ক্যাব— আগুনে জ্বলছে অসম

সুমনা রহমান চৌধুরী 

 

অসমের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ইন্টারনেট বন্ধ ১১ই ডিসেম্বর (বুধবার) রাত থেকে। বরাক উপত্যকায় ১২ তারিখ (বৃহস্পতিবার) বিকেল থেকে। ১৪৪ ধারা জারি সমগ্র আসামে। পুলিশ, র‍্যাফ বাহিনি জায়গায় জায়গায় মোতায়েন। অসম নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের আগুনে জ্বলছে। এই মুহূর্তে গুয়াহাটিসহ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার অবস্থা ভয়ঙ্কর। স্থানে স্থানে আন্দোলনকারী জনগণের উপর পুলিশ গুলি ছুঁড়ছে, কখনও বা শূন্যে।

ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সমস্ত ছাত্রছাত্রী, শিল্পী, সাধারণ মানুষ সান্ধ্য আইন তোয়াক্কা না করে রাস্তায় নেমেছেন। গুয়াহাটির লাচিতনগরে আন্দোলনরত অবস্থায় পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়েছে দীপাঞ্জন দাস নামে সৈনিক ভবনের এক কর্মচারীর। গণেশগুড়িতে উত্তেজিত জনতার পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়েছে। গুয়াহাটির হাতিগাঁওয়ে দুটি স্থানে পুলিশ গুলি চালিয়েছে। একজন আন্দোলনকারীর ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছে, রগিন মেধী, নাজমা বেগম, ইমতিয়াজ আহমেদ সহ ছয়জন আহত হয়েছেন। রুক্মিনীগাঁওয়ে পুলিশের গুলিতে একজন আন্দোলনকারীর ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছে। বশিষ্ট চারিআলিতে পুলিশের গুলিচালনাতে মৃত্যু হয়েছে একজনের। মাজুলিতে উত্তেজিত জনতার আক্রমনের শিকার হয়েছেন প্রাগ নিউজের সাংবাদিক পুলক শর্মা। মঙ্গলদৈ-এ পুলিশ গুলি চালিয়েছে। মানুষের কানে, গালে গুলির আঘাত লেগেছে। আন্দোলনকারী জনগণকে ছত্রভঙ্গ করতে বেধড়ক মেরেছে পুলিশ, র‍্যাফ, সেনা। এসএফআই-এর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কয়েকজনের খোঁজ পাওয়া যায়নি এখনও।

কিছুক্ষণ আগে গুয়াহাটির খ্রিস্টানবস্তিতে পুলিশের ডিজিপির কনভয়ে লোহার অস্ত্র, পাথর নিয়ে আন্দোলনকারী জনতা আক্রমণ চালিয়েছে। দুজন পুলিশকর্মী গুরুতর আহত অবস্থায় কাছের অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। পুলিশের তিনটে কনভয়েই আক্রমণ হয়েছে। পুলিশ শূন্যে গুলি ছোঁড়ে। মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন থেকে শুরু করে বিধায়ক আঙুরলতা ডেকা সহ অন্যান্য বিজেপি বিধায়ক, সাংসদ, নেতাদের বাড়িতে উত্তেজিত জনতা ঘেরাও করেছে।

আরএসএস-এর অনেকগুলো অফিস ভাঙচুর করা হয় আজ সারাদিনে। বিজেপি দল ত্যাগ করেছেন যতীন বরা সহ অনেক শিল্পী, বিজেপি নেতা, বিধায়ক। সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে আপাতত রাজ্যে ইন্টারনেট বন্ধ থাকবে আগামী শনিবার অব্দি।

ব্যাহত রাজ্যের রেলপরিষেবাও। ২৪টি যাত্রীবাহী ট্রেন বাতিল। ২২ ডিসেম্বর থেকে গুয়াহাটি, কামরূপ, শিবসাগর, ডিব্রুগড়, হোজাই, নগাঁও, শোনিতপুর, তিনসুকিয়া সহ বেশ কয়েকটি জেলার সরকারি, বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশ জারি হয়েছে সরকারিভাবে। ইউনিফাইড কমান্ডোর বিশেষ বৈঠক হয় আজ রাতে। রাজ্যের আইন, প্রশাসনের ভার সেনার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। কংগ্রেস রাজ্যের এহেন পরিস্থিতিতে অসম বিধানসভায় বিশেষ অধিবেশনের দাবি জানিয়েছে। এদিকে আজ সকাল ৬টা থেকে ‘আসু’র গণঅনশন কার্যসূচি। সহযোগিতায় জুবিন গর্গ-সহ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সব শিল্পী কলাকুশলী, ছাত্রছাত্রী, সাধারণ মানুষ। যদিও অনির্দিষ্টকালের জন্যে সান্ধ্য আইন জারি রয়েছে। সেনার হাতে রাজ্য।

বিজেপি সরকার ছ-বছরে আর কিছু করতে পারুক আর নাই পারুক, সমগ্র অসমের বুকে ষাট, সত্তর, আশির দশকের পুরোনো ঘা-গুলি খুঁচিয়ে দ্বিগুণভাবে ফিরিয়ে আনতে পেরেছে। অহমিয়া জনগণের তীব্র ক্ষোভ আর হিংসার আঁচে বরাক উপত্যকার ভাষিক সংখ্যালঘুরা, বাঙালি হিন্দু-মুসলমানরা পুড়তে চলেছেন। আর এবারে শুধু ভাষিক হিংসাই চলবে না, পাশাপাশি ধর্মীয় হিংসা, দাঙ্গায় অসম নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে।

ক্যাবের নামে কয়েক দশক ধরে অসমে চলমান অসমিয়া-বাঙালি ভাষিক সঙ্ঘাতকে আরও উসকে দিয়ে সমগ্র অসমে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করল বিজেপি। এতকাল ভাষিক অস্তিত্বের লড়াই করছিল অসমের সংখ্যালঘু বাঙালি হিন্দু-মুসলমানরা। বিজেপি সরকার সুচতুরভাবে সেখানে ধর্মীয় মেরুকরণ ঢুকিয়ে দিয়েছে। সমস্ত অসমকে তিনভাগে ভাগ করে মাননীয় মোদিজি সম্রাট নিরোর মতো বেহালা বাজাচ্ছেন। গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সারা রাজ্যে। মোদিজি এবং অসমের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল অহমিয়া জনগণের উদ্দেশ্যে বার্তা দিচ্ছেন— সরকারকে ভুল না বোঝার জন্য। অহমিয়া জনগণের ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, রক্ষা এবং সংরক্ষণ করতে কেন্দ্র সরকার এবং রাজ্য সরকার নাকি বদ্ধপরিকর।

আমরা জানি এবং দেখেছিও বিজেপি সরকারকে অসম চুক্তির ৬ নং ধারা বিলোপ না করে রূপায়ণের লক্ষ্যে এগোতে। আমরা দেখেছি এনআরসি আবেদনের সময়ও OI (Original Inhabitant) বলে অসমিয়াদের চিহ্নিত করা হয়েছিল। কমিটি বানানো হয়েছে। খিলঞ্জিয়া বা Original Inhabitant বলে অসম চুক্তিতে যাদের কথা বলা হচ্ছে তাদের একশোভাগ রিজার্ভেশন দিতে হবে সর্বক্ষেত্রে। এই ইস্যুতে বিল পাস করাতে হবে। অহমিয়ারাই অসমের আদি নিবাসী, ভূমিপুত্র, খিলঞ্জিয়া। অসম তাদেরই। বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী হিন্দু-মুসলমানদের নাম এনআরসি তালিকায় থাকলেও এই ছয় নং ধারা অনুযায়ী তাঁরা অসমের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে পরিগণিত হবেন। কদিন আগে অমিত শাহ বলেও দিয়েছেন অসমের সরকারি ভাষা, অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ অহমিয়া। মানেটা এই, বাংলা, বড়ো এসব ভাষা যত রক্তক্ষয়ী আন্দোলন করেই সরকারি ভাষার স্বীকৃতি লাভ করুক না কেন, তা ছেটে ফেলা হবে। ক্যাব-বিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি আসু নেতা সমুজ্জ্বল ভট্টাচার্য-সহ অন্যান্য অহমিয়া জাতীয়তাবাদী নেতারাও দাবি জানাচ্ছেন, “সমস্ত ভারতবর্ষের মধ্যে এই একটি রাজ্যেই অহমিয়ারা বাস করেন। ভাষার ভিত্তিতে এই রাজ্য স্থাপন হয়েছে। অসম অহমিয়াদের। তাই অহমিয়াকে সরকারি ভাষা ঘোষণা করার পাশাপাশি অবিলম্বে অসম চুক্তির ৬ নং ধারার বাস্তবায়ন করতে হবে।”

এখানেই প্রশ্ন আসে— তাহলে ভাষিক সংখ্যালঘু, আরও স্পষ্ট করে বললে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানদের কী হবে??

তাহলে ক্যাবে যে “হিন্দু” সবাই সুরক্ষিত বলা হচ্ছে সেটা কী? ক্যাব কি বরাকের হিন্দু বাঙালির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না? এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে অসম বাইরের জনগণের প্রথমেই দুটো জিনিস বোঝা প্রয়োজন।

অসমের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব বিলের বিরোধীদের তিনটে দল বা তিনটে অবস্থান—

১) উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদীরা। বর্তমানে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় যারা ক্যাব-বিরোধী আন্দোলন করছেন। পঞ্চাশের দশক থেকেই এরা বাঙালি-বিরোধী, আরও স্পষ্ট করে বললে বরাক-বিরোধী। ষাটের দশক থেকে এদের নেতৃত্বেই অসমে শুরু হয় ‘বঙ্গালী খেদাও’ আন্দোলন। এরাই প্রথম স্লোগান তোলে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা অসম দখল করে নিচ্ছে। তাই এদের অসম থেকে বের করে দিতে হবে। কালক্রমে বাংলাভাষী মানেই অসমে বহিরাগত, তার সঙ্গে দাড়ি-তকি-পাঞ্জাবি পরিহিত হলে তো আর কথাই নেই, “কেলা বাংলাদেশি, গেদা”— এটাই সামাজিক তত্ত্ব হিসেবে সমগ্র অহমিয়া সমাজে গৃহীত হয়। এবং অসমের সমস্ত ইতিহাসকে অস্বীকার করে এদের সংগঠন “আসু” তৎকালীন সময়ে হিসেব দেয় অসমে ৯০ লক্ষ বিদেশি ঘাঁটি গেড়েছে, যার মধ্যে ৫০ লক্ষ বাঙালি হিন্দু এবং ৪০ লক্ষ চর অঞ্চলের নব্য-অহমিয়ারা বা পূর্ববঙ্গীয় মূলের মিঞা মুসলমানরা। এবারে সিটিজেনশিপ বিল বা ক্যাব নিয়ে এদের প্রকাশ্য বিরোধিতার কারণও তাই। অতীত থেকে বর্তমান— এরাই এনআরসি-র দাবি জানিয়েছিল বাংলাভাষী হিন্দু-মুসলমান তাড়াতে। পরবর্তীকালে তাতে বিজেপির উদ্দেশ্য বিধেয় কীভাবে এসে একাত্ম হয়ে যায় সেটা অন্য বিষয়, অন্য ব্যাখ্যা। এবারে তাদের আশঙ্কা এই বিল এসে গেলে অসম চুক্তি, আসু আন্দোলন, এতদিনকার সব হিসেব জলে গেল! তাই অহমিয়া হিন্দু-মুসলমান সব একযোগে ক্যাবের বিরোধী।

২) বরাক উপত্যকার কিছু মুসলমান সংগঠন এবং সাধারণ মুসলমান জনগণ। কারণ তাদের মতে নাগরিকত্ব বিল যেসব হিন্দুদের নাম এনআরসি তালিকায় আসেনি, শুধুমাত্র তাদের সুরক্ষা দেবে। কিন্তু বাস্তবে তো অনেক প্রান্তিক গরিব মুসলমান মানুষের নামও এনআরসি তালিকায় আসেনি! তারা কোথায় যাবে? সুতরাং তারা ভয় পাচ্ছে সরকার এই বিল আনলে মুসলমান জনগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে বৈষম্য করা হবে, হয়তো তাদেরকে দেশও ছাড়তে হতে পারে বা আজীবন ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকতে হতে পারে। যেকোনও দেশের সংখ্যালঘু জনগণের মতো একই ভয় এরাও পাচ্ছে।

৩) বরাক উপত্যকা এবং ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বিভিন্ন মানবতাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ অসমের হিন্দু-মুসলমান জনগণ। কারণ তাদের মতে ক্যাব আমাদের দেশের সংবিধানের মূল কাঠামোকে সরাসরি আঘাত করছে।

কোনও গণতান্ত্রিক দেশ, যে দেশ সংবিধানের উপর ভিত্তি করে পরিচালনা করা হয়, সেখানে ধর্মের ভিত্তিতে এইভাবে নাগরিকত্ব প্রদান করা যায় না। এবং এই বিল হিন্দুদের সুরক্ষার স্লোগান আউড়ে আনা হলেও বাস্তবে

হিন্দু বাঙালিরা আদৌ এই বিলে সুরক্ষিত নন। এদের দাবি “নো এনআরসি, নো ক্যাব”। সরকার ১৯ লক্ষ এনআরসি-ছুট নাগরিক এবং ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক নাগরিক— সবাইকে নিঃশর্ত নাগরিকত্ব প্রদান করুক।

ক্যাবের পক্ষের দলও অসমে দুটো—

১) বরাক উপত্যকার সাধারণ হিন্দু জনসাধারণ, বিজেপি যাদের এতদিন থেকে বুঝিয়েছে “ক্যাব হিন্দুদের সুরক্ষাকবচ, মুসলমানদের জন্যে বাঁশ”। ক্যাব বিল পাশ হওয়ার পর এরা বাজিও পুড়িয়েছিল।

২) উগ্র হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট দলগুলো। নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থের জন্যে তারা ক্যাব সাপোর্ট করছে, ক্যাব বিল এনেছে।

এবারে ক্যাব (CAB) কেন সংবিধান-বিরোধী সে কথার উত্তরে বলা যায়—

কারণ এই বিল সংবিধানের ধারা ১৪ এবং ধারা ২১-এর সরাসরি উলঙ্ঘন। কোনও গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র শুধুমাত্র ধর্মের উপর ভিত্তি করে নাগরিকত্ব প্রদান করতে পারে না। যেখানে সংবিধান শুরুই হয়েছে “উই দ্য পিপল অফ ইন্ডিয়া” বলে! এবারে কেউ বলতেই পারেন যে ১৯৭৬ সালে ৪২-তম অ্যামেন্ডমেন্টে “সেকুলার” শব্দ সংবিধানে যোগ করা হয়েছে। তার আগে ভারতবর্ষ সেকুলার দেশ ছিল না। তাদের ভারতবর্ষের নাগরিক হিসেবে ছোট্ট একটা তথ্য শুধু জেনে রাখা প্রয়োজন যে একবার অ্যামেন্ডমেন্ট হয়ে গেলে তারপর ওটাই সংবিধান। আইন।

আগে কী ছিল, আর পরে কী হয়েছে, ওসব ইমোশনাল কথাবার্তা হতেই পারে, তবে তা আইনত গ্রহণযোগ্য কথা নয়। এবং ক্যাব সংবিধানের প্রিএম্বলে উল্লেখিত “সেকুলার” শব্দ তো উলঙ্ঘন তো করেছেই সঙ্গে সংবিধানের ধারা ১৪ থেকে যে রাইট টু ইক্যুলিটির কথা বলা হয়েছে, সেই ধারাগুলোও উলঙ্ঘন করেছে।

ক্যাব (CAB) কেন “হিন্দু”দের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ? কারণ—

১) নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিলে (CAB) বলা হয়েছে, “২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বরের আগে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে প্রবেশকারী হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি এবং ক্রিশ্চানরা ভারতে বসবাস করতে পারবেন।

এঁরা মাত্র ৬ বছর ভারতে থাকলেই নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারবেন।”

অর্থাৎ সরকার বলছে ‘কেউ হিন্দু হলে এবং এনআরসি’র ফলে নাগরিকত্ব হারালে, তার কোনও চিন্তা নেই, ক্যাব বিলের মাধ্যমে ফিরিয়ে দেওয়া হবে তার ‘নাগরিকত্ব’। সাধারণ চোখে কথাটা খুবই সুন্দর, সহজ সরল এবং আশাদায়ক।

কিন্তু কীভাবে সেই নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে? প্রক্রিয়াটা কি? এনআরসি-ছুট মানুষ ক্যাব বিলের ভিত্তিতে নাগরিকত্বের আবেদন করবেন। অর্থাৎ কিনা প্রথমেই তাঁদের স্বীকার করতে হবে যে তাঁরা শরাণার্থী এবং তাঁরা ভারতবর্ষের নাগরিকত্ব চান! মানে তারা এই দেশের নাগরিকই নন। বাংলাদেশ, পাকিস্তান কিংবা আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় হিংসার কারণে তারা এই দেশে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন। এর মানেটা এই, অ্যাদ্দিন ধরে যেসব এনআরসি-ছুট মানুষ দাবি করছিলেন তাঁরা ভারতীয়, বাংলাদেশ থেকে আসেননি, এখানেই তাঁদের জন্ম-কর্ম-জীবিকা-জমি-বাড়ি এবং এখনও আইনের দরজা তাদের সামনে খোলা ছিল নিজেদের দেশের নাগরিক প্রমাণ করার, ক্যাবের জন্যে তারা স্বঘোষিত বিদেশি হবেন। এনআরসি-র জটিল নিয়ম বা কাগজপত্রের হেরফেরের জন্যে যেসব ভারতীয় নাগরিকের নাম আসেনি, তাদের জন্যেও একই নিয়ম। এনআরসির কল্যাণে বেশিরভাগ পরিবারেই পরিবারে দুজনের নাম এসেছে, একজনের নাম আসেনি, অথবা একজনের নাম এসেছে বাকিদের আসেনি, ছেলের নাম আছে, মেয়ের নাম নেই, মেয়ের নাম আছে, মায়ের নাম নেই। এদের ক্ষেত্রেও একই পরিবারের যার নাম আসেনি সে শরণার্থী, কিন্তু যার নাম এসেছে সে ভারতীয় নাগরিক থাকবে!! আইনের কাছে এখনও এর কোনও সদুত্তর নেই!

যে হিন্দু নাগরিকরা এনআরসিছুট হয়েছেন, তাঁরা এই দেশে বাড়ি গাড়ি জমিজমা চাকরিবাকরি ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স যা যা জমিয়েছিলেন সব সরকারের ঘরে বাজেয়াপ্ত হবে, অথবা অন্যরা লুটেপুটে খাবে। কারণ, তাঁরা তো এই দেশের নাগরিকই নন! তাঁরা নাগরিকত্বের আবেদনের পর সেটা মঞ্জুর হলে তখনই নাগরিকের সুযোগসুবিধা ভোগ করতে পারবেন! আবেদন মঞ্জুরের আগে এদেরও ঠাঁই হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে। এবং বিল অনুযায়ী কেউ কেউ নাগরিকত্ব পেলেও, তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে পরিগণিত হবেন। অবশ্য দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক শুধু এঁরাই নন, অসমের সমস্ত বাঙালি, যাঁদের নাম এনআরসিতে এসেছে, তারাও হবেন। কীভাবে? আসাম চুক্তির ৬ নং ধারা অনুযায়ী শুধু অহমিয়ারাই অসমের প্রথম শ্রেণির নাগরিক হিসেবে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে।

২) নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিল (CAB) অনুসারে কাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে? পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে যেসব হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি এবং ক্রিশ্চানরা ধর্মীয় হিংসার শিকার হয়ে এদেশে এসেছেন। এবং ৬ বছর ভারতে থাকলেই এরা ‘নাগরিকত্বের আবেদন’ করতে পারবেন। এবারে ধর্মীয় হিংসার শিকার হয়েছেন একথার প্রমাণও ‘আবেদন’-এর সঙ্গে দাখিল করতে হবে। কোনও হিন্দু বাঙালি যিনি কিনা বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে এদেশে এসেছেন আবার সেই দেশে ফেরত গিয়ে সন্ত্রাসের প্রমাণ আনতে পারবেন? সাক্ষীসাবুদ আনতে পারবেন? তারা কি এফআইআর করতে পেরেছিলেন ওইসময় থানায়? যদি করেও থাকেন কেউ কেউ, সেই এফআইআরের কপিখানা কি বর্তমানে পাওয়া যাবে? সর্বোপরি, এনআরসির বলি এই চূড়ান্ত গরিব প্রান্তিক মানুষগুলোর অর্থনৈতিক ক্ষমতা আছে কি আরেক দেশে গিয়ে কাগজপত্র বের করার? উত্তর হল না। কোনও দেশ কি কখনও স্বীকার করবে “জ্বী হুজুর, এই মানুষগুলো আমার দেশে ধর্মীয় হিংসার শিকার হয়ে আপনাদের দেশে গেছে, দয়া করে এদের নাগরিকত্ব দিন”? না। পৃথিবীর কোনও দেশ এই স্বীকারোক্তি দেবে না।

৩) এবারে ধরা যাক কোনও মানুষ সেই হিংসার প্রমাণ দিলেন এনে, তাহলেও কি তিনি সরাসরি নাগরিক হয়ে যাবেন এই দেশের?? না। তাকে প্রথমে আবেদন করতে হবে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তাকে কাগজপত্র সব দাখিল করতে হবে। সে যে ঘরে, যে জমিতে আছে, সেখানে থাকারও অধিকার থাকবে না তার! কারণ সে তো এখনও এই দেশের নাগরিক নয়!! কোনও সুযোগ-সুবিধাই সে নাগরিক না হওয়া অব্দি পাবে না। অপেক্ষা করতে হবে সেই আবেদন মঞ্জুর হওয়ার জন্য। অফিসের চক্কর কাটতে হবে। সেই অপেক্ষামান অবস্থায় সে কোনও চাকরি, পড়াশোনা, জমি ক্রয়-বিক্রয় কিছুই করতে পারবে না। কারণ সে তো ভারতীয় নাগরিকই নয়!

ক্যাব হিন্দু-মুসলমান কাউকেই সুরক্ষা দিতে পারবে না। এই বিল বিজেপির জুমলাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। অহমিয়াদের বলছে তাদের সুরক্ষা দেবে, বাঙালি হিন্দুদের বলছে তাদের। আসলে এইসব করে ৬ বছরে দেশকে গাড্ডায় নিয়ে যাওয়ার উপর পর্দা ঢালার বন্দোবস্ত করা হচ্ছে। যাঁরা হিংসার প্রমাণ আনতে পারবেন না, বা যাঁরা নাগরিকত্বের আবেদন করবেন তাদেরও নিয়তি থাকবে একটাই— ডিটেনশন ক্যাম্পে পচে মরা। রাষ্ট্রহীন হয়ে মরণ না হওয়া অব্দি মৃতের মতো বেঁচে থাকা। মুসলমানদেরও তাই হবে।

ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকা মানুষগুলির পরিচয় কী হবে? দেশহীন নাগরিক। তাদের কোনও সরকারি কাজ পাওয়ার বা কোনও স্কিমে যুক্ত হওয়ার অধিকার থাকবে না। থাকবে না রেশন কার্ড, জবকার্ডও। রিক্সা বা ঠেলা চালানোরও লাইসেন্স পাবেন না। তাহলে তারা খাবে কীভাবে? দিনমজুরি করে। তাদেরকে কি একজন ভারতীয় নাগরিক দিনমজুরের সমান মজুরি দেওয়া হবে? না। কারণ শ্রম আইন তো শুধুমাত্র দেশের নাগরিকদের জন্যে প্রযোজ্য, দেশহীনদের জন্যে মোটেও নয়!! ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকা মহিলা, শিশুদের অবস্থা আরও খারাপ হবে। তাদের পাচার করা থেকে শুরু করে দেহব্যবসা, কম মজুরির শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করা হবে। ৬০, ৮৪-র অসমকে মনে আছে তো? সেই রক্তাক্ত, ভয়াবহ দিনগুলো ফেরত না চাইলে সব বাঙালি একজোট হোন, এনআরসি ভেস্তে দিন। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার অহমিয়া জনজাতি ক্যাব-বিরোধী আন্দোলন করে এই কদিনে দেখিয়ে দিয়েছে ভাষার অসমের ভাষিক সঙ্ঘাতকে কাজে লাগিয়ে, অসম চুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিজেপির প্রথম থেকেই লক্ষ্য ছিল এনআরসির মাধ্যমে সস্তায় শ্রমিক সৃষ্টি করে দেশি-বিদেশি পুঁজির হাত শক্ত করা। সেইজন্যেই সারা দেশজুড়ে তা কার্যকর করার প্ল্যান করা হচ্ছে। অসম ছিল এই পরীক্ষানিরীক্ষার ল্যাবরেটোরি। পরীক্ষা শেষ। রেজাল্ট ২০ লক্ষ মানুষ বিদেশি। সারা দেশে তবে ক-লক্ষ? বা ক-কোটি? নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিল একটি সাময়িক জুমলা মাত্র। বিশ্বাস করতে বলা দেশের ৭৫ শতাংশ জনগণকে যে তোমরা থাকছ! বিশ্বাসভঙ্গ তো শুরুই হয়েছে ২০১৫ থেকে! আদতে ৭৫ শতাংশ ও ২৫ শতাংশ সাধারণ জনগণের “কোথাও কেউ নেই”, কোনওদিন ছিলও না।

তাই কোনও ক্যাব (CAB) নয়, দাবি উঠুক “১৯ লক্ষ এনআরসি-ছুট নাগরিক এবং ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি নাগরিকদের নিঃশর্ত নাগরিকত্ব”। দাবি উঠুক “কাগজের জাঁতাকলে পিষে আর কোনও জনগণকে মারা চলবে না”। দাবি উঠুক “কোনও দুলালচন্দ্র পাল-রা আর ডিটেনশন ক্যাম্পে মরবে না, মরার মতো বেঁচে থাকবে না”। দাবি উঠুক “নো এনআরসি, নো ক্যাব”। তবেই বাঁচতে পারবেন। নাহলে যত ভাগ হবেন, তত মরণফাঁদে আটকাবেন। ভাষা আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছিল সংস্কৃতি কৃষ্টি রক্ষার জন্যে কীভাবে এক হয়ে আন্দোলন করতে হয়, দাবি আদায় করতে হয়! বরাক উপত্যকার বাঙালিরা হিন্দু-মুসলমানে ভাগ হওয়া বন্ধ করে নিজের মুখের জবান রক্ষার জন্যে, ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষার জন্যে, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে এক হয়ে আবার আন্দোলনে নামুন এইবারে। মাথার উপর ৬ নং ধারা ঝুলছে, বাঁচতে চাইলে এক হোন। আর মরতে চাইলে এই দুঃসময়েও সাম্প্রদায়িক উস্কানির ফাঁদে পড়ে থাকুন। চয়েজ ইজ ইয়োর্স…!

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2039 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...