জাপ্টে ধরেছি শূন্যকে

অম্লানকুসুম চক্রবর্তী

 

যাদবপুরের সুজনের মতো আমারও সরে গিয়ে বেঁচে যেতে ইচ্ছে করে প্রতিদিন। এ ভাবে বেঁচে যাওয়া যায় কি না জানি না। তাও ইচ্ছে করে। পারি না। ইচ্ছে করে, ছাদের উপরে গিয়ে সবাইকে, চিনি যাদের, তাদের সঙ্গে চিনি না যাদের তাদেরকেও একসঙ্গে একটা ভিডিও কল করে ঝাঁপিয়ে পড়তে। হে ভৈরব, শক্তি দাও। কিসের শক্তি চাইছি তুমি তো বোঝ।

এখন রাত সাড়ে এগারোটা। আরও একটা দিনের শেষ। কালকে আরও একটা দিন। হতাশাকে জাপ্টে ধরে বেঁচে থাকা, আরও চব্বিশ ঘণ্টা। প্রতিদিন চব্বিশের সঙ্গে চব্বিশ জুড়ে যায়। কুয়াশা। দেখতে পাই না কিছু। প্রথম প্রথম হতাশা আমার পিঠে থাবা বসাতে যেত যখন, ওকে গলাধাক্কা দিতাম। ধাক্কা মারার সময় দেখতাম ও হাসত মহিষাসুরের মতো। অট্টহাসি দেখেছি ওর আলকাতরা মাখানো কালো দাঁতের। ও এগিয়ে এসেছে ক্রমশ। দমবন্ধ লাগতে শুরু করার পরে বুঝেছি, ও আসলে আমার গলাটা টিপে ধরেছে।

সেল্ফ হেল্প-এর বই পড়েছি। ইউটিউবে দেখেছি মন ভাল করার ভিডিও। মোটিভেশনাল টক। শিভ খেরা। অমুক। তমুক। ওঁরা ফিল্মফেয়ারের অনুষ্ঠানের মতো বিশাল স্টেজে স্পটলাইটের আলোর তলায় মন ভালো রাখার টিপস দেন। স্যুট বুট টাই পরে। জীবন থেকে পজিটিভ রে শুষতে বলেন সারা শরীর দিয়ে। এক মিনিট কথা বলার পরেই ইউ অ্যাগ্রি উইথ মি, রাইট বলে প্রশ্ন ছোঁড়েন অডিয়েন্সের দিকে। প্রশ্নের মধ্যেই তো রাইট কথাটা আছে। এর মানে উনিই ঠিক, ওনারাই ঠিক। ভিডিও শেষ হয়ে যাওয়ার পরে মোবাইলের স্ক্রিনটা কালো হয়ে যায়, আমার বেঁচে থাকার চারপাশটাও।

বেঁচে থাকার জন্য খোরাক লাগে। পেটের খোরাকের সঙ্গে লাগে মনের খোরাকও। এক খোরাকের সঙ্গে অন্য খোরাকের মল্লযুদ্ধ চলে এখন। চাকরির বাজার, কর্মসংস্কৃতির হার গত পঁয়তাল্লিশ বছরের মধ্যে তলানিতে। জোমাটো-স্যুইগিতে আজকে একটা খাবারের অর্ডার করার সময় চিন্তা হয়, কালকে এটা করার ‘মুরোদ’ থাকবে তো? ক্ষমতা থাকবে তো অ্যাপ-ক্যাবে চড়ার? বাহারি চাল ছেড়ে দিই। খাওয়ার ক্ষমতা থাকবে তো? প্রথম মাইনেটা আমি খাওয়ার পর থেকে তো ইএমআই আমাকে খায় প্রতি মাসে। আমাকে না, একসঙ্গে চাকরি করতে ঢুকেছিলাম আমরা যারা সবাই, তাদের প্রত্যেককে। স্ট্যাটাস নামের সিঁড়িটা দিয়ে চড়তে চড়তে একসময় দেখেছি, নিচের সিঁড়িগুলো দেখা যাচ্ছে না আর। উপরেও আরও হাজার হাজার সিঁড়ি। সিঁড়িটা কেমন যেন নড়বড় করে এখন। বুঝতে পারি, মইটা আসলে তৈরি দেশলাই কাঠি দিয়ে, লেপে দেওয়া সোনার জল।

ঠাকুর্দা বেঁচেছিলেন যখন, প্রণাম করার পরে বলতেন, সুখে থাকো। সুখে থাকা বলে কাকে? শুধু নিজের আখেরটুকু গুছিয়ে নিলেই কি সুখ হয়? চারপাশটা? রাত্রে স্বপ্নের মধ্যে গুলির শব্দ আসে কেন? সকালে প্রতিটা খবর কাগজের প্রথম পাতায় রক্তের ছবি। বাস পুড়ছে। ট্রেন জ্বলছে। পুড়ছে মানুষ। কাগজের পাতা ওল্টানোর সময় হাতের আঙুলে লেগে যায় আলতা রং। আশা নিয়ে ভোট দিয়েছি যাঁদের, তাঁরা একে অন্যকে খুন করছেন রোজ, শুধু কথাতেই। মানুষ পুলিশকে মারছে, পুলিশ মানুষকে। মারতে মারতে মরে যাচ্ছে সবাই। দুই সম্প্রদায়কে একই বৃন্তে দুটো ফুলের মতো বলেছিলেন কে যেন। ভাগ্যিস তিনি বেঁচে নেই আজ। সারাটা জীবন এ দেশে কাটিয়ে দেওয়ার পরে শুধু নিজেকে সরকারের সামনে ফের প্রমাণ করার ভয়ে রোজ মরে যাচ্ছেন কেউ কেউ। দাবার বোর্ডের বোড়েগুলোর মতো। ওদেরকে গজ খেতে পারে, রাজা খেতে পারে, মন্ত্রী খেতে পারে, খেয়ে নিতে পারে নৌকোও। বড় বড় লোকেরাই বেঁচে থাকার ধূসর মাঠটাতে সাদা কালো রং করে দেন। বোড়েরা লড়াই করে, আর ওঁরা বোড়েদের খান।

আমার শহরে শুকিয়ে যাচ্ছে জল। এ নিয়ে কথা কই? কোনও এক বেয়াড়া সমীক্ষা কয়েক মাস আগে বলেছিল, দেশের তাবড় তাবড় শহরগুলোতে মাটির তলার জলস্তর নেমে যাচ্ছে হু হু করে। ক্রমশ জলশূন্য হয়ে যাচ্ছে একটার পর একটা শহর, গ্রাম। জল বাঁচাতে আমরা কিছু করছি না। এ নিয়ে রাষ্ট্রের সময় নেই। যখন ‘ঘটনা’ ছিল না দেশে, যখন নাগরিক ছিল সবাই, তখন প্লাস্টিক বন্ধ করা নিয়ে একটু আধটু কথা শোনা যাচ্ছিল। ভালোভাবে, সারা দেশ জুড়ে বাঁচার আগেই ফসিল হয়ে যেতে বসল এ নিয়ে সচেতনতাবোধ। অ্যাসিড আক্রান্ত তরুণীর জীবনসংগ্রাম নিয়ে লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন হয়। অথচ সিনেমা করার থেকেও জরুরি ছিল যেটা, তা হল মিনারেল ওয়াটারের বোতলের মতোই এতটা সহজভাবে অ্যাসিড বিক্রি বন্ধ করা, প্রকাশ্যে। ঘুমের ট্যাবলেট কিনতে গেলে প্রেসক্রিপশন লাগে। অ্যাসিড কিনতে গেলে লাগে না। যে খাবারটা খেয়ে যাচ্ছি রোজ, তাতে ভেজাল বন্ধ করা নিয়ে কাউকে ভ্রু কুঁচকোতে দেখি না। সমীক্ষা আরও বলছে, বাতাস শ্বাস নেওয়ার মতো থাকবে না আর মাত্র কয়েক বছর পরেই। দিল্লি বুঝেছে। আমরাও বুঝছি ক্রমশ। বুঝতে শুরু করেছে অন্য শহরও।

হাসি পাচ্ছে, না? কী সব বলে চলেছি, উল্টোপাল্টা। একেবারে বকওয়াস। আর মাত্র কয়েকটা দিন পরেই তো ইংরিজি নতুন বছর। হ্যাপ্পি নিউ ইয়ার। আরও একটা প জুড়ে দিতে পারলে ভাল হত। যুক্তাক্ষর পেলাম না। ৩১ তারিখে, যার যার মধ্যরাতে সারা দুনিয়ায় বাজি ফাটবে। রাত নটা থেকে সুরে সুরায় যুগলবন্দি। ঝিনচ্যাক। রাত ১২টায় একে অন্যকে টলোমলো আলিঙ্গন। নতুন বছরের আলিঙ্গন। জড়াজড়ি। ঠোঁটের পাশ দিয়ে লালা। বাথরুমের শাওয়ারের মতো হোয়্যাটসঅ্যাপে ভালো থাকুন। ভালো রাখুন। ভালো ভাবুন। নতুন বছরের রেজলিউশন। লেট আস মেক এ বেটার টুমরো। আজ জগাছায় এক বন্ধু ছুরি দিয়ে অন্য বন্ধুর পায়ের গোড়ালি আর থাইয়ের শিরা কেটে খুন করল। বাঁশ দিয়ে চিরে দিল পা। ডিনারে স্যালাড কাটার মতো একজন অন্যজনের গলার নলি কাটে এখন। এ সব আর খবর হয় না, দুটো নিউ ইয়ার ধমাকার বিজ্ঞাপনের মাঝে ফিলারের মতো যায়। ভালো থাকুন। ভালো রাখুন।

কী নিয়ে বাঁচব? জীবনটা তো আসলে একটা লতানে গাছের মতো। আশার আঁকশি মেলে ধরতে ইচ্ছে করে বার বার। আঁকশি মেলে দেখি, আসলে জাপ্টে ধরেছি একটা ফাঁপা, শূন্যকে। ইউটিউব বলে আজকের জন্য বাঁচো। এফ এম চিল্লায়, কাল হো না হো। আমি পারি না। প্রতি রাতে ঘুমনোর চেষ্টা করার সময় পরের দিনের সকালের সূর্যের কথা মনে হয়। সূর্যোদয়ের স্বপ্ন ছাড়া সূর্যাস্ত হয়?

কালো সূর্যটা সোনালি হচ্ছে না কিছুতেই। এই বাঁচা নিয়ে কয়েক বছর পরের এক আয়নায় নিজেকে দেখি। চিনতে পারি না। হাত থেকে পড়ে যাওয়া, ক্র্যাক হয়ে যাওয়া মোবাইল স্ক্রিনের মতো লাগে আমার মুখ। দেখি হাঁসফাঁস করছে একটা শরীর। দেখি সকাল নটায় কোনও এক কালে কেনা ব্র্যান্ডেড জামা প্যান্ট পরে রেডি হচ্ছে একটা ল্যাংটা শরীর। মর্নিং মিস্ট লেখা ডিওডোরেন্ট স্প্রে করছে গলায়, আন্ডারআর্মস-এ। ডিওডোরেন্টে গোবরের গন্ধ। ড্রেসরত শরীরটা কিন্তু জানে, কোনও অফিসে তার জন্য জায়গা খালি নেই। ল্যাপটপের পাওয়ার বোতামটা টিপে যাচ্ছে বারবার। ওয়েলকাম লেখার বদলে চোদ্দ ইঞ্চির কালো স্ক্রিনে টানা দেখিয়ে যাচ্ছে, শাটিং ডাউন। রোজকার মতো লোকটা আজও হাঁসফাঁস করবে। ‘আমি ভারতীয়’ লেখা মোটা কার্ডটা স্যানিটাইজার দিয়ে ধুয়ে ফের সাজিয়ে রাখবে আলমারির লকারে। লোকটা চাকরির সন্ধানে বেরিয়ে রোজ দেখবে, অফিসবাড়িগুলো একটা একটা করে ভেঙে তৈরি হচ্ছে ধর্মস্থান। গড়ে উঠছে উপাসনাগৃহ।

নতুন বছর মানেই তো আমার আরও একটা জন্মদিন। মানে আরও এক বছর বাঁচা। বাঁচা নয়, আসলে কোনওরকমে বেঁচে যাওয়া। বাঁচতে ভয় হয়। কালীপুজোর সময় সাপবাজির কালো ট্যাবলেটগুলোতে আগুন দেওয়ার পরে যেমন হয়, ঠিক তেমনভাবে মাথার মধ্যে বেড়ে উঠছে পার্থেনিয়ামের গাছ। বটবৃক্ষের মতো বিশাল শরীর তার। আর সেই কালো পাতা কালো ডালের গাছ থেকে ক্রূরস্বরে ক্রমাগত ডেকে যাচ্ছে কয়েক হাজার নাম না জানা প্রাণী। পাখি কি? জানি না। ওরা সমস্বরে বলছে, ছাদে ওঠ্, ছাদে ওঠ্।

হে ভৈরব, শক্তি দাও।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2086 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...