সিএবি আর এনআরসি-র আগুন যার তুলনায় নেহাত পোষ্য

সুদীপ চক্রবর্তী

 

মূল লেখাটি Live Mint ওয়েব পোর্টালে ১২ ডিসেম্বর, ২০১৯-এ প্রকাশিত ও লেখকের অনুমতিক্রমে পুনঃপ্রকাশ করা হল। চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর জন্য লেখাটি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন সত্যব্রত ঘোষ

গরিষ্ঠবাদীদের রাজনৈতিক জয় উদযাপনের পর বিজেপি পরিচালিত সরকার যে অসন্তোষ আর হিংসার পূর্বানুক্রম নতুন বছরের জন্য রেখে যাচ্ছে, তা জিইয়ে থাকবে আরও বহু বছর সন্দেহ নেই। সিটিজেন (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০১৯ হয়তো শীঘ্র সিটিজেন (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-এ পরিণত হবে।

জাতীয়তাভিত্তিক অ্যাজেন্ডাগুলিকে যতই ধার্মিকতা আর রাজনৈতিক গরিষ্ঠতাবাদ দিয়ে চালনা করা হোক না কেন, আমরা নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে গিয়ে মানুষের সুরক্ষা আর অনিশ্চয়তার নির্দিষ্ট কারণগুলিকে বিশ্লেষণ করব। এবং পূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের ভৌগোলিক অঞ্চল, যা বাংলাদেশের পরিধি ছুঁয়ে নিজের বিশালতার মাঝে বহুজাতি, বহুভাষী এবং বহুধার্মিক মানুষদের সমাহারে বিস্ময় জাগায়, যেখানে জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণ (এনআরসি) এবং নাগরিক সংশোধন বিল (সিএবি) সংক্রান্ত বিক্ষোভের কেন্দ্রভূমি— তা নিয়ে আমাদের নির্দিষ্ট চিন্তা ভাবনা প্রকাশ করব।

দেশান্তর, অথবা বেআইনি দেশান্তরের কথাই ধরা যাক। যা এনআরসি এবং সিএবি-র মূলে রয়েছে। এগুলিতে যথেষ্ট অসঙ্গতি এবং সাংবিধানিক জটিলতা রয়েছে। তাছাড়া ২০২১ সালে অসম এবং পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের বৃহত্তর প্রস্তুতিপর্বের জন্য রাজনৈতিক উপসিদ্ধান্তগুলিও কম নেই। সেগুলিকে আপাতত আলোচনার বাইরে রেখে দেওয়া যাক।

আমাদের মনে রাখতে হবে সমগ্র অঞ্চলে দেশান্তরিত মানুষদের উত্তর-পূর্ব ভারতে বসবাস করা নিয়ে সেখানকার অধিবাসীদের অসন্তোষ বহুদিনের। বাংলাদেশ থেকেই নয়, মূল ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে জোর করে মানুষদের অসমে এনে চা-বাগানের শ্রমিক বানানোর ঔপনিবেশিক প্রথা ছাড়াও দেশবিভাজন এবং ধর্মীয় কারণে নিপীড়িতরা এখানে আসবার ফলে স্থানীয়দের গাত্রদাহ বাড়তে থাকে— অগ্নিপ্রদায়ী ভাষণ আর হিংসায় ইন্ধন দেয়।

চিন্তার কারণ আছে। অনেকগুলি উদাহরণের মধ্যে একটির কথা বলা যাক। ২০১৪-র শেষের দিকে উত্তর-পূর্ব ভারতের আটটি রাজ্য থেকে আসা মানুষগুলির একটি প্রতিনিধি দলের হয়ে আমিও তৎকালীন কেন্দ্রীয় গৃহমন্ত্রী কিরেন রিজিজু-র সঙ্গে দ্বন্দ্বের নিষ্পত্তি এবং উন্নয়ন সংক্রান্ত এক ভাব-বিনিময় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম। জাতীয় সুরক্ষা পরিষদের প্রধান অজিত দোভালও সেখানে ছিলেন।

আলোচনা ক্রমশ যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটানোর জন্য ভারতের নীতির প্রসঙ্গে পরিবহনের স্বার্থে উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের রাজ্যের সঙ্গে এশিয়ান হাইওয়ের সংযোগ নির্মাণের বিষয়টি আসে, যাতে স্থলপথ, জলপথ এবং রেলব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষ এবং জিনিসপত্র সহজে বাংলাদেশ এবং ভারতের মূল ভূখণ্ডে যাতায়াত করতে পারে, তখনই আলোচনার পারদ চড়তে শুরু করল। এমনকি, দিল্লি-মুম্বাই ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডরের মতো ‘সেভেন সিস্টার করিডর’-এর মতো বহু আকাঙ্খিত প্রকল্পের রূপরেখা নিয়ে আলোচনাটিও বিবাদের অন্যতম বিষয় হয়ে ওঠে। এতে কি বাংলাদেশ থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতে দেশান্তরিত মানুষদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে? যদি তা হয়, তাহলে ‘সেভেন সিস্টার করিডর’ চুলোয় যাক।

কিন্তু দেশান্তর তো তাতে থামেনি। বেঁচে থাকবার তাগিদে মানুষ আসতেই থাকে। সত্যিটা হল, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে দ্রুত এবং দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন না ঘটলে, ভারত বা বাংলাদেশ— দুই দেশই অসহায় হয়ে পড়বে। বাংলাদেশ সীমান্তে ৪.০০০ কিলোমিটার জুড়ে গাঁথা বেড়াতার মানুষদের দেশান্তর হওয়া থেকে আটকাতে পারবে না।

২০০৯-এ কেশরোলি গ্রুপ নামে পেশাদারদের এক চিন্তনশালা (think tank)-এর জন্য একটি অবস্থান লেখ্য (position paper) রচনার সুবাদে এই অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ অনুমান করবার একটি সুযোগ পাই আমি। চিন-ভারত এবং বাংলাদেশ-ভারতের ম্যাট্রিক্সগুলির হিংস্র জাতিবাদ আর রাজনীতির মাঝে উত্তর-পূর্ব ভারত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক দিক থেকে নিজের কোনও প্ররচনা ছাড়াই।

ধরুন যদি বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে প্রবল ঝড়ঝঞ্ঝা এবং বন্যায় বাংলাদেশ ডুবে যায়। ভারতীয় তটভূমিতে বঙ্গোপসাগরে জলস্তর একই হারে বৃদ্ধি পেলে দেশের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যত পরিমাণ ভারতীয়রা আশ্রয় নেবে, তার চেয়ে অনেক বেশি বাংলাদেশের নড়বড়ে দক্ষিণ অংশে বসবাসকারী মানুষ অন্য সব দিকে ছড়িয়ে গিয়ে স্থানান্তরিত হবেন একবিংশ শতাব্দীর অনেকগুলি দশক ধরে।

ভারতের পক্ষে এই দেশান্তরকে আটকানো সম্ভব হবে না। পরিণতিতেতে আরেক ধরনের বন্যা শুরু হবে এই দেশে। বেঁচে থাকবার নিষ্ঠুর তাগিদে ধর্মীয় প্রতিরোধের সব বেড়া ভেঙে যাবে। সেক্ষেত্রে এমনটাও হতে পারে বাঙালি মুসলিম দেশান্তরীরা ভারতের বাঙালি অধ্যুষিত এবং মুসলমান-প্রধান সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে, যেমন অসমের গোয়ালপাড়া, ধুবড়ি, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি এবং পশ্চিমবঙ্গের সমগ্র সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরবিচ্ছিন্নভাবে নতুন মানুষদের আগমনকে মকাবিলা করতেই থাকবে।

পূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব ভারত এভাবেই ভবিষ্যতে অন্তর্বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, যার ফলে এনআরসি এবং সিএবি-র কারণে জ্বলে ওঠা আগুনকে নেহাতই পোষ্য মনে হয়।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2039 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...