বিরোধিতা করা মানেই কিন্তু শাস্তি-বিরোধিতা নয়। বরং ফাস্ট-ট্র‍্যাক কোর্টে রোজ শুনানির মাধ্যমে ছ মাসের মধ্যে ধর্ষণ মামলার নিষ্পত্তি প্রয়োজন৷

এক হাজার কোটির নির্ভয়া ফান্ড গঠিত হয়েছিল, যা থেকে প্রতি ভিক্টিম তিন লক্ষ টাকা পাবেন। আজও সেই প্রাপ্য আদায় করতে বহু বছর কেটে যায় বা তা অনাদায়ী থাকে।

ভার্মা কমিটি ম্যারাইটাল রেপকে ধর্ষণের অন্তর্ভুক্ত করেছিল। কিন্তু বৈবাহিক ধর্ষণের অস্তিত্ব আজও মানা হয়নি। ভার্মা কমিটি বলেছিল, নির্বাচনে যেকোনও প্রার্থীর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ থাকলে সে প্রার্থী হিসেবে অযোগ্য বিবেচিত হোক। তাও হল কই? বরং উন্নাও কাণ্ডে দেখা গেল, রাজনৈতিক মদতপুষ্ট ব্যক্তিরা ধর্ষণের ব্যাপারে অকুতোভয়৷

চারবছর পরে নির্ভয়ার ধর্ষকদের ফাঁসি হয়েছিল বটে, জনসাধারণ ভেবেছিল বটে, ন্যায় নেমে এল কলিকালের পৃথিবীতে। কিন্তু তা যৌন নির্যাতন বিরোধী লড়াই-এ তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য ধাপ নয় বলেই মনে হয়। ঠিক যেমনভাবে হায়দ্রাবাদের তরুণীটির ধর্ষকদের এনকাউন্টারে খতম করে দেওয়াও ধর্ষণ প্রতিরোধে কোনও উল্লেখযোগ্য ধাপ নয়৷ এ সব হল বড়জোর ‘symptomatic treatment’।

 

প্রতিকারের পথ

এই ধর্ষণ সংস্কৃতির বিপ্রতীপ সংস্কৃতি গড়ে তোলা ছাড়া আর উপায় কী? সে পথ কঠিন, শ্রমসাধ্য। প্রথমেই কতগুলো মিথ ভাঙা প্রয়োজন।

মিথ ১: ধর্ষণের অভিযোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিথ্যা।
প্রকৃত ঘটনা: পরিসংখ্যান তা বলছে না৷ ২% মতো ঘটনা সাজানো। মিথ্যা অভিযোগের হার অন্য কেসের থেকে বেশি নয়।

মিথ ২: পুরুষের ধর্ষণ হয় না।
প্রকৃত ঘটনা: অবশ্যই হয়। পুরুষের দ্বারাই পুরুষের ধর্ষণ হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। কখনও কখনও নারীর দ্বারাও হয়, বিশেষত পুরুষ যদি নারীর থেকে বয়সে ছোট হন বা কম ক্ষমতাবান হন৷ পরিসংখ্যানের দিক থেকে দেখতে গেলে নারী কর্তৃক ধর্ষণ কম হয়, কিন্তু হয়। বরং ধর্ষণের পরে লজ্জা যেমন নারীকে তার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করতে বাধা দেয়, পুরুষের ক্ষেত্রেও বাধা দেয় তার পৌরুষের ফাঁপা ধারণা। ধর্ষিত হওয়াকে সে তার পৌরুষের বিচ্যুতি ভাবে। আবার দ্বিধা কাটিয়ে সে বলে উঠতে পারলেও অনেক সময়েই তা বিশ্বাস করা হয় না৷

মিথ ৩: অচেনা পুরুষ রেপ করে।
প্রকৃত ঘটনা: ৯০% ধর্ষণ চেনা পুরুষের দ্বারা ঘটে।

মিথ ৪: ধ্বস্তাধ্বস্তি বা প্রতিরোধের চিহ্ন নেই মানেই ধর্ষণ নয়।
প্রকৃত ঘটনা: আত্মসমর্পণ মানেই সম্মতি নয়৷ ভয় ও ভয়জনিত অসাড়তার কারণে কেউ প্রতিরোধ করল না মানেই সে ধর্ষণ উপভোগ করছে, এমন নয়৷

মিথ ৫: ভিক্টিম ফ্লার্ট করে, ছোট জামাকাপড় পরে বা নেশাসক্ত হয়ে নিজেই ধর্ষণকে আমন্ত্রণ করেছে।
প্রকৃত ঘটনা: আসলে ধরেই নেওয়া হচ্ছে পুরুষ একজন যৌনক্ষুধাসর্বস্ব ব্যক্তি যার নিজেকে সামলানোর দায় নেই৷ তাই ধর্ষিতাকেই বলা হচ্ছে নিজেকে সংশোধন করতে।

মিথ ৬: যৌনতায় কোনও একবার সম্মতি দিয়ে থাকলে তা একটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।
প্রকৃত ঘটনা: কনসেন্ট কোনও অন্ধ চুক্তি নয়৷ কনসেন্ট বারবার নিতে হয়। প্রতিবার নিতে হয়, এমনকি স্ত্রী বা প্রেমিকার থেকেও। প্রতিটি আলাদা আলাদা যৌনকার্যের জন্য নিতে হয়।

আর মিথ ভেঙে বিপ্রতীপ সংস্কৃতি গড়ে তোলার এই কাজটি পুরুষদের সাহায্য ছাড়া, পুরুষদের সদর্থক প্রশিক্ষণ ও ভূমিকা ছাড়া অসম্ভব৷ পুরুষকে কনসেন্টকে মান্য করার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাকে ‘না’ বলতে ও শুনতে শিখতে হবে। ‘হ্যাঁ’-র জন্য অপেক্ষা করা শিখতে হবে। শিখতে হবে জড়তাযুক্ত কনসেন্টও কনসেন্ট নয়, একমাত্র স্বচ্ছন্দ ও উৎসাহী সম্মতিই হল সম্মতি।

পৌরুষের ধারণার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। হিংস্রতা আর আধিপত্য দিয়ে পৌরুষ মাপলে চলবে না৷ পুরুষ হয়ে উঠতে গেলে দু চারবার ইভটিজিং করতেই হবে, বাসে ট্রামে মেয়েদের গায়ে হাত দিতেই হবে, বহুসংখ্যক মেয়েকে ‘তুলতে’-ই হবে, বেড়ে ওঠার বয়সে পারিপার্শ্বিক চাপে নিজের কাছে এমন সব অদৃশ্য চাহিদা গড়ে ওঠে পুরুষের নিজের মনে ও মননেও৷ সেই অন্ধকার থেকে তাকে বেরোতে সাহায্য করতে হবে। পৌরুষের নতুন সদর্থক সংজ্ঞা তৈরি করতে হবে। সহানুভূতি, আত্মসংবরণ, মমতা ইত্যাদিকেও পুরুষালি গুণ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

পরবর্তী প্রজন্মকে লিঙ্গসাম্যে প্রশিক্ষিত করতে হবে।

যেখানেই ‘শি ওয়াজ আস্কিং ফর ইট’ লজিক দেখা যাবে, অবশ্যই প্রতিবাদ করতে হবে৷ পুরুষ-নারী নির্বিশেষে সকলেই পিতৃতান্ত্রিক অন্ধকার পেয়েছে পুরুষানুক্রমে৷ সে অন্ধকার থেকে তাদের বের করতে হলে ধৈর্যশীল হতে হবে৷ গভীরতর শোধনের এই পথ লিঙ্গসাম্যের শিক্ষা ছাড়া অসম্ভব৷ ধর্ষণ নিয়ে সংলাপ বৃদ্ধি পেতে হবে। পিতামাতা যখন পুত্রের সঙ্গে তা নিয়ে খোলাখুলি সংলাপে যেতে পারবেন, তখনই তো শেখাতে পারবেন ধর্ষক না হয়ে ওঠার পথ।

নারীপুরুষ নির্বিশেষে অনেকেই বলছেন, ‘আমার মেয়েটার জন্য খুব ভয় পাচ্ছি।’

‘ভয় পাচ্ছি, ছেলেটা ধর্ষক না হয়ে যায়! খুব ভয় পাচ্ছি…’— ছেলের বাবা-মারা এরকম বলেছেন কি? ভাবছেন কি? স্ট্যাট দেখলে তাঁদেরও কিন্তু ভয় পাওয়ারই কথা৷ কলকাতা পুলিশের ‘ডিয়ার বয়েজ’ প্রজেক্ট ব্যর্থ হয়েছিল। ওরকম একটা প্রচেষ্টার অর্থ নাকি ছেলেদের অপমান করা! সব ছেলেদের অপরাধী দাগিয়ে দেওয়া!

শুধু কন্যাশিশুদের নয়, পুত্রশিশুদেরও রক্ষা করা কর্তব্য। বাচ্চা ছেলেটিকে ওর বাউন্ডারি চেনাতে হবে৷ শেখাতে হবে, ও ভোগ ও দখলদারি করতে জন্মায়নি। দেখাতে হবে, “পুরুষ” হয়ে ওঠা আর মানুষ হয়ে ওঠার রাস্তাগুলো কোথায় কোথায় আলাদা হয়ে যাচ্ছে। জীবনের প্রথম বছরগুলোতেই না দেখানো হলে দেরি হয়ে যাবে৷ পরিবার থেকেই এই আলোচনা শুরু হতে হবে। তারপর সংগঠনে, সামাজিক স্তরে, বিদ্যালয়ে, কলেজে, কাজের জায়গায় সেই আলোচনা ছড়িয়ে পড়তে হবে।

অন্যদিকে অত্যাচারিতর খুঁত ধরা বন্ধ করতে হবে৷ বুঝতে হবে, ধর্ষণের কার্যের দায় তাঁর কোনওমতেই নয়। তাঁর কোনও এজেন্সিই ছিল না সেখানে। তাঁর রাতে বাইরে বেরোনো বা জামার ঝুল বা মদ্যপানের কারণেই তাঁর উপর যৌন অত্যাচার করার অধিকার কারও জন্মায় না। এমনকী যৌনকর্মীরও কনসেন্ট দরকার যৌনকার্যে। টরন্টোর পুলিশকর্তা বলেছিলেন, মেয়েদের হাবভাব ও পোষাকের জন্যই নাকি ধর্ষণ হয়। তাই বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছিল স্লাট ওয়াক৷

নারীর পণ্যায়ন ও স্রেফ যৌনবস্তু হিসেবে নারীকে দেখাও বন্ধ করতে হবে। বিষমকামী পুরুষ নারীকে যৌনক্রীড়ার সময় যৌনবস্তু হিসেবে দেখতেই পারেন। মুশকিল হল, শুধু সেইটুকু দেখাতেই আটকে থাকেন তিনি। বিছানায় নারীকে যৌনসঙ্গী হিসেবে কামনা করা আর সাংস্কৃতিকভাবে তাকে যৌনসামগ্রী মাত্র ভাবার মধ্যে তফাত আছে। প্রথমটি সুস্থ যৌনতার ধাপ। দ্বিতীয়টি করতে পারলে তবেই অপরিচিত মেয়েকে টেনে নিয়ে গিয়ে, সমবেত ধর্ষণ করে, তার উচ্ছিষ্ট শরীর জ্বালিয়ে দেওয়া যায়।

যৌন নির্যাতনের প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি নিতে হবে৷ পড়াশুনো, কাজের জায়গায়, রাস্তা ঘাটে। জীবিত ধর্ষিতার প্রতি কিন্তু এমপ্যাথির যথেষ্ট অভাব দেখা যায় সমাজের, এমনকী আইনেরও।

ধর্ষণ সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা বাড়াতে হবে৷ ধর্ষণ মানে রাতে একা বেরোনো মেয়ের উপর অচেনা শক্তিশালী ভিলেনের ঝাঁপিয়ে পড়া মাত্র নয়৷ তা ঘটতে পারে নিকটজনের দ্বারাও। বিবাহের মধ্যেও। আর মেয়েদের ঠেলে অন্তঃপুরে ফেরত পাঠালেই তাই ধর্ষণ কমবে না৷

ধর্ষণের বিষয়ে ইন্টারসেকশনাল মনোভাব নিতে হবে।

জাতি-ধর্ম নির্বিশেষ, অর্থনৈতিক অবস্থা বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে, সব মেয়েদেরই ধর্ষণ হয়৷ আর ধর্ষকও আসেন সবরকম স্থানাঙ্ক থেকেই৷ যৌন অভিরুচি ভিন্ন যাদের, যেমন সমপ্রেমী বা দ্বিপ্রেমীদের, তাঁদেরও ধর্ষণ হয়। ‘কারেকটিভ রেপ’ হল এমন ধর্ষণ যার মাধ্যমে ধর্ষক নাকি সমকামী ধর্ষিতকে বিষমকামী স্বাভাবিকত্বে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন৷ অথবা যারা প্রতিবন্ধী বা আদিবাসী বা দরিদ্র বা ফুটপাথবাসী— তাঁদের সকলেরই ধর্ষণ হতে পারে৷ তাঁদের সকলের ধর্ষণই একই রকম ভয়ানক৷

নির্ভয়া বা তেলেঙ্গানার ঘটনায় দেখা গেল, মানুষ সবচেয়ে বেশি বিচলিত হয় নিজের শ্রেণির, নিজের সমকক্ষ মেয়েদের ধর্ষণে। দিল্লির জ্যোতি বা হায়দ্রাবাদের পুড়ে যাওয়া মেয়েটি শিক্ষায়-পেশায়-সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে আমাদের সমকক্ষ৷ তাই আমরা ভয় পেয়েছি। আসিফা বা উন্নাও-এর পর আমাদের সহমর্মিতা ছিল, ততটা ‘ভয়’ ছিল না৷

নারীর সার্বিক ক্ষমতায়নের জটিল প্রক্রিয়ার উপরেও জোর দিতেও হবে বৈকি। নারীর স্বাস্থ্য, নারীর শিক্ষা, নারীর সম্পত্তিতে অধিকার, স্বাধীন সম্পর্কের অধিকার, প্রয়োজনে সম্পর্ক-ভঙ্গের অধিকার ইত্যাদি নানাবিধ বিষয়ের সঙ্গে ধর্ষণ সংস্কৃতি জড়িত।

২০০০ সালে প্রকাশিত ‘Women, Gender and the State’ বইতে সন্ধ্যা আর্য বলেন, আশির দশকের আইনি পরিবর্তনসমূহ ভারতীয় নারীর সামাজিক অবস্থান বদলাতে আদৌ সাহায্য করেনি। বরং আইন স্বয়ং নারীকে সহনাগরিক, সমনাগরিকের মর্যাদা না দিয়ে তাকে ‘পারিবারিক মর্যাদা’, ‘মেয়ে-মা-বোন’, ‘পরনির্ভরশীল’ ইত্যাদি পিতৃতান্ত্রিক রেটরিকে বন্দি করেছে। প্রকারান্তরে, আইন-ই ব্যবহারিক ক্ষেত্রে ‘খারাপ মেয়ে/ভালো মেয়ে’ বাইনারি তৈরি করেছে, ধরে নিয়েছে— ‘সুরক্ষা’ দরকার শুধু পিতৃতান্ত্রিক পরিভাষা অনুযায়ী ‘ভালো মেয়েদের’। তদুপরি ছিল এবং আছে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা, দুর্নীতি, নির্যাতিতর অজ্ঞতা— যা এমনকি প্রচলিত অসম্পূর্ণ আইনকেও বহুলাংশে ভোঁতা করে রেখেছিল।

শুধু ফাঁসি ও ক্রিনিমাল ল-ই আমাদের মাথাব্যথার কারণ না হোক। ভাবতে হবে সিভিল ল নিয়েও— ভাবতে হবে সিভিল ল কীভাবে নারীর ক্ষমতায়নে সাহায্য করতে পারে— যাতে নারীর শিক্ষার অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, কাজের অধিকার ইত্যাদি নিশ্চিত হয়। তবেই না সে পূর্ণ শক্তিতে ক্রিমিনাল ল-কে কাজে লাগিয়ে নিজের বিরুদ্ধে ঘটতে থাকা হিংসাকে প্রতিহত করতে পারবে!

সার্ভাইভারকে বিশ্বাস করতে হবে। এও ধর্ষণ সংস্কৃতিকে রোখার এক প্রথামিক শর্ত৷ ‘মিটু’ নামক আন্দোলনে যখন শত শত ধর্ষিতা সোচ্চার হন, তখন প্রাথমিকভাবে তাঁদের অবিশ্বাস করা হয়, তাঁদের সমালোচনা হয়৷ ভিক্টিমের প্রতি এই সমবেত অবিশ্বাসও ধর্ষণ সংস্কৃতি। ধর্ষিতা যদি তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে অবিশ্বাস আর সন্দেহই পান, তাহলে দুটি বিষয় ঘটে। ধর্ষিতার ভিক্টিমহুড তাতে দীর্ঘায়িত হয়। দুই, আরও অনেক ধর্ষিতা মুখ খোলা থেকে পিছিয়ে আসেন।

ধর্ষণ নিয়ে মজার পাঞ্চলাইন হয় না৷ যে রসবোধ যৌন হেনস্থাকে স্বাভাবিকত্ব দেয় তা বর্জন করাই ভালো।

বাইস্ট্যান্ডার হিসেবে দায়িত্বশীল হতে হবে৷ মহিলার ধর্ষণ বা যৌন হেনস্থা কিন্তু সকলের চোখের সামনেই আকছার ঘটে৷ দেখেও না দেখার ভান না করে প্রতিবাদ করতে হবে৷ লিঞ্চিং-এর এই দেশে ভিড় বাসে যৌন হেনস্থা করার সময় তো কেউ গণপিটুনির ভয়ে ভীত হয় না! কারণ সকলেই জানে, কেউ প্রতিবাদ করবে না৷ তাই ধর্ষণ ঘটার উপক্রম হলে বা ধর্ষণ ঘটে গেলে, ধর্ষিতার পাশে দাঁড়াতে হবে।

ব্যক্তি ধর্ষক একটা নারীবিদ্বেষী সমাজের মুখপাত্র মাত্র। সে শিং-শ্বদন্ত বিশিষ্ট ‘অপর’ হলে লড়াইটা অনেক সোজা হত। কিন্তু বাস্তবে লড়াইটা সোজা নয়, তাই ধর্ষণের ন্যারেটিভের ক্লোজার আসে না ব্যক্তি ধর্ষকের এনাকাউন্টারে বা ফাঁসিতে। এমনকী হিন্দু শাস্ত্রেও যে ‘পশু বলিদান’-এর কথা আছে, তাও ‘অন্তরের পশু’-র বলিদানেরই রূপকমাত্র।

লড়াইটা সোজা নয়, কারণ এ লড়াই নিজের বিরুদ্ধে, নিজের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। ধর্ষক-হত্যার মাধ্যমে ‘ন্যায়’ প্রতিষ্ঠার গালগল্পে ভোলা কি উচিত হবে?

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2039 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...