আংটি

সৌগত ভট্টাচার্য 

 

“কি রে ভাত বসালি? আজ দেরি হয়ে গেছে মা…”

কুয়োর পারে গায়ে জল ঢালতে ঢালতে জহর ওর মেয়ে বুড়িকে বলে।

“কাকভোরে উঠেও সময় করে উঠতে পারি না, পূর্ণিমার সবটাই করে দিতে হয়, তারপর না নিজে তৈরি হওয়া…”

জহর পাশের বাড়ির হারানকে গা মুছতে মুছতে বলতে থাকে। হারান তখন নিমের ডাল দিয়ে দাঁত মাজছিল।

“সকালের দিকে দম ফেলার ফুরসৎ পাই না। মেয়েটারও তো পড়াশোনা আছে, রান্না করবে, না স্কুলে যাবে—” জহর বলতে বলতে একবার সূর্যের দিকে তাকিয়ে কপালে দুই হাত ঠেকায়। স্কুল থেকে ফিরে বুড়িই ওর মাকে দেখাশোনা করে। পূর্ণিমার আজকাল বিছানা থেকেও উঠতে কষ্ট হয়। কোনও রকমে উঠোন পেরিয়ে স্নান বাথরুম পায়খানা করে এসে আবার শুয়েই থাকে সারাদিন। হাফ পাকা, হাফ টিনের ঘরে টিভিটায় বুড়ি স্কুল যাওয়ার আগে যে চ্যানেল দিয়ে যায় সেটাই আপন মনে সারাদিন চলতে থাকে। টিভি চললে পূর্ণিমার তাও মনে হয় ঘরে কেউ আছে। কখনও সখনও টিভির দিকে তাকিয়ে থাকলেও বেশিক্ষণ টিভি দেখতে পারে না পূর্ণিমা, ঘুমিয়ে পড়ে। বুড়ি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে পূর্ণিমাকে খেতে দেয়। বুড়ির এবার ইলেভেন ক্লাস।

“মায়ের খাওয়ার আগের কালো সিরাপটা শেষ, নতুন শিশি আনা আছে খুলে নিস মা—” মাথা ভর্তি কোঁকড়ানো চুলকে সেট করে আঁচড়াতে আঁচড়াতে বুড়িকে বলে জহর। পরিপাটি মানুষ জহর প্রতিদিন নিখুঁতভাবে দাড়ি কেটে, মুখে একটু বোরোলিন মেখে সাদা কলারওয়ালা পাঞ্জাবি, খাটো ঢোলা পায়জামা আর পালিশ করা কালো পাম্পশু পরে রেডি হয়। ছোট ফোনটার ফিতের সঙ্গে লাগানো ক্লিপটাকে পাঞ্জাবির বুকপকেটে লাগাতে লাগাতে জহর মেয়েকে বলে— “এই সপ্তাহের মধ্যেই তোর মাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।” বুড়ি সকালের খাবার খাওয়ানোর পর পূর্ণিমার মুখ মোছাতে মোছাতে বলে, “বাবা, মা কিন্তু কেমন যেন করে সারাদিন, গোঁ গোঁ আওয়াজটা বেড়েছে।” কাদোবাড়ি থেকে সদর দশ কিলোমিটারের মত রাস্তা। জহর ওর ঝাঁ চকচকে পুরনো মোটর সাইকেল নিয়েই ডেইলি শহরে আসে। পুরনো হলেও নিজের মতোই পরিপাটি রেখেছে বাইকটিকে। ওর ‘পার্টি’রা সবাই এই বাইকটিকে চেনে।

পূর্ণিমার রোগটার একটা কঠিন ইংরেজি নাম ডাক্তারবাবু বলেছেন, জহর ঠিক মনে রাখতে পারে না। শুধু মাথার নার্ভের কিছু একটা রোগ সেটা বুঝতে পারে। প্রথম দিকে জহর রোগটাকে খুব একটা পাত্তা দেয়নি। দিনে দিনে কেমন যেন অসংলগ্ন হয়ে ওঠে পূর্ণিমার কথাবার্তা, অবশ হয়ে যেতে থাকে হাত পা শরীর, দিনরাত্রি গুলিয়ে ফেলতে থাকে। পূর্ণিমা প্রতিদিন যেন আস্তে আস্তে অচেনা হয়ে যাচ্ছে জহরের কাছে!

সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে জহর প্রতিদিন বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে। আজ বেরোতে একটু দেরি হয়ে গেছে। বেরোনোর সময় পূর্ণিমার একটা ওষুধ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। হলদিবাড়ি-এনজেপি প্যাসেঞ্জার জলপাইগুড়ি টাউন স্টেশনে ঢোকার আগে জহরকে বাইক নিয়ে স্টেশনে পৌঁছতেই হবে। হলদিবাড়ির থেকে লোকাল ট্রেনে যে ডেইলি প্যাসেঞ্জাররা সদরে আসে, তাঁরা অনেকেই জহরের কাস্টমার। তাই কাস্টমার ধরার জন্য ট্রেনের আগে জহরকে স্টেশনে পৌঁছাতেই হয়।

হলদিবাড়ি লোকাল জলপাইগুড়ি স্টেশনে পৌঁছালে স্টেশন চত্বর জমজমাট হয়ে ওঠে, টোটোওয়ালারা ডাকাডাকি শুরু করে, “হাসপাতাল, দশতলা, কোর্ট, দিনবাজার, বেগুনটারি”। হলদিবাড়ি থেকে আসা তাজা সবজির বাজার বসে স্টেশনের গায়ে লাগা বাজারে। জলপাইগুড়ি শহরের সব ধরনের মিস্ত্রি লেবার চাকুরে নানান মানুষরা ট্রেন বোঝাই করে প্রতিদিন আসে সদরে রুটিরুজির সন্ধানে।

স্টেশনের ‘মেইন’ গেটের ঠিক উল্টো দিকেই রেলের জমিতে “বিনা অস্ত্রে চাঁদসীর ক্ষত চিকিৎসালয়”-এর সাইনবোর্ড। একটা ছোট্ট ঘুপচি টিনের ঘরে একটা টেবিল আর চেয়ার পাতা। সামনে দুটি কাঠের বেঞ্চ। চাঁদসীর ডাক্তারবাবু কমল সমাদ্দারের সঙ্গে জহরের চেনা পরিচিতি আজকের না, সে বহুদিনের। বিয়ের আগে ডাক্তারবাবুর স্ত্রী আর জহর একই পাড়ায় থাকত। তাই চাঁদসীর ডাক্তারকে জহর “ডাক্তারজামাই” বলেই ডাকে। ডাক্তারবাবু সেদিন স্টেশনে জন্মাষ্টমীর চাঁদা নিতে আসা ছেলেদের বলছিলেন, “আগে পেশেন্ট যখন ছিল তখন সাধ্যমতো দিয়েছি, এখন আর পারব না দিতে, এখন মানুষ কথায় কথায় হাসপাতাল দৌড়ায়, আমাদের আর আগের মতো বাজার নাই। হাইড্রোসিল পাইলসের পেশেন্ট পাইই না, কোনও মতে প্রেসার মেপে ইনজেকশন দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে, দেখতেই তো পাও চোখের সামনে সব।” সকাল সাড়ে আটটা থেকে দশটার ডাউন এনজেপি-হলদিবাড়ি প্যাসেঞ্জার ট্রেন জলপাইগুড়ি স্টেশনে আসা অবধি জহর ডাক্তারবাবুর চেম্বারের কাঠের বেঞ্চে বসে। এই সময়টুকুর জন্য ডাক্তারবাবুকে মাসে আড়াইশো টাকা দেয় জহর। সকালের দিকে এটা জহরেরও চেম্বার।

“দেখেন তো আংটির রংটা পাল্টায় কালো হয়ে গেল কেন!” জহরকে জিজ্ঞেস করেন টাইলস মিস্ত্রি দিলু। জহর দুধ চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, “আমি তো আগেই বলেছিলাম শনি-মঙ্গলবার বার ঠাকুরবাড়ি গিয়ে শোধন করাতে হবে, না হলে কি আর এই আংটির রেজাল্ট পাওয়া যায়।” দিলু ওর স্ত্রী বিমলাকে জহরের সামনে এগিয়ে দিয়ে বলে, “ওর হাতটা একটু দেখে দেন তো জহরদা, আমাদের কবে ছেলেপুলে হবে…!” জহর নিচু গলায় দিলুর বউকে কিছু একটা বলে, আয়ার কাজ করা বিমলা চোখ নামায়, জহর কী বলে শোনা যায় না!

“কয়েক দিনের মধ্যেই কেমন পাল্টে গেল না, এই স্টেশনের ছবিটা। যখন ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে ওপার থেকে এদেশে আসি তখন মাঝেমাঝে সদরে আসতাম, এই জায়গাটা অন্য রকম ছিল, কত গাছ!” জহর ডাক্তারজামাইকে বলে। ডাক্তারও ওপার বাংলার মানুষ। জহর ডাক্তারকে বলে, “আপনারা তো মিদনাপুরে এসেছিলেন প্রথমে, মরতে কেন নর্থ বেঙ্গল আসলেন!” সেই কোন কালে এই দেশে এসেছিল আজকের পঞ্চাশ-ছুঁই জহরের সেটাও মনে পড়ে না।

জহরের তখন পনেরো ষোলো বছর বয়স হবে, হুজুরের মেলায় এক ভবঘুরে মতো লোকের পিছুপিছু চলে গেছিল। অনেক দিন সেই লোকটির চ্যালা হয়ে কাটিয়ে দেয়। গ্রামের সকলে বলত লোকটি নাকি তুকতাক জানত। তারপর একদিন গ্রামে ফিরে এসে জহর ঘোষণা করে, “আমি সামনের দিন কার কেমন যাবে বলে দিতে পারব।” গ্রামের মানুষ প্রথম দিকে জহরের কথা উড়িয়ে দিলেও, পরে নিজেরাই বলাবলি করে, “ঘুঘুডাঙ্গার সনাতনের আর ফেরার কথা ছিল না! কে জানত জহরের পাথর আর আংটির জোর! সনাতনকে যমের দরজা থেকে টেনে নিয়ে আসল জহর…”, বা বিয়ে না হওয়া চায়নাকে যখন মাস বলে বিয়ে দিয়ে দিল তখন থেকেই জহরের নাম ফেটে পড়ল এই এলাকায়।

হাত দেখার পাশাপাশি আংটি আর পাথরের ব্যবসাটাই জহরের আসল ব্যবসা। সঙ্গে কিছু ঘটকালিও করে, সেটা সাইড বিজনেস। “বিনা অস্ত্রে চাঁদসীর চিকিৎসালয়ে”র একদিকে ডাক্তার কমল সমাদ্দার বিরস মুখে বসে থাকে, অন্যদিকের বেঞ্চে দুই আঙুলের ফাঁকে সিগারেটে নিয়ে হাতকে মুঠো করে মুখের সামনে এনে লম্বা টান দিয়ে জহর বলে, “আগেও বলেছি এখনও বলছি বৃহস্পতি আর মঙ্গলের স্থান ঠিক নেই, এই যোগ কাটতে আরও তিন চারমাস লাগবে… তোমাকে বললে তো শুনবে না, ভাববে জহরদা শুধু ব্যবসা করে! স্টোন ছাড়া এর প্রতিকার নাই। কেউ যদি করতে পারে চ্যালেঞ্জ দিলাম। কোনও ডাক্তার কবিরাজ হেকিম বিদ্যি পারবে না এই সমস্যার সমাধান দিতে। যদি আংটি সমেত পাথর ধারণ করতে না পারো তাহলে মঙ্গল বেস্পতির মধ্যে কোনও একদিন স্নান করে, লিখে দিচ্ছি, এই মূল কালো কার সুতা দিয়ে ধারণ করো, কালীবাড়ির সামনে দশকর্মার দোকানে পাবে।” নিজে গ্রামের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও গ্রাম থেকে আসা মানুষের সঙ্গে জহর সচেতনভাবেই শহুরে ভাষায়ই কথা বলে। শহুরে ভাষাটা তার ব্যবসার একরকম পুঁজি।

মা লক্ষ্মীর কৃপায় জহরের খরিদ্দারের অভাব নেই। জহর তাদের পার্টি বলে কাস্টমারও বলে। বিমলার ছোট ছেলে ওর বড় বৌমাকে নিয়ে পালিয়েছে। বিমলা মন্ডলঘাট থেকে জলপাইগুড়িতে বাসাবাড়ি কাজ করতে আসে। জহরের কাছে এসেছে ওর ছেলে কোথায় আছে জানতে। বিমলা বলে, “মাইয়াটা গোড়া থেইকাই বেচালের। আমি শুধু পোলাটার হদিস চাই। ওই মেয়েছেলেটা মরে তো মরুক। এইগুলা দেখার আগে আমার মরণ হয় না কেন!” জহর অনেকক্ষণ কী যেন একটা চিন্তা করে বলে, “তোমার বৌমার গ্রহের দোষ ছিল না! যদ্দুর মনে পড়ে আগেও বলেছিলাম, হ্যাঁ। আসলে সময় ভালো যাচ্ছে না তোমাদের, তাও বলছি সামনের অমাবস্যার মধ্যেই ফিরবে ওরা, ফিরলে ছেলেকে একটা আসল মুক্তা নিতে বলবে!”

“তোমার তো কোর্টে যাওয়ার টাইম হল, তুমি বেরোলে আমিও দরজাটা টেনে একটু বাজারে যাব,” উঠে দাঁড়িয়ে প্যান্টের মধ্যে টেরিকটনের সাদা জামাটা গুঁজতে গুঁজতে ডাক্তার জহরকে বলে। দশটার ট্রেন স্টেশনে ঢুকলেই জহর ওঁর কালো কাঁধব্যাগটা ঝুলিয়ে বাইক নিয়ে সোজা চলে যায় নবাববাড়ির কোর্টে। দশটার প্যাসেঞ্জার ট্রেনে আসা মানুষজন বেশিরভাগ স্কুলকলেজ অফিসকাছারিতে আসে। দশটা থেকে দুটো আড়াইটা পর্যন্তই বাইরে থেকে সদরে আসা মানুষের ভিড় থাকে কোর্টে। কোর্ট চত্বরে আগে দুই একজন ছিল জহরের মতো হাত দেখার লোক। এখন কত যে জ্যোতিষী! কেউ মাইক আর ছোট সাউন্ড বক্স নিয়ে কেউ কালো ঘোড়ার নালের আংটি বিক্রি করছে, কেউ আবার গ্যারান্টি দিয়ে মামলা জিতিয়ে দিচ্ছে। এদের দেখে জহরের অবাক লাগে। কিন্ত যতই হোক কোর্ট চত্বরে জহর সবচেয়ে পুরানো এই লাইনে, তাই ওর কদরই আলাদা কাস্টমারদের কাছে। চাওয়ালা নিমাই দুধ-চায়ের গ্লাসটা জহরের সামনে নামিয়ে বলে, “জহরদা এই তুমি যে স্টোন আর আংটিগুলো দাও সত্যি কাজ হয়! দেখো না আমার হাতে অন্য কাজকাম আছে কি না, এই কাজ আর ভালো লাগে না!” জহর সিগারেটে টান দিয়ে বলে, “আরে পাথর আংটি কথা কয়, কথা কয় রে, এগুলো বুজরুকি হলে কি এতদিন বুক ঠুকে শহরে টিকে থাকতে পারতাম! পুরা গ্যারান্টি দিয়ে কাজ করি!” এর মধ্যেই একজন ছাপা শাড়ি পরা মহিলা সঙ্গে একটি আঠারো উনিশ বছরের ছেলেকে নিয়ে সামনে এসে জহরকে প্রণাম করে। “আরে আরে কী করছ!” বলে ওঠার আগেই মহিলাটি বলে ওঠে, “আপনি আমাদের কাছে সাক্ষাৎ ভগবান, আপনি সেদিন ওকে পাথর না দিলে ও আর বাঁচত না, ডাক্তার ফেল করে গেছিল, আপনি ওকে বাঁচাইছেন!” ছদ্মবিনয়ী জহর ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে বলে, “আমি আর কে, সব উপরওয়ালার কৃপা!” মিন্টু কোণায় দাঁড়িয়ে নাক খুঁটছিল। সেই মহিলা সাইড হতেই মিন্টু জহরের সামনে এসে ফুঁ ফুঁ করে বিড়ির সামনে পিছনে ফুঁ দিয়ে দাঁত চেপে বিড়িটা ধরায়। “শালা, আর কতদিন যে ডেট দিবে, কোনও শালা জানে না!” গরুপাচার কেসে জড়িত মিন্টু জহরকে বলে। চাউলহাটি থেকে এখানে এসে উকিলের খরচ দিয়ে মিন্টুর ডেট নেওয়া আর পোষায় না। উকিল টাকা নিয়েই যাচ্ছে, আর ডেটের পর ডেট দিয়েই যাচ্ছে। এই কেসে মিন্টুর জেল হয়েছিল। এখন হাজিরা দিতে সদরে আসতে হয়। জহরকে মিন্টু বলে, “তুমি যাওয়ার সময় আমাকে একটু কদমতলা বাসস্ট্যান্ডে নামায় দিবা!”

“বাবা, মায়ের ওষুধগুলো বেশিরভাগই শেষ হয়ে গেছে, এবার ডাক্তার কিন্তু দেখাতেই হবে…” আসার সময় আজ বুড়ি জহরকে বলেছিল। মায়ের অসুখ বুড়ির বয়সকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ডাক্তারবাবু দুই মাস পর দেখাতে যেতে বলেছিলেন, কিন্তু যাওয়া হয়নি। আগের দুইবার জহর ওর বড় শ্যালক সান্তোষের সঙ্গে পূর্ণিমাকে ডাক্তারের কাছে পাঠিয়েছে। তাতে নিজের পরিবারের মধ্যেই অনেক কানাঘুষো হয়েছে, “উঁ উঁ উঁ যে দুনিয়ার রোগ সারিয়ে বেড়াচ্ছেন, সে কি না শহরে এলোপ্যাথি ডাক্তার দেখায় বউকে! মুরোদ থাকলে নিজের আংটি পাথরের জোরে রোগ সারাক না, বুঝব খ্যাম!”

“কি জহরদা আপনি এখানে…” জহরকে মাথার নার্ভের ডাক্তারবাবুর চেম্বারে দেখে জহরের এক পার্টি জিজ্ঞেস করেছিল। “এই একজনের কাছে টাকা পাই সেটা তুলতে এসেছি,” ভ্যাবাচ্যাকা মুখে বলে জহর। এই এক সমস্যা, এত দিন ধরে হাত দেখে জটিল সব রোগের বা অন্যান্য সমস্যার নিদান দিয়ে বেরিয়েছে জহর। ওর পার্টিরা জহরের কথাকে বিশ্বাস করেছে, ভরসা করেছে ওর দেওয়া আংটি পাথর মূল ইত্যাদিকে। গ্রামে শহরে ছড়িয়ে আছে ওর কাস্টমার। আর সেই জহর কি না আজ নিজেই এলোপ্যাথির চেম্বারে! সেবার প্রথমবার যখন পূর্ণিমার রোগের উপসর্গ দেখা দিল জহর নিজেই মোটর বাইকে করে শহরে মাথার নার্ভের ডাক্তারের কাছে নিয়ে এসেছিল! জহরের এক পার্টিও সেই ডাক্তারের চেম্বারে হাজির। সেই পার্টিকে অনেক দিন আগে জহরই আংটি দিয়েছিল এই মাথার ব্যামোর জন্য। সেই পার্টি যত না আশ্চর্য জহরকে ডাক্তারের কাছে দেখে, জহর পড়েছে তার চেয়েও এক বিষম অস্বস্তিতে, দ্বন্দ্বে। অপ্রস্তুত জহর ঘামতে ঘামতে চেম্বারের বাইরে এসে একটা সিগারেট ধরায় পূর্ণিমাকে একটা বেঞ্চে বসিয়ে। চেম্বারের ভেতর থেকে দুই একবার পূর্ণিমার নাম ডাকলেও জহর সাড়া দেয়নি। পূর্ণিমাকে বলেছে, “ভিড় ফাঁকা হলে ধীরেসুস্থে ঢুকব ডাক্তারবাবুর কাছে।” সেই পার্টি ডাক্তার দেখিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময়, বলে যায়, “আসি জহরদা!” পার্টি চলে গেলে জহর পূর্ণিমাকে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে ঢোকে। ডাক্তারের চেম্বারের ভেতরে ঢুকে জহর মনোযোগ দিয়ে ডাক্তারবাবুকে কিছু বলতে পারেনি বা তাঁর কথা শুনতে পারেনি। শুধু ভয় পেয়েছে, এসি চেম্বারে বসেও ঘেমে গেছে, এই বুঝি কেউ দেখে ফেলল ডাক্তারের চেম্বারে জহরকে। আংটি পাথরের ব্যবসা জহরকে রুটিরুজি স্বচ্ছলতা দিয়েছে, বড় মেয়ের ভালো বিয়ে দিয়েছে, বউয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাচ্ছে। কিন্তু জহরের জীবনে বড় বালাইয়ের নাম এলোপ্যাথি ডাক্তার!

বেলা আড়াইটা নাগাদ কোর্ট থেকে জহর মিন্টুকে কদমতলায় নামিয়ে সোজা বাইক নিয়ে চলে আসে পান্ডাপাড়া শ্রীদয়াল হলের সামনে। শ্রীদয়াল হলের উল্টো দিকেই একটা ছাপড়া হোটেলে রিকশাচালক টোটোচালক দিনমজুররা দুপুরের খাওয়া পেটচুক্তিতে খায়। গরম ভাত ডাল সবজি মাছ ডিম খুব সস্তা এই হোটেলে। জহর প্রতিদিন মোটা চালের ভাত ডাল সবজি দিয়ে এখানেই দুপুরের খাওয়া সারে। খেয়ে হোটেলের উল্টো দিকের দোকান থেকে একটা গাছপাতা পান আর সুপারি মুখে পুরে সিগারেটে লম্বা টান দেয়। এখানে খেতে আসা অনেক রিকশাওয়ালা টোটোওয়ালা জহরের পার্টি। এখানেও কোনও কোনও দিন টুকটাক বিক্রিবাট্টা হয় স্টোন বা আংটির। কেউ আবার শুধুই হাত দেখায়।

বিকেল থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত এদিক সেদিক টুকটাক ঘুরে শেষবাতির বুড়ার চায়ের দোকানে বসে জহর। দার্জিলিং মেলের কানেকশন ট্রেনটা স্টেশন ছাড়লে বুড়ার দোকান থেকে এক কাপ চা খেয়ে জহর পান্ডাপাড়ার ভেতরের রাস্তা দিয়ে সোজা স্টেশনে চলে আসে। স্টেশনের দুই নম্বর প্লাটফর্মের সামনের রাস্তায় একটা বটগাছের তলায় বাইক স্ট্যান্ড করে তার ওপর বসে জহর। সেই সময় সকাল সাড়ে আটটার ট্রেনে আসা মানুষের দল বাড়ি ফেরার জন্য স্টেশনে এসে জড়ো হয়, বটগাছের তলায় বিশুর দোকানে চা খায়, সন্ধের ফিরতি সাতটার এনজেপি-হলদিবাড়ি প্যাসেঞ্জার ধরবে বলে। এই মানুষের দলই জহরের বাড়ি ফেরার সময়ের কাস্টমার।

গত রাতে পূর্ণিমা হাত পা ছুঁড়ে বাড়াবাড়ি করছিল। গতিবিধি ভালো লাগছে না জহরের। ওই রাতে কোনও রকমে বাপ বেটিতে সামাল দিয়েছে। পূর্ণিমাকে একবার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া খুব দরকার। কিন্তু যতবার জহর হাসপাতাল বা ডাক্তারখানায় গেছে, কোনও না কোনও চেনা মুখের সঙ্গে দেখা হয়েছে। একবার ডাক্তারের চেম্বারে দূর থেকে জহর ওর এক পার্টিকে দেখে বাথরুমে গিয়ে অনেকক্ষণ লুকিয়ে ছিল। এই বিরাট পৃথিবীটা জহরের মতো এক গ্রামের জ্যোতিষীর কাছে পালাতে পালাতে ছোট হয়ে যাচ্ছিল। যেখানেই ডাক্তার দেখাতে যায় বউকে নিয়ে সেখানেই যেন সবাই জহরকে চেনে। নিজের মনে মনেই বলে, “কী হবে কেউ দেখলে! কত মানুষই তো রোজ যায় ডাক্তার দেখাতে! বউটার জন্য গেলে কে কী আর ভাববে।” সত্যি কেউ কিছু ভাবে কি না জহর জানে না, কিন্তু নিজে ভাবে সারাদিন। মেয়ে বউয়ের ভাতকাপড় জোগাড়ের জন্য জহরকে এলোপ্যাথির উল্টো কথা বলেই সংসার চালাতে হয়, কিন্তু আজ সে নিজেই যখন এলোপ্যাথি ডাক্তারের স্মরণাপন্ন, অন্য কেউ আসবে কেন তাকে দেখাতে। এই খবরগুলো চাপা থাকে না। বৈশাখের শুকনো পাতায় আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। কেউ না বুঝুক জহর নিজে সেটা ভালোভাবেই জানে। সম্মানের সঙ্গে দাপটের সঙ্গে “বুক ঠুকে” মানুষকে বিশ্বাস বিক্রি করে জহর! সে জানে সেই বিক্রি করা বিশ্বাস দিয়েই তার সংসারের ভাতকাপড়ের জোগাড় হয়!

অনেকক্ষণ আগে সাতটার হলদিবাড়ি লোকাল স্টেশন ছেড়ে চলে গেছে, একা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত বিধ্বস্ত জহর নিজের হাতের তালুর দিকে তাকিয়ে আকাশপাতাল এই কথাই ভেবে যাচ্ছিল। কাঠের পালিশমিস্ত্রি সুবল ট্রেন ফেল করে হাঁফাতে হাঁফাতে এসে জহরকে দেখে বলল, “তুমি এখনও যাওনি জহরদা, ভালো হল। তোমার সঙ্গে যাওয়া যাবে।” সুবলের বাড়ি কাদোবাড়ি হাটে। বাইকে জহর সুবলকে নিয়ে রওনা দেয় আদরপাড়া সানুপাড়ার ভেতর দিয়ে কাদোবাড়ির দিকে।

প্রতিদিন রাতের খাওয়াদাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ টিভিতে খবর, গান এসব দেখে জহর। লাইট জ্বালিয়ে টিভি চালিয়ে কখন ক্লান্ত জহর ঘুমিয়ে পড়েছিল কে জানে! একটা গোঙানির আওয়াজে ওর ঘুম ভেঙে যায়। দেখে পূর্ণিমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে গাল ভিজে গেছে আর সঙ্গে অদ্ভুত এক গোঙানির শব্দ। জহর পূর্ণিমার চোখে মুখে জলের ছিটে দিয়ে মুখ মুছিয়ে জল খাইয়ে দেওয়াতে পূর্ণিমা শান্ত হয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। পূর্ণিমার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে জহর। পূর্ণিমার তো সারাজীবনেও কোনও দাবি কোনও চাহিদা কিছুই ছিল না! ভাতকাপড়ের দিন তো জহর বলেছিল, বিয়ের পর সব দায়িত্ব নেবে। জহর ভাতকাপড়ের জোগানের জন্য আংটি পাথর বেচে সবটা দায়িত্ব করেছে। কিন্তু এলোপ্যাথি চিকিৎসার দায়িত্বটা!

সদ্য ষোড়শী পূর্ণিমা তখন বুড়ির বয়েসী, বিয়ের বৌভাতের দিন যখন বাসর ঘরে এসেছিল জহর, দরমার বেড়ার ঘরে পূর্ণিমা একটা চৌকির ওপর বসেছিল লাল টুকটুকে শাড়ি পড়ে। জহর পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমালে জড়ানো একটা রুপোর আংটি পূর্ণিমার আঙুলে পরিয়ে দিয়েছিল। জহরের পাশে ঘুমন্ত অসুস্থ পূর্ণিমার হাতে আজও সেই আংটিটি চেপে বসে আছে। সেই আংটির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঘুমন্ত পূর্ণিমার কপালে একটা চুমু দেয় ও। অস্থির লাগে জহরের, পূর্ণিমার আংটি পড়া হাতটাকে হাতে নিয়ে ঝাপসা হয়ে ওঠা চোখে বিড়বিড় করে বলে ওঠে, “অসুখ সারানোর কোনও ক্ষমতা ছিল না এই আংটিতে। শুধু সোহাগ ছিল পূর্ণিমা, শুধু সোহাগ…… সত্যি বলছি রে রোগ সরানোর ক্ষমতা একরত্তি আংটিতে থাকে না…”

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2220 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...