ম্যারাথন

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী

 

বরফ পড়ছে। হালকা পালকের মত ভেসে ভেসে নাবছে যেন স্বপ্নদৃশ্য। মায়াবী আলোয় স্নান করছে পৃথিবী। একটু পরেই অ্যান আরবার শহরের সব পথ সাদা বরফে ঢেকে যাবে। রাস্তা পিছল হয়ে যাবে, গাড়ি কেন হেঁটে যাওয়াও কঠিন হবে। এর মধ্যে সুরজিৎ জুতোর ফিতে বাঁধছিল।

কোথায় যাচ্ছ এখন?
দৌড়তে।

এই সংক্ষিপ্ত জবাবে খুশি হল না পাপড়ি। তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? এই বরফে কেউ দৌড়াতে যায়?

চোখ তুলে তাকাল সুরজিৎ। মুখের একটা রেখাও কাঁপল না। সমান্তরাল গলায় বলল, তোমাকে তো বলেছিলাম আমি ম্যারাথনে নাবব। তার প্র্যাকটিস শুরু আজ থেকে।

আজকের দিনটাই তোমার সেই শুভদিন বলে মনে হচ্ছে?
There is no good or bad day. This has to be done.

অসম্ভব রাগ হলে পাপড়ির কথা জুতমতো বেরোতে চায় না। চোখমুখ লাল হয়ে যায়। তুমি কি আমার কোনও কথাই শুনবে না?

শীতকালে মিশিগানে বরফ পড়বেই।
বেসমেন্টে ট্রেডমিলে দৌড়ালে তোমার প্র্যাকটিস হবে না?

আমি জ্যাকেট পড়ে নিচ্ছি। আজ প্রথম দিন, বেশিক্ষণ দৌড়াব না। যেন সেটাই যথেষ্ট এরকম ভাব করে সুরজিৎ দরজা টেনে বেরিয়ে গেল।

জ্যাকেটটা মাথায় টেনে নে।

বাধ্য ছেলের মতো সুরজিৎ জ্যাকেটের হুডটা মাথায় তুলে দিল।

জমি একটু পিছল। কিন্তু বরফ এখনও সেভাবে জমেনি। সাইডওয়াক ধরে দৌড়াতে শুরু করল সুরজিৎ। মাথার উপর টপটপ করে বরফ পড়ছিল। বৃষ্টির ফোঁটার মত। তার সমস্ত প্রথম দিনেরা বৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। সব সময়। মনে আছে জীবনে প্রথম স্কুলযাত্রার দিনেও এমনি টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল। লাল নীল সবুজ ছাতাটা মাথায়, পিঠে কড়কড়ে নতুন খাকি ব্যাগ। মা বলেছিল আজ ওকে সাইকেলে চাপিয়ে পৌঁছে দাও না। বাবু রাজি হয়নি। অভ্যাস করুক। স্কুল এরকম কিছু দূরে নয়। আজ হেঁটে পৌঁছে দেব, চিনে গেলে কাল থেকে নিজে নিজেই যেতে পারবে। গুড এক্সারসাইজ।

বাবু রোজ সকালে অফিসে বেরিয়ে যায়। কে পৌঁছে দেবে সুরজিৎকে রোজ রোজ। তাই ওর জন্য রাস্তাটা চিনে নেওয়া জরুরি ছিল। এমনিতেও বাবুর উপরে কিছু বলা যেত না। এখানে ওখানে জল জমেছিল। বাবু সাবধান করে দিচ্ছিল, জল বাঁচিয়ে, জল বাঁচিয়ে টুবলু। নতুন জুতোটার বারোটা বেজে যাবে।

স্কুলে যাওয়া উপলক্ষে বাটার কালো বুটজুতো কেনা হয়েছিল। পায়ে চেপে বসছিল। চোখ কুঁচকে ব্যথা চেপে হাঁটছিল টুবলু। মাকে হলে বলত। এমন কিছু দূর ছিল না স্কুল, বাড়ির থেকে দুটো মাঠ পেরিয়েই। বাড়ির বারান্দায় দাঁড়ালে স্কুল দেখা যায়। তবু টুবলুর কাছে সেটাই অনেক। স্কুলের দরজায় পৌঁছে বাবু ওর মাথায় হাত রেখেছিল। আজকে তোমার প্রথম স্কুল সুরজিৎ। এরপর অনেক দূরে দূরে তুমি পড়তে যাবে। তোমার জীবনের ম্যারাথনের এই শুরুর রাস্তাটা যে বৃষ্টির মধ্যেও নিজে হেঁটে আসলে সেটা তোমায় নিজেকে বিশ্বাস করা শেখাল।

বাবু খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার সময় তুমি করে বলত। সম্বোধন করত পোশাকি নামে। সুরজিতের বয়স তখন ছয়। একটু দেরিতেই স্কুলে দাখিল করা হয়েছিল ওকে। বাবু এক্স্যাক্টলি কী বলেছিল এখন সেটা ঝাপসা। কিন্তু ম্যারাথন কথাটার মানে জানত না, শব্দটা তাই কানে গেঁথে গেছিল। মনে আছে সেটা। বিকেলবেলা বাবুকে জিজ্ঞেস করেছিল, ম্যারাথন মানে কী বাবু?

খুব লম্বা একটা দৌড়। অনেক অনেক মাইল— বলে থেমে গেছিল বাবু। ছাব্বিশ মাইল। তুই তো কুড়ি অবধি গুণতে শিখেছিস। তারপর আরও ছয়। অনেক অনেক বছর আগে গ্রিস বলে এক দেশে যুদ্ধের সময় রাজার দূত ম্যারাথন বলে একটা শহর থেকে এথেন্স অবধি এক দৌড়ে চলে গিয়েছিল। এই দুই শহরের দূরত্ব ছিল ছাব্বিশ মাইল। এর থেকেই নাম ম্যারাথন। অলিম্পিকে এই দৌড় হয়।

আমার স্কুল কি ছাব্বিশ মাইল দূরে?

এবার অট্টহাস্যে ফেটে পড়েছিল বাবু। দেখো তোমার ছেলে কী বলছে। ছাব্বিশ মাইল অনেক দূর রে টুবলু। মাথার চুল আদর করে ঘেঁটে দিয়েছিল বাবু। কিন্তু যে কোনও লম্বা দৌড় শুরু হয় খুব ছোট ছোট দৌড় দিয়ে। নিজেকে তৈরি করতে হয়। দেখবি একদিন তুইও ম্যারাথন দৌড়াতে পারবি।

এই, এই সামলে।

আর একটু হলেই জমে যাওয়া বরফের উপর স্লিপ করছিল সুরজিৎ। আসলে বরফের কুচি এসে চশমার কাচটাকে ঝাপসা করে দিয়েছে। সেদিন স্কুলে যাওয়ার সময় বাবু কি হাত ধরেছিল তার? হ্যাঁ। মনে আছে। বাবু খুব সিম্বলিজমে বিশ্বাস করত। ছেলের হাত ধরে প্রথমদিন স্কুলে নিয়ে যাওয়াটা বাবুর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ছুটি নিয়ে বাড়িতে ছিল সেইদিন। এমনকি স্কুল যাওয়ার পথে নিজের মাথায় ছাতা খুলে ধরেনি। বরং নিজের হাতের গরম তালুতে নিয়েছিল টুবলুর কচি হাত। কি রে হাত ঘামছে কেন? স্কুলে যেতে ভয় লাগছে নাকি তোর? লজ্জা পেয়ে ঘনঘন মাথা নেড়েছিল টুবলু। কই না তো। তারপর বাবুর মুখে প্রশয়ের হাসি দেখে বলেছিল, এট্টু।

শুরুতে একটু ভয় পাওয়া ভালো। ভয়ের শেষে পৌঁছে যখন দেখবি ভয় পাওয়ার মতো কিচ্ছু ছিল না, ভবিষ্যতে ভয় করতে ভুলে যাবি।

বাবু কি প্রথম দিনেই এমনি কথা বলেছিল না পরে আরেকদিন? হয়তো হাইস্কুলে ভর্তির দিন। কিংবা আরও পরে। কিন্তু বলেছিল।

সুরজিৎ চামড়ার গ্লাভস পড়েছিল। ঝট করে খুলে ফেলল। একরাশ ঠান্ডা আঙুলে আঙুল জড়াল। অনেকদিন বাদে হাসল সুরজিৎ। একটা নরম হাসি। শরীরে উষ্ণতা ছড়ালে যেমন হাসি ঠোঁটের কোণে জায়গা নেয়।

আজ খুব বেশি দূরে যাবে না সুরজিৎ। তার ম্যারাথন স্কুলের আজ প্রথম দিন। হিসেব মতো ওয়াটার্স রোড দিয়ে গিয়ে ওয়াগ্নারে বাঁদিকে পড়ে আবার অ্যান আরবার সেলিন ধরে চলে এলেই মাইল দুয়েক হয়ে যায়। বরফ পড়ছিল বলে দুলকি চালে দৌড়েছে আজ। মিনিট চল্লিশের মধ্যেই বাড়িতে ফিরে এসেছে।

একসঙ্গে দৌড়াতে খুব ভালো লাগল রে আজ।

আমারও। বলে মুখে মৃদু হাসি নিয়ে যখন সুরজিৎ বাড়িতে ঢুকল পাপড়ি জাস্ট তার আগে ফোন রেখেছে। সুদীপার সঙ্গে কথা না বললে টেনশান যাচ্ছিল না। এই লোকটাকে বললে তো কিছু শুনবে না। এখন আবার বেশি কিছু বলাও যাচ্ছে না। সুদীপাও তাই বলল। দৌড়াতে দে পুপু। একটু বরফ গায়ে লাগলে কিছু খসে পড়বে না ওর। সুরজিৎদার মুখচোখ বড্ড বসে গেছে। সারাক্ষণ বসে বসে ভাবে, হয়তো দৌড়ালে বেটার ফিল করবে।

প্রবীরের তো মা মারা গেল গত বছর। ও কি এমন করেছে? বয়েস হলে—
একেকজন আলাদা আলাদা ভাবে হ্যান্ডেল করে। সুরজিৎদার শকটা একটু আলাদা, ওকে ওর মতো রাস্তায় স্বাভাবিক হতে দে। ম্যারাথন দৌড়াবে সেটা তো ভালোই হল। হেলদি, চল্লিশ এগিয়ে আসছে। যত এক্সারসাইজের মধ্যে থাকবে ওদের জন্য ততই মঙ্গল।

মনটা একটু শান্ত হল শুনে। আর ঠিক তখনই সুরজিৎ ঘরে ঢুকল। ওর মুখের হাসিটা তখনও পুরো মিলিয়ে যায়নি। পাপড়ির মনে হল সুদীপা ঠিকই বলেছে। একটু স্পেস দেওয়া দরকার। গলা নরম করে জিজ্ঞেস করল, তোমাকে একটু গরম জলে লেবু আর মধু গুলে দিই?

যেন একটা স্বপ্নের মধ্যে থেকে কেউ ডেকে তুলল। ওর চোখে সেরকম একটা ঝটকা। লেবু জল? না, চাইনি তো।

পাপড়ির বুকে কেমন খচ করে উঠল। কিন্তু মুখে আর কিছু বলল না।

সুরজিৎ অ্যান আরবার ম্যারাথনে নাববে শুনে অনেক ফোন আসছিল। পাপড়ির জন্য কোনও খবর ছড়াতেই বেশি সময় লাগে না। কৌশিক ফোন করে বলল, সুরজিৎদা আমাদের ব্যাডমিন্টন গ্রুপে চলে এসো। বডি ফিট থাকবে।

হ্যাঁ, হ্যাঁ যাব যাব। মুখে বললেও সুরজিৎ জানে যাবে না। সে শুধু দৌড়াবে। আস্তে আস্তে দুই থেকে চার, চার থেকে আট, ষোলো হয়ে ছাব্বিশে পৌঁছে যাবে ঠিক। সে শুধু বাবুর সঙ্গে দৌড়াতে চায়। রোজ।

প্রথম কদিন দুই মাইলের বেশি দৌড়াবে না ঠিক করেছিল। আজ বরফ গলে গেছে। টেম্পারেচার কম হলেও বিকেল এখনও অত কমেনি। শেষ আলো ছিল। কিন্তু ওর দৌড় শেষ হতে হতে আলো থাকবে না। সেই জন্যেই ডাউন টাউনটা বেছে নিয়েছে আজ। ভিড় থাকবে, কিন্তু অন্ধকার নয়। আজ ফিরে রিক্রিয়েশনাল স্পোর্টস থেকে ফ্লোরেসেন্ট আর্ম ব্যান্ড আর মাথায় লাগানোর টর্চ কিনে নেবে। অফিসের দিনে সন্ধ্যাবেলাতেই দৌড়াতে হবে, তাই এই ব্যাবস্থাগুলো থাকা চাই। রোজ রোজ ডাউন টাউনে এসে দৌড়ানোর কোনও মানে হয় না।

গাড়ি চালিয়ে লিবার্টি ধরে এসে মিশিগান থিয়েটারের সামনে গাড়ি পার্ক করল। এই সময়ে অ্যান আরবার ডাউন টাউন সরগরম। ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা হাতে হাত ধরে হাসতে হাসতে রাস্তা জুড়ে চলেছে। ঠান্ডা পরে গেছে বলে এখন আর পেভমেন্টে গেস্টদের জন্য টেবিল চেয়ার পাতেনি রেস্তোরাঁগুলো। সেটাই রক্ষে। তবু গা বাঁচিয়ে দৌড়াতে হচ্ছিল।

একদিন পার্ক স্ট্রিটের ভিড়ের রাস্তা দিয়ে আমি আর তুই দৌড়েছিলাম। মনে আছে টুবলু?
হ্যাঁ, এরকমই ভিড় ছিল। না আসলে আরও অনেক বেশি।
দাঁতের ডাক্তারের কাছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল।
তুমি বকা দিচ্ছিলে। বলছিলে আমাদের দেরি হয়ে গেছিল খুব।
ওই রাস্তায় সব সময়েই ভিড়।

তুমি পারছিলে না, হাঁফাচ্ছিলে। সুরজিতের মনে পড়ল সেটা ছিল শনিবার। শনিবার বাবুর হাফ ছুটি থাকত। অন্য শনিবারে বাবু এই সময়ে বিছানায় একটু গড়াগড়ি দেয়। সেদিন বাড়িতে ফিরে দুটো মুখে দিয়েই আবার টুবলুকে নিয়ে কলকাতার পথে বেরিয়েছিল। কত বয়েস ছিল তখন বাবুর? সুরজিতের যদি চোদ্দো হয়, বাবু তাহলে ছেচল্লিশ। এখনকার সুরজিতের থেকে আট বছরের বড়।

এখানে ফুটপাথে অন্তত হকার বসে না।

সম্মতির সঙ্গে মাথা নাড়ল সুরজিৎ। ৩৪/১ পার্ক স্ট্রিট বাসরাস্তা থেকে এক মাইলও হবে না। কিন্তু সেটা সোজা রাস্তার দৌড় ছিল না। অবস্টাকল রেস।

হার্ডলস। শুধরে দিল বাবু।

ফুটপাথে কত রকমের পসরা সাজিয়ে বসেছে হকাররা। পার্ক হোটেলের নীচে ম্যাগাজিন, পর্নোগ্রাফি আর বিদেশি কনডোমের প্যাকেটের ঢালাই বিক্রি। এর আগে অবধি বাবু সুরজিতের বাঁদিকে ছিল। এইখানে এসে দিক বদল করে ডাঁয়ে এসে পড়ল। নষ্ট দুনিয়ার সমস্ত হাতছানিকে আড়াল করে। এই করতে গিয়ে খদ্দেরের অপেক্ষায় দাঁড়ানো স্কার্ট পরা একটি অ্যাংলো মেয়ের গায়ে ধাক্কা লাগিয়ে ফেলেছিল বাবু। মুখ ঘুরিয়ে গাঢ় লাল লিপস্টিকে রাঙ্গানো ঠোঁটে বিশ্রি কিছু গালাগালি ছুঁড়ে দিয়েছিল বাবুর দিকে। সুরজিৎ জানত বাবুর চোখমুখ অপমানে লাল হয়ে গেছিল। কিন্তু সুরজিৎ মুখ ফিরিয়ে বাবুর মুখ দেখতে যায়নি। এখানে সুরজিৎকে সরে রাস্তা করে দিচ্ছিল পথচারীরা। একটি মেয়ের গায়ে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল একবার। টেক কেয়ার বলে মেয়েটা ঝটিতি সরে না গেলে ধাক্কা লেগে যেতে পারত।

স্কার্ট পড়লেও মেয়েগুলো সভ্য।

হাসল সুরজিৎ। সেদিন স্কার্ট পরা অ্যাংলো মেয়েটা দুটো বাজে কথা বলেছিল বলেই কি ওই পোশাকটা বাবুর এত অপছন্দ ছিল? কলেজে পড়ার সময় পাপড়িকে নিয়ে একদিন বাড়িতে এসেছিল। পাপড়ির পরনে স্কার্ট। তখনও খুব বেশি কলেজপড়ুয়া মেয়ে স্কার্ট পরত না। রাত্রে খেতে বসে বাবু মাকে বলেছিল, আজকালকার মেয়েরা বড্ড পাশ্চাত্যঘেঁষা হয়ে যাচ্ছে। শাড়ির মতো এত ভাল পোশাক আছে নাকি? সুরজিৎ মুখ নিচু করে খেয়ে যাচ্ছিল। কিছু বলেনি।

ভুলটা ধরিয়ে দিতে পারতিস। আঠেরো বছর বয়সের পরে তুইও তো একটা গোটা মানুষ।
বলোনি তো।

কী বলব? টুবলু তুমি এখন বড় হয়ে গেছ। তোমার নিজের মত অন্যরকম হতেই পারে? কোথায় আমার সিগারেটের প্যাকেট থেকে যখন চুরি করে খেলি তখন তো পারমিশান লাগেনি কোনও। বাবু গলার মধ্যে হাসল। অন্তত সেরকমই মনে হল সুরজিতের।

এড়িয়ে চলতাম তোমাকে।

কিন্তু আমি কি তোকে মারতাম? কবার মেরেছি বল তো? কাতরতা ছেয়ে যাচ্ছিল বাবুর গলায়।

বাবু তাকে সারাজীবনে শুধু দুইবার চড় মেরেছে। তবু কেমন করে যে বাবুকে ভয় লাগত এত! তার অন্য সব ছোটবেলার বন্ধুরাও বাবাকে ভয় পেত। পাপড়ি পায় না। সুরজিৎ পাপড়ির কলেজ জীবনের ছবি দেখেছে, ওর বাবার কোলে বসে কচি খুকিটির মতো গলা জড়িয়ে। সুরজিতের তার বাবার সঙ্গে সেই বয়সের শুধু একটা ছবিই আছে। দার্জিলিঙের মলে।

জোড়বাংলার দিকে হাঁটার সময় আর একটা ছবি ছিল আমাদের, ভুলে গেলি? ওখানেও এমনি খাড়াই ছিল রাস্তাটা।

নর্থ ক্যাম্পাস ধরে দৌড়ানোর দিন বলেছিল বাবু। এখন সুরজিৎ রোজকার দৌড়বাজদের মতো সাজসজ্জায়। মাথায় ব্যান্ডে লাগানো টর্চ। হাতে ফ্লোরেসেন্ট আর্ম ব্যান্ড। পকেটেও আর একটা সেট আছে। খুব আরাম দিচ্ছে ওরা। এখন সুরজিৎ প্রায় পাঁচ মাইল দৌড়াচ্ছে রোজ। এক ঘণ্টার মধ্যে। স্পিড বেড়েছে। স্ট্যামিনাও। বেটস ড্রাইভ ধরে স্কুল অব মিউজিক পেরিয়ে দৌড়ে যাচ্ছিল সুরজিৎ। এই রাস্তাটার চড়াই বেশ অনেকটা। সুরজিৎ হাঁফাচ্ছিল।

একটু দাঁড়িয়ে নিবি?
না, পারব। পারতেই হবে।
এই জোরটা রাখবি।
তোমার কেন রইল না বাবু?

কোনও উত্তর নেই।

দাঁড়িয়ে গেল সুরজিৎ। কোমরে হাত দিয়ে। বাবু! বাবু!

আছি।

এরকম খোলাখুলি প্রশ্ন বাবুকে কোনদিন করেনি সুরজিৎ। ভয় পাচ্ছিল বাবু কি চলে গেল! থাক, বেশি খোঁচানোর দরকার নেই। সময় হলে আপনিই বলবে। কথা ঘোরাতে জিজ্ঞেস করল, আমাদের সেই ছবিটা তাহলে কোথায় গেল বাবু। কীরকম ছবি? আমি তো অ্যালবামে দেখিনি।

ছবিটা মনে করিয়ে দিই। উপরের দিকে অক্সিজেন একটু কম ছিল বোধহয়। আমরা হাঁটছিলামও একটু জোরে। আমার হাঁফ ধরে গেছিল। কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। তুই আমার বুকে হাত ডলে দিচ্ছিলি। বলতেই মনে পড়ে গেল সুরজিতের। বাবুর বুকে ওই একবারই হাত দিয়েছিল সুরজিৎ। মা ওদের থেকে অনেকটা পিছনে ছিল। ওরা দাঁড়িয়ে পড়েছিল বলে ধরে ফেলতে পেরেছিল। বাবুর হটশট ক্যামেরাটা মার হাতে ছিল। তাই দিয়ে মা হঠাৎ ছবিটা তুলে সলজ্জে হেসে বলেছিল। দ্যাখ কেমন ওঠে। আমি তো ছবি তুলি না। তোদের বাবা ছেলের এমন সুন্দর একটা ভাব তৈরি হল— মা ভালোবাসাকে ভাব বলত।

সেই ছবিটা গেল কোথায়? আমি তো অ্যালবামে আর দেখিনি।

হালকা হাসির শব্দ।

তুমি জানতে?
আমার কাছে ছিল। পার্সে।

হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল সুরজিৎ। দুহাতে মুখ ঢেকে। রাস্তার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। গলায় হেঁচকি উঠছিল।

ও কি রে, কী হল টুবলু?
সরি বাবু।
না, না ঠিক আছে। কান্না পেলে কাঁদবি, কাঁদলে মন পরিষ্কার হয়। এখানে লোকে তেমন নজর করে না। মানুষ খোলাখুলি কাঁদতে পারে।

ছেলেদের কান্না বাবু পছন্দ করত না। নিজেও কখনও কাঁদে নি। ঠাকুমা যেদিন মারা গেল ঠায় শুকনো চোখে বসেছিল বাবু। পিসিরা আছারিপিছারি দিয়ে কাঁদছিল। বাবুর চোখে জল দেখা যায়নি। মুখেও কোনও কথা ছিল না। মা মারা যাবার পর বাবু কি কেঁদেছিল? জানে না সুরজিৎ। অফিসের কাজ, যেতে তিনদিন দেরি হয়। এত দূর। মুখে আগুন দিবি না? ফোনে বাবুর এই প্রশ্নের উত্তর জানা ছিল না সুরজিতের। শ্রাদ্ধ, বাড়িভর্তি লোক। বাবুর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলাও হয়নি। একসঙ্গে বসে কিছু কথা বলার ছিল। কিংবা শুধুই পাশাপাশি বসে থাকার। হয়নি। সুরজিৎ চলে এল। ছোটপিসিরা তখনও ছিল। দাদাকে ঘনঘন ফোন করিস টুবলু। ফিসফিস করে বলেছিল পিসি। ফোনে চুপচাপ পাশে বসে থাকা যায় না। কথা না বলে। বাবুর সঙ্গে বলার কথা কবে থেকে যে কমে গেল। বাবুকে বারবার আসতে বলেছিল। থেকে যাও এসে তিন মাস।

বড় ফাঁকা ফাঁকা তোদের ওখানে।
আগে তো এসেছিলে।
তখন তোর মা ছিল।
বাইরের লোক না থাকলে ভিতরে বেশি কথা হয়ে যায়।
বাড়িতে কতরকম হয় মানুষের, মনে রাখলে চলে?
মনে রাখিনি।
মাকে বুঝিয়ে বলতে পারতে।
তিরিশ বছর একসঙ্গে থাকার পর দুটো মানুষ আলাদা করে ভাবতে পারে না।
আমি জানি, তুমি পুপুকে দোষী করেছিলে।
রিকুকে দেখতে ইচ্ছে করত।
আসলেই পারতে।
তোরা আর বছর বছর আসছিলি না।
অনেক খরচ।
তোর তো এখনও পঞ্চাশ হয়নি।

বাবু আবার হাসল।

বুকের দমটা অনেক বেড়ে গেছে এখন সুরজিতের। তাছাড়া নিচের দিকে দৌড়ে নাবাটা অনেক সোজা। যদিও কাফ মাসলে বড্ড টান লাগে। চুপচাপ দৌড়াচ্ছিল দুজনে। পাশাপাশি। কিন্তু আছে কি নেই জানার জন্যে থমকে দাঁড়াতে হয় না।

বাড়িতে ঢুকতেই পাপড়ি পাকড়াও করল। কী হয়েছে বলো তো তোমার? টাইম দেখেছ ঘড়িতে? শীতের রাতে এত দেরি অবধি কেউ বাইরে থাকে?

সেটা থাকে। আমি একা তো দৌড়াই না। এখানের লোকের দৌড়ানোর অভ্যেস।
তাই বলে দুই ঘণ্টা?

রাস্তায় দৌড়াতে সময় লাগে। ম্যারাথন, লম্বা দৌড়ের প্রস্তুতি। জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে বলল সুরজিৎ। হাফ ম্যারাথন অবধি হয়ে গেছে। এটা বলেনি। বাবু শুনতে পেয়ে নিঃশব্দে হাসল।

অফিস থেকে আসো, আর বেরিয়ে যাও। সারা দিন বাড়ির বাইরে। পাপড়ি আর পারছে না। এগিয়ে এসে বসে থাকা সুরজিতের কাঁধে হাত রাখল। এত বেশি সময় বাইরে বাইরে থাকছ। ছেলেটার দিকে অবধি তাকিয়ে দেখার সময় নেই? তুমি ফিরতে ফিরতে ঘুমিয়ে পড়ছে ও।

এই ভুলটা আমিও করেছিলাম টুবলু।
কী ভুল?

আমি ভুল বলিনি জিৎ, কিন্তু বাবা হিসেবে ছেলের জন্য তোমার একটা কর্তব্য আছে তো। নাকি? নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঝাঁঝিয়ে ওঠে পাপড়ি। মাঝখান থেকে বাবু কী বলল সেটা হারিয়ে গেল। মোবাইলে সিগন্যাল না পেলে যেমন খোলা জানালার কাছে চলে যায় তেমনি আড়ালে সরতে সরতে জিজ্ঞেস করল সুরজিৎ, শুনতে পাইনি, আরেকবার বলো।

ওভার টাইম করতাম রে খুব। বাড়িতে আর একটা ঘর তোলার ছিল। তোর আলাদা পড়ার ঘরের দরকার তখন। ফিরতে ফিরতে ঘুমিয়ে পড়তিস।
একদিন তোমার জন্য অপেক্ষা করেছিলাম অনেক রাত অবধি। তুমি বলেছিলে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের ম্যাচ দেখাতে নিয়ে যাবে। ভেবেছিলাম তোমাকে জিজ্ঞেস করব টিকিট পেয়েছ কিনা।
শনি রবিবারেও ডিউটিতে যাচ্ছিলাম। কেমন করে যেতাম?
প্রথম ময়দানে বড় ম্যাচ দেখি কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে থাকতে। বন্ধুদের সঙ্গে।

বাবু এখন চুপচাপ থাকবে। কোনও সাড়া দেবে না। জুতোটা র‍্যাকে রাখতে রাখতে হাসল সুরজিৎ। কেন হাসল? জিতে গেল বাবুর উপর? না কি একইভাবে হেরে যাচ্ছে সেটা অ্যাকনলেজ করল? রিকের শোবার ঘরে এল সুরজিৎ। আট বছর বয়েসেই বেশ লম্বা। বাবুর ধাত পেয়েছে। এটা ভাবতে ভালো লাগল সুরজিতের। না হলে সে নিজেও তো বেশ লম্বা। ছেলের মাথায় হাত রাখল সুরজিৎ। ক্রু কাট, চাঁদি দেখা যায়।

তোর চুল অনেক লম্বা হত, বেশ বড় রাখতিস।
সেটা কলেজে পড়ার সময় বাবু।
তোর খুব নরম চুল ছিল, তোর মায়ের মত। হাওয়ায় পতপত করে উড়ত। জয়পতাকা।
তুমি দেখতে?
লুকিয়ে লুকিয়ে।

কেন? প্রশ্নটা করলেও সুরজিৎ জানে তার দিকে তাকিয়ে থাকলে সে যে বিরক্ত হত সেই খবর পৌঁছে গেছিল। মাকে বলেছিল বাবু এমনভাবে তাকিয়ে থাকে কেন? আমি কি অন্যায় করেছি? মনে আছে সুরজিতের। ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পেল না। ওর বন্ধুরা সব ভাল ভাল কলেজে পড়তে চলে গেল। সুরজিতের মনে হত বাবার নিস্পলক চোখ ওকে দোষারোপ করছে। মা বলেছে, পঞ্চাশ পেরিয়েছে না, ভীমরতি।

পঞ্চাশটা একটা মাইলস্টোন।

হাফ ম্যারাথনের মত? জানতে ইচ্ছে হল সুরজিতের। তারটা এখনও বেশ দূর।

আধাআধি এসে গিয়েছি ভাবতে ভালো লাগে, কিন্তু আসলে অর্ধেকের অনেক বেশি। সেটা বুঝেই ভয় লাগে।
মরার ভয়?

না। মনে হত কী করা হল, কী হল না। তোকে দাঁড় করিয়ে যেতে পারব কি না। এইসব। সাফাই গাওয়ার সুরে বলল বাবু।

এখানে এমন করে দাঁড়িয়ে আছ কেন? লাইট জ্বেলেছ, রিক যদি উঠে যায়! পাপড়ি পিছন পিছন এসেছে।

নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এল সুরজিৎ।

তোমার কী হয়েছে বলো তো?

সাদা চোখে তাকাল সুরজিৎ। টায়ার্ড। আর কিছু নয়।

হবেই তো। প্রবলেমটা শরীরে জানলে একটু স্বস্তি পায় পাপড়ি। কী দরকার ছিল এইসব ম্যারাথন ট্যারাথনের?

এড়ানো যায় না। এটা বাবুকে বলল না কি পাপড়িকে?

শোনো, শুধু দৌড়ালে হয় না। ডায়েটটা ঠিক হতে হয়। আমি একটা চার্ট পেয়েছি, সেই দেখে দেখে তোমার খাবার দেব কাল থেকে।
রিককে আমি কাল ড্রপ করে দেব স্কুলে, কাল স্কুলবাসে যেতে হবে না ওকে।

পরদিন বরফ ঝড়ে স্কুলই বন্ধ। অফিসে গেছিল সুরজিৎ। ফিরে আবার দৌড়ের জন্য ধড়াচূড়া পড়তে দেখে পাপড়ি ছুটে এল। এতদিন যা করেছ, করেছ। আমি আজ যেতে দেব না, ব্যাস।

আমাকে যেতেই হবে পুপু।
প্রবীরকে জিজ্ঞেস করেছি, বলল ম্যারাথনের ট্রেনিঙে কেউ রোজ দৌড়ায় না, মাঝে মাঝে গ্যাপ দেয়।
সবার শিডিউল আলাদা।
সবসময়ে নিজের মনমৌজিপনা চলবে না জিৎ। এই বরফের সমুদ্রে তোমাকে আজ বেরোতে হবে না।

সুরজিৎ নীরবে জুতোর ফিতে বেঁধে উঠে দাঁড়াল।

কী হল তুমি শুনবে না? নিজেকে সুরজিৎ আর দরজার মাঝখানে রেখে দাঁড়াল পাপড়ি। সুরজিতের মধ্যে রাগ কুণ্ডলী পাকাচ্ছিল। কেউ কিচ্ছু জানে না, তাকে বোঝার কেউ নেই। শুধু খবরদারি! এক ঝটকায় পাপড়িকে দরজার থেকে সরিয়ে দিল সুরজিৎ।

উফ! কোনওমতে টাল সামলাতে সামলাতে ফেটে পড়ল পাপড়ি। যত দিন যাচ্ছে, তুমি কি অমানুষ হয়ে যাচ্ছ? কী করেছি আমি? আমার কী দোষ ছিল? গলা চিরে আসে পাপড়ির। ততক্ষণে সুরজিৎ ড্রাইভওয়েতে। রিক লিভিং রুমের পর্দা ধরে দাঁড়িয়েছিল।

কারও কোনও কথা শুনিস না এখনও।

গুম হয়ে রইল সুরজিৎ। সন্ধ্যার দিকে সারাদিন মুখ চেয়ে বসে থাকে। সেখানে কেউ বাধা দিতে এলে মাথার ঠিক রাখতে পারে না।

পাপড়ি ফোনে সেই কথাই বলছিল সুদীপাকে। ওর আর মাথার ঠিক নেই রে। আমি কী করব কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। হ্যাঁ, না হলে বলছি কী? রিক শুধু এক দিকের কথা শুনতে পাচ্ছিল। আমি ওকে নিজের মনে বিড়বিড় করতে দেখেছি। একটু থেমে দম নিল পাপড়ি। ফোঁপাচ্ছিল। আর কাকে বলব বল, তোকে ছাড়া। এসব কাউকে বলা যায়? রিক সুদীপামাসির কথাগুলো মনে মনে জুড়ে নিচ্ছিল।

আমার কথাও শুনতে চাইতিস না। তোকে বললাম নিটের কোর্সটা করতে।
অনেক টাকা লাগত।
তুই বললি, তুমি কী জানো এসবের। আসলে অফিসে সবাই বলছিল—
খোঁজখবর না নিয়ে কোনও একটা কোর্স করলেই হল?
সেই তো করলি। যখন তরুণ, বিল্বরা করল।

তোমার বলার মধ্যে কী একটা ছিল। সুরজিতের ডিফেন্সিভ লাগছিল নিজেকে।

জানি। আসলে কদিন বাদে রিটায়ার করব, মাথায় চিন্তা থাকত। কোনও কিছুর সঙ্গেই টাকার কথাটা সবাইকে শুনিয়ে দিতে মন চাইত।
মার সঙ্গেও টাকা নিয়ে ঝগড়া হত তোমার।
মানুষের চাহিদাটা কমাতে হয়।
তুমি মাকে মেরেছিলে।

কানে এখন শুধু হাওয়ার শব্দ। শনশন করে হাওয়া বইছে। বরফের কুচিগুলো মাটিতে এসে পড়ছে, প্রায় সমান্তরাল।

আমাকে না জিজ্ঞেস করে ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা ধার করেছিল।
তাই বলে মারবে?
মারিনি, ধাক্কাধাক্কিতে খাট থেকে পড়ে গেছিল।
মার কপাল নীল হয়েছিল।
আমার হাতে কামড়ে দিয়েছিল তোর মা।
তুমি তিনদিন বাদে আমাকে দেখাতে এসেছিলে।
তুই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলি।
তোমাকে নীচ মনে হয়েছিল। বস্তি।
আমারও তো কিছু বলার ছিল।
আমার কিছু শোনার ছিল না।
ছমাস কথা বলিসনি।

ঝড়টা বেড়ে যাচ্ছিল। রাস্তায় সুরজিৎ ছাড়া বোধহয় আর কেউ নেই। অনেক পরে পরে একেকটা গাড়ি গুঁড়ি মেরে মেরে এগিয়ে চলেছে। হাওয়ার শব্দ ছাড়া সব চুপচাপ। বরফ আর পড়ছে না এখন। কিন্তু মাটিতে পড়ে থাকা ঝুরো বরফ হাওয়ায় ঘূর্ণি পাকিয়ে উড়ছে। সুরজিৎ মুখ ঘুরিয়ে বাড়ির পথ ধরল। বাবু আর একটাও কথা বলল না। পাপড়িও আজ গুম। সুরজিৎ ঘরে ঢুকে জুতো খুলে রকিং চেয়ারটায় বসেছিল।

প্রবীরও ম্যারাথনে নাববে ঠিক করেছে। কাল থেকে ও তোমার সঙ্গে দৌড়াতে বেরোবে।
প্রবীর ক্যান্টনে থাকে। অতদূর থেকে আমার সঙ্গে দৌড়াতে আসবে কেন?
সবাই তো তোমার মত একা একা থাকতে ভালোবাসে না।
আমি একা থাকি না।
একা দৌড়াও।
আমি একা দৌড়াই না।

কে যায় তোমার সঙ্গে? চোখটা এবার সন্দেহে সরু হয়ে গেল পাপড়ির। আমার কাছে কী লুকাচ্ছ বলো তো।

প্রবীরকে বারণ করে দিও।
আমি পারব না। লোকের সঙ্গে যদি সম্পর্ক না রাখতে হয় তুমিই জানিও।

পরদিন সুরজিৎ দৌড়ানোর পোশাক নিয়েই অফিসে বেরোল। ফিরে বাড়িতে আর ঢুকল না। বাড়ি থেকে একটু দূরে গাড়ি রাখল। গাড়িতেই ড্রেস বদলে বেরিয়ে পড়ল। জ্যাকসন রোড ধরে শহরের পথে চলল। পায়ে জোর বাড়াতে সিঁড়ি ভাঙতে হবে। রিপাবলিক পার্কিং সাত তলা, ওটার সিঁড়ি ধরে দৌড়ে উঠবে আজ।

ডাউন টাউনের রাস্তাও আজ একদম ফাঁকা।

তোর কত মাইল হয় আজকাল?
কুড়ি অবধি গেছি। তারপরে পায়ে খিঁচ ধরে যাচ্ছে।
কুড়ি থেকে ছাব্বিশ— এইখানেই অনেক ছিটকে যায়।
তুমি সেই ভয় পাচ্ছিলে আমাকে নিয়ে।
সনাতনবাবুর ছেলে হরিৎ ড্রাগস নিয়ে শেষ হয়ে গেল।
তুমি আমার উপর আর একটু বিশ্বাস রাখতে পারতে।
রেখেছিলাম। বলেছিলাম কিছু আমি?
মাকে বলতে।
কাউকে তো বলতে হয়। না হলে চাপটা বেড়ে যায়। কিন্তু মা কেন সেগুলো তোকে লাগাত।
রিলে করত। আসলে মাকেও তো কারও কাছে বলতে হয়।
আমি জানতাম তুই ভালো কিছু একটা করবি।
জানতে না। আকাঙ্ক্ষা।
আশা করতাম।
মা আশা আকাঙ্ক্ষা শব্দ দুটো একসঙ্গেই বলত।
দুটো আলাদা ভাবনা।
মা আর বাবারা আলাদা কেন ভাবে?
বাবাদের লুকাতে হয়।
স্টিরিওটাইপ।
আমাদের সময় আলাদা ছিল।
আমরাই আমাদের সময় তৈরি করি।
চল্লিশ হবার আগে আমিও তাই ভাবতাম।

সিঁড়ি দিয়ে ধাপে ধাপ উঠে যাচ্ছিল সুরজিৎ। এক ধাপে ও বলছিল, আরেক ধাপে বাবু।

চল্লিশের পরে কী হয়?
উতরাই।
সেটা তো সহজ।
নীচের দিকে তাকালে হুমড়ি খাওয়ার ভয় করে।

রিপাবলিক পার্কিং-এর সাত তলায় পৌঁছে গেছিল সুরজিৎ। এই তলার পার্কিং ওপেন এয়ার। বরফের সময় এখানে কেউ গাড়ি রাখে না। শুধু একটা গাড়ি বরফের ভূত সেজে দাঁড়িয়ে ছিল।

পার্কিং-এর ছাদের একেবারে কোণায় চলে এসেছিল সুরজিৎ। নিচে মেনারড রোডে একটা ডাম্পস্টার, খুচরো কিছু মানুষ, গোটা তিনেক গাড়ি। সব কিছু বেশ ছোট লাগছে এখান থেকে।

তোমার ভয় লেগেছিল বাবু?
কখন?
সাত তলা ছাদের আলসেতে দাঁড়িয়ে।

তোদের এখানে ছাদগুলো অনেক নীচু। আমাদের দেশে এর থেকে ঢের বেশি উঁচু হয়। সুরজিতের মনে হল বাবু তাকে মক করছে।

নীচের দিকে তাকিয়ে তোমার ভয় লেগেছিল বাবু? প্রশ্নের উত্তর আজ এড়িয়ে যেতে দেবে না সুরজিৎ।

আমার সামনে পিছনে দুটোতেই ভয় ছিল।

কীসের ভয়? আমার সঙ্গে কথা বলোনি কেন? কেন ফোন করোনি? ছাদের একেবারে আলসেতে এসে গেছিল সুরজিৎ। বরফে ছাদটা পিচ্ছিল হয়ে আছে। কিন্তু কোনও ভয় করছে না সুরজিতের। তারও কি পিছনের ভয়টা বেশি হয়ে গেছে?

উত্তর দাও বাবু। বেশ জোরে জোরে চেঁচাল এবার সুরজিৎ। হাওয়া ধরে ঝাঁকাতে ইচ্ছে করছিল। বাবু বলতে ইতস্তত করছে। দূরে সরে যাচ্ছে সুরজিতের থেকে। আজ যেতে দেবে না বাবুকে। জাপটে ধরে আটকাতে গেল সুরজিৎ। পিছন থেকে জাপটে ধরল প্রবীর। কী করছ কী সুরজিৎ?

থরথর করে কাঁপছিল সুরজিৎ।

ভাগ্যিস তোমাকে না পেয়ে আমি আন্দাজে আন্দাজে ডাউনটাউনে চলে এসেছিলাম। পার্কিং লটে ঢুকতে দেখেই সন্দেহ হয়েছিল। আর একটু হলে কি কাণ্ড হত!

সুরজিতের হুঁশ নেই। সে তখনও বাবুর উত্তর শুনতে চাইছিল।

হাওয়া ফিসফিস করে বলল, একা থাকলে ধরে ফেলার কেউ থাকে না রে টুবলু।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2508 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...